সারকথা
ঠিক ষাট বছর আগে, ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, পাকিস্তানের লাহোর শহরে শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এ প্রবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য—ছয় দফা কোনো আকস্মিক, চরমপন্থী বা বৈপ্লবিক বিস্ফোরণ ছিল না; বরং এটি ছিল বছরের পর বছর ধরে চলা এক হতাশাজনক যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার চূড়ান্ত পরিণতি। গভীর ঐতিহাসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়া এ কর্মসূচির রূপরেখা তৈরি করে দিয়েছিল। ছয় দফাকে রাজনৈতিক কল্পনা, অর্থনৈতিক বাস্তবতার ব্যবচ্ছেদ এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের কাঠামোর ভেতরে মানিয়ে নেওয়ার সব ধরনের ব্যর্থ চেষ্টার এক পুঞ্জীভূত ফলাফল হিসেবেই দেখা যেতে পারে। ১৯৪০ সালের পাকিস্তান প্রস্তাবটিই মূলত ছিল ছয় দফার প্রথম পর্ব। পরবর্তী আড়াই দশক ধরে ঘটে যাওয়া বেশ কিছু ঘটনাপ্রবাহ—যার কিছু ছিল অতীত ধারাবাহিকতার ফসল, আর কিছু একদমই নতুন ও স্বকীয়—মূলত ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ছয় দফা ঘোষণার পথ তৈরি করেছিল। এ প্রবন্ধে এমন ছয়টি ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, যা ছয় দফার মূল পটভূমি তৈরি করে দিয়েছিল। পাকিস্তান প্রস্তাব উত্থাপিত হওয়ার পর ১৯৪০ থেকে ১৯৪৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে অনেক বাঙালি মুসলমান পাকিস্তানকে একটি নিরঙ্কুশ কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র হিসেবে দেখেননি; বরং তাঁরা একে ভেবেছিলেন আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থা হিসেবে। পাকিস্তান গঠিত হওয়ার পর তাঁদের স্বপ্নভঙ্গ শুরু হয়। ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানি রাষ্ট্রের চরম কেন্দ্রীভূত ও স্বৈরতান্ত্রিক রূপটিকে সবার সামনে উন্মোচিত করে দিয়েছিল। ১৯৫৬ সালে বাঙালি অর্থনীতিবিদদের উপস্থাপিত ‘দুই অর্থনীতি’ তত্ত্ব ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বার্তা একাডেমিক জগতের বাইরে বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া এবং ষাটের দশকের শুরুতে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানকে দেওয়া অর্থনীতিবিদদের প্রতিবেদন—এসবই ধাপে ধাপে স্বায়ত্তশাসনের ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
ভূমিকা
১৯৪০ সালের মার্চ মাস। নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বিশেষ অধিবেশনে যোগ দিতে গোটা উপমহাদেশ থেকে লীগের সদস্যরা জড়ো হয়েছেন পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরে। ২৩ মার্চ সেখানে এক যুগান্তকারী প্রস্তাব পেশ করার জন্য পূর্ব বাংলার দক্ষিণাঞ্চলীয় এক জেলার (বরিশাল) এক বাঙালি রাজনৈতিক নেতা যখন উঠে দাঁড়ালেন, উপস্থিত সবাই বিপুল করতালিতে তাঁকে স্বাগত জানান। তিনি ছিলেন আবুল কাশেম ফজলুল হক, আর তাঁর উত্থাপিত সে প্রস্তাবই ভারতের মুসলমানদের জন্য এক পৃথক আবাসভূমির ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল। প্রথমে প্রস্তাবটি যে শহরে উত্থাপিত হয়েছিল, তার নামে ‘লাহোর প্রস্তাব’ হিসেবে পরিচিত হলেও পরবর্তী সময়ে এটি ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ নামেই বেশি পরিচিতি পায়।
এর ঠিক আড়াই দশক পর, একই শহর লাহোরে রাজনৈতিক নেতাদের আরেকটি সমাবেশ। এবার বাংলার আরেক দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলার (ফরিদপুর) আরেকজন বাঙালি রাজনৈতিক নেতা উঠে দাঁড়ালেন এবং এমন একটি দাবি সনদ পেশ করলেন, যা ১৯৪০ সালের পাকিস্তান প্রস্তাবের মতোই সুদূরপ্রসারী বলে প্রমাণিত হলো। তিনি শেখ মুজিবুর রহমান, আর তাঁর সেই দাবি সনদটিই ইতিহাসে ‘ছয় দফা’ নামে পরিচিত। সেই সভায় এ প্রস্তাব খুব একটা উৎসাহব্যঞ্জক সাড়া না পেলেও এর প্রভাব ছিল সমানভাবেই যুগান্তকারী।
এটা নেহাত কোনো কাকতালীয় ব্যাপার ছিল না। এগুলো একেবারেই সম্পর্কহীন, বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনাও ছিল না। বলা যেতে পারে, ১৯৪০ সালের পাকিস্তান প্রস্তাবটিই মূলত ছিল ছয় দফার প্রথম পর্ব। পরবর্তী আড়াই দশক ধরে ঘটে যাওয়া বেশ কিছু ঘটনাপ্রবাহ—যার কিছু ছিল অতীত ধারাবাহিকতার ফসল, আর কিছু একদমই নতুন ও স্বকীয়—মূলত ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ছয় দফা ঘোষণার পথ তৈরি করেছিল। এ প্রবন্ধে এমন ছয়টি ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, যা ছয় দফার মূল পটভূমি তৈরি করে দিয়েছিল।
স্বায়ত্তশাসনের স্বপ্ন: ১৯৪০ সালের পাকিস্তান প্রস্তাব
১৯৪০ সালের পাকিস্তান প্রস্তাবে এমন একটা ব্যাপার ছিল, যা বাঙালি মুসলমানদের হৃদয়কে গভীরভাবে ছুঁয়ে গিয়েছিল—আর তা হলো আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রতিশ্রুতি। পাকিস্তান প্রস্তাবের ভাষাটি খেয়াল করলেই আমরা তা বুঝতে পারব। সেখানে স্বাধীন ‘রাষ্ট্রসমূহের’ (states) কথা বলা হয়েছিল, যার প্রতিটি গঠিত হবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং ভৌগোলিকভাবে সংলগ্ন অঞ্চলগুলো নিয়ে। আর প্রতিটি ‘রাষ্ট্রের’ ভেতরের অঙ্গরাজ্য বা ইউনিটগুলো হবে সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম। ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগের দিল্লি সম্মেলনে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ অবশ্য দাবি করেছিলেন, ‘state’ শব্দের শেষে যুক্ত ‘s’ অক্ষরটি একটি মুদ্রণপ্রমাদ (typo) মাত্র; তাঁদের মূল লক্ষ্য মুসলমানদের জন্য কেবল একটি রাষ্ট্রই গঠন করা। তাঁর এ দাবি সত্য হোক বা না হোক, প্রস্তাবের মূল বাক্যের অন্য অংশটি কিন্তু এতে বাতিল হয়ে যায় না—অর্থাৎ গঠিত রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গরাজ্য একটি নির্দিষ্ট মাত্রার স্বায়ত্তশাসন ভোগ করবে।
স্বায়ত্তশাসনের এ ধারা যুক্ত করার মাধ্যমে ১৯৪০ সালের প্রস্তাবের প্রণেতারা মূলত ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্যমান ব্যাপক সাংস্কৃতিক ও অন্যান্য পার্থক্যের বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিয়েছিলেন। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা মুসলমানদের ইতিহাসের কিছু সাধারণ মিল থাকলেও প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ছিল—যেমন তাদের জীবনবোধ, অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও সাংস্কৃতিক আকাঙ্ক্ষা। কেবল অভিন্ন ধর্মের দোহাই দিয়ে বিশাল এ পার্থক্যগুলোকে মুছে ফেলা সম্ভব—এমনটা ভাবা নিতান্তই বোকামি হতো। পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ শাসকেরা এই বোকামির ফাঁদে পা দিলেও পাকিস্তান প্রস্তাবের মূল প্রণেতারা ছিলেন যথেষ্ট দূরদর্শী। তাঁরা ঠিকই বুঝেছিলেন, এ স্বপ্নের আবাসভূমির ঐক্য টিকিয়ে রাখতে হলে এর অঙ্গরাজ্যগুলোকে অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট মাত্রার স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে।
তাই এতে মোটেও অবাক হওয়ার কিছু নেই যে ১৯৪০ থেকে ১৯৪৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে অনেক বাঙালি মুসলমান পাকিস্তানকে একটি নিরঙ্কুশ কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র হিসেবে দেখেননি; বরং তাঁরা একে ভেবেছিলেন আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থা হিসেবে। ঠিক এই কাঠামোর ভেতরে থেকেই বাঙালি মুসলিম নেতারা—তাঁরা রাজনীতিক হোন বা বুদ্ধিজীবী—তাঁদের নিজস্ব মানুষের জন্য এক স্বপ্নের আবাসভূমির রূপরেখা আঁকতে শুরু করেছিলেন। ঐতিহাসিক নীলেশ বোস এ প্রসঙ্গে লিখেছেন:
‘যুক্তপ্রদেশ বা পাঞ্জাবের মতো দূরের কোনো প্রদেশের অবাঙালিদের কথার শুধু অন্ধ অনুকরণ না করে, বাঙালি মুসলিম চিন্তাবিদরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শেকড়সন্ধানী ইতিহাসের সাথে পাকিস্তানের ধারণাকে মিলিয়ে নিয়েছিলেন। তাঁরা কাজ করেছিলেন নিজস্ব ভূগোল, রাজনৈতিক অর্থনীতি ও সাহিত্য সমালোচনার গণ্ডির ভেতরে থেকেই’ (বোস ২০১৪: ৩)।
বাঙালি মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা—যাঁদের মধ্যে ছিলেন ঔপন্যাসিক, কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক—নিয়মিত জড়ো হতেন আজাদ, সওগাত ও মোহাম্মদীর মতো সংবাদপত্র ও সাহিত্য পত্রিকাগুলোর কলকাতার কার্যালয়ে। আড্ডা জমত ‘পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি’র মতো সাহিত্য সংগঠনগুলোতেও। সেখানেই তাঁরা ভবিষ্যতের পাকিস্তানের রূপরেখা কল্পনা করতেন, নিজেদের স্বপ্নের আবাসভূমি নিয়ে চলত বিস্তর আলোচনা, বিতর্ক ও লেখালেখি। প্রায়ই রাজনীতিকেরাও তাঁদের এই আড্ডায় যোগ দিতেন। তাঁরা যেমন বুদ্ধিজীবীদের সামনে তুলে ধরতেন রাজনীতির বাস্তবতার কথা, তেমনি বুদ্ধিজীবীদের গভীর আবেগ ও সুগভীর জীবনবোধ থেকে আলোকিত হয়ে ফিরে যেতেন। আবার আবুল মনসুর আহমদের মতো কেউ কেউ ছিলেন, যাঁদের এ দুই জগতেই ছিল সাবলীল পদচারণ—তিনি একাধারে ছিলেন একজন রাজনীতিক, সাংবাদিক ও বিশিষ্ট লেখক।
১৯৪২ সালে কলকাতায় গড়ে ওঠা পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটির অন্যতম প্রাণপুরুষ ছিলেন সাংবাদিক আবুল কালাম শামসুদ্দীন। তাঁর মতো বুদ্ধিজীবীরা পাকিস্তানের ধারণাকে মূলত স্বাধীনতার এক অবিচ্ছেদ্য সংগ্রাম হিসেবেই দেখেছিলেন। এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে নিজেদের স্বকীয়তা বজায় রাখা এবং সেই স্বকীয়তার বিকাশে স্বাধীনভাবে কাজ করার ভাবনাটি। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে পাকিস্তান কেবল মুসলমানদের জন্য আলাদা একটি ভূখণ্ডের দাবি ছিল না; বরং তা হয়ে উঠেছিল মুক্তির সংগ্রাম, নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় প্রতিষ্ঠা এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ খোঁজার এক মূর্ত প্রতীক। এ সংগ্রাম শুধু মুসলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তৎকালীন ভারতের খ্রিষ্টান কিংবা দ্রাবিড়দের মতো যেকোনো সংখ্যালঘু বা অনগ্রসর সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেও এটি সমানভাবে প্রযোজ্য হতে পারত। ঠিক এ জায়গা থেকেই যদি আমরা দেখি, তাহলে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি কেন একসময় পাকিস্তানের ধারণাকে সমর্থন জুগিয়েছিল, তা বোঝা মোটেও কঠিন কিছু নয়।
একসময় হিন্দু লেখকদের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকা সাহিত্যের আঙিনায় বাঙালি মুসলমানরা কেবল একটুখানি জায়গা পেতে চাইতেন। কিন্তু এখন তাঁরা সম্পূর্ণ নিজস্ব ধারার সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে নিজেদের জন্য এক স্বাধীন পরিসর তৈরি করে নিচ্ছিলেন। অতীত থেকে রসদ নিলেও তাঁদের চোখ নিবদ্ধ ছিল ভবিষ্যতের দিকে। তাঁদের রচিত সেসব গল্প-উপন্যাস, কবিতা ও প্রবন্ধগুলোই হয়ে উঠেছিল এমন এক বাহন, যার মধ্য দিয়ে ফুটে উঠছিল ভবিষ্যতের পাকিস্তানের স্পষ্ট রূপরেখা।
তাঁদের কাছে পাকিস্তান ছিল সেই স্বপ্নের জায়গা, যেখানে এই নিজস্ব সংস্কৃতির পূর্ণ বিকাশ ঘটবে। ভাষা ও সাহিত্যই হবে সেই মূল ভিত্তি, যার ওপর ভর করে গড়ে উঠবে নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তান। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ধর্ম যুগে যুগে বিভিন্ন অঞ্চলে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেললেও সংস্কৃতি সব সময়ই স্থানীয় ভূগোল আর জলবায়ুর শিকড়েই বাঁধা থাকে। বাংলার ক্ষেত্রেও এ কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। এ ভাবনাগুলোরই চমৎকার প্রতিফলন ঘটেছিল ১৯৪২ সালে প্রকাশিত সাংবাদিক মুজিবুর রহমান খানের পাকিস্তান বইয়ে, আবুল কালাম শামসুদ্দীন ও আবুল মনসুর আহমদের নানা প্রবন্ধে এবং ফররুখ আহমদের কবিতায়।
আবুল মনসুর আহমদ তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর-এ জানিয়েছেন, শুরুতে তিনি পাকিস্তানের ধারণা নিয়ে বেশ সন্দিহান ছিলেন। তাঁর মনে হতো, এটি স্রেফ উচ্চবিত্ত মুসলমানদের একটি সাম্প্রদায়িক উদ্যোগ, যার সঙ্গে বাংলার গরিব কৃষকদের জীবনবাস্তবতার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে পরবর্তী সময়ে তিনি তাঁর এ ধারণা পাল্টে ফেলেন। তিনিসহ অন্য নেতারা পাকিস্তানের ধারণাকে নিজেদের আঞ্চলিক সংস্কৃতির শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁরা পাকিস্তানের ধারণাকে বাংলার আপামর কৃষক-শ্রমিকের আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে একসুতায় গাঁথেন এবং ইসলামি মূল্যবোধের আলোকে সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন।
এই বুদ্ধিজীবীরা দ্বিজাতিতত্ত্বকে সরাসরি ছুড়ে ফেলেননি; বরং বাঙালি মুসলমানদের সংস্কৃতির স্বকীয়তা তুলে ধরতে এর কিছুটা পরিমার্জন করেছিলেন। তাঁরা যেমন হিন্দু অভিজাতদের দ্বারা কোণঠাসা হয়েছিলেন, তেমনি উর্দুভাষী মুসলিম নেতাদের কাছেও হয়েছেন অবহেলিত। তাই তাঁরা ঠিক করলেন, এখন থেকে বাঙালি মুসলমানরা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজেদের সংস্কৃতির চর্চা করবেন। অমুসলিম বাঙালি ও অবাঙালি মুসলিমদের সংস্কৃতির ছোঁয়ায় তা সমৃদ্ধ হবে ঠিকই, কিন্তু কোনোভাবেই তাঁদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বা আজ্ঞাবহ হবে না।
১৯৪৪ সালের মে মাসে ইস্ট পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি কলকাতায় একটি বৃহৎ সম্মেলনের আয়োজন করে, যাতে সভাপতিত্ব করেন আবুল মনসুর আহমদ। সম্মেলনে তাঁর সভাপতির ভাষণ গভীর সাড়া জাগায়। তাঁর আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর বইটিতে তিনি তাঁর বক্তব্যের সংক্ষিপ্তসার দিয়েছেন (মনসুর ২০১৭: ২০৩-২০৪):
‘প্রথমত, আমি বলিয়াছিলাম, পাকিস্তান দাবিটি প্রধানত কালচারেল অটনমির দাবি। বলিয়াছিলাম, রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার চেয়েও কালচারেল অটনমি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এই দিক হইতে পাকিস্তান দাবি শুধু মুসলমানদের সাম্প্রদায়িক দাবি নয় এটা গোটো ভারতের কালচারেল মাইনরিটির জাতীয় দাবি। দ্বিতীয় কথা আমি বলিয়াছিলাম যে ভারতীয় মুসলমানরা হিন্দু হইতে আলাদা জাত তো বটেই বাংলার মুসলমানরা পশ্চিম মুসলমানদের হইতে পৃথক জাত। বলিয়াছিলাম, শুধুমাত্র ধর্ম জাতীয়তার বুনিয়াদ হইতে পারে না।’
সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার এই চেতনা যখন বেগবান হলো, তখন বাঙালি মুসলমানরা নিজেদের সমমনা হিন্দু এবং অবাঙালি মুসলমানদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তোলার উদ্যোগ নিলেন। তাঁরা পাকিস্তানকে নিছক কোনো ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক সত্তা হিসেবে দেখেননি; বরং একে দেখেছিলেন তৎকালীন সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিপরীতে দাঁড় করানো এক জোরালো আদর্শিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে। ১৯৪০-এর দশক থেকে বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা তাঁদের সমৃদ্ধ ভাষা ও সাহিত্যের আলোকেই পাকিস্তানের রূপরেখা তুলে ধরতে শুরু করেন। তাঁরা আধুনিক বাঙালি জীবনের পরতে পরতে ইসলামি প্রতীকগুলোকে এমন নিপুণভাবে গেঁথে দিয়েছিলেন, যা অবাঙালি ও অমুসলিম প্রতিবেশীদের সঙ্গে তাঁদের মিল ও অমিল—দুটিই খুব স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছিল। এই পুরো প্রক্রিয়ার মূলে ছিল ‘স্বায়ত্তশাসন’-এর ধারণা, অর্থাৎ অন্য কারও খবরদারি বা আধিপত্যের কাছে মাথা নত না করে, সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজেদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার চূড়ান্ত অধিকার।
তবে এ চিন্তাধারা কেবল সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক স্বায়ত্তশাসনের গণ্ডিতেই আটকে থাকেনি; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি অর্থনৈতিক মুক্তি ও উন্নয়নের স্বপ্নকেও ধারণ করতে শুরু করে। তৎকালীন পূর্ব বাংলা, এমনকি আসামসহ বৃহত্তর বাংলাও ছিল মূলত একটি চরম দরিদ্র অঞ্চল। হাতে গোনা কয়েকজন বিত্তবান জমিদার, ভূমিনির্ভর মধ্যস্বত্বভোগী ও অবস্থাপন্ন পেশাজীবী ছাড়া এ অঞ্চলের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ নিদারুণ দারিদ্র্যের মধ্যে দিনাতিপাত করত। বেঁচে থাকার ন্যূনতম রসদটুকু জোগাড় করতেই তাদের দিনরাত এক হয়ে যেত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল এবং ১৯৪৩ সালের মন্বন্তরের দুঃসহ স্মৃতি তখনো মানুষের মনে দগদগে ক্ষতের মতো জেগে ছিল।
আবুল মনসুর আহমদ ও আবুল হাশিম (যিনি ১৯৪৩ সালে বেঙ্গল মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন) ছিলেন সেই দূরদর্শী নেতাদের অন্যতম, যাঁরা এমন চরম নৈরাশ্যজনক পরিবেশের মধ্যেও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্ভাবনা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছিলেন। তাঁরা এ দেশের মানুষের কঠোর পরিশ্রম, ঘুরে দাঁড়ানোর অদম্য শক্তি ও সৃজনশীলতার অপার সম্ভাবনায় গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন। তাঁদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, এ সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে সমৃদ্ধি আসতে বাধ্য। তবে এর জন্য প্রয়োজন ছিল একধরনের স্বাধীনতা—নিজেদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিজেদের মতো করে গড়ার স্বায়ত্তশাসন। তাঁদের অগাধ বিশ্বাস ছিল, তাঁরা পাকিস্তানকে যেভাবে কল্পনা করছেন, সেই পাকিস্তান তাঁদের এই কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতাটুকু নিশ্চিত করবে।
১৯৪৪ সালে বেঙ্গল মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আবুল হাশিম যে খসড়া ইশতেহার তৈরি করেছিলেন, তাতে এ ভাবনারই এক সুস্পষ্ট রূপরেখা পাওয়া যায়। নানা দিক থেকেই এটি ছিল একটি অত্যন্ত প্রগতিশীল ইশতেহার, যেখানে অন্যান্য প্রসঙ্গের পাশাপাশি সমতা, ন্যায়বিচার ও নারী উন্নয়নের কথা জোর দিয়ে বলা হয়েছিল। আবুল হাশিমের জীবনীকার, জাপানি গবেষক শো কুয়াজিমা (কুয়াজিমা ২০১৫: ৪৭-৪৮) লিখেছেন:
‘খসড়াটিতে কেবল মুসলমানদের অধিকারের কথাই বলা হয়নি; বরং শ্রমিক, কৃষক, কারিগর, নারী এবং সংখ্যালঘুদের অধিকারের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যের অধিকারের বিষয়টিও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল। চিরস্থায়ী জমিদারি প্রথার আশু বিলুপ্তি এবং একই সাথে একচেটিয়া ব্যবসার—বিশেষ করে পাটশিল্পে—অবসান ঘটানো ছিল অর্থনৈতিক ফ্রন্টে তাদের অন্যতম প্রধান দাবি।...তৎকালীন তীব্র খাদ্যসংকট সমাধানের লক্ষ্যে ইশতেহারে “অধিক খাদ্য ফলাও” অভিযানের পাশাপাশি মজুতদারিবিরোধী অভিযান এবং সমস্ত শহর ও ঘাটতি অঞ্চলে রেশনিং ব্যবস্থা চালুর জোর দাবি জানানো হয়েছিল।’
পরবর্তীকালে ছয় দফা মূলত এই প্রতিষ্ঠাকালীন দৃষ্টিভঙ্গি বা রূপরেখা থেকেই তার আদর্শিক বৈধতা অর্জন করেছিল।
একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে ২১ দফা
১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচি—এ দুই ঘটনাই মূলত ছয় দফার আদর্শিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি রচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
১৯৪৮ সালে যে ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তা এক চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। মূলত এর মধ্য দিয়েই পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রথম প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ পূর্ব পাকিস্তানে বসবাস করা এবং তাঁদের মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার পাঁয়তারা করে। এই হঠকারী সিদ্ধান্ত পূর্ব বাংলার মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বেলে দেয়। তাঁরা বুঝতে পারেন, এটি কেবল ভাষার ওপর আঘাত নয়; বরং তাঁদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় ও রাজনৈতিক অধিকারকে চিরতরে মুছে ফেলার এক গভীর ষড়যন্ত্র।
আগের পর্বেই আলোচনা করা হয়েছে যে পাকিস্তান প্রস্তাবে স্বায়ত্তশাসনের যে প্রতিশ্রুতি ছিল, তাতেই উদ্বুদ্ধ হয়ে বাঙালি মুসলমানরা এমন এক স্বাধীন আবাসভূমির স্বপ্ন বুনেছিলেন, যেখানে নিজেদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের পূর্ণ স্বাধীনতা তাঁদের থাকবে। তাঁদের এ অবস্থানকে আরও জোরালো করেছিল ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি এক বিশেষ জোর। এই ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মকে অস্বীকার করা ছিল না; বরং এর মূল লক্ষ্য ছিল ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে যেন কোনো বৈষম্য তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করা। এই অসাম্প্রদায়িক চেতনাই তৎকালীন পূর্ব বাংলার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করেছিল।
উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে খোদ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও তাদের মদদপুষ্ট বুদ্ধিজীবীরা চরম ধৃষ্টতা দেখিয়েছিল। ১৯৪০-এর দশকে যে আবেগের বশবর্তী হয়ে বাঙালি মুসলমানরা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবিতে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার হয়েছিলেন, শাসকেরা সেই আবেগকে স্রেফ পদদলিত করে। নিজেদের পাকিস্তানের ‘প্রকৃত’ চেতনার ধারক-বাহক দাবি করলেও এই শাসকগোষ্ঠী আসলে পাকিস্তান প্রস্তাবের মূল চেতনাকেই অবজ্ঞা করেছিল। পাকিস্তান প্রস্তাবের প্রণেতারা যে সুদূরপ্রসারী চিন্তা থেকে স্বায়ত্তশাসনের ধারাটি যুক্ত করেছিলেন, সেই চেতনা বোঝার মতো ক্ষমতা বা সদিচ্ছা কোনোটিই তাদের ছিল না। ব্যাপারটা পরিহাসের হলেও ইতিহাস তো এমনই নানা নির্মম পরিহাসে ভরপুর।
ভাষা আন্দোলন একদিকে যেমন পাকিস্তানি রাষ্ট্রের চরম কেন্দ্রীভূত ও স্বৈরতান্ত্রিক রূপটিকে সবার সামনে উন্মোচিত করে দিয়েছিল, তেমনি অন্যদিকে অভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও বঞ্চনার বোধ বাঙালিকে এক সুদৃঢ় ঐক্যের সুতায় বেঁধেছিল। এ আন্দোলন ছাত্র, শ্রমিক থেকে শুরু করে আপামর জনসাধারণকে রাজনীতিতে সচেতন ও সক্রিয় করে তোলে, যা মূলত ভবিষ্যতের বড় বড় গণ-আন্দোলনের শক্ত ভিত গড়ে দিয়েছিল। ভাষাশহীদদের এই আত্মত্যাগ বাঙালির রাজনৈতিক চেতনার মোড় চিরতরে ঘুরিয়ে দেয়। তরুণ শেখ মুজিবুর রহমান নিজেও এই ভাষা আন্দোলন দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। তিনি খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছিলেন যে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ করতে এই আন্দোলনের চেতনা কতটা অপরিহার্য।
ভাষা আন্দোলনের প্রাথমিক লক্ষ্য ভাষা ও সাংস্কৃতিক অধিকার আদায় হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে এক বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নিতে থাকে। বাঙালির এই ক্রমবর্ধমান অধিকার আদায়ের দাবিগুলোই মূলত ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচিতে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। ২১ দফা ছিল বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষার এক সুসংগঠিত ও পূর্ণাঙ্গ দলিল। ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের একাধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে আওয়ামী লীগসহ পূর্ব পাকিস্তানের সমমনা কয়েকটি রাজনৈতিক দল মিলে এই ‘যুক্তফ্রন্ট’ জোট গঠন করেছিল।
পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা নানা ধরনের বিষয় এই ২১ দফা কর্মসূচিতে উঠে এসেছিল। এর অন্যতম প্রধান দাবিই ছিল বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। এটি ছিল সরাসরি ভাষা আন্দোলনের অর্জন ও আকাঙ্ক্ষারই এক সুস্পষ্ট প্রতিফলন। এ দাবি মূলত বাঙালির সাংস্কৃতিক মর্যাদা ও রাজনৈতিক স্বীকৃতি আদায়ের বৃহত্তর সংগ্রামের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কেবল সাংস্কৃতিক গণ্ডিতে আটকে না রেখে ভাষার অধিকারকে সরাসরি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার মধ্য দিয়ে যুক্তফ্রন্ট মূলত একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে এক সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক রূপরেখায় পরিণত করেছিল।
ভাষার মর্যাদার পাশাপাশি ২১ দফা কর্মসূচিতে অর্থনৈতিক সংস্কার এবং প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের ওপরও জোরালো তাগিদ দেওয়া হয়েছিল। পূর্ব বাংলার মানুষ তত দিনে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলেন যে কেন্দ্রীয় সরকার কীভাবে তাঁদের অর্থনৈতিকভাবে শুষে খাচ্ছে। গোটা পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার সিংহভাগই আসত পূর্ব পাকিস্তানের পাট রপ্তানি থেকে; অথচ উন্নয়নের বড় বড় বাজেট আর বরাদ্দ চলে যেত পশ্চিম পাকিস্তানে। তাই ২১ দফার মাধ্যমে সম্পদের সুষম বণ্টন ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ওপর প্রদেশের বৃহত্তর নিয়ন্ত্রণের দাবি তোলা হয়েছিল। এ ছাড়া কৃষকদের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য যুগোপযোগী ভূমি সংস্কারের দাবিও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই দাবিগুলো স্পষ্টতই প্রমাণ করছিল যে অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে বাঙালির মনে ক্ষোভের আগুন কতটা তীব্রভাবে জ্বলছে এবং পাকিস্তানের তৎকালীন রাজনৈতিক কাঠামোয় আমূল পরিবর্তন আনা কতটা জরুরি হয়ে পড়েছে।
২১ দফা কর্মসূচির মধ্যে ১৯ নম্বর দফাটিই মূলত পরবর্তীকালের স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে সবচেয়ে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পূর্ণ প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের সুস্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরার কারণেই এ দফার ঐতিহাসিক গুরুত্ব এত বেশি। এই দফার মূল বক্তব্যটি ছিল ঠিক এমন:
‘লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে দেশরক্ষা, পররাষ্ট্র ও মুদ্রা—এই তিনটি বিষয় কেন্দ্রের হাতে রাখিয়া অবশিষ্ট সকল বিষয় পূর্ববঙ্গের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনাধীনে আনিতে হইবে। দেশরক্ষার ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকারের সেনাবাহিনী সদর দপ্তর পশ্চিম পাকিস্তানে ও নৌবাহিনীর সদর দপ্তর পূর্ববঙ্গে স্থাপন করিতে হইবে এবং পূর্ববঙ্গে অস্ত্রনির্মাণ কারখানা স্থাপন করিতে হইবে, এবং আনসার বাহিনীকে সশস্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ মিলিশিয়ায় রূপান্তরিত করিতে হইবে।’
সহজ কথায়, এই দফার মূল দাবি ছিল—পূর্ব পাকিস্তান তার নিজস্ব প্রশাসন, অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ যাবতীয় বিষয়ে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ভোগ করবে; অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকবে কেবল দেশরক্ষা, পররাষ্ট্র ও মুদ্রার মতো হাতে গোনা কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয়। দাবিটি সরাসরি পাকিস্তানের চরম কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থার ভিত্তিমূলেই এক বিরাট চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল।
১৯ নম্বর দফার প্রকৃত গুরুত্ব অনুধাবন করতে হলে ১৯৫০-এর দশকের শুরুতে পাকিস্তানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটটা একটু খতিয়ে দেখা দরকার। স্বাধীনতার পর থেকেই পাকিস্তান এমন এক কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল, যেখানে পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনীতিক আর সামরিক আমলাদেরই ছিল একচ্ছত্র আধিপত্য। মোট জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ পূর্ব পাকিস্তানে বসবাস করা সত্ত্বেও জাতীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের প্রতিনিধিত্ব ও নিয়ন্ত্রণ ছিল একেবারেই নগণ্য। অর্থ, বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা ও উন্নয়নের মতো রাষ্ট্রের বড় বড় নীতিই নির্ধারিত হতো কেন্দ্রীয় সরকারের ইশারায়। ক্ষমতার এই চরম ভারসাম্যহীনতা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। তাঁরা বুঝতে পারেন, রাজনৈতিকভাবে তাঁদের কোণঠাসা করে রাখা হচ্ছে এবং অর্থনৈতিকভাবে চালানো হচ্ছে নির্মম শোষণ।
পাকিস্তান রাষ্ট্রটির জন্মের একদম শুরু থেকেই দেশের পূর্ব ও পশ্চিম অংশের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্যটি বাঙালিদের চোখে ধরা পড়তে থাকে। শুরু থেকেই দুই অংশের উন্নয়নের মাত্রা ও সম্পদের প্রাথমিক বণ্টনে বিস্তর ফারাক ছিল। স্বাভাবিকভাবেই সবার প্রত্যাশা ছিল যে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ও অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকেরা অন্তত এই বৈষম্যগুলো দূর করার বা এর প্রভাব কিছুটা হলেও কমিয়ে আনার চেষ্টা করবে।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। দিন যত গড়িয়েছে, পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতি সম্পদের পক্ষপাতমূলক বণ্টনের প্রমাণ ততই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে পাট রপ্তানির মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করলেও সরকারি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও সামরিক খাতের বিশাল ব্যয়ের প্রায় সবটুকুই পশ্চিম পাকিস্তানেই কুক্ষিগত করে রাখা হয়েছিল।
এ দেশের অর্থনীতিবিদ ও সরকারি কর্মকর্তারাই সবার আগে এই শোষণের চিত্রটি ধরতে পেরেছিলেন এবং তা নথিবদ্ধ করেছিলেন। খুব দ্রুতই সাংবাদিক আর রাজনীতিকেরাও এ ইস্যু লুফে নেন। অর্থনৈতিক বৈষম্যের এ বিষয় সংসদীয় বিতর্ক, একাডেমিক সেমিনার ও সংবাদপত্রের সম্পাদকীয়গুলোর সবচেয়ে আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়। বাঙালিরা এমন এক সুষম যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার দাবি তুলতে শুরু করেন, যেখানে সম্পদের অনেক বেশি ন্যায্য ও সুষম বণ্টন নিশ্চিত হবে।
১৯৫০-এর দশকের শুরুর দিকে এ ধরনের পারস্পরিক যোগাযোগের প্রমাণ আমরা পাই রাজনীতিবিদদের লেখায়। রাজনীতিবিদ ও ট্রেড ইউনিয়ন নেতা কামরুদ্দীন আহমদ তাঁর আত্মজীবনীতে অর্থনীতিবিদ এ সাদেকের সঙ্গে পরিচয় ও আলাপচারিতার স্মৃতি তুলে ধরেছেন। সে সময় ড. সাদেক পাকিস্তান পরিসংখ্যান ব্যুরোতে কর্মরত ছিলেন এবং তাঁর হাতে ছিল এমন বিশদ পরিসংখ্যানগত তথ্য, যা পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার প্রকট বৈষম্যকে স্পষ্ট করেছিল। সম্ভবত তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে এই বৈষম্যের ব্যাপ্তি ও বহুমাত্রিক চরিত্র উন্মোচন করেন। কামরুদ্দীন আহমদ স্মরণ করেন, একপর্যায়ে তিনি ও বিশিষ্ট বাঙালি নেতা আতাউর রহমান খান এই নিবেদিতপ্রাণ অর্থনীতিবিদের সঙ্গে দেখা করেন।
তাঁর আত্মজীবনী বাংলার এক মধ্যবিত্তের আত্মকাহিনী-তে কামরুদ্দীন আহমদ স্মরণ করছেন: ‘আমরা যখন পাকিস্তানের দুটি অঞ্চলের মধ্যে ব্যবধান কেন সৃষ্টি হলো এবং কতটা ব্যবধান হয়েছে, তার ওপর অনুসন্ধান চালাচ্ছি, ঠিক সেই সময় ড. সাদেক এক সন্ধ্যায় আমাদের অফিসে এসে আতাউর রহমান সাহেব ও আমাকে তাঁর বাসায় পরের দিন সন্ধ্যার পর চায়ের নিমন্ত্রণ করলেন। আমাদের শুধু বললেন যে আঞ্চলিক ভিত্তিতে পাকিস্তানের অর্থনীতির একটা ছক তিনি প্রস্তুত করেছেন। সকল প্রকার পরিসংখ্যান বিষয় (স্ট্যাটিসটিকস) তাঁর নিকট আছে, তা-ই নিয়ে আমাদের সঙ্গে আলাপ করতে চান। যেহেতু তিনি সরকারি চাকুরে, সুতরাং আমাদের অফিসে বসে আলোচনা করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। আমরা তাঁর নিমন্ত্রণ গ্রহণ করলাম।…পরের দিন সন্ধ্যার পর আমরা তাঁর দোতলার ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখি ডাইনিং টেবিলে বিছানো রয়েছে খাবারের স্থলে বড় বড় নকশা বা “চার্ট”। একজন অর্থনীতিবিদের বহু পরিশ্রমের ফল। আমাদের জন্য যেন প্রফেসর তৈরিই ছিলেন’(কামরুদ্দীন ২০১৮: ২৮)।
পরবর্তী সময়ে কামরুদ্দীন আহমদ ড. সাদেকের সংগৃহীত তথ্য ও বিশ্লেষণকে রাজনৈতিক পরিসরে তুলে ধরার উদ্যোগ নেন। তিনি (কামরুদ্দীন ২০১৮: ২৯) লিখছেন, ‘ড. সাদেকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে যতটা সম্ভব স্ট্যাটিসটিকস দ্বারা পূর্ব পাকিস্তানের ওপর যে অবিচার করা হচ্ছিল, সে সম্পর্কে একখানা পুস্তিকা রচনার অনুরোধ করলাম। যুক্তফ্রন্ট থেকে এই পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়। পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অলি আহাদ সাহেব আরও সুন্দর করে পরবর্তী সংস্করণ প্রকাশ করেন’ (কামরুদ্দীন ২০১৮: ২৯)।
১৯ নম্বর দফার মূল লক্ষ্যই ছিল পূর্ব পাকিস্তানকে তার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো পরিচালনার অধিকার দেওয়ার মাধ্যমে এই চরম বৈষম্যের অবসান ঘটানো। প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন মানেই হলো প্রশাসন, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, করব্যবস্থা, শিক্ষা, কৃষি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মতো বিষয়গুলোয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা পূর্ব পাকিস্তানের হাতেই থাকবে। কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতাকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আটকে রাখার মাধ্যমে যুক্তফ্রন্ট মূলত এটাই নিশ্চিত করতে চেয়েছিল যেন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ নিজেদের সম্পদ ও উন্নয়নের অগ্রাধিকারগুলো নিজেরাই সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
১৯ নম্বর দফাটি অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত ছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে অত্যন্ত মূল্যবান পাট রপ্তানি করে পূর্ব পাকিস্তান গোটা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার এক বিশাল অংশ আয় করত। অথচ এই বিপুল আয়ের সিংহভাগই ব্যয় করা হতো পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্পায়ন ও সামরিক শক্তি বৃদ্ধির পেছনে; আর পূর্ব পাকিস্তান পড়ে থাকত সেই চিরচেনা অনুন্নয়নের অন্ধকারে। প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবির মাধ্যমে ১৯ নম্বর দফাটি মূলত এটাই নিশ্চিত করতে চেয়েছিল, যেন পূর্ব পাকিস্তান তার নিজস্ব সম্পদ নিজেদের কাছেই রাখতে পারে এবং তা এ অঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে কাজে লাগাতে পারে।
১৯৫৬ সাল: ‘দুই অর্থনীতি’ তত্ত্বের আত্মপ্রকাশ
ঠিক দুই বছর পর, ১৯৫৬ সালের আগস্ট মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমবেত হন একদল অর্থনীতিবিদ। উপলক্ষ, পাকিস্তানের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার খসড়া নিয়ে আলোচনা। এটি ছিল মূলত পাকিস্তান অর্থনীতি সমিতির পূর্ব পাকিস্তান শাখার একটি সম্মেলন। উপস্থিত অর্থনীতিবিদদের প্রায় সবাই ছিলেন বাঙালি, তবে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তান থেকেও হাতে গোনা কয়েকজন যোগ দিয়েছিলেন।
সম্মেলন শেষে বাঙালি অর্থনীতিবিদেরা একটি প্রতিবেদন প্রণয়ন করেন, যার শিরোনাম ছিল ‘খসড়া পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বিষয়ে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদদের বিশেষ সম্মেলনের প্রতিবেদন’। এই প্রতিবেদনেই তাঁরা প্রথমবারের মতো ‘দুই অর্থনীতি’ (Two Economies) ধারণার অবতারণা করেন। তাঁদের মূল বক্তব্য ছিল—পাকিস্তান আসলে এক অর্থনীতির দেশ নয়; বরং এর অর্থনীতি দুটি। দশজনের একটি দল (যার অধিকাংশই অর্থনীতিবিদ ছিলেন) এই প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করে পাকিস্তান পরিকল্পনা কমিশনের কাছে জমা দিয়েছিল। এই দশজন হলেন—এম এন হুদা, মাজহারুল হক, এ রাজ্জাক, নুরুল ইসলাম, এ সাদেক, এ ফারুক, এ এন এম মাহমুদ, মো. শফিউল্লাহ, মুহাম্মদ হোসেন ও শফিকুর রহমান। সে সময় বাংলাদেশের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক নুরুল ইসলাম হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি শেষ করে সদ্যই দেশে ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে যোগ দিয়েছেন। দলের সবচেয়ে কনিষ্ঠ সদস্য হওয়ায় অন্যদের মতামতের ভিত্তিতে পুরো প্রতিবেদন গুছিয়ে লেখার মূল দায়িত্বটি অধ্যাপক নুরুল ইসলামের কাঁধেই বর্তেছিল।
তত দিন পর্যন্ত পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর যুক্তি ছিল—পশ্চিম পাকিস্তানে সম্পদের এই বিপুল ও অসম বরাদ্দ একেবারেই যৌক্তিক। কারণ, সেই সম্পদের সঠিক ব্যবহার ও তা কাজে লাগানোর সক্ষমতা ওই প্রদেশের অনেক বেশি। তাদের এই খোঁড়া যুক্তির মূল কথা ছিল: দুই প্রদেশের মধ্যে সম্পদের সমান ভাগাভাগি করতে গেলে পাকিস্তানের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে, যা শেষ পর্যন্ত বাঙালিদের জন্যও কোনো সুফল বয়ে আনবে না। এর বদলে পশ্চিম পাকিস্তানে বেশি সম্পদ বিনিয়োগ করা হলে পাকিস্তানের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে, অর্থনীতির আকার বড় হবে এবং সেই বর্ধিত প্রবৃদ্ধির একটি বড় অংশ চুইয়ে (trickle-down effect) পূর্ব পাকিস্তানেও পৌঁছাবে। অর্থাৎ তাদের দাবি ছিল সম্পদের এই অসম বণ্টনেই যেহেতু বাঙালিদের আখেরে লাভ, তাই এ নিয়ে তাদের কোনো অভিযোগ থাকা উচিত নয়।
কিন্তু ‘দুই অর্থনীতি’ তত্ত্ব এই ভ্রান্ত চিন্তাধারাকে পুরোপুরি নস্যাৎ করে দেয়। এই তত্ত্বে জোরালো যুক্তি দেওয়া হয় যে দুই প্রদেশের অর্থনীতি মৌলিকভাবেই সম্পূর্ণ আলাদা; এদের উৎপাদনের ব্যবস্থা, মূলধন গঠনের প্রক্রিয়া এবং উন্নয়নের গতিপথ—সবকিছুতেই বিস্তর ফারাক রয়েছে। তত্ত্বটি দাঁড়িয়েছিল ‘উপাদানের অচলতা’ (factor immobility) নামের একটি সুদৃঢ় অর্থনৈতিক ধারণার ওপর। যেহেতু পাকিস্তানের দুই প্রদেশ প্রায় হাজার মাইলের ভারতীয় ভূখণ্ড দ্বারা বিচ্ছিন্ন ছিল, তাই পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল ভোগ করতে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষদের পক্ষে সহজে সেখানে ছুটে যাওয়া সম্ভব ছিল না।
অন্যভাবে বললে, দুই প্রদেশের এই বিশাল ভৌগোলিক দূরত্ব এবং এর ফলে সৃষ্ট শ্রমিকসহ উৎপাদনের অন্যান্য উপাদানের অচলতার কারণে, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী প্রবৃদ্ধির যে ‘চুইয়ে পড়া’ সুফলের গল্প শোনাত, তা কখনোই বাস্তবে রূপ নেওয়া সম্ভব ছিল না। তা ছাড়া এক প্রদেশ থেকে অন্য প্রদেশে পণ্য পরিবহনের খরচও ছিল আকাশছোঁয়া। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পণ্য আনার চেয়ে অন্য কোনো দেশ থেকে তা আমদানি করা পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ঢের বেশি সাশ্রয়ী ছিল। তাই অর্থনীতিবিদেরা জোরালোভাবে যুক্তি দেখান, ‘উন্নয়ন পরিকল্পনার স্বার্থে, বিশেষ করে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির জন্য, পাকিস্তানকে দুটি পৃথক অর্থনৈতিক ইউনিট হিসেবে বিবেচনা করতে হবে’ [১]।
এই দলের অন্যতম সদস্য এম এন হুদা পরবর্তী সময়ে তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন:
‘আমরা পাকিস্তানকে দুই টুকরো করে ফেলার বা দুটি আলাদা দেশ হিসেবে গণ্য করার কোনো প্রস্তাব দিইনি। আমাদের যুক্তির মূল কথা ছিল, দেশের দুই অংশে দুটি সম্পূর্ণ আলাদা অর্থনীতি বিরাজমান। ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন পাকিস্তানের ক্ষেত্রে পুরো জাতির জন্য কেবল একটিমাত্র অর্থনীতির ধারণা কোনোভাবেই খাটে না। তাই পাকিস্তানের উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলোকে হতে হবে অত্যন্ত নমনীয়। নির্দিষ্ট কোনো অংশে যা কাজে লাগবে, পরিকল্পনা ও নীতিগুলো ঠিক সেভাবেই সাজাতে হবে। পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য প্রযোজ্য কোনো পরিকল্পনা জোর করে পূর্ব পাকিস্তানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়, কিংবা এর উল্টোটাও করা যাবে না' (হুদা ২০২১: ৯৯-১০০)।
বাঙালি অর্থনীতিবিদদের ওই প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে জাতীয় আয়, লেনদেনের ভারসাম্য এবং আর্থিক সম্পদের মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সূচকগুলোর তথ্য দুই প্রদেশের জন্য আলাদাভাবে সংগ্রহ করতে হবে। পাকিস্তানের সামগ্রিক অর্থনীতির গড় তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নয়; বরং এই বিভাজিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই পরিকল্পনা ও নীতিনির্ধারণ করতে হবে।
এভাবেই অর্থনৈতিক তত্ত্ব এবং বাস্তব পরিসংখ্যানের এক সমন্বয়ের মাধ্যমে বাঙালি অর্থনীতিবিদেরা দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে প্রবৃদ্ধির ওই ‘চুইয়ে পড়া’ নীতি এখানে কোনো কাজেই আসবে না। এর মধ্য দিয়ে অসম সম্পদ বণ্টনের পক্ষে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দেওয়া যাবতীয় যুক্তি একেবারে ধোপে টিকল না। বহু বছর পর একটি সংবাদপত্রের নিবন্ধে অধ্যাপক নুরুল ইসলাম সেই যুগান্তকারী প্রতিবেদনের তাৎপর্য তুলে ধরতে গিয়ে লেখেন:
‘এই “দুই অর্থনীতি” তত্ত্বের মধ্য দিয়েই পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদেরা তাঁদের অধিকার আদায় এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার বৈষম্য বাড়িয়ে তোলা শ্লথ অর্থনৈতিক অগ্রগতি রোধ করার লক্ষ্যে প্রথম সুসংগঠিত চিন্তাভাবনা শুরু করেন। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক কৌশল প্রণয়নের জন্য এটিকেই সবচেয়ে উপযুক্ত এবং অপরিহার্য বিশ্লেষণাত্মক ও ধারণাগত কাঠামো হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল’ (ইসলাম ২০১৪)।
এর আগপর্যন্ত বৈষম্য নিয়ে যত আলোচনা হতো, তার প্রায় সবটাই ঘুরপাক খেত সম্পদের অসম বণ্টন এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য নির্দেশকারী কিছু খণ্ডিত পরিসংখ্যানের চারপাশে। কিন্তু ‘দুই অর্থনীতি’ তত্ত্বের আত্মপ্রকাশ এই আলোচনাকে সম্পূর্ণ নতুন এক মাত্রায় নিয়ে যায়। এটি অর্থনৈতিক বঞ্চনার কারণগুলো নিয়ে ভাবার এবং তার প্রতিকার চাওয়ার জন্য একটি অত্যন্ত সুসংহত ও যৌক্তিক তাত্ত্বিক কাঠামো দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল।
বার্তার বিস্তার: জনমানুষের মধ্যে ‘দুই অর্থনীতি’ তত্ত্ব
‘দুই অর্থনীতি’ তত্ত্বের আত্মপ্রকাশ চারদিকে রীতিমতো হইচই ফেলে দেয়। খুব স্বাভাবিকভাবেই পশ্চিম পাকিস্তানি অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকেরা একে খুব একটা ভালোভাবে নেননি, বরং অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা চরম বৈরী আচরণ করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে এম এন হুদার স্মৃতিচারণাটি প্রণিধানযোগ্য—
‘পাকিস্তানের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও উন্নয়নের জগতে এই প্রতিবেদন রীতিমতো আলোড়ন তুলেছিল। কেন্দ্রীয় সরকার কোনোভাবেই দুটি বিষয় মানতে রাজি ছিল না: ক) বিস্তর ভৌগোলিক দূরত্বে অবস্থিত পাকিস্তানের দুই অংশে আসলে দুটি সম্পূর্ণ আলাদা অর্থনীতিই বিরাজ করছে; এবং খ) কেবল এই ভৌগোলিক বাস্তবতাকে হিসাবের কেন্দ্রে রাখলেই পাকিস্তানের জাতীয় নীতি বা উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো বাস্তবসম্মত ও অর্থবহ হতে পারে’ (হুদা ২০২১: ৯৯)।
লড়াই তো তখন সবে শুরু। এই তত্ত্বের মূল বার্তা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়াটা ভীষণ জরুরি হয়ে পড়ে। তাই ছয় দফার দিকে এগোনোর চতুর্থ পর্বটি ছিল—অর্থনৈতিক বঞ্চনার এই খতিয়ানকে কেবল একাডেমিক বা নীতিনির্ধারণী আলোচনার গণ্ডিতে আটকে না রেখে তাকে আমজনতার রাজনীতির মাঠে নিয়ে যাওয়া। তত্ত্বটির এই জনপ্রিয়করণ ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর ফলেই পরবর্তীকালে ‘ছয় দফা’ মানুষের কাছে কোনো বিমূর্ত বা কেবল বিশেষজ্ঞদের কাগুজে তত্ত্ব বলে মনে হয়নি; বরং তা সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের নিরেট বাস্তবতার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিটি রূপ নিয়েছিল মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও রাজনৈতিক আত্মসম্মানের প্রতীকে।
ছাত্র আন্দোলন, রাজনৈতিক সমাবেশ, ট্রেড ইউনিয়ন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচার-প্রচারণার মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক শোষণের এই বয়ান ধীরে ধীরে গণমানুষের চেতনায় গেঁথে যায়। ‘অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদ’ কিংবা ‘অর্থনৈতিক আধিপত্য’-এর মতো গালভরা শব্দগুলোও তখন পূর্ব পাকিস্তানের প্রাত্যহিক রাজনৈতিক আলাপচারিতার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় যে অর্থনীতিবিদ অন্যতম প্রধান অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছিলেন, তিনি রেহমান সোবহান। ‘দুই অর্থনীতি’ তত্ত্বের প্রবক্তা মূল দলটিতে তিনি ছিলেন না। সে সময় তিনি মাত্রই কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তবে দেশে ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেওয়ার পরপরই এই তত্ত্বের বার্তা চারদিকে ছড়িয়ে দিতে তিনি আক্ষরিক অর্থেই নিজের সর্বস্ব ঢেলে দেন। নুরুল ইসলাম, এম এন হুদা ও হাবিবুর রহমানের মতো অর্থনীতিবিদেরা যখন সেমিনারে প্রবন্ধ পাঠ করে ‘দুই অর্থনীতি’ তত্ত্বের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন, তখন রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশি সক্রিয় রেহমান সোবহান এই বার্তাকে ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন রাজনীতির মাঠে। এই বিতর্কে কে কোন পক্ষে ছিলেন, তার ওপর ভিত্তি করে এই তৎপরতা তাঁকে যেমন খ্যাতি এনে দিয়েছিল, তেমনি জুটিয়েছিল বিরাগভাজন হওয়ার তকমাও।
১৯৬১ সালের জুনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সেমিনারে নুরুল ইসলাম ও হাবিবুর রহমানের সঙ্গে তিনিও একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। ঠিক তার পরদিন তৎকালীন শীর্ষ দৈনিক ‘পাকিস্তান অবজারভার’-এর প্রথম পাতায় পাকিস্তানের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী রাষ্ট্রপতির খবরের ঠিক পাশেই নিজের খবর দেখে তিনি রীতিমতো বিস্মিত হন। রেহমান সোবহান তাঁর স্মৃতিকথায় সেই অভাবনীয় অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে লিখেছেন:
‘পরদিন সকালে “পাকিস্তান অবজারভার” হাতে নিয়েই প্রথম পাতার শিরোনাম দেখলাম—“রেহমান সোবহান বলছেন, পাকিস্তানে দুটি অর্থনীতি রয়েছে”। আমার এই বক্তব্য আরও বেশি চাঞ্চল্য তৈরি করেছিল, কারণ আইয়ুব খান তখন তাঁর এই উপনিবেশ পরিদর্শনে এসেছিলেন। কার্জন হলে আমাদের সেমিনারের দিনই ঢাকা ছাড়ার সময় সাংবাদিকেরা তাঁর কাছে “দুই অর্থনীতি” নিয়ে জানতে চান। তাঁর উত্তরটিও অবজারভারের প্রথম পাতায়, ঠিক আমার মন্তব্যের পাশেই বড় হরফে ছাপা হয়েছিল—“আইয়ুব খান বলছেন, পাকিস্তানে কেবল একটিই অর্থনীতি রয়েছে।” সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী এক সামরিক শাসকের মন্তব্যের ঠিক পাশেই ২৬ বছর বয়সী এক বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষকের মন্তব্যের এই অদ্ভুত সহাবস্থান মূলত পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভেতরকার মতাদর্শগত পরিবর্তনের এক সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছিল, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল একটি স্বাধীন বাংলাদেশ’ (সোবহান ২০২৪)।
পাকিস্তানের একটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিক পত্রিকার প্রথম পাতায় এই শিরোনাম প্রকাশিত হওয়া থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে ‘দুই অর্থনীতি’ তত্ত্বটি আর শুধু একাডেমিক আগ্রহের বিষয় ছিল না; এটি তখন রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ও জন–আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসা একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদে পরিণত হয়েছিল।
পাকিস্তান তখন সামরিক শাসনে পিষ্ট, রাজনীতিকদের প্রকাশ্যে কথা বলার ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু তাঁদের অনেকেই রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন নিয়ে নিজেদের চিন্তাভাবনা শাণিত করতে মরিয়া ছিলেন এবং অর্থনীতিবিদদের এই সরব উপস্থিতিতে তাঁরা দারুণ আশার আলো দেখতে পান। রাজনীতিকেরা শুধু অর্থনীতিবিদদেরই নয়, বরং সহানুভূতিশীল যেসব বাঙালি আমলার কাছে সরকারের সংবেদনশীল নথিপত্র ও ভেতরের খবর থাকত, তাঁদেরও দ্বারস্থ হতে শুরু করেন। তাঁরা মূলত স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের নীতিগত দিকগুলো ও এর সম্ভাব্য প্রভাবগুলো গভীরভাবে বুঝতে চাইছিলেন। রেহমান সোবহানের মতো অর্থনীতিবিদেরা একাডেমিক আলোচনাগুলোকে রাজনীতির মাঠে নিয়ে যাওয়ার এই সুযোগগুলো লুফে নেন। আর এই সেতুবন্ধনের কাজটি প্রায়ই করতেন রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছাত্ররা। রেহমান সোবহান (সোবহান ২০২৪) এ সময়কালকে বর্ণনা করেছেন ‘বাঙালি নেতা এবং বুদ্ধিজীবীদের রাজনৈতিক জাগরণের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্ব’ হিসেবে।
নিজের স্মৃতিকথার প্রথম খণ্ডে রেহমান সোবহান দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের কথা তুলে ধরেছেন, যার মূল লক্ষ্যই ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ফসলকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়া। এর একটি হলো ‘ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর সোশ্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক প্রোগ্রেস’ (এনএএসইপি), যা পরবর্তী সময়ে ‘জনমৈত্রী পরিষদ’ (জেপি) নামে রূপান্তরিত হয়ে এর কর্মপরিধি আরও বিস্তৃত করে। রাজনৈতিক চিন্তাধারাভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক তৈরির এই প্রাথমিক উদ্যোগগুলোর মধ্য দিয়ে সমমনা বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিকেরা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নীতি নিয়ে আলোচনার জন্য এক ছাদের নিচে আসার সুযোগ পান। উদাহরণস্বরূপ, এনএএসইপির নিয়মিত আড্ডায় যোগ দিতেন আবদুর রাজ্জাক, বদরুদ্দীন উমর, সালাহউদ্দীন আহমদ ও মোশাররফ হোসেনের মতো বুদ্ধিজীবীরা; কামাল হোসেনের মতো আইনজীবীরা (যিনি রেহমান সোবহানের সঙ্গে এই সংগঠনের অন্যতম উদ্যোক্তাও ছিলেন) এবং কমরুদ্দীন আহমদের মতো রাজনীতিকেরা।
এই ফোরামগুলোর আলোচনা কেবল অর্থনৈতিক বৈষম্যের আক্ষেপেই সীমাবদ্ধ থাকত না; বরং তা পরিচালিত হতো অত্যন্ত সুচিন্তিত প্রবন্ধের ওপর ভিত্তি করে। এসব আলোচনায় গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার মতো বিষয়গুলোও গভীরভাবে উঠে আসত, যা পরবর্তী সময়ে ১৯৭২ সালের সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে জায়গা করে নিয়েছিল। রাজনীতিকদের এই সক্রিয় উপস্থিতির ফলে যে নীতিগত বিষয়গুলো হয়তো শুধু একাডেমিক গণ্ডির ভেতরেই আটকে থাকত, সেগুলো রাজনীতির বৃহত্তর ময়দানে প্রবেশের ছাড়পত্র পেয়ে যায়। পাকিস্তানের পার্লামেন্টের বেশ কয়েকজন বাঙালি সদস্য অধিবেশনে যোগ দেওয়ার আগে নিয়মিতভাবে রেহমান সোবহান ও কামাল হোসেনের সঙ্গে বসতেন এবং তাঁদের কাছ থেকে তথ্য ও যুক্তির ধার শাণিত করে নিতেন। এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই মূলত সে সময়কার রাজনৈতিক আলোচনাগুলো তথ্য, উপাত্ত ও নীতিগত দিক থেকে অনেক বেশি সমৃদ্ধ ও পরিণত হয়ে উঠেছিল।
আইয়ুব খানের ঢাকা সফর: প্রাপ্তির খাতা শূন্যই রয়ে গেল
ক্ষমতা গ্রহণের প্রায় আড়াই বছর পর পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল আইয়ুব খান অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রশ্নটি নিয়ে বাঙালি অর্থনীতিবিদদের মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। ১৯৬১ সালের মে মাসে তিনি ঢাকায় আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের কয়েকজন অধ্যাপককে তাঁর সঙ্গে সকালের নাশতার আমন্ত্রণ জানান। এই অধ্যাপকেরা—আতোয়ার হোসেন, আবদুল্লাহ ফারুক ও নুরুল ইসলাম—পূর্ব পাকিস্তানের অনুন্নয়ন ও আঞ্চলিক বৈষম্যের বিষয়ে আইয়ুব খানের সঙ্গে বেশ খোলামেলা আলোচনা করেন। এম এন হুদাকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, কিন্তু ঢাকার বাইরে থাকায় তিনি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করতে পারেননি।
এ বৈঠক নিয়ে পরবর্তী সময়ে অধ্যাপক নুরুল ইসলাম লিখেছেন, তাঁর মনে হয়েছিল আইয়ুব খান সত্যিই তাঁদের কথা মন দিয়ে শুনছেন। আলোচনার শেষ পর্যায়ে আইয়ুব খান তাঁদের নিজস্ব বিশ্লেষণ ও সুপারিশগুলো তুলে ধরে একটি স্মারকলিপি (মেমোরেন্ডাম) প্রস্তুত করতে বলেন। তবে বাঙালি অর্থনীতিবিদদের মধ্যে মতামতের কিছুটা ভিন্নতা আঁচ করতে পেরে তিনি প্রত্যেকের কাছ থেকে আলাদা আলাদা প্রতিবেদন চেয়ে বসেন। কিন্তু বাঙালিরা সহজেই বুঝে যান, এটি মূলত তাঁদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির একটি সুকৌশল চাল। তাঁরা কোনোভাবেই এই ফাঁদে পা দিতে রাজি ছিলেন না; বরং একটি অভিন্ন প্রতিবেদন জমা দেওয়ার বিষয়ে তাঁরা অটল থাকেন। শেষমেশ আতোয়ার হোসেন, আবদুল্লাহ ফারুক ও নুরুল ইসলামের সঙ্গে এম এন হুদা ও আরও কয়েকজন মিলে প্রতিবেদনটি তৈরি করেন এবং তা রাষ্ট্রপতির সচিবের কাছে জমা দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনটি তৈরির মূল কৌশল ছিল—উন্নয়ন ও আঞ্চলিক সমতা বিধানে আইয়ুব খানের সদিচ্ছার ওপর আপাত আস্থা রাখা এবং তাঁর সরকার কীভাবে কার্যকরভাবে এই লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে পারে, সে বিষয়ে তাঁকে পথ দেখানো।
‘দুই অর্থনীতি’ তত্ত্বের সূত্র ধরেই ‘পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উন্নয়ন’ (দ্য ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অব ইস্ট পাকিস্তান) শীর্ষক এই স্মারকলিপিতে বেশ কিছু জোরালো সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে ছিল—প্রতিটি অঞ্চলের জন্য আয় ও কর্মসংস্থানের আলাদা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ, পৃথক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং আঞ্চলিক চাহিদার ভিত্তিতে ব্যয়ের তুলনামূলক হিসাব সমন্বয় করা। একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সুষম প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে পূর্ব পাকিস্তানে বিনিয়োগ বাড়িয়ে সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করতে একটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতারও প্রস্তাব করা হয়। এই লক্ষ্য পূরণে আরও সুপারিশ করা হয় যে পূর্ব পাকিস্তানে মোট বিনিয়োগের হার ১৯৬০-৬৫ সালের ৩০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৯৭৫-৮০ সালের মধ্যে ৬০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে।
তবে দুই প্রদেশের মধ্যে সম্পদ বণ্টনে এত বড় মাপের কোনো পরিবর্তন আনতে পাকিস্তান সরকার আদৌ রাজি হবে কি না, তা নিয়ে বাঙালি অর্থনীতিবিদদের ঘোর সন্দেহ ছিল। তাই তাঁরা একটি অপেক্ষাকৃত যুগান্তকারী বিকল্প পথের সুপারিশ করেন। তাঁদের প্রস্তাব ছিল—প্রদেশগুলো নিজেদের কর ও করবহির্ভূত রাজস্ব আদায়ের এবং তা নিজেদের ইচ্ছামতো ব্যয়ের পূর্ণ ক্ষমতা পাবে। সহজ কথায়, বৈদেশিক মুদ্রা আয়সহ যাবতীয় রাজস্ব ও সম্পদ নিজ নিজ অঞ্চলের হাতেই থাকবে; আর কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যয় নির্বাহের জন্য প্রদেশগুলো নিজেদের সামর্থ্য এবং কেন্দ্র থেকে পাওয়া সুবিধার ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট অংশ কেন্দ্রে জমা দেবে। কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকবে কেবল দেশরক্ষা, পররাষ্ট্র ও আন্ত–আঞ্চলিক যোগাযোগের মতো বিষয়গুলো। একই মুদ্রা ব্যবহার করলেও প্রতিটি অঞ্চল স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের স্থানীয় বোর্ডের মাধ্যমে নিজ নিজ মুদ্রানীতি পরিচালনা করবে। একটি বিশেষজ্ঞ দল এই ধারণাগুলোকে আরও পরিমার্জন করতে পারে বলেও তাঁরা মত দেন। মূলত এই প্রস্তাবগুলোকেই পরবর্তীকালের ‘ছয় দফা’র একটি সুস্পষ্ট পূর্বসূরি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা ও কাজ সীমিত করার এমন প্রস্তাব এবারই প্রথম দেওয়া হয়নি। ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছিল। তাদের ২১ দফা নির্বাচনী ইশতেহারেও প্রস্তাব করা হয়েছিল, কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে কেবল তিনটি বিষয়—দেশরক্ষা, পররাষ্ট্র ও মুদ্রা—ন্যস্ত থাকবে।
অর্থনীতিবিদদের একটি ছোট দল এই স্মারকলিপি তৈরি করলেও এটিকে কোনো গোপনীয় দলিল হিসেবে আটকে রাখা হয়নি; বরং এটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এর মূল সুপারিশসহ ভেতরের অনেক কথাই দ্রুত জনসমক্ষে চলে আসে। ১৯৫৬ সালের যে প্রতিবেদনটি ‘দুই অর্থনীতি’ তত্ত্বের জন্ম দিয়েছিল, এই নতুন স্মারকলিপি সেই তত্ত্বের পালেই যেন নতুন করে হাওয়া দেয়। আগেই বলা হয়েছে, বাঙালি অর্থনীতিবিদেরা তত্ত্বটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ায় তা বেশ প্রচার পেয়েছিল। ১৯৬১ সালের এই স্মারকলিপি আন্ত–আঞ্চলিক বৈষম্য এবং ‘দুই অর্থনীতি’ তত্ত্ব নিয়ে চলমান বিতর্ককে আরও অনেক বেশি উসকে দেয়, যা দ্রুতই সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও নীতিনির্ধারকদের নজর কাড়তে সক্ষম হয়।
অধ্যাপক নুরুল ইসলাম নিজে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহকর্মী রেহমান সোবহানের সঙ্গে এই প্রতিবেদন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন এবং অন্য পেশাজীবীদের কাছেও এর মূল বিষয়বস্তু তুলে ধরেন। এর পাশাপাশি প্রস্তাবগুলোর পক্ষে সমর্থন আদায়ে আইয়ুব খানের মন্ত্রিসভার পূর্ব পাকিস্তানি সদস্যদের—বিশেষ করে বিচারপতি ইব্রাহিম এবং এ কে খানের কাছে—এর অনুলিপি পাঠানো হয়। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এই স্মারকলিপির প্রভাব কতটা গভীর ছিল, তার প্রমাণ মেলে যখন বিচারপতি ইব্রাহিম এই প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো যুক্ত করে আইয়ুব খানের কাছে একটি মেমো পর্যন্ত পাঠিয়েছিলেন।
আইয়ুব খানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাঙালি অর্থনীতিবিদেরা যে আন্তরিকতার সঙ্গে স্মারকলিপিটি তৈরি করেছিলেন, দিন শেষে তার কোনো সুফলই মিলল না। খোদ রাষ্ট্রপতির সচিবালয় থেকে এই প্রতিবেদনের কোনো জবাবই এল না। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক নুরুল ইসলাম লিখেছেন:
‘প্রেসিডেন্ট বা তাঁর সচিবালয়—কারও কাছ থেকেই আমরা আমাদের স্মারকলিপির কোনো উত্তর পাইনি। তবে ব্যক্তিগত সূত্র থেকে জানতে পারি, প্রতিবেদনটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও মতামতের জন্য অর্থমন্ত্রী এবং পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো হয়েছিল। তাঁদের পরামর্শেই আইয়ুব খান সম্ভবত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে পূর্ব পাকিস্তানের এই অর্থনীতিবিদেরা আসলে এখানকার ক্ষমতা-লোভী রাজনীতিকদের সাথে হাত মিলিয়েছেন, যাদের মূল লক্ষ্য পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আলাদা করা। তাঁরা যেন পেশাদার অর্থনীতিবিদের বদলে রাজনৈতিক ইন্ধনদাতার ভূমিকাতেই অবতীর্ণ হয়েছেন। তাই প্রেসিডেন্ট মনে করেছিলেন, তাঁদের সাথে নতুন করে আর কোনো যোগাযোগ বা মতবিনিময় করাটা মোটেও ফলপ্রসূ বা বাঞ্ছনীয় হবে না’ (ইসলাম ২০০৩: ৩৪)।
সেই বছরেরই শেষ দিকে আইয়ুব খানের সঙ্গে দ্বিতীয় আরেকটি বৈঠকে যোগ দিতে গিয়ে এম এন হুদা এই তিক্ত বাস্তবতার সরাসরি আঁচ পান। সেই বৈঠকে নুরুল ইসলাম না থাকলেও ছিলেন আরেক বাঙালি অর্থনীতিবিদ মাজহারুল হক। ‘দুই অর্থনীতি’ তত্ত্বের অন্যতম প্রবক্তা হাবিবুর রহমান তখন পাকিস্তান পরিকল্পনা কমিশনে কর্মরত। তিনিই আগেভাগে এম এন হুদাকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে পরিকল্পনা কমিশন ও কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে স্মারকলিপিটি রীতিমতো তোপের মুখে পড়েছে। আইয়ুব খানকে এমনভাবে বিষয়টি বোঝানো হয়েছে, যাতে বাঙালি অর্থনীতিবিদদের চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়। এতে প্রেসিডেন্ট প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ। হুদাকে এমন এক আইয়ুব খানের মুখোমুখি হতে হবে, যিনি আক্ষরিক অর্থেই রাগে ফুঁসছেন। এই সতর্কবার্তা পেয়ে এম এন হুদা নিজেও পুরোপুরি প্রস্তুত হয়েই বৈঠকে গিয়েছিলেন।
সতর্কবার্তাটি অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেল; আইয়ুব খান ছিলেন চরম মারমুখী মেজাজে। এ বিষয়ে এম এন হুদার ভাষ্যটি ছিল এমন:
‘প্রেসিডেন্ট যেন ছিলেন রাগের এক জ্বলন্ত প্রতিমূর্তি! তাঁর চোখমুখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছিল। প্রতিবেদনের কোনো সূত্র বা প্রসঙ্গ ছাড়াই শুরুতেই তিনি আমাদের ওপর গালাগালির তুবড়ি ছোটালেন! প্রেসিডেন্ট আইয়ুব আমাদের পাকিস্তানবিরোধী এবং ভারতের চর বলে আখ্যা দিলেন। দেশভাগ বা ভারতের সাথে যোগ দেওয়ার চক্রান্তসহ নানা ধরনের অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও তুললেন আমাদের বিরুদ্ধে। একটানা ৭ থেকে ১০ মিনিট ধরে চলল এই বিষোদ্গার। পূর্ব পাকিস্তানের অত্যন্ত সম্মানিত অর্থনীতিবিদ হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আমাদের সাথে চূড়ান্ত অসম্মানজনক ও চরম অবজ্ঞাপূর্ণ আচরণ করলেন!’ (হুদা ২০২১: ১০৮)।
তবে এম এন হুদার অত্যন্ত বিনয়ী অথচ সুদৃঢ় জবাবে আইয়ুব খান কিছুটা শান্ত হন। মনে হলো, তিনি অন্তত এটুকু বুঝতে পেরেছিলেন যে পরিস্থিতি সামাল দিতে কিছু একটা করা প্রয়োজন। পরবর্তী সময়ে সেই সফরের মধ্যেই ঢাকার পল্টন ময়দানে এক জনসভায় আইয়ুব খান একটি ‘অর্থ কমিশন’ (ফাইন্যান্স কমিশন) গঠনের ঘোষণা দেন। সেই ঘোষণার পরপরই ১৯৬১ সালের অক্টোবরে পূর্ব পাকিস্তান থেকে তিনজন সদস্য নিয়ে এই অর্থ কমিশন গঠন করা হয়। এই তিন সদস্য হলেন—পূর্ব পাকিস্তান সরকারের অতিরিক্ত প্রধান সচিব ডেভিড কে পাওয়ার (যিনি পূর্ব পাকিস্তান প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন), অর্থসচিব সৈয়দ আবুল খায়ের ও অধ্যাপক নুরুল ইসলাম। কমিশনের মূল কাজ ছিল—(ক) কেন্দ্র ও প্রদেশগুলোর মধ্যে রাজস্বের উৎসগুলো কীভাবে ভাগ করা হবে, এবং (খ) কর, বৈদেশিক সহায়তা, অভ্যন্তরীণ ঋণসহ কেন্দ্রীয় রাজস্ব দুই অঞ্চলের মধ্যে কীভাবে বণ্টিত হবে, সে বিষয়ে সুপারিশ করা।
কমিশনের পূর্ব পাকিস্তানি সদস্যরা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছিলেন, যার মধ্যে দুটি বিশেষ সুপারিশের কথা উল্লেখ করা যায় । প্রথমত, কেন্দ্রীয় সরকারের সম্পদ বণ্টনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ফর্মুলা বা সূত্র প্রস্তাব করা হয়েছিল। এই সূত্র মূলত দুই প্রদেশের মাথাপিছু আয়ের বৈষম্য দিয়ে ভারযুক্ত (ওয়েটেড) জনসংখ্যার অনুপাতের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল। সূত্রের প্রথম অংশটি—অর্থাৎ জনসংখ্যার অনুপাত—তৎকালীন বাস্তব পরিস্থিতির প্রতিফলন ঘটিয়েছিল। আর দ্বিতীয় অংশটি—অর্থাৎ মাথাপিছু আয়ের পার্থক্যের ভিত্তিতে মূল্যায়ন—ছিল মূলত ঐতিহাসিক বঞ্চনার স্বীকৃতি; বছরের পর বছর ধরে চলা বৈষম্যের কারণেই যে পূর্ব পাকিস্তান এতটা পিছিয়ে পড়েছে, এটি ছিল তারই প্রমাণ। এ ছাড়া পূর্ব পাকিস্তানি সদস্যরা এমন একটি সাংবিধানিক বিধানও যুক্ত করতে চেয়েছিলেন, যেখানে আগামী ২৫ বছরের মধ্যে সব ধরনের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার একটি চূড়ান্ত আইনি প্রতিশ্রুতি থাকবে।
কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর প্রতিক্রিয়া ছিল যথারীতি নিরুত্তাপ; বলতে গেলে রীতিমতো বৈরী। নুরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানি সদস্যদের এই জোরালো অবস্থানে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী চরম অসন্তোষ ও বিরক্তি প্রকাশ করেছিল’(ইসলাম ২০০৩: ৭০)। পূর্ব পাকিস্তানি সদস্যদের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলোসহ আরও অনেক সুপারিশ হয় সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হয়, নয়তো এমনভাবে কাটছাঁট করা হয় যাতে সেগুলোর আর কোনো কার্যকারিতাই না থাকে। কেন্দ্রীয় সরকারের সম্পদ বণ্টনের সেই প্রস্তাবিত সূত্রটিও বাতিল করে দেওয়া হয়। পাকিস্তানের ১৯৬২ সালের সংবিধানে বৈষম্য দূর করার বিষয়ে একটি ধারা যুক্ত করা হলেও তার জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি; বরং বলা হয়েছিল, ‘যত দ্রুত সম্ভব’ বৈষম্য দূর করা হবে—যা আসলে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতিই ছিল না।
সব মিলিয়ে এটা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানোর বিষয়ে আইয়ুব খানের উদ্যোগগুলো শুরুতে আন্তরিক মনে হলেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চরম একগুঁয়েমি ও অসহিষ্ণুতার কারণে পূর্ব পাকিস্তানের ভাগ্যে কোনো সুফলই জোটেনি। আর পর্দার আড়ালের এই সব খবরাখবর খুব দ্রুতই শেখ মুজিবুর রহমানসহ তৎকালীন বাঙালি রাজনৈতিক নেতাদের কানে পৌঁছে যাচ্ছিল।
১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ: পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তার চরম দুর্বলতা উন্মোচন
১৯৬৫ সালের আগস্ট মাসে কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের সীমান্ত সংঘাত শুরু হয়, যা দ্রুতই এক সর্বাত্মক যুদ্ধে রূপ নেয়। আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে টানা ছয় সপ্তাহ ধরে চলা এই পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তার মারাত্মক দুর্বলতাগুলোকে একেবারে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। যুদ্ধের আগে থেকেই দুই প্রদেশের মধ্যে সামরিক শক্তি ও সম্পদ বণ্টনে চরম বৈষম্য ছিল। আর যুদ্ধ চলাকালে সামরিক পরিকল্পনা, রাজনৈতিক মনোযোগ এবং যুদ্ধকালীন প্রয়োজনীয় রসদ—সবকিছুই আরও বেশি মাত্রায় পশ্চিম পাকিস্তানে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে।
১৯৬৫ সালের এই যুদ্ধ মূলত পশ্চিম রণাঙ্গনেই সীমাবদ্ধ ছিল। পূর্ব পাকিস্তান সরাসরি খুব একটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। তবে এই যুদ্ধ—বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক প্রস্তুতির নিদারুণ অভাব—প্রদেশটির চরম অরক্ষিত দশাকে প্রকট করে তোলে। সর্বোপরি প্রায় হাজার মাইলের ভারতীয় ভূখণ্ড দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন এই পূর্বাঞ্চলে দ্রুত সামরিক সহায়তা পাঠানো যে বাস্তবে স্রেফ এক অলীক কল্পনা, তা স্পষ্ট হয়ে যায়।
অর্থনৈতিক বৈষম্যের যন্ত্রণায় আগে থেকেই ধুঁকতে থাকা বাঙালিদের মনে এই ঘটনা চরম অবহেলার অনুভূতিকে আরও তীব্র করে তোলে। তাদের মনে এই বিশ্বাস আরও বদ্ধমূল হয় যে চরম সংকটের মুহূর্তে রাষ্ট্র যদি তার পূর্বাংশকে রক্ষাই করতে না পারে, তবে টিকে থাকার স্বার্থেই প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন ও আত্মনির্ভরশীলতার কোনো বিকল্প নেই। যদিও ভারত ১৯৬৫ সালে পূর্ব সীমান্তে সর্বাত্মক কোনো আক্রমণ চালায়নি, তবু পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ এই যুদ্ধকে একটি চূড়ান্ত সতর্কবার্তা হিসেবেই নিয়েছিল। তারা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল যে তাদের অস্তিত্বের নিরাপত্তা সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক স্বার্থ দ্বারা চালিত বহুদূরের একটি প্রদেশের খেয়ালখুশির ওপর নির্ভরশীল। ‘পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা পশ্চিম পাকিস্তানের হাতেই নিহিত’, এই বহুল প্রচলিত তত্ত্বটি তখন কোনো সুচিন্তিত সামরিক কৌশলের বদলে নিছক এক ভাঁওতাবাজি হিসেবেই প্রমাণিত হয়।
এমনকি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠজনেরাও বাঙালিদের এই তীব্র ক্ষোভ ও অনুভূতির গভীরতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। বাঙালি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ গোলাম ওয়াহেদ চৌধুরী—যিনি আইয়ুব খানের উত্তরসূরি জেনারেল ইয়াহিয়া খানের মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করেছিলেন—লিখেছেন:
‘একটি বদ্ধমূল মিথ বা অলীক ধারণা প্রচলিত ছিল যে ভারত যদি পূর্ব পাকিস্তানে আক্রমণ চালায়, তবে পশ্চিম পাকিস্তানি সেনারা মার্চ করে সোজা দিল্লি চলে যাবে। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধ সেই মিথকে চিরতরে গুঁড়িয়ে দেয়। আইয়ুব খানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব ভুট্টো জাতীয় পরিষদে অত্যন্ত দম্ভভরে দাবি করেছিলেন যে চীনের কারণেই নাকি পূর্ব পাকিস্তান রক্ষা পেয়েছে। বাঙালিরা তখন পাল্টা যুক্তি জুড়ে দিল—কথাটা যদি সত্যই হয়, তবে আমরা নিজেরাই কেন আমাদের কূটনৈতিক ও বৈদেশিক সম্পর্ক নির্ধারণ করব না? যে পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানকে কোনো সুরক্ষাই দিতে পারে না, তার ওপর কেন আমাদের নির্ভর করতে হবে? যুদ্ধ শুরুর এক ঘণ্টার মধ্যেই পূর্ব পাকিস্তান কেবল পশ্চিম পাকিস্তান থেকেই নয়, গোটা বিশ্ব থেকেই সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল’ (চৌধুরী ১৯৯৪: ৮)।
এর ফলে কোনো না কোনো কাঠামোর অধীনে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি আরও বেগবান হয়ে ওঠে। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধ প্রতিনিধিত্ব ও আঞ্চলিক বৈষম্য নিয়ে জমে থাকা পুরোনো ক্ষোভের সঙ্গে যোগ করে চরম নিরাপত্তাহীনতার এক নতুন মাত্রা। পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষার জন্য যে নিজস্ব সক্ষমতা থাকা জরুরি, সেই উপলব্ধি ক্রমেই তীব্রতর হতে থাকে।
এর ঠিক পাঁচ মাস পর ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি, পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লাহোরে সমবেত রাজনীতিকদের এক সমাবেশের সামনে দাঁড়িয়ে শেখ মুজিবুর রহমান পেশ করেন তাঁর সেই ঐতিহাসিক ‘ছয় দফা’।
ছয় দফা
‘ছয় দফা’ কর্মসূচিতে মূলত পাকিস্তানের জন্য একটি নতুন সাংবিধানিক কাঠামোর প্রস্তাব করা হয়েছিল। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের আলোকে একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় বা ফেডারেল ব্যবস্থা এবং সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সরাসরি নির্বাচিত আইনসভাসহ একটি সংসদীয় সরকার গঠনের ওপর এতে জোর দেওয়া হয়। এতে প্রস্তাব করা হয় যে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা কেবল দেশরক্ষা ও পররাষ্ট্র—এই দুটি বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে এবং বাকি সব ক্ষমতা থাকবে প্রদেশ বা অঙ্গরাজ্যগুলোর হাতে। এ ছাড়া দুটি পৃথক মুদ্রা, অথবা পুঁজি পাচার রোধের কার্যকর ব্যবস্থাসহ একটি অভিন্ন মুদ্রার কথাও বলা হয়েছিল। এর পাশাপাশি পূর্ব পাকিস্তানের জন্য স্বতন্ত্র আর্থিক নীতি এবং একটি পৃথক রিজার্ভ ব্যাংকের দাবিও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। কর ও শুল্ক আদায়ের ক্ষমতা থাকবে অঙ্গরাজ্যগুলোর হাতে এবং দুই অংশের বৈদেশিক মুদ্রার আয় আলাদাভাবে হিসাব রাখা হবে। আরও দাবি করা হয় যে পূর্ব পাকিস্তানের নিজস্ব সামরিক বা আধা সামরিক বাহিনী থাকবে এবং নৌবাহিনীর সদর দপ্তর এই প্রদেশেই স্থাপন করতে হবে।
ছয় দফার প্রকৃত রচয়িতা কে বা কারা ছিলেন, তা আজও স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা যায়নি। বৈষম্য এবং ‘দুই অর্থনীতি’ তত্ত্বকে কেন্দ্র করে যে চিন্তাভাবনা, বিতর্ক ও আলোচনার ধারা গড়ে উঠেছিল, তা নিঃসন্দেহে ছয় দফার ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তবে তৎকালীন শীর্ষস্থানীয় বাঙালি অর্থনীতিবিদদের—যেমন এম এন হুদা, নুরুল ইসলাম বা রেহমান সোবহান—কেউই ছয় দফার প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন না, তা আমরা জানি। নুরুল ইসলাম লিখেছেন:
‘ছয় দফা কর্মসূচির খসড়ার সঠিক রচয়িতা কে ছিলেন, আমি তা জানি না। যারা বিষয়টি জানতেন—বিশেষ করে তাজউদ্দীন—তাদের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়ার কথা আমার মনে কখনো আসেনি। প্রচলিত ধারণা ছিল যে শেখ মুজিব প্রধান বিষয়গুলো তুলে ধরেন এবং তাজউদ্দীনকে সেগুলো “বিভিন্ন দফা” আকারে সুসংগঠিতভাবে লিখে দিতে অনুরোধ করেন। পরে জানা যায় যে এগুলো ইংরেজিতে রূপ দিয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের একজন জ্যেষ্ঠ সরকারি আমলা, যিনি শেখ মুজিবের ঘনিষ্ঠ ছিলেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার একজন আসামি ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সরকারের মহাসচিব হন’ (নুরুল ইসলাম যার কথা বলছেন, তিনি রুহুল কুদ্দুস) (ইসলাম ২০০৩: ৮৫)।
ছয় দফা হঠাৎ করে শূন্য থেকে গজিয়ে ওঠেনি। এই প্রবন্ধে যেমনটি দেখানো হয়েছে, ১৯৬৬ সালে লাহোরে ঘোষিত এই ছয় দফা ছিল মূলত দীর্ঘ আড়াই দশকের এক যাত্রার চূড়ান্ত পরিণতি, যার শুরুটা হয়েছিল ১৯৪০ সালে ঠিক এই শহরেই, লাহোর প্রস্তাব গ্রহণের মধ্য দিয়ে। তবে ১৯৪০ সালের সেই সম্মেলনে লাহোর প্রস্তাবটি বিপুল উৎসাহের সঙ্গে গৃহীত হলেও, পশ্চিম পাকিস্তানিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ভরা ১৯৬৬ সালের সমাবেশে ছয় দফা তেমন কোনো উষ্ণ অভ্যর্থনা পায়নি। তারপরও এটি হয়ে উঠেছিল আপামর বাঙালির মুক্তির এক অমোঘ ডাক। এর কারণ হলো, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না; বরং বহু মাইলফলক অতিক্রম করে দীর্ঘ পথচলার এক পরিণতি হিসেবে এটি আত্মপ্রকাশ করেছিল।
পাকিস্তানের সূচনালগ্নেই বাঙালিরা অন্তত দুটি কারণে সাংঘাতিকভাবে আশাহত হয়েছিল। প্রথমত, রাষ্ট্রভাষা হিসেবে একমাত্র উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর প্রচেষ্টা বাঙালিদের ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক স্বায়ত্তশাসনের ধারণার বিরুদ্ধে গিয়েছিল—যে ধারণা তাদের রাজনৈতিক চেতনা ও পাকিস্তান সম্পর্কে কল্পনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। দ্বিতীয়ত, ক্রমেই বাড়তে থাকা অর্থনৈতিক বৈষম্য সেই শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্নের গালে সজোরে চপেটাঘাত করেছিল, যেখানে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল।
আমরা আগেই দেখেছি, অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রথম দিকের প্রতিক্রিয়াগুলো মূলত সম্পদের ন্যায্য হিস্যা আদায়ের দাবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এর পেছনে সব সময়ই স্বায়ত্তশাসনের ধারণাটি প্রচ্ছন্ন ছিল। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার ১৯ নম্বর দফায় আমরা এর সুস্পষ্ট প্রকাশ দেখেছি। ১৯৫৬ সালের ‘দুই অর্থনীতি’ তত্ত্ব, যা বৈষম্যের সমস্যাগুলো তুলে ধরতে একটি অত্যন্ত জোরালো বিশ্লেষণাত্মক কাঠামো দাঁড় করিয়েছিল, তা–ও পরোক্ষভাবে এই স্বায়ত্তশাসনের দিকেই ইঙ্গিত করেছিল। সবশেষে ১৯৬১ সালে বাঙালি অর্থনীতিবিদেরা যখন আইয়ুব খানের কাছে স্মারকলিপি জমা দেন, তখন তাঁরা শুধু সম্পদের সুষম বণ্টনের একটি সূত্রই তুলে ধরেননি; বরং এর বিকল্প হিসেবে প্রদেশগুলোকে নিজেদের অর্থনৈতিক কৌশল ও নীতি প্রণয়নের জন্য পর্যাপ্ত স্বায়ত্তশাসন দেওয়ারও জোরালো সুপারিশ করেছিলেন। আগেই আলোচনা করা হয়েছে যে বাঙালি অর্থনীতিবিদদের এই সরব উপস্থিতি অর্থনৈতিক বঞ্চনার যুক্তিগুলোকে রাজনীতিক, সাংবাদিক এবং সমাজের অন্য প্রভাবশালীদের কাছে পৌঁছে দিতে সাহায্য করেছিল এবং স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে এক দুর্ভেদ্য জনমত তৈরি করেছিল।
আইয়ুব খানের লোকদেখানো উদ্যোগগুলোর ব্যর্থতাই ছিল এই প্রক্রিয়ার শেষ পেরেক। বাঙালি নেতারা পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিলেন যে পাকিস্তানের সাংবিধানিক কাঠামোর খোলনলচে না বদলালে কোনোভাবেই অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার আদায় করা সম্ভব নয়। ঠিক এই সন্ধিক্ষণেই ছয় দফার আবির্ভাব ঘটে—কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী ডাক হিসেবে নয়, বরং পূর্ব বাংলার জন্য পাকিস্তান রাষ্ট্রটিকে টিকে থাকার উপযোগী করতে ন্যূনতম যে সাংবিধানিক কাঠামোটি প্রয়োজন, ঠিক সেই হিসেবেই। আর্থিক স্বায়ত্তশাসন, বৈদেশিক মুদ্রার পৃথক হিসাব এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা সীমিত করার দাবির মধ্য দিয়ে ছয় দফা মূলত কয়েক দশকের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ এবং রাজনৈতিক হতাশাগুলোকে একটি সুসংহত সাংবিধানিক কর্মসূচিতে রূপ দিয়েছিল।
ছয় দফা কর্মসূচি কি তাহলে ছদ্মবেশে স্বাধীনতারই আন্দোলন ছিল? ঐতিহাসিকেরা হয়তো এই বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক করতে পারেন। ওপরের অনুচ্ছেদে যে দৃষ্টিভঙ্গিটি তুলে ধরা হয়েছে, তা থেকে মনে হতে পারে ছয় দফা আসলে পাকিস্তানের সঙ্গে কোনো বিশ্বাসঘাতকতা ছিল না, বরং এটি ছিল পাকিস্তান সৃষ্টির মূল চেতনাকে পুনরুদ্ধার করার একটি মরিয়া চেষ্টা। অন্যভাবে বললে, বাঙালিদের কাছে স্বায়ত্তশাসন কোনো নতুন আবিষ্কার ছিল না, বরং পাকিস্তান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতির ভেতরেই এই প্রত্যাশার বীজ বোনা ছিল।
উপসংহার
এই প্রবন্ধে এমন বেশ কিছু ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, যা ছয় দফা উত্থাপনের পেছনের পটভূমি তৈরি করেছিল। এই আলোচনা থেকে এটিই প্রতীয়মান হয় যে ছয় দফা কোনো আকস্মিক, চরমপন্থী বা বৈপ্লবিক বিস্ফোরণ ছিল না; বরং এটি ছিল বছরের পর বছর ধরে চলা এক হতাশাজনক যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার চূড়ান্ত পরিণতি। গভীর ঐতিহাসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়া এই কর্মসূচির রূপরেখা তৈরি করেছিল। ‘বিনা মেঘে বজ্রপাতের’ মতো হঠাৎ করে উদয় হওয়া তো দূরের কথা, ছয় দফাকে বরং রাজনৈতিক কল্পনা, অর্থনৈতিক বাস্তবতার ব্যবচ্ছেদ এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের কাঠামোর ভেতরে মানিয়ে নেওয়ার সব ধরনের ব্যর্থ চেষ্টার এক পুঞ্জীভূত ফলাফল হিসেবেই দেখা যেতে পারে।
প্রতিটি পদক্ষেপে বাঙালিরা দেখেছিল আপসের পথগুলো কীভাবে ক্রমেই সরু হয়ে আসছে। তথ্য-উপাত্ত ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরতে তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং এই সমস্যা সমাধানের পথ বাতলে দেওয়ার অসীম ধৈর্যের প্রয়াস—সবকিছুই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চরম উপেক্ষার শিকার হয়েছিল। তাই এ কথা বলাই যায় যে পাকিস্তানের বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর ওপর থেকে বাঙালিদের বিশ্বাস পুরোপুরি উঠে যাওয়ারই চূড়ান্ত স্মারক ছিল এই ছয় দফা।
এর বিপরীতে আরেকটি যুক্তি এমন হতে পারে যে ছয় দফার আমূল পরিবর্তনকামী চরিত্র একে কার্যত স্বাধীনতার দাবিরই সমার্থক করে তুলেছিল। অর্থনীতিবিদ নুরুল ইসলাম ছয় দফার ব্যবচ্ছেদ এবং এর অন্তর্নিহিত অর্থ নিয়ে বিস্তর লেখালেখি করেছেন। ১৯৬৯ সালে শেখ মুজিব আইনজীবী কামাল হোসেন, অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান এবং আরও কয়েকজনের সঙ্গে নুরুল ইসলামকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, যাতে তাঁরা ছয় দফার বিস্তারিত প্রয়োগ ও প্রভাব নিয়ে কাজ করেন। অর্থনৈতিক নীতির খুঁটিনাটি বিষয়গুলো নিয়ে গঠিত এই ছয় দফাকে যখন নুরুল ইসলাম গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেন, তখন তাঁর কাছে এটি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে ছয় দফা কর্মসূচি আসলে একটি অত্যন্ত শিথিল কনফেডারেশন বা রাষ্ট্রসমবায় গঠনেরই রূপরেখা, যার ভিত্তি পুরোপুরি প্রদেশগুলোর সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। অধ্যাপক ইসলাম লিখেছেন:
‘ছয় দফা কর্মসূচিতে আমরা মূলত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের অত্যন্ত শিথিল একটি রূপরেখাই খুঁজছিলাম। আমরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলোর একটি কনফেডারেশন বা রাষ্ট্রসমবায়ের কথা ভেবেছিলাম, যেখানে দেশরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতির মতো কেবল কিছু সাধারণ বিষয় যৌথভাবে পরিচালিত হবে এবং প্রতিটি রাষ্ট্রের আর্থিক অবদানের ভিত্তিতে এর ব্যয় নির্বাহ হবে। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে এটি ছিল এক অনন্য এবং অভিনব পরীক্ষা’ (ইসলাম ২০০৩: ৯৩)।
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ সরকারের ‘ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যানেও’ ঠিক এমন একটি শিথিল কনফেডারেশনের রূপরেখাই দেওয়া হয়েছিল, যা ছিল ভারতের ‘প্রদেশগুলোর বিভিন্ন গ্রুপের’ মধ্যে। মুসলমানদের জন্য পৃথক আবাসভূমির বিষয়ে মুসলিম লীগের দাবি এবং অখণ্ড ভারত টিকিয়ে রাখার আকাঙ্ক্ষা—এই দুইয়ের মধ্যে একটি আপস হিসেবেই এটিকে দেখা হয়েছিল। ক্যাবিনেট মিশনের সদস্যদের চোখে এর সমাধান ছিল ভারতের প্রদেশগুলোর ‘তিনটি গ্রুপ’ (প্রধানত হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশসমূহ, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশসমূহ এবং পূর্বাঞ্চল (বঙ্গ ও আসাম)) নিয়ে একটি শিথিল রাজনৈতিক জোট গঠন করা, যেখানে কেবল দেশরক্ষা ও পররাষ্ট্রবিষয়ক দায়িত্বগুলো থাকবে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে।
আমরা এটাও লক্ষ করতে পারি যে ১৯৬০-এর দশকের শুরুর দিকে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণার ধারণা নিয়ে কিছু গোপন তৎপরতা চলছিল (আহমদ ২০২১)। শেখ মুজিবুর রহমান নিজেও যে মনে এমন চিন্তাভাবনা পোষণ করতেন, তার কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তাঁর জীবনীকার এস এ করিম আমাদের জানান যে স্বাধীনতা ঘোষণা করলে ভারতের সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু, তা যাচাই করতে ১৯৬১ সালের দিকে মুজিব ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করেছিলেন। এস এ করিম এ-ও লিখেছেন যে ১৯৬১ সালের শরৎকালে কমিউনিস্ট নেতা মণি সিংহ ও খোকা রায়ের সঙ্গে ধারাবাহিক কয়েকটি বৈঠকের মাধ্যমে মুজিব পরিস্থিতি আঁচ করার চেষ্টা করেছিলেন। এই নেতারা তাঁকে সতর্কতার সঙ্গে এগোনোর পরামর্শ দেন; তাঁরা যুক্তি দেখান যে ওই মুহূর্তে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়াটা হবে বড্ড অপরিণত সিদ্ধান্ত। করিম লিখেছেন:
‘মুজিব মূলত কমিউনিস্টদেরকে নিজের চিন্তাভাবনার প্রতিধ্বনি যাচাইয়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছিলেন। তাঁর প্রস্তাবে তাঁদের এই সতর্ক প্রতিক্রিয়ায় মুজিব মোটেও অবাক হননি। তবে অন্তত এই বিষয়ে তাঁর বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়েছিল যে স্বাধীনতার এই অন্বেষণে তিনি একা নন। কমিউনিস্ট নেতাদের সঙ্গে আলোচনা সম্ভবত তাঁকে এ কথা বুঝতে সাহায্য করেছিল যে তাঁর চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে আরও সময় লাগবে এবং তাঁকে ধাপে ধাপে এগোতে হবে। সামনের মাসগুলোতে তিনি এই বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করেন’ (করিম ২০০৫: ১০০)।
ছয় দফা কি ছদ্মবেশে স্বাধীনতারই কোনো কর্মসূচি ছিল, নাকি পাকিস্তানের মূল চেতনায় ফিরে যাওয়ার একটি মরিয়া প্রচেষ্টা মাত্র—এই প্রশ্নের চূড়ান্ত মীমাংসা করতে আরও গভীর ঐতিহাসিক গবেষণার প্রয়োজন, যা এই প্রবন্ধের আওতাভুক্ত নয়। তবে যা–ই হোক না কেন, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চরম একগুঁয়েমির কারণে ছয় দফায় যে শাসনতান্ত্রিক পরীক্ষার আহ্বান জানানো হয়েছিল, তা আর কখনোই আলোর মুখ দেখেনি। এভাবেই, ক্ষমতার আমূল বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে পাকিস্তানকে বাঁচানোর হয়তো শেষ ও সবচেয়ে আন্তরিক চেষ্টাটিও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়, আর তার চিতাভস্ম থেকেই প্রশস্ত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পথ।
প্রান্তটীকা
[১] খসড়া পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বিষয়ে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদদের বিশেষ সম্মেলনের প্রতিবেদন।
রচনাপঞ্জি
ইসলাম ২০০৩।। Nurul Islam, Making of a Nation Bangladesh: An Economist’s Tale, Dhaka: The University Press Limited।
ইসলাম ২০১৪।। Nurul Islam, ‘The Two Economies thesis: Road to the Six Points Programme’, The Daily Star, June 21, 2014।
করিম ২০০৫।। S. A. Karim, Sheikh Mujib: Triumph and Tragedy, Dhaka: The University Press Limited।
কামরুদ্দীন ২০১৮।। কামরুদ্দীন আহমদ, বাংলার এক মধ্যবিত্তের আত্মকাহিনী, ঢাকা: প্রথমা প্রকাশন।
কুয়াজিমা ২০১৫।। Sho Kuwajima, Muslims, Nation and the World: Life and Thought of Abul Hashim, leader of the Bengal Muslim League, New Delhi: LG Publishers Distributors।
চৌধুরী ১৯৯৪।। G. W. Chowdhury, The Last days of United Pakistan, Dhaka: The University Press Limited।
বোস ২০১৪।। Neilesh Bose, ‘Purba Pakistan Zindabad: Bengali Visions of Pakistan, 1940–1947’, Modern Asian Studies, Vol. 48, No. 1, January 2014, pp. 1-36।
মনসুর ২০১৭ ।। আবুল মনসুর আহমদ, আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, ঢাকা: প্রথমা প্রকাশন।
মহিউদ্দিন ২০২১।। মহিউদ্দিন আহমদ, প্রতিনায়ক: সিরাজুল আলম খান—নিউক্লিয়াস, মুজিব বাহিনী, জাসদ, ঢাকা: প্রথমা প্রকাশন।
সোবহান ২০২৪।। Rehman Sobhan, Untranquil Recollections: The Years of Fulfillment, Dhaka: The University Press Limited।
হুদা ২০২১।। Mirza Nurul Huda, My Seven Decades Journey through British India, Pakistan and Bangladesh, Dhaka: The University Press Limited।
লেখক পরিচিতি
অর্থনীতিবিদ সৈয়দ আখতার মাহমুদ প্রায় তিন দশক কাজ করেছেন বিশ্বব্যাংকে নানা বিষয়ে—অর্থনৈতিক নীতি, দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ ও সমস্যা, বাজার অর্থনীতি ও নীতি-সংস্কারের গতিপ্রকৃতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা ও একসময় শিক্ষকতা করেছেন। তিনি ১৯৮৯ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে ডিফিল ডিগ্রি অর্জন করেন; তারপর ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং ফেলো হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ইতিহাস নিয়ে তাঁর আগ্রহ আছে। তিনি বিশ্বাস করেন অর্থনীতি, রাজনীতি কিংবা সমাজকে বুঝতে হলে, ও ভবিষ্যতের দিক নির্দেশ ঠিক করতে হলে, আমাদের ইতিহাসের দিকে তাকাতেই হবে। তাঁর প্রকাশনাগুলোর মধ্যে রয়েছে The Political Economy of Development Policy Change (গুস্তাভ রানিসের সহ-লেখকত্বে) ও Privilege-Resistant Policy Making in the Middle East (মেরিয়েম আইত আলী স্লিমানের সহ-লেখকত্বে)। তাঁর বিভিন্ন লেখায় তিনি উদ্যোক্তা কার্যক্রম, বাজারের বিকাশ এবং নীতিনির্ধারণী গতিশীলতার পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন।
সম্পাদকীয় নোট: এই লেখায় ব্যবহৃত বিভিন্ন ঐতিহাসিক ছবির মান কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে উন্নত করা হয়েছে।