মাহমুদ মামদানির ‘চিরস্থায়ী সংখ্যালঘু’ ও জাতিরাষ্ট্রের অভিশাপ

Neither Settler nor Native: The Making and Unmaking of Permanent Minorities (2020)।

শুকিয়ে যাওয়া ক্ষতগুলো চিরস্থায়ী কিছু দাগ রেখে যায় শরীরে। ঠিক যেমন স্কুলজীবনে কাঠের বেঞ্চে স্টিলের স্কেল দিয়ে কাটা আঁচড়গুলো শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন শেষ হয়ে যাওয়ার পরও দগদগে অতীত হিসেবে মুখব্যাদান করে টিকে থাকে। বিশ্বসভ্যতা, সংস্কৃতি ও মানবতার প্রশ্নে উপনিবেশ অনেকটা শরীরের ক্ষত কিংবা বেঞ্চে কাটা আঁচড়ের মতো। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের তীব্রতা, বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব ও ইউরোপের নানা দেশের সামরিক দুর্বলতার কারণে কাগজে–কলমে ইতিহাসের পাতায় বর্ণিত উপনিবেশকাল শেষ হয়েছে। তবে বাস্তবতার নিরিখে দেখতে গেলে, পরিস্থিতি অনেকটা রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের মতো, অর্থাৎ ‘শেষ হয়ে হইল না শেষ’।

উপনিবেশবাদও বিভিন্ন ধাপ পার হয়ে আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের মধ্যে পরিণতি পেয়েছে। তবে উপনিবেশবাদের ইতিহাসচর্চায় জাতিরাষ্ট্রকে উপনিবেশের পরবর্তী ধাপ হিসেবে দেখার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছেন মাহমুদ মামদানি। তিনি দেখাচ্ছেন, এই দুটি রাজনৈতিক মডেলকে আগে-পরে দিয়ে বোঝা যাবে না। বরং তারা একই সময়ে রূপ লাভ করেছে এবং একটি অপরটিকে গড়ে দিয়েছে। এই মডেল হলো সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ। মাহমুদ মামদানি একেই বলছেন রাজনৈতিক আধুনিকতার আদি পাপ।

বিশ্বের নানা স্থানে চলমান জাতিগত সংঘাত ও জাতিবিদ্বেষের বাস্তবতায় এডওয়ার্ড সাঈদ উত্তরকালে নির্যাতিতের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত উগান্ডার তাত্ত্বিক মাহমুদ মামদানি (১৯৪৩-)। উগান্ডার ইদি আমিনের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের কর্মী, দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের সহযাত্রী এবং উপনিবেশিবাদবিরোধী তাত্ত্বিক হিসেবে মামদানি সেই সারিতে অবস্থান করেন, যেখানে ছিলেন আলজেরিয়ার ফ্রাঞ্জ ফানো, ফিলিস্তিনের এডওয়ার্ড সাঈদ, পাকিস্তানের একবাল আহমদ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনস্টিটিউট অব আফ্রিকান স্টাডিজের পরিচালক, উগান্ডার কাম্পালা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। উগান্ডার সমাজবিজ্ঞান গবেষণার প্রথম প্রতিষ্ঠানটি তাঁরই হাতে গড়া। বিভিন্ন সময়ে তিনি দেশটি থেকে বহিষ্কৃতও হয়েছেন। আবার গণতান্ত্রিক শাসনে ফিরে গেছেন জন্মভূমিতে। মামদানি বক্তৃতা, বিবৃতি ও বিতর্কে যেমন সরব, তেমনি ১৩টি মৌলিক গ্রন্থ ও সম্পাদিত প্রকাশনায় তিনি উপনিবেশোত্তর অধ্যয়নের বিদ্যাজগতেও এক উজ্জ্বল নাম। তাঁর আলোচিত বইগুলোর মধ্যে রয়েছে The Myth of Population Control: Family, Class and Caste in an Indian Village (1972), Good Muslim, Bad Muslim: America, the Cold War and the Roots of Terror (2004), Define and Rule: Native as Political Identity (The W.E.B. DuBois Lectures) (2012) এবং সর্বশেষ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস থেকে প্রকাশিত Neither Settler nor Native: The Making and Unmaking of Permanent Minorities (2020)। শেষ বইটিতে তিনি জাতিরাষ্ট্র গঠনের আদর্শ ও তার ইতিহাস এবং উপনিবেশবাদ ও দখলদার প্রশ্নে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ যুক্তিতর্ক উত্থাপন করেছেন। আধুনিক রাজনীতি, নাগরিকত্ব, সার্বভৌমত্ব, মানবাধিকার ইত্যাকার প্রশ্নে তাঁর গবেষণালব্ধ অন্তর্দৃষ্টি বর্তমানকালের রাজনৈতিক জটিলতা ও মানবিক দুরবস্থা বুঝতে সাহায্য করতে পারে।

১.

প্রচলিত ইতিহাসে আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের সূচনা ধরা হয় ইউরোপের ১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তিকে। ৩০ বছরের যুদ্ধের মধ্য দিয়ে রোমান সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়ে তার জায়গা নেয় তিনটি ইউরোপীয় সাম্রাজ্য। এরা নিজেদের মধ্যে এই চুক্তি করে যুদ্ধের অবসান ঘটায় যে পরস্পর পরস্পরের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলাবে না এবং ইউরোপজুড়ে সংখ্যালঘু ধর্মমতকে ততক্ষণ পর্যন্ত নিজ নিজ ধর্মচর্চা করতে দেবে, যতক্ষণ না তারা সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক বিষয়ে কথা বলবে। তবে এই অপর ধর্মমত বলতে খ্রিষ্টধর্মের ভেতরের তিনটি সম্প্রদায়কে বোঝানো হয়—ক্যাথলিক, লুথেরান ও ক্যালভিনিস্ট। প্রটেস্ট্যান্ট সাম্রাজ্যে এরা হয়ে পড়ে জাতীয় সংখ্যালঘু। জাতীয় সংখ্যালঘুর কোনো সার্বভৌম অধিকার থাকবে না। বলা বাহুল্য, সংখ্যালঘুর মর্যাদার মধ্যে ইহুদি, মুসলিম বা রোমা জনগোষ্ঠীকে ধরা হয় না। এভাবে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও ধর্মীয় সহনশীলতাকে আধুনিক রাষ্ট্রের মূল দুই সূত্র হিসেবে নেওয়া হয়। মামদানি বলছেন, ১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তি আসলে আরও আগের আরেকটি যুগান্তকারী চুক্তিরই উত্তরাধিকারী। তৎকালীন আইবেরিয়া তথা আধুনিক স্পেনের কাস্টাইল ও আরাগঁ রাজ্যের দুই রাজন্য রানি ইসাবেলা ও রাজা ফার্দিনান্দ আন্দালুসিয়ার দ্বিতীয় উমাইয়া খেলাফত উচ্ছেদ করার পর মুসলমান ও ইহুদিদের ওপর গণহত্যা চালান, বাকিদের বিতাড়ন করেন। এটাই জাতিরাষ্ট্র গঠনের পথে জাতিগত শুদ্ধি বা এথনিক ক্লিনজিং, যার চরিত্র হলো গণহত্যা। গণহত্যার পরও থেকে যাওয়া অখ্রিষ্টানদের বাধ্যতামূলক ধর্মান্তরের ‘সুযোগ’ দেন। ১৪৯২ সালে আলহামরা ডিক্রি জারি করে ঘোষণা করা হয় ‘এক দেশ, এক ধর্ম, এক রাজ্য’। এই ডিক্রির মাধ্যমে নতুন স্পেনীয় জাতি গঠন শুরু হয়। তখন দেখা গেল, রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে কিন্তু জাতির বদলে পাওয়া যাচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়। ‍সুতরাং জাতি গঠন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয় ওই এক দেশ এক ধর্ম কায়েম করার মাধ্যমে। ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভাষার চিহ্ন মুছে ফেলা হয়। এর মাধ্যমে শুদ্ধ জাতি গঠনের চেষ্টা হয়। শুদ্ধ জাতির সদস্যরাই কেবল ‘সার্বভৌম’। তারপরও যারা জাতির সংজ্ঞার বাইরে রয়ে যায়, তারা হয়ে পড়ে ‘পার্মানেন্ট মাইনরিটি’ বা ‘স্থায়ী সংখ্যালঘু’। ১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তির নতুনত্ব হলো এই সংখ্যালঘুদের সহ্যকরণ।

সংখ্যালঘুকরণ করতে হলে আগে সংখ্যাগরিষ্ঠ বানাতে হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠদের এক সম্প্রদায়ের হতে হবে, বিধায় পাল্টা সংখ্যাগরিষ্ঠ হতে চাওয়াদের সেই রাষ্ট্রের সীমানার বাইরে ফেলে দেওয়া হয়। তারপরও যারা রয়ে যায়, তারাই হলো ‘স্থায়ী সংখ্যালঘু’। ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তিতে সংখ্যালঘুদের নাগরিক অধিকার ছিল না। কেবল নিজস্ব পরিমণ্ডলে ধর্মপালনের অধিকার ছিল।

যে বছরে আইবেরীয় চুক্তি হয়, সেই ১৪৯২ সালে কলম্বাস আমেরিকা মহাদেশে পা রাখেন। ইউরোপের প্রথম উপনিবেশে চলে প্রথম ইউরোপীয় জাতিরাষ্ট্র গঠন কর্মসূচির অনুকরণ। এখানেও গণহত্যার মাধ্যমে ‘সেটলার’রা নেশন গঠন করে। বেঁচে যাওয়া আদিবাসীদের ছোট্ট জায়গায় আটকে রেখে তৈরি করা হয় জাতীয় সংখ্যালঘু। কিন্তু ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তিতে সংখ্যালঘুর যে অধিকার দেওয়া হয়, সেটা উপনিবেশে দেওয়া হয় না। এই উপনিবেশকরণকে ইউরোপের ‘সিভিলাইজিং মিশন’ বলে কর্তব্যের মর্যাদা দেওয়া হয়; দার্শনিক, আইনবিদ, ধর্মবেত্তারা এর বৈধতা দেন।

এডওয়ার্ড সাঈদ উত্তরকালে নির্যাতিতের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত উগান্ডার তাত্ত্বিক মাহমুদ মামদানি (১৯৪৩-)। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনস্টিটিউট অব আফ্রিকান স্টাডিজের পরিচালক, উগান্ডার কাম্পালা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।

মামদানি জাতিরাষ্ট্রের উত্থান পর্ব থেকে স্থানীয় (Native) আর বহিরাগত প্রশ্নের বিভিন্ন অভিমুখ পর্যালোচনা করেছেন। স্থানীয় ও বহিরাগত প্রশ্নে স্পেনের এই ধরনের মতবাদ আবার উল্টে যায় বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা তাদের উপনিবেশগুলোতে। একই কাস্টিলিয়ান রাজতন্ত্রের ধ্বজাধারীরা যখন আমেরিকা কিংবা আফ্রিকার নানা স্থানে উপনিবেশ স্থাপন করেছিল, সেখানেও তারা চেয়েছিল একক জাতিসত্তার দাপট। ফলে আদিবাসী আফ্রিকান কিংবা আমেরিকানদের তারা গণহত্যার মাধ্যমে জাতিগতভাবে নির্মূল করার প্রচেষ্টা চালায়। একই সঙ্গে বিভিন্ন আদিবাসী গ্রামে আক্রমণ করে তাদের পুরুষদের হত্যা করা হয়। গণধর্ষণের শিকার হন আদিবাসী নারীরা। কারণ, এর মাধ্যমে স্প্যানিশ উপনিবেশ প্রতিষ্ঠাকারীরা মনে করেছিল, আফ্রিকা কিংবা আমেরিকার স্থানীয় অধিবাসীদের ওপর জাতিগতভাবে আধিপত্য বিস্তার করা সম্ভব হবে।

এখানে ইতিহাসবিদদের সঙ্গে মামদানির মতপার্থক্য উপনিবেশ বিস্তৃতির সময়কাল নিয়ে। মূলধারার ইতিহাস গবেষক যেখানে মনে করেন নির্দিষ্ট সময়কাল পরে উপনিবেশের পরিসমাপ্তি ঘটেছে, সেখানে মাহমুদ মামদানি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শাসনের প্রশ্ন তুলে দাবি করেছেন, উপনিবেশ এখনো ভিন্নভাবে টিকে আছে। তাঁর মতে, একটি সময় যেখানে সরাসরি উপনিবেশ ছিল, এখন পরোক্ষভাবে ওই অঞ্চল উপনিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারেনি। আবার জাতি গঠন প্রকল্পের মাধ্যমে তারা স্থানীয় এলিটদের সেই জায়গায় বসিয়েছে, যেখানে আগে ছিল ঔপনিবেশিক প্রভুরা। এভাবে জাতি গঠনের মাধ্যমে দেশের ভেতরেই কায়েম হয়েছে অভ্যন্তরীণ উপনিবেশ।

মামদানি মনে করেন, প্রত্যক্ষ উপনিবেশ উচ্ছেদের পর জাতীয়তাবাদী শক্তির ক্ষমতায় থাকা অনেক প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বিপন্ন করেছে। তারা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মুখে পড়ে নিজ নিজ সত্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পুরোপুরি ব্যর্থ। অনেক জাতিগোষ্ঠী নামমাত্র টিকে থাকলেও তাদের ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতি শাসনক্ষমতায় থাকা বৃহৎ জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে পুরোপুরি একীভূত হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ বহিঃশক্তির উপনিবেশ থেকে মুক্তি মিললেও উপনিবেশের আদলে পরিচালিত শাসনব্যবস্থা তাদের অজগরের বেষ্টনীর মতো জড়িয়ে ধরেছে। এভাবে আত্মপরিচয়ের সংকট আর সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য বিচারে তাদের জন্য নিশ্বাস আর নাভিশ্বাস হয়ে গেছে সমার্থক। এসব দেশ কেনো উত্তর ঔপনিবেশিক আধুনিকতার জন্য স্বজাতির রক্ত ঝরাচ্ছে, কীভাবে লাগাতার ভয়ের মধ্যে তাদের দিনাতিপাত করতে হয়; সে বিষয়ের আলোচনাটা এখন খুব জরুরি। আর জাতিগত নির্মূলকরণের স্থানীয় মডেল দাঙ্গা আর গৃহযুদ্ধ এসব দেশকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা সাংস্কৃতিক—প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিপর্যস্ত ও বিভক্ত করে রেখেছে। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে উপনিবেশ উচ্ছেদ হলে সেখানে সিন্দাবাদের ভূতের মতো চেপে বসতে দেখা গিয়েছে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী জনগোষ্ঠীর আধিপত্য।

মোদ্দাকথায় বললে ভিন্নধর্মী জনগণের যে কাউকে তাঁর পিতৃপ্রদত্ত প্রাণটা নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট জাতিরাষ্ট্রের ভৌগোলিক পরিসীমায় উপযুক্ত রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে টিকে থাকার পথ ছিল তিনটি: ক. ধর্মান্তর খ. অভিবাসন গ. মৃত্যু। কিন্তু যখন স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ান বা লাল জাতির মতো গণহত্যার মাধ্যমে সংখ্যালঘু করে দেওয়া যায় না, তখন কী করা হয়? মামদানি দেখাচ্ছেন, তখন তাদের মধ্যে চলে ‘ডিফাইন অ্যান্ড রুল’, অর্থাৎ শাসনের সুবিধার্থে আগে সংজ্ঞায়িত করো। রোমান সাম্রাজ্য উপনিবেশ চালাত ভাগ করো শাসন করো নীতির ভিত্তিতে। আধুনিক ইউরোপীয় সাম্রাজ্য চালায় ‘নাম দাও শাসন করো’ নীতি। আদতে ভাগ করার জন্য আগে তো নাম দিতে হয়। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভিন্নতা ও বৈচিত্র্যকে স্থায়ী শত্রুতামূলক পরিচয়ে সংজ্ঞায়িত করা হয়। আদমশুমারি, আইন, শিক্ষার মাধ্যমে প্রতিটি জনগোষ্ঠীকে আত্মসচেতন করে তোলা হয় অপর জনগোষ্ঠীর বিপক্ষে। এদেরকেই আবার ‘নেশন’ বা জাতি হয়ে ওঠার প্রেরণা দেওয়া হয়। এভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতি নির্মাণ করে সংখ্যালঘু বলে কাউকে দাগিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে বোনা হয় স্থায়ী শত্রুতার পরিচয়ের রাজনীতি। সংঘাতে বিপর্যস্ত আধুনিক বিশ্ব এই ইতিহাসের সাক্ষ্য দেয়।

ইতিহাসে জন্ম নেওয়া ঔপনিবেশিক সংকটের এই দীর্ঘ ফিরিস্তি মামদানি দেন দীর্ঘ ভূমিকায়। এখানে এসে তিনি ৪৩৬ পৃষ্ঠার দীর্ঘ বইটিকে ৫টি অধ্যায়ে ভাগ করে ফেলেন। ঔপনিবেশিক ঔরসে জন্ম নেওয়া স্বাধীন জাতিরাষ্ট্রের ভেতরে স্থায়ীভাবে সংখ্যালঘু হয়ে পড়া স্থানীয় অধিবাসীদের ‘সার্বভৌমত্ব’ যে রাজনৈতিক আধুনিকতা কেড়ে নিয়েছে বা নামমাত্র করে রেখেছে, সেসব জাতিরাষ্ট্রের গড়নের বিকৃতি তিনি একে একে দেখান। অধ্যায়গুলো হলো:

১. The Indian Question in the United States, ২. Nuremberg: The Failure of Denazification, ৩. Settlers and Natives in Apartheid South Africa, ৪. Sudan: Colonialism, Independence, and Secession, ৫. The Israel/Palestine Question. ষষ্ঠ অধ্যায়ে মামদানি আলোচনা করেন নতুন রাজনৈতিক সমাজ গঠনের শর্তগুলো। সেই শেষ অধ্যায়ের শিরোনাম, Decolonizing the Political Community (রাজনৈতিক সমাজের বি-উপনিবেশীকরণ)।

২.

আদতে দখলদার উপনিবেশিক শক্তির অংশ নন কিন্তু নিজ দেশে পরবাসী হয়ে থাকা কিছু মানুষের আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রশ্ন মামদানির কাছে বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল। তিনি আফ্রিকার বিভিন্ন স্বাধীন দেশে বাস করেও সার্বভৌমত্ব প্রশ্নের বাইরে থাকা মানুষগুলোকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। পাশাপাশি খেয়াল করে দেখেছেন মার্কিন মুলুকের আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ানদের। তিনি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করেন, যাদের ওপর গণহত্যা ও নিপীড়নের স্টিমরোলার চালিয়ে তাদের ভূখণ্ড দখলে নেওয়া হয়েছিল, তারা আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে দাসদের থেকেও বেশি নিগৃহীত, উপেক্ষিত ও বঞ্চিত।

সংকট প্রশ্নে শুধুই কি ইউরোপের ইহুদি আর মুসলিম কিংবা রেড ইন্ডিয়ান আর আফ্রিকান–আমেরিকান কালো মানুষের কথা বললে হবে। খেয়াল করলে দেখা যায়, চীনের উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায়, সম্প্রতি আরাকানের রোহিঙ্গা, কম্বোডিয়া এবং সোমালিয়ার কিছু আদিবাসী গোষ্ঠী—এরা কেউই এই উত্তর উপনিবেশকালের সংকট থেকে মুক্ত নয়। এমনকি ভারতে সম্প্রতি এনআরসির মাধ্যমে সৃষ্ট সংকট আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরাম, মণিপুর, মেঘালায়, অরুণাচল ও নাগাল্যান্ডে যে জাতিগত সংকট তৈরি করেছে, তা এ ক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য।

মামদানির তত্ত্বায়ন থেকে বিশ্লেষণ করলে ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে ইসরায়েলের ক্রম সম্প্রসারণবাদ, কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের ঠান্ডা লড়াই, আরাকানের রোহিঙ্গা গণহত্যা, চীনের উইঘুরে মুসলিম নির্মূল অভিযান—এগুলো একই সুতায় গাঁথা। এখানে শুরুতে নৃতাত্ত্বিক ও জাতিগত দিক থেকে আলাদাভাবে চিহ্নিত (Define and Rule) করা হয়ছে। তারপর ধীরে ধীরে সুপরিকল্পিতভাবে তাদের নির্মূল করা হয়েছে।

দক্ষিণ আফ্রিকার কথাই ধরা যাক, সাদা চামড়ার লোকের আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে শহর থেকে সব কালো মানুষকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। তারা শহর থেকে তাড়া খেয়ে অপেক্ষাকৃত গ্রাম এলাকা তথা বান্টুস্থানে গিয়ে আশ্রয় নেয়। ঠিক এভাবেই ব্রিটিশরা সুদানে আরব ও আফ্রিকান বলে দুটি আলাদা পরিচয় তৈরিতে মদদ দিয়ে তাদের মধ্যে গৃহযুদ্ধের রসদ তৈরি করে রেখেছিল। তাদের আলাদা জাতিসত্তা হিসেবে না দেখালে তো তা সম্ভব হতো না। একইভাবে ভারতবর্ষে হিন্দু ও মুসলিম পরিচয় নির্মাণে ভূমিকা রেখেছিল ব্রিটিশ আদমশুমারি, শিক্ষাব্যবস্থা, ইতিহাসলিখন এবং ভিন্ন ভিন্ন নির্বাচনব্যবস্থা।

সম্প্রতি ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে জায়নবাদী বসতি স্থাপনকারী দখলদারেরা আদিবাসী ফিলিস্তিনিদের তাদের বসতিস্থল থেকে তাড়িয়ে দিচ্ছে। আবার দখলদারির মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত ইসরায়েল রাষ্ট্রে একজন ফিলিস্তিনের জন্য ‘নাগরিক’ হয়ে ওঠা প্রায় অসম্ভব করে তোলা হয়েছে। অর্থাৎ ইসরায়েলি জাতি গঠন প্রকল্পে প্রথম ধাপে চলে নির্মূলকরণ ও শরণার্থীকরণ। পরের ধাপে চলতে থাকে স্থানীয়দের জমি দখলের মাধ্যমে তাদেরকে গাজা ও পশ্চিম তীর নামক বান্টুস্থানে আটকে ফেলা। যারা খোদ ইসরায়েলি রাষ্ট্রের ভেতর রয়ে গেল, তাদের জন্য বরাদ্দ সার্বভৗমত্বহীনতা। তারা কখনোই পূর্ণ নাগরিক অধিকার পাবে না। এভাবে সংখ্যালঘু ইহুদিদের ফিলিস্তিনি ভূমিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে ওঠার যাত্রায় চলে সেই আদি জাতিরাষ্ট্র গঠনের নকশারই বাস্তবায়ন, যা দেখা গিয়েছিল আন্দালুসিয়ায়, আমেরিকায়, জার্মানিতে।

বিশ্বের নানা স্থানে সংঘটিত এসব ঘটনাকে মামদানি চিহ্নিত করেছেন ‘নব্য নাজিবাদ’ হিসেবে। তিনি এর আশু প্রতিকারের পথ হিসেবে ন্যুরেমবার্গের আদলে একটি স্থায়ী ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। তাঁর হিসেবে এই ট্রাইব্যুনাল বিশ্বের নানা স্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের মাধ্যমে অন্তত সংখ্যালঘু আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারবে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী শক্তিগুলোর তৈরি করা ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালের বনিয়াদি সমালোচনাটাও তাঁরই। তিনি জাতিরাষ্ট্র গঠনের যে নাজিবাদী মডেল কমবেশি পৃথিবীতে অনুসরণ করা হয়েছে, সেই মডেলের রাজনৈতিক বিচার ও পর্যালোচনা না করে ব্যক্তিদের দায়ী করার ফৌজদারি বিচারপদ্ধতিকে অগ্রহণযোগ্য মনে করেন। তাঁর কাছে এটা জাতিরাষ্ট্রের আদর্শিক চেহারা বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টামাত্র। অর্থাৎ ব্যক্তির বিচারের মাধ্যমে রাজনীতিকে খালাসের চেষ্টা হিসেবে তিনি ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালকে দেখেন; এরই উত্তরসূরি হলো আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)। ডিনাজিফিকেশন তথা নাজিমুক্তকরণের বেলায় ন্যুরেমবার্গ আদালতের নানামুখী ব্যর্থতার কঠোর সমালোচক মামদানি।

মাহমুদ মামদানি মনে করেন, ‘সব ধরনের রাজনৈতিক সংকট ও সংঘাতের মোকাবিলা রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে, সংঘটিত অপরাধের লোকদেখানো বিচার কিংবা অপর্যাপ্ত আদালতের রায় এর কোনো সমাধান দিতে পারবে না।’ বিশেষজ্ঞ হিসেবে মামদানি মনে করেন, সংখ্যাগরিষ্ঠের সব কর্মের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি রাষ্ট্রকে দুর্বল করে দেয়। আর এই দুর্বল রাষ্ট্রে অপেক্ষাকৃত সবল ব্যক্তিরা দুর্বল ব্যক্তিদের জন্য যমদূত হিসেবে আবির্ভূত হন। উপনিবেশের বিরুদ্ধে সংগ্রাম একটি জাতিরাষ্ট্রকে প্রতিষ্ঠাকালীন পর্ব থেকেই দুই ভাগে ভাগ করে দেয়। উপনিবেশের শিকল ছিঁড়ে বের হওয়া দেশগুলোর জনশক্তি দুইভাবে সদা বিভক্ত থাকে। একটি দল তাদের স্বাধীনতার পক্ষে লড়াইকারী হিসেবে পরিচয় দেওয়ার বাইরে অন্যদের হঠকারী, ঠগ ও জোচ্চোর হিসেবে চিহ্নিত করে। অন্যদিকে পরোক্ষভাবে দুর্বল চিহ্নিত দলও ইনিয়েবিনিয়ে নানা কথা বলতে পারে। তবে বেলা শেষে সবাই কমবেশি দুটি রাজনৈতিক ব্লকে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সেখানেও দেখা যেতে পারে যে একদল হয়ে পড়ছে রাজনৈতিকভাবে স্থায়ী সংখ্যালঘু।

এখানে জাতিরাষ্ট্রের মূল জনস্রোত এবং ভিন্ন ধারা নিয়ে সৃষ্ট সংকট প্রসঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রপতি জর্জ ডব্লিউ বুশের বক্তব্যটি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছিলেন, ‘তুমি আমাদের সঙ্গে নয়তো সন্ত্রাসীদের সঙ্গে।’ আধুনিক জাতিরাষ্ট্রে জাতিগত নির্মূলের যে ভিত্তিমূল, তার মূল শিকড়টা এই বিভাজনের গহিনেই গ্রথিত। ‘আমরা’ বনাম ‘ওরা’ নামক এই বিভাজন নিরন্তরভাবেই উৎপাদিত হয়ে চলেছে। উত্তর উপনিবেশকালে জাতিগত বিভাজন নিয়ে বিভিন্ন বাইনারি অপজিশন তথা বিপরীত জোড়ের ‘তপ্ত শব্দযুগল’ আরও জোরেশোরে উচ্চারিত হয়েছে। আদিবাসী বনাম বহিরাগত, ভূমিপুত্র বনাম বসতকার, অভিবাসী ও দেশবাসী ইত্যাদি। এভাবে সুনির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বাস করা গোত্র ও জাতিগুলোর কেউ কেউ হয়ে গেছে চিরস্থায়ী সংখ্যালঘু, কেউ হয়ে উঠেছে চিরকালের জন্য সর্বেসর্বা। উপনিবেশ–পূর্বকালে গোত্র, কৌম কিংবা স্থানীয়ভাবে যে নামেই যারা পরিচিতি পাক, উপনিবেশ–উত্তরকালে তারা সবাই কমবেশি হারিয়েছে নিজ নিজ আদি পরিচিতি।

রাষ্ট্রের সার্বভৌম নাগরিক হতে গেলে সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিভুক্ত হওয়ার যে বাধ্যবাধকতার অলিখিত বিধান, তাকে নাকচ করার এটাই নিদান। জাতি হয়ে উঠতে গেলে রাষ্ট্রের অনিবার্যতা কিংবা রাষ্ট্র হওয়ার দরকারে একটা জাতিগত সংখ্যাগরিষ্ঠতার যে জরুরত এবং তা থেকে তৈরি হওয়া ‘চিরস্থায়ী সংখ্যালঘুত্ব’ থেকে বের হয়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ নাগরিক সমাজ গড়ে তোলার এই প্রস্তাব; ভেবে দেখা দরকার।

ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের অন্তিম লগ্নে ভারতবর্ষের পরিণতি নিয়ে ভাবা যাক। ভারতবর্ষের স্বাধীনতার সঙ্গে পায়ে–পায়ে এগিয়ে যাওয়া দ্বিজাতিতত্ত্ব তথা হিন্দুর দেশ, মুসলমানের দেশ নিয়ে যত গল্প, তার শুরুটাও এখানে কি না, কে জানে? একইভাবে বঙ্গভঙ্গ–উত্তরকালের খায়-খতিয়ানে এপারে লেখা ইতিহাসে শুধুই মুসলমানদের উপকার কিংবা বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে ক্ষতি আর ওপারে হিন্দুদের সব হারানোর হাহাকার! এগুলো বুঝতে গেলে আশার আলো হয়ে উঠতে পারে মামদানির স্থানীয়তা ও বহিরাগত প্রশ্নের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, তবে সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ।

অভিবাসী এবং দখলদারত্বের প্রশ্নকে নানা দিক থেকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন মামদানি। ফলে এনআরআই তথা নন রেসিডেন্ট ভারতীয়দের অবস্থা তাঁর গবেষণায় গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি ছয় ভাগে বিভক্ত গ্রন্থের গোড়ার দিকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ভারতীয়দের বর্তমান অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। উচ্চ বেতনে চাকরির শান্তির বিপরীতে জাতিগত পরিচয়ের জ্বালা কীভাবে মানুষকে আমৃত্যু পুড়িয়ে খাক করে যায়, তিনি সেটা ধারাবাহিক বর্ণনার মাধ্যমে তত্ত্বায়নের চেষ্টা করেছেন।

পশ্চিমের চোখে ‘প্রফেসর অব টেরর’ নামে পরিচিত এডওয়ার্ড সাঈদ জাতিগত বিদ্বেষ ও নির্মূলকরণ প্রকল্পের ভয়াবহতা প্রসঙ্গে উত্থাপন করেছিলেন তাঁর বিখ্যাত তত্ত্ব ‘ফিলিস্তিন প্রশ্ন’। আর মামদানি বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন ‘এমনি হাজারো রাষ্ট্র কীভাবে এক উপনিবেশ থেকে মুক্তি প্রাপ্তির পর ধীরে ধীরে আরেক জাতের দাসে পরিণত হচ্ছে’। জাতিবিদ্বেষ এবং জাতিগত সংকট তিনি তুলে ধরেছেন আমেরিকার নানা স্থানে গণতন্ত্র টিকে থাকা এবং ভোটের রাজনীতির উপসংহার সামনে এনে। তিনি দেখিয়েছেন, ‘ভোটের দিন উৎসব করে ভোট দিতে গেলেও স্থানীয় আদিবাসী আমেরিকানদের ব্যাপারে অভিবাসী সাদারা কতটা নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে’।

সুনির্দিষ্ট আমেরিকান অঞ্চলে কারা বাস করবে, এটা নিয়েই গোলযোগ চলমান। নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বাস করতে গিয়ে নেটিভ আমেরিকানদের বর্তমানে উল্টো নানামুখী হেনস্তার শিকার হতে হয়। তাই আদিবাসী হলেই কেউ তার ভূখণ্ডে নিরাপদ কিংবা অধিপতিশীল হবে, তেমন চিন্তার সুযোগ নেই। মার্কিন মুলুকের সুনির্দিষ্ট অঞ্চলে নেটিভ আমেরিকানদের থেকে বহিরাগত অনেকের দাপট বেশি। এমনকি আফ্রিকা থেকে দাস হিসেবে বাধ্যতামূলক অভিবাসী হওয়া মানুষের চেয়েও তাদের অবস্থা করুণ। আমেরিকার কালো মানুষদের তিনি দেখান জাতিবিদ্বেষের শিকার হিসেবে আর রেড ইন্ডিয়ানদের বলেন ‘কলোনাইজড’। কারণ, সিংহভাগ সাদা চামড়ার বহিরাগতদের হাতে গড়ে ওঠা মার্কিন জাতিরাষ্ট্রের একপর্যায়ে কালো মানুষের দাসশ্রম মার্কিন শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও সেখানে লাল জাতির মানুষেরা ছিল অনাহূত ও পরিত্যক্ত।

মার্কিন সংবিধানে উল্লিখিত ‘ইন্ডিয়ান’ শব্দটিও অনেক জটিলতার জন্ম দিয়েছে। একটি জাতিসত্তার প্রতিটি মানুষ কোন অঞ্চল থেকে আগত, তা নিয়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে এই প্রস্তাবনা। আদতে তারা আমেরিকার আদিবাসী কিন্তু তাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে ইন্ডিয়ান হিসেবে। অন্তত পরিচয়গত দিক থেকে ধরলে এটা বিরাট জটিলতা। তাই নাগরিক হিসেবে অনেক অঞ্চলে এই ‘ইন্ডিয়ান’ আমেরিকানদের নথিভুক্তীকরণ পর্যন্ত ঘটেনি। ক্ষেত্রবিশেষে তাদের অবস্থান এ জন্যই আফ্রিকা থেকে আগত আফ্রিকান-আমেরিকান দাসবংশীয় মানুষের থেকেও করুণ।

মামদানি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, হিটলারের সেই আর্যতত্ত্ব তথা জাতিভিত্তিক সর্বেসর্বা মতবাদ আমেরিকাতেও প্রবল। মজার ব্যাপার হচ্ছে, সাদা বর্ণের মানুষেরা আমেরিকাতে যে আধিপত্য বিস্তার করছে, খোদ হিটলারেরও সেটা পছন্দ। আর সে জন্যই তাঁর আত্মজীবনী মেইন ক্যাম্প তথা মাই স্ট্রাগল লিখতে গিয়ে হিটলার বর্ণবাদের আমেরিকান মডেলের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এমনকি জার্মান ভূখণ্ডে জাতিগত নির্মূলকরণ অনেকাংশে আমেরিকান মডেলেই চালানো হয়।

আমেরিকায় সাদা চামড়ার বহিরাগতদের হাতে জাতিরাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল বেশ আগে। তারপর আমেরিকান ইন্ডিয়ান মানুষেরা কোনো ভূখণ্ডে থিতু হতে পারেনি। আদিবাসী হিসেবে তাদের মর্যাদা প্রদান অনেক পরের প্রশ্ন, উল্টো তাদেরকে নানা রকম নিপীড়ন, বাধ্যতামূলক নির্বাসন ও বসতি স্থানান্তর, এমনকি বিভিন্ন সময়ে গণহত্যার শিকার হতে হয়েছে। ঠিক এভাবেই হিটলারের জার্মানিতে অত্যাচার করা হয়েছিল ইহুদিদের ওপরে। সম্প্রতি ইউক্রেনের দনবাসে সেই কাজ করছে খোদ ইউক্রেনের মদদপুষ্ট জাতীয়তাবাদী বাহিনী অ্যাজোভ। উল্টো দিকে ইউক্রেনীয়দের প্রাধান্য রয়েছে, এমন এলাকায় সেই কাজই করছে রাশিয়া।

অর্থনৈতিক নানা ক্ষেত্র থেকে শুরু করে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে যে আধিপত্য, তার বিশ্লেষণ না করলে উপনিবেশের প্রভাব সম্পর্কে বোঝা কঠিন। প্রখ্যাত তাত্ত্বিক এডওয়ার্ড সাঈদ তাঁর ‘সংস্কৃতি ও সাম্রাজ্য’ শীর্ষক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এর নানা দিক তুলে ধরলেও উপনিবেশের রাজনৈতিক আধুনিকতার আলোচনায় মামদানি জরুরি। জাতিগত নির্মূলের হীন চিন্তার শিকড়টা অনেকটাই যে সাংস্কৃতিক বিপত্তি সৃষ্টির মধ্যে গ্রথিত, এই দেখাটাই তাঁর অবদান।

উপনিবেশকালের মনোদৈহিক আধিপত্যবাদ আরও চূড়ান্তরূপে ভয়াবহতা দেখাতে শুরু করেছে উগ্র জাতীয়তাবাদ বিকাশের নামান্তে। উপনিবেশ প্রতিরোধ করতে গিয়ে যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের উত্থান, তার মাধ্যমে বিপন্ন ও বিলুপ্ত হয়েছে আরও অনেক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ‘সামাজিক কাঠামোর অভ্যন্তরস্থ সাংস্কৃতিক প্রপঞ্চ’।

৩.
এত সব সংকটের ইতিহাস আলোচনা করে মামদানি সমস্যার কারণ চিহ্নিত করেন জাতি ও রাষ্ট্রকে এক ভাবার ভেতরে। রাষ্ট্র হতে হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতি হয়ে উঠতে হবে, এই ইউরোপীয় রাজনৈতিক বিশ্বাসের দাম দিতে হয়েছে পাশাপাশি থাকা ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়ের সমাজকে। উপনিবেশের সর্বনাশা শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে ‘এক জাতি হয়ে ওঠা’ জরুরি হয়ে উঠেছিল বিপ্লবীদের চোখে। এক হতে গিয়ে বলা হয়েছিল, তোমরা ভারতীয় হয়ে যাও, তোমরা পাকিস্তানি হয়ে যাও কিংবা তোমরা বাঙালি হয়ে যাও। ভারতের হিন্দুত্ব প্রকল্পও সেই আদি পাপেরই অনুকরণমাত্র। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ইউটোপিয়ান একত্রীকরণ প্রশ্নে বাধ্যতামূলকভাবেই হারিয়ে যেতে হয়েছে অপেক্ষাকৃত কম জনশক্তির প্রতিটি সত্তাকে। এই একত্রীকরণের জন্য বিপজ্জনক প্রতিপক্ষের ভয় দেখাতে হয়। এই কথিত ‘শক্তিশালী প্রতিপক্ষ’কে নির্মূল নাহয় বিতাড়ন ছাড়া জাতীয়তাবাদ স্বস্তি পায় না। জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও জাতিগত বিশুদ্ধতার মতো অলীক চিন্তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেক কথিত রাষ্ট্রের ‘ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সীমারেখার মধ্যে’ চলেছে এই ‘ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জাতি বিনাশ ও নির্মূলকরণের ধ্বংসাত্মক প্রকল্প’।

চিহ্নিত নানা ঔপনিবেশিক সংকট থেকে উত্তরণে কিছু অনুসিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন মামদানি। অনেক ক্ষেত্রে মামদানির এই বর্ণনা ইউটোপিয়া মনে হতে পারে। মামদানি ঔপনিবেশিক দেশগুলোকে ক্ষমা প্রার্থনা ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার মাধ্যমে সংকট নিরসনের যে কল্পনা করেছেন, তা অসম্ভব বলেও প্রতীয়মান। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসন অবসানের সময় এর কাছাকাছিই করা হয়েছিল। সাবেক প্রভুরা ক্ষমা চেয়েছিল এবং নির্যাতক ও নির্যাতিতের পরিচয় সরিয়ে তারা উভয়েই নিজেদের সংজ্ঞায়িত করেছিল ‘সারভাইবর’ হিসেবে। দখলদার ও দখলীকৃত হিসেবে সাবেক যে রাজনৈতিক পরিচয়, তার জায়গায় এসেছে এই নতুন রাজনৈতিক পরিচয়।


তবে তাঁর প্রস্তাবনাটা আরও মৌলিক। ঔপনিবেশিক রাজনৈতিক আধুনিকতার শুরুতে জাতি ও রাষ্ট্রের যে জোড়, তিনি তাকে বিজোড় করার মধ্যে সমাধান দেখেন। রাষ্ট্রের সার্বভৌম নাগরিক হতে গেলে সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিভুক্ত হওয়ার যে বাধ্যবাধকতার অলিখিত বিধান, তাকে নাকচ করার এটাই নিদান। জাতি হয়ে উঠতে গেলে রাষ্ট্রের অনিবার্যতা কিংবা রাষ্ট্র হওয়ার দরকারে একটা জাতিগত সংখ্যাগরিষ্ঠতার যে জরুরত এবং তা থেকে তৈরি হওয়া ‘চিরস্থায়ী সংখ্যালঘুত্ব’ থেকে বের হয়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ নাগরিক সমাজ গড়ে তোলার এই প্রস্তাব; ভেবে দেখা দরকার।

ড. মো. আদনান আরিফ সালিম সহকারী অধ্যাপক (ইতিহাস), ওপেন স্কুল, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়