গণতন্ত্রের হেলে পড়া: পুনর্জাগরণ থেকে বিপন্নতায়

সারকথা
১৯৯০ এ সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনকে পশ্চিমা দুনিয়ায় গণতন্ত্রের জয় হিসেবে দেখা শুরু হয়েছিল। সেই বছরই যুক্তরাষ্ট্র থেকে থেকেই প্রকাশিত হতে শুরু করে জার্নাল অব ডেমক্রেসি পত্রিকা। গণতন্ত্রপ্রেমী ও রাষ্ট্রচিন্তকদের মধ্যে বিপুল আশাবাদের জোয়ার দেখা যাচ্ছিল। দেশে দেশে স্বৈরশাসকেরা আত্মরক্ষায় ব্যতিব্যস্ত। মনে হচ্ছিল গণতন্ত্রই হতে চলেছে বিশ্বের একমাত্র রাজনৈতিক ব্যবস্থা। পাশাপাশি নব্য গণতান্ত্রিক দেশগুলির নামকাওয়াস্তে গণতান্ত্রিক চর্চা দেখে পণ্ডিতেরা এদের ভবিষ্যত নিয়েও সন্দিহান হয়ে উঠছিলেন। পরে খোদ যুক্তরাষ্ট্রেও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের অগভীরতা, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো কর্তৃত্ববাদী নেতার বিজয় গণতন্ত্রের নাজুকতাকে সামনে নিয়ে আসে। ভারত, ব্রাজিল, রাশিয়াসহ নব্বইয়ের দশকে হাজির হওয়া নতুন গণতন্ত্রগুলিতেও কর্তৃত্ববাদী নেতারা ক্ষমতাসীন হতে থাকেন। এই প্রবন্ধের লেখক নিজে জার্নাল অব ডেমোক্রেসির সম্পাদক হিসেবে বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের উত্থান ও ধারাবাহিক পতনের সাক্ষ্য দিচ্ছেন এই রচনায়।

রচনাটি ডেমোক্রেসি ফর জার্নাল–এর চলতি সংখ্যার মূল প্রবন্ধ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের সংকটের বিবরণ দেওয়ার পাশাপাশি চীনের উত্থান এবং ইউক্রেন সংকটে রাশিয়ার ভূমিকার পটভূমি এই প্রবন্ধে আলোচিত হয়েছে।

‘আমাদের ইতিহাসের আরম্ভ থেকেই স্বৈরতন্ত্র বনাম স্বাধীনতার সেই প্রাচীনতম ও একমাত্র হেতুটি ছাড়া, রাজনীতির ন্যূনতম অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার বাস্তব কোনো কারণই আর অবশিষ্ট নেই।’

—হান্না আরেন্ডট, অন রেভল্যুশন, ১৯৬৩

মার্ক প্ল্যাটনার ও আমি ১৯৮৯ সালের শুরুর দিকে যখন এই জার্নাল প্রকাশের প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছিলাম, জোরালোভাবে না হলেও গণতন্ত্র তখন বিশ্বজুড়ে পুনরুত্থিত হয়েছিল। স্যামুয়েল পি হান্টিংটন অচিরেই যাকে ‘গণতন্ত্রের তৃতীয় তরঙ্গ’ নাম দেবেন, তত দিনে তা দক্ষিণ ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা ও এশিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সংখ্যা ১৯৭৪ সালের এক-চতুর্থাংশ থেকে ১৯৮৮ সালের শেষে বেড়ে হয়েছিল ৪০ শতাংশ। বিশ্বের বিদ্বজ্জন, শিক্ষার্থী, সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মী এবং নীতিনির্ধারকদের চিন্তার খোরাক জোগানোর মতো নতুন প্রকাশনা চালু করার উদ্যোগ নিতে গিয়ে ভেবেছিলাম যে আমরা বিশ্বকে বদলে দেওয়ার মতো এক ঐতিহাসিক তরঙ্গে আরোহণ করেছি। কিন্তু এটা যে অনিবার্য হয়ে উঠেছে, তা আমরা টের পাইনি। এবং রাজনৈতিক রূপান্তর যে গতি ও বিস্তার নিয়ে আসন্ন হয়ে উঠেছিল, আমরা তা কল্পনাও করিনি।

১৯৮৯ সালের শেষের দিকে আমাদের প্রথম সংখ্যাটি ছাপাখানায় গেল। বার্লিন প্রাচীর কয়েক দশক ধরে যাদের আটকে রেখেছিল, তারা সে সময় তা ভেঙে ফেলেছিল। সোভিয়েত ব্লকও তখন ভেঙে টুকরা টুকরা হয়ে যাচ্ছিল। মিখাইল গর্বাচেভের অধীনে অনর্গল পাঁচ বছরের পর, জরাজীর্ণ সোভিয়েত ইউনিয়ন যেন এক অনিশ্চিত যুগে প্রবেশ করেছিল। ১৯৯১ সালের শেষ দিকে এর পতন হয়। সে সময়ে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের বেশির ভাগ দেশে গণতন্ত্রের ভালো রকম উত্তরণ ঘটে চলছিল। দক্ষিণ আফ্রিকায় নেলসন ম্যান্ডেলা মুক্তি পান। বেনিনের সুশীল সমাজ একনায়কতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে ফেলে এবং আফ্রিকার অন্য সব দীর্ঘস্থায়ী স্বৈরতন্ত্রও আত্মরক্ষামূলক হয়ে পড়ে। অচিরেই জাম্বিয়া, কেনিয়া ও মালাউয়ির দুর্ধর্ষ–রকম একনায়কদেরও পতন ঘটে। ১৯৯৪ সাল নাগাদ, আধা দশকের মধ্যে প্রায় ৪০টি দেশ গণতন্ত্রে উত্তরিত হয়।

সবই ছিল আশাপ্রদ—এবং মাঝে মাঝে রোমাঞ্চকরও। জার্নাল অব ডেমোক্রেসি–এর গোড়ার বছরগুলোতে মনে হতো উদার গণতন্ত্রই ‘একমাত্র সত্যিকারের এবং সম্পূর্ণ আধুনিক সমাজ’। গণতন্ত্রের অভিযাত্রা কেবল—বাস্তবের মাটিতে এবং ভোটের বাক্সে—আক্ষরিকভাবেই চলছিল না, গুণগত ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবেও তা এগিয়ে যাচ্ছিল। বাম ও ডানপন্থী উভয়েই, নাইজেরিয়ার ক্লড এইকে এবং পেরুর মারিও ভার্গাস ইয়োসার মতো বুদ্ধিজীবীরাও গণতন্ত্রকে ঐতিহাসিকভাবে প্রয়োজনীয় সরকার পদ্ধতি বলে প্রমাণ করে দেখান। ১৯৯৯ সালে ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন সিঙ্গাপুরের রাষ্ট্রনায়ক লি কুয়ান ইউর তত্ত্বকে অকাট্যভাবে খণ্ডন করে দেখান যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য কর্তৃত্ববাদ কোনো কার্যকরী ব্যবস্থা নয়। সেনের যুক্তি হলো, প্রবৃত্তিগতভাবে রাজনীতিতে মানুষের শরিকানা প্রতিষ্ঠা এবং মুক্তির প্রতি মৌলিক আকাঙ্ক্ষা মেটানোর জন্যই গণতন্ত্র এত গুরুত্বপূর্ণ। প্রায়োগিক দিক থেকে, দরিদ্রসহ এটা জনগণকে কথা বলার এবং তা শোনানোর সক্ষমতা দেয়।

একনায়কতন্ত্রী শাসন পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে অশ্রুপাতের দাগ রেখে গেছে: নৃশংস মানবাধিকার লঙ্ঘন, আতঙ্কের বিস্তার, ব্যাপক দুর্নীতি এবং মাঝে মাঝে অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও পতন। লাতিন আমেরিকান একনায়কতন্ত্র নাগরিক ও রাজনীতিবিদ উভয়কেই বশ করে রেখেছিল। প্রতিক্রিয়ায় (বিশেষত বামপন্থীদের মধ্যে) ‘গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে গণতন্ত্র আরও বেশি করে মহিমান্বিত হয়, যাকে তার নিজের জন্য এবং বাস্তবের স্বার্থে সুরক্ষিত করা প্রয়োজন’ বলে অভিহিত করেন হুয়ান লিঞ্জ ও আলফ্রেড স্তেফান।

মুক্তির জোয়ারে অনুপ্রাণিত, কর্তৃত্ববাদী শাসনের নিষ্ঠুরতায় তাড়িত, এবং কিছু দেশে (বিশেষত পূর্ব এশিয়ায়) বাড়তে থাকা আয়, শিক্ষা এবং পাশ্চাত্যের সঙ্গে সমন্বয়ের ফলে রূপান্তর ঘটছিল। এসব কারণে দুনিয়াজুড়েই গণতন্ত্রকে সেরা সরকারব্যবস্থা হিসেবে ভাবার পক্ষে জনমত তৈরি হয়। ১৯৯৫ সালের মধ্যে বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রই গণতন্ত্রে পরিণত হয়। ধীরগতিতে হলেও পরের কয়েকটি দশকে গণতন্ত্র সারা বিশ্বে প্রসারিত হয়।

তাহলেও, বিপরীত বাতাসে গণতন্ত্রের উড়ালের চলতি অবস্থারও কয়েক বছর আগে আমি গণতান্ত্রের অগভীরতা এবং মেকিপনার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হতে শুরু করছিলাম। এর কিছুটা এসেছে লাতিন আমেরিকার গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা এবং গভীর অন্তর্দ্বন্দ্ব বিষয়ে আমার ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ থেকে। তাদের আগেকার গণতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভৌগোলিক নৈকট্য, গণতান্ত্রিক সুরক্ষার জন্য আঞ্চলিক কাঠামো এবং নিম্ন–মধ্যম পর্যায়ের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য শুরুর দিকে লাতিন গণতন্ত্রকে সুবিধাপ্রাপ্তই মনে হচ্ছিল। অনেক বছর আগের একটি স্মৃতি আমার মনে রয়ে গেছে। ১৯৮৬ সালের শেষের দিকে আমেরিকার কার্টার সেন্টার আয়োজিত গণতন্ত্র সম্মেলনে গুয়াতেমালার প্রেসিডেন্ট ভিনিসিও সেরেজো ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমার দেশে ক্ষমতার ১০ শতাংশ আমার হাতে রয়েছে’। এটা শুনে আমার এক রূঢ় বোধোদয় ঘটেছিল। বাকি ক্ষমতা, তিনি বলেছিলেন, সেনাবাহিনী এবং বিভিন্ন গুপ্ত সংস্থা ও ধনী এলিটদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। গণতন্ত্রের বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা বাস্তব ও কার্যকর হতে পারে, যখন সেসব আড়ালের শক্তিগুলো, যেমন সামরিক ক্ষমতার ‘সংরক্ষিত এলাকা’, আঞ্চলিক মাফিয়া ও কর্তাদের ‘জমিদারি ছিটমহল’–এর দ্বারা বশীভূত থাকে? ১৯৯৩ সালে, লাতিন আমেরিকার আইনি রাষ্ট্রব্যবস্থার সীমিত নাগালের বিষয়ে গুইলারমো ও’ডোনেল সতর্ক করে দিয়েছিলেন। কেননা, এর বাইরে রয়েছে বিস্তীর্ণ ‘ধূসর এলাকা’, যা আইনবহির্ভূত কিন্তু ‘পরিবারতন্ত্র’, ‘রাজকীয়’ কিংবা নিছক ‘গুন্ডা ধরনের’ শক্তির দ্বারা বেশ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। এসব হলো ‘চরম সহিংস’ এবং মাৎস্যন্যায়ের জগৎ। এই জগৎ এমন এক শাসনব্যবস্থার সঙ্গে সহাবস্থান করে টিকে থাকে, জাতীয় রাজনৈতিক কেন্দ্রে যে ব্যবস্থা চেহারায় অন্তত গণতান্ত্রিক।’ ১৯৯০–এর দশকে লাতিন আমেরিকার গণতন্ত্র সম্পর্কে আমার যে মূল্যায়ন, তা থেকে এই অঞ্চলের ‘গণতন্ত্রের অনুদার চরিত্র’ আমাকে একই রকমভাবে ভাবিয়ে তোলে। আমি বলেছিলাম, অগভীর গণতন্ত্র একটি দেশের সাংবিধানিক ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ভাঙনের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। এ ছাড়া গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা যদি বিস্তৃতভাবে মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না থাকে, এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষমতাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সামাল না দিলে সেই গণতন্ত্র নিরাপদ হতে পারে না। এরপরে, লাতিন আমেরিকার কিছু দেশ এগিয়ে গেলেও অন্যরা পিছিয়ে গেছে। কিন্তু গণতন্ত্র থেকে গেছে খণ্ডিত, সমস্যাগ্রস্ত এবং বৈরী বাস্তবতায়, সম্প্রতি আরও বেশি করে তা উন্মোচিত হচ্ছে।

যখন অনাচারের রাজত্ব চলে, দুর্নীতি প্রবল এবং রাষ্ট্র দুর্বল হয়, গণতন্ত্রকে সুসংহত করা তখন অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা জোরের সঙ্গে বলেছিলেন, সুশাসন—আগ্রাসী শাসনের বিপরীতে সুশীল শাসনকে—গণতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি বিকাশের চাবিকাঠি।

খারাপ ও গলদভরা গণতন্ত্র হলো ঘটবার অপেক্ষায় থাকা এক দুর্ঘটনা। একপর্যায়ে, সেখানে কোনো সংকট বা গণতন্ত্রবিরোধী শক্তি—যেমন সেনাবাহিনী বা কোনো বিদ্রোহী আন্দোলন অথবা ভ্লাদিমির পুতিন বা হুগো শাভেজের মতো বক্তৃতাবাজ দাপুটে নেতার আবির্ভাব ঘটে এবং তারা গণতন্ত্রকে পরাস্ত করে। গণতান্ত্রিক উন্নয়নের জন্য যদি কোনো পবিত্র পাত্র (Holy Grail) থেকে থাকে, আমার দৃষ্টিতে সেটা হলো সুশাসন।

কিন্তু দুর্বল আইন, আদালত, আমলাতন্ত্র এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ঐতিহাসিক ও সামাজিক পরিস্থিতি থেকে কীভাবে সুশাসনের বিকাশ হয়? এটা একমাত্র সম্ভব নেতৃত্ব, সংগঠন এবং সংস্কারবাদী জোটের সচেতন প্রয়াস এবং কখনো কখনো অন্যান্য রাষ্ট্র ও বাইরের প্রতিষ্ঠানের সহায়তার মাধ্যমে। রাজনৈতিক ও নাগরিক সংস্থা, কৌশল ও বাছাই—অথবা রাজনীতি বিজ্ঞানের অধুনা বিরল শব্দ ‘নেতৃত্ব’ আসলেই গুরুত্বপূর্ণ। বেশির ভাগ সাফল্যের গল্পগুলো সাধিত হয়েছে সেই সব নেতার দ্বারা (যদিও তাঁরা হয়তো নিষ্কলুষ নন), যাঁরা দক্ষ ও নিবেদিত এবং যাঁরা গণতন্ত্রের প্রতি দায়বদ্ধ, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি যাঁরা শ্রদ্ধাশীল। জোট গঠন ও তাকে প্রসারিত করা এবং প্রতিষ্ঠানকে ধীরে ধীরে শক্তিশালী করার বিষয়ে তাঁরা সচেতন। অনেক পণ্ডিতই জোরের সঙ্গে বলে থাকেন যে রাজনৈতিক ‘প্রতিনিধিত্বের’ সুযোগ অনেক সময়ই কাঠামোগত অবস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা দ্বারা কঠোরভাবে সীমিত। কিন্তু গণতন্ত্রের টিকে থাকায় সহায়ক এই সব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই (প্রতিনিধিত্বমূলক দল, উপযুক্ত নির্বাচনী ব্যবস্থা, অন্তর্ভুক্তিমূলক নিয়ম, সক্ষম রাষ্ট্র, স্বাধীন আদালত) ছিল আশু অতীতের সরকার ও সুশীল সমাজের নেতাদের রাজনৈতিক নৈপুণ্যের ঐতিহাসিক ফসল।

তা সত্ত্বেও, গণতন্ত্রের উত্থান অথবা পতন বৈশ্বিক শূন্যতার মধ্যে ঘটে না। হান্টিংটনের ১৯৯১ সালের সাড়া জাগানো বইয়ের নাম দ্য থার্ড ওয়েভ। বইটির মূল অবদানের একটি হলো, প্রচলিত রীতিনীতি, ধ্যানধারণা, মডেল ও প্রবণতা এবং শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দেশের নীতি ও পদক্ষেপের পেছনে ক্রিয়াশীল আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের গুরুতর প্রভাব দেখানো এবং স্বৈরতন্ত্রের তুলনায় সেগুলোর শক্তিমত্তা স্পষ্ট করা। মুক্তির ধারণার বৈশ্বিক নিয়তি ঠিক হয়েছে এসবের মাধ্যমেই। তৃতীয় তরঙ্গের সময়ে, কোনো অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের চাপ, কূটনৈতিক সম্পর্ক ও সমর্থন সফল গণতান্ত্রিক রূপান্তরের দিকে (অথবা গণতন্ত্রের বিলয় ঠেকাতে) ভারসাম্য বজায় রেখেছিল। পরবর্তীকালের একটি তুলনামূলক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যেসব দেশে সফল গণতান্ত্রিক রূপান্তর ঘটেছিল, সেসব দেশে পশ্চিমা প্রাযুক্তিক সহায়তা, প্রশিক্ষণ, বুদ্ধিবৃত্তিক যোগাযোগ, কূটনৈতিক চাপ এবং স্বাধীন মিডিয়া ও এনজিওগুলোকে দেওয়া আর্থিক সহায়তা বড় ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু যেখানে এসব অনুঘটকের ভূমিকা দুর্বল ছিল, সেখানে রূপান্তর ব্যর্থ হয়েছে।

এজেন্সি বা মধ্যস্থতার ভূমিকা বুঝলে গণতন্ত্রের পরিণতি নিয়ে ফাঁকা আশাবাদ আসে না যে একবার ‘সংহত’ হয়ে গেলে গণতন্ত্র টিকবেই। ১৯৯০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে, যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি পশ্চিমা গণতন্ত্রে রাজনৈতিক অবক্ষয়, অবিশ্বাস এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অবনতি দেখা যায়। ১৯৯৫ সালে রবার্ট পুটনাম ‘Bowling Alone’ শিরোনামে প্রবন্ধ লিখে এই সমস্যার একটা বিশেষ দিকে দৃষ্টিপাতের ডাক দেন। তা হলো, আমেরিকার ক্ষয়িষ্ণু সামাজিক পুঁজি (Social Capital)। আমাদের জার্নাল অব ডেমোক্রেসি পত্রিকার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি পঠিত নিবন্ধগুলোর একটি হলো এই লেখা। একই বছর হুয়ান লিঞ্জ, সেম্যুর মার্টিন লিপসেট এবং আমি হুঁশিয়ারি জানাই:

সংহতকরণকে এককালীন অপরিবর্তনীয় প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা এক বিপজ্জনক ভ্রান্তি। গণতন্ত্র আসে এবং যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বৈধ, প্রাতিষ্ঠানিক এবং দৃঢ় হতে পারে। কিন্তু গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর যেহেতু পতন হয় এবং গণতান্ত্রিক বিশ্বাস ও চর্চা ক্ষয় পায়, এবং এসব নেতিবাচক প্রবণতাও কিন্তু সংহত হয়ে যেতে পারে...এমনকি প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রেও এমন বুলিবাজ নেতা থাকতে পারেন, সমাজের ব্যর্থতার জন্য যাঁরা খোদ গণতন্ত্রকেই দায়ী করেন। গুরুতর সামাজিক সংকট এবং সরকারের দীর্ঘস্থায়ী অকার্যকারিতা ও দুর্নীতির প্রেক্ষাপটে এই বুলিবাজরা বিপুলসংখ্যক অনুসারী পাবেন না, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই।

গণতন্ত্রের দ্রুততর পশ্চাদপসরণ

১৯৯৬ সালে আমি একটি সম্ভাবনার কথা তুলেছিলাম যে ভোটের হারের নিম্ন দশা এবং বাদ বাকি উদারনৈতিক অংশের মধ্যে বাড়তে থাকা ব্যবধানের কারণে গণতন্ত্রের তৃতীয় তরঙ্গ স্থবির বা পশ্চাৎমুখী হয়ে যেতে পারে। তৃতীয় তরঙ্গের অনেক গণতন্ত্রই (অথবা পাকিস্তানের মতো নামকাওয়াস্তে গণতান্ত্রিক বলে চিহ্নিত) সাংবিধানিক রীতিনীতির ওপর এলিটদের আঘাতে ভুগতে ভুগতে উপরিস্তরেই থমকে গিয়েছিল অথবা তাদের ‘তিলে তিলে মৃত্যু ঘটছিল’। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গভীর ও শক্তিশালী করা না হলে অনেক দেশের গণতন্ত্রই ব্যর্থ হয়। আমি তখন যুক্তি দিয়েছিলাম (এবং এখনো দিই) যে প্রতিষ্ঠিত উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো ‘বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের উন্নয়ন চালিয়ে যাওয়ার’ পাশাপাশি ‘গণতন্ত্রকে চাঙা রাখা, সংস্কার চালানো এবং সুশাসনের’ ক্ষেত্রে তাদের ধারাবাহিক সামর্থ্যের পরিচয় না দিলে গণতন্ত্র গভীরে পৌঁছাবে না।

আমার অনেক বাজে আশঙ্কা ফলে গেছে দেখে আমি খুশি হচ্ছি না। পাকিস্তানের নাজুক ‘গণতন্ত্র’ ১৯৯৯ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে পতিত হয়েছে। সে সময় যেসব গুরুত্বপূর্ণ গণতন্ত্র নিয়ে চিন্তা হতো, সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ও তুরস্ক পরিষ্কারভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এর বাইরে রয়েছে দোদুল্যমান দেশ, যেমন শ্রীলঙ্কা। অথবা কিছু ক্ষেত্রে তাদের শাসনের চারিত্রিক অস্পষ্টতা প্রবেশ করেছে ‘ধূসর এলাকায়’ (যেমন ফিলিপাইন)। ১৯৯৯-এর দিকে যে ৩০টি দোদুল্যমান রাষ্ট্রকে আমি চিহ্নিত করেছিলাম, সেগুলোর মধ্যে কেবল তাইওয়ান ও চেক প্রজাতন্ত্র উচ্চস্তরের উদার গণতন্ত্র বজায় রেখেছে অথবা মূলগতভাবে সেই লক্ষ্যের দিকে এগিয়েছে। কোনো না কোনোভাবে দক্ষিণ কোরিয়া এবং বুলিবাগীশ জনতুষ্টিবাদী ও রক্ষণশীল নেতা ও দলের হাতে পড়ে ভারত, ব্রাজিল ও পোল্যান্ডের গণতন্ত্র গুরুতরভাবে পিছিয়ে গেছে। বাংলাদেশ ও তুরস্ক ছাড়াও, রাশিয়া ও থাইল্যান্ডে গণতন্ত্র চূর্ণ হয়েছে। পাশাপাশি চিলিতে তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ, দক্ষিণ আফ্রিকায় দুর্বল সুশাসন এবং রাশিয়ার হস্তক্ষেপ ও আগ্রাসনের কারণে ইউক্রেনীয় গণতন্ত্র আবার হুমকির মুখে পড়েছে।

গণতান্ত্রিক মন্দা এক দশক ধরে এতটাই সূক্ষ্ম, ধীর ও মিশ্র ছিল যে এটি আদৌ ঘটছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক করা যৌক্তিকই ছিল৷ কিন্তু সময় অতিবাহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা পরিত্যাগ করা কঠিনতর হয়ে উঠেছে। স্নায়ুযুদ্ধ–পরবর্তী প্রথম ১৫ বছরের দৃষ্টান্তগুলোর উল্টা দিকে ফিরে তাকালে আমরা দেখতে পাই, গত ১৫ বছরের প্রতিবছরে গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা অর্জনের বদলে অনেক দেশে তা হ্রাস পেয়েছে।

এই ঘটনাগুলো গণতন্ত্রের বিপর্যয়ের আংশিক তালিকা দেয় মাত্র। সামগ্রিকভাবে, আসলে ২০০৬ সালের আগে বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক মন্দা শুরু হয়নি। তারপর থেকে, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের মাত্রা লাগাতারভাবে পাতলা হয়ে এসেছে। অল্প কিছু দেশ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিণত হলেও, অধিকাংশ দেশেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা (প্রায় সবই উদারপন্থী) ভেঙে গেছে। বেশ কয়েকটি উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের গুণমান হ্রাস পেলেও হাঙ্গেরিতে গণতন্ত্র একদম পর্যুদস্ত হয়েছে। এ ছাড়া পেরুর মতো বেশ কয়েকটি নির্বাচনী গণতন্ত্রও সুতোর ওপরে ঝুলে আছে। আরবের একমাত্র গণতন্ত্র তিউনিসিয়া নির্বাহী অভ্যুত্থানের শিকার হয়েছে। এবং আফ্রিকার সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ঘানা ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি এবং অসন্তোষের ভারে অবনত। কম্বোডিয়া, নিকারাগুয়া ও উগান্ডার মতো বেশ কিছু প্রতিযোগিতামূলক কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থায় প্রতিযোগিতার কোনো লেশমাত্র আর নেই। চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তিশালী কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার পাশাপাশি মিসর, ইরান ও সৌদি আরবও এখন মেরুকরণ আর অবক্ষয়ের দিকে পিছল গতিতে ধাবিত হচ্ছে। পরিশেষে যুক্তরাষ্ট্রের মতো কিছু নেতৃস্থানীয় উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি ও আস্থা টিকিয়ে রাখার বদলে, উদ্বেগজনকভাবে রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং ক্ষয়ের দিকে এগিয়ে চলেছে।

গণতান্ত্রিক মন্দা এক দশক ধরে এতটাই সূক্ষ্ম, ধীর ও মিশ্র ছিল যে এটি আদৌ ঘটছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক করা যৌক্তিকই ছিল৷ কিন্তু সময় অতিবাহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা পরিত্যাগ করা কঠিনতর হয়ে উঠেছে। স্নায়ুযুদ্ধ–পরবর্তী প্রথম ১৫ বছরের দৃষ্টান্তগুলোর উল্টা দিকে ফিরে তাকালে আমরা দেখতে পাই, গত ১৫ বছরের প্রতিবছরে গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা অর্জনের বদলে অনেক দেশে তা হ্রাস পেয়েছে। আমার হিসাবে যেসব রাষ্ট্রে গণতন্ত্র ছিল (১ মিলিয়নের বেশি জনসংখ্যার দেশগুলোতে) ২০০৬ সাল নাগাদ তা সর্বোচ্চ ৫৭ শতাংশে পৌঁছেছিল এবং এর পর থেকে ক্রমাগত তা হ্রাস পেয়েছে (১৯৯৩ সালের পর ২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো তা ৪৮ শতাংশে নেমে যায়)।

এখন প্রতিটি বার্ষিক বৈশ্বিক মূল্যায়ন গুরুতর নিম্নগামী দশার ব্যাপারে আমাদের সাবধান করে। যেমন সাম্প্রতিক সময়ে ফ্রিডম হাউস সমীক্ষার শিরোনাম হলো, ‘অবরোধে গণতন্ত্র’। ভ্যারাইটিজ অব ডেমোক্রেসি (ভি-ডেম) প্রতিবেদনের শিরোনাম, ‘মহামারি আকারে স্বৈরাচারায়ন’। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ২০২০ সালের গণতন্ত্র সূচকে দেখা গেছে, কোভিড-১৯ মহামারির চাপে প্রায় ৭০ শতাংশ দেশে গণতন্ত্রের মাত্রা হ্রাস পেয়েছে। ২০০৬ সাল থেকে চলে আসা এই সূচকের ইতিহাসে বৈশ্বিক গড় এই প্রথম সর্বনিম্ন স্তরে নেমে আসে।

সম্প্রতি আমরা যখন গণতন্ত্রের অধোগতির আরও একটা আশঙ্কাজনক পর্যায়ে প্রবেশ করেছি, তখন হান্টিংটন কথিত উল্টা তরঙ্গের কথাও আমাদের মনে পড়ে। গড় পরিসংখ্যানের চেয়ে সমস্যাটা দেখা দিয়েছে গুণগত প্রবণতায়। সেগুলো কোথায় হচ্ছে, সেটাও দেখার বিষয়। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল গণতন্ত্র ভারতে উদার গণতন্ত্রের আদর্শিক ও সাংবিধানিক ভিত্তিগুলো, যেমন রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বহুত্ববাদ; জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি সহনশীলতা; বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আমলাতান্ত্রিক পেশাদারত্ব এবং গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের স্বাধীনতা ব্যাপক আক্রমণের মুখে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার এমন এক পথ অনুসরণ করছে, যার সঙ্গে আতঙ্কজনক মিল তুরস্কের মতো দেশের, যেখানে গণতন্ত্র ক্রমেই ধ্বংস পাচ্ছে। উদীয়মান বিরাট বাজার এবং চীনের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো কৌশলগত গুরুত্বধারী হওয়ার কারণে মুখ্য কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রই ভারতকে হুঁশিয়ার করতে চায় না। বৈশ্বিক দক্ষিণের অন্যান্য বৃহৎ ও প্রভাবশালী গণতন্ত্রও একই সঙ্গে কর্তৃত্ববাদী ও জনতুষ্টিবাদী নেতাদের কারণে বিপদাপন্ন (ব্রাজিল ও মেক্সিকোতে)। দুর্বল প্রতিষ্ঠান এবং ক্রমবর্ধমান সামাজিক চাপের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশও সমস্যাকবলিত। ফিলিপাইন সম্ভবত আগামী বছরের নির্বাচনে দেশটির শেষ স্বৈরশাসক ফার্দিনান্দ মার্কোসের পুত্রকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত করবে। সম্ভবত এর মাধ্যমেই দেশটি আবার স্বৈরতন্ত্রের চক্রে ফিরে যাবে।

বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের এই পিছু হঠাকে আরও ইন্ধন জোগাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্রের ধীর কিন্তু মর্মান্তিক অধঃপতন। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট একে বলেছে ‘ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র’। মূলগতভাবে একই ধরনের চাপ যেমন টলায়মান অর্থনীতি, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, অভিবাসনের চাপ, পরিচয় বিভাজন এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় এসবের ফেটে পড়া প্রতিক্রিয়ার খপ্পরে পড়ে মার্কিন গণতন্ত্রও ভিন্নভাবে ক্ষয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিদলীয় মেরুকরণ, বক্তৃতাবাজ শক্তির চাতুরীতে পড়ে হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, তুরস্ক ও ভেনেজুয়েলার মতো একই বিষাক্ত পতনের পথ অনুসরণ করছে। জেনিফার ম্যাককয় ও মুরাট যেমন ব্যাখ্যা করেছেন, বিভক্তকারী সামাজিক শক্তি ও রাজনৈতিক কৌশলাদি গভীর সামাজিক ফাটল তৈরি করে। তৈরি হয় ‘আমরা বনাম তারা’ জাতীয় আন্তগোষ্ঠীয় যুক্তি। এভাবে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যকার সামাজিক বন্ধন নষ্ট হয়; সেমুর মার্টিন লিপসেটসহ ও অন্যান্য পণ্ডিতেরা যে বন্ধনকে গণতন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেছেন। নিজ নিজ গোষ্ঠীর প্রতি আনুগত্য ও আদান–প্রদানের চৌহদ্দি যত মজবুত হয়, তত গভীরভাবে বিভাজিত রাজনৈতিক শিবিরগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার জায়গা নেয় অবিশ্বাস, বাঁধা বুলি, পক্ষপাত ও শত্রুতা। প্রতিটি পক্ষ একে অপরকে অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে দেখে, চাপ বোধ করে এবং তা থেকে নষ্ট হয়ে যায় গণতান্ত্রিক নিয়ম ও রীতিনীতি। উইলিয়াম গ্যালস্টন দেখান, উদার গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে থাকা গভীর টানাপোড়েন জাতীয়তাবাদ ও ঐতিহ্যবাদের পুনরাবির্ভাবের কারণে আরও নাজুক হয়ে যায়। ব্যক্তিবাদের প্রতিক্রিয়ায় তৈরি হয়েছে আরও নিবিড় সমাজের আকাঙ্ক্ষা। কল্যাণবাদ মর্যাদা এবং স্বাতন্ত্র্যের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে…বৈচিত্র্য একতার চাহিদার জন্ম দিচ্ছে; চলছে দৃঢ় নেতৃত্বের জন্য ক্লান্তিকর দর–কষাকষি।

কেবল রাজনৈতিক আচরণই যুক্তরাষ্ট্রকে সাংবিধানিক সংকটের কিনারে নিয়ে গেছে, তা নয়। দুই দলের রাজনৈতিক শিবিরের মধ্যে এমন মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গির লোকের অনুপাত এতটাই বেড়ে যাচ্ছে, যা হয়ে উঠেছে গণতন্ত্র ধ্বংসের বিপদসংকেত। উভয়ের মধ্যে কোনো সাধারণ রাজনৈতিক ভূমি আর নেই। পিউ রিসার্চ সেন্টারের করা অক্টোবর ২০২০ জরিপে দেখা গেছে, ‘উভয় দলের দশের মধ্যে আটজন নিবন্ধিত ভোটার বলেছেন যে অন্য পক্ষের সঙ্গে তাদের ভিন্নমত মূলত মৌলিক আমেরিকান মূল্যবোধের ব্যাপারে। উভয় দলের দশজনের মধ্যে নয়জনই আবার চিন্তিত যে প্রতিপক্ষের বিজয় যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির দিকে নিয়ে যাবে।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারির একটি সমীক্ষায় সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে গভীর পক্ষপাতমূলক বিভাজন নথিভুক্ত হয়েছে। সমীক্ষাটিতে বেশির ভাগ রিপাবলিকান ব্যাপক ভোট জালিয়াতি হয়েছে বলে সন্দেহ প্রকাশ করলেও খুব কম ডেমোক্র্যাটই তা বিশ্বাস করে। এমনকি নির্বাচিত নেতারা ‘আমেরিকাকে রক্ষা করতে’ ব্যর্থ হলে ১০ জন আমেরিকানের মধ্যে প্রায় ৩ জন (২৯ শতাংশ) এবং ৩৯ শতাংশ রিপাবলিকানই ‘জনগণের দ্বারা সহিংস কর্মকাণ্ড’ সমর্থন করার জন্য প্রস্তুত ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রে ক্রমবর্ধমানসংখ্যক রাজনীতিবিদ এবং নির্বাচিত কর্মকর্তা ক্ষমতা অর্জন বা ধরে রাখার চেষ্টায় গণতান্ত্রিক নিয়মকানুন অমান্য বা খর্ব করতে রাজি অবস্থায় আছেন। ক্ষমতা ধরে রাখার বেলায় এবং ক্ষমতাসীন দলের চারপাশে ব্যারিকেড তৈরি করাকে তাঁরা তাঁদের স্থায়ী অধিকার মনে করেন। এ জন্য ভোটদানের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা, নির্বাচনী প্রশাসনের রাজনীতিকরণ এবং উত্তরোত্তর বেশি হারে হঠকারী ও বৈজ্ঞানিক কূটকৌশল প্রয়োগ করছে, যা নির্বাচনের ফল বদলে দেওয়ার উপযোগী। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটলে ৬ জানুয়ারির বিদ্রোহের পরও বেশির ভাগ আমেরিকান এখনো বুঝতে সক্ষম হয়নি যে গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার জন্য যে ন্যূনতম আদর্শিক ও আচরণগত সমঝোতা জরুরি, তার থেকে দেশ কতটা দূরে সরে গেছে। রবার্ট এ ডাহল একে ‘পারস্পরিক নিরাপত্তাব্যবস্থা’ বলে অভিহিত করেছেন, যেখানে প্রতিযোগী রাজনৈতিক শক্তিরা পরস্পরকে সহ্য করতে এবং নিয়ম অনুযায়ী শান্তিপূর্ণভাবে গণতন্ত্রের খেলায় অংশ নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। গণতন্ত্রের সব বিশেষজ্ঞই প্রতিযোগীদের জন্য গণতন্ত্রের মৌলিক প্রয়োজনীয় দিকগুলো চিহ্নিত করেছেন, সেগুলো হলো: ১) রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের বৈধতা স্বীকার করা এবং তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার অধিকার নিশ্চিত করা; ২) বিশ্বাস করাতে হবে যে প্রতিদ্বন্দ্বীরা ক্ষমতাসীন হয়ে তাদের নির্মূল করবে না; এবং ৩) সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত নির্বাচনের ফল মেনে নেওয়া। স্টিভেন লেভিটস্কি ও ড্যানিয়েল জিব্ল্যাটের ভাষায়, এসবের জন্য ‘শুধু পরমতসহিষ্ণুতা’ থাকলেই হবে না, বরং দরকার রাজনৈতিক ‘সহনশীলতা’—ক্ষমতা প্রয়োগে সংযম, সহিংসতা প্রত্যাখ্যান এবং গণতন্ত্রের অলিখিত নিয়ম ও পরিসরগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা। এই প্রধান দুটি রীতি শিথিল হয়ে যাওয়ায়, গণতন্ত্রও যুক্তরাষ্ট্রের সংহতি দুর্বল হতে শুরু করেছে এবং পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

পুনরুত্থিত কর্তৃত্ববাদ

আমার দীর্ঘকালীন সহসম্পাদক মার্ক প্ল্যাটনার পত্রিকার ত্রিশতম বার্ষিকী সংখ্যায় তাঁর পর্যবেক্ষণ জানাচ্ছেন যে ‘আমরা পুনরায় সেই পাঠটি শিখছি যে গণতন্ত্রের ভাগ্যের জন্য ভূরাজনীতি গভীরভাবে গুরুত্বপূর্ণ।’ চার্লস ক্রাউথামার যাকে ‘ইউনিপোলার মোমেন্ট’ বলে অভিহিত করেছিলেন, গণতান্ত্রিক সম্প্রসারণের সেই তুমুল ’৯০-এর দশকটিও কোনো কাকতালীয় ঘটনা ছিল না। কেননা, যুক্তরাষ্ট্র তার পশ্চিমা মিত্রদের সহায়তায় ‘বিশ্ব শক্তির কেন্দ্রে’ ‘অপ্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তি’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। ইতিমধ্যে ১৯৭০ দশকে, বিশেষ করে ১৯৮০ দশকে যুক্তরাষ্ট্র তার শক্তি ও সদিচ্ছা নিয়ে মানবাধিকার রক্ষা এবং গণতন্ত্র বিস্তারের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। এ ঘটনা গণতান্ত্রিক রূপান্তরের আন্দোলনে আশা জাগিয়েছিল এবং স্বৈরশাসকদের ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। এরপর, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং অন্যান্য শক্তিশালী স্বৈরতন্ত্রের অনুপস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন অদৃষ্টপূর্ব মাত্রায় গণতন্ত্র বিস্তারে সাহায্য ও সমর্থন জুগিয়ে যায়। দুনিয়াজুড়েই গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহ জোরদার হয়, নৈতিকভাবে বন্দিত এবং বস্তুগতভাবে মদদপুষ্ট হয়। বাইরের সাহায্য ও কূটনৈতিক সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল স্বৈরশাসকেরা গণতন্ত্রায়ণের অপ্রতিরোধ্য চাপে পড়ে বিদায়ের পরিকল্পনা নিতে বাধ্য হয় অথবা নির্বাচনে হেরে গেলে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়।

ক্রাউথ্যামার ভেবেছিলেন, ওই ‘এককেন্দ্রিক মুহূর্ত’ দশকের পর দশকজুড়ে চলবে। অথচ এটা এক দশকের সামান্য বেশি দিন টিকেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক আধিপত্য প্রথম মারাত্মক আঘাত খায় ২০০৩ সালে ইরাক আগ্রাসনের পরে। এটা ছিল খামখেয়ালিভাবে ক্ষমতার অতি বিস্তারের ফল। এই ঘটনায় গণতন্ত্রে রপ্তানির ধারণা মার খায়। দ্বিতীয় আঘাত ছিল ঋণ–বন্ধকি কারবারিদের লোভ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নীতিকৌশলের ভুলের পরিণতিতে সৃষ্টি হওয়া ২০০৮ সালের আর্থিক সংকট। যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সংকট বৈশ্বিক অভিঘাত ফেলায় বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী গণতন্ত্রের সুনাম আরও নষ্ট হলো। আর্থিক সংকটে জেরবার অবস্থা এবং মানবাধিকারের প্রতি গভীর দার্শনিক অঙ্গীকার ও সহজাত বাস্তববোধের মধ্যে টানাটানির মধ্যে পড়ে সেসময়কার মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা একটা মধ্যপন্থা নিলেন। তাতে গণতন্ত্রে উত্তরণের মার্কিন নীতির ‘আংশিক পুনরুজ্জীবন’ হলো মাত্র। ওবামা যদিও গণতান্ত্রিক সহায়তা চালিয়ে গেলেন, গণতন্ত্রের পশ্চাদপসরণ নিরুৎসাহিত করায় কাজ করলেন এবং মাঝেমধ্যে গণতান্ত্রিক পরিবর্তন ঘটাতে চাপও দিলেন, তারপরও যুক্তরাষ্ট্র আর স্বৈরতন্ত্রের গণতন্ত্রায়ণের মুখ্য শক্তি রইল না। দুনিয়াকে আরও গণতান্ত্রিক করে তোলায় মার্কিন নেতৃত্বের সোনালি যুগ প্রায় শেষের কাছে চলে এল।

দুটি কাঠামোগত কারণ ওবামাকে—এবং যুক্তরাষ্ট্রকে—গণতন্ত্রকে এগিয়ে নেওয়ার বাধা হয়ে উঠেছিল। একটি ছিল মার্কিন রাজনীতির গভীর মেরুকরণ, যা পরে গণতন্ত্রের মডেল হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের আবেদন আরও কমিয়ে দিয়েছে (এবং আগামী বছরগুলোতে আরও নাটকীয়ভাবে এই আবেদন কমতে থাকবে)। আর দ্বিতীয়টি ছিল স্বৈরতন্ত্রের বিশ্বব্যাপী পুনরুত্থান: যেমন চীনের বর্ধিত শক্তি, আক্রমণাত্মক ও বিদ্বেষী রাশিয়ার প্রত্যাবর্তন, বিভিন্ন দেশের স্বৈরাচারী শাসকদের চতুর কায়দায় অভিযোজনের কৌশল শিখে যাওয়া, এবং বিভিন্ন যৌথ নেটওয়ার্কে নিজেদের মধ্যে আদান–প্রদান চালানো এবং নিয়ম–বিরুদ্ধ উদ্যোগ নেওয়া।

ক্ষমতা এবং বৈধতা

একুশ শতকের কোনো পরিবর্তনই গণতন্ত্রের বৈশ্বিক অবস্থানের অতটা ক্ষতি করেনি, যতটা করেছে বিশ্বের পরবর্তী পরাশক্তি হিসেবে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের আবির্ভাব। চীনের রয়েছে বিশ্বের মধ্যে দ্রুতবর্ধনশীল সেনাবাহিনী, বৈশ্বিক প্রচারণা যন্ত্র, বৈশ্বিক অবকাঠামো উন্নয়নের কর্মসূচি—বেল্ট অ্যান্ড রোড। বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পের মহাসড়ক, রেলপথ, বন্দর, জ্বালানি পাইপলাইন এবং ষাটটি দেশে বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে জড়ানো এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২০০ বিলিয়ন ডলার।

চীন এখন আমেরিকাকে ছাড়িয়ে গিয়ে ইউরোপ, দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকারর বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হয়ে উঠেছে। চীন রাশিয়াসহ আরও কয়েকটি কর্তৃত্ববাদী দেশের সঙ্গে মিলে জাতিসংঘের ১৫টি বিশেষ সংস্থার ৪টিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে। তারা এসবের মাধ্যমে বর্তমান মানবাধিকারকেন্দ্রিক নীতিমালার অবনমনে জোরের সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি বর্তমান বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে, যেমন জাতিসংঘ ও এর মানবাধিকার পরিষদে সুশীল সমাজের গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ কঠিন করে তুলছে। এসবের মাধ্যমে তারা বর্তমান আন্তর্জাতিক আইনকে এমনভাবে বদলে দিতে চাইছে, যাতে করে স্বৈরতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র এবং ডিজিটাল নিপীড়নকে নিরাপদ করা যায়। চীন এখন পৃথিবীর প্রথম কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল মুদ্রা তৈরিতে নেমেছে, যাতে করে ডলারের একাধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করা যায় এবং তার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইনভঙ্গকারীদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধ চাপানোর ক্ষমতা কমজোরি হয়ে যায়।

ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব ও সম্পদ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চীন সাবেকি কমিউনিস্টদের ‘যুক্তফ্রন্ট’ গঠনের কৌশলে গণতন্ত্রের উপরিকাঠামোয়—বিশ্ববিদ্যালয়, থিঙ্কট্যাংক, গবেষণা কেন্দ্র, সংবাদমাধ্যম, শিল্পকলা, করপোরেশন, সামাজিক সংস্থা, রাজনৈতিক দল ও স্থানীয় সরকার— প্রভাব খাটাতে চাইছে। তাদের এই কার্যক্রমের তিনটি প্রধান লক্ষ্য হলো: ১) বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও সামরিক আধিপত্য কায়েমের লক্ষ্যে পশ্চিমা প্রযুক্তি চুরি এবং সেসবকে নিজেদের সঙ্গে মানানসই করে নেওয়া; ২) স্বদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বহির্বিশ্বে যুদ্ধমান কার্যক্রমকে সেন্সর ও ভয় দেখিয়ে চাপা দিয়ে চীন সম্পর্কে বয়ানকে নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি নিজেদের সম্পর্কে মহান ভাবমূর্তি তুলে ধরা; এবং ৩) বিনিময় অংশীদার এবং যুক্তফ্রন্ট মিত্রদের (জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে) চীনের আধিপত্যবাদী প্রবণতাকে প্রতিহত করার বদলে আলিঙ্গন করার জন্য চালিত করা এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার আমূল পালাবদলের পক্ষে যায়, এমন নীতির জন্য তাদের সরকারের কাছে লবিং করা।

‘আপন শক্তি লুকাও এবং নিজের সময়টা কাটাও’ চীনা রাষ্ট্রনায়ক দেং জিয়াও পিংয়ের এই ঐতিহাসিক নির্দেশনা উপেক্ষা করে, চীনের স্বৈরাচারী নেতা সি চিন পিং নিজ অঞ্চলে এবং তার বাইরেও উদ্ধত ও যুদ্ধংদেহী আচরণ চালিয়ে যাচ্ছেন। চীন কার্যত সম্পদ-সমৃদ্ধ এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সমগ্র দক্ষিণ চীন সাগরের ওপর সার্বভৌমত্ব দাবি করছে। সেখানে নতুন দ্বীপ গঠন ও সামরিকীকরণ এবং তাইওয়ানের বিরুদ্ধে সামরিক অনুসন্ধান চালিয়ে এই দাবি বাস্তবায়ন করছে। এ ধরনের ক্রিয়াকলাপ, এবং এই অঞ্চলে এবং বিশ্বব্যাপী চীনের তীক্ষ্ণ শক্তির (জার্নাল অব ডেমোক্রেসি পত্রিকা ‘শার্প পাওয়ার’ বা ‘তীক্ষ্ণ শক্তি’ বলতে চীন ও রাশিয়ার মতো সরকারের আন্তর্জাতিক স্তরে প্রভাব বিস্তারের কৌশলকে বুঝিয়ে থাকে। এসব কৌশলের মধ্যে রয়েছে গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে বাক্‌স্বাধীনতাকে সীমিত করা, সংশয় ছড়িয়ে দেওয়া, গণতান্ত্রিক পরিবেশ নষ্ট করা। এটা করা হয় সেন্সরশিপ এবং কৌশলে বশে আনার মাধ্যমে—সম্পাদক) বিস্তারের প্রতিক্রিয়া আছে। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও জাপানের মধ্যে চতুর্ভুজ কৌশলগত সংলাপের মাধ্যমে সমন্বিত ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া আরম্ভ হয়েছে। এবং বিশেষ করে জাপান ও অস্ট্রেলিয়া তাদের প্রতিরক্ষা ভঙ্গি ও নজরদারি বাড়াচ্ছে।...কর্তৃত্ববাদ ও লুটেরাতন্ত্র একে অপরের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী হয়ে বিশ্বব্যাপী সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন, জাতীয় সম্পদ লুণ্ঠন, আইনের শাসন উচ্ছেদ, বিরোধী দল দমন করছে। অবৈধ সম্পদ পাচারের মাধ্যমে উন্নত গণতন্ত্রকে দুর্বল করছে। লুটেরাদের দুর্নামের ওপর চুনকাম চালিয়ে তাদের কুকীর্তি আড়াল করছে। অজস্র পশ্চিমা করপোরেশন, পরামর্শক, আইনি সংস্থা, ব্যক্তিগত গোয়েন্দা ও নজরদারি ঠিকাদারেরা এই দূষিত বিশ্ব বাণিজ্যে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে। এসবের ফলে বিশ্বের স্বৈরাচারীদের দমনমূলক ক্ষমতা, প্রতিশোধের নাগাল এবং আত্মবিশ্বাস ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে।

রাজনৈতিক ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও বৈশ্বিক ক্ষমতা লক্ষণীয়ভাবে আলাদা হলেও চীন ও রাশিয়ার শাসকদের মধ্যে চরিত্রগত ও স্বার্থগত গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে। উভয়ই নাটকীয়ভাবে গত এক দশকে আরও বেশি নিপীড়ক হয়ে উঠেছে। চীন নব্য–সর্বগ্রাসী নজরদারিমূলক রাষ্ট্রে পরিণত হতে চলেছে আর রাশিয়া রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও ভিন্নমতাবলম্বীদের নিষ্ঠুরভাবে শাস্তি দিচ্ছে। দুটি ব্যবস্থাই ক্রমেই এক ব্যক্তির শাসনে পরিণত হচ্ছে, যিনি আবার ক্ষমতা হারানোর ভয়ে আরও বেশি করে দমন চালাচ্ছেন, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে উসকে দিচ্ছেন জাতীয়তাবাদ। দুটি ব্যবস্থাই প্রতিবেশী গণতন্ত্রকে হুমকি বলে মনে করে—চীনের বেলায় তাইওয়ান, রাশিয়ার বেলায় ইউক্রেন। উভয়ের বেলাতেই ‘সমস্যাজনক’ প্রতিবেশীর সঙ্গে তাদের রয়েছে ব্যাপক সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত মিল। তাদের ভয়, এই মিলের কারণে নিজ দেশের মানুষও প্রতিবেশীদের মডেল অনুসরণে গণতন্ত্রী ও বহুত্ববাদী হয়ে পড়বে। উভয় স্বৈরতন্ত্রেরই লক্ষ্য প্রতিবেশীদের অন্তর্ঘাতের আগেই তাদের ওপর অন্তর্ঘাত চালানো। উভয় নেতা—এবং ব্যবস্থা—পাশ্চাত্যকে তীব্র ঘৃণা করেন এবং তাঁদের অপছন্দের এই উদারনৈতিক বিশ্বব্যবস্থাকে উল্টে দিতে চান। উভয়ই বিশ্বাস করেন যে আমেরিকান গণতন্ত্র এবং আরও বড় আকারে পশ্চিমা গণতন্ত্র হলো দুর্বল ও অসংহত। সুতরাং এদের বাঁকানো, চ্যালেঞ্জে ফেলা এবং একদিন সফলভাবে পরাস্ত করা সম্ভব। একসঙ্গে এবং আলাদা আলাদাভাবে চীন ও রাশিয়া কর্তৃত্ববাদী শাসকদের আঁতাতমূলক নেটওয়ার্ক লালন করে এবং উভয়ই বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিজেদের পক্ষে আনার জন্য অভিলাষী।…

এসব কারণে তাইওয়ান ও ইউক্রেন হয়ে পড়েছে বৈশ্বিক স্বাধীনতা রক্ষার সমররেখা। শক্তিশালী প্রতিবেশীর আগ্রাসনের মাধ্যমে দুই গণতন্ত্রের যেকোনোটির পতন হবে ইতিহাসের মোড় ফেরানো ঘটনা। শীতল যুদ্ধের ছায়া–লড়াই নয়; এর সঙ্গে তুলনীয় কেবল চেকোস্লোভাকিয়ায় নাৎসি বাহিনীর আগ্রাসন। গত কয়েক দশকজুড়ে আমরা গণতন্ত্রের সংগ্রামকে নিছক রাজনৈতিক ও বেসামরিক ভাবায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ১৯৩০ দশকের মতোই, বর্তমান বিপদের মধ্যে লক্ষণীয় সামরিক হুমকির উপাদান রয়েছে। এই হুমকি মোকাবিলার জন্য ওই দুটি গণতান্ত্রিক রণক্ষেত্র দেশ কিংবা বিশ্বের সবচেয়ে উদার গণতন্ত্রগুলো মনস্তাত্ত্বিকভাবে, সামরিকভাবে এবং সরবরাহ লাইনের নিরাপত্তার দিক থেকে যথেষ্টভাবে প্রস্তুত নয়।

ক্ষমতা ও বৈধতা

বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের পুঞ্জীভূত সংকটের মোক্ষম সমাধান হতে পারে এর মূল দুই প্রতিপক্ষ রাশিয়া এবং বিশেষ করে চীনকে যদি গণতন্ত্রী করে তোলা যায়। ১৯৯০-এর দশকে রাশিয়ার উঠতি গণতন্ত্রের ব্যর্থতা আসলে পূর্বনির্ধারিত ছিল না। সম্প্রতি মাইকেল ম্যাকফাউল ব্যাখ্যা করেছেন যে জরাজীর্ণ বরিস ইয়েলৎসিনের উত্তরসূরি বাছাই করা ছিল মূলত সাক্ষাৎ বিপদ এড়ানোর ব্যবস্থা। বৈশ্বিক আর্থিক মন্দা এবং সংস্কারপন্থী উপপ্রধানমন্ত্রী বরিস নেমতসভের নেতৃত্বে মুক্তবাজারীকরণের কারণে ১৯৯৮ সালের আগস্টে রাশিয়ার ভঙ্গুর অর্থনীতিতে ধস নামে। যদি এসব না ঘটত, তাহলে হয়তো একটা ভিন্ন পরিস্থিতি কল্পনা করা যায়। নেমতসভ যদি ইয়েলৎসিনের স্থলাভিষিক্ত হতেন, তাহলে হয়তো ধীরে ধীরে রাশিয়ায় একটি অপূর্ণ কিন্তু প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হতে পারত। পুতিনের একনায়কত্ব এখন নির্মম এবং অপ্রতিরোধ্য বলে মনে হতে পারে, কিন্তু তাঁর নেতৃত্বের প্রতি জনগণের আস্থা তো কমছেই, তার ওপর পুতিনের শাসনব্যবস্থার আত্মবিশ্বাসও কমে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।

বিপরীতে, ১৯৮৯ সালের তিয়েনআনমেন স্কয়ারে গণহত্যার পর থেকে চীনের কমিউনিস্ট শাসন বিরাট অর্থনৈতিক সাফল্য এবং দক্ষ নিয়ন্ত্রণের বৃহৎ যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। তা হলেও চীনা শাসকগোষ্ঠী বহুবিধ দোলাচলের মুখে পড়ছে। এর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার কমে সম্ভবত ৪ শতাংশ বা তারও নিচে নেমেছে। রিয়েল এস্টেট খাতও অতিঋণজনিত সংকটের মধ্যে রয়েছে।

হ্যাল ব্র্যান্ডস ও মাইকেল বেকলে সম্প্রতি খেয়াল করেছেন, ‘(চীনে) রাষ্ট্রীয় জোম্বি সংস্থাগুলোকে লাগাতার সহযোগিতা করা হচ্ছে যখন বেসরকারি সংস্থাগুলো পুঁজির দুর্ভিক্ষে রয়েছে।’ অর্থনৈতিকভাবে উদ্ভাবনাময় ও গতিশীল থাকার জন্য শাসনযন্ত্রকে বেসরকারি উদ্যোগ ও বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে হবে। কিন্তু চীন তার সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি অন্যান্য উদ্যোক্তার সঙ্গে কঠোর আচরণ করছে। কারণ, চীনা কমিউনিস্ট পার্টি তাদের জিনগত অক্ষমতার কারণে ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বীকে সহ্য করতে পারে না। ব্র্যান্ডস ও বেকলে জানাচ্ছেন, ‘নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করায়’ চীনে পানি ফুরিয়ে যাচ্ছে এবং ‘অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি জ্বালানি ও খাদ্য আমদানি করতে হচ্ছে।’ ফলে চীনা প্রবৃদ্ধি এক একক বাড়ানোর খরচ ২০০০-এর থেকে তিন গুণ বেশি হয়ে গেছে। চীনা জনসংখ্যার মধ্যে প্রবীণদের হার দ্রুত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রমের মূল্য এবং আর্থিক চাপও বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী তিন দশকে কর্মক্ষম জনসংখ্যা ২০ কোটি পর্যন্ত কমে যাবে এবং সমানতালে প্রবীণ নাগরিকদের সংখ্যা বাড়বে।

এই দ্বন্দ্বগুলো চীনের বিস্ময়কর অর্থনৈতিক উত্থানকে সোভিয়েতের মতো লম্বা স্থবিরতার রূপ দিতে পারে। কিন্তু তার আগে আসতে পারে কমিউনিজমের পতন এবং গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা। এমন সম্ভাবনা শাসকদের মনে কৌশলগত আতঙ্ক তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা ব্র্যান্ডস ও বেকলের। তারা এই উপসংহারে আসতে পারে যে সময়টা তাদের শাসনের পক্ষে নয়। এবং এই ভয় থেকে (প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে জার্মানি এবং পার্ল হারবারের আগে জাপানের মতো) ক্ষমতা ফোরানোর আগেই তড়িঘড়ি করে সামরিক আঘাত হানা শুরু করতে পারে চীন।

দুই দশক আগে কল্পনা করা হয়েছিল, চীনের দ্রুত উন্নয়ন গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের জন্য চাপ তৈরি করতে পারে। অর্থনীতিবিদ হেনরি এস রোয়েন অবশ্য ২০০৭ সালেই পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, চীনের দ্রুত অর্থনৈতিক আধুনিকীকরণ দেশটিকে ২০১৫ সালের মধ্যে একটি ‘আংশিক মুক্ত’ রাষ্ট্র এবং ২০২৫ সালের মধ্যে ‘মুক্ত’ রাষ্ট্রে পরিণত করবে। একইভাবে এশিয়ান ব্যারোমিটার (তাইওয়ানের দুটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত জরিপ–সম্পাদক) বারবার কিছু আশাপ্রদ প্রামাণিক তথ্য খুঁজছিল যে চীনাদের মূল্যবোধ, বিশেষ করে যুবকেরা আরও বেশি করে উদারনৈতিকতার দিকে বদলে যাচ্ছে কি না। যাহোক, আধুনিকীকরণ উদারীকরণকে এগিয়ে নেয়—এই বিশ্বাস (আমার কাছে তা প্রলুব্ধকর বলে মনে হয়েছিল) এখন পর্যন্ত ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে। এই জার্নালটি রোয়েনের প্রবন্ধটির মতো অনেক পূর্বাভাসমূলক প্রবন্ধ প্রকাশ করে গেছে, যেখানে ন্যূনতম থেকে ব্যাপক পরিবর্তনের আশা করা হয়েছিল। আশা করা হয়েছিল শক্তিশালী নাগরিক সমাজ ও অধিকতর প্রযুক্তিবিদকেন্দ্রিক, আইনভিত্তিক রাষ্ট্রের জন্য। অথবা দুর্নীতি ও জবাবদিহিহীন শাসনের সংকট গণতন্ত্রের পথ খুলে দেবে বলে বিশ্বাস করা হয়েছিল।

এসবের বিপরীতে, অ্যান্ড্রু নাথানের ২০০৩ সালের ‘কর্তৃত্ববাদী সহনক্ষমতা’ বিশ্লেষণটি বরং বেশি বাস্তব বলে মনে হয়। তবে নাথানের মূল্যায়নে ধরে নেওয়া হয়েছিল, চীনা কমিউনিস্ট পার্টি নিয়মিতভাবে, যোগ্যতর উত্তরাধিকারী বাছাই, মেধাভিত্তিক, বিশেষায়িত আমলাতন্ত্র এবং গণ-অংশগ্রহণ ও গণ–আবেদন সৃষ্টির পথ খুলে দেওয়ার মাধ্যমে শাসন চালিয়ে যাবে। খুব কম লোকই ভাবতে পেরেছিলেন নয়া কর্তৃত্ববাদী শাসক হিসেবে সি চিন পিং তাঁর ক্ষমতার সামনের প্রাতিষ্ঠানিক বাধাগুলো গুঁড়িয়ে দেবেন, জনতার ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়াবেন এবং রাজনৈতিক উদারতার চিহ্নমাত্র মুছে ফেলবেন।

আমরা দুটি ভিন্ন ধরনের শাসনপদ্ধতির মধ্যে যুগান্তকারী সংঘাতের সময়ে চলে এসেছি—একটি চলে ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে, অন্যটি বৈধতার ওপর। ক্ষমতার ওপর দাঁড়ানো শাসনব্যবস্থাগুলো পরস্পরের স্বাচ্ছন্দ্য ও সহায়তা যেমন উপভোগ করে, তেমনি তাদের রয়েছে অংশীদারি দুর্নীতিগ্রস্ত নেটওয়ার্ক ও নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তি। তবে বেশির ভাগেরই অর্থনৈতিক সম্ভাবনা হ্রাস পাচ্ছে। নজরদারি ও নিপীড়ন ব্যয়বহুল, এবং ধনিক গোষ্ঠীর অত্যাচার অর্থনীতিকে নিষ্কাশিত করে এবং দমন ছাড়া রাষ্ট্রের আর সব সক্ষমতা লোপ পায়। যেমন ভেনেজুয়েলা ও জিম্বাবুয়ে আবিষ্কার করেছে, যদি শাসক চক্রের লুট করার প্রাকৃতিক সম্পদ না থাকে বা (উত্তর কোরিয়া ও সিরিয়ার মতো) তারা যদি বৈশ্বিক অপরাধ সিন্ডিকেট হিসেবে কাজ না করে, তাহলে এই ফর্মুলা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকে অবক্ষয়িত এবং শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ করে দিতে পারে। তুরস্কের রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং হাঙ্গেরির ভিক্টর অরবানের মতো স্বৈরাচারীরা তাঁদের শাসনের বৈধতা ও নবায়নের জন্য নির্বাচনের ওপর নির্ভর করেন, সেখানে তাঁদের অপশাসনের অর্থনৈতিক পরিণতিই ডেকে আনবে তাঁদের পতন। ভারতের জনতুষ্টিবাদী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যদি তাঁর অগণতান্ত্রিক শাসন চালিয়ে যান, তাহলে এই দোলাচলের মোকাবিলা তাঁকেও করতে হবে।

কিন্তু রাশিয়া ও চীনের স্বৈরশাসকেরা নিজেদের ধ্বংস করার আগেই বিশ্ব শান্তি ধ্বংস করে ফেলতে পারেন। তাঁদের অপরিণামদর্শী মডেল গভীর দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হওয়ায় রাশিয়া ও চীনের কর্তৃত্ববাদী শাসকদের বৈধতা কমে যেতে থাকবে। গর্বাচেভের পরিণতি দেখে রাজনৈতিক সংস্কারের ভয়ে তাঁরা ভীত। কিন্তু সংস্কার না করা হলে ক্ষমতা বাঁচাতে তাঁদের স্বদেশে ও বিদেশে শক্তি প্রয়োগের ওপর বেশি করে নির্ভর করতে হবে। এটি সম্ভবত তাদের ফ্যাসিবাদী পথে চালিত করবে। নিরলসভাবে অভ্যন্তরীণ বহুত্ববাদ দমন, উগ্রজাতীয়তাবাদ, সম্প্রসারণবাদ চালানোর পাশাপাশি সমস্ত উদার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রতি তীব্র আদর্শিক শত্রুতা জারি থাকবে। রাশিয়া ও চীন উভয় দেশেই এলজিবিটি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও হয়রানিমূলক প্রচারণা চলবে এবং প্রথাগত জেন্ডার আচরণ থেকে যেকোনো বিচ্যুতিকে জাতগর্বী বিদ্বেষ থেকে ‘পশ্চিমা প্রভাব’ বলে চিহ্নিত করবে। এসব হলো আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য আরও বেশি করে হুমকি হয়ে ওঠা এই শাসনব্যবস্থার ভেতরের দিক।

অর্ধশতাব্দীর মধ্যে স্বাধীনতার ধারণার জন্য সবচেয়ে অন্ধকার মুহূর্তে আমরা আছি। আমি গণতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার প্রতি বিশ্বাস রাখি, কারণ এটি নৈতিকভাবে উচ্চতর এক ব্যবস্থা। এটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চাহিদা মেটাতে, অর্থনীতির বিকাশে, পরিবেশ রক্ষায়, মানবাধিকারের প্রতি সম্মানে এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর হতে পারে বলে প্রমাণিত হয়েছে। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, মর্যাদা ও স্বশাসনের দাবি মানুষের মজ্জাগত। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে এই মূল্যবোধগুলো আরও কাঙ্ক্ষিত হয়েছে। তবে গণতন্ত্রের বিজয় অবশ্যম্ভাবী কিছু নয়। এই নতুন যুগে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং নেতাদের কৌশল ও পদক্ষেপের অভিঘাত দশক ধরে চলতে থাকবে। প্রশ্ন হলো, বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো কি তাদের মধ্যকার বিভেদ সামলিয়ে এবং তাদের সংকল্পকে এক করে পুনরুত্থিত কর্তৃত্ববাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে? আন্তোনিও গ্রামসির কথাটা তাড়িত করে: ‘বুদ্ধির হতাশাই ইচ্ছাশক্তির আশাবাদ।’ বর্তমান বিপদের গভীরতা বিষয়ে পরিষ্কার নজরই পারে প্রয়োজনীয় ইচ্ছাশক্তি জাগাতে।

আমি আশাবাদীই রইলাম।

আমি আশাবাদী।

ল্যারি জে ডায়মন্ড একজন আমেরিকান রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানী ও সাবেক মার্কিন সরকারি কর্মকর্তা। তিনি তিন দশক ধরে আমেরিকার ন্যাশনাল এনডাউমেন্ট সংস্থা থেকে প্রকাশিত জার্নাল অব ডেমোক্রেসি–এর প্রতিষ্ঠাতা সহসম্পাদক। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর, জাতিসংঘ প্রভৃতিতে কাজ করেছেন। রচনাটি যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত জার্নাল অব ডেমোক্রেসির জানুয়ারি সংখ্যা থেকে নেওয়া হয়েছে। ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন ধ্রুব সাদিক।