
কার্ল মার্ক্সে’স ইকোসোশ্যালিজম: ক্যাপিটাল, নেচার, অ্যান্ড দ্য
আনফিনিশড ক্রিটিক অব পলিটিক্যাল ইকোনমি—কোহেই সাইতো,
মান্থলি রিভিউ প্রেস, নিউইয়র্ক, ২০১৭।
ভূমিকা
প্রকৃতি বিষয়ে কার্ল মার্ক্সের দৃষ্টিভঙ্গির প্রসঙ্গ উঠলেই মোটামুটি তিনটি সমালোচনা হয়ে থাকে। প্রথম সমালোচনা হলো মার্ক্স একটি ‘উত্পাদনবাদী’ বা ‘প্রমিথীয়’ দৃষ্টিকল্পের শিকার। এর অর্থ হলো মার্ক্স মানব সংগঠনের উদ্দেশ্য হিসেবে পরিমাপযোগ্য অর্থনৈতিক উত্পাদনশীলতা ও প্রবৃদ্ধিকেই বিশ্লেষণের উপজীব্য হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। এই দৃষ্টিকল্পের অধীনে ভাবা হয় যে উত্পাদনশীল শক্তিগুলোর পুঁজিবাদী বিকাশের ফলে মানুষের উত্পাদনক্ষমতা প্রাকৃতিক বাধাগুলোকে সম্পূর্ণরূপে অতিক্রম করতে পারে। এখানে কমিউনিজম বা সাম্যবাদকে দেখা হয় প্রকৃতির ওপর সম্পূর্ণ মনুষ্য আধিপত্য বিস্তারের পুঁজিবাদী চেতনার সম্প্রসারণ ও তা জায়েজ করার অংশ হিসেবে। এ ছাড়া পুঁজিবাদ ও সাম্যবাদ দুটোকেই মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে অনিবার্য বৈরিতার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হয়।
দ্বিতীয় সমালোচনা হলো পুঁজিবাদের বিশ্লেষণে মার্ক্স উত্পাদনের ক্ষেত্রে প্রকৃতির ভূমিকাকে হয় বাতিল করে দিয়েছেন অথবা গুরুত্ব দেননি। মার্ক্স মূল্যের যে শ্রমতত্ত্ব দিয়েছেন, সে ক্ষেত্রে এটা বিশেষভাবে প্রযোজ্য। আর তৃতীয় সমালোচনাটি হলো পুঁজিবাদের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বের যে সমালোচনা মার্ক্স করেছেন, সেখানে প্রকৃতি বা উত্পাদনের প্রাকৃতিক শর্তগুলোর কোনো ভূমিকা নেই।
পল বুর্কেট ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত মার্ক্স অ্যান্ড নেচার গ্রন্থে এই সমালোচনাগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন। সেখানে তিনি মার্ক্স সম্পর্কে এই দাবিগুলোর সাধারণ অনুসিদ্ধান্তগুলোরও উত্তর দিয়েছেন খুবই পদ্ধতিগতভাবে এবং রাজনৈতিকভাবে কার্যকর পদ্ধতিতে। তাঁর বক্তব্য ছিল এ রকম যে প্রকৃতি বিষয়ে মার্ক্সের অ্যাপ্রোচের একটি অন্তর্নিহিত যুক্তি যেমন আছে, তেমনি সাযুজ্য ও বিশ্লেষণী ক্ষমতাও রয়েছে। কিন্তু এই বিষয়টি এখনো স্বীকৃত নয়। এমনকি পরিবেশকেন্দ্রিক ইকোলজিক্যাল মার্ক্সবাদীরাও মার্ক্সের এই অ্যাপ্রোচটির স্বীকৃতি এখনো দেয়নি।
আরেকজন প্রথিতযশা সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং মান্থলি রিভিউ সাময়িকীর সম্পাদক জন বেলামি ফস্টার এ বিষয়ে অনেক প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। বিশেষ করে ফস্টারের মার্ক্সে’স ইকোলজি: ম্যাটেরিয়েলিজম অ্যান্ড নেচার এই বিষয়ে একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। অবশ্য ফস্টার মার্ক্সবাদের প্রথাগত ব্যাখাকে পরিবেশের সংকট মোকাবিলায় নতুন করে সামনে এনেছিলেন। পরিবেশের সংকটকে মাথায় রেখে তিনি আরও যুক্তিসংগত পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন। পুঁজিবাদী কৃষি ও মাটির বাস্তুতন্ত্রের ওপর মার্ক্সের অনাদৃত লেখাজোখা, দার্শনিক প্রকৃতিবাদ ও বিবর্তনবাদী তত্ত্ব ঘেঁটে ফস্টার দেখিয়েছিলেন যে মার্ক্স পুঁজিবাদী সমাজের শক্তিশালী সমালোচক হিসেবে পরিচিত হলেও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের পরিবর্তনশীল সম্পর্ক বিষয়ে মার্ক্স গভীরভাবে সজাগ ছিলেন।
অবশ্য কার্ল মার্ক্সের বিরুদ্ধে এসব সমালোচনার প্রথম জবাব আসে ষাট ও সত্তরের দশকেই। মার্ক্সীয় বিশ্লেষক রেমন্ড উইলিয়ামস ও ইস্তাভান মেসজারস যুক্তি দেখান যে মার্ক্সের রাজনৈতিক অর্থনীতি বুঝতে হলে পুঁজিবাদী সম্পর্কের সঙ্গে বাস্তুতন্ত্রের দ্বন্দ্ব ভালোভাবে বুঝতে হবে।
মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক পল বুর্কেট ও জন বেলামি ফস্টারের কাজের ওপর ভিত্তি করেই জাপানি মার্ক্সবাদী পণ্ডিত কোহেই সাইতো কার্ল মার্ক্সে’স ইকোসোশ্যালিজম: ক্যাপিটাল, নেচার, অ্যান্ড দ্য আনফিনিশড ক্রিটিক অব পলিটিক্যাল ইকোনমি গ্রন্থটি লিখেছেন। বইয়ের মূল কথা হলো পৃথিবী ধ্বংসের পেছনের মূল কারণ পুঁজিবাদী উত্পাদনের ধরন। আর এটা বুঝতে হলে মার্ক্সের চিন্তাকে কেন্দ্রীয় পদ্ধতি হিসেবে ধরতে হবে। এ ছাড়া প্রমিথীয় হিসেবে মার্ক্সের বিরুদ্ধে সমালোচনার অন্যতম জবাব হিসেবে বইটি গুরুত্বপূর্ণ। সাইতোর বইয়ে মার্ক্সের বিস্তৃত কাজকে তুলে আনা হয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো সম্প্রতি প্রকাশিত প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের ওপর মার্ক্সের নোটবুকগুলো।
মার্ক্সের চিন্তার বিবর্তন
কোহেই সাইতোর মতে, মার্ক্স শুধু একজন অর্থনীতিবিদই নন। ব্যাপারটি এমন নয় যে তাঁকে মাঝেমধ্যে প্রকৃতিবিষয়ক আলোচনায় পাওয়া যায়। সাইতো মনে করেন, ‘রাজনৈতিক অর্থনীতির যে সমালোচনা মার্ক্স করেছেন, তা পুরোপুরি বুঝতে হলে মার্ক্সের পরিবেশবিষয়ক ভাবনাও খতিয়ে দেখতে হবে...আসলে, মার্ক্স সমগ্র প্রকৃতি সম্পর্কেই আলোচনা করেছেন। সেটাই তাঁর ‘ম্যাটেরিয়াল ওয়ার্ল্ড’ বা বস্তুগত দুনিয়া, যাকে তিনি দেখেছেন পুঁজির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের জায়গা হিসেবে এবং এখানেই পুঁজিবাদের দ্বন্দ্বগুলো সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে (পৃ. ১৪)।’ মজার ব্যাপার হলো সাইতোর এই বিশ্লেষণ পশ্চিমা মার্ক্সীয় ব্যাখ্যা থেকে উত্সারিত হয়নি। এই বিশ্লেষণ সাইতো করেছেন কুরুমা স্কুল নামে মার্ক্সীয় দর্শনচর্চার জাপানি ঘরানা থেকে। জাপানি অর্থনীতিবিদ সামেঝো কুরুমার নামানুসারে এই ঘরানার মার্ক্সবাদীদের নামকরণ করা হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বে কুরুমার কাজ খুব একটা পরিচিত নয়। জার্মানিতে কিছুটা পরিচিত, কারণ কুরুমার ছাত্র ও আরও কয়েকজন মিলে জার্মান ভাষায় একটি বই সম্পাদনা করেছিল। কিন্তু তাঁর মূল কাজ হলো মার্ক্সে’স থিওরি অব দ্য জেনেসিস অব মানি: হাউ, হোয়াই অ্যান্ড থ্রু হোয়াট ইজ আ কমিডিটি মানি? কুরুমার এই কাজটি অনেকাংশেই অবহেলিত। সাইতোর এই বইয়ের তৃতীয় অধ্যায়ে কুরুমার কিছু কাজকে পরিচিত করানো হয়েছে।পুঁজি গ্রন্থের জাপানি এই ঘরানার ব্যাখ্যায় যে তাত্ত্বিক ভিত্তি পাওয়া যায়, সেখান থেকে দেখা যায়, মার্ক্স পুঁজিবাদের দ্বন্দ্বের নজির হিসেবে শ্রমশক্তি ও মাটির নিঃশেষকেই শুধু দেখেননি; বরং এখান থেকেই পুঁজির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের কথা ভেবেছেন।
মার্ক্স ও এঙ্গেলস-বিষয়ক চলমান একটি গবেষণা প্রকল্পের (Marx-Engels-Gesamtausgabe) অংশ হিসেবে প্রকাশিত মার্ক্সের ‘এক্সার্পট নোটবুকস’ থেকে বিশদ আকারে বর্ণনা দিয়ে সাইতো মার্ক্সকে চমত্কারভাবে চিত্রিত করেছেন। প্রথমে তিনি মার্ক্সকে চিত্রিত করেছেন একজন তরুণ ব্যক্তি হিসেবে, যার দার্শনিক প্রত্যয় ছিল কীভাবে পুঁজিবাদী সম্পর্ক আমাদের প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে তা খতিয়ে দেখা। এরপর মার্ক্সকে তিনি দেখেন প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের একজন প্রত্যয়ী ছাত্র হিসেবে, যেখানে তিনি পুঁজির বাস্তুতান্ত্রিক দ্বন্দ্বগুলোর বৈজ্ঞানিক সত্যতা খুঁজে পেতে চাইছেন।
বইয়ের ‘ইকোলজি অ্যান্ড ইকোনমি’ নামক প্রথম অধ্যায়ে সাইতো মার্ক্সের বাস্তুতান্ত্রিক বা ইকোলজিক্যাল ক্রিটিকের পদ্ধতিগত বিকাশ তুলে ধরেছেন। ১৮৪০ সালের দশকে মার্ক্সের প্যারিস নোটবুকস থেকে মার্ক্সের পূর্ণ বয়সের কাজ ক্যাপিটাল গ্রন্থ পর্যন্ত এই বিকাশ সাইতো দেখিয়েছেন। মার্ক্সের প্যারিস নোটবুকগুলোর একটি অংশ ইকোনমিক অ্যান্ড ফিলোসফিক্যাল ম্যানুস্ক্রিপ্ট নামে প্রকাশিত হয়েছিল। সেগুলোয় মার্ক্সকে দেখা যায়, একজন তরুণ পণ্ডিত হিসেবে, যিনি তখনো ফয়েরবাখ ও ইয়াং হেগেলিয়ান স্কুলের দার্শনিক প্রভাবের আওতায় ছিলেন। পুঁজিবাদী সম্পর্কের অধীনে এলিয়েনেশন বা বিচ্ছিন্নতার তিনি চার ধরনের সংজ্ঞা তৈরি করেছিলেন। মার্ক্স দেখান যে পুঁজিবাদের অধীনে একজন ব্যক্তি তার নিজের শ্রমে উত্পাদিত পণ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, খোদ শ্রম প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, নিজের মুক্ত ও সৃজনশীল স্পিসিস বিয়িং বা সহজাত সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয় এবং তার সহকর্মী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। এ রকম বিচ্ছিন্নতা দূর করতে মার্ক্স ব্যক্তি সম্পত্তি (বিচ্ছিন্ন শ্রমে তৈরি পণ্য) রদ করার কথা বলেন। তাঁর মতে, এর ফলে মানুষ মুক্ত, সহযোগিতামূলক পন্থায় প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারবে। পরে তাঁর ইকোলজিক্যাল বা বাস্তুতান্ত্রিক চিন্তার পাটাতন তৈরি করে দিয়েছিল যেসব মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি, তা তিনি সে সময়েই পেয়েছিলেন। কিন্তু তখনো মার্ক্স একটি ইতিহাস বিযুক্ত, ফয়েরবাখীয় আদর্শবাদে প্রেমমুগ্ধ ছিলেন। এই প্রেমমুগ্ধতা তিনি পরবর্তী সময়ে অতিক্রম করেছিলেন, যা ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’-বিষয়ক কাজগুলোয় দেখা যায়।
মেটাবলিজম শব্দটি মার্ক্স প্রথম ব্যবহার করেন তাঁর ১৮৫১ সালের লন্ডন নোটবুকস-এ এবং পরবর্তী সময়ে গ্রুনদ্রিসে গ্রন্থে। তবে, ‘মার্ক্স তাঁর রিফ্লেকশন নামক কাজে মেটাবলিজমের ধারণা ব্যবহার করেছিলেন লিবিগের (Justus von Liebig) লেখা পড়ার আগেই (পৃ. ৬২)।’ সাইতোর মতে, মার্ক্স মনে করেন শ্রম প্রক্রিয়া হলো ‘প্রকৃতির সঙ্গে একটি বিপাকীয় বা মেটাবলিক মিথস্ক্রিয়া’, যা উত্পাদনের ধরনের ওপর ভিত্তি করে সময়ে সময়ে বদলায়। পরিবেশের ওপর প্রভাবের দিক থেকে চিন্তা করলে পুঁজিবাদ তার আগের উত্পাদনের ধরনগুলো থেকে ভিন্ন। কারণ, এখানে পৃথিবীর সম্পদের সীমার বিপরীতে সম্পদের বিপজ্জনক পুঞ্জীভবনের ধারণা তৈরি হয়। সাইতোর মতে, উত্পাদনের শক্তিগুলোর বিকাশে পুঁজিবাদের প্রগতিশীল ভূমিকা সম্পর্কে মার্ক্সের যে আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, তা পরবর্তী সময়ে মার্ক্স নিজেই সংশোধন করেছেন। এই বিষয়টি কমিউনিস্ট মেনিফেস্টোতে স্পষ্ট হয়েছে।
মার্ক্সের বস্তুবাদী সমালোচনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে জার্মান আইডিওলজি (১৮৪৬) লেখার মাধ্যমে। তিনি ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসকে সঙ্গে নিয়ে এই পাণ্ডুলিপিটি রচনা করেন। এখানে মার্ক্স ইকোলজি বা বাস্তুতন্ত্রের একেবারে দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরে এসে একটি ‘প্রাকৃতিক বৈজ্ঞানিক’ দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করেন, যা মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে বিবর্তনযোগ্য সম্পর্কের একটি ঐতিহাসিক উপলব্ধির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে এই গতিশীল আন্তবিনিময় বোঝানোর জন্য তিনি ‘মেটাবলিজম’ শব্দটি ব্যবহার করা শুরু করেন। এর মাধ্যমে মার্ক্স বোঝাতে চেয়েছেন যে প্রকৃতি হলো মানুষের ‘ইন-অর্গানিক বডি’ বা অজৈব অংশ, যার ওপর মানুষ তার নিজের অস্তিত্বের জন্য নির্ভর করে। ১৮৫০ সালের দশকের মাঝামাঝি সময়ে গ্রুনদ্রিসে লেখার মাধ্যমে মার্ক্স মেটাবলিজমের ধারণা আরও পরিশুদ্ধ করেন। সেখানে তিনি পুঁজির একটি স্বাভাবিক মেটাবলিক বা বিপাকীয় প্রবণতা দেখান। এর মূল কথা হলো ক্রমবর্ধমান সম্প্রসারণের লক্ষ্যে পুঁজিবাদ প্রাকৃতিক শক্তিগুলোকে শোষণ করে। এই শোষণপ্রক্রিয়ায় মানুষের শ্রমশক্তিও অন্তর্ভুক্ত। এর মাধ্যমেই পুঁজিবাদ সস্তা ইনপুট খুঁজে থাকে। কিন্তু এই প্রক্রিয়া পুঁজিবাদের নিজস্ব দ্বন্দ্বগুলোকে আরও গভীর করে থাকে। যেমন বন বিনাশ, কার্বন নির্গমন, জীববৈচিত্র্য হারানো ইত্যাদি আরও তীব্র আকার ধারণ করে। এর সবাই মার্ক্সের লেখাজোখার সময় থেকে এখন পর্যন্ত অনেক বেশি তীব্রতর হয়েছে। পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের অবনতির ফলে পুঁজির পুঞ্জীভবন শেষ হওয়ার আগেই হয়তো মনুষ্যসভ্যতা অসম্ভব হয়ে পড়বে। সে জন্যই টেকসই মানব উন্নয়নের সঙ্গে পুঁজিবাদের মেটাবলিক সম্পর্ক সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
রাজনৈতিক অর্থনীতির অসমাপ্ত সমালোচনা
কোহেই সাইতো তাঁর মার্ক্সে’স ইকোসোশ্যালিজম গ্রন্থে বলেছেন যে মানুষ ও প্রাকৃতিক পৃথিবীর মধ্যে অপূরণীয় ফাটলের ধারণা মার্ক্সের বিশ্লেষণের কোনো দুর্ঘটনাপ্রসূত অংশ নয়, বরং পুঁজিবাদের প্রধান দ্বন্দ্বও বটে। এই অপূরণীয় ফাটলের ধারণাটি সমৃদ্ধ করেছেন জন বেলামি ফস্টার। তিনি একে বলছেন ‘মেটাবলিক রিফট’। সাইতো মনে করেন যে যদি পুঁজিবাদের কারণে পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে একমাত্র সমাধান হলো এর চেয়ে উন্নততর উত্পাদনপদ্ধতির প্রবর্তন করা। আর তা হলো সমাজতন্ত্র। তবে মার্ক্স বলেননি যে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ ঘটলেই আপনা থেকে পরিবেশ ও বাস্তুতান্ত্রিক সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু সমাজতন্ত্র কায়েম হলে সীমিত সম্পদের ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনেক বেশি সাবধানতা অবলম্বন করা হবে। এই ভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে ভবিষ্যত্ প্রজন্মের কথা বিবেচনা করা। প্রকৃতির পার্থিব সীমার সঙ্গে সচেতন আন্তক্রিয়ার উপলব্ধি থেকে মূল্যভিত্তিক উত্পাদনের সামাজিক ব্যবস্থার অবসান হবে। আজকের টেকসই উন্নয়নের মূল কথাও ভবিষ্যত্ প্রজন্মের কথা বিবেচনা করে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা।
সাইতোর বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে মার্ক্সের ১৮৪৪ সালের প্যারিস ম্যানুস্ক্রিপ্টস খতিয়ে দেখার মধ্য দিয়ে। মার্ক্স সেখানে বলেছেন যে সামন্তবাদের অধীনে দায়বদ্ধ কৃষক বা ভূমিদাসরা ভূমির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। কিন্তু পুঁজিবাদের অধীনে শ্রমিকদের ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। শহর ও গ্রামের মধ্যে এই ফাটলের কারণে জমির উর্বরতা শক্তি কমে যায়। কারণ, বর্জ্য পণ্য পুনরায় ব্যবহৃত হয় না।
সাইতোর বিশ্লেষণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি মার্ক্সের ইকোসোশ্যালিজম বা পরিবেশ সমাজতন্ত্রের প্রধান বিষয় হিসেবে ‘রিইফিক্যাশন’ (Reification) ধারণার ওপর জোর দিয়েছেন। রিইফিক্যাশন শব্দের সাধারণ অর্থ হলো কোনো বিমূর্ত বিষয়কে বাস্তব রূপদান করা। মার্ক্সবাদে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয় একটি প্রক্রিয়া হিসেবে। এই প্রক্রিয়ায় যেই সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে মানুষ যুক্ত থাকে, সেই সম্পর্ককে মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা হয়, অথবা সম্পর্কের অন্তর্গত কিছু পণ্যের বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা হয়। এই ধারণার মাধ্যমে বোঝানো হয় যে অবজেক্ট পরিণত হয় সাবজেক্টে, আর সাবজেক্ট পরিণত হয় অবজেক্টে। এর ফলে একদিকে যেমন সাবজেক্টকে নিষ্ক্রিয় বা স্থির বিষয় হিসেবে দেখা হয়, অন্যদিকে অবজেক্টকে দেখা হয় সক্রিয়, নির্ধারক উপাদান হিসেবে। এই ধারণাটি মার্ক্সের এলিয়েনেশন ও কমিডিটি ফেটিশিজম ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও এগুলোর চেয়ে রিইফিক্যাশন ভিন্ন। এলিয়েনেশন হলো মানুষের বিচ্ছিন্নতার সাধারণ অবস্থা। কিন্তু রিইফিক্যাশন হলো এলিয়েনেশনের একটি নির্দিষ্ট রূপ। আবার কমিডিটি ফেটিশিজম হলো রিইফিক্যাশনের একটি নির্দিষ্ট রূপ।
মার্ক্সের নিজের কাজগুলোয় রিইফিক্যাশনের ধারণা তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো ধারণা হিসেবে ছিল না। এই বিষয়টি বোঝার জন্য হাঙ্গেরীয় মার্ক্সবাদী দার্শনিক জর্জ লুকাচের (György Lukács) দ্বারস্থ হতে হবে। তিনিই এই শব্দটিকে ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তাঁর হিস্টোরি অ্যান্ড ক্লাস কনশাসনেস গ্রন্থের অংশ হিসেবে লিখিত ‘রিইফিক্যাশন অ্যান্ড দ্য কনশাসনেস অব দ্য প্রলেতেরিয়েত’ প্রবন্ধের মাধ্যমেই রিইফিক্যাশনের ধারণাটি সমৃদ্ধ হয়েছে। মার্ক্সের ক্যাপিটাল গ্রন্থে কমিডিটি ফেটিশিজমের ওপর আলোচিত অধ্যায়ের নিবিড় বিশ্লেষণের মাধ্যমে লুকাচ রিইফিক্যাশনের ধারণা হাজির করেছেন। তাঁর মতে, এটা পুঁজিবাদী সমাজের এমন একটি সমস্যা, যা পণ্যের ধরনের ব্যাপকতার সঙ্গে সম্পর্কিত। লুকাচের কাজ পরবর্তী সময়ে ফ্রাঙ্কফুর্ট ঘরানার দার্শনিকদের প্রভাবিত করেছিল।
মার্ক্সের ক্যাপিটাল গ্রন্থের ‘দ্য ওয়ার্কিং ডে’ ও ‘মেশিনারি অ্যান্ড লার্জ-স্কেল ইন্ডাস্ট্রি’ নামের দুটি অধ্যায়ে রিইফিক্যাশন ধারণার পরিপূর্ণ প্রকাশ দেখা যায়। তবে ইকোলজিক্যাল ক্রিটিকের অংশ হিসেবে মার্ক্স রিইফিক্যাশন ধারণাটির বিকাশ ঘটিয়েছেন ধীরে ধীরে। সংক্ষেপে, রিইফিক্যাশন বলতে বোঝায় একটি প্রক্রিয়া, যেখানে বেসরকারি উত্পাদকরা পণ্যের বিনিময় করে থাকে। এসব পণ্যের মূল্য নির্ধারিত হয় উত্পাদনে ব্যবহৃত বিমূর্ত শ্রমের পুরো যোগফল হিসেবে। প্রকৃতির কাঁচামালগুলোর অর্থনৈতিক রূপ দেওয়া হয়। এসব রূপই ‘জিনিস’ হিসেবে পরিণত হয়। কিন্তু পুঁজির অধীনে এসব বস্তুগত জিনিস কখনোই জমা হয় না। এভাবেই সর্বোচ্চ বিমূর্ত শ্রম-শোষণের উদ্দেশ্যে প্রকৃতিকে পুনর্গঠন করার মাধ্যমে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের মেটাবলিজমের বা বিপাকের ধারাবাহিকতাকে পুঁজি ফেলে দেয় হুমকির মুখে। রিইফিক্যাশনের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যে সমাজের উত্পাদন ও পুনরুত্পাদন করা সম্ভব, কিন্তু তা হতে হবে শুধুই মূল্যের মধ্যস্থতার মাধ্যমে। সাইতো এই বিষয়টি তাঁর বর্তমান বইয়ে চমত্কারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন:
মানুষ পৃথিবী ধ্বংস করছে—মার্ক্স শুধু এইটুকু বলেই ক্ষান্ত হননি। বরং তিনি তাঁর ‘ম্যাটেরিয়েল ওয়ার্ল্ড’ ধারণার মাধ্যমে খতিয়ে দেখেছেন কীভাবে পুঁজির বস্তুকে মূল্যে রূপান্তর প্রক্রিয়া মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যকার চিরন্তন মেটাবলিজম বা বিপাককে বদলে ফেলে এবং টেকসই মানব উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক বস্তুগত শর্তগুলোর অস্তিত্ব অস্বীকার করে। একইভাবে, মার্ক্স সমাজতান্ত্রিক প্রকল্পের মাধ্যমে মানুষ-প্রকৃতির সম্পর্কের পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি করেছেন। এই পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য তিনি নিষেধাজ্ঞার কথা বলেছেন এবং সবশেষে বলেছেন রিইফিক্যাশনের বিদেশি শক্তিকে অতিক্রম করার কথা (পৃ. ১৩৩)।
‘মার্ক্সে’স ইকোলজি অ্যান্ড দ্য মার্ক্স-এঙ্গেলস-গেসামটসগাবে’ নামের বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়ে সাইতো মার্ক্সের প্রাকৃতিক বিজ্ঞানবিষয়ক নোটবুকগুলো ঘেঁটে দেখেছেন। এগুলো সম্প্রতি উন্মুক্ত হয়েছে। এই নোটবুকগুলোয় দেখা যায়, মার্ক্স বছরের পর বছর ধরে বহু লেখকের লেখা পড়ে গবেষণা করেছেন। উদ্দেশ্য ছিল পুঁজির বাস্তুতান্ত্রিক সমালোচনার ধারণা পরিশোধিত করা। সাইতো স্বীকার করেছেন যে প্রকৃতি বিষয়ে মার্ক্সের শুরুর দিকের ‘উত্পাদনবাদী’ চিন্তাভাবনার কিছু প্রমাণও পাওয়া যায়। এর মানে হলো মার্ক্স আশাবাদী ছিলেন যে বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মাধ্যমে প্রকৃতির সীমাবদ্ধতাগুলো অতিক্রম করা সম্ভব। জুস্টুস ভন লিবিগের অ্যাগ্রিকালচারাল কেমিস্ট্রি এবং জেমস এফ ডব্লিউ জনস্টোনের নোটস অন নর্থ আমেরিকা গ্রন্থের প্রথম দিকের সংস্করণগুলো থেকে মার্ক্স বাছাইকৃত অংশের নোট রেখেছিলেন। সেখানে মার্ক্সের একটি আশাব্যঞ্জক নোট পাওয়া যায়। সেই নোটে তিনি কৃষি বিষয়ে ডেভিড রিকার্ডোর ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ আইন অতিক্রম করার আশা ব্যক্ত করেছেন। উন্নত মৃত্তিকাবিজ্ঞান ও ভূমি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রিকার্ডোর এই তত্ত্ব অতিক্রান্ত করা যাবে বলে তিনি মনে করেছিলেন। লিবিগের প্রথম দিকের কাজগুলোয় দেখা যায়, তিনি ধরে নিয়েছিলেন যে কৃত্রিম সার ব্যবহার করে উত্পাদনশীলতা বাড়ানো যায়। তবে লিবিগের মতো একজন কৃষি অর্থনীতিবিদের জন্য এটা একটি বেশ সুবিধাজনক অবস্থান। কারণ, তাঁর নিজেরও রাসায়নিক সারের ব্যবসা ছিল।
তবে লিবিগ ও মার্ক্স উভয়ের জন্যই ১৮৬২ সালে অ্যাগ্রিকালচারাল কেমিস্ট্রি গ্রন্থের সপ্তম সংস্করণ প্রকাশিত হওয়া ছিল উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এই সংস্করণে লিবিগ পুঁজিবাদী সম্পর্কের আওতায় কৃষি দস্যুতা বা রবারি অ্যাগ্রিকালচারের একটি নিকষ–কালো তত্ত্ব দাঁড় করান। লিবিগ তখন ‘ল অব রেপ্লিনিশমেন্ট’ বা পুনঃ জোগান আইনের কথা বলেন, যেখানে তিনি দেখান যে উত্পাদনশীলতা ধরে রাখতে হলে জৈব ও অজৈব উভয় প্রকার উপাদানই মাটির প্রয়োজন। জৈব উপাদানের ক্ষেত্রে বলেছেন যে বায়ুমণ্ডল ও বৃষ্টিপাতের মাধ্যমে এটা পুনরায় পূর্ণ হয়ে যায়। কিন্তু অজৈব উপাদান, যেমন খনিজের ক্ষতিসাধন অবশ্যই কমাতে হবে। কারণ, পুঁজিবাদী উত্পাদনব্যবস্থার চাপের মুখে এগুলো পুনরায় পূর্ণ করা অনেক বেশি কঠিন। এর ফলে মার্ক্স যখন ক্যাপিটাল গ্রন্থের প্রথম খণ্ড লিখছিলেন, তখন তাঁর অবস্থান বদল করেন। মার্ক্স বুঝতে পেরেছিলেন যে পুঁজিবাদের অধীনে দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক বিকাশ মাটির উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধি করবে না। মার্ক্স এ-ও বুঝেছিলেন যে টেকসই কৃষি ও পুঁজিবাদী উত্পাদনপদ্ধতির মধ্যে একটি দ্বন্দ্ব রয়েছে। সাইতো লিখেছেন যে লিবিগের সপ্তম সংস্করণ পড়ার ফলে ‘মার্ক্সের অন্তর্দৃষ্টি আরও গভীর হয়। তিনি বুঝতে পারেন যে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে প্রকৃতিকে যথেচ্ছভাবে অধীন ও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। কারণ, কিছু অলঙ্ঘনীয় প্রাকৃতিক সীমা আছে (১৬০)।’ মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে বিপাকের একটি যৌক্তিক ব্যবস্থাপনার যে দাবি মার্ক্স করেছেন, তার উত্স হলো প্রাকৃতিক সীমার এই স্বীকৃতি। এ ছাড়া এই উপলব্ধি যে টেকসই মানব উন্নয়ন অর্জনে সামাজিক উত্পাদন মৌলিকভাবে পুনর্গঠন করতে হবে। মার্ক্স বুঝতে পেরেছিলেন যে পুঁজিবাদ এই যৌক্তিক মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়ার প্রতি সহজাতভাবেই শত্রুভাবাপন্ন। কারণ, সব ধরনের সম্পর্ককেই পুঁজিবাদ বিচার করে রিইফাইয়েড ভ্যালু বা পণ্যের মূল্যে।
মার্ক্স মনে করতেন, সম্পদ পুঞ্জীভবনের প্রতি পুঁজিবাদের যে অসীম আকাঙ্ক্ষা, সেখানে প্রাকৃতিক সীমার এই বাধা সে চুপচাপ মেনে নেবে না। যখনই পুঁজিবাদ কোনো সীমা বা বাধার মুখোমুখি হয়, তখনই সে তা অতিক্রম করতে উঠেপড়ে লাগে। এই দিক থেকে বলা যায়, মার্ক্সবাদের অন্যতম তাত্ত্বিক রোজা লুক্সেমবার্গ মার্ক্সের ‘স্কিম অব রিপ্রোডাকশন’ ধারণার যে বিশ্লেষণ দিয়েছেন, তা ভুল। রোজা লুক্সেমবার্গের বিশ্লেষণটি মার্ক্সীয় তত্ত্বে উল্লেখযোগ্য হিসেবে পরিচিত। তিনি দ্য অ্যাকুমিউলেশন অব ক্যাপিটাল গ্রন্থে বলেছিলেন যে সামাজিক ও প্রাকৃতিক মেটাবলিজম বা বিপাকের একটি ভারসাম্য আছে। পুনরুত্পাদন স্কিমের সেই ভারসাম্য বিনষ্ট করলে পুঁজিবাদ ভয়ানক সংকটের মধ্যে পড়বে। কিন্তু পুঁজিবাদের একঘেয়েমি চরিত্রকে খাটো করে দেখা যাবে না। কারণ, সাইতোর বইয়ে মার্ক্সের উক্তি দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন যে পুঁজিবাদের একটি ‘স্থিতিস্থাপক বা নমনীয় শক্তি’ আছে। এই বিষয়ে মার্ক্স বারবার জোর দিয়েছেন। মার্ক্স মনে করতেন যে সামাজিক ও প্রাকৃতিক মেটাবলিজমের ভারসাম্যের বিচ্যুতি ঘটলে এই নমনীয় শক্তির কারণে পুঁজিবাদ ঠিকই সাড়া দিতে পারে। পুঁজিবাদের ইতিহাস থেকে দেখা যায় যে পুঁজির পুঞ্জীভবনের পথে যেকোনো বাধা বা সীমা অতিক্রম করতে পুঁজিবাদ ঠিকই নতুন কোনো পদ্ধতি বের করে ফেলে। এখান থেকেই পুঁজিবাদ দুটি পদ্ধতি নির্মাণে উদ্বুদ্ধ হয়: ‘প্রাকৃতিক ও মানব বৃত্তির সাধারণ শোষণপদ্ধতি’ এবং ‘সাধারণ উপযোগিতার পদ্ধতি’। নতুন কার্যকরী ও সস্তা উত্পাদনের উপকরণ, প্রযুক্তি ও বাজার খুঁজতে গিয়ে পুঁজিবাদ সারা পৃথিবীতেই শোষণ চালায়। মার্ক্সের গ্রুনদিসে গ্রন্থ থেকে এই বিষয়ে ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এটা করতে গিয়ে নতুন প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের জন্ম হয়। ফলে হোক সেটা বৈরী আবহাওয়া বা সম্পদের দুষ্প্রাপ্যতা—কোনো কিছুই পুঁজির পুঞ্জীভবনে বাধা হতে পারে না। এ ক্ষেত্রে জেনেটিক্যালি মডিফাইয়েড (জিএম) কৃষি বীজের উদাহরণ দেওয়া যায়। রাসায়নিক সার এবং জিএম বীজের মাধ্যমে হলেও পুঁজি তার নমনীয় শক্তির জোরে প্রাকৃতিক সীমা অতিক্রম করতে চায়।
পুঁজিবাদের বিশ্বব্যাপী এই সর্বজনীন শোষণের কারণে প্রকৃতিও মানুষের বস্তু এবং একটি উপযোগিতার বিষয়ে পরিণত হয়। এটাকেই মার্ক্স বলেছেন, ‘পুঁজিবাদের চমত্কার সভ্যতাকরণ প্রভাব’ (গ্রেট সিভিলাইজিং ইনফ্লুয়েন্স অব ক্যাপিটাল), যা পুরোনো জীবনপ্রণালি যেমন ক্রমাগত ধ্বংস করতে থাকে, তেমনি ধ্বংস করে প্রকৃতিকেও। সাইতোর ভাষায়, ‘এই প্রক্রিয়ার ফলে পুঁজিবাদ তার নিজের ভেতরকার দ্বন্দ্বগুলোকে আরও গভীর করে, যেমন আমাজন এলাকায় ব্যাপক বন বিনাশ; চীনে শোষণমূলক শিল্পের মাধ্যমে পানি, মাটি ও বাতাস দূষণ করা; মেক্সিকো উপসাগরে দুর্ঘটনার ফলে তেল ছড়িয়ে পড়া; এবং জাপানের ফুকুশিমায় পারণবিক দুর্ঘটনা’ (পৃ. ৬৭)।
মার্ক্সের মেটাবলিক রিফট তত্ত্বের একটি অনুপ্রেরণার উত্স ছিল লিবিগের কৃষি দস্যুতার ধারণা। মেটাবলিক রিফট বা বিপাকীয় ফাটলের ধারণা পরবর্তী সময়ে বিস্তৃত আকারে জন বেলামি ফস্টার তাঁর মার্ক্সে’স ইকোলজি গ্রন্থে আলোচনা করেছেন। তবে মার্ক্স এই ধারণা দিয়ে ক্যাপিটাল গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে গ্রাম ও শহরের মধ্যে মেটাবলিক রিফট বুঝিয়েছেন। কিন্তু সাইতো মেগা (MEGA) নোটবুকগুলো গবেষণা করার ফলে আমরা দেখছি যে ১৮৬৭ সালে ক্যাপিটাল গ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ার পর মার্ক্স আরেকজন কৃষি অর্থনীতিবিদের কাজগুলো খতিয়ে দেখছিলেন। তাঁর নাম হলো কার্ল ফ্রাস (Carl Fraas)। বিশেষ করে ফ্রাসের ১৮৬৬ সালে প্রকাশিত অ্যাগ্রারিয়ান ক্রাইসেস অ্যান্ড দেয়ার রিমিডিজ গ্রন্থটি লিবিগ সম্পর্কে মার্ক্সের পূর্ববর্তী ধারণায় যেমন পরিবর্তন ঘটায়, তেমনি পুঁজিবাদের বাস্তুতান্ত্রিক দ্বন্দ্বগুলো বোঝার ক্ষেত্রে তাঁর জন্য একটি বৈজ্ঞানিক রাস্তা খুলে যায়। লিবিগের ‘কৃষি রসায়নের’ বিপরীতে ফ্রাস ‘কৃষি পদার্থবিদ্যার’ ধারণা এগিয়ে নেন। লিবিগের বেশির ভাগ কাজের গুরুত্ব ফ্রাস অস্বীকার করেননি। তবে তিনি মনে করতেন যে মাটির উত্পাদনশীলতার জন্য রাসায়নিক ব্যাপারগুলোর চেয়ে জলবায়ুসংক্রান্ত বিষয়গুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একটা পর্যায়ে ফ্রাস লিখেছেন যে একটি অনুকূল জলবায়ু থাকলে নিঃশেষ হওয়া ছাড়াই চাষাবাদ হতে পারে। সে ক্ষেত্রে মানুষের দ্বারা বিপাকীয় চক্রের মাধ্যমে মাটির পুষ্টি ফিরে না এলেও সমস্যা নেই।
এ ছাড়া ফ্রাস তাঁর ক্লাইমেট অ্যান্ড দ্য প্ল্যান্ট ওয়ার্ল্ড ওভারটাইম গ্রন্থে বলেছেন যে বন বিনাশই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রাথমিক কারণ। কারণ, এর ফলেই তাপমাত্রা বেড়ে যায় এবং আর্দ্রতা কমে যায়, যেমন মরুকরণ। এই বিষয়টিকে তিনি মেসোপটেমিয়া, মিসর ও গ্রিস সভ্যতার একটি ঐতিহাসিক প্রবণতা হিসেবে দেখেছেন। ফ্রাসের মতে, সমস্যা হলো বিভিন্ন কাজে সভ্যতাগুলো বিপুলসংখ্যক বন ব্যবহার করে, যেমন জাহাজ বানানো থেকে শুরু করে ঘরবাড়ি, লোহা ও চিনি। এর ফলে বিনাশ হয়ে যাওয়া বন পুনরায় লাগানো অনেক সময় বাস্তবায়নযোগ্য নয়। ক্যাপিটাল গ্রন্থে মার্ক্স দেখিয়েছেন কীভাবে আয়ারল্যান্ড থেকে ব্রিটেনে খাদ্য ও কাঁচামাল আমদানি করার ফলে মাটির ধ্বংস সাধন ঘটেছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে প্রথাগত টেকসই কৃষি ও হস্তশিল্পের বদলে বৃহদাকারে চা ও আফিমের পণ্য উত্পাদন চালু করে। প্রাচীন সেচব্যবস্থা বাতিল করায় খরা ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। সাইতোর বিশ্লেষণে দেখা যায়, ‘ফ্রাসের কাজ গবেষণা করে মার্ক্স সঠিকভাবেই ভেবেছেন যে উত্পাদনশীল শক্তিগুলোর বিকাশের নেতিবাচক দিক এবং প্রাকৃতিক মেটাবলিজমে এগুলো যে বাধা সৃষ্টি করে, তা উত্পাদনের অন্যান্য উপাদানের প্রেক্ষাপটে আরও ভালোভাবে গবেষণা করা দরকার’ (পৃ. ১৬৮)।
সে সময়ে দ্রুতগতিতে যেসব প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ ঘটছিল, মার্ক্স তা প্রত্যক্ষ করছিলেন। তিনি সঠিকভাবেই সেসব প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা গবেষণা করা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলেন। এগুলো সতর্কতার সঙ্গে গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল পুঁজিবাদ যেসব বাস্তুতান্ত্রিক সংকট সৃষ্টি করেছে, তা সে কতটুকু থামাতে পারে, তা খতিয়ে দেখা। এ ছাড়া তাঁর আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল। নিজের উচ্চমূল্য ধরে রাখতে পুঁজিবাদের যে অসীম আকাঙ্ক্ষা এবং তার ফলে যেসব সমস্যার উদ্ভব হচ্ছে, তা-ও মার্ক্স খতিয়ে দেখতে চেয়েছিলেন। ক্যাপিটাল গ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণে এসে তিনি লিবিগের প্রতি মূল্যায়ন কিছুটা বদলে ফেলেন। এর ফলে আসলে বাস্তুতান্ত্রিক গবেষণার একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়।
সাইতো অবশ্য বলেছেন যে ‘মার্ক্সের রাজনৈতিক অর্থনীতির চিন্তায় বাস্তুতন্ত্রকে যদি মনে করা হয় দ্বিতীয় সারির বিষয়, তাহলে এর কারণ আংশিক পাওয়া যাবে পশ্চিমা মার্ক্সীয় ঐতিহ্যে। কারণ, পশ্চিমা মার্ক্সবাদে সামাজিক ধরন নিয়ে আলোচনা হয় বেশি। কিন্তু ম্যাটেরিয়াল বা কনটেন্ট বহুলাংশেই অবহেলিত থাকে’ (পৃ. ১৮০)।
নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে মার্ক্স প্রথমে যখন পুঁজিবাদের সমালোচনা তৈরি করছিলেন, তখন তিনি বাস্তুতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবেননি। কিন্তু ১৮৪৪ সালে মার্ক্স যেসব নোটবুক লিখেছেন, সেখানে দেখা যায় তিনি ইতিমধ্যেই প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের রূপান্তর ঘটাতে আধুনিক এলিয়েনেশন বা বিচ্ছিন্নতার অবসান দাবি করেছেন। কিন্তু তরুণ মার্ক্সের বিচ্ছিন্নতার এই ব্যাখ্যাটি বহুকাল ধরে নজরে না আসার কারণ হলো তাঁর বিচ্ছিন্নতা তত্ত্বের মূলধারার দার্শনিক ব্যাখ্যা। তবে ইকোলজি বা বাস্তুতন্ত্র-সম্পর্কিত বিতর্কে যে বিষয়টির ওপর জোর দেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, মার্ক্স তাঁর আধুনিক সমাজের সমালোচনায় প্রকৃতি থেকে মানুষকে আলাদা করার ফলে সৃষ্ট সংকটকে প্রধান সমস্যা হিসেবে দেখেছেন।
শেষ কথা
মার্ক্স-এঙ্গেলস-গেসামটসগাবে-এর ঐতিহাসিক এই সংস্করণ প্রকাশিত হওয়ার ফলে আমরা মার্ক্সের তত্ত্বকে নতুন করে পুনর্নির্মাণ করতে পারি। এখান থেকে দেখা যায় কীভাবে মার্ক্স তাঁর রাজনৈতিক অর্থনীতির তত্ত্ব সংহত করতে গিয়ে পুঁজিবাদের সমালোচনা হিসেবে নিজের বাস্তুতান্ত্রিক ভাবনার বিকাশ ঘটিয়েছেন। মেগা প্রকল্পের আওতায় প্রকাশিত নতুন অনেক বিষয় ঘেঁটে সাইতো দেখাতে চেয়েছেন যে প্রাকৃতিক সম্পদের দুষ্প্রাপ্যতা ও আমাদের বাস্তুতন্ত্রের দুর্দশা সম্পর্কে মার্ক্স উদাসীন ছিলেন বলে যে একদেশদর্শী ও মিথ্যা ধারণা রয়েছে, তা ঠিক নয়। এ ছাড়া অসীম অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত বিকাশ সম্পর্কে মার্ক্সের প্রমিথীয় কুসংস্কার সম্পর্কে যে সমালোচনা রয়েছে, তা-ও যুক্তিসিদ্ধ নয়। আবার মার্ক্সের যেসব উদ্বৃতাংশ ও নোট রয়েছে, সেগুলো ঘাঁটলে দেখা যায় যে পুঁজিবাদের সমালোচনায় ইকোলজি বা বাস্তুতন্ত্রকে মার্ক্স কেন্দ্রীয় ভূমিকায় রেখেছেন। মার্ক্সের মূল্য তত্ত্ব থেকে আমরা খুবই সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বাস্তুতান্ত্রিক তত্ত্ব পাই এবং সেটা তাঁর রাজনৈতিক অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই পাওয়া যায়। তা ছাড়া পুঁজিবাদের মাধ্যমে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সামাজিক ও প্রাকৃতিক মেটাবলিজম বা বিপাককে তিনি তাঁর সমাজতন্ত্রের দৃষ্টিকল্পে উদ্ধার করার কথা বলেছেন। সাইতোর বইয়ে এই ব্যাপারগুলো স্পষ্টতই ধরা পড়েছে।
এই বইয়ে একটি বিষয় লক্ষণীয়। সাইতো মার্ক্সের নোটবুকগুলো অনেক বেশি পড়েছেন এবং সেখান থেকে বাস্তুতন্ত্র বিষয়ে মার্ক্সের অন্তর্নিহিত ধারণার চেয়ে স্পষ্ট ধারণাগুলোর ওপর ভিত্তি করেই বেশি যুক্তি তিনি তুলে ধরেছেন। কিন্তু সেখানে মার্ক্সের লেখা থেকে পর্যাপ্ত প্রমাণাদি তিনি দেননি। যাহোক, মার্ক্সের পরিবেশ সমাজতন্ত্রের ধারণা বিকশিত করতে ভবিষ্যত্ গবেষকদের আরও অনেক কাজ করতে হবে। কারণ, সাইতোর বই থেকে আমরা দেখতে পাই যে মেগা প্রকল্পের আওতায় এই পর্যন্ত মার্ক্সের বাছাইকৃত নোটবুকগুলোর মধ্যে ১৮৬৮ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু তাঁর শেষ পনেরো বছরে বিকাশমান পরিবেশ ভাবনা যেসব নোটবুকে রয়েছে, তা মেগা প্রকল্পের চতুর্থ ভাগে প্রকাশিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। তবু বলা যায় কার্ল মার্ক্সে’স ইকোসোশ্যালিজম গ্রন্থটি মার্ক্সীয় পরিবেশ সমাজতন্ত্রের বিকাশমান রচনায় একটি অপরিহার্য সংযোজন।
কোহেই সাইতোর এই বইটি অত্যন্ত পরিশ্রমী একাডেমিক কাজ হওয়া সত্ত্বেও পাঠকের জন্য যথেষ্ট সহজবোধ্য দিকনির্দেশনা রয়েছে। এখানে স্পষ্টভাবে তিনি দেখিয়েছেন, মার্ক্সের সমাজতান্ত্রিক প্রকল্প বাস্তবায়নে পুঁজির বাস্তুতান্ত্রিক ফাটল দূর করা অপরিহার্য। এ ছাড়া সাইতো চমত্কারভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে জার্মান আইডিওলজি লেখার পর মার্ক্সের দশকব্যাপী প্রাকৃতিক বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনার ফলে তাঁর বিশ্লেষণের ওপর প্রভাব ফেলেছে। সাইতো তাঁর বইয়ের উপসংহারে লিখেছেন, ‘মার্ক্স সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন, এমন নয়। তিনি আজকের পৃথিবীর জন্য ভবিষ্যদ্বাণীও করেননি। কিন্তু এর মানে এই নয় যে তাঁর বাস্তুতন্ত্রবিষয়ক কাজের কোনো মূল্য আজ আর নেই। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে মার্ক্স পুঁজিবাদের যে সমালোচনা করেছেন, তা থেকে বর্তমানে বাস্তুতন্ত্রের সংকট বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ভিত্তি পাওয়া যায় এবং বাস্তুতন্ত্র বিষয়ে মার্ক্সের নোটবুকগুলো তাত্ত্বিক ভিত্তির বিরাট গুরুত্ব প্রমাণ করে’ (পৃ. ১৮৩)। পৃথিবীর সঙ্গে পুঁজির অসামঞ্জস্যতা বিষয়ে মার্ক্সের বিবর্তনমূলক উপলব্ধির পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা সাইতো দিয়েছেন। পরিবেশ সমাজতন্ত্র নিয়ে যারা কাজ করতে চায়, তাদের জন্য সাইতোর এই কাজ অত্যন্ত প্রশংসার দাবিদার।
গ্রন্থপঞ্জি
১. Paul Burkett, Marx and Nature: A Red and Green Perspective, New York: St. Martin’s Press, 1999.
২. John Bellamy Foster, Marx’s Ecology: Materialism and Nature, Monthly Review Press New York, 2000.
৩. György Lukács, History and Class Consciousness: Studies in Marxist Dialectics, The Marlin Press, 1971.
৪. Rosa Luxemburg, The Accumulation of Capital, translated by Agnes Schwarzschild, Routledge & Kegan Paul, 1951.
৫. Karl Marx, Grundrisse, translated by Martin Nicolaus, Penguin Press, 1973. Retrieved from Marxists Internet Archive.
নোট: প্রথম প্রকাশ: প্রতিচিন্তা, অষ্টম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা, এপ্রিল-জুন ২০১৮।