শেখ মুজিব-ডিপি ধর কথোপকথন, ২২ জানুয়ারি, ১৯৭২

ডিপি ধরের গোপন প্রতিবেদনের একাংশ

ভূমিকা

ভারত সরকারের অন্যতম নীতিনির্ধারক দুর্গাপ্রসাদ ধর—ডি পি ধর নামে যিনি বেশি পরিচিত—১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে এক বিশেষ বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন। প্রায় তিন ঘণ্টা স্থায়ী সেই আলোচনার বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করা থেকে সে সময়ে উভয় পক্ষই বিরত ছিল। তবে ডি পি ধর এই বৈঠকের একটি বিস্তারিত বিবরণী প্রস্তুত করেছিলেন। বর্তমানে সেটি ভারতের জাতীয় আর্কাইভে সংরক্ষিত আছে।

বৈঠকের আলোচনায় প্রধানত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আইনি কাঠামো নির্ধারণ, বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার এবং অনিয়মিত বাহিনীর হাতে থাকা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। এ ছাড়া বাংলাদেশে আটকে পড়া ‘বিহারি’দের বিনিময়ে পাকিস্তান থেকে বাঙালিদের ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে শেখ মুজিব তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ব্যক্ত করেন।

বৈঠকে বাংলাদেশের নবগঠিত প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দাকাঠামোর আধুনিকায়নে ভারতের কারিগরি ও প্রশিক্ষণ সহায়তার বিষয়টি নিয়েও বিস্তারিত কথা হয়। এসবের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এবং সপ্তম নৌবহরের গতিবিধি সম্পর্কে ডি পি ধর তাঁর গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন তুলে ধরেন। আলোচনায় গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার উন্নয়ন এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার রূপরেখাও বিশেষ প্রাধান্য পায়।

আঞ্চলিক রাজনীতি ও কূটনীতির ইতিহাসে ডি পি ধরের লেখা অতিগোপনীয় ও ব্যক্তিগত এই নথিটি অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ বিধায় নথির সম্পূর্ণ বাংলায় অনুবাদ প্রকাশ করা হলো। এই অনুবাদটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২৬ সালের প্রথম আলো'র ঈদ সংখ্যায়। অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ সাজ্জাদুর রহমান।

নথিটির সূত্র: ডি পি ধরের প্রস্তুত করা শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে কথোপকথনের বিবরণী, ২৯ জানুয়ারি ১৯৭২, সাবজেক্ট ফাইল ২৩৩, পি এন হাকসার পেপারস (তৃতীয় কিস্তি), এনএমএমএল।

শেখ মুজিব, ডিপি ধর এবং আবদুস সামাদ আজাদ। ১৯৭২, ২২ জানুয়ারির বৈঠকে।
দৈনিক বাংলা, ২৩ জানুয়ারি, ১৯৭২

অতি গোপনীয় (ব্যক্তিগত)

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষের আন্দোলনে আমার ব্যক্তিগত ভূমিকার কথা উল্লেখ করে শেখ মুজিবুর রহমান অত্যন্ত উষ্ণ ও স্নেহপূর্ণ স্মৃতিচারণার মাধ্যমে আলোচনা শুরু করলেন। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের বিভিন্ন দিক পরিচালনার জন্য একটি বিশেষ সংস্থা গঠন এবং বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষায় ভারত সরকারের নানামুখী প্রচেষ্টার সঙ্গে আমার মতো দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে যুক্ত করায় তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রতিও গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

প্রধানমন্ত্রীর প্রসঙ্গ আসতেই মুজিব দৃশ্যত আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি জানান, মিসেস গান্ধীকে তিনি কেবল বিদেশি সংবাদপত্রের ছবিতেই দেখেছেন, কারণ পাকিস্তান সরকারের নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমে তাঁর ছবি প্রকাশ করাও তখন অপরাধ হিসেবে গণ্য হতো। মুজিব বললেন, ‘আপনারা জানেন, পণ্ডিত নেহরুর জীবন ও আদর্শে আমি গভীরভাবে প্রভাবিত। আমি আমার পোশাক হিসেবে “জওহর জ্যাকেট” বেছে নিয়েছি—অবশ্য বাংলাদেশে একে “মুজিব কোট” বলা হয়। বাংলাদেশের মানুষ যদি মানুষ হয়, তাদের মধ্যে যদি সামান্যতম মূল্যবোধও অবশিষ্ট থাকে, তবে তারা কখনোই আপনার প্রধানমন্ত্রীর এই কৃতজ্ঞতার ঋণ শোধ করতে পারবে না। আমি তাঁর জন্য কিছু করতে চাই। আমি কী করতে পারি? আপনি কি এমন কোনো পরামর্শ দিতে পারেন, যার মাধ্যমে মিসেস গান্ধীর সাহসী নেতৃত্বে ভারতের জনগণ কয়েক মাস ধরে যে অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট সয়েছেন, তার সামান্যতম প্রতিদানও আমি দিতে পারি? আপনি কি মনে করেন, কলকাতার ময়দানের জনসভায় আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারি? আমি বিশ্ববাসীকে জানাতে চাই তাঁর সম্পর্কে, ভারতের জনগণ সম্পর্কে এবং তিনি যে মহান সংগঠনটির নেতৃত্ব দেন, তা সম্পর্কে আমি কী অনুভব করি। আমার জন্য এমনটা করা কি খুব বেমানান হবে? তবে আমি অত্যন্ত আগ্রহী যে আমার জনগণের কৃতজ্ঞতা আমি শিগগিরই এমন কোনো প্রকাশ্য পন্থায় ব্যক্ত করব, যা বিশ্ববাসী অনুধাবন করতে পারে।’ এ কথা বলতে গিয়ে তিনি পুনরায় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অত্যন্ত সশ্রদ্ধ মন্তব্য করলেন এবং হঠাৎ কান্নায় ভেঙে পড়লেন।

এরপর তিনি তিক্ততা, এমনকি ক্ষোভের সঙ্গে বাংলাদেশে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী ও কর্তৃপক্ষের নির্মম ও বর্বর ভূমিকার কথা তুলে ধরলেন। একের পর এক উদাহরণ দেওয়ার পর তিনি আমার দিকে ঘুরে আবারও গভীর আবেগের সঙ্গে বললেন, ‘আপনি কি জানেন, আজ আমি বড় একা। আমি আমার ৯০ শতাংশেরও বেশি আপনজন ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের হারিয়েছি। যখনই আমি ক, খ বা গ-এর খোঁজ করি, আমাকে সেই একই মর্মান্তিক উত্তর শুনতে হয়—তাদের হত্যা করা হয়েছে অথবা তারা নিখোঁজ। স্বজন হারানোর বেদনা এত বিশাল এবং আমার ক্ষত এত গভীর যে আমি জানি না জাতির ওপর নেমে আসা এই মহাবিপর্যয়ের রেশ কাটিয়ে আমি কবে পুরোপুরি সেরে উঠতে পারব। বন্ধু ও ভাই হিসেবে আমরা কেবল আপনাদের এবং আপনাদের প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে আছি—শুধু এই সংকট উত্তরণে সাহায্যের জন্য নয়, বরং আমাদের জনগণের এই চরম যন্ত্রণার মুহূর্তে তাদের স্নেহ ও সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যও। এ কারণেই আমি চাই, মিসেস গান্ধী খুব শিগগির বাংলাদেশ সফর করুন। আমি চাই, তিনি বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করুন এবং নিজের চোখে দেখুন তারা তাঁর প্রতি কতটা কৃতজ্ঞ। তাঁর কাছ থেকে সামান্য আশ্বাসের বাণী শোনার পর তারা কতটা স্বস্তি অনুভব করে, তা তিনি দেখুন।’

শেখ [মুজিব] যখন পাকিস্তানি দখলদার কর্তৃপক্ষ ও বাহিনীগুলোর হাতে সংঘটিত নৃশংসতার বিষয়টি উল্লেখ করলেন, তখন আমার মনে হলো—যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল, এ ধরনের অপরাধ তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা গঠন করা এবং বাছাইকরণের ভিত্তিতে এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপক্ষের মামলা জোরালো ও টেকসই করার জন্য প্রাথমিক ও বিশদ তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ ও সন্নিবেশিত করার পদ্ধতি-সম্পর্কিত প্রশ্নে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির একটি পরিষ্কার চিত্র পাওয়া প্রয়োজন। আমার মনে হলো, নৃশংসতার নিত্যনতুন তথ্য বেরিয়ে আসার ফলে অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাঁর মধ্যে প্রবল হলেও তাঁর সরকার এ বিষয়ে ঠিক কীভাবে এগোবে, সে সম্পর্কে তাঁর ধারণা খুব একটা স্পষ্ট ছিল না। শুরুতেই তিনি উল্লেখ করলেন যে ট্রাইব্যুনাল গঠনের জন্য তিনি জাতিসংঘের কাছে আবেদন জানিয়েছেন। আমি তাঁকে বললাম, রাজনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকে এটি অত্যন্ত বিচক্ষণ পদক্ষেপ হতে পারে, কিন্তু বাস্তব দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের বুঝতে হবে যে জাতিসংঘ তার সনদের আওতার মধ্যে থেকে এ ধরনের ট্রাইব্যুনাল গঠনে সহায়তা করতে পারে না। এমনকি যদি তাদের সেই আইনি এখতিয়ার থাকতও, তবু তারা এ ধরনের কোনো নজির সৃষ্টি করতে আগ্রহী হবে না। শোনা গেছে, তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আবেদন করেছেন যেন খ্যাতিমান আইনজ্ঞদের নিয়োগ দিয়ে একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয় এবং দখলদার কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো তদন্ত করা হয়। আমি পুনরায় তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললাম যে একটি ট্রাইব্যুনালকে বাস্তব রূপ দিতে হলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে কেবল অস্পষ্ট আবেদন জানালেই চলবে না। আইনজ্ঞদের কিছু আন্তর্জাতিক সংগঠন অবশ্যই রয়েছে, কিন্তু সেগুলো হয় ডানপন্থী অথবা বামপন্থী হিসেবে চিহ্নিত বা একপেশে। তাই এই দুই চরম পন্থা এড়িয়ে এমন কিছু আইনজ্ঞ নির্বাচন করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে, যাঁদের সততা প্রশ্নাতীত এবং যাঁরা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন; বরং কেবল পেশাগতভাবে দায়বদ্ধ। বস্তুত, এ ধরনের ট্রাইব্যুনাল গঠনের আইনি কর্তৃত্ব বাংলাদেশ সরকারের হাতেই ন্যস্ত। সুতরাং, বাংলাদেশ সরকারকেই এই ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। এই ট্রাইব্যুনালের নিরপেক্ষতা ও ন্যায়বিচারের সুনাম নিশ্চিত করতে অপরিহার্য না হলেও অন্যান্য দেশের কিছু আইনজ্ঞকে তাঁদের ব্যক্তিগত পরিচয়ে এর সঙ্গে যুক্ত করাটা হবে দূরদর্শী পদক্ষেপ। মুজিব জানতে চাইলেন, মিত্রবাহিনী অর্থাৎ ভারত ও বাংলাদেশের বাহিনীগুলোর পক্ষে কি এমন ট্রাইব্যুনাল গঠন করা সম্ভব নয়? আমি তাঁকে জানালাম, এই প্রক্রিয়ায় দুটি মারাত্মক ত্রুটি থেকে যাবে। প্রথমত, সাধারণ আইনের অধীন বিচারকার্য পরিচালনার জন্য বিচারিক বা আধা বিচারিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করা সামরিক বাহিনীর কাজ নয়। দ্বিতীয়ত, ভারতীয় বাহিনীকে ঠিক ‘মিত্রবাহিনী’ হিসেবে অভিহিত করা যায় না; কারণ তারা বাংলাদেশে কাজ করার কর্তৃত্ব পেয়েছে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক জারিকৃত এক সুস্পষ্ট ঘোষণার অধীন ‘সহায়ক বাহিনী’ হিসেবে।

আলোচনায় তদন্তকারী সংস্থার প্রসঙ্গটিও এল। এ বিষয়েও মুজিবের ধারণা অস্পষ্ট ছিল; তাঁকে বলা হয়েছিল, তদন্তকারী সংস্থায়ও আন্তর্জাতিক সদস্য থাকা বাঞ্ছনীয়। আমি তাঁকে জানালাম, তদন্তকারী সংস্থা গঠনের মতো জটিল কাজে এটি কোনো বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। কারণ, এই সংস্থার কাজ হবে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের বিশদ সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা এবং ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপনের জন্য রাষ্ট্রপক্ষের আইনি নথিপত্র বা সারসংক্ষেপ প্রস্তুত করা। তবে ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবীদের প্যানেলে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এক-দুজন আইনজীবীকে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। আমি বললাম, যা-ই হোক, বাংলাদেশ সরকারের এখন সবকিছুর আগে যে বিষয়টিতে মনোযোগ দেওয়া উচিত, তা হলো সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা, সেগুলো যাচাই-বাছাই করা এবং পরিশেষে রাষ্ট্রপক্ষের মামলাটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার লক্ষ্যে সেগুলো সুবিন্যস্ত করা। মুজিব জানতে চাইলেন, কীভাবে এটি করা সম্ভব? আমি বললাম, প্রাথমিকভাবে কাজটি করতে হবে পুলিশ কর্মকর্তাদের। তাঁদের সঙ্গে থাকবেন বিশিষ্ট আইনজীবীরা, যাঁদের মধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের শিক্ষকেরা থাকতে পারেন। প্রমাণ সংগ্রহের বিষয়টি যেন অনির্দিষ্ট পরিসরের অপরাধকে আওতাভুক্ত না করে, কিংবা তদন্তকারী সংস্থা যেন গুরুতর থেকে লঘু—সব ধরনের অপরাধের এলোমেলো অনুসন্ধানে নেমে না পড়ে। তাঁদের উচিত সর্বজনবিদিত এবং অত্যন্ত গুরুতর, বিশেষ করে গণহত্যা প্রকৃতির মামলাগুলো দিয়ে কাজ শুরু করা। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে শুরু হওয়া এই প্রচেষ্টার পাশাপাশি তদন্তকারী ও জিজ্ঞাসাবাদকারীদের একটি যৌথ দল কাজ করবে। এ দলে থাকবেন বাংলাদেশ সরকার ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রতিনিধি এবং ভারতের বিশেষজ্ঞ পুলিশ কর্মকর্তারা, যাঁরা বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে ভারতীয় সেনাবাহিনীর জিম্মায় যুদ্ধবন্দী হিসেবে আটক কিছু বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। এসব প্রক্রিয়ার বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা ঠিক করার জন্য অবিলম্বে কোনো একধরনের যৌথ কার্যব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। মুজিব এই সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে একমত প্রকাশ করলেন। এরপর তিনি হঠাৎ করেই আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, যুদ্ধবন্দীদের যুদ্ধাপরাধের বিচারের অনুমতি দিতে ভারতের কোনো অসুবিধা আছে কি না। তিনি জানতে চাইলেন, নিয়াজির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে আত্মসমর্পণের যে যৌথ শর্তাবলি নির্ধারিত হয়েছিল, তাতে আমরা পাকিস্তান বা অন্য কোনো দেশের কাছে এ বিষয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়েছি কি না। তিনি বললেন, এই প্রশ্নে ভারতের অবস্থান নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি রয়েছে। আমি মুজিবকে জানালাম, এ বিষয়ে ভারতের মনোভাব নিয়ে যদি কোনো বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়ে থাকে, তবে তার জন্য একমাত্র আমিই দায়ী। আমি তাঁকে বললাম, প্রায় এক মাস আগে আমি যখন ঢাকায় এসেছিলাম, তখন গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে যুদ্ধবন্দীদের বিচারের আইনি বৈধতার বিষয়টি আমাদের কাছে খুব একটা স্পষ্ট ছিল না। আমি তাঁকে জানালাম, ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনের সময় আমার অজ্ঞতার কারণেই এ বিষয়ে আমার বক্তব্যে কিছুটা দ্বিধা বা অস্পষ্টতা ছিল। আমি ভেবেছিলাম, জেনেভা কনভেনশন এবং যুদ্ধবন্দীদের প্রতি আচরণবিধি-সংক্রান্ত অন্যান্য সহযোগী কনভেনশনের কাঠামোর মধ্যে এ ধরনের বিচার হয়তো কোনো আইনি জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে। ইতিমধ্যে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইনবিশেষজ্ঞরা বিষয়টি খতিয়ে দেখেছেন এবং আমাদের নিশ্চিত করেছেন যে যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে যাঁদের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বা আচরণের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণ করা যাবে, তাঁদের নিয়মিত বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠন করার এখতিয়ার বাংলাদেশ সরকারের রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে নুরেমবার্গ ট্রায়ালে গৃহীত পদ্ধতিগুলো যুদ্ধবন্দীদের আচরণবিধি-সংক্রান্ত পূর্ববর্তী কনভেনশনগুলোকে হয় প্রতিস্থাপন করেছে, নয়তো উল্লেখযোগ্যভাবে সংশোধন করেছে। আমি মুজিবকে আশ্বস্ত করলাম, ভারতের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আমরা তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ীই চলব। উপরন্তু, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ ও সন্নিবেশ করার ক্ষেত্রে যদি আমরা তাঁকে কোনোভাবে সহায়তা করতে পারি, তবে তাঁর সরকারকে সেই সহায়তা দিতে পারলে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত হব। আমি মুজিবকে বললাম, ঠিক এ কারণেই পুরো বিষয়টি নিয়ে যে পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তার কর্মকাঠামো সম্পর্কে একটি ঘনিষ্ঠ সমঝোতা বা বোঝাপড়া গড়ে তোলার প্রস্তাব আমি দিয়েছি। মুজিব বললেন, তিনি এখন তাঁর উপদেষ্টাদের সঙ্গে আরও সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্টভাবে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবেন। তিনি আরও জানালেন, কলকাতায় মিসেস গান্ধীর সঙ্গে আলোচনার সময় তিনি যে বিষয়গুলোয় তাঁর চূড়ান্ত পরামর্শ চাইবেন, এটি হবে তার মধ্যে অন্যতম।

যুদ্ধবন্দী ও তাদের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনার সময় মুজিব বিহারিদের (যা বস্তুত বাংলাদেশে বসবাসরত অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়) প্রসঙ্গটিও তুললেন। একই সঙ্গে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের হয়ে কাজ করা বাঙালি বেসামরিক ব্যক্তি এবং বর্তমানে পাকিস্তান সরকারের হাতে আটক বাঙালি বেসামরিক ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের কথাও উল্লেখ করলেন। এরপর তিনি বললেন, ‘আমি আপনাকে অত্যন্ত গোপনে ও স্পষ্টভাবে একটি কথা বলতে চাই—আমার দেশের বৃহত্তর বাঙালি সমাজে বিহারিদের আত্তীকরণ করা আমার পক্ষে অসম্ভব। আমি তাদের নিরাপত্তা দিতে পারি, কিন্তু কাউকে তাদের চাকরি দিতে বাধ্য করতে পারি না। তারা অমানবিক অপরাধ করেছে। শত শতাব্দী পার হলেও বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে এই অভিজ্ঞতার দগদগে স্মৃতি মুছে ফেলা কঠিন হবে। পাকিস্তানে বর্তমানে আটকে পড়া আমাদের বাঙালি জনগণের সঙ্গে এই বিহারিদের বিনিময়ের কোনো একটি উপায় আমাদের বের করতেই হবে। দয়া করে আমাকে ভুল বুঝবেন না। বিহারিদের প্রতি আমার কোনো বিদ্বেষ নেই। অনুগ্রহ করে আপনার প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করবেন যে আজ বাংলাদেশে আমি যে রূঢ় বাস্তবতার সম্মুখীন, তার কারণেই আমি এমনটি ভাবতে বাধ্য হচ্ছি। আমি এ বিষয়ে আর কারও সঙ্গে কথা বলিনি। আমি চাই আপনি বিষয়টি নিয়ে ভাবুন এবং আপনার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করুন, যাতে এই বিনিময়ব্যবস্থা কার্যকর করার ক্ষেত্রে তিনি আমাকে দিকনির্দেশনা দিতে পারেন।’

তিনি তড়িঘড়ি করে আরও যোগ করলেন, ‘আপনি কি জানেন কারা হঠাৎ বিহারিদের প্রবল হিতৈষী হয়ে উঠেছে? বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি। মণিদা (মণি সিংহ) আমার সঙ্গে দুবার দেখা করেছেন এবং চেয়েছেন আমি যেন তাদের জন্য কিছু করি। এ কারণেই আমি সর্বদা বিশ্বাস করি যে কমিউনিস্টরা ভারত, বাংলাদেশ বা এমনকি পাকিস্তান—কোনো জায়গারই বাস্তব পরিস্থিতির সংস্পর্শে নেই। ধর্মনিরপেক্ষতার দোহাই দিয়ে তারা চায় আমি যেন অপরাধীদের আমার সমাজের মধ্যেই রেখে দিই। আপনি কি মনে করেন অপরাধীদের ছাড় দেওয়া ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে? এ সমস্যা সমাধানে আপনাকে অবশ্যই আমাকে সাহায্য করতে হবে। আমাদের এই বিহারিদের বিদায় করতেই হবে।’

আমি মুজিবকে বললাম, আমি তাঁর অনুভূতি খুব ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পারছি। ২৫ মার্চের আগে ও পরে বাংলাদেশের অবাঙালিরা সামগ্রিকভাবে অত্যন্ত জঘন্য ভূমিকা পালন করেছিল। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের সুনামের বৃহত্তর স্বার্থে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির কথা বিবেচনা করে আমি তাঁকে পরামর্শ দিলাম, তিনি যে নতুন সমাজ গড়ার চেষ্টা করছেন, সেখানে এই অংশটিকে একীভূত করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হোক। সর্বোপরি, এই কঠিন কাজটি সম্পন্ন করার মতো কর্তৃত্ব ও সক্ষমতা তাঁর রয়েছে। তিনি অধৈর্য হয়ে পাল্টা জবাব দিলেন, ‘না, না, এটা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি এতে বিশ্বাসী নই। আমার বাংলায় তাদের কোনো স্থান নেই। আমার জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। আপনাকে এমন একটি সূত্র বের করে দিতে হবে, যাতে আমি বিহারিদের বিনিময়ে পাকিস্তান থেকে আমার বাঙালিদের ফিরিয়ে আনতে পারি। আমি পাকিস্তানের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখতে চাই না। আমি চাই না আমার সমাজে এমন কোনো উপাদান বা গোষ্ঠী টিকে থাকুক, যারা ভবিষ্যতে পাকিস্তানের প্রবক্তা হয়ে উঠতে পারে। বিহারিদের যেতেই হবে।’ আমি মুজিবকে বললাম, সমস্যাটি আমাদের আবারও বাস্তবতার নিরিখে দেখতে হবে। বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে পারস্পরিক ক্ষমতার ভারসাম্যের ভিত্তিতে—অর্থাৎ একদিকে পাকিস্তান আমাদের বিরুদ্ধে কতটা সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করতে পারে, অন্যদিকে একটি সম্মানজনক সমাধানের জন্য আমরা পাকিস্তানের ওপর কতটা চাপ সৃষ্টি করতে পারি। আমি তাঁকে জানালাম, দিল্লিতে ফিরে আমি আমার সহকর্মীদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব এবং আমরা একে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেব। তিনি আবার বাধা দিয়ে প্রবলভাবে মাথা নেড়ে বললেন, ‘না, না, আপনার সহকর্মীদের সঙ্গে নয়; শুধু মিসেস গান্ধীর সঙ্গে।’

এরপর মুজিব আবার সেই ঘটনাবলির প্রসঙ্গে ফিরে গেলেন, যা ২৫ মার্চের হামলা-পরবর্তী গণহত্যার পটভূমি রচনা করেছিল। তিনি ইয়াহিয়ার সেই ষড়যন্ত্রের বিস্তারিত বিবরণ দিলেন, যা এখন সবারই জানা। পরিকল্পনা ছিল, মুজিব যদি ছদ্মবেশে নিরাপদ কোনো স্থানে পালানোর চেষ্টা করেন, তবে তাঁকে হত্যা করা হবে। তিনি জানালেন, তাঁর পলায়নের অজুহাত দেখিয়ে ইয়াহিয়ার সেনাবাহিনী যাতে বাংলাদেশের জনগণের ওপর পরিকল্পিত নিপীড়ন চালানোর সুযোগ না পায়, সে কারণেই তিনি তাৎক্ষণিকভাবে পাকিস্তান বাহিনীর কাছে ধরা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আমাকে স্বীকার করতেই হবে যে তিনি যেভাবে প্রতিটি ঘটনার খুঁটিনাটি বর্ণনা করছিলেন এবং এই তত্ত্বের সত্যতা সম্পর্কে আমাকে বোঝানোর জন্য সচেতনভাবে প্রয়াস চালাচ্ছিলেন, তাতে আমার মনে একধরনের সন্দেহের উদ্রেক হলো। মনে হলো, এই ব্যাখ্যা পরবর্তী সময়ে ভেবে দাঁড় করানো হয়েছে কি না।

আমি মুজিবকে বললাম, ২৫ মার্চের রাতের সাংঘাতিক ঘটনাবলির আগের পুরো আলোচনার গতিপ্রকৃতি নিয়ে আমরা বেশ বিভ্রান্ত ছিলাম। জাহাজে করে একের পর এক পাকিস্তানি সৈন্য বাংলাদেশে আনা হচ্ছিল, বাংলাদেশের জনগণের মুক্তির সংগ্রামকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য সর্বাত্মক সংঘাতের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল; অথচ আলোচনা কেবল দীর্ঘায়িতই হচ্ছিল। এতে বিশ্ববাসী ধারণা করছিল, এমনকি তাদের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছিল যে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রকৃত রূপরেখা চূড়ান্ত করা হচ্ছে। বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে আমাদের অজ্ঞতার কারণ হতে পারে এই যে আমাদের তথ্য পাওয়ার কোনো উৎস ছিল না। বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনার পর দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের মিশন বহির্জগৎ থেকে যোগাযোগ-বিচ্ছিন্ন ছিল। আমি মুজিবকে স্মরণ করিয়ে দিলাম যে বাংলাদেশের ওপর এই মর্মান্তিক ঘটনাগুলো নেমে আসার আগে প্রায় দুই বছর তিনিও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কোনো চেষ্টা করেননি। আমি তাঁকে বললাম, আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষী ও প্রতিবেশী হিসেবে যোগাযোগ থাকলে আমরা হয়তো পাকিস্তানের রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি প্রতিরোধে এবং পরে ইয়াহিয়ার দমনমূলক সামরিক যন্ত্রের নিষ্ঠুরতা কিছুটা হলেও রোধ করতে তাঁকে সাহায্য করতে পারতাম।

মুজিব আমার দিকে ঘুরে বললেন, ভারতের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল, এ কথা সত্য। তিনি অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে আমাকে জানালেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার পর তাঁকে খুব সতর্ক থাকতে হয়েছিল। তা সত্ত্বেও মুজিব দাবি করলেন যে তিনি মিসেস গান্ধীর কাছে একটি বার্তা পাঠিয়েছিলেন যেন বাংলাদেশে সৈন্যসমাবেশ বন্ধ করার জন্য কিছু করা হয়। সেই বার্তায় তিনি উপযুক্ত সময়ে প্রকাশ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার ইচ্ছার কথাও উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু কোনোভাবে সেই বার্তা তাঁর কাছে পৌঁছায়নি। আমি মুজিবকে বললাম, ‘এটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। আমি এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাটি শুনেছি, কিন্তু মিসেস গান্ধীর কাছে সেই বার্তা না পৌঁছানোর কারণ আমরা এখনো উদ্‌ঘাটন করতে পারিনি।’ আমি জানতে চাইলাম, যোগাযোগের এই মর্মান্তিক ব্যর্থতার জন্য কারা দায়ী, তা তিনি এখন চিহ্নিত করতে পেরেছেন কি না। মুজিব বললেন, তিনি জোরেশোরে বিষয়টি তদন্ত করছেন। তিনি আশা করেন, সত্য বেরিয়ে আসবে এবং যারা তাঁর ও তাঁর বিশ্বাসের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তিনি তাদের চিনতে পারবেন। (এখানেও আমি নিশ্চিত নই যে মুজিব আদৌ আমাদের কাছে এমন কোনো বার্তা পাঠিয়েছিলেন কি না। অন্য বিষয়টির মতো এ ক্ষেত্রেও আমার মনে হয়, বার্তা পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়ার এই তত্ত্বটি সম্ভবত পরে সাজানো একটি ভাবনা।) আমি এই সুযোগে মুজিবকে জানালাম, সুদূর মস্কো থেকে বাংলাদেশের ঘটনাবলি আমার কাছে কেমন মনে হতো। আমি বললাম, ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের বিমান ছিনতাইয়ের পর পাকিস্তান মরিয়া হয়ে আমাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে চেয়েছিল, যাতে আগের অবস্থা ফিরিয়ে আনা যায় এবং তাদের ঢাকাগামী বিমানগুলোকে ভারতের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়। প্রকৃতপক্ষে এমন প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল যে মস্কোতে আমি এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত জামশেদ মার্কার যেন গোপনে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করি। আমি সরাসরি তা প্রত্যাখ্যান করি। কারণ, বাংলাদেশে উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে আমার কোনো অসাধারণ জ্ঞান আছে, এমন ধারণা না দিয়েও—আমার মনে হয়েছিল, শুধু পশ্চিম থেকে পূর্ব পাকিস্তানে বিমান চলাচল পুনরায় চালু করার উদ্দেশ্যে ভারতীয় বিমান ছিনতাইয়ের বিষয়ে আলোচনার জন্য পাকিস্তানের এমন নির্লজ্জ অনুনয়-বিনয়ের পেছনে নিশ্চয়ই কোনো দুরভিসন্ধি রয়েছে। আমি মুজিবকে জানালাম, সোভিয়েত পররাষ্ট্র দপ্তর আমাকে জানিয়েছিল যে তাদের প্রতিনিধি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। মস্কোতে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের কাছ থেকেও আমি জানতে পারি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। বস্তুত আমাকে এমন ধারণা দেওয়া হয়েছিল যে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়ই একই সঙ্গে তাঁর [মুজিব] ও ইয়াহিয়া খানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। মস্কোর কূটনৈতিক মহলে এমন ধারণা প্রচলিত ছিল যে আলোচনা যখন প্রায় সফল সমাপ্তির পথে, ঠিক তখনই মিস্টার ভুট্টো ঢাকায় এসে সব হিসাব-নিকাশ উল্টে দেন এবং হঠাৎ করেই আলোচনা ভেঙে যায়। আমি মুজিবকে বললাম, আলোচনার পুরো সময়ে তিনি যে অসামান্য যুক্তিবোধের পরিচয় দিয়েছিলেন, মস্কোর কূটনৈতিক মহল তার ভূয়সী প্রশংসা করেছিল। আমি তাঁকে জানালাম, ব্যক্তিগতভাবে আমি শুরু থেকেই সন্দিহান ছিলাম এবং আমার রুশ বন্ধুদেরও তা বলেছিলাম; কারণ বাংলাদেশে সামরিক ও পুলিশ বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধির সঙ্গে মুজিব ও ইয়াহিয়ার আলোচনায় কথিত ‘আন্তরিকতা’র কোনো মিল আমি খুঁজে পাচ্ছিলাম না। ব্রিটিশ সূত্র থেকে আমি জানতে পেরেছিলাম যে ফারল্যান্ড (ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কনসাল জেনারেল/রাষ্ট্রদূত) একধরনের দ্বিমুখী ভূমিকা পালন করছিলেন। পরে পাকিস্তানে আমাদের শেষ হাইকমিশনার মিস্টার অটল বিমানে করে কলকাতায় আসার সময় আমাকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, ফারল্যান্ড তাঁর এবং ভারতের মনোভাবের তীব্র সমালোচনা করতেন। তিনি প্রতিটি সুযোগে আগ বাড়িয়ে পাকিস্তানের বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করতেন এবং বাংলাদেশের দাবির পক্ষে হস্তক্ষেপ করার জন্য ভারতের নিন্দা করতেন।

এ কথা শুনে মুজিব রাগে লাল হয়ে গেলেন এবং ভদ্রতার তোয়াক্কা না করে চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘ফারল্যান্ড আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে বড় “হারামজাদা”। আসলে যদি সম্ভব হতো, তবে যেসব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তার জন্য আমি টিক্কা খানের চেয়েও তাকে বেশি দোষী সাব্যস্ত করতাম।’ তারপর মুজিব আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি আমেরিকান প্রতিনিধিদের সঙ্গেও দেখা করতেন বলে সোভিয়েতরা তাঁকে সন্দেহ করত কি না। আমি তাঁকে বললাম, খোলাখুলি বলতে গেলে তারা তাঁকে সন্দেহ করেনি; বরং তাদের মনে হয়েছিল ইয়াহিয়া খান কেবল মুজিবের সঙ্গেই নয়, সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গেও প্রতারণা করেছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সমান্তরাল মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা তাদের মনে কিছুটা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে থাকতে পারে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের প্রতি বিভিন্ন দেশের মনোভাব সম্পর্কে জানতে মুজিব অত্যন্ত কৌতূহলী ছিলেন। আমি তাঁকে বাংলাদেশের দাবির প্রতি আন্তর্জাতিক মনোভাব এবং এর সমর্থনে ভারত যেসব পদক্ষেপ নিয়েছিল, তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিলাম। ১৩ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে পাঠানো প্রেসিডেন্ট পদগোর্নির প্রকাশ্য আবেদনের প্রেক্ষাপট এবং সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের জন্য ইয়াহিয়ার ওপর সোভিয়েত ইউনিয়ন যে ধারাবাহিক চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করেছিল, তা আমি বর্ণনা করলাম। আমি মুজিবকে বললাম, এটি বোঝা প্রয়োজন যে একেবারে শেষ পর্যায় পর্যন্ত এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নও পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিম অংশের সম্পূর্ণ বিচ্ছেদের কথা ভাবেনি। এরপর আমি আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সোভিয়েত নেতৃত্বের ত্রয়ীর (ত্রোইকা) বৈঠকের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিলাম—কীভাবে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ভালো-মন্দ, মুজিবের নেতৃত্বের প্রগতিশীল গুণাবলি এবং গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের প্রতি তাঁর অবিচল নিষ্ঠার বিষয়টি তাদের সামনে তুলে ধরা হয়েছিল। আমি মুজিবকে জানানো সমীচীন মনে করলাম যে স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি কোন রাজনৈতিক লক্ষ্যগুলো এগিয়ে নেবেন, সে বিষয়ে স্বচ্ছতার কিছুটা অভাব ছিল।

বাংলাদেশের জনগণের দাবি ও স্বার্থ বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত যোগাযোগ, দিল্লিতে পররাষ্ট্র দপ্তর ও বিভিন্ন দেশে নিযুক্ত আমাদের মিশনপ্রধানদের কূটনৈতিক তৎপরতা এবং বিশেষভাবে গঠিত মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধিদলের প্রচেষ্টার কথা আমি মুজিবকে অবহিত করলাম।

আমি তাঁকে ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তির পটভূমি সম্পর্কেও জানালাম। আমি বললাম, বিশ্ব তখন বাংলাদেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি, এমনকি পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কহীন একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অস্তিত্বের ধারণার প্রতিই বৈরী মনোভাব পোষণ করছিল। অন্যদিকে ভারত সরকার বাংলাদেশের জনগণের পরাধীনতার শৃঙ্খল দ্রুত মোচনের লক্ষ্যে প্রয়োজনে সামরিক হস্তক্ষেপ করারও সংকল্প নিয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের একজন নির্ভরযোগ্য ও স্থায়ী মিত্রের সন্ধান করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল।

আমি স্মরণ করিয়ে দিলাম, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ভোটাভুটির ধরন থেকেই মুজিব নিশ্চয়ই অনুধাবন করতে পেরেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন তাঁর লক্ষ্যের প্রতি কতটা বৈরী মনোভাব পোষণ ও লালন করত। বিশ্বমঞ্চে তাঁর এবং আমাদের বিরুদ্ধে কী বিপুল প্রতিকূলতা সাজানো ছিল, তা নিশ্চয়ই তিনি বুঝতে পেরেছেন। তবু এটি ছিল এক মর্মান্তিক পরিহাস যে আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ সরকারের আমাদের কিছু বন্ধু এবং ভারতের কিছু প্রতিক্রিয়াশীল মহল ভারত-সোভিয়েত চুক্তিকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিল। তাদের ধারণা ছিল, বাংলাদেশের মুক্তির জন্য অবাধ পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করাই ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের উদ্দেশ্য। এ পর্যায়ে আমি মুজিবকে বললাম, সম্ভবত আমি তাঁর অনেকটা সময় নিচ্ছি। গত ৯ মাস তিনি তাঁর জনগণ ও ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু থেকে দূরে থাকাকালে যেসব ঘটনা ঘটেছে, তার খুঁটিনাটি বিবরণ দিয়ে হয়তো তাঁকে বিরক্তই করছি। কিন্তু তাঁর কৌতূহল যেন শিশুর মতোই বেড়ে গেল। তিনি অত্যন্ত উষ্ণতার সঙ্গে বললেন, আমরা তো মাত্র দেড় ঘণ্টা কথা বলেছি। তিনি চাইলেন আমরা যেন দিনের পর দিন কথা বলতে পারি এবং অতীতের ঘটনাগুলো আরও বিস্তারিতভাবে আলোচনা করতে পারি, যাতে বাংলাদেশ সরকারের ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ড এই অভিজ্ঞতার আলোকে পরিচালিত হতে পারে। তিনি স্বীকার করলেন, অনেক তথ্যই তাঁর অজানা ছিল। (প্রকৃতপক্ষে তাজউদ্দীন [আহমদ], মনসুর আলী, [সৈয়দ] নজরুল ইসলাম ও [আবদুস] সামাদ [আজাদ] আমাকে জানিয়েছিলেন যে তাঁর অনুপস্থিতিতে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর বিস্তারিত জানাতে এখন পর্যন্ত কেউ তাঁর সঙ্গে পাঁচ মিনিট কথা বলারও সুযোগ পাননি।) তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর হামলার পরপরই ভারত কেন হস্তক্ষেপ করেনি? তাহলে হয়তো অনেক দুর্ভোগ লাঘব হতো এবং মূল্যবান প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হতো। আমি মুজিবকে বললাম, আমি আগেই উল্লেখ করেছি যে এই মর্মান্তিক ঘটনার আগে কয়েক বছর ধরে তাঁর সঙ্গে আমাদের কোনো যোগাযোগ ছিল না। আর তিনি যেসব পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের সামনে এমন কোনো ভিত্তি ছিল না, যার ওপর দাঁড়িয়ে আমরা আমাদের নীতি নির্ধারণ করতে পারতাম বা কোনো পদক্ষেপ নিতে পারতাম। (আমি কথা বাড়াতে চাইলাম না। কারণ, আমার মনে হলো, আমি যদি আরও বিস্তারিত বা খোলাখুলিভাবে বলি, তবে তা হয়তো তাঁর নিজের কিছু ব্যর্থতা সম্পর্কে তাঁকেই সচেতন করার শামিল হবে। আমার মনে হয়, প্রধানমন্ত্রী নিজেই হয়তো মুজিবের সঙ্গে আলোচনায় এ বিষয়টি তুলবেন।)

মুজিব তখন আমাকে বললেন, আমেরিকানদের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি এখন পরিষ্কার। তিনি বললেন, ‘সত্যি বলতে কি, ঢাকায় পৌঁছানোর পর আমার প্রথম বক্তৃতায় আমি যে বলেছিলাম আমি আমেরিকার সাহায্য গ্রহণ করতে প্রস্তুত, তার জন্য আমি আপনার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। বিশ্বাস করুন, তখন আমি আসল ঘটনা জানতাম না। যখন আমেরিকান কনসাল জেনারেল আমার কাছে এসেছিলেন, আমি তাঁকে বলেছিলাম, আমি একজন আত্মমর্যাদাশীল মানুষ। আমার দেশের স্বাধীনতা আমার জনগণকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস গান্ধীর দেওয়া এক উপহার। তিনি আপনাদের সাহায্য প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি আমাদের যে সাহায্য করেছেন, তাঁর ওপর যে যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং এখন আপনারা ভারত থেকে যে সাহায্য প্রত্যাহার করে নিয়েছেন—এসব কারণে তাঁর চতুর্থ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার লক্ষ্যমাত্রা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমি তাঁকে বলেছিলাম, মুজিব এত নিচু মনের মানুষ নন যে তাঁর কারণে তাঁর বন্ধু ভারত যখন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তখন তিনি আপনাদের সাহায্য গ্রহণ করবেন। আমি মিসেস গান্ধীর সঙ্গে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করব। আমি তাঁর অগোচরে কিছুই করব না। আমি তাঁর পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা চাইব। সর্বোপরি, তিনি আমার কাছে রক্তের সম্পর্কের বোনের চেয়েও আপন। প্রশাসনিক কাজে তাঁর অভিজ্ঞতা আছে। তিনি একটি বিশাল দেশ শাসন করছেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি আমার জন্য যা করেছেন, এরপর তাঁর কাছ থেকে আমার অনেক শেখার আছে। আপনি আমার গলায় হাত দিয়ে দেখুন। এখানে ফাঁসির দড়ি ছিল। কে আমার গলাকে সেই দড়ি থেকে বাঁচিয়েছে? তিনি আপনার প্রধানমন্ত্রী।’ এরপর তিনি আবারও কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তাঁর গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল।

কিছুটা সামলে ওঠার পর তিনি ব্রিটিশ, ফরাসি এবং অন্যদের মনোভাব সম্পর্কে আমার কাছে জানতে চাইলেন। আমি তাঁকে জানালাম, সন্তোষজনক বিষয় হলো ব্রিটিশরা ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ের প্রতি তাদের মনোভাব নির্ধারণে যথেষ্ট সতর্কতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে। তবে একটি বিষয় নিঃসন্দেহে পরিষ্কার ছিল—আমি তাঁকে বললাম, তারা যে রাষ্ট্রটি সৃষ্টি করেছিল, অর্থাৎ পাকিস্তান, সেটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাক, তা তারা চায়নি। ইয়াহিয়ার প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবসম্মত ছিল এই অর্থে যে তারা মনে করেছিল ইয়াহিয়া তাদের পরামর্শ মেনে চললে হয়তো তখনো পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষীণ সূত্রটুকু টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে। ব্রিটিশ জনমত, সংবাদমাধ্যম ও অন্য প্রচারমাধ্যমগুলো ব্যাপকভাবে বাংলাদেশের দাবির পক্ষে ছিল; এমনকি ব্যতিক্রম হিসেবে তারা তাদের চিরকালীন বিরাগভাজন ভারতের প্রতিও ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছিল। আমি মনে করি, ব্রিটিশ পার্লামেন্টের প্রায় ৩০০ জন সদস্য বাংলাদেশের দাবির সমর্থনে প্রস্তাব উত্থাপন করে যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন, সে বিষয়টিকে আমাদের খাটো করে দেখা উচিত নয়। আমাদের মিশন এবং বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রতিনিধি—যিনি বাংলাদেশের অত্যন্ত প্রতিভাবান একজন সন্তান এবং বর্তমানে আপনাদের প্রজাতন্ত্রের সম্মানিত রাষ্ট্রপতি, বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী—আপনার দাবির প্রতি ব্রিটিশ জনমতের আগ্রহ ধরে রাখতে অসামান্য ভূমিকা পালন করেছেন। ফরাসিরা ধীরে এগোলেও শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারতের অবস্থান এবং আপনাদের দাবির পক্ষে নির্ণায়ক ভূমিকা নিয়েছিল। প্যারিসে আমাদের মিশন দারুণ কাজ করেছে। আলোচনার সময় আমি আগেই মুজিবকে জানিয়েছিলাম যে ব্রেজনেভও তাঁর ফ্রান্স সফরের সময় পম্পিদুর মতামত তৈরিতে অবদান রেখেছিলেন। সর্বোপরি মিসেস গান্ধীই ছিলেন মূল চালিকা শক্তি; পশ্চিম ইউরোপ ও আমেরিকায় তাঁর দীর্ঘ ও শ্রমসাধ্য সফরই বাংলাদেশের দাবির পক্ষে বিশ্বজনমতকে প্রভাবিত করেছিল।

এরপর মুজিব সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃক বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে বিলম্বের কারণ সম্পর্কে কথা বললেন। তিনি জানালেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে তিনি চেয়ারম্যান কোসিগিনের কাছে একটি চিঠি লিখেছেন; তবে তিনি সামাদকে (পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদ) নির্দেশ দিয়েছেন, আমার সঙ্গে পরামর্শ না করা পর্যন্ত যেন চিঠিটি পাঠানো না হয়। তিনি পররাষ্ট্র দপ্তরকে চিঠিটি আমাকে দেখানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। আমি মুজিবকে জানালাম, আমি চিঠিটি দেখেছি। এটি যথাযথভাবেই লেখা হয়েছে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে পুনরায় সংযোগ স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়ে ভুট্টো বিভিন্ন দেশের মনে যে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছিলেন, এই চিঠি তার অবসান ঘটাবে। আমি তাঁকে আমার বিনীত অভিমত জানালাম যে চেয়ারম্যান কোসিগিনের কাছে পাঠানোর জন্য তাঁর এই চিঠির অনুমোদন দেওয়া উচিত। মুজিব আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, এই চিঠি পাওয়ার পরপরই কি সোভিয়েত ইউনিয়ন স্বীকৃতি দেবে বলে আমি মনে করি? আমি বললাম, আমি যদি রুশদের অভিপ্রায় সঠিকভাবে অনুমান করতে পারি, তবে ক্রেমলিনে চিঠি পৌঁছানোর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই স্বীকৃতি চলে আসা উচিত। তাঁকে কিছুটা সন্দিহান মনে হলো। তিনি বললেন, এ বিষয়ে তিনি অতটা নিশ্চিত নন; কারণ তাঁর মনে হয়, সোভিয়েত ইউনিয়ন হয়তো তাঁর ও ভুট্টোর মধ্যে সমদূরত্ব বজায় রাখতে চাইবে। আমি তাঁকে বললাম, চেয়ারম্যান কোসিগিনকে চিঠি লিখে তিনি তাঁর জনগণের প্রতি নিজের কর্তব্য পালন করেছেন। পাশাপাশি সোভিয়েতদের মনে যদি কোনো ভয় বা সন্দেহ থেকেও থাকে, তা দূর করার উদ্যোগও তিনি নিয়েছেন। এরপরও যদি সোভিয়েতরা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে দেরি করে, তবে দোষ ও ক্ষতি—উভয়ই তাদেরই হবে।

তারপর তিনি আরেকটি বিষয়ে আমার পরামর্শ চাইলেন, যেটি ম্যাকনামারার (বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকনামারা) ভারত ও ঢাকা সফর–সংক্রান্ত। আমি তাঁকে জানালাম, ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগেই আমরা বিষয়টি বিবেচনা করেছি। বিশ্বব্যাংকে আমাদের পরিচালক, ওয়াশিংটনে আমাদের মিশন এবং জেনেভায় আমাদের মিশনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমরা আশঙ্কা করছি, ম্যাকনামারা হয়তো আমাদের অনুরোধ করবেন যেন আমরা বিশ্বব্যাংকের হয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে মধ্যস্থতা করি। এর উদ্দেশ্য হলো, সাবেক পাকিস্তানের সম্পদ ও দায়দেনার প্রশ্নে কোনো একধরনের আলোচনা শুরু করতে বাংলাদেশকে রাজি করানো। আমি মুজিবকে বললাম, দ্বিতীয়ত, বিনিময়ে সুবিধা হিসেবে তিনি সম্ভবত আমাদের উভয়ের সামনে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার উন্নয়নের জন্য—যেমন বিদ্যুৎ উৎপাদন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদির ক্ষেত্রে—বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের টোপ দিতে পারেন। সবশেষে, তিনি যদি নির্দেশ পেয়ে থাকেন, তবে হয়তো বিশ্বব্যাংকের সাহায্যের প্রশ্নে আমাদের ওপর আরও একটু চাপ প্রয়োগ করে কিসিঞ্জারের ইচ্ছা পূরণ করার চেষ্টা করবেন। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, প্রথম ইস্যুটিতে আমরা তাঁকে সরাসরি আপনার সঙ্গে কথা বলতে বলব এবং মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে অস্বীকৃতি জানাব। আমি ব্যক্তিগতভাবে মুজিবকে আরও পরামর্শ দিলাম যে সাবেক পাকিস্তানে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের বিষয়টি একদিন ঋণ পরিশোধের দায় বণ্টনের ক্ষেত্রে তাঁদের সামনে আসবে। তাই পুরো সমস্যাটি নিয়ে একটি সমীক্ষা চালানো ফলপ্রসূ হবে। সৌভাগ্যবশত, বাংলাদেশের কয়েকজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ইতিমধ্যেই সাবেক পাকিস্তানের দুই অংশের বিনিয়োগ কাঠামোর পরিমাণগত ও গুণগত দিক নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁরা বিনিয়োগযোগ্য পুঁজি বণ্টন ও সম্পদ সৃষ্টির ক্ষেত্রে চরম বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরেছেন। আমি তাঁকে বললাম, আমার প্রাথমিক অভিমত হলো, বাংলাদেশ একটি নতুন রাষ্ট্র—এই যুক্তি ছাড়াও তারা দাবি করতে পারে যে প্রতিরক্ষা ও উন্নয়ন উভয় ক্ষেত্রেই বৈদেশিক সাহায্য ও বিনিয়োগের পুরো বিষয়টি মূল্যায়ন করা উচিত এবং জনসংখ্যার অনুপাতে তা ভাগ করা উচিত। আমি তাঁকে সতর্ক করে বললাম, অর্থনীতির বিষয়ে আমি একেবারেই অজ্ঞ, তাই আমি এটুকুই পরামর্শ দিতে পারি যে বিশ্বব্যাংক বা অন্য কোনো ঋণদানকারী সংস্থা বা দেশ—যেখান থেকেই এ ধরনের প্রস্তাব আসুক না কেন, তার প্রতি কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা উচিত। মুজিব বললেন, তিনি আমার সঙ্গে পুরোপুরি একমত এবং ম্যাকনামারাকে ঢাকা সফরের কোনো আমন্ত্রণ জানাবেন না। তবে তিনি যদি ঢাকায় আসতে চান, তবে তাঁকে স্বাগত জানানো হবে এবং আমি যা উল্লেখ করেছি, তিনি তাঁকে ঠিক তা-ই অক্ষরে অক্ষরে বলে দেবেন; কারণ এ বিষয়ে তাঁর নিজস্ব মতও একই। ভারত এই প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন।

তারপর মুজিব জানতে চাইলেন, তাঁর কানে আসা সেই গুজবগুলো সম্পর্কে আমি কিছু জানি কি না—যেখানে বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব ও সরকারের একটি অংশ তাঁর অগোচরে ছয় দফার ভিত্তিতে আমেরিকানদের সঙ্গে সমঝোতা বা দরাদরি করার চেষ্টা করছিল। আমি মুজিবকে বললাম, জীবনে এমন অনেক কথা আছে যা বলা প্রয়োজন, আবার অনেক কথা আছে যা অনুচ্চারিত থাকাই শ্রেয়। কারও অগোচরে কথা বলা আমার অভ্যাস নয়। দুর্ভাগ্যবশত ঠিক সেই মুহূর্তে সামাদ [পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদ] কক্ষে প্রবেশ করলেন। আমি মুজিবকে বললাম, এই তথ্যগুলো তাঁর নিজের সহকর্মীদের কাছ থেকে জেনে নেওয়াই শ্রেয় হবে। সম্ভবত তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রীই তাঁকে এসব তথ্য দেওয়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি। আমি মুজিবকে বললাম, এর অর্থ এই নয় যে ঘটনাগুলো আমাদের অজানা। কিন্তু এটি এতটাই স্পর্শকাতর বিষয় যে আমাদের এই প্রথম সাক্ষাতে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা না করার জন্য আমি তাঁর কাছে মার্জনা চাইছি। অবশ্য একটি কথা আমি বলতে পারি—ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা এবং দিল্লিতে তাঁদের রাষ্ট্রদূত একাধিকবার আমাদের বলেছিলেন যে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের একাংশের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য মার্কিন সরকার যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, ভারত তাতে বাধা সৃষ্টি করছে। আমাদের অবস্থান জনসমক্ষে জানানো হয়েছিল এবং ব্যক্তিগত আলাপচারিতায়ও আমরা তাদের কাছে তার পুনরাবৃত্তি করেছি। আমরা স্পষ্ট জানিয়েছিলাম, শেখ মুজিবুর রহমানের অবিসংবাদিত নেতৃত্বে বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে গ্রহণযোগ্য যেকোনো সমাধান আমাদের কাছেও গ্রহণযোগ্য হবে। বস্তুত, বিষয়টি আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার প্রশ্নের ওপর নির্ভরশীল ছিল না। শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর জনগণের ভবিষ্যতের জন্য বৈধ ও ন্যায়সংগত সমাধান হিসেবে যা গ্রহণ করবেন, সারা বিশ্বেরই তা মেনে নেওয়া উচিত। আমরা সম্ভবত কূটনৈতিক সতর্কতার সীমা কিছুটা লঙ্ঘন করেই আমেরিকান এবং অন্যদের কাছে স্পষ্ট করে দিয়েছিলাম যে বাংলাদেশ সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে শুরু হওয়া যেকোনো আলোচনায় শেখ মুজিবুর রহমানকে পাশ কাটানোর যেকোনো অপচেষ্টা আমরা আমাদের সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিহত করব। আমি মুজিবকে বললাম, এটি কোনোভাবেই তাঁকে খুশি করার জন্য বা তাঁর প্রতি করুণা প্রদর্শনের জন্য ছিল না। এটি ছিল আমাদের কাছে একটি নীতিগত প্রশ্ন। আমরা বিশ্বাস করি, জনগণের আস্থাভাজন ব্যক্তিরা এবং তাঁদের নেতাই কেবল তাঁদের দেশের ভবিষ্যৎ-সংক্রান্ত সমস্ত বিষয় নির্ধারণ করতে পারেন। মুজিব আবারও অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন। তিনি বললেন, এটি অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে গ্রেপ্তারের আগে তিনি তাজউদ্দীনের সঙ্গে মাত্র এক মুহূর্ত কথা বলতে পেরেছিলেন। তিনি তাজউদ্দীনকে নির্দেশনা দিয়েছিলেন এবং শত্রুকে প্রতিহত করার জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত ও অনিয়মিত বাহিনী এবং পুলিশ সদস্যদের কাছে বার্তা পাঠিয়েছিলেন। আমি মুজিবকে বললাম, তাজউদ্দীন আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার পরেই মূলত পরিস্থিতি সম্পর্কে আমাদের ধারণা কিছুটা পরিষ্কার হয়। তারপর অস্থায়ী সরকার গঠনের পর আমরা আপৎকালীন পরিস্থিতির জন্য পরিকল্পনা প্রস্তুত করতে শুরু করি। এর মধ্যে ছিল গেরিলা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া, তাদের অস্ত্রসজ্জিত করা এবং তাদের মুক্তির নিয়মিত হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তোলা। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং নিয়মিত সেনা ইউনিটগুলোকে পুনরায় সজ্জিত ও প্রশিক্ষিত করার কাজও এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। আমি বললাম, তবু আমি তাঁর কাছে স্বীকার করতে চাই—পুরো পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর প্রকৃত ইচ্ছা কী ছিল, তা নিয়ে আমাদের মনে সংশয় রয়ে গিয়েছিল। আমাদের নির্ভর করতে হয়েছিল জনাব তাজউদ্দীনের কথার ওপর; অথচ দুর্ভাগ্যবশত, তাঁরই কয়েকজন সহকর্মী এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কিন্তু আমাদের প্রধানমন্ত্রীর তাঁর [মুজিবের] প্রতি এবং তাঁর জনগণের দাবির প্রতি যে পূর্ণ আস্থা ছিল, একমাত্র তা-ই আমাদের ভয় ও সংশয় দূর করেছিল। সেই আস্থাই আমাদের বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য চূড়ান্ত পরিকল্পনা গ্রহণে সাহসী করে তুলেছিল। আমি তাঁকে জানালাম, আমার ধারণা ছিল তিনি এবং প্রধানমন্ত্রী একে অপরকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন এবং সেই ব্যক্তিগত সম্পর্ক থেকেই হয়তো এই আস্থার জন্ম। আমি মুজিবকে বললাম, তাঁর কাছ থেকে এটা জেনে আমি বেশ অবাক হয়েছি যে ঢাকা যাওয়ার পথে দিল্লি বিমানবন্দরেই তাঁদের প্রথম দেখা হয়েছে। মুজিব আবার কথার মাঝখানে বলে উঠলেন, ‘প্রিয় ভাই, আমি দিল্লিতে আমার জনসভায় এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি। আমি কি সেই কারণগুলো বর্ণনা করিনি, যা আপনাদের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ভারতের জনগণকে বাংলাদেশের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে একসূত্রে গেঁথেছে? আমাদের অভিন্ন আদর্শ এবং আমাদের অভিন্ন মূল্যবোধই সেই কারণ।’ মুজিব আবারও তাঁর অগোচরে চলা ছোটখাটো ষড়যন্ত্রের কিছু বিবরণ জানতে চাইলেন, কিন্তু আমি সফলভাবে প্রসঙ্গটি অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম হলাম।

মুজিব বললেন, তিনি তাঁর ‘ছেলেদের’ (মুক্তিযোদ্ধাদের) কাছ থেকে শুনেছেন—কী কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ভারত তাঁদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে, অস্ত্র ও অন্ন জুগিয়েছে এবং মুক্তির চূড়ান্ত যুদ্ধের জন্য তাদের প্রস্তুত করে তুলেছে। ‘তারা ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষক এবং ভারত সরকারের অন্য কর্মকর্তাদের প্রতি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। এখন প্রশ্ন হলো, এই অনিয়মিত বাহিনীগুলোর বিষয়ে কী করা উচিত। এই প্রশ্নটি আরও জটিল হয়েছে এ কারণে যে, সব অস্ত্র এমন ব্যক্তিদের হাতে নেই, যারা আমার, আমার সরকার বা আমার জনগণের বন্ধু হবেই।’ পাকিস্তানিরা আলবদর বাহিনী এবং ধর্মান্ধ মুসলিম গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে প্রচুর অস্ত্র বিতরণ করেছিল। নকশালপন্থীরাও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অস্ত্র সংগ্রহ করেছে। তিনি বললেন, বাংলাদেশ সরকারের বন্ধু ও শত্রু—উভয় প্রকার অনিয়মিত গেরিলা বাহিনীর হাতে মোট কত অস্ত্র থাকতে পারে, সে বিষয়ে আমাদের প্রাক্কলন জানতে পারলে তিনি খুশি হবেন। আমি মুজিবকে জানালাম, আমরা বিভিন্ন ধরনের ১ লাখের বেশি অস্ত্র দিয়েছি। এ ছাড়া ৩০ হাজার রাজাকারকে অস্ত্র দেওয়া হয়েছিল। আমি মুজিবকে আরও জানালাম, আত্মসমর্পণের সময় জেনারেল নিয়াজি উল্লেখ করেছিলেন—তাঁর কমান্ডে ৯৩ হাজার সামরিক ও আধা সামরিক সদস্য রয়েছে, যাদের যুদ্ধবন্দী হিসেবে নিতে হবে। আমরা এখন পর্যন্ত তাদের মধ্যে প্রায় ৮৩ হাজার জনের আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করেছি। কিন্তু আত্মসমর্পণকারী মানুষের সংখ্যার সঙ্গে উদ্ধারকৃত অস্ত্রের সংখ্যার কোনো সামঞ্জস্য নেই। বিভিন্ন ধরনের প্রায় ১০ হাজার অতিরিক্ত অস্ত্রের কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। যদি ধরে নেওয়া হয় যে এই অস্ত্রগুলোর ২০ শতাংশ নদীনালায় ফেলে দেওয়া হয়েছে বা অন্যভাবে ধ্বংস করা হয়েছে, তবু এর অর্থ দাঁড়ায় বিভিন্ন ধরনের প্রায় ৭ হাজার অস্ত্র অজ্ঞাত ব্যক্তিদের হাতে রয়ে গেছে। এর পাশাপাশি আমি মুজিবকে বললাম, পাকিস্তানিরা অবাঙালি জাতিগোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্রসজ্জিত করেছিল। তিনি জানেন, আজও আমাদের চিরুনি অভিযানে ওই সব এলাকা থেকে এলএমজি, এমএমজিসহ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করা হচ্ছে। আমি মুজিবকে জানালাম, গতকালই আদমজী মিল এলাকায় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু অস্ত্রের গোপন ভান্ডার লুকানো রয়েছে। এই শ্রেণিগুলো ছাড়াও আমি মুজিবকে বললাম, অভিযানের সময় পুলিশ, নিয়মিত পাকিস্তানি বাহিনী, রাজাকার ইত্যাদির কাছ থেকে বিভিন্ন বাহিনী যেসব অস্ত্র দখল করেছে, সেগুলোও আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। আমাদের সরবরাহ করা অস্ত্র ছাড়াও বাংলাদেশের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের কাছে যে অতিরিক্ত অস্ত্র রয়েছে, তার সংখ্যা বড়জোর অনুমানের বিষয় হতে পারে। আমি তাঁকে বললাম, আমাদের মতে মোট অস্ত্রের সংখ্যা ২ লাখ ৫০ হাজারের কম হবে না; যদিও ভারতীয় সেনাবাহিনীর সূত্রগুলো সংখ্যাটি আরও কম বলে মনে করে। গোপনে ও সুকৌশলে লুকিয়ে রাখা অস্ত্রের ভান্ডারগুলো এই হিসাবের বাইরে থাকবে। মুজিব বললেন, তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যেন ১০ দিনের মধ্যে সব অস্ত্র জমা দেওয়া হয়। তিনি বললেন, ‘আমি নিশ্চিত, জনগণ আমার ডাকে অবিলম্বে এবং নির্দ্বিধায় সাড়া দেবে। এমনকি যারা আমার সরকারের বিরুদ্ধে, তারাও জনগণের সতর্কতা এবং আমার প্রতি তাদের সর্বাত্মক সমর্থনের কারণে আমার নিযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে অস্ত্র জমা দিতে বাধ্য হবে।’ আমি এতে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালাম না। মুজিব সম্ভবত তৎক্ষণাৎ তাঁর অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী বিবৃতির বিষয়ে আমার সংশয় লক্ষ করলেন এবং আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি কি মনে করেন আমি যেভাবে ভাবছি, সেভাবে এসব অস্ত্র উদ্ধারে কোনো অসুবিধা হবে?’ আমি মুজিবকে বললাম, অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে আমি তাঁকে জানাতে চাই যে তাঁর মতো অবিসংবাদিত কর্তৃত্বসম্পন্ন ব্যক্তির আবেদন সত্ত্বেও সব অস্ত্র উদ্ধার সফল হবে কি না, সে বিষয়ে আমার গুরুতর সন্দেহ রয়েছে। আমি তাঁকে আরও বললাম, যদি আমরা ধরেও নিই যে ৮০ শতাংশ অস্ত্র জমা পড়বে, তবু অবশিষ্ট ২০ শতাংশ শেষ পর্যন্ত তাঁর দেশের শান্তিশৃঙ্খলার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। আমি বললাম, আমার বিনীত অভিমত হলো রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে প্রশাসনিক পদক্ষেপের সমন্বয় ঘটানোর যে পদ্ধতিটি অস্থায়ী সরকারের ঘোষণায় বর্ণিত হয়েছিল, তা অনুসরণ করলে হয়তো ভালো ফল পাওয়া যেত। সেই ঘোষণায় বলা হয়েছিল, অনিয়মিত বাহিনীকে একটি জাতীয় মিলিশিয়ায় রূপান্তর করা হবে। এটি তদারক করবে এমন একটি কমিটি, যাতে সেসব দলের সদস্যরা থাকবেন, যাঁরা এই অনিয়মিতদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন এবং যাঁদের প্রতি তাঁরা আনুগত্য পোষণ করেন; এমনকি মহকুমা পর্যায়েও এই কাঠামোর বিস্তৃতি থাকবে। আমি তাঁকে বললাম, নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই আমি এই সংশয় প্রকাশ করার সাহস করছি। দেশভাগের সময় ভারতের পশ্চিম সীমান্তে একে অপরকে হত্যার জন্য হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে হাজার হাজার অস্ত্র বিতরণ করা হয়েছিল। পরিশেষে অস্ত্র কারবারিরা সাম্প্রদায়িক আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে সেই অস্ত্রগুলো এমন সব অপশক্তির কাছে বিক্রি করেছিল, যাদের কেউ কেউ আজও চম্বল উপত্যকায় সক্রিয়। এর বিপরীতে, সেই সময় ভারত ও পাকিস্তান উভয় সরকারই যদি একটু দূরদর্শী হতো এবং নির্বিচার অস্ত্র বিতরণের বিপদগুলো আঁচ করতে পারত, তাহলে ভারতের কিছু কিছু অংশে আজও আমরা যে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি, তা থেকে রক্ষা পাওয়া যেত। অবশ্য পাকিস্তানের পরিস্থিতি সম্পর্কে আমি জোর দিয়ে কিছু বলতে পারি না।

দুর্গা প্রসাদ ধর, যিনি সাধারণত ডিপি ধর (১৯১৮-১৯৭৫) নামে পরিচিত।

মুজিব কপালে হাত দিয়ে গভীর ভাবনায় মগ্ন হলেন। তিনি বললেন, ‘দেখুন, আমি তো আপনাকে বলেছি যে আমাদের যথেষ্ট প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা নেই। আমার আবেদন যদি প্রত্যাশিত ফল বয়ে আনতে ব্যর্থ হয়, তাহলে আমি কী করব?’ আমি বললাম, আমি নিতান্তই একজন বহিরাগত। আমি তাঁর দেশ চিনি না। আমি কেবল জানি, জনগণের অপরিসীম ভালোবাসার কারণে তাদের ওপর তাঁর কর্তৃত্ব কতটা বিশাল। আমি মুজিবকে বললাম, তিনি যদি আমার মতামত জানতে চান, তবে আমি বলব, যারা দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছে, তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার জন্য ১০ দিন খুবই অল্প সময়। যা-ই হোক, আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, যারা অস্ত্র জমা দেবে না, তাদের ক্ষেত্রে তিনি কী পদক্ষেপ নেওয়ার সংকল্প করেছেন। তিনি একমুহূর্ত দ্বিধা না করে বললেন, ‘আমি মিত্রবাহিনীকে বলব বাংলাদেশের প্রতিটি কোণে ও আনাচকানাচে চিরুনি তল্লাশি চালাতে এবং অননুমোদিত ব্যক্তিদের কাছ থেকে সব অস্ত্র উদ্ধার করতে।’ আমাকে বলতেই হচ্ছে, ভারতীয় সেনাবাহিনীকে এমন একটি কাজে ব্যবহার করার সম্ভাবনায় আমি বেশ শঙ্কিত হয়ে পড়লাম। কারণ, এটি একটি বিদেশি হস্তক্ষেপে রূপ নিতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত একটি পুরোদস্তুর গৃহযুদ্ধে গড়াতে পারে। আমি মুজিবকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে বললাম, অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়ে প্রশাসনিক পদক্ষেপের সঙ্গে রাজনৈতিক কৌশলের সমন্বয় পুনর্বিবেচনা করার সুযোগ যদি এখনো থাকে, তাহলে ধৈর্য ধারণ করাই বাঞ্ছনীয় হবে। আমি তাঁকে বললাম, এর বিকল্প হলো সংঘাত। স্বভাবগতভাবে শান্তিবাদী হওয়ায় আমি বললাম, সংঘাতের চেয়ে ধৈর্যের পক্ষেই আমি আমার মত দেব। আমি তাঁকে জানালাম, এই পরামর্শ দেওয়ার সাহস করার পেছনে আমার আরেকটি কারণ রয়েছে। তা হলো বাংলাদেশে যেকোনো অভ্যন্তরীণ সংঘাত পাকিস্তান ও তার মিত্রদের উদ্দেশ্য সাধন করতে পারে। আমি তাঁকে সতর্ক করে বললাম, সব সৎ উদ্দেশ্য থাকা সত্ত্বেও আমরা হয়তো তাদের পাতা কোনো ফাঁদে পা দিতে যাচ্ছি। মুজিব জানালেন, মোটের ওপর তিনি আমার দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে একমত। কিন্তু তিনি যেসব পদক্ষেপ ঘোষণা করেছেন, তা থেকে এখন সরে এলে সরকারের কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়বে; আর সরকারের কর্তৃত্ব দুর্বল হলে বাংলাদেশে বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। তিনি সরকারের কর্তৃত্ব আর মুজিবের কর্তৃত্বকে সমার্থক বলেই মনে করেন।

এ সুযোগে আমি তাঁকে পশ্চিমবঙ্গের উদাহরণ দিলাম। সেখানে আমাদের অত্যন্ত দক্ষ ও সুসংগঠিত গোয়েন্দাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও সব অস্ত্র খুঁজে বের করা বা শনাক্ত করা ছিল অত্যন্ত কঠিন কাজ। অথচ বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো গোয়েন্দাকাঠামোই নেই। আমরা দেখেছি, আমাদের দেশের গোয়েন্দাব্যবস্থাকে আমরা খুব সুসংগঠিত মনে করলেও সব ক্ষেত্রে, বিশেষ করে সব অস্ত্র উদ্ধারের ব্যাপারে তা শতভাগ সফল হতে পারেনি। মুজিব বললেন, একপর্যায়ে তিনি বাংলাদেশে গোয়েন্দাব্যবস্থা সংগঠিত করার জন্য ভারতের সহায়তা নেওয়ার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু এখন তিনি একজন খুব দক্ষ অফিসার খুঁজে পেয়েছেন, যিনি বরিশাল জেলে ছিলেন [সম্ভবত তিনি তাঁর নাম ‘মাহির’ বলে উল্লেখ করেছিলেন]। তাঁকে তিনি পুরোপুরি বিশ্বাস করেন এবং তাঁকেই তিনি বাংলাদেশে গোয়েন্দাকাঠামো গড়ে তোলার দায়িত্ব দিয়েছেন। আমি বললাম, নিঃসন্দেহে এই অফিসার একজন অত্যন্ত যোগ্য ব্যক্তি হবেন এবং তিনি প্রয়োজনীয় গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের জন্য একটি দক্ষ সংগঠন গড়ে তুলতে সফল হবেন। তবে এতে সময় লাগবে। ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে একটি গোয়েন্দা সংগঠন পেয়েছিলাম, যদিও তা ছিল কেবল একটি কঙ্কালসার কাঠামো। কিন্তু স্বাধীনতার ২৫ বছর পরেও আমরা দেখছি যে আমাদের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দাব্যবস্থায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়ে গেছে। মুজিব আমার দিকে ফিরে বললেন, অবশ্যই এই সংগঠন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি ভারতের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সাহায্য নেবেন। কিন্তু তিনি যোগ করলেন, এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। তিনি বললেন, তাঁর সরকারের যদি কোনো সাহায্যের প্রয়োজন হয়, তবে তিনি তা কেবল আমাকেই জানাবেন; অন্যথায় বাংলাদেশে তাঁর শত্রুরা রটাবে যে ভারত এমনকি বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাও পরিচালনা করছে।

আমি তৎক্ষণাৎ তাঁর মন থেকে এই ভুল ধারণা দূর করার চেষ্টা করলাম। আমি তাঁকে জানালাম, তাঁর গোয়েন্দাব্যবস্থা সংগঠিত করার ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করার কোনো অভিপ্রায় আমাদের নেই। আমি কেবল অঘোষিত ও অবৈধ অস্ত্রের অবস্থান নির্ণয় ও শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে এ ধরনের সংগঠনের অনুপস্থিতিকে একটি অন্তরায় হিসেবে উল্লেখ করেছি। আমার মনে হলো, বাংলাদেশে অস্ত্র উদ্ধারের ব্যাপারে মুজিব তাঁর সম্মোহনী ব্যক্তিত্ব দিয়ে আহ্বানের মাধ্যমে যে শতভাগ সাফল্যের আশা করেছিলেন, সে বিষয়ে তিনি আর আগের মতো এতটা সুনিশ্চিত ছিলেন না। আমাদের পক্ষে তাঁকে পরোক্ষভাবে পরামর্শ দেওয়া প্রয়োজন হবে যেন তিনি ডান ও বাম চরমপন্থীদের বাদ দিয়ে বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠীর মধ্যে আস্থা সঞ্চার করেন, যাতে তারা অস্ত্র উদ্ধারের জন্য গণ-অভিযান পরিচালনায় তাঁকে সহায়তা করতে পারে। কার্যত এর অর্থ হবে তাজউদ্দীন আগে যে ফর্মুলা বা সূত্রটি দিয়েছিলেন, তা মেনে নেওয়া। এ প্রসঙ্গে কথা বলার সময় মুজিব ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং এর ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করলেন। তিনি বললেন, অবশ্য ব্যক্তিগতভাবে কিছু সৈন্যের আচরণের ব্যাপারে ছোটখাটো অভিযোগ ছিল; কিন্তু তিনি খোঁজ নিয়ে দেখেছেন, এর অধিকাংশই ভিত্তিহীন এবং এমন সব উৎস থেকে ছড়ানো হয়েছে, যারা আমাদের দুই দেশের বন্ধুত্বের বিরোধী। আমি এই সদয় প্রশংসার জন্য তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম। সেই সঙ্গে এই সুযোগে বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় বাহিনী দ্রুত ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে তিনি আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে যে অনুরোধ করেছিলেন, সেটির কথা তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিলাম। আমি মুজিবকে জানালাম, আমি বাংলাদেশে ভারতীয় সেনা কমান্ডারদের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছি। তাঁদের অনুভূতি হলো, যে প্রধান উদ্দেশ্য নিয়ে তাঁদের বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছিল, অর্থাৎ দেশটির স্বাধীনতায় সহায়তা করা, তা অর্জিত হয়েছে। আমি মুজিবকে বললাম, তিনি যে তাঁর বাহিনীকে দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করার নির্দেশ দেওয়ার কথা বলেছিলেন, এটি তাঁর সেই অত্যন্ত চমকপ্রদ বিবৃতিরই প্রতিফলন। আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের নিয়মিত ও অনিয়মিত বাহিনীর প্রচেষ্টার মাধ্যমেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। আমি তাঁকে বললাম, অভিযানের সময় আমরা লক্ষ করলাম পাকিস্তানের সুসংগঠিত, যান্ত্রিক ও নিয়মিত বাহিনীর বিরুদ্ধে দ্রুত ফলাফল অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন হবে। আমাদের হিসাব ছিল যে পাকিস্তানের বর্বর দখলদার বাহিনীকে হটিয়ে সাফল্যের কাছাকাছি পৌঁছাতেও বহু বছর লাগবে এবং এর জন্য বাংলাদেশের যুবকদের অপরিসীম ত্যাগ, বীরত্ব ও সাহসের প্রয়োজন হবে। এ কাজ আরও কঠিন হয়ে পড়ত, কারণ পাকিস্তানি দখলদারেরা যুদ্ধের কোনো নিয়মই মানেনি। বাঙালি জাতিকে নির্মূল করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। তাই স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যে মূল্য দিতে হতো, তা হতো অত্যন্ত চড়া। তাই আমি মুজিবকে জানালাম, আমাদের প্রধানমন্ত্রী মনস্থির করেছিলেন, পরিণাম যা-ই হোক না কেন, তিনি তাঁর সশস্ত্র বাহিনী (যার মধ্যে সাঁজোয়া বাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনী অন্তর্ভুক্ত) দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রামে সক্রিয় সহায়তা করবেন। আমি মুজিবকে বললাম, বিশাল বিশাল সব ঝুঁকি ছিল, যা তিনি জানতেন এবং আমরাও পরে উপলব্ধি করেছি। ঠিক এ কারণেই যৌথ অভিযানের পরিকল্পনা করা হয়েছিল এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশের মাটিতে উপস্থিত হয়েছিল।

তিনি আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে যা বলেছিলেন, তার আলোকে আমি সাহস করে বললাম যে বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের ব্যবস্থা নিতে আমরা সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত। তবে আমাদের সৈন্যদের ভারতে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও লজিস্টিক আয়োজন সম্পন্ন করার জন্য মুজিব সৈন্য প্রত্যাহারের একটি সুনির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ করে দিলে আমরা বাধিত থাকব। আমার প্রধানমন্ত্রী আমাকে আরও নির্দেশ দিয়েছেন যে এই সিদ্ধান্ত পুরোপুরি মুজিবের সুবিধা ও সুবিবেচনার ওপরই ছেড়ে দিতে হবে। মুজিব বললেন, ‘প্রিয় ভাই, জনসমক্ষে আমরা যা বলি, ব্যক্তিগত আলাপে তার সবকিছু বলা ঠিক নয়।’ খোলাখুলি বলতে গেলে, তিনি কী বোঝাতে চাইলেন, তা আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না। তাই আমি তাঁকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলার অনুরোধ জানালাম। তখন তিনি বললেন, ‘আমি আপনাকে বলতে চাই, বাংলাদেশে ভারতীয় সৈন্যদের উপস্থিতি হয়তো এ দেশের কিছু মানুষ পছন্দ করছে না, হয়তো বিশ্বসম্প্রদায়ের কিছু মানুষও পছন্দ করছে না। আর নিশ্চিতভাবেই মিস্টার ভুট্টো বাংলাদেশে তাদের উপস্থিতি পছন্দ করছেন না; কেন করছেন না, তা নিশ্চয়ই আপনাকে বুঝিয়ে বলতে হবে না। একজন বাস্তববাদী রাজনীতিবিদ হিসেবে আমার দেশ থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের বিষয়টি যেসব পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল, তা আপনাকে ও আমাকে অবশ্যই অনুধাবন করতে হবে। আপনারা সৈন্য প্রত্যাহার করে আমার দেশকে এক বিশৃঙ্খল অবস্থায় ফেলে যেতে পারেন না। যখন আমার দেশের রাজপথে বহু সশস্ত্র দল ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং আমাদের অর্জিত স্বাধীনতাকে নস্যাৎ করতে বদ্ধপরিকর, তখন আপনারা সৈন্য প্রত্যাহার করতে পারেন না। একই সঙ্গে আমরা জানি, বাংলাদেশে আপনাদের সৈন্যদের উপস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিকভাবে আপনারা কিছুটা বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন। কিন্তু মুজিব জানে, আপনারা আমার কারণেই এখানে আছেন। আমি আপনাদের চাই। নিক্সন আপনাদের এখানে চান কি না, তাতে কিছু যায়-আসে না। আমি আপনাদের চাই। সুতরাং ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের বিষয়টি ফয়সালা করতে হবে—বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, নিকট ভবিষ্যতে ভুট্টো ও তাঁর দোসরদের অভিপ্রায় এবং একটি বিদেশি রাষ্ট্রে সৈন্য উপস্থিতির কারণে ভারত সরকার যে অস্বস্তি বোধ করছে—এসবের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে। এটি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, যে বিষয়ে আমি আপনার প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা চাইব। আমি তাঁর পরামর্শ মেনেই চলব, কিন্তু ভুলে যাবেন না যে আমাদের নিজেদের মধ্যেই অনেক শত্রু রয়েছে।’ আমি তাঁকে জানালাম, ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়টির আরেকটি দিক তিনি বিবেচনায় নেননি, তা হলো বিশ্বের কিছু দেশের কাছ থেকে তাঁর দেশের স্বীকৃতি পাওয়া। তিনি আমার দিকে ঘুরে বললেন, যদি বাংলাদেশের অস্তিত্বই না থাকে, তবে ওই দেশগুলো কাকে স্বীকৃতি দেবে? তিনি আমাকে ধৈর্য ধরতে বললেন এবং পরামর্শ দিলেন, এই প্রশ্নের মীমাংসার জন্য বাংলাদেশ বা ভারত কারোরই তাড়াহুড়ো করা উচিত নয়। তিনি আবারও জোর দিয়ে বললেন, এটি এমন একটি প্রশ্ন, যা নিয়ে তিনি মিসেস গান্ধীর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করবেন।

এ প্রসঙ্গে আলোচনাকালে তিনি বললেন, ‘আমি আপনাকে অত্যন্ত গোপনে বলছি, আমার কোনো সশস্ত্র বাহিনীর প্রয়োজন নেই। আমাকে যদি আমার মতো থাকতে দেওয়া হতো, তবে আমার কোনো সশস্ত্র বাহিনীর দরকার হতো না। কিন্তু তখন তারা বলবে যে মুজিবের অস্তিত্ব এবং তাঁর দেশের অস্তিত্ব ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল। আমার সেনাবাহিনী থাকার কী প্রয়োজন? তিন দিকে আমার আছে এক বন্ধুত্বপূর্ণ ও ভ্রাতৃপ্রতিম প্রতিবেশী—ভারত। অন্যদিকে আছে বার্মা। আপনারা কি চান বার্মা আমার প্রতিবেশী বলে আমি বিশাল এক সেনাবাহিনী লালন করি? আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে আমার দেশের মোট রাজস্বের ২০ শতাংশের বেশি আমি সশস্ত্র ও পুলিশ বাহিনীর পেছনে ব্যয় করব না। আমি ওসমানীকে এ কথা বলেছি। আমি আমার সহকর্মীদেরও এ কথা জানিয়েছি। আসলে আমি আপনাকে অত্যন্ত গোপনে বলতে চাই, বহিঃশত্রুর আগ্রাসন, অভ্যন্তরীণ অন্তর্ঘাত কিংবা কোনো ধরনের হস্তক্ষেপের আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আমরা পারস্পরিক প্রতিরক্ষার জন্য কোনো চুক্তি বা বন্দোবস্ত করতে পারি। আমি আপনাকে অত্যন্ত গোপনে এ কথা বলছি। দয়া করে আমার এই কথা গোপন রাখবেন। এটি এমন কোনো বিষয় নয়, যা এখনই জানাজানি হওয়া উচিত। তবে আরও ছোটখাটো দু-একটি বিষয় আছে, যা আমি আপনার কাছে উল্লেখ করতে চাই। আপনার সেনাবাহিনী পাকিস্তানিদের কাছ থেকে কিছু অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে। আপনারা সেগুলো ভারতে নিয়ে যেতে চান। এটি অহেতুক সন্দেহ ও জটিলতার সৃষ্টি করছে; আমার ব্যক্তিগত অভিমত হলো আপনারা সব নিয়ে গেলেও আমার কোনো আপত্তি নেই। যা আপনাদের, তা আমার; আর যা আমার, তা আপনাদের।’

আমি তাঁকে বললাম, এই প্রশ্নে কিছু ভুল-বোঝাবুঝি রয়েছে। যেমনটি আমরা আগেই আলোচনা করেছি, বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র এখনো হিসাববহির্ভূত বা অচিহ্নিত অবস্থায় রয়ে গেছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছ থেকে জব্দ করা বা তাদের ফেলে যাওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদের দায়িত্ব কোনো একটি নির্দিষ্ট সংস্থা বা দলের হাতে ছেড়ে দেওয়া আমাদের জন্য চরম অবিবেচকের কাজ হবে। এমনকি আজ যখন আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলছি, তখনো আমরা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ফেলে যাওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদের তালিকাভুক্তি ও শ্রেণিবিন্যাসের কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। এটা খুবই সম্ভব যে আমাদের সেনাবাহিনীর কেউ কেউ হয়তো বলবেন, বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম শুরুর পর থেকে তাঁরা কোটি কোটি টাকার গোলাবারুদ ব্যয় করেছেন। কিন্তু এটি কখনোই আমাদের কাছে বিবেচ্য বিষয় ছিল না। আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ফেলে যাওয়া বা তাদের কাছ থেকে জব্দ করা সমস্ত সামরিক সরঞ্জাম যথাযথভাবে হিসাবের খাতায় বা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা। ‘আমাদের কিছু জরুরি প্রয়োজন মেটানোর জন্য আমরা হয়তো আপনাদের কাছে কিছু সরঞ্জাম চাইতে পারি। কিন্তু আপনাদের অনুমতি ছাড়া বাংলাদেশের মাটি থেকে আমরা কিছুই নিয়ে যেতে চাই না। এখানকার সবকিছুর মালিক বাংলাদেশ সরকার।’ আমি মুজিবকে জানালাম, এটাই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি। আমি আরও বললাম, আমি কিছুটা ব্যথিত হয়েছিলাম, যখন কর্নেল ওসমানী এই ডিপোগুলোতে থাকা অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে সরকারকে কিছুটা রূঢ় বা নিছক কাজের ভাষায় একটি চিঠি লিখেছিলেন। সামাদ, যিনি সেই মুহূর্তে সেখানে উপস্থিত ছিলেন, তিনি আমাকে আগেই বলেছিলেন যে এটা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করার কোনো প্রয়োজন নেই। মুজিব রাগান্বিত স্বরে বললেন, ‘ওসমানী একটা বোকা। আপনি আমাকে যে ব্যাখ্যা দিলেন, তাতে আমি সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট। আপনি জানেন, ২৫ বছর ধরে তারা আমার জনগণের মনে ভারত সম্পর্কে সন্দেহ ছাড়া আর কিছুই বপন করেনি। আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি—সশস্ত্র বাহিনী হোক বা বেসামরিক প্রশাসন—যেসব কর্মকর্তার পাকিস্তানি ধাঁচে বেড়ে ওঠা বা পাকিস্তানি মানসিকতা রয়েছে, আমি তাদের সহ্য করব না। আমার সরকারে তাদের কোনো স্থান হবে না। আমি জানি না আপনি শুনেছেন কি না যে সম্প্রতি কিছু নিয়োগের কারণে আমি সমালোচিত হয়েছি। তাতে কী আসে-যায়? পাকিস্তানি মতাদর্শে কলুষিত প্রত্যেককে আমি বিদায় করব। বাঙালির বেশে আসা কোনো পাকিস্তানি আসলে বাঙালি নয়। আমাকে তাকে পাকিস্তানি হিসেবেই গণ্য করতে হবে এবং তাদেরকে বিহারিদের সঙ্গে ফেরত পাঠাতে হবে।’

এরপর মুজিব বললেন, তিনি তাঁর প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রসঙ্গে ফিরে যেতে চান এবং এই বাহিনীর কাঠামো ও আয়তন কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়ে আমার মতামত জানতে চাইলেন। আমি তাঁকে বললাম, এমন একটি অত্যন্ত কারিগরি বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার যোগ্যতা আমার নেই। তবে অবশ্যই, আমার মতে—বিমান ও নৌবাহিনীর ক্ষুদ্র একটি প্রাথমিক ইউনিটসহ তাঁর একটি সমন্বিত বাহিনী থাকা উচিত। আমি তাঁকে জানালাম, তাঁর প্রতিরক্ষা বাহিনীর আয়তন ও কাঠামো কেমন হতে পারে, তার একটি রূপরেখা আমরা তৈরি করে দিতে পারি; কিন্তু এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয় এবং আমরা চাই না এটা নিয়ে কোনো ভুল-বোঝাবুঝি হোক। মুজিব বললেন, ‘দয়া করে অত্যন্ত গোপনে আমার জন্য এই রূপরেখাটি তৈরি করুন। এটি যেন সরাসরি আমার কাছে পাঠানো হয়। এটি কারা তৈরি করেছে, তা আমি কারও কাছে প্রকাশ করব না। এ ধরনের একটি নথি আমাকে আমাদের প্রতিরক্ষা চাহিদা নিরূপণ করতে এবং এ খাতে আমার কাছে যে দাবিগুলো আসবে, তা সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করতে সহায়তা করবে। আপনি কি আপনার সেনা কর্তৃপক্ষকে আমার জন্য এই নথিটি তৈরি করতে বলতে পারেন? আপনি আপনার কোনো বিশ্বস্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে এটি ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে পাঠাতে পারেন। ঢাকায় পৌঁছানোর পর তাঁকে শুধু এটুকুই বলতে হবে যে তিনি মিস্টার ধরের একটি চিঠি নিয়ে এসেছেন। তাহলেই আমি তাঁর আগমনের উদ্দেশ্য বুঝতে পারব।’ আমি মুজিবকে আশ্বস্ত করলাম যে আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখব এবং তাঁর ইচ্ছাপূরণে আমরা অবশ্যই আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করব। ইতিমধ্যে আমি তাঁকে জানালাম, আমাদের সেনাপ্রধান জেনারেল মানেকশ বাংলাদেশের সদস্যদের প্রশিক্ষণের জন্য বিভিন্ন সামরিক প্রতিষ্ঠানে ৫ শতাংশ আসন সংরক্ষিত রেখেছেন। আমি আরও বললাম, আমাদের নৌ ও বিমানঘাঁটিগুলোতেও আমরা বাংলাদেশের ক্যাডারদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারি। এটি আমাদের জন্য নতুন কিছু নয়, কারণ বন্ধুপ্রতিম আফ্রো-এশীয় দেশগুলোকে আমরা আগে থেকেই এই সুবিধা দিয়ে আসছি। তবে বাংলাদেশের জন্য আমরা বিশেষ ব্যবস্থা করব। শুধু বিশেষ ব্যবস্থাপনাই নয়, বরং তাদের প্রশিক্ষণের জন্য আমরা আরও ব্যাপক সুযোগ-সুবিধা উন্মুক্ত করব। আমি তাঁকে বললাম, ভারত এমনকি বাংলাদেশের জন্য একটি ‘ন্যাশনাল ডিফেন্স একাডেমি’ প্রতিষ্ঠা করতেও প্রস্তুত। আমরা ইথিওপিয়ায় এমন একটি একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেছি। আমি তাঁকে জানালাম, আমাদের প্রতিরক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অত্যন্ত উচ্চমানের এবং সেখানে প্রশিক্ষণার্থীদের দক্ষতা ও পারদর্শিতা অর্জনের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। মুজিব এই প্রস্তাবগুলোর জন্য আমাকে ধন্যবাদ জানালেন এবং বললেন, এ বিষয়ে দেশের চাহিদা নিরূপণ করার মতো সময় পেলেই তিনি অবশ্যই এই সুযোগগুলো গ্রহণ করবেন।

এরপর মুজিব জানতে চাইলেন, ভুট্টো যেসব বিবৃতি দিচ্ছেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে ভবিষ্যৎ ঘটনাবলি সম্পর্কে আমার মূল্যায়ন কী। তিনি জানতে চাইলেন, পাকিস্তান বা তার মিত্রদের কাছ থেকে ভারত কোনো প্রকার গোলযোগের আশঙ্কা করছে কি না। আমি মুজিবকে বললাম, বর্তমান পরিস্থিতিতে কিছু বিষয় অত্যন্ত প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে এবং আমাদের সেগুলোর পূর্ণ গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনুধাবন করতে হবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা শুধু পাকিস্তানি সামরিক জান্তার যুদ্ধংদেহী মনোভাবকেই স্তব্ধ করে দেয়নি, বরং চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের যাবতীয় হিসাব-নিকাশও উল্টে দিয়েছে। বস্তুত চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরামহীন বিরোধিতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ফলে তাদের সেই ঔদ্ধত্যপূর্ণ মনোভাব কিছুটা হলেও খর্ব হয়েছে। আমি মুজিবকে জানালাম, ইতিহাসে আমরা দেখেছি, অনেক সংঘাত ও যুদ্ধই আসলে আহত অহমিকাপ্রসূত অযৌক্তিকতার ফসল। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ভুট্টো প্রতিমুহূর্তেই তাঁর অবস্থান পরিবর্তন করছেন। তা সত্ত্বেও একটি বিষয় তিনি ক্রমাগত আওড়াচ্ছেন যে বর্তমান সংঘাতে পাকিস্তান কেবল পর্যুদস্তই হয়নি, অপদস্থও হয়েছে। অপমান ও পরাজয়ের এই মনস্তত্ত্ব জ্ঞানীদের অতীতের নীতিগুলোকে আরও যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত ভিত্তিতে পুনর্মূল্যায়নের দিকে চালিত করতে পারে, অথবা এটি প্রতিশোধপরায়ণতারও জন্ম দিতে পারে। আমরা আমাদের উত্তর সীমান্তে চীনের কিছু অস্বাভাবিক সামরিক গতিবিধির খবর পেয়েছি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পাকিস্তান এখন তার সমস্ত বাহিনী আমাদের পশ্চিম সীমান্তে কেন্দ্রীভূত করার সুযোগ পেয়েছে। পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে গোপন আঁতাত বা যোগসাজশ এখনো বিদ্যমান। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সৈন্য দিয়ে সাহায্য না করলেও দেশটির পাকিস্তানকে সামরিক সহায়তা প্রদানের সম্ভাবনা রয়েছে। এটি সম্ভব যে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে আমাদের ক্ষুদ্র সামর্থ্য দিয়ে অবদান রাখার ‘শাস্তিস্বরূপ’ ভারতের বিরুদ্ধে একটি ত্রিপক্ষীয় চক্রান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে ভুট্টো এখনো ‘মুসলিম’ বাংলার সঙ্গে ‘মুসলিম’ পাকিস্তানের পুনরেকত্রীকরণের বুলি আওড়াচ্ছেন। চীন বা পশ্চিমা দেশগুলোর কোনো দায়িত্বশীল সরকারি মহল থেকে এমন কোনো বিবৃতি আসেনি, যা ঘুণাক্ষরেও ইঙ্গিত দেয় যে তারা বাংলাদেশের বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দিচ্ছে—এমন নয় যে তারা এই বাস্তবতা সম্পর্কে জানত না। আমি উল্লেখ করলাম, এমনকি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রও এখন এই নতুন বাস্তবতার অস্তিত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন; কিন্তু এই সচেতনতার অর্থ এই নয় যে তারা পরিস্থিতির সঙ্গে আপস বা সমঝোতা করে নিয়েছে। তাই আমি যোগ করলাম, যদি আমাদের ওপর কোনো সংঘাত চাপিয়ে দেওয়া হয়, তবে আমি আশঙ্কা করি, বাংলাদেশে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা ও গৃহবিবাদ সৃষ্টির মধ্যেই তারা সেই সংঘাতের যৌক্তিকতা খুঁজে নেবে। আমি মুজিবকে বললাম, আমি যদি নিজেকে পাকিস্তানের অবস্থানে বসাতাম, যেখানে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে এবং ইরান, তুরস্ক ইত্যাদি দেশকে ছোট অংশীদার হিসেবে নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণের পরিকল্পনা করা হতো, তবে আমি কী করতাম এবং কীভাবে আমার উদ্দেশ্য অর্জনে অগ্রসর হতাম? আমি ঠিক এভাবেই কাজ করতাম এবং এভাবেই আমার উদ্দেশ্য অর্জনের চেষ্টা করতাম। অবশ্য আমি মুজিবকে আশ্বস্ত করলাম, এটা নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। তবে আমরা যদি নিশ্চিন্তে হাত গুটিয়ে বসে থাকি এবং আত্মতুষ্টিতে ভুগি, তাহলে জনগণের প্রতি কর্তব্য পালনে চরম অবহেলার দায়ে আমরা দোষী সাব্যস্ত হব। মুজিব জানালেন, তিনি আমার মূল্যায়নের সঙ্গে একমত। তিনি বললেন, এর অর্থ দাঁড়ায় আমাদের একে অপরের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতে হবে; সেই সঙ্গে বাংলাদেশের সমস্যাগুলো সঠিকভাবে সমাধান করে যত দ্রুত সম্ভব শৃঙ্খলা ও স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। তিনি আমাকে আরও জিজ্ঞাসা করলেন, যদি ভারতের ওপর এমন সংঘাত চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে আমার মতে তা কোন সময়ের মধ্যে ঘটতে পারে? আমি উত্তরে বললাম, আমি যদি নিজেকে আবারও পাকিস্তান ও তার মিত্রদের অবস্থানে বসাই, তবে এপ্রিল মাসের কোনো এক সময়ে এমন দুঃসাহসিক অভিযান শুরু করব; কারণ তখন উত্তরের গিরিপথগুলো চলাচলের উপযোগী হয়ে উঠবে। তিনি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললেন, ‘ওহ্‌, তাহলে তো আমরা অনেক সময় পাচ্ছি।’

প্রসঙ্গক্রমে মুজিব জানতে চাইলেন, ভারতের পক্ষে কি সম্ভব মাঝে মাঝে তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে বহির্বিশ্বের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে আমাদের মূল্যায়ন জানানো? তিনি বললেন, সামাদ (পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদ) তাঁকে একটি এক্সটার্নাল সার্ভিস (বৈদেশিক গোয়েন্দাব্যবস্থা) চালু করার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু তিনি সামাদকে বলেছেন, এটি একটি ব্যয়বহুল বিষয়। তাই আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ক্রিয়াকলাপ সম্পর্কে অবহিত হওয়ার জন্য তিনি পুরোপুরি ভারতের ওপরই নির্ভর করতে চান, তা কেবল উপমহাদেশের পরিস্থিতির সঙ্গে প্রাসঙ্গিক বিষয়ই হোক কিংবা বৃহত্তর আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে। আমি তাঁকে বললাম, বৃহৎ শক্তিগুলোর মতো আমরা আন্তর্জাতিক পরিসরে গুপ্তচরবৃত্তির জন্য কোনো সংস্থা চালাই না। তবে সীমিত সম্পদের মধ্যে থেকেও আমাদের চারপাশে কী ঘটছে, বিশেষ করে যা আমাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক, সে সম্পর্কে আমরা সজাগ থাকার চেষ্টা করি। এখন যেহেতু আমরা অনুভব করছি যে বাংলাদেশ ও ভারতের নিরাপত্তা পরস্পরের পরিপূরক, তাই আমি তাঁকে বললাম, আমাদের কাছে যা তথ্য আছে বা ভবিষ্যতে যা আসবে, তা তাঁর সঙ্গে ভাগ করে নিতে আমাদের কোনো দ্বিধা নেই। তবে এ ক্ষেত্রেও আমি তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিলাম, আমরা একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে কথা বলছি। আমাকে আমার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে হবে। তবে আমার মনে কোনো সন্দেহ নেই যে তিনি আপনাকে নিয়মিত এসব বিষয়ে অবহিত করার জন্য একজন অত্যন্ত বিশ্বস্ত কর্মকর্তাকে নিয়োগ করবেন। মুজিব এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানালেন। এরপর তিনি জানতে চাইলেন, পাকিস্তানি দখলদারত্বের সময় বাংলাদেশে অবস্থানরত কিছু ফরেন সার্ভিস অফিসার এবং অন্যান্য কর্মকর্তার মনোভাব, আচরণ ও রাজনৈতিক ঝোঁক সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব কি না। আমি তাঁকে জানালাম, আমরা বেশ কিছু তথ্য সম্পর্কে একেবারে অজ্ঞ নই; কিন্তু ইতিমধ্যে উল্লিখিত কারণগুলোর জন্য এমন তথ্য সরবরাহ করা আমি অনুচিত বলে মনে করি। আমি তাঁকে বললাম, তাঁর যে ধরনের তথ্যের প্রয়োজন, তা তাঁর সহকর্মীদের কাছ থেকেই পাওয়া যাবে। আমরা সর্বোচ্চ যা করতে পারি, তা হলো তিনি যদি সুনির্দিষ্টভাবে কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে পাঠান, তাহলে আমরা তার সত্যতা যাচাই করতে সহায়তা করতে পারি। আমি আবারও মুজিবকে বিনীতভাবে অনুরোধ করলাম যেন তিনি অনুধাবন করেন যে ভারত সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের আমার কোনো সহকর্মীকে এই দায়িত্ব নিতে বলা আমার জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর হবে। মুজিব এবার বেশ জোর দিয়েই বললেন, ‘যা-ই হোক, আপনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, আন্তর্জাতিক ঘটনাবলি, বিশেষ করে যেগুলো ভারত ও বাংলাদেশের নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে, তা সম্পর্কে আমাকে অবহিত রাখবেন। আপনার প্রধানমন্ত্রী এ কাজে যাঁকে নিয়োগ করবেন, তাঁকে সাদরে গ্রহণ করা হবে। তাঁকে শুধু বলতে হবে যে তিনি মিস্টার ধরের কাছ থেকে একটি বার্তা নিয়ে এসেছেন। আমি তাঁকে অত্যন্ত গোপনে সাক্ষাৎ দেব এবং কেউ এ ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে পারবে না।’ (এখানে আমাকে অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে যে যখনই তিনি আমার সঙ্গে অত্যন্ত গোপনে কিছু বলতে চাইতেন, তখনই তিনি বেশ অশোভনভাবে সামাদের উপস্থিতি এড়িয়ে যেতেন বা তাঁকে ঘর থেকে বিদায় করে দিতেন। বিষয়টি আমার জন্য এক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল; কারণ মুজিব যখনই তাঁকে জোর করে ঘর থেকে বের করে দিতেন, তখনই সামাদ আমার কাছে জানতে চাইতেন মুজিব আমাকে কী বলছিলেন।)

মুজিব জানালেন, পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি তিনি আমার সঙ্গে বিনিময় করতে চান। তিনি বললেন, ‘অবশ্যই আমি আপনার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলব। আপনি জানেন, বহু বছর ধরেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমার ধারণা অত্যন্ত স্বচ্ছ। দীর্ঘকাল ধরে আমি পাকিস্তানের দর্শনকে কখনোই মেনে নিইনি এবং এর সঙ্গে আপস করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছি। আপনি জানেন, আমি করাচিতে এক জনসভায় ভাষণ দিয়েছিলাম। সেই বিশাল জনসমুদ্রকে আমি বলেছিলাম যে পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণ তাদের নেতাদের দ্বারা প্রতারিত হচ্ছে। জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য তাদের তিনটি স্লোগান ছিল। আমি তাদের বলেছিলাম, প্রথম স্লোগানটি হলো, “ইসলাম বিপন্ন”। আমি তাদের প্রশ্ন করলাম, পাকিস্তানের ওই অংশে তো একজনও অমুসলিম নেই, তাহলে তারা কোথা থেকে ইসলামের বিপদ দেখতে পায়? দ্বিতীয় স্লোগানটি ছিল, ভারত পাকিস্তানের ঐক্য ও সংহতি বিনষ্ট করতে চায়। আমি তাদের জানালাম, পাকিস্তানের ঐক্য ও সংহতি তাদের নিজস্ব শাসকেরাই বিনষ্ট করেছে। আমি তাদের শুধু পূর্ব বাংলাই নয়, বরং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ এবং বেলুচিস্তানের উদাহরণও দিলাম। আমি তাদের বুঝিয়ে বললাম, ভারতের তথাকথিত হুমকির চেয়ে এক ইউনিটের হাতে অন্য ইউনিটের শোষণই পাকিস্তানের ঐক্যের জন্য বড় বিপদ। তৃতীয় যে স্লোগানটি দিয়ে তাদের শোষণ করা হচ্ছিল, তা হলো কাশ্মীরের মুক্তি। সেই বিশাল সমাবেশে আমি জিজ্ঞেস করলাম, তাদের নেতারা, সেনাবাহিনী, শিল্প ও অর্থনৈতিক শক্তি কি ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ করে কাশ্মীর স্বাধীন করতে সক্ষম? আমি অবশ্য অত্যন্ত রূঢ় ভাষায় বলেছিলাম, ১৯৬৫ সালে তারা যা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে, ভবিষ্যতেও তা অর্জন করতে পারবে না।’ উত্তেজিত হয়ে মুজিব বললেন, ‘প্রিয় ভাই, আপনি কি জানেন, যখন আমি ভারতীয় বিমান ছিনতাই, ফারাক্কা ইত্যাদি ইস্যুর কৃত্রিমতা নিয়ে কথা বলেছিলাম, তখন পশ্চিম পাকিস্তানের শহরগুলোয় তারা আমার আর মিসেস গান্ধীর কুশপুত্তলিকা দাহ করেছিল। তারা স্লোগান দিয়েছিল, “মুজিব-ইন্দিরা ভাই-ভাই…”’ (বাকি শব্দগুলো আমি ভুলে গেছি, তবে তাদের মূল ছিল এই যে, এক দড়িতে ফাঁসি চাই)। মুজিব বললেন, ভারত ও বাংলাদেশের উচিত পশ্চিম পাকিস্তান এবং এর ইউনিটগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতির গতিপ্রকৃতি সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং এ বিষয়ে তথ্য বিনিময় করা। এখানে আমাকে অবশ্যই যুক্ত করতে হবে যে ততক্ষণে তিনি ভুট্টোর প্রসঙ্গ তোলা একেবারেই বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

যেহেতু মুজিব পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন অংশের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন (আমি সঙ্গে সঙ্গে ‘পশ্চিম পাকিস্তান’ বলায় ক্ষমা চেয়ে নিজেকে সংশোধন করে ‘পাকিস্তান’ বললাম), তাই আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, বেলুচিস্তান ও সিন্ধুর জনগণের অনুভূতি সম্পর্কে তাঁর মতামত কী? আমার প্রশ্নে মুজিব তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালেন না। তিনি কিছুক্ষণের জন্য উঠে গেলেন। ফিরে আসার পর তিনি আবারও সামাদকে কারও সঙ্গে সাক্ষাতের সময় ঠিক করার অজুহাতে ঘর থেকে বের করে দিলেন। তারপর প্রায় ফিসফিস করে আমাকে বললেন, সিন্ধিদের মধ্যে দরিদ্র অংশটি ছাড়া বাকিরা এবং বিপুলসংখ্যক বাঙালি, বালুচ ও অসিন্ধিরা ভুট্টোর অবাধ্য হবে না। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের মানুষ নির্ভরযোগ্য নয়। তারা ব্রিটিশ এবং পরে পাকিস্তানের সরকারগুলোর মাধ্যমে বহু দশক ধরে কলুষিত হয়েছে। ‘বালুচদের ওপর আমার অগাধ আস্থা আছে। সেখানে আমার একটি সংগঠনের নেটওয়ার্ক আছে, যার ওপর যেকোনো কাজের জন্য নির্ভর করা যায়। মিসেস গান্ধীর আস্থাভাজন সেই ভদ্রলোকের সঙ্গে আমি বিষয়গুলো বিস্তারিত আলোচনা করব। আমাদের যা করতে হবে, তা হলো সমর্থন, অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং অন্য সব ধরনের বস্তুগত সহায়তার আশ্বাস দেওয়া। বিশ্বাস করুন, পাকিস্তানের যেকোনো অপাঞ্জাবি অংশের চেয়ে বালুচরা অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য। আমি তাদের সবার সঙ্গে কাজ করেছি। আমি এই সত্যটি জানি।’ তিনি পুনরায় জোর দিয়ে বললেন, ‘এটি এমন একটি বিষয়, যা আমাদের অবশ্যই বিস্তারিত আলোচনা করতে হবে এবং আমি আপনাকে বলছি, তারা পাকিস্তানে বিশাল বিপর্যয় সৃষ্টি করবে।’

মুজিব আমাকে বললেন, এশিয়ার দেশগুলোকে একত্র হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি একটি রাজনৈতিক উদ্যোগ শুরু করার কথা ভাবছেন। এশিয়ায় বড় ভূমিকা রাখার এই অসংলগ্ন বিষয়টি ব্যাখ্যা করার সময় তাঁকে অত্যধিক উচ্চাভিলাষী শোনাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর অহংকে উসকে দিয়েছে। এই অলীক স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেওয়ার পর তিনি উপমহাদেশের পরিস্থিতির রূঢ় বাস্তবে ফিরে এলেন। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কোনো ধরনের সংলাপ সম্ভব কি না। এ কথা বলার পরপরই যেন তিনি রক্ষণাত্মক অবস্থানে আছেন, এমনভাবে বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়ে ভুট্টো যা যা বলেছিলেন, তার পুনরাবৃত্তি করে বললেন, এ বিষয়ে সংবাদপত্রে যা প্রকাশিত হয়েছে, তার বাইরে নতুন কিছু নেই। তবে আমার ধারণা, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে একধরনের সংযোগ বজায় রাখার সম্ভাবনা নিয়ে যে কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে, তা নিশ্চয়ই অনিচ্ছুক প্রতিপক্ষের কবল থেকে নিজের মুক্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মুজিবের অত্যন্ত চতুর ও প্রবল আকাঙ্ক্ষারই ফল। এটি সম্ভব যে সত্যিকার অর্থে মুক্ত হওয়ার পরপরই সব প্রত্যাখ্যান করবেন, এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ সচেতন থেকেই হয়তো তিনি অত্যন্ত চমকপ্রদ ও লোভনীয় সব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বিশ্বের কয়েকটি দেশের কূটনৈতিক দপ্তরগুলোয় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে একধরনের সংযোগের ধারণা নিয়ে এখনো যে বিভ্রান্তি বিরাজ করছে, তার মূল কারণ সম্ভবত নিজের মুক্তির জন্য দর-কষাকষির সময় মুজিবের সেই আচরণ। আমি মুজিবকে বললাম, মিসেস গান্ধী উপমহাদেশে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত আগ্রহী, যা তাঁর দেওয়া প্রকাশ্য বিবৃতিগুলো থেকেই সুস্পষ্ট। উপমহাদেশে একটি স্থায়ী শান্তির যুগে প্রবেশ করাই বাঞ্ছনীয়, যা ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের পূর্ণ সমতা ও স্বাধীনতার ভিত্তিতে যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে সূচিত হতে পারে। মুজিব বললেন, তিনি কলকাতায় মিসেস গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় এমন পরিস্থিতির দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনাগুলো নিয়ে আলোচনা করতে চান।

যা-ই হোক, তিনি বললেন, তিনি জানেন, ভারত ও বাংলাদেশের মতো বড় দেশগুলো শুধু এই অঞ্চলেই নয়, বরং সমগ্র আফ্রো-এশিয়ায় যৌথভাবে যে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তার বিরুদ্ধে পাকিস্তানের বন্ধুরা পাকিস্তানকে একটি ‘লিভারেজ’ বা কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা অব্যাহত রাখবে। প্রসঙ্গক্রমে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘সপ্তম নৌবহর এখন কোথায়? এটি কি বঙ্গোপসাগর ছেড়ে চলে গেছে? দয়া করে আমাকে সপ্তম নৌবহরের পুরো ঘটনাটি বলুন।’ আমি মুজিবকে জানালাম, সপ্তম নৌবহর এখন আর বঙ্গোপসাগরে নেই। প্রকৃতপক্ষে এটি ফিরে গেছে এবং আমাদের উপকূল থেকে বহু দূরে অবস্থান করছে। আমি মুজিবকে জিজ্ঞাসা করলাম, বর্তমানে ‘অ্যান্ডারসন পেপারস’ নামে যা বিখ্যাত হয়ে উঠেছে, তিনি সেটি পড়েছেন কি না। তিনি বললেন, তিনি সেই প্রতিবেদনগুলো বিক্ষিপ্তভাবে কিছুটা পড়েছেন। আমি যদি অ্যান্ডারসনের ফাঁস করা তথ্যের পূর্ণাঙ্গ সেট তাঁকে পাঠাতে পারি, তবে তিনি খুব খুশি হবেন। সপ্তম নৌবহরের আবির্ভাবে আমাদের অনুভূতি কেমন ছিল, তা তিনি পুনরায় জানতে চাইলেন। আমি তাঁকে জানালাম, চীন সাগর থেকে মালাক্কা প্রণালিতে এবং পরে মালাক্কা প্রণালি থেকে বঙ্গোপসাগরের দিকে সপ্তম নৌবহরের গতিবিধি সম্পর্কে আমরা শুরু থেকেই অবগত ছিলাম। অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে আমি বললাম, এ বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য আমরা রুশ সূত্রের মাধ্যমে পেয়েছিলাম। এটি আমাদের দেশ এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য এক বিশাল বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছিল; বিশেষত যখন এই নৌবহরের অগ্রযাত্রার পাশাপাশি চীনাদের পক্ষ থেকেও তীব্র আস্ফালন শোনা যাচ্ছিল। আমাদের প্রতিক্রিয়া ছিল সহজ—বীর ও সাহসীদের প্রতিক্রিয়া যেমন হয়, ঠিক তেমন। আমি তাঁকে বললাম, ব্যক্তিগতভাবে ভারতের ইতিহাসের এই মহিমান্বিত মুহূর্তের সাক্ষী হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার এবং আমাদের সেনা সদর দপ্তর চরম উদ্বেগের মধ্যে ছিল। আমাদের প্রশাসনের সদস্যরাও গভীর শঙ্কা বোধ করছিলেন। মিসেস গান্ধীর রাজনৈতিক সহকর্মীরাও স্বভাবতই চিন্তিত ছিলেন। কিন্তু তিনি ছিলেন অকুতোভয়। তিনি যে পথ বেছে নিয়েছিলেন, অর্থাৎ বাংলাদেশকে স্বাধীন করা—সেই পথ থেকে বিচ্যুত হতে তিনি অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। তিনি প্রস্তুত ছিলেন প্রয়োজনে ভারত সম্মানের সঙ্গে ধ্বংস হয়ে যাবে, তবু হুমকির মুখে কোনো অপমানজনক শর্ত মেনে নেবে না। আমি শেখ মুজিবকে কল্পনা করতে বললাম, তিনি [ইন্দিরা গান্ধী] যদি ভয় পেয়ে নতি স্বীকার করতেন এবং যুদ্ধবিরতির নির্দেশ দিতেন, পরিস্থিতি তাহলে কী হতো! বাংলাদেশ তখন আরেকটি ভিয়েতনামে পরিণত হতো। সপ্তম নৌবহরের উপস্থিতি তথা যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর জন্য আপনার দেশের মাটিতে কোথাও না কোথাও অন্তত একটি অবস্থান বজায় রাখা, যাতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের উপস্থিতি আরও বাড়ানো যায় এবং তা কার্যকর করে তোলা যায়। মুজিব দৃশ্যত আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন। তিনি আবারও মাথা নত করলেন এবং বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, ‘তিনি সত্যিই এশিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহসী মানুষটির সুযোগ্য সাহসী কন্যা। বাঙালিদের যদি সামান্যতম কৃতজ্ঞতাবোধও থাকে, তাহলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাদের উচিত তাদের ত্রাণকর্তা—আপনার প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।’

মুজিব জানালেন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গা অববাহিকার উন্নয়ন নিয়ে আলোচনার জন্য তিনি (বি এম) আব্বাসকে ভারতে পাঠিয়েছেন। উত্তেজিত হয়ে তিনি বললেন, ‘আপনি জানেন, আমি জনসমক্ষে বলেছি যে ফারাক্কা নিয়ে বিতর্ক ছিল পূর্ব বাংলার জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করা একটি ধাপ্পাবাজি। আমি জীবনে কখনোই পূর্ব বাংলাকে “পূর্ব পাকিস্তান” বলিনি। আমি আমার জনগণকে বলেছিলাম, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিলে মিসেস গান্ধীর সঙ্গে এক বৈঠকে ১৫ মিনিটেরও কম সময়ে আমি এই সমস্যার সমাধান করব। এই ঘরেই ইয়াহিয়া আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ভারতের প্রতি আমার মনোভাব কী হবে। আমি তাঁকে বলেছিলাম, আমার মনোভাব এক শব্দেই বর্ণনা করা যায়—“বন্ধুত্ব”। তিনি জানতে চাইলেন, আপনি কি ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য করবেন? আমি বললাম, অবশ্যই! পারস্পরিক সুবিধার্থে দুই বাংলা একে অপরের সঙ্গে বাণিজ্য করবে। দুই দেশ সমানভাবে পারস্পরিক স্বার্থে একে অপরের সঙ্গে বাণিজ্য করবে। আমি তাঁকে প্রশ্ন করলাম, চীন থেকে কয়লা আনার কী যুক্তি থাকতে পারে, যার জন্য বাংলায় আমাদের প্রতি টনে ১৭৬ থেকে ১৮০ টাকা খরচ পড়ে? অথচ একই কয়লা, সম্ভবত আরও উন্নত মানের কয়লা, আমি আমার প্রতিবেশীর কাছ থেকে প্রতি টনে ৬৫ থেকে ৭০ টাকায় পেতে পারি। আপনি বলেছিলেন, অর্থনীতিতে আপনি খুব একটা দক্ষ নন। স্বীকার করছি, আমিও নই। কিন্তু এই সাধারণ পাটিগণিতটুকু আমি বুঝি। ইয়াহিয়া এটি পছন্দ করেননি।’

‘আমাদের গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র—এ দুই অববাহিকার উন্নয়নের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে হবে। দয়া করে এই সমীক্ষার সঙ্গে জনসমক্ষে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সেচ ইত্যাদির প্রশ্ন জড়াবেন না। বাংলাদেশের মানুষকে সবচেয়ে বেশি স্পর্শ করে বারবার বন্যার বিভীষিকা। আপনি রাজনীতির মানুষ, আমিও তা-ই। সুতরাং, আসুন আমরা বলি, ভারত ও বাংলাদেশ যৌথভাবে বাংলাদেশে বন্যা নিয়ন্ত্রণে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। অন্য বিষয়গুলো এ প্রক্রিয়ার মধ্যেই নিহিত। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সেচের পানি বাংলাদেশের মানুষকে ততটা আলোড়িত করবে না, যতটা করবে এই সত্যটি যে বন্যার ধ্বংসলীলা নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি ভারত ও বাংলাদেশের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক উন্নয়নের মধ্যেই নিহিত।’ আমি মুজিবকে জিজ্ঞাসা করলাম, সমস্যাটি খতিয়ে দেখার জন্য তিনি একটি যৌথ কমিশন গঠন করতে চান কি না। এই কমিশনের কাজ হবে দুই সরকারের কাছে বিদ্যমান তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা এবং বর্তমানে আমাদের কাছে থাকা কারিগরি তথ্যের যেসব ঘাটতি রয়েছে, তা পূরণে আরও তথ্য সংগ্রহ করা। এরপর আমরা একটি প্রাথমিক প্রকল্প প্রতিবেদন এবং পরে বিস্তারিত প্রকল্প প্রতিবেদন তৈরি করতে পারি। এ প্রক্রিয়ায়—যদিও আমাদের দুই দেশের মধ্যেই যথেষ্ট যোগ্য বিশেষজ্ঞ রয়েছেন—তবু প্রয়োজনে আমরা বাইরে থেকে বিশেষজ্ঞ আমন্ত্রণ জানাতে পারি। এই অববাহিকাগুলোর উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত সুফল পেতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পর বিশ্বব্যাংক বা অন্য কোনো সংস্থার মাধ্যমে এটি করা যেতে পারে। এরপর আমরা প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করব। এই ব্যয় আমাদের নিজস্ব সম্পদ থেকে আংশিক এবং বিদেশ থেকে ঋণ নিয়ে আংশিক মেটানো যেতে পারে। আসওয়ান বাঁধের ক্ষেত্রে যেমন দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে ঋণ নেওয়া হয়েছিল, অথবা বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের মতো বহুপক্ষীয় ঋণদানকারী সংস্থাগুলোর কাছ থেকেও এই ঋণ চাওয়া যেতে পারে। মুজিব বললেন, তিনি এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে একমত। তবে তিনি অত্যন্ত আগ্রহী যেন ‘মার্চের মাঝামাঝি’ সময়ের মধ্যেই তিনি তাঁর জনগণকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কিছু বলতে পারেন। ‘আমি এই প্রকল্পগুলোর মধ্যে এক বা দুটির কাজ শুরু করতে চাই। বাঁধ নির্মাণের জন্য অর্থাৎ এই কাজের জন্য প্রয়োজনীয় কায়িক শ্রমের জোগান দিতে আমি বাংলাদেশের ১০ লাখ, আপনি চাইলে ২০ লাখ মানুষকেও সমবেত করতে পারি। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে জনগণকে কাজে লাগিয়েই চীনারা অনেক কিছু করেছে এবং অর্জন করেছে। আমরাও জনগণকে কাজে লাগাতে পারি। নদীগুলোর বাঁধ নির্মাণের কাজ বিশাল পরিসরে শুরু করার জন্য আমি আপনাকে আমার দেশের ২০ লাখ মানুষ দেব। আপনার কাছে আমার শুধু একটাই চাওয়া, এই প্রকল্পের কাজ অবশ্যই শুরু করতে হবে। আমার দেশের মানুষকে দেখতে হবে যে পাকিস্তান যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা ছিল ধাপ্পাবাজি; আর ভারতের সহায়তায় আমি যা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, তা হলো বাস্তবতা। এটি আরেকটি বিষয়, যা আমি মিসেস গান্ধীর সঙ্গে আলোচনা করতে চাই।’

আলোচনার শেষ পর্যায়ে মুজিব পুনরায় পাকিস্তানিদের হাতে সংঘটিত নৃশংসতার বিবরণ দিতে শুরু করলেন। তিনি বললেন, ‘আপনি জানেন, তারা নিজেদের মুসলমান বলে দাবি করত, আর আমাদের বলত কাফের। পাকিস্তানে যখন আমি আপনার নাম প্রথম শুনেছিলাম, তখন ভেবেছিলাম আপনি একজন বাঙালি। এমনকি দিল্লিতে আপনার সঙ্গে সাক্ষাতের সময়ও আমার ধারণা ছিল আপনি বাঙালি। কেবল এখানে এসেই আমি জানতে পারলাম যে আপনি একজন কাশ্মীরি। বাংলা থেকে এত দূরের একজন মানুষ আমাদের এতটা সহায়তা করেছেন—এ কথা জেনে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। আমি মিসেস গান্ধীকে বলব যে আপনাকে নির্বাচন করে তিনি সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছিলেন। তবে আমি কাশ্মীরের জনগণের সঙ্গে কথা বলতে চাই। আমি কাশ্মীরে ২০ দিন কাটাতে চাই। আমি তাদের বলতে চাই যে আমিও একজন মুসলমান। আমি তাদের বলতে চাই—মুসলমান হিসেবে তারা তো পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হতে চায়। কিন্তু পাকিস্তানের মুসলমানরা বাংলার মুসলমানদের ওপর যে পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়েছে, তার সব ছবি ও কাহিনি আমি সঙ্গে করে নিয়ে যেতে চাই। আমি আপনার কাশ্মীরিদের জিজ্ঞাসা করব—এটাই কি সেই পাকিস্তান, যার সঙ্গে তারা যুক্ত হতে চায়? আমি তাদের বলব, মিসেস গান্ধীই আমাদের এই বর্বরদের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। আমি তাদের প্রশ্ন করব—তারা কি গিয়ে এই বর্বরদের আলিঙ্গন করবে, নাকি তারা মিসেস গান্ধীর ওপর আস্থা রাখবে, যিনি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্রকে শৃঙ্খলমুক্ত করেছেন? আমি কাশ্মীরে যাবই। আপনার জন্য আমি অন্তত এটুকু করতে পারি। মিস্টার ধর, বাংলাদেশে আমার ভাই, আমার বোন আর আমার কন্যারা যে দুর্ভাগ্যের শিকার হয়েছে, আমি চাই না আপনার ভাইবোনেরাও সেই একই পরিণতির শিকার হোক। এটিও সেই বিষয়গুলোর অন্যতম, যা নিয়ে আমি আপনার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করব।’

ততক্ষণে মুজিবের সঙ্গে আমার আলোচনার প্রায় ২ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট অতিক্রান্ত হয়েছে। তাই আমি তাঁকে বললাম, আমি তাঁর অনেকটা সময় নিয়ে ফেলেছি। তা ছাড়া তাঁর কাছে ক্রমাগত অপেক্ষমাণ সাক্ষাৎপ্রার্থীদের নাম লেখা বেশ কিছু চিরকুট আসছিল। আমি তাঁকে বললাম, আমাকে এতটা সময় দেওয়ার জন্য আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। এখন আমি বিদায় নিতে চাই। যদিও এ কথা বলতে গিয়ে আমার মনে হচ্ছিল, তাঁর মতো এমন এক সম্মোহনী ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করা আমার জন্য কঠিনই বটে। মুজিব আমাকে বিদায় দিতে অনিচ্ছুক ছিলেন। তিনি বললেন, ‘আমরা এখানে ৩ ঘণ্টা ধরে আছি। আমার তো ইচ্ছে করছে আমরা যেন ৩ দিন, ১০ দিন বা ৩ মাস ধরে একত্রে থাকতে পারি। আমাদের একে অপরকে বলার মতো অনেক কথা আছে। কিন্তু আমি জানি, আপনারও অন্য কাজ আছে। দয়া করে আমার সাক্ষাতের সময়গুলোর দোহাই দিয়ে চতুরতা করবেন না। ওই ভদ্রলোকেরা অপেক্ষা করতে পারবেন। তবে চলে যাওয়ার আগে আমি আপনাকে দু-একটি প্রশ্ন করতে চাই। আমি আনন্দিত যে আপনি আমার সঙ্গে অকপটে কথা বলেছেন। আমিও আপনার সঙ্গে অকপট হব। প্রকৃতপক্ষে আমি সব সময়ই স্পষ্টবাদী। আর এটাই আমার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি আমলাদের সঙ্গে, এমনকি সামরিক জান্তার বিবেকহীন প্রতিনিধিদের সঙ্গেও খোলাখুলি কথা বলেছি। কিন্তু আজ আমি এমন একজন ব্যক্তির সঙ্গে অকপটে কথা বলছি, যাঁর রাজনৈতিক অতীত রয়েছে এবং আমি শুনেছি তিনি আমাদের মহান বন্ধু মিসেস গান্ধীর আস্থাভাজন। আপনি কি আমাকে বলতে পারেন—আমাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমরা একে অপরের সঙ্গে কত দূর পর্যন্ত যেতে পারি? আমি চাই না বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষের রক্ত দিয়ে যে বন্ধুত্বের ভিত রচিত হয়েছে, তা ব্যবসা-বাণিজ্য বা অন্য কোনো স্বার্থের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হোক। এ বিষয়ে আমি আপনার মতামত জানতে চাই।’ আমি মুজিবকে বললাম, আমি দুঃখিত যে আমার প্রধানমন্ত্রী আমাকে যে মূল বার্তাটি আপনার কাছে পৌঁছে দিতে বলেছিলেন, তা আমি এখনো দিইনি। আমি তাঁকে জানালাম, আমি তাঁর পক্ষ থেকেই বলছি—ভারত এমন কিছুই করতে চায় না, যা তাঁকে, তাঁর দলকে এবং বাংলাদেশে তাঁর কর্তৃত্বকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে। একইভাবে বাংলাদেশে তাঁর অবস্থান, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে শক্তিশালী করতে পারে—এমন কিছু করতেও ভারত পিছপা হবে না। সংক্ষেপে এটিই ভারতের উদ্দেশ্য। স্বাভাবিকভাবেই এর জন্য প্রয়োজন হবে খোলামেলা মতবিনিময়। আমি মুজিবকে বললাম, আমাদের কোনো কাজে বা প্রস্তাবিত পদক্ষেপে যদি তাঁর বিব্রতকর অবস্থায় পড়ার আশঙ্কা থাকে, তবে তা জানাতে তিনি যেন বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করেন। কারণ, আমরা অনিচ্ছাকৃতভাবে বা অন্য কোনোভাবে এমন কিছুই করতে চাই না, যা আমাদের সম্পর্কের মধ্যে অস্বস্তির বীজ বপন করতে পারে। আমি মুজিবকে আরও বললাম, এর পর থেকে যদি বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের মধ্যে কোনো ভুল-বোঝাবুঝি বা অস্বস্তির সৃষ্টি হয়, তবে তার দায় ভারতের হবে না, বরং বাংলাদেশেরই হবে; কারণ আমরা সর্বদা তাঁর বিজ্ঞ পরামর্শ ও উপদেশ মেনেই চলব। মুজিব আবারও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন। তাঁর গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ার সময় বললেন, ‘আমার বন্ধু, আমার ভাই, অনুগ্রহ করে মিসেস গান্ধীকে বলবেন যে আমরা তাঁর প্রতি এবং ভারতের জনগণের প্রতি কখনোই অকৃতজ্ঞ হব না। প্রশাসনের ক্ষেত্রে আমার কোনো অভিজ্ঞতা নেই। আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি পরিচালনারও কোনো অভিজ্ঞতা আমার নেই। তাই ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় পৌঁছে তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার অপেক্ষায় আমি অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছি। তাঁর অভিজ্ঞতা আছে। তিনি আমাকে অবশ্যই পথ দেখাবেন। আপনি দেখবেন, আমি তাঁকে নিরাশ করব না।’

ততক্ষণে মুজিবকে ঘিরে থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে কিছুটা অধৈর্য ভাব লক্ষ করলাম। তাই আমার মনে হলো, আবারও বিদায় নেওয়ার অনুমতি চাওয়াই সমীচীন হবে। আমি তাঁকে বললাম, আমরা তিন ঘণ্টা ধরে একত্রে আছি এবং তিনি যে আমাকে এতটা সময় দিয়েছেন, তা তাঁর মহানুভবতা। আমার চলে যাওয়ার তাড়ায় তাঁকে কিছুটা ক্ষুণ্ন মনে হলো। তিনি সামাদকে জিজ্ঞাসা করলেন, কেন আমাকে তাঁর সঙ্গে আরও কিছুক্ষণ থাকতে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না? সামাদ জানালেন, বঙ্গবন্ধুর অনেকগুলো পূর্বনির্ধারিত সাক্ষাৎ রয়েছে এবং আমাদের সাক্ষাতের আরও সুযোগ আসবে। মুজিব আমার দিকে ঘুরে বললেন, ‘আপনি কি মনে করেন, ৬ ফেব্রুয়ারি মিসেস গান্ধী যখন কলকাতায় আসবেন, তখন সেখানে যাওয়ার জন্য আপনাকে আমার আলাদা করে আমন্ত্রণ জানাতে হবে? আপনি কি আমার কর্মসূচি জানেন? আমি তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করতে চাই। কলকাতায় আমি যে জনসভায় ভাষণ দেব, সেখানে আমি তাঁর প্রতি আমার কর্তব্য পালন করতে চাই। আমি একটি শরণার্থীশিবিরও দেখতে চাই। ৭ ফেব্রুয়ারি তারিখটি আপনাকে অবশ্যই আমার জন্য ফাঁকা রাখতে হবে। আমি আমার বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে চাই। আমি শান্তিনিকেতনে গিয়ে সেই মহামানবের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে চাই, যাঁর “সোনার বাংলা”র স্বপ্ন আজ বাস্তবায়িত হয়েছে।’ আমি তাঁকে জানালাম, কলকাতায় তাঁর কর্মসূচির বিস্তারিত আমি জানি না। তবে আমি নিশ্চিত, মিসেস গান্ধীর সঙ্গে সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করার মতো পর্যাপ্ত সময় তিনি পাবেন। সাহস করে আমি এ-ও বললাম যে তাঁর সফরকালে আমিও কলকাতায় উপস্থিত থাকব। একই সঙ্গে তাঁকে সতর্ক করে বলার ধৃষ্টতা দেখালাম যে শান্তিনিকেতন সফরের বিষয়টি সেখানকার রাজনৈতিক পরিস্থিতির, বিশেষ করে নকশাল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করে দেখতে হবে।