‘দাদার–বাবার নাম ভুলে যাওয়ার রাজনীতি’: মুসলমানিত্বের সঙ্গে বাঙালিত্ববাদের বোঝাপড়া

বাঙালি মুসলিম ও হিন্দু: জেনেটিক অভিন্নতা বনাম ধর্মীয় বিভাজন

বাংলাদেশি মুসলিম ও হিন্দু বাঙালিদের জেনেটিক পরিচয়ের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হলো তাদের মধ্যকার অবিশ্বাস্য সাদৃশ্য। আধুনিক জিনোমিক গবেষণায় বারবার প্রমাণিত হয়েছে, ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে এই অঞ্চলের মানুষের জেনেটিক কাঠামো মূলত একই ভৌগোলিক উৎসের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে (জিওয়ানি ২০২৩)। ভারতের বারাক উপত্যকা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের ঢাকা পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, হিন্দু ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে জেনেটিক ডিস্ট্যান্স বা দূরত্ব ০.১২ শতাংশ থেকে ০.১৫ শতাংশের বেশি নয় (সুপ্রিয় ২০১০)।

‘১০০০ জেনোমস প্রজেক্ট’-এর অধীন সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের বাঙালিদের জেনেটিক ক্লাস্টার অত্যন্ত সুসংবদ্ধ। এই ক্লাস্টারে হিন্দু ও মুসলিম উভয় ধর্মাবলম্বীরাই এমনভাবে মিশে আছে যে কেবল ডিএনএ ডেটা ব্যবহার করে ধর্মীয় পরিচয় আলাদা করা প্রায় অসম্ভব (কার্লসন ও অন‍্যান‍্য ২০১৩)। এটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করে যে বাংলার মানুষের মধ্যে ধর্মীয় রূপান্তর মূলত একটি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রক্রিয়া ছিল, যা কোনো বড় আকারের জনতাত্ত্বিক প্রতিস্থাপন ঘটাতে পারেনি (গুটালা ও অন‍্যান‍্য ২০০৬)।

দক্ষিণ এশিয়ার, বিশেষ করে বাংলার হিন্দু ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে জেনেটিক ও রক্তগত সাযুজ্যের হার অত্যন্ত গভীর। ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ দুই ধর্মীয় গোষ্ঠীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় ভিন্ন হলেও তাদের জৈবিক ভিত্তি মূলত এক। নিচে আপনার প্রদান করা উপাত্তের ভিত্তিতে এর একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ দেওয়া হলো (সুপ্রিয় ২০১০):

রক্তগত ও জিনগত অভিন্নতা (এবিও ও আরএইচ ফ্যাক্টর): জেনেটিক সূচকগুলোর মধ্যে এবিও ব্লাড গ্রুপ এবং আরএইচ ফ্যাক্টর সবচেয়ে মৌলিক। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, হিন্দু ও মুসলিম উভয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে এবিও ব্লাড গ্রুপ জিনের অভিন্নতা প্রায় ৯৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ। একইভাবে আরএইচ ব্লাড গ্রুপের ক্ষেত্রে এই সাযুজ্যের হার ৯৯ দশমিক ৯০ শতাংশ। এই উচ্চমাত্রার মিল প্রমাণ করে, উভয় জনগোষ্ঠীর পূর্বপুরুষেরা একই ভৌগোলিক ও নৃবৈজ্ঞানিক উৎস থেকে এসেছেন। ধর্মান্তরের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার ফলে সাংস্কৃতিক পরিবর্তন এলেও রক্তগত উপাদানে কোনো উল্লেখযোগ্য বিভাজন তৈরি হয়নি।

হেটেরোজাইগোসিটি (Heterozygosity) ও জেনেটিক বৈচিত্র্য: হেটেরোজাইগোসিটি মূলত একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে জেনেটিক বৈচিত্র্যের মাত্রা নির্দেশ করে। উপাত্ত অনুযায়ী, এবিও ব্লাড গ্রুপের ক্ষেত্রে হিন্দু জনগোষ্ঠীর হেটেরোজাইগোসিটি মান শূন্য দশমিক ৫৫৯৮ এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে শূন্য দশমিক ৫৩৪৬। যদিও এই দুই মানের মধ্যে সামান্য পার্থক্য রয়েছে, তবু উভয় ক্ষেত্রেই উচ্চ সাযুজ্য লক্ষ করা যায়। হিন্দুদের ক্ষেত্রে কিছুটা বেশি বৈচিত্র্য থাকার কারণ হতে পারে তাদের দীর্ঘকালীন বর্ণভিত্তিক সামাজিক কাঠামো এবং বিভিন্ন উপগোষ্ঠীর সংমিশ্রণ। অন্যদিকে মুসলিমদের মান সামান্য কম হলেও তা সামগ্রিক জিনগত ঐক্যেরই প্রতিফলন।

প্যানমিকটিক ইনডেক্স ও প্রজননধারা: প্যানমিকটিক ইনডেক্স (Panmictic Index) একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে অবাধ প্রজনন বা সংমিশ্রণের হার নির্দেশ করে। হিন্দু জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ সূচক উচ্চতর, যা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী জেনেটিক বিনিময়ের ফল। অন্যদিকে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এ সূচক তুলনামূলক নিম্নতর। এর একটি প্রধান কারণ হতে পারে নির্দিষ্ট কিছু মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত ‘অন্তঃপ্রজনন’ বা আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ের (Consanguinity) প্রভাব। তবে এ পার্থক্য মূলত সামাজিক রীতিনীতির কারণে সৃষ্ট, যা তাদের মৌলিক জেনেটিক কাঠামোকে পরিবর্তন করে না।

সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার হিন্দু ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে জেনেটিক দূরত্বের চেয়ে নৈকট্যই অনেক বেশি প্রবল। আদিবাসী দক্ষিণ এশীয় (এএসআই), উত্তর ভারতীয় (এএনআই) এবং অস্ট্রো-এশীয় (এএআই) উপাদানের যে সংমিশ্রণ আমরা আগের আলোচনায় দেখেছি, তা উভয় ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেই প্রায় সমানভাবে বিদ্যমান। এই বৈজ্ঞানিক সত্য প্রমাণ করে, আমাদের ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হলেও জৈবিক শিকড় মূলত একই সূত্রে গাঁথা।

মজার বিষয় হলো, কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, মুসলিমদের তুলনায় হিন্দুদের মধ্যে জেনেটিক বৈচিত্র্য বা হেটেরোজাইগোসিটি সামান্য বেশি, যার কারণ হতে পারে হিন্দুদের ঐতিহাসিক বর্ণপ্রথার জটিল কাঠামো এবং এর মধ্য দিয়ে হওয়া ধীর জেনেটিক প্রবাহ (সুপ্রিয় ২০১০)। অন্যদিকে মুসলিমদের মধ্যে কাজিন ম্যারেজ বা নিকটাত্মীয়ের মধ্যে বিয়ের প্রচলন থাকায় তাদের মধ্যে সামান্য ইনব্রিডিং কো-ফিশিয়েন্ট লক্ষ করা যায় (পামবার্টো ও অন‍্যান‍্য ২০১৫)।

ইসলামি রূপান্তর এবং ‘বিদেশি বংশোদ্ভূত’ তত্ত্বের বৈজ্ঞানিক অসারতা: ঐতিহাসিকভাবে একটি ধারণা প্রচলিত ছিল, বাংলার মুসলিমরা মূলত আরব, পারস্য বা মধ্য এশিয়া থেকে আগত ধর্মপ্রচারক ও যোদ্ধাদের সরাসরি বংশধর। তবে জেনেটিক তথ্য এ ধারণাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে। ওয়াই ক্রোমোজোম ও মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাংলাদেশি মুসলিমদের সিংহভাগই স্থানীয় হিন্দু, বৌদ্ধ এবং অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উত্তরসূরি, যারা মধ্যযুগে ধর্মান্তরিত হয়েছিল (তুলি ও অন‍্যান‍্য ২০২৫)।

বিশেষ করে ‘এমসিএম৬’ জিনের বিশ্লেষণ থেকে পাওয়া তথ্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই জিনের সি/টি–১৩৯১০ ভেরিয়েন্টটি ইউরোপ ও ইরানের মানুষের মধ্যে প্রচলিত, যা ভারতীয় উপমহাদেশে মধ্য এশীয় অভিবাসনের সংকেত দেয় (মেটসপল ও অন‍্যান‍্য ২০১০)। কিন্তু সৌদি আরবের নির্দিষ্ট ভেরিয়েন্ট টি/জি–১৩৯১৫ বাঙালিদের মধ্যে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত (মেটসপল ও অন‍্যান‍্য ২০১০)। এর অর্থ হলো, বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে যদি সামান্য কোনো বিদেশি রক্ত থেকেও থাকে, তবে তার উৎস সরাসরি আরব নয়, বরং ইরান বা মধ্য এশিয়া, যা মূলত সুলতানি ও মোগল আমলে প্রশাসনিক ও সামরিক প্রয়োজনে আসা অভিবাসীদের মাধ্যমে ঘটেছে (ডকুমেন্টারি ২০২৬)।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৮৭০ সালের আদমশুমারিতে মাত্র ২ শতাংশ মুসলিম বিদেশি বংশোদ্ভূত হওয়ার দাবি করেছিলেন, আর আধুনিক ডিএনএ স্টাডিজ এ তথ্যকেই সমর্থন করে (সলিমুল্লাহ ২০২৪)। মূলত ১২ শতকের পর থেকে ইসলামি সুফি ও ধর্মপ্রচারকদের প্রভাবে স্থানীয় কৃষিভিত্তিক সমাজ এক বিশাল সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়, যা কোনো প্রকার জেনেটিক প্রতিস্থাপন ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছিল (তুলি ও অন‍্যান‍্য ২০২৫)।

 

‘পূর্বাঞ্চলীয় (তিব্বতি-বর্মণ) জেনেটিক শিফট’ (Eastern Shift): বাংলাদেশের বাঙালিদের জেনেটিক পরিচয়ের একটি অনন্য দিক হলো তাদের মধ্যে থাকা তিব্বতি-বর্মণ (Tibeto-Burman) উপাদানের আধিক্য। একে অনেক বিজ্ঞানী ‘Eastern Shift’ হিসেবে অভিহিত করেন (কার্লসন ও অন‍্যান‍্য ২০১৩)। পশ্চিম ও উত্তর ভারতের মানুষের তুলনায় বাঙালিদের মধ্যে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ তিব্বতি-বর্মণ বা পূর্ব এশীয় জেনেটিক মার্কার পাওয়া যায় (সলিমুল্লাহ ২০২৪)।

এ প্রভাব মূলত এসেছে হিমালয় ও মিয়ানমার অঞ্চল থেকে আগত জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল ও উত্তরবঙ্গের সীমান্ত এলাকাগুলো দিয়ে হাজার হাজার বছর ধরে এই অভিবাসনপ্রক্রিয়া চলেছে (ডকুমেন্টারি ২০২৬)। হ্যাপ্লোগ্রুপ ‘ও২’ এবং ‘ডি’-এর উপস্থিতি বাঙালিদের মধ্যে এই পূর্ব এশীয় সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করে (ডকুমেন্টারি ২০২৬)। এই জেনেটিক উপাদান বাংলাদেশি মুসলিম ও হিন্দুদের মধ্যে সমভাবে বিদ্যমান, যা তাদের একটি সুনির্দিষ্ট ‘পূর্ববঙ্গীয়’ জেনেটিক পরিচয় প্রদান করে এবং পশ্চিম ভারতের জনগোষ্ঠী থেকে আলাদা করে (কার্লসন ও অন‍্যান‍্য ২০১৩)।

 

বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি ও জেনেটিক বাস্তবতা

বাংলাদেশের রাজনীতির মূল দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে দুটি প্রধান জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারার মধ্যে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ  (সলিমুল্লাহ ২০২৪)। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের মূল ভিত্তি ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ। শেখ মুজিবুর রহমান মনে করতেন, ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে বাঙালিরা একটি অবিচ্ছেদ্য জাতি, যেখানে ধর্ম কোনো বিভেদ সৃষ্টি করতে পারে না (সলিমুল্লাহ ২০২৪)। জেনেটিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দেখলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল দাবি; অর্থাৎ হিন্দু ও মুসলিম বাঙালি রক্তগত ও সাংস্কৃতিক ঐক্য অত্যন্ত জোরালোভাবে সমর্থিত (কার্লসন ও অন‍্যান‍্য ২০১৩)। ডিএনএ ডেটা স্পষ্টভাবে দেখায়, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের বাঙালির মধ্যে জেনেটিক কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই, যা ১৯৭২ সালের সংবিধানে প্রতিফলিত ধর্মনিরপেক্ষ ও ভাষাকেন্দ্রিক সংহতির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে (সলিমুল্লাহ ২০২৪)। একই রকম জেনেটিক ও সাংস্কৃতিক ঐক‍্য প্রতীয়মান আদিবাসী সম্প্রদায়সমূহের সঙ্গে বাঙালির।

১৯৭৫–পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটে। এই মতবাদ অনুযায়ী, বাংলাদেশের নাগরিকেরা কেবল বাঙালি নন, বরং তারা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের চেয়ে আলাদা একটি স্বকীয় পরিচয়ের অধিকারী (সলিমুল্লাহ ২০২৪)। এই স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠার জন্য ধর্মকে (ইসলাম) একটি প্রধান নিয়ামক হিসেবে যুক্ত করা হয় এবং নাগরিকত্বকে ‘বাঙালি’ থেকে ‘বাংলাদেশি’ নামে সংজ্ঞায়িত করা হয় (সাইমন ২০২৫)। বাবু সংস্কৃতিও এ বিভাজনে একটি শক্তিশালী সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।

তবে জেনেটিক ডেটা এই ‘স্বাতন্ত্র্য’ বা ‘পার্থক্য’-এর দাবিকে খুব একটা সমর্থন করে না। ডিএনএ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশি মুসলিমরা জেনেটিক্যালি পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু বা মুসলিমদের চেয়ে আলাদা কিছু নন (গুটালা ও অন‍্যান‍্য ২০০৬)। অর্থাৎ বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ যতটা না বৈজ্ঞানিক বা বংশগত পার্থক্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, তার চেয়ে বেশি এটি একটি রাজনৈতিক ও কৌশলগত নির্মাণ (imagined community), যার লক্ষ্য ছিল ভারতের সঙ্গে থাকা সাংস্কৃতিক মিলসমূহকে অস্বীকার করে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রীয় পরিচয় তৈরি করা (সলিমুল্লাহ ২০২৪)।

জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞা ও ভিত্তি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভিন্ন ভিন্ন রূপ নিলেও জেনেটিক বা জৈবিক বাস্তবতায় তা এক ধ্রুব ও অবিচ্ছিন্ন সত্য। বাংলাদেশে মূলত দুই ধরনের রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদ প্রচলিত, যার একটির মূল ভিত্তি ভাষা ও সংস্কৃতি এবং অন্যটির ভিত্তি ধর্ম ও ভূখণ্ড। তবে আধুনিক জিনতত্ত্বের নিরিখে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজনৈতিক বিভাজন সত্ত্বেও আমাদের জৈবিক পরিচয় অত্যন্ত সুসংহত ও অভিন্ন।

রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ মূলত ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এটি একটি সেক্যুলার চেতনা। অন্যদিকে ১৯৭৫–পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং সামরিক শাসনের হাত ধরে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ বিকাশ লাভ করে, যার নেতৃত্বে রয়েছে বিএনপি। এ আদর্শ ভাষা অপেক্ষা ধর্ম (ইসলামি প্রভাব) এবং নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানাকে বেশি গুরুত্ব দেয়, যা ভারতকে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গকে সাংস্কৃতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখে নিজেদের স্বতন্ত্র সার্বভৌম পরিচয় জাহির করতে চায়।

বাঙালিদের পাশাপাশি বাংলাদেশের জেনেটিক মানচিত্রে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরার মতো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই জনগোষ্ঠীগুলো মূলত তিব্বতি-বর্মণ বংশোদ্ভূত এবং তাদের জেনেটিক প্রোফাইল বাঙালিদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা (ইশতিয়াক ও অন‍্যান‍্য ২০২৪)। রাজনীতিতে এই জেনেটিক পার্থক্যটি ‘জুম্ম জাতীয়তাবাদ’ হিসেবে রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশের মূলধারার রাজনীতির ‘বাঙালি’ বা ‘বাংলাদেশি’ সংজ্ঞা অনেক সময়ই এই পাহাড়ি আদিবাসীদের অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে দীর্ঘকালীন ভূরাজনৈতিক সংঘর্ষের জন্ম হয়েছে (মাহমুদ ২০২৩)। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ যখন ‘ধর্মীয়’ চরিত্র ধারণ করে, তখন তা এই অমুসলিম পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জন্য আরও বেশি বর্জনীয় হয়ে পড়ে।

কিন্তু রাজনৈতিক এই বিভাজন যখন জেনেটিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়, তখন ছবিটা পাল্টে যায়। আধুনিক জেনেটিক মানচিত্র অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার এই অঞ্চলের মানুষ একটি অভিন্ন জেনেটিক ক্লাস্টারের অন্তর্ভুক্ত। সীমান্তের এপার এবং ওপারের মানুষের রক্তে হাজার বছর ধরে যে অ্যানসেস্ট্রাল নর্থ ইন্ডিয়ান, অ্যানসেস্ট্রাল সাউথ ইন্ডিয়ান, অ্যানসেস্ট্রাল অস্ট্রোএশিয়াটিক ইন্ডিয়ান এবং তিবেতো–বার্মান উপাদানের মিশ্রণ ঘটেছে, তা কোনো রাজনৈতিক দলের নীতি বা ভৌগোলিক সীমারেখা দ্বারা পরিবর্তিত হয়নি। রাজনৈতিক আদর্শ যেখানে নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ক্ষণে (১৯৫২ বা ১৯৭৫) জন্ম নেয়, জেনেটিক বাস্তবতা সেখানে হাজার বছরের ধারাবাহিকতা বহন করে। অর্থাৎ রাজনৈতিকভাবে আমরা ‘বাঙালি’ না ‘বাংলাদেশি’ তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও জৈবিকভাবে আমরা উচ্চমাত্রায় মিশ্র এবং এক অবিচ্ছেদ্য জনগোষ্ঠীর অংশ।

রাজনীতি প্রায়ই মানুষকে বিভক্ত করার ভাষা খুঁজে নেয়, কিন্তু আমাদের ডিএনএ বা জেনেটিক কোড নিরবচ্ছিন্নভাবে আমাদের সাধারণ উৎসের কথাই বলে যায়।

পরিশেষে

সাউথ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো বর্তমানে একটি বিশাল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের যে প্রবল উত্থান দেখা যাচ্ছে, তার ঢেউ বাংলাদেশেও আছড়ে পড়ছে। এই অঞ্চলে বহুত্ববাদ বা প্লুরালিজম এখন হুমকির মুখে। পশ্চিমা ধাঁচের ধর্মনিরপেক্ষতা, যা ধর্ম ও রাষ্ট্রকে পুরোপুরি আলাদা করে দেখে, তা দক্ষিণ এশিয়ার ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে খুব একটা কার্যকর হয়নি (আশিস ১৯৮৭)।

আশিস নন্দীর মতো পণ্ডিতেরা যুক্তি দেন যে আধুনিক রাষ্ট্রীয় ধর্মনিরপেক্ষতা আসলে মানুষের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভেদকে আরও উসকে দিয়েছে। তাঁর মতে, প্রাক্‌-আধুনিক ভারতে যে ধরনের ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও লৌকিক আচার বিদ্যমান ছিল, তা ছিল অনেক বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক (আশিস ১৯৮৭)। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সুফি ও পীরদের যে লোকজ ইসলাম, তা–ও ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। জাতীয়তাবাদ-উত্তর রাষ্ট্রকল্পে এই লৌকিক ও সমন্বয়বাদী ঐতিহ্যগুলো পুনরুদ্ধারের দাবি ক্রমে জোরালো হচ্ছে।

বাঙালি আতরাফ মুসলিমদের ‘দাদার বাবার নাম’ ভুলে যাওয়ার রাজনীতি এবং নামের শুরুতে ‘মোহাম্মদ’ বা ‘মো.’ ব্যবহারের যে বিশ্লেষণ এই প্রবন্ধে তুলে ধরা হয়েছে, তা এক দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিক সংগ্রামের ফলাফল। এটি একদিকে যেমন বর্ণবাদী অপমান এবং সামাজিক বঞ্চনা থেকে মুক্তিলাভের এক মরিয়া চেষ্টা, অন্যদিকে এটি নিজের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার এক করুণ আখ্যান।

আশরাফীকরণের মাধ্যমে যে সামাজিক মর্যাদা তারা অর্জন করতে চেয়েছিলেন, তা অনেক ক্ষেত্রেই একধরনের মরীচিকা হিসেবে ধরা দিয়েছে। কারণ, আজও মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরে বংশীয় আভিজাত্যের সূক্ষ্ম দেয়ালগুলো পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। বরং আধুনিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় এই ‘পরিবর্তিত পরিচয়’ তাদের জন্য নতুন আইনি ও রাজনৈতিক বিপদ তৈরি করছে। নিজের প্রকৃত ইতিহাসকে অস্বীকার করার ফলে তারা আজ রাষ্ট্রের সামনে নিজেদের বৈধতা প্রমাণ করতে হিমশিম খাচ্ছে।

ভবিষ্যতের বাঙালি মুসলিম পরিচিতি নির্মাণের চ্যালেঞ্জ হলো এই বিস্মৃতির কুয়াশা সরিয়ে নিজের প্রকৃত নৃতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক শিকড়কে স্বীকার করা। ‘বাঙালি’ হওয়া এবং ‘মুসলিম’ হওয়ার মধ্যে যে কৃত্রিম দ্বন্দ্ব ঐতিহাসিকভাবে তৈরি করা হয়েছে, তা নিরসন করা প্রয়োজন। নামের শুরুতে ‘মোহাম্মদ’ থাকাটা ভক্তির বহিঃপ্রকাশ হতে পারে, কিন্তু তা যেন নিজের শিকড়কে অস্বীকার করার বা আড়াল করার হাতিয়ার না হয়। বাঙালি মুসলিম সমাজের মুক্তি নিহিত রয়েছে তাদের এই আত্মপরিচয়ের সংকটের একটি সুস্থ ও সাহসী সমাধানে, যেখানে তারা তাদের পূর্বপুরুষের ইতিহাসকে সগৌরবে স্বীকার করেই একটি আধুনিক ও সাম্যবাদী সমাজ অবিনির্মাণ করতে পারবে।

জাতীয়তাবাদ-উত্তর রাষ্ট্রকল্পে মুসলমানিত্বর বাঙালিত্ববাদের সঙ্গে বোঝাপড়া কোনো শেষ হয়ে যাওয়া অধ্যায় নয়, বরং এটি একটি চলমান ও ক্রমবর্ধমান প্রক্রিয়া। ১৯৭১ সালের বাঙালিত্ববাদের প্রকল্প সময়ের পরিক্রমায় অনেক চড়াই-উতরাই পার করেছে। বাংলাদেশের বর্তমান সমাজ ও রাজনীতিতে আমরা দেখতে পাই, মানুষ আর কোনো একটি পরিচয় দিয়ে সন্তুষ্ট নয়। সে একই সঙ্গে বাঙালি, সে একই সঙ্গে মুসলমান, আবার সে একই সঙ্গে বিশ্ব নাগরিক। অমর্ত‍্য সেন (২০০৬) এমন এক সমাজের কথা বলেন, যেখানে মানুষ তাদের বৈচিত্র্য বজায় রেখেও একে অপরের সঙ্গে সাংস্কৃতিকভাবে যুক্ত থাকবে এবং বৃহত্তর মানবিক পরিচয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবে।

বদরুদ্দীন উমরের শ্রেণিকাঠামো, আনিসুজ্জামানের সমন্বয়বাদ এবং সলিমুল্লাহ খানের বিনির্মাণ—এই তিন ধারা আমাদের সামনে তিনটি ভিন্ন পথ নির্দেশ করে। কিন্তু সত্যটি সম্ভবত এদের মাঝামাঝি কোনো স্থানে নিহিত। পরিচয় কোনো স্থির সত্তা নয়, বরং এটি একটি প্রবহমান নদী, যা পরিবেশ ও পরিস্থিতির সঙ্গে তার গতিপথ পরিবর্তন করে। বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজন এমন একটি রাষ্ট্রকল্প, যেখানে নাগরিকের ধর্মীয় চেতনা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় একে অপরের প্রতিপক্ষ হবে না। জাতীয়তাবাদের সংকীর্ণতা থেকে বেরিয়ে এসে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ার জন্য প্রয়োজন সেই ঐতিহাসিক ও দার্শনিক বোঝাপড়া, যা আমাদের শেখায় যে মুসলমানিত্ব ও বাঙালিত্ব একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং একই মানুষের হৃৎস্পন্দনের দুটি ভিন্ন ধ্বনি।

বাঙালি মুসলিম ও হিন্দু এবং জনগোষ্ঠীর জিনগত পরিচয় মূলত একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। বিজ্ঞানের আলোকে আমাদের রক্ত ও ডিএনএতে বিভাজনের কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশি মুসলিমরা তাদের প্রতিবেশী হিন্দুদের মতোই এই বদ্বীপের আদিম ও মিশ্র বংশধারার উত্তরাধিকারী।

বাংলাদেশের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাঙালি জাতীয়তাবাদ যেখানে জিনগত ঐক্যের বৈজ্ঞানিক সত্যের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ মূলত একটি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নির্মাণ, যা ভারতের থেকে স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে উভয় রাজনীতিরই উচিত জিনবিজ্ঞানের বর্তমান বিশ্লেষণকে গ্রহণ করে এই বদ্বীপের সব মানুষের, অর্থাৎ বাঙালি ও আদিবাসীর সমান অধিকার নিশ্চিত করা। ডিএনএ আমাদের পূর্বপুরুষের ইতিহাস জানায়, কিন্তু নাগরিক হিসেবে আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক মানসিকতার ওপর।

জাতীয়তাবাদের তাত্ত্বিক বিবর্তন এবং এর ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জসমূহ বিশ্লেষণ করলে তিনটি প্রধান পর্যায় পরিলক্ষিত হয়। জাতীয়তাবাদী পর্যায়ে মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘এক জাতি, এক ভাষা ও এক রাষ্ট্র’ গঠন, যা একটি ঐক্যবদ্ধ পরিচয় তৈরিতে সহায়তা করলেও এর বড় চ্যালেঞ্জ ছিল আদিবাসী ও ভিন্নমতের বর্জন (ইমরান ২০১৫)। এর পরবর্তী ধাপে ধর্মীয় পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়টি সামনে আসে, যেখানে ধর্মীয় পরিচয় প্রাধান্য পায় এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিলাভের চেষ্টা চলে। তবে এই পর্যায়ের প্রধান ঝুঁকি হলো ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতা এবং বৈশ্বিক আধুনিকতা থেকে বিচ্যুতি। বর্তমানে একটি উত্তর-জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে, যার মূল ভিত্তি হলো পরিচয়ের বহুত্ব এবং নাগরিক অধিকারের প্রাধান্য। এই আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উগ্রবাদ মোকাবিলা করা এবং সমাজের বহুত্ববাদ রক্ষা করে সব শ্রেণির সহাবস্থান নিশ্চিত করা।

এই বিশাল ঐতিহাসিক যাত্রায় বাঙালি মুসলমান বারবার প্রমাণ করেছে যে সে কোনো একটি ছাঁচে বন্দী হতে রাজি নয়। তার ভাষা ও ধর্মের এই দীর্ঘকালীন দর–কষাকষিই তাকে দক্ষিণ এশিয়ার এক অনন্য জনগোষ্ঠী হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে। আগামী দিনের বাংলাদেশ এই দুই পরিচয়ের এক নতুন সিনথেসিস বা সংশ্লেষের দিকে এগিয়ে যাবে, যেখানে মানুষ হবে তার রাষ্ট্রের আসল মালিক আর তার পরিচয় হবে তার কর্ম ও মানবিকতায়। বাংলাদেশের মানুষ মুসলিম হওয়ার জাতীয়তাবাদী তাড়নায় তাই ভুলে যেতে চায় পূর্বজদের নাম ও পরিচয়। জাতীয়তাবাদে ‘অতীতের অনুপস্থিতি’ মানে এই নয় যে অতীত নেই; বরং একটি জাতিকে মানসিকভাবে একতাবদ্ধ রাখার জন্য অতীতের নেতিবাচক বা বিভেদ সৃষ্টিকারী অংশগুলোকে সচেতনভাবে আড়ালে রাখা বা ভুলে যাওয়া। একটি জাতির বর্তমান পরিচয় তার ‘স্মৃতি’ ও ‘বিস্মৃতি’র ভারসাম্যেই গড়ে ওঠে। তবে বাংলাদেশের মুসলমানগণ মুসলিম হিসেবে নিজের পরিচয়ের তাড়নায় পূর্বজদের পরিচয়কেই অস্বীকার করে বসে আছে।

এই প্রবন্ধে এই বিশ্লেষণ হাজির করা হয়েছে যে বিজ্ঞানের কর্তৃত্ব যখন রাজনীতির স্বার্থে ব্যবহৃত হয়, তখন তা প্রায়ই বিভেদ সৃষ্টি করে। কিন্তু যখন তা সত্য উদ্‌ঘাটনে ব্যবহৃত হয়, তখন তা আমাদের অভিন্ন পরিচয়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বাঙালির ডিএনএ পরিচয় কোনো বিভাজনের রাজনীতির হাতিয়ার হওয়া উচিত নয়; বরং তা হওয়া উচিত আমাদের হাজার বছরের সংকর ও সহিষ্ণু ঐতিহ্যের স্মারক।

তথ্যসূত্র

অ্যান্ডারসন ২০০৬।। Benedict Anderson, Imagined Communities: Reflections on the Origin and Spread of Nationalism, Rev. ed., London: Verso।

আনসারি ১৯৬০।। Ghaus Ansari, Muslim Caste in Uttar Pradesh: A Study of Culture Contact, Lucknow: Ethnographic and Folk Culture Society।

আনাস ২০২৬।। Khwaja Anas (ed.), 'Dhaka Nawab Family and Shia Community', Scribd, প্রবেশ: ১৯শে এপ্রিল, ২০২৬, https://www.scribd.com/document/33613407/Shia-Community-the-Dhaka-Nawab-Family-Edited-by-Anas-Khwaja।

আনিসুজ্জামান ২০২২।। আনিসুজ্জামান, 'আনিসুজ্জামানের চিন্তাধারার বিষয়-আশয়', কালি ও কলম, ১৪ই মে, https://www.kaliokalam.com/%E0%A6%86%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%B8%E0%A7%81%E0%A6%9C%E0%A7%8D%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%9A%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%A7%E0%A6%BE/।

নুরুল ২০১৪।। A. B. M. Nurul Absar, 'Muslim Identity, Bengali Nationalism: An Analysis on Nationalism in Bangladesh', Academic Journal of Interdisciplinary Studies, 3, no. 1: 439।

রেজাউল ২০২৬।। Rezaul Amin, 'The Language Movement of 1952: A Struggle for Cultural Self-Determination', Medium, 17 February, https://medium.com/@rezaul.amin/the-language-movement-of-1952-a-struggle-for-cultural-self-determination-1213fc316326।

রীয়াজ ২০১২।। আলী রীয়াজ, বাংলাদেশে ধর্মীয় রাজনীতি: ইসলামীকরণের একটি বিশ্লেষণ, ঢাকা: প্রথমা প্রকাশন।

ইমতিয়াজ ১৯৬৬।। Imtiaz Ahmad, 'The Ashraf-Ajlaf Dichotomy in Muslim Social Structure in India', The Indian Economic & Social History Review, 3, no. 3: 268-278।

তৌসিফ ২০২৩।। Tausif Ahmad, 'Politics of Recognition and Caste among Muslims: A Study of Shekhra Biradari of Bihar, India', CASTE: A Global Journal on Social Exclusion, 4, no. 1 (April): 92–108, DOI: 10.26812/caste.v4i1.401।

রফিউদ্দিন ১৯৯৬।। Rafiuddin Ahmed, The Bengal Muslims, 1871–1906: A Quest for Identity, 2nd ed., Dhaka: University Press Limited।

মোসাররাপ ২০১৭।। Mosarrap H. Khan, 'The construction of Bengali Muslim identity in the late nineteenth and early twentieth century', Café Dissensus, July 15, https://cafedissensus.com/2017/07/15/the-construction-of-bengali-muslim-identity-in-the-late-nineteenth-and-early-twentieth-century/।

ইশতিয়াক ও অন্যান্য ২০২৪।। Ishtiaque Ahammad, Anisur Rahman, Zeshan Mahmud Chowdhury, et al., 'Gut Microbiome Composition Reveals the Distinctiveness between the Bengali People and the Indigenous Ethnicities in Bangladesh' [Preprint], ResearchGate, DOI: 10.13140/RG.2.2.36859.36647।

ইটন ১৯৯৩।। Richard M. Eaton, The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204–1760, Berkeley: University of California Press, pp. 343-344।

ইশতিয়াক ২০১৩।। ইশতিয়াক আহমেদ, Pakistan: The Garrison State; Origins, Evolution, Consequences (1947-2011), করাচি: অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস।

ইয়ামিন ২০২৩।। মোহাম্মদ ইয়ামিন, বাংলার মুসলিম সমাজ: বাঙাল ও ঘটি সংস্কৃতি, কলকাতা: বঙ্গ প্রকাশন।

সিরাজুল ২০২২।। Md. Sirajul Islam, 'Ethnic Identity & Social Stratification of Bengali Muslims', Journal of Historical and Social Research, pp. 87-98।

মাইনুল ২০২৫।। Md Mainul Islam, 'Bengali Muslim Intelligentsia: Socio-Political Ideologies and Trends in Early 20th Century Bengal', NBPA Journal for Arts, Humanities & Social Sciences, 1(2): 45-58, DOI:10.65842/nbpa.v1.i2.004।

ওয়েবার ১৯৭৮।। Max Weber, Economy and Society: An Outline of Interpretive Sociology, ed. Guenther Roth and Claus Wittich, Berkeley: University of California Press, pp. 921-926।

ওয়ালি ১৯০৪।। Maulvi Abdul Wali, 'On the Curious Superstitions, Beliefs and Practices of the Mussalmans of Bengal', Journal of the Anthropological Society of Bombay, 7, no. 7: 574-577।

কবির ১৯৮৭।। Muhammad Ghulam Kabir, The Minority Politics in Bangladesh, New Delhi: Vikas Publishing House।

কার্লসন ও অন্যান্য ২০১৩।। Elinor K. Karlsson, Jason B. Harris, Pardis C. Sabeti, et al., 'Natural Selection in a Bangladeshi Population from the Cholera-Endemic Ganges River Delta', Science Translational Medicine, 5 (192): 192ra86, https://doi.org/10.1126/scitranslmed.3006338।

রাজনি ১৯৯৫।। Rajni Kothari, Poverty: Human Consciousness and the Amnesia of Development, London: Zed Books।

খান ২০১৭।। F. Khan, Between Piety and Politics: Bengali Muslim Masculinities in Bangladesh, Shuddhashar, May 01, 2025।

গেলনার ১৯৮৩।। Ernest Gellner, Nations and Nationalism, Ithaca: Cornell University Press, pp. 1-10।

গুটালা ও অন্যান্য ২০০৬।। Ramana Gutala, Denise R. Carvalho-Silva, Li Jin, et al., 'A Shared Y-chromosomal Heritage between Muslims and Hindus in India', Human Genetics, 120, no. 4: 543–551, DOI: 10.1007/s00439-006-0234-x।

মুরশিদ ২০০৩।। গোলাম মুরশিদ, বাঙালির বাবু সংস্কৃতি, কলকাতা: সাহিত্য সংসদ।

সুপ্রিয় ২০১০।। Supriyo Chakraborty, 'Genetic Distance and Genetic Identity Between Hindu and Muslim Populations of Barak Valley for ABO and Rh Genes', Notulae Scientia Biologicae, 2 (3): 20–25, https://doi.org/10.15835/nsb234758।

জয়া ১৯৯৪।। Joya Chatterji, Bengal Divided: Hindu Communalism and Partition, 1932–1947, Cambridge: Cambridge University Press।

জয়া ২০০৭।। Joya Chatterji, The Spoils of Partition: Bengal and India, 1947–1967, Cambridge: Cambridge University Press।

তুলি ও অন্যান্য ২০২৫।। Samayeta Sarkar Tuli, et al., 'Trajectory of Human Migration: Insights from Autosomal and Non-Autosomal Variant Clustering Patterns', Journal of Advanced Biotechnology and Experimental Therapeutics, 8, no. 1: 139-149, doi:10.5455/jabet.2025.12।

আশিস ১৯৮৭।। Ashis Nandy, 'The Politics of Secularism and the Recovery of Religious Tolerance', Alternatives: Global, Local, Political, 11, no. 4: 451–475।

পাইন ২০১৯।। Arunsubhra Pain, 'The Great Divide: Tracing How the Bangal-Ghoti Divide Extends to Gastronomic Differences', CASS Studies, 3, no. 1 (March): Addendum 5।

পাসি ২০১৫।। Ansi Paasi, 'Border Studies', in International Encyclopedia of the Social & Behavioral Sciences, 2nd ed., Elsevier।

পেম্বারটন ও অন্যান্য ২০১৫।। Trevor J. Pemberton, Evgeny V. Belyaev, and Boris E. Volfovsky, 'High level of inbreeding in final phase of 1000 Genomes Project', Scientific Reports, 5, no. 1: 17453।

ফাহীম ২০১৩।। Faheem Hasan Shahed, ‘Revisiting Bangladeshi Nationalhood: Walking Along Global, Glocal and Local Pathway’, Journal of the Asiatic Society of Bangladesh  (Hum.), Dhaka: 58(2): 239-261 ।

বদরুদ্দীন ১৯৭০, ১৯৭২, ১৯৮৪।। বদরুদ্দীন উমর, পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি (১ম, ২য় ও ৩য় খণ্ড), ঢাকা: আনন্দ পাবলিশার্স।

বণিক বার্তা ২০২৫।। 'বাংলার কৃষকের সামাজিক মুক্তি ও এ কে ফজলুল হকের প্রাসঙ্গিকতা', বণিক বার্তা, ২৬শে এপ্রিল, https://bonikbarta.com/editorial/Zp1hI5T3USJ2PcRO।

বাংলাপিডিয়া ২০২৬।। 'Folk Culture', Banglapedia, প্রবেশ: ১৮ই এপ্রিল, ২০২৬, https://en.banglapedia.org/index.php/Folk_Culture।

ব্রামসন ১৯৮১।। Leon Bramson, Identity and Culture in the Immigrant Experience, New York: Academic Press।

মনিরুজ্জামান ২০১০।। মনিরুজ্জামান তালুকদার, বাংলাদেশে রাজনীতি: ১৯৭২-১৯৮১, ঢাকা: প্রথমা প্রকাশন।

মনসুর ১৯৩৫।। আবুল মনসুর আহমদ, আয়না, কলকাতা: ওরিয়েন্ট বুক কোম্পানি।

মুনতাসীর ২০১৭।। মুনতাসীর মামুন, ঢাকার নওয়াব পরিবার ও তৎকালীন ঢাকার সমাজ, ঢাকা: কথাপ্রকাশ।

মুরজানি ও অন্যান্য ২০১৩।। Priya Moorjani, Qasim Ayub, Carlo Delane, et al., 'Genetic Structure of the People of the Indian Subcontinent', American Journal of Human Genetics, 93, no. 5: 834-846।

মেটস্পালু ও অন্যান্য ২০১০।। Mait Metspalu, Eaaswarkhanth Muthukrishnan, Siiri Rootsi, et al., 'Traces of Sub-Saharan and Middle Eastern Lineages in Indian Muslim Populations', Journal of Human Genetics, 55, no. 3: 179–185।

মোমিন ১৯৭৮।। A. R. Momin, Muslims in India: A Sociological Perspective, New Delhi: Monohar Publication।

রবিনসন ১৯৭৪।। Francis Robinson, Separatism Among Indian Muslims: The Politics of the United Provinces' Muslims, 1860-1923, Cambridge: Cambridge University Press।

রেনান ১৯৯৬।। Ernest Renan, 'What is a Nation?' (lecture), in Becoming National: A Reader, ed. Geoff Eley and Ronald Grigor Suny, New York: Oxford University Press, pp. 41–55।

রেডিট ২০২৬।। 'Bengali DNA Secrets' [Documentary], r/kolkata - Reddit, প্রবেশ: ২৩শে মার্চ, ২০২৬, https://www.reddit.com/r/kolkata/comments/1kjze0s/bengali_dna_secrets_documentary/।

রেইখ ও অন্যান্য ২০০৯।। David Reich, Kumarasamy Thangaraj, Nick Patterson, et al., 'Reconstructing Indian Population History', Nature, 461, no. 7263: 489–494, প্রবেশ: ২৩শে মার্চ, ২০২৬, https://pmc.ncbi.nlm.nih.gov/articles/PMC2842210/।

অসিম ১৯৮৩।। Asim Roy, The Islamic Syncretistic Tradition in Bengal, Princeton: Princeton University Press।

এশা ২০১৬।। Esha Roy, 'Almost 80% of rural Muslims in West Bengal are borderline poor: Report', The Indian Express, February 15।

ভারুন ২০২২।। Varun Kumar Roy, 'The Babus and the Social Body in Conceptual Proposition in Early Colonial Bengal', Karatoya: NBU Journal of History, 13: 146-160।

লুডেন ২০০৪।। David Ludden, 'South Asia: The Invention of a Region', South Asian Journal, 1 (July): 1-15।

শ, চাহাল ও অ্যাটকিনসন ২০০৯।। Alison Shaw, Sarah E. H. S. Chahal, and Susan Atkinson, 'Genetics, Religion and Identity Among British Bangladeshis: Some Initial Findings', Ethnicity and Health, 14, no. 3: 315-328।

জওহার ২০১৯।। Jawhar Sircar, Class, caste and habitus: The rise of Bhadralok in 19th-century Bengal [e-book], Kolkata: The Satyashodhak।

সুমিত ২০২৪।। Sumit Sarkar, 'Class, caste and habitus: The rise of Bhadralok in 19th century Bengal', The Satyashodhak, September 9।

সার্টোরি ২০০৮।। Andrew Sartori, Bengal in Global Concept History: Culturalism in the Age of Capital, Chicago: University of Chicago Press।

সাইমন ২০২৫।। Allen David Simon, 'The Great Identity Tussle: Bangladeshi or Bengali Nationalism', Ramjas Political Review, May 7, https://www.ramjaspoliticalreview.com/post/the-great-identity-tussle-bangladeshi-or-bengali-nationalism।

সাজেন ২০২০।। Shamsuddoza Sajen, 'The Champion of the Bengali Muslim Peasantry', The Daily Star, October 25, https://www.thedailystar.net/slow-reads/focus/news/the-champion-the-bengali-muslim-peasantry-1984161।

সিন্দারপাল ২০০১।। Sinderpal Singh, 'Framing "South Asia": Whose Imagined Region?', প্রবেশ: ২০শে মার্চ, ২০২৬, https://www.rsis.edu.sg/wp-content/uploads/rsis-pubs/WP09.pdf।

সিরাজুল ২০১২।। সিরাজুল ইসলাম (সম্পাদিত), বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ, ২য় সং., ঢাকা: এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বাংলাদেশ।

সিরাজুল ২০১৫।। সিরাজুল ইসলাম, 'চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত', বাংলাপিডিয়া, ঢাকা: এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বাংলাদেশ, ১৭ই এপ্রিল (আপডেটেড ২০২১), banglapedia.org।

সিরাজুল ২০২১।। সিরাজুল ইসলাম (সম্পাদিত), 'বঙ্গভঙ্গ ১৯০৫', বাংলাপিডিয়া, ৩১শে জুলাই, https://bn.banglapedia.org/index.php?title=%E0%A6%AC%E0%A6%99%E0%A7%8D%E0%A6%97%E0%A6%AD%E0%A6%99%E0%A7%8D%E0%A6%97,_%E0%A7%A7%E0%A7%AF%E0%A7%A6%E0%A7%AB।

শিলা ১৯৮৬।। Shila Sen, Muslim Politics in Bengal, 1937–1947, New Delhi: Impex Publications।

অমর্ত্য ২০০৬।। Amartya Sen, Identity and Violence: The Illusion of Destiny, New York: W.W. Norton & Company, pp. 15-20।

রামিয়ানি ২০২২।। Ramyani Sengupta, 'Understanding "Babu Culture" through Kalighat Paintings', The Itihasology Journal, 1, no. 1।

সলিমুল্লাহ ২০২৪।। সলিমুল্লাহ খান, আ মরি আহমদ ছফা: বিষয় বাঙালি মুসলমানের মন, ঢাকা: মধুপোক।

হবসবাউম ও রেঞ্জার ১৯৮৩।। Eric Hobsbawm and Terence Ranger (eds.), The Invention of Tradition, Cambridge: Cambridge University Press, pp. 1–14।

সামিয়া ২০২১।। Samia Huq, 'Recasting Politics and Reimagining Islam: Beyond Contested Nationalisms in Bangladesh', Economic and Political Weekly, 56, no. 3 (January 16), https://www.epw.in/engage/article/recasting-politics-and-reimagining-islam-beyond।

হান্টার ১৮৭১।। W. W. Hunter, The Indian Musalmans: Are They Bound in Conscience to Rebel Against the Queen?, London: Trübner & Co।

হাশমি ২০০০।। Taj Hashmi, Women and Islam in Bangladesh: Beyond the Veil, Dhaka: University Press Limited।

হেক্টার ২০০০।। Michael Hechter, Containing Nationalism, Oxford: Oxford University Press, pp. 20-25।

হেলাল ২০২৬।। হেলাল উদ্দিন আহমেদ, 'বঙ্গভঙ্গ রদ', বাংলাপিডিয়া, প্রবেশ: ১৯শে এপ্রিল, ২০২৬, https://bn.banglapedia.org/index.php?title=%E0%A6%AC%E0%A6%99%E0%A7%8D%E0%A6%97%E0%A6%AD%E0%A6%99%E0%A7%8D%E0%A6%97_%E0%A6%B0%E0%A6%A6।

ইন্তেখাব ২০১৩।। M. Intekhab Hossain, 'Social stratification and Muslim society: Some empirical observations on West Bengal', Muslim Societies: A Social Science Journal, 6(1), https://www.muslimsocieties.org/vol-6-no-1_social_stratification_and_muslim_society/।ভূমিকা

শ্রেণিকক্ষে সাংস্কৃতিক ঐতিহ‍্য ও ইতিহাস নির্মাণের রাজনীতির আলাপে একটি বিষয় প্রায়ই জানতে চাই—কে কে তাঁর ‘দাদার–বাবার নাম জানেন’। এর জবাবে ৩০ থেকে ৪০ জনের ভেতরে ৫ থেকে ৭ জন জানেন বলে হাত উত্তোলন করেন। তার মানে সিংহভাগই জানেন না। এখানে কেন্দ্রীয় বিষয় হলে প্রশ্নকর্তা হিসেবে আমি নিজেসহ সিংহভাগই দাদার–বাবার নাম জানি না। এখন প্রশ্ন হলো, এই না জানাটা কি একটি সাধারণ বিস্মৃতি, নাকি রাজনৈতিক অ্যামনেসিয়া? যদিও ফরাসি দার্শনিক আর্নেস্ট রেনান তাঁর ১৮৮২ সালের ‘হোয়াট ইজ আ নেশন’ নামক বিখ্যাত বক্তৃতায় প্রথম এই রাজনৈতিক অ্যামনেসিয়া বা ভুলে যাওয়ার প্রকল্পের বীজ বপন করেন। তাঁর মতে, জাতি গঠনের জন্য অতীতকে নিখুঁতভাবে স্মরণ রাখার চেয়ে অতীতকে ভুলে যাওয়া বেশি জরুরি। বিশেষত, প্রাচীনকালের জাতিগত সংঘাত, যুদ্ধ, রক্তপাত ও বিভেদকে ভুলে গিয়েই একটি সমাজ ঐক্যবদ্ধ হয় (রেনান ১৮৮২: ৫১-৬০)। অর্থাৎ সংঘাতময় বাস্তব অতীতের ‘অনুপস্থিতি’ বা সেটিকে যৌথ স্মৃতি থেকে মুছে ফেলাই আধুনিক জাতীয়তাবাদের প্রধান শর্ত। এখন প্রশ্ন করা যেতে পারে যে পরিচয়ের উত্তরাধিকারকে ভুলে যাওয়া জরুরি কি না? অথবা জাতীয়তাবাদের হাত ধরে একমুখী পরিচয় নির্মাণও কতটা ভয়াবহ হতে পারে? এ ব‍্যাপারে অমর্ত‍্য সেন আইডেন্টিটি অ্যান্ড ভায়োলেন্স: দ্য ইলিউশন অব ডেসটিনি (২০০৬) বইয়ে ‘সলিটারিস্ট আইডেন্টিটি’ বা ‘একমুখী পরিচয়ের’ ধারণাকে কঠোরভাবে সমালোচনা করেছেন। তিনি মনে করেন, ‘কোনো মানুষকে যদি বলা হয় সে কেবল “মুসলমান” বা কেবল “হিন্দু”, তবে তার অন্যান্য মানবিক পরিচয় আড়াল হয়ে যায়। আমাদের পরিচয় স্থির কোনো বস্তু নয়; বরং এটি নির্বাচনের বিষয়। একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে বাঙালি, ভারতীয়, একজন অভিভাবক, একজন পেশাজীবী এবং একজন বিশ্বনাগরিক হতে পারেন। যখন রাজনৈতিক বা সামাজিক শক্তি মানুষকে কেবল একটি পরিচয়ে আটকে দেয়, তখন সেটি “আমরা” বনাম “তারা” বিভাজন তৈরি করে, যা শেষ পর্যন্ত সহিংসতার জন্ম দেয়’ (অমর্ত্য ২০০৬: ১৫-২০)।

তবে বাংলাদেশের বর্তমান বাংলাদেশপন্থী মানুষের পরিচয়কে একরৈখিক মুসলমানিকরণের প্রকল্পে একটি ধর্মনির্ভর জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে বোঝাপড়া করতে হচ্ছে। এ বিষয়টা বোঝা যেতে পারে ইতিহাসবিদ এরিক হবসবাউমের কাজের ভেতর থেকে। যেখানে তিনি দেখিয়েছেন, ‘যখন আধুনিক রাষ্ট্রগুলো দ্রুত আধুনিকায়ন বা শিল্পায়নের মধ্য দিয়ে যায়, তখন মানুষের পুরোনো জীবনযাত্রার সঙ্গে তাদের একটি বিশাল দূরত্ব তৈরি হয়। সেখানে প্রকৃত অতীতের একটি “অনুপস্থিতি” বা শূন্যতা দেখা দেয়। এই শূন্যতা পূরণের জন্য রাজনৈতিক শাসকগোষ্ঠী বা এলিটরা সম্পূর্ণ নতুন কিছু প্রথা তৈরি করে এবং সেগুলোকে “প্রাচীন” বা “সনাতন” বলে দাবি করে’ (হবসবাউম ১৯৮৩: ১-১৪)। হবসবাউম একে বলেছেন ইনভেনশন অব ট্র্যাডিশন। যখন প্রকৃত অতীত অনুপস্থিত থাকে, তখন জাতীয়তাবাদের স্বার্থে নতুন করে একটি ‘গৌরবময় অতীত’ উদ্ভাবন করা হয়। বাংলাদেশে বৈশাখ উদ্‌যাপন রাস্ট্রীয়ভাবে করাকে এই উদ্ভাবন হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে জাতীয়তাবাদের এ ধরনের যাত্রায় নিজের উত্তরাধিকারের পরিচয়কে ভুলে যাওয়ার প্রকল্পের উদাহরণ অন‍্যত্র খুব একটা পাওয়া যাবে কি না, তা আরেক খুঁজে দেখার বিষয়। জীবন্ত ঐতিহ‍্যের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখতে হলে উত্তরাধিকার হতে হয়। এই ভুলে যাওয়ার রাজনীতি অতীত ঐতিহ্যের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে। বিচ্ছিন্নতা নির্মাণ করে নিজের পূর্বজদের ইসলাম গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত যে পরিচয় ছিল, তার সঙ্গে। এ বিচ্ছিন্নতা জমিন ও সংস্কৃতির সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা স্থাপন করে। এর পাশাপাশি ইতিহাসকে এমনভাবে লেখা ও পড়ানো হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে, যা এ অঞ্চলের মানুষকে, বিশেষ করে ইসলাম ধর্মের বিভিন্ন তরিকার মানুষকে বিচ্ছিন্ন করছে সামগ্রিক সাংস্কৃতিক আচরণ ও তার পরম্পরা থেকে। আমি আমার অপর একটি বই ‘বাঙালিত্ববাদ’–এ (ইমরান ২০১৫) বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ আলাপের সূত্রপাত করেছি। এখানে সংস্কৃতির একটি সমগ্র নির্মাণ করে তার ওপর জাতীয়তার পরিচয়কে স্থাপন করা হয়েছে।

আর্নেস্ট গেলনারের মতে, ‘জাতীয়তাবাদ কোনো সুপ্ত বা প্রাচীন জাতিকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলে না; বরং যেখানে জাতির কোনো অস্তিত্বই ছিল না, সেখানে জাতীয়তাবাদ নতুন করে জাতির জন্ম দেয়। কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে শিল্পভিত্তিক সমাজে উত্তরণের সময় পুরোনো সমাজকাঠামো ভেঙে যায় এবং রাষ্ট্রের টিকে থাকার জন্য এক নতুন সমজাতীয় সংস্কৃতির দরকার হয়। অতীতের এই প্রকৃত সংযোগের অনুপস্থিতিই আধুনিক জাতীয়তাবাদী চেতনার জন্ম দেয়’(গেলনার ১৯৮৩: ১-১৪)।

‘অতীতের অনুপস্থিতি’ তত্ত্ব আমাদের শেখায় যে জাতীয়তাবাদ কোনো প্রাচীন বা শাশ্বত প্রাকৃতিক বিষয় নয়। এটি একটি আধুনিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নির্মাণ। যখন একটি সমাজের নিজস্ব ঐতিহাসিক শিকড় দুর্বল হয়ে পড়ে বা আধুনিকতার প্রভাবে মুছে যায়, তখন সেই অনুপস্থিত অতীতকেই রোমান্টিসাইজ করে অথবা নতুন কল্পনার রঙে সাজিয়ে জাতীয়তাবাদের ভিত শক্ত করা হয়। রাজনৈতিক ও সামাজিক ঐক্যের প্রয়োজনে একটি সমাজ তার অতীতকে কতটা মনে রেখেছে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সে তার অতীতকে কতটা ভুলেছে বা নতুন করে সাজিয়েছে।

একবিংশ শতাব্দীর ভূরাজনীতি এবং সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের সংকটে ‘জাতীয়তাবাদ–উত্তর রাষ্ট্রকল্প’ বা পোস্টন্যাশনালিস্ট স্টেট ইমাজিনারি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক কাঠামো হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার পরিপ্রেক্ষিতে, যেখানে ধর্মীয় এবং নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের সংঘাত ঐতিহাসিককাল থেকেই বিদ্যমান, সেখানে ‘মুসলমানিত্ব’ এবং ‘বাঙালিত্ববাদের’ পারস্পরিক বোঝাপড়া বা দর–কষাকষি একটি জটিল সমীকরণ তৈরি করেছে। জাতীয়তাবাদের প্রথাগত ধারণাগুলো যখন আধুনিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে সংকীর্ণ হয়ে পড়ে, তখন সমাজ ও রাজনীতির গভীরে পরিচয়তত্ত্বের এক নতুন পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয় (সিন্দারপাল ২০০১)।

মূলত ঐতিহাসিক জাতীয়তাবাদী হেজিমনিক প্রকল্পসমূহ জুতসই তাত্ত্বিক কাঠামোর ওপর না দাঁড়ানোর কারণে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানও খারিজি প্রকল্পের ভেতর ঢুকে পড়েছে। নিজের হেজিমনিক প্রকল্পে নিজেই হেজিমনাইজড হয়ে পড়েছে। এই অভ্যুত্থান কি কোনো তাত্ত্বিক কাঠামো নিয়ে হাজির হয়েছে? না হয়নি। তবে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিষ্ঠিত একদলীয় একরৈখিক বয়ানকে এবড়োথেবড়োভাবে খারিজ করছে। উদাহরণ হিসেবে ৭ মার্চের ঐতিহাসিক বঙ্গবন্ধুর ভাষণ খারিজ করার চেষ্টা থেকে আমরা এটা বুঝতে পারি। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানকে তার নিজের অর্গানাইজড কোনো বয়ান নিয়ে হাজির হতে দেখি না। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিস্তৃত পরিসরে সব এজেন্সির উপস্থিতি নিশ্চিত করার ভেতর থেকে অতীতের পুনঃবিবরণ নির্মাণ ব্যতিরেকে এ ধরনের মুড়মুড়ে রাজনীতি করা হয়েছে ১৯৭৫–উত্তর বাংলাদেশে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে ভূখণ্ডকেন্দ্রিক বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, যা বর্তমানে বাংলাদেশপন্থা হিসেবে হাজির হয়েছে, তা একধরনের ব্যাখ্যাহীন জাতীয়তাবাদ। সেখানে ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’–এর (অর্থাৎ বর্ষবরণ যাত্রায় সাংস্কৃতিক মোটিফের ক্ষেত্রে প‍্যাঁচাকে বাদ দিয়ে মুরগ উদ্‌যাপন করা হয়েছে) মতো তত্ত্বায়নের চেষ্টা করলেন অনেকে, যা আজও কোনো একটি একক চেহারায় হাজির হয়নি।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থান বেশ কিছু প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছিল। অনেকে বলেছিল, এটা একটা নতুন বাংলাদেশ বা আবারও স্বাধীনতা অর্জন বা চেতনা-রাজনীতিমুক্ত দেশ বা জাতীয়তাবাদী রাজনীতিমুক্ত বাংলাদেশ বা সবার অংশগ্রহণমূলক বাংলাদেশ; অর্থাৎ সব মত-পথের অংশগ্রহণের বাংলাদেশ। তাহলে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়, যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারণাকল্পের অধীনে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ সাল অব্দি, তা বাংলাদেশের সব অংশীজনের সংস্কৃতিকে একাঙ্গীকরণে ব্যর্থ হয়েছে। এ জনযুদ্ধ আগের রাজনৈতিক প্রকল্পকে অস্বীকার করেছে রাজনৈতিকভাবে একাঙ্গীকরণের ব্যর্থতার কারণে। যদিও অমর্ত‍্য সেন  দ্বি–জাতিতত্ত্বের অধীনে দেশভাগের বিভাজনকে সমালোচনা করে বলেন, ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের সম্পত্তি নয়; বরং এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ধারণা। তিনি  মধ্যযুগের সুফি ও বৈষ্ণব পদাবলি থেকে শুরু করে লালন শাহর গানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এই সমন্বয়ী চেতনাকে বাঙালির আসল শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেন। তবে সেন  মুসলিম বা হিন্দুদের নিজেদের ভেতরকার বিভাজনকে বুঝতে চেষ্টা করেননি (অমর্ত্য ২০০৬)।

মুসলিমদের ভেতরে এ প্রবণতাগুলো স্পষ্ট হতে শুরু করে ফরায়েজি আন্দোলনের ভেতর থেকে। সাতচল্লিশ–উত্তর পূর্ব বাংলায় এসব বিভাজনরেখা আরও স্থূল হতে থাকে। এর পরণতি বলা যেতে পারে আজকের বাংলাদেশ পন্থা; অর্থাৎ ধর্মনির্ভর মুসলিম জাতীয়তাবাদ এবং ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদ মোটাদাগে একে অপরকে খারিজ করে দাঁড়াতে চেষ্টা করেছে। এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি কি অপরাপর জাতিসত্তাকে নিয়ে ভেবেছে? একদমই ভাবেনি। এই প্রবণতা আমরা পশ্চিমাদের কাছ থেকেই আত্মস্থ করেছি। সতেরো শতকের মধ্যভাগে (১৬৪৮) ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তির ভেতর থেকে পৃথিবীতে যেসব ধর্মনির্ভর জাতি-রাষ্ট্র গঠিত হয়, তার প্রধানতম বিষয় ছিল পরমতসহিষ্ণুতা। তবে এই ‘সহিষ্ণুতা’র ঘটনাটি সক্রিয় হয় ক্রিশিয়ানিটির ভেতরের বিবদমান মত ও পথের মানুষের ভেতরের সহিষ্ণুতার প্রশ্নে। এ কারণে এই উদ্যোগ আজ পর্যন্ত সমাদৃত। তবে আমরা একটু বাড়তি মনোযোগী হলে দেখতে পাব, চুক্তিটি ক্রিশিয়ানিটির বাইরে যে ইসলাম, জায়নবাদসহ অপরাপর ধর্মীয় গোষ্ঠী, তাদের প্রতি সহিষ্ণুতা নিয়ে কোনো সুস্পষ্ট মতামত হাজির করেনি। এটি সম্পূর্ণরূপে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মমতের ভিত্তিতে জাতি-রাষ্ট্র নির্মাণ করাকেই উৎসাহিত করেছে। এমনকি জাতীয় চরিত্র নির্মাণে সংখ্যালঘিষ্ঠসহ যারা তাদের ভেতরে একেবারে অপ্রধান, সেই অপরাপর ধর্মীয় ও জাতিগত অংশীজনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেনি।

মোটামুটি ম্যাক্স ওয়েবার (১৯৭৮), ডব্লিউ কননোর (১৯৯৪), এম হেক্টর (২০০০) প্রমুখ প্রখ্যাত চিন্তাবিদও মনে করেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর মতামতের ভিত্তিতেই রাষ্ট্রের জাতীয়তাবাদী সংস্কৃতি গঠিত হবে। ভারতবর্ষের রাজনীতিও প্রশিক্ষিত হয়েছিল এই জ্ঞানতাত্ত্বিক পাটাতনের ওপর। এখানেও একইভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠের রাজনীতির মনস্তত্ত্ব প্রভাবশালী হয়ে পড়ে। মুসলিম লীগ ১৯৪৭-পূর্ব সময়ে দুবার নির্বাচনে বিজয় লাভ করলেও তার ভোটারদের বুঝতে ভুল করেছিল। ভোটের প্রকৃত এলাকার ভিত্তিতে ভোটারের ধর্মীয় ও জাতিগত ভিন্নতাকে বোঝার ব্যর্থতাস্বরূপ তারা নিজেকে কেবল মুসলিম হিসেবেই বিবেচনা করেছিল। দলটি দলিতদের অধিকারের লড়াই থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়। ভারতবর্ষ ভাগ হয় ধর্মনির্ভর দ্বি–জাতিতত্ত্বের ভিত্ত্বিতে। ’৪৭-পরবর্তী রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক ভাবনা ধর্মকে সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে। এই বিচ্ছিন্নতার প্রয়োগ ঘটে মূলত খারিজি অর্থে। ধর্মের ক্ষেত্রে আবার আশরাফ, আতরাফ ও আজলাফের ভিন্নতার সংস্কৃতি সমাজে প্রকট হতে থাকে, যখন পাকিস্তানের পূর্ব অংশে ধর্মনির্ভর জাতীয়তাবাদ দুর্বল হয়ে পড়ে।

বাঙালি মুসলিম সমাজের আত্মপরিচয় নির্মাণের ইতিহাস এক জটিল ও বহুমুখী প্রক্রিয়া, যা ধর্মীয় আদর্শ, ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামো এবং স্থানীয় আর্থসামাজিক স্তরবিন্যাসের টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে। এই বিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে ‘আশরাফ’ ও ‘আতরাফ’ বা ‘আজলাফ’ নামক দুটি বিপরীতমুখী সামাজিক মেরুকরণ। এই বিভাজন কেবল শ্রেণিগত নয়, বরং এটি একটি নৃ–বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বয়ানও বটে (মোসারাপ ২০১৭)। বাঙালি আতরাফ বা নিম্নবর্গের মুসলিমদের মধ্যে নিজেদের প্রকৃত বংশীয় ইতিহাস বা ‘দাদার বাবার নাম’ ভুলে যাওয়ার যে প্রবণতা লক্ষ করা যায়, তা কোনো আকস্মিক স্মৃতিভ্রংশ নয়; বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত এবং সচেতন ‘বিস্মৃতির রাজনীতি’ (মাইনুল ২০২৫)। এই বিস্মৃতির সমান্তরালে নামের শুরুতে ‘মোহাম্মদ’ বা তার সংক্ষিপ্ত রূপ ‘মো.’ ব্যবহারের যে ব্যাপক প্রচলন ঘটেছে, তা একটি বৈশ্বিক ও একীভূত মুসলিম পরিচিতি লাভের আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিফলিত করে। এটি একই সঙ্গে স্থানীয় বর্ণগত বা পেশাগত পরিচয়কে আড়াল করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

অপর দিকে উনিশ শতকের বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো ‘বাবু সংস্কৃতি’। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রত্যক্ষ প্রভাবে কলকাতাকেন্দ্রিক যে শিক্ষিত মধ্যবিত্তশ্রেণির উদ্ভব ঘটেছিল, তাদের জীবনধারা, মূল্যবোধ এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিই মূলত এই সংস্কৃতির ভিত্তি (রামিয়ানি ২০২২; ভারুন ২০২২; সার্টোরি ২০০৮; টেন্ডফোলাইন ২০২১) । তবে এই বাবু সংস্কৃতি কেবল হিন্দু ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি বাংলার মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরীণ শ্রেণিবিভাগ এবং পরবর্তীকালে ‘ঘটি’ ও ‘বাঙাল’ বিভাজনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিন্যাসেও গভীর প্রভাব ফেলেছিল (হাশমি ২০০০)। বাংলার মুসলিম সমাজের একটি বড় অংশ যখন ঔপনিবেশিক আধুনিকতাকে গ্রহণ করতে শুরু করে, তখন তাদের মধ্যেও একটি ‘ভদ্রলোক’ বা ‘বাবু’সুলভ আচরণের বিকাশ ঘটে, যা মূলত পশ্চিম বাংলার (ঘটি) এবং পূর্ব বাংলার (বাঙাল) মুসলিমদের মধ্যে সামাজিক ও রাজনৈতিক দূরত্বের সৃষ্টি করে (জয়া ১৯৯৪)।

পশ্চিমা এনলাইনটেনমেন্টের সময় সেক্যুলারিজম ও লিবারালিজম ধারণায় ধর্মকে প্রাইভেট বিষয়ে পরিণত করে এবং তা পরিগণিত হয় একটি সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি হিসেবে। বিষয়টি ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ বুঝতে ব্যর্থ হয়। এই ফাঁকার ভেতর থেকে পাকিস্তানের পূর্ব পাশে ভাষানির্ভর সংস্কৃতি প্রধান হয়ে ওঠে। সাবজেকটিভলি যা সংহতি, আত্মসচেতনতা ও আনুগত্যের মতো বিষয়সমূহকে তাড়িত করে একটি সংঘবদ্ধতা নির্মাণকল্পে। এই ভাষানির্ভর জাতীয়তাবাদী প্রকল্পের সংস্কৃতি থেকে ধর্মকে অনুল্লেখ্য করে তোলে, ’৭১-পরবর্তী বাংলাদেশে যা ‘খারিজীকরণের’ প্রক্রিয়ার ভেতরে যুক্ত হয়। এসব পাল্টাপাল্টি খারিজীকরণের চূড়ান্তরূপ হিসেবে ২০১৩ সালে দেশ বিভাজিত হয়ে পড়ে ‘শাহবাগ’ ও ‘শাপলাচত্বর’-এ। বলা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ্যুত্থান একীভূত করে এই দুই চত্বরকে। এ কথা বলাই যেতে পারে যে নিপীড়িত মানুষমাত্রই নিপীড়িত হওয়ার ভেতর থেকে ঐক্য বোধ করে। এর পাশাপাশি একটি কেন্দ্রীয় প্রশ্নের উদয় হয়, নিপীড়িত মানুষমাত্রই কি সাংস্কৃতিক বোধের জায়গা থেকে একীভূত বোধ করবে? একীভূত হওয়ার ক্ষেত্রে একই শত্রুকে পাল্টা–আক্রমণ করাটা প্রধান হয়ে গিয়েছিল আন্দোলনের সময়ে। আন্দোলন এবং আন্দোলনোত্তরকালে এ দেশের ধর্মীয়, জাতিগতসহ নানামাত্রিক মতাদর্শের অস্তিত্বকে জেগে উঠতে দেখতে পাই, যা আজও প্রবলভাবে সক্রিয়। এসব সক্রিয় সত্তার অংশগ্রহণের ভিত্তিতে একটি আগামীর বাংলাদেশ গড়ে ওঠা জরুরি। যে কারণে বাংলা অঞ্চলের সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া আবশ্যক।

সাংস্কৃতিক বোঝাপড়ার পাশাপাশি ২০১৯ সাল থেকে ডিএনএর জিনতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ভেতর থেকে বাংলা অঞ্চলের তথাকথিত বাঙালি হয়ে ওঠার সংখ‍্যাগরিষ্ঠের এই ভূখণ্ডের অপরাপর জাতিসত্তার মানুষদের থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে দেখানোর কৌশলকে একটি বড় ধাক্কা দিয়েছে। বঙ্গীয় বদ্বীপের জনতাত্ত্বিক ইতিহাস ও জেনেটিক গঠন বিশ্বের অন্যতম জটিল ও কৌতূহলোদ্দীপক। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর বিধৌত এই উর্বর ভূখণ্ড হাজার বছর ধরে বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর মিলনস্থলে পরিণত হয়েছে (শ এবং অন‍্যান‍্য ২০০৯)। এই অঞ্চলের মানুষের জেনেটিক পরিচয় কেবল তাদের আদিম অভিবাসন প্রক্রিয়ারই প্রতিচ্ছবি নয়, বরং তা আধুনিক বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণেও একটি শক্তিশালী উপাদান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বাংলাদেশি মুসলিম ও হিন্দু বাঙালিদের মধ্যে বিদ্যমান জেনেটিক সাযুজ্য বা বৈসাদৃশ্য এবং এই বৈজ্ঞানিক তথ্যের সঙ্গে রাজনৈতিক আদর্শের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে অত্যন্ত জরুরি (হেলাল ২০২৬)।

আরেকটি প্রশ্ন উত্থাপন করা যেতে পারে, রাষ্ট্রের জন্য জাতীয়তাবাদ জরুরি কি না বা নেশনের ধারণা জাতীয়তাবাদকালের বাইরে কোনো গুরুত্ব বহন করে কি না? রাষ্ট্রের সংস্কৃতির বহুমাত্রিকতাকে গ্রহণ করে একটি জাতীয় ধারণা জরুরি কি না, তা–ও ভাবা প্রয়োজন। অমর্ত্য সেন বহুসংস্কৃতিবাদের প্রকৃত ধারণার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি তথাকথিত ‘বহু-একক সংস্কৃতিবাদ’-এর (Plural monoculturalism) কড়া সমালোচনা করেন, যেখানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ একই দেশে বাস করলেও একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকে এবং নিজেদের গণ্ডির বাইরে মেলামেশা করে না। তিনি এমন এক সমাজের কথা বলেন, যেখানে মানুষ তাদের বৈচিত্র্য বজায় রেখেও একে অপরের সঙ্গে সাংস্কৃতিকভাবে যুক্ত থাকবে এবং বৃহত্তর মানবিক পরিচয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবে (অমর্ত্য ২০০৬)। তবে বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসনের  মড্যুলার-এর ধারণা খানিকটা বিপজ্জনক একরৈখিকতাকে উসকে দেয়, যা আমরা বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং মুসলিম জাতীয়তাবাদের ক্ষেত্রে দেখতে পাই (অ্যান্ডারসন ২০০৬: ৬-৭)। তাঁর মতে, ‘জাতি হলো একটি “কল্পিত সম্প্রদায়”। ছাপাখানা ও পুঁজিবাদের বিকাশের ফলে ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের মানুষ একই সংবাদপত্র বা সাহিত্য পড়তে শুরু করে। এর ফলে তারা নিজেদের মধ্যে এমন এক ঐক্যের কল্পনা করে, যা অতীতে বাস্তবে কখনোই ছিল না। প্রকৃত ঐতিহাসিক যোগসূত্রের এই অনুপস্থিতিই মানুষের কল্পনাশক্তিকে উসকে দেয় এবং একটি অভিন্ন জাতীয় পরিচয় তৈরি করতে সাহায্য করে’ (অ‍্যান্ডারসন ২০০৬: ৩৭-৪৬)। শেষ পর্যন্ত জাতীয়তাবাদ মূলত একরৈখিকতা নির্মাণ করে, যার চূড়ান্ত ফলাফল হিসেবে তা আমাদের একটি কানাগলিতে নিয়ে দাঁড় করায়। এই একাঙ্গীকরণে সব অংশীজনের অংশগ্রহণ সমান হবে কীভাবে, তার সুলুক-সন্ধান আবশ্যক। তার কারণ হলো, অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে দাতা-গ্রহীতার সম্পর্ক প্রবল হয়ে উঠলে সেই অংশগ্রহণও অন্যায্য হয়ে পড়বে।

বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের রাজনীতির বিশ্লেষণ এবং এর সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক প্রভাবগুলোর ঐতিহাসিক বিবর্তন, বুদ্ধিবৃত্তিক সংঘাত, সাংবিধানিক সংকট এবং উত্তর-জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রকল্পে এর ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতির পর্যালোচনামূলক বিশ্লেষণই বর্তমান প্রবন্ধের কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয়।

হাইফেনেটেড পরিচয়ের বহুমাত্রিকতা: তারুণ্যের জাতীয়-পরিচয়বাদী ভাবনা

বাংলাদেশের বহুমাত্রিক জাতীয়তাবাদী পরিপ্রেক্ষিতে কীভাবে প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাস বিভাগের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজেদের পরিচয় নির্ধারণ করেন, তা নিয়ে ২০১৪ থেকে ২০১৫ সালের সময়ে একটি শ্রেণিকক্ষভিত্তিক বোঝাপড়ার আলাপ পরিচালনা করি। এই আলাপে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তাঁদের জাতীয়তা সম্পর্কে ধারণা জানার জন্য সাধারণ ও অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতিতে আলাপ জুড়ে দিই। নৃবিজ্ঞান এবং প্রত্নতত্ত্ববিষয়ক ক্লাসে আলোচনা চলাকালে তাঁদেরকে বলা হয়েছিল, এক পৃষ্ঠার মধ্যে নিজের জাতীয়তা কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন, তা লিখতে।

আমাদের শ্রেণিকক্ষে স্বভাবতই শিক্ষার্থীদের ভেতর আদিবাসীদের সংখ‍্যা থাকে এক বা দুজন। তবে তাঁদের উত্তরগুলো ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আলাদা, যা বাংলাদেশের সংবিধানের চেতনার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। উদাহরণস্বরূপ, সোহান গাজি তাঁর উত্তর দেন:

‘আমি একজন মানুষ। জন্মসূত্রে মুসলিম, জৈবিকভাবে পুরুষ। পারিবারিক বংশাণুক্রমে গাজি। ভাষা, সংস্কৃতি ও রীতিতে বাঙালি এবং নাগরিকত্বের দিক থেকে বাংলাদেশি।’

অন্য শিক্ষার্থীরা তাঁদের উত্তরগুলোতে বিভিন্ন মাত্রা যোগ করেন। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। রথী তালুকদার—যিনি নারী এবং বাঙালি হিন্দু হিসেবে নিজেকে চিহ্নিত করেন। একইভাবে, রিপন হাওলাদার—বাঙালি মুসলিম; মোরশেদ মোয়েন—মুসলিম বাঙালি; পিংকি রহমান—বাঙালি মুসলিম; দুলাল সমদ্দার—হিন্দু বাঙালি এবং বুলবুল ভূঁইয়া—বাংলাদেশি বাঙালি। অন্যদিকে আদিবাসী অংশগ্রহণকারীদের উত্তর ছিল এক শব্দে সীমাবদ্ধ এবং সরল। যেমন ‘চাকমা’, ‘মারমা’, ‘মুরং’।

এই উত্তরগুলো বহুমাত্রিক সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে তুলে ধরে। বেশির ভাগ বাঙালি শিক্ষার্থী তাঁদের পরিচয় বর্ণনার সময় জাতীয়তা এবং ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সংমিশ্রণ ব্যবহার করেন। যেমন বাঙালি মুসলিম বা বাঙালি হিন্দু। কিন্তু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উত্তরগুলো তাদের নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করেই সীমাবদ্ধ থাকে, যেখানে নাগরিকত্ব বা ধর্ম তাদের জাতীয়তার অংশ হয় না।

এই বৈচিত্র্যময় উত্তরগুলো আমাদের দেখায় যে জাতীয়তার ধারণাটি এখনো অনেকের কাছে অস্পষ্ট। এটি কিছুটা উনিশ শতকের বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কল্পিত চরিত্র কামলাকান্তের মতো, যার দ্বিধাগ্রস্ত পরিচয়ের দিকটি আহমদ ছফা তাঁর ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ বইয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। ছফা দেখিয়েছেন, কীভাবে বাঙালি মুসলমান পরিচয়টি পুঁথিসাহিত্যে আরব সংস্কৃতির আদলে তৈরি হলেও এর অন্তর্নিহিত চেতনা ও কার্যক্রম মূলত বাঙালি পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি এবং হিন্দু দেব-দেবী দ্বারা প্রভাবিত। এসব পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয়তার ধারণাটি আজও বহুমুখী এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে একক সংজ্ঞায় সীমাবদ্ধ নয়।

ফাহীমের ভাষ্যে আহমেদ ছফার (২০১৩) বিশ্লেষণকে নিম্নরূপে ব্যাখ্যা করা হয়েছে:

প্রথমত, পুঁথির লেখকদের মূল উদ্দেশ্য ছিলো বাংলায় ইসলামের মহানুভবতা তুলে ধরা। তারা মুসলিম নায়কদের অবিশ্বাস্যভাবে বীরত্বপূর্ণ কাজের মাধ্যমে এটি প্রদর্শন করতে চেয়েছিলেন। তারা মনে করতেন, এটি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে বেশি আবেদন সৃষ্টি করবে। দ্বিতীয়ত, এই পুঁথিগুলো যে সময়ে লেখা হয়েছিলো, তখন বাঙালি মুসলমানদের মানসিক ও সামাজিক দ্বন্দ্ব চলছিলো। এটি এমন একটি সময় ছিলো, যখন মুসলমানদের নতুন সামাজিক শ্রেণি এবং নিম্নবিত্ত শ্রেণির মধ্যে মূল্যবোধ এবং দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাত দেখা যাচ্ছিল। ফলে এই নিম্নবিত্ত শ্রেণি পুঁথির নায়কদের মাধ্যমে তাদের আকাঙ্ক্ষাগুলোকে বাস্তবায়িত করে একধরনের মানসিক স্বস্তি খুঁজে পেত। তৃতীয়ত, পুঁথির লেখকরা ইসলামী সভ্যতার উৎপত্তি এবং আরবি-ফারসি ভাষার সম্পর্কে অনভিজ্ঞ ছিলেন। ইতিহাস এবং ভৌগোলিক সীমানার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা আধ্যাত্মিক ও সামাজিক উন্নয়নের ধারণা না থাকায় তারা এমন অপরিণত মিশ্র আখ্যান তৈরি করেছিলেন। চতুর্থত, এই লেখকরা অনেকেই নিম্নবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায় থেকে মুসলমান হয়েছিলেন। একসময় ব্রাহ্মণদের দ্বারা নিপীড়িত এই মানুষরা পরবর্তীতে মুসলিম নায়কদের মাধ্যমে ব্রাহ্মণদের পরাজয় দেখিয়ে এক ধরনের মানসিক প্রতিশোধ নিয়েছিলেন (ফাহীম ২০১৩: ২৪৯) ।

আরেকটি ধারণা হলো আত্মসচেতনতা। সাক্ষাৎকার চলাকালে লক্ষ করা গেছে যে অংশগ্রহণকারীরা বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদের দ্বৈত রাজনৈতিক ধারা সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন। এটি তাঁদের কাছে স্পষ্ট যে জাতীয় পরিচয় প্রায়ই রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে জড়িত। উদাহরণস্বরূপ, যাঁরা নিজেদের ‘বাঙালি’ বলে পরিচয় দেন, তাঁরা সাধারণত আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে বিবেচিত হন আর ‘বাংলাদেশি’ পরিচয় বিএনপির প্রতি আনুগত্যের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়।

বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদের তিনটি ধারা রয়েছে: ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক জাতীয়তাবাদ, ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ এবং ভৌগোলিক সীমানাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ। ফরহাদ মজহার বাঙালি বনাম বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে একটি প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখেছেন। তাঁর মতে, ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ গড়ে উঠেছিলো বাঙালি জাতীয়তাবাদের আক্রমণাত্মক প্রচারণার প্রতিক্রিয়া হিসেবে, তবে এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারেনি’ (মজহার ২০০৮: ৫৭)।

সম্প্রতি শাহবাগ আন্দোলনের প্রতিক্রিয়ায় হেফাজতে ইসলাম ‘আল্লাহু আকবর! তুমি কে, আমি কে? মুসলমান! মুসলমান!’ স্লোগানের মাধ্যমে মুসলমান জাতীয়তাবাদকে প্রকাশ্যে পুনর্জাগরিত করেছে।

বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ নিয়ে ভাবতে গেলে একটা বিষয় খুব পরিষ্কার হয়ে যায়, দেশটি জাতীয়তাবাদের ধারণারই একরকম শিকার। জাতীয়তাবাদের ধারণা আমাদের জন্য বরং একটা ধাঁধার মতো। বিভিন্ন সময়ের প্রভাব, যেমন সমাজ আর রাজনীতির পরিস্থিতি, আমাদের চিন্তাভাবনা আর পরিচয়ের ওপর বড়সড় ছাপ ফেলেছে। সাক্ষাৎকারদাতাদের উত্তরগুলো সেই প্রভাবগুলোর প্রতিফলন বহন করে।

অ্যান্ডারসনের ‘ইমাজিনড কমিউনিটি’ তত্ত্ব অনুযায়ী, জাতীয়তাবাদের ধারণা একটি ‘সমজাত শূন্য সময়’-এর মাধ্যমে গঠিত হয়। এটি এমন এক কাঠামো তৈরি করে, যেখানে ব্যক্তিরা নিজেদের কল্পিত একটি বৃহৎ সম্প্রদায়ের অংশ হিসেবে দেখতে পারে। জাতীয়তাবাদের এই ধারণা ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপট, শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশাসনিক কাঠামো ও সামাজিক আন্দোলনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয় (অ‍্যান্ডারসন ২০০৬: ২৪-২৫) । বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অ্যান্ডারসন উল্লেখ করেছেন, জাতীয়তাবাদের জন্য প্রয়োজনীয় ‘ব্যাকরণ’ হলো যেমন আদমশুমারি, মানচিত্র, ও জাদুঘর, যা যথাযথভাবে বিকশিত হয়নি। ফলে জাতীয় পরিচয় সম্পর্কে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা দেয় এবং সাক্ষাৎকারে উত্তরদাতারা প্রায়ই আত্মনিয়ন্ত্রিত বা সতর্কতার সঙ্গে উত্তর দিয়েছেন, যেখানে তাঁরা দ্বৈত রাজনীতির বাইরে নিজেদের অবস্থান বোঝাতে চেয়েছেন (অ্যান্ডারসন ২০০৬: ১৬৩-১৮৫)।

বিশ্বযুদ্ধের পর অভিবাসনের বৃদ্ধি, বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোতে একটি ‘দ্বৈত’ বা ‘হাইফেনেটেড’ পরিচয়ের ধারণা তৈরি করে (যেমন আমেরিকান-বাংলাদেশি, ব্রিটিশ-বাংলাদেশি)। ব্রামসনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এ ধরনের দ্বৈত পরিচয় মূলত একটি সেতুর মতো কাজ করে, যা মূল জাতীয় পরিচয় এবং অভিবাসিত পরিচয়ের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে (ব্রামসন ১৯৮১: ৫৫)।

বাংলাদেশে ‘দ্বৈত’ বা ‘হাইফেনেটেড’ পরিচয়ের ধারণা ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে প্রভাব বিস্তার করেছে। মাঠপর্যায়ের গবেষণায় ও উন্মুক্ত আলাপের অংশে এটি স্পষ্ট হয়েছে, এ ধরনের পরিচয় গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। এটি ক্ষমতা ও জ্ঞানের সম্পর্কের পুনর্গঠনে সাহায্য করতে পারে এবং বিভিন্ন মত ও অংশগ্রহণকে একত্র করে একটি সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে।

আশরাফীকরণ, নামের রাজনীতি ও এমনেসিয়ার সমাজতত্ত্ব

বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের সংকট বা দ্বৈততা কোনো সমসাময়িক বিষয় নয়, বরং এর শিকড় প্রোথিত রয়েছে মধ্যযুগীয় এবং ঔপনিবেশিক আমলের সামাজিক কাঠামোর মধ্যে। ঐতিহাসিকভাবেই বাঙালি মুসলমান সমাজ ‘আশরাফ’ ও ‘আতরাফ’—এই দুই প্রধান ভাগে বিভক্ত ছিল। আশরাফরা সাধারণত নিজেদের বিদেশি বংশোদ্ভূত (আরব, পারস্য বা তুর্কি) বলে দাবি করত এবং তারা উর্দু ভাষা ও উত্তর ভারতীয় সংস্কৃতির অনুসারী ছিল (ইটন ১৯৯৩: ৩৪৩-৩৪৪)। অন্যদিকে আতরাফরা ছিল স্থানীয় বাঙালি, যারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল এবং কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। এই বিভাজন কেবল সামাজিক নয়, বরং রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্মাণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে যখন আধুনিক শিক্ষা ও রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পায়, তখন বাঙালি মুসলমান সমাজ এই দ্বৈত পরিচয়ের সংকটে পড়ে। ১৮৭১ সালের আদমশুমারিতে বাঙালি মুসলমানদের বিশাল অংশকে নিম্নবর্ণের হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যা তৎকালীন মুসলমান অভিজাতদের মধ্যে এক ধরনের হীনম্মন্যতা ও পরিচয়ের সংকট তৈরি করে (রফিউদ্দিন ১৯৯৬)। এই সংকট থেকেই পরবর্তী সময়ে ‘ইমিগ্রেশন থিওরি’ বা অভিবাসন তত্ত্বের উদ্ভব ঘটে, যেখানে দাবি করা হয়, বাংলার মুসলমানরা কেবল স্থানীয়ভাবে ধর্মান্তরিত নয়, বরং তারা বিদেশি ভাগ্যান্বেষী ও ধর্ম প্রচারকদেরও বংশধর (ইটন ১৯৯৩: ৩০৪-৩০৬)। এই তত্ত্ব মূলত আশরাফ শ্রেণির রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা এবং নিজেদের বাঙালিত্বের চেয়ে মুসলমানত্বের দিকে বেশি ঝুঁকিয়ে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা ছিল।

তবে এই অভিজাতদের আধিপত্যের সমান্তরালে একধরনের সিনক্রিটিক পরিচয়ও বিকশিত হচ্ছিল। বিশেষ করে সুফি সাধক ও পীরদের মাধ্যমে ইসলাম যখন বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা স্থানীয় লোকজ বিশ্বাস ও আচারের সঙ্গে মিশে এক অনন্য রূপ ধারণ করে (ইটন ১৯৯৩)।  এখানে ইসলাম ধর্মীয় আচারের চেয়েও একটি জীবনপদ্ধতি হিসেবে স্থানীয় সংস্কৃতিকে ধারণ করেছিল, যেখানে একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে মুসলমান ও বাঙালি হিসেবে নিজের পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করত (ইটন ১৯৯৩: ২৯৬-৩০০)।

দক্ষিণ এশীয় মুসলিম সমাজের সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত স্তরবিন্যাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আশরাফ শ্রেণি মূলত নিজেদের বিদেশি বংশোদ্ভূত বলে দাবি করত এবং তারা ছিল সমাজের উচ্চবিত্ত ও অভিজাত অংশ (ইটন ১৯৯৩: ২৬৮-২৭৮)। তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় গড়ে উঠেছিল উর্দু ভাষা এবং একটি প্যান-ইসলামিক বা বিশ্বজনীন মুসলিম সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে, যা তাদের সাধারণ মানুষের থেকে আলাদা করে রাখত। এর বিপরীতে, আতরাফ বা আজলাফ গোষ্ঠী ছিল মূলত স্থানীয়ভাবে ধর্মান্তরিত কৃষক ও শ্রমজীবী শ্রেণি। তারা ঐতিহ্যগতভাবে বাংলা ভাষা এবং এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের লোকজ সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবে নিজেদের পরিচয় বজায় রেখেছিল (বাংলাপিডিয়া ২০২৬) । তবে এই দুই ধারার বাইরেও একটি সিনক্রিটিক পরিচয় বা সমন্বিত ধারা গড়ে উঠেছিল, যেখানে সুফি সাধক ও পীরদের প্রভাব ছিল অপরিসীম। ধর্ম ও স্থানীয় সংস্কৃতির এই মিলনের ফলে একটি সমন্বিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং লৌকিক ইসলামের জন্ম হয়, যা বাংলার সাধারণ মুসলিম মানসে ভাষা ও ধর্মের এক অনন্য সেতুবন্ধন তৈরি করেছিল (অসিম ১৯৮৩: ৫৪-৫৬; ইটন ১৯৯৩: ২১৯-২২৫)।

ঐতিহাসিক স্তরবিন্যাস এবং আশরাফ-আতরাফ দ্বন্দ্বের উৎস

বাংলার মুসলিম সমাজ ঐতিহাসিকভাবেই এক গভীর ও অনমনীয় স্তরবিন্যাসে বিভক্ত ছিল, যা ইসলামের তাত্ত্বিক সাম্যবাদের ধারণার সঙ্গে প্রায়ই সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দী ও বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ব্রিটিশ নৃবিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিকেরা, যেমন উইলিয়াম হান্টার বাংলার বিশাল মুসলিম জনসংখ্যাকে প্রধানত দুটি শ্রেণিতে ভাগ করেছিলেন: আশরাফ ও আজলাফ (বা আতরাফ) (হান্টার ১৮৭১: ১৬৭-১৬৮)। হান্টার ও তাঁর সমসাময়িকদের মতে, পূর্ব ভারতের জলাভূমি অঞ্চলে মুসলিমদের এই বিপুল উপস্থিতির কারণ ছিল নিম্নবর্ণের হিন্দু সমাজ থেকে ব্যাপক ধর্মান্তকরণ! যদিও ইটন (১৯৯৩) তাঁর কাজে এ ধরনের ধর্মান্তকরণ তত্ত্বের সমালোচনা হাজির করেছেন।

আশরাফ বলতে বোঝানো হতো সেই মুসলিমদের, যারা উত্তর ভারত বা মধ্য এশিয়া (যেমন আরব, পারস্য বা আফগানিস্তান) থেকে আগত বলে দাবি করতেন (রফিউদ্দিন ১৯৬৬: ২৬৮-২৭৮)। এই শ্রেণির মধ্যে প্রধানত চারটি গোষ্ঠী অন্তর্ভুক্ত ছিল: সৈয়দ, শেখ, মোগল ও পাঠান (আনসারি ১৯৬০)। এরা সাধারণত উচ্চবিত্ত, ভূস্বামী, ধর্মীয় নেতা বা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন এবং তাঁরা নিজেদের স্থানীয় মুসলিমদের তুলনায় নৃতাত্ত্বিকভাবে শ্রেষ্ঠ মনে করতেন (মোসাররাপ ২০১৭)। অন্যদিকে আতরাফ বা আজলাফ বলতে বোঝানো হতো সেই বিশাল জনসংখ্যাকে, যারা মূলত স্থানীয় নিম্নবর্ণের হিন্দু বা বৌদ্ধ সমাজ থেকে ধর্মান্তরিত হয়েছিল এবং যাদের পেশা ছিল মূলত কৃষিকাজ বা অন্যান্য কায়িক শ্রম (ওয়ালি ১৯০৪: ৫৭৪-৫৭৭)। এ কাঠামোর নিচে ছিল ‘আরজাল’ বা ‘রাইজাল’ শ্রেণি, যারা ঝাড়ুদার বা মেথরের মতো তথাকথিত ‘অশুচি’ পেশায় নিয়োজিত ছিল এবং সমাজের মূলধারা থেকে প্রায় অস্পৃশ্য হিসেবে বিবেচিত হতো (মোসাররাপ ২০১৭)।

ঐতিহাসিকভাবে দক্ষিণ এশীয় মুসলিম সমাজে বর্ণপ্রথার আদলে সামাজিক স্তরবিন্যাস গড়ে উঠেছিল। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশীয় মুসলিম সমাজ প্রধানত যে তিনটি স্তরে বিভাজিত ছিল—আশরাফ, আজলাফ ও আরজাল—তার মূলে ছিল বংশপরিচয়, পেশা ও অর্জিত সামাজিক মর্যাদা। আশরাফরা ছিল সমাজের সর্বোচ্চ স্তরের অভিজাত শ্রেণি। তারা মূলত নিজেদের বিদেশি বংশোদ্ভূত, অর্থাৎ আরব, পারস্য, তুর্কি বা আফগান বংশধর হিসেবে দাবি করত। এই স্তরে অন্তর্ভুক্ত ছিল সৈয়দ, শেখ, মোগল ও পাঠানরা। তারা প্রধানত বিশাল ভূসম্পত্তির মালিক, উচ্চশিক্ষিত আলেম অথবা রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ সামরিক ও বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করত। বংশীয় শ্রেষ্ঠত্ব ও ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থানের কারণে তারা সমাজে সর্বোচ্চ আভিজাত্য ও সম্মানের অধিকারী ছিল।

সামাজিক সিঁড়ির দ্বিতীয় স্তরে ছিল আজলাফ বা আতরাফ গোষ্ঠী। তারা মূলত স্থানীয়ভাবে ধর্মান্তরিত মুসলিম ছিল, যারা ইসলাম গ্রহণের পরও তাদের ‘শুদ্ধ’ বা সম্মানজনক কায়িক শ্রমের পেশাগুলো ধরে রেখেছিল। এই শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল ধর্মান্তরিত শেখ, আনসারি (জোলাহা), রায়িন ও মনসুরিরা। তারা মূলত কৃষক, তন্তুবায় (তাঁতি), দরজি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হিসেবে কাজ করত। আজলাফরা সমাজের মূল চালিকা শক্তি এবং সংখ্যাগুরু অংশ হলেও আশরাফদের তুলনায় তাদের সামাজিক মর্যাদা ছিল মধ্যম বা নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির।

সমাজের সবচেয়ে নিচের স্তরে অবস্থান ছিল আরজাল গোষ্ঠীর। তারা মূলত অতিনিম্নবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায় থেকে ধর্মান্তরিত ছিল এবং তথাকথিত ‘অশুচি’ পেশায় নিয়োজিত থাকত। এই স্তরে হালালখোর, লালবেগী ও ভাটিয়ারাদের মতো গোষ্ঠীগুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাদের ঐতিহাসিক পেশা ছিল ঝাড়ুদার, মেথর, মৃতদেহ সৎকারকারী কিংবা নাপিতের কাজ করা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ইসলাম ধর্মের মূলনীতি সাম্য হলেও পেশাগত কারণে এই গোষ্ঠী সামাজিকভাবে চরম অবজ্ঞা ও অস্পৃশ্যতার শিকার হতো। এই বিভাজনগুলো মূলত বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রবল ছিল, তবে আধুনিক শিক্ষা ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ফলে বর্তমানে এই ব্যবধানগুলো অনেকটাই কমে এসেছে।

এ বিভাজন কেবল তত্ত্বগত ছিল না, বরং তা দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় গভীর বৈষম্য সৃষ্টি করত। আশরাফ মুসলিমরা উর্দু ভাষাকে তাদের আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছিল এবং বাংলাকে ‘হিন্দুয়ানি’ ভাষা হিসেবে অবজ্ঞা করত (রফিউদ্দিন ১৯৯৬: ১১০-১১৫)। তাদের পোশাক (কুর্তা-পায়জামা) ও খাদ্যাভ্যাসও ছিল স্থানীয় মুসলিমদের (লুঙ্গি-ধুতি পরিহিত কৃষক) থেকে ভিন্ন (রফিউদ্দিন ১৯৯৬: ১১০-১১৫)। এই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দূরত্ব ঘোচানোর লক্ষ্যে এবং মর্যাদা বৃদ্ধির তাগিদে আতরাফ মুসলিমদের মধ্যে যে প্রক্রিয়ার সূচনা হয়, সমাজবিজ্ঞানে তাকে ‘আশরাফীকরণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় (ইমতিয়াজ ১৯৬৬)।

আশরাফীকরণ এবং পদবি পরিবর্তনের রাজনীতি: ‘জোলাহা’ থেকে ‘শেখ’ হওয়ার আখ্যান

আশরাফীকরণ হলো এমন একটি সামাজিক প্রক্রিয়া, যেখানে নিম্নবর্গের মুসলিমরা নিজেদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে উচ্চবর্গের (আশরাফ) মুসলিমদের আচার-আচরণ, জীবনধারা ও নামীয় পদবি গ্রহণ করে (মোমিন ১৯৭৮) । এ প্রক্রিয়ায় নামের পরিবর্তন ছিল সবচেয়ে সহজলভ্য এবং শক্তিশালী কৌশল। বাংলার গ্রামীণ সমাজে একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় প্রবাদ ছিল, যা এই সামাজিক গতিশীলতাকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলে—

‘গত বছর ছিলাম জোলাহা, এ বছর শেখ, আগামী বছর যদি ফসলের দাম বাড়ে তবে হব সৈয়দ।’

১৮৭২ থেকে ১৯৩১: পরিচয়ের বিস্ময়কর রূপান্তর

ব্রিটিশ শাসনামলে পরিচালিত আদমশুমারিগুলোতে বাঙালি মুসলিমদের এই আত্মপরিচয় পরিবর্তনের প্রবণতা সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। ১৮৭২ সালের আদমশুমারিতে বাংলায় মুসলিমদের মধ্যে খুব সামান্য অংশ নিজেদের ‘আশরাফ’ বা ‘শেখ’ হিসেবে দাবি করেছিল। কিন্তু ১৯০১ ও ১৯২১ সালের আদমশুমারিগুলোতে দেখা যায়, মোট মুসলিম জনসংখ্যার এক বিশাল অংশ (৯৫ শতাংশের বেশি) নিজেদের ‘শেখ’ হিসেবে নথিভুক্ত করেছ (ইটন ১৯৯৩: ২০৭-২১০)। এটি কোনো নৃবৈজ্ঞানিক পরিবর্তন ছিল না, বরং ছিল আতরাফ মুসলিমদের এক সংগঠিত প্রয়াস, যার মাধ্যমে তারা তাদের মণ্ডল , প্রামাণিক, বিশ্বাস বা জোলাহার মতো স্থানীয় ও পেশাগত পদবি বর্জন করে ‘শেখ’ বা ‘সৈয়দ’–এর মতো মর্যাদাসম্পন্ন ধর্মীয় পদবি গ্রহণ করেছিল (রফিউদ্দিন ১৯৯৬: ১২০-১৪০)।

বাংলার মুসলিম সমাজে ‘শেখ’ পদবি ব্যবহারের বিবর্তনটি বিশ্লেষণ করলে এক চমকপ্রদ সামাজিক রূপান্তরের চিত্র ফুটে ওঠে। ১৮৭২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, তৎকালীন বাংলায় মাত্র ২ লাখ ৩২ হাজার ১৮৯ মানুষ নিজেদের ‘শেখ’ বলে পরিচয় দিতেন, যা ছিল মোট মুসলিম জনসংখ্যার মাত্র ১ দশমিক ৫ থেকে ৪ শতাংশ। এই ক্ষুদ্র গোষ্ঠীটি মূলত নিজেদের বিদেশি বংশোদ্ভূত বা উচ্চবংশীয় বলে দাবি করত (রফিউদ্দিন ১৯৯৬: ১২০-১৪০)। তবে বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই এই চিত্রে এক অভাবনীয় পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। ১৯০১ সালের মধ্যে ‘শেখ’ পদবিধারী জনসংখ্যা একলাফে ১৯ দশমিক ৫ মিলিয়নে পৌঁছায়, যা ছিল মোট মুসলিম জনসংখ্যার প্রায় ৯১ শতাংশ। এই সময়কালেই মূলত ব্যাপক ‘আশরাফীকরণ’ প্রক্রিয়া শুরু হয়, যেখানে নিম্নবর্ণ বা সাধারণ পেশাজীবী মুসলিমরা সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির অভিপ্রায়ে নিজেদের পুরোনো পদবি বদলে ‘শেখ’ পদবি গ্রহণ করতে থাকে (রফিউদ্দিন ১৯৯৬: ১২০-১৪০)। এই রূপান্তরের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯২১ সালে, যখন শেখ পদবিধারী জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৪ দশমিক ৪ মিলিয়ন বা মোট মুসলিম সমাজের প্রায় ৯৫ দশমিক ৮ শতাংশ (রফিউদ্দিন ১৯৯৬: ১২০-১৪০)। মাত্র ৫০ বছরের ব্যবধানে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রায় সবাই একক ‘শেখ’ পরিচয়ে পরিচিতি লাভ করার মাধ্যমে বংশীয় বিভাজন কাটিয়ে একটি সংহতিমূলক পরিচয় নির্মাণের চেষ্টা চালায়।

এই তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাঙালি মুসলিমরা একটি ব্যাপক ‘পরিচয়ের পুনর্গঠনের’ মধ্য দিয়ে গিয়েছিল। তারা তাদের স্থানীয়, ভৌগোলিক ও নৃবৈজ্ঞানিক শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি বৃহত্তর, কল্পিত আভিজাত্যের মধ্যে আশ্রয় খুঁজেছিল। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা একদিকে যেমন হিন্দু বর্ণপ্রথার ছায়া থেকে মুক্ত হতে চেয়েছিল, তেমনি অন্যদিকে আশরাফদের সামাজিক অবজ্ঞা থেকে বাঁচতে চেয়েছিল।

‘দাদার বাবার নাম’ ভুলে যাওয়ার রাজনীতি: শিকড় কর্তনের মনস্তত্ত্ব

বাঙালি আতরাফ মুসলিমদের ভেতর একটা প্রবণতা ছিল, তিন বা চার পুরুষ আগের পূর্বপুরুষের নাম বা বংশীয় ইতিহাস ভুলে যাওয়ার, যা একটি গভীর ও সুসংগঠিত ‘সাংস্কৃতিক এমনেসিয়া’। এই বিস্মৃতির রাজনীতি মূলত তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে: হীনম্মন্যতা থেকে মুক্তি, সামাজিক আভিজাত্যের পুনর্নির্মাণ ও ধর্মীয় বিশুদ্ধতার অন্বেষণ।

নৃতাত্ত্বিক শিকড় আড়াল করার কৌশল: বাঙালি মুসলিমদের পূর্বপুরুষেরা প্রায়ই নিম্নবর্ণের হিন্দু বা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল, যারা ব্রাহ্মণ্যবাদী নিপীড়ন বা সামাজিক বঞ্চনা থেকে বাঁচতে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। কিন্তু ধর্মান্তরিত হওয়ার পরও আশরাফ বা বিদেশি বংশোদ্ভূত মুসলিমরা তাদের ‘নিচু জাতের’ হিসেবে গণ্য করত। অনেক ক্ষেত্রে তাদের আদি পদবি (যেমন পাল, দত্ত, বিশ্বাস) তাদের হিন্দু অতীতের দিকে ইঙ্গিত করত। ফলে নিজেদের ‘বিশুদ্ধ মুসলিম’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে এবং আশরাফদের সমমর্যাদা পেতে তারা তাদের সেসব পূর্বপুরুষদের নাম বা পদবি ভুলে যাওয়ার বা মুছে ফেলার চেষ্টা করত, যারা স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত ছিল (রফিউদ্দিন ১৯৯৬: ১০৮-১১৫) । ‘দাদার বাবার নাম’ ভুলে যাওয়া মানে হলো সেই আদি ‘অপবিত্র’ বা ‘নিম্ন’ শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা।

কল্পিত আভিজাত্য এবং ‘শাজরা’ বা ‘বংশলতিকা’ নির্মাণ: বাস্তব পূর্বপুরুষদের ইতিহাস এমনেসিয়ার গর্ভে ঠেলে দেওয়ার পর সেখানে একধরনের ‘উদ্ভাবিত আভিজাত্য’ (ইনভেনটেড নোবিলিটি) নির্মাণ করা হয়। আতরাফ থেকে আশরাফে রূপান্তরিত হওয়ার জন্য তারা নতুন বংশতালিকা বা ‘শাজরা’ তৈরি করে, যেখানে তারা নিজেদের সরাসরি আরব্য বা পারস্যের কোনো বীর বা সুফি সাধকের বংশধর হিসেবে দাবি করে (সিরাজুল ২০২২: ৮৭-৯৮)। এ প্রক্রিয়ায় তাদের সত্যিকারের পারিবারিক ইতিহাস অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে, যা ব্যক্তিকে তার বর্তমান সামাজিক অবস্থানে একধরনের বৈধতা প্রদান করে।

শিক্ষিত মধ্যবিত্তের উদয় ও আভিজাত্যের স্পৃহা: বিংশ শতাব্দীতে বাংলার মুসলিম সমাজে একটি ক্ষুদ্র কিন্তু উচ্চাকাঙ্ক্ষী শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদয় হয়, যারা ব্রিটিশ প্রদত্ত ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করে (রফিউদ্দিন ১৯৯৬)। এই শ্রেণি যখন গ্রামীণ কৃষি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শহুরে পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে চায়, তখন তারা তাদের কৃষক বা কায়িক শ্রমিকের পরিচয়কে আড়াল করতে চায়। এই ‘এমনেসিয়ার রাজনীতি’ তাদের জন্য একটি ঢাল হিসেবে কাজ করে, যা তাদের নতুন সামাজিক আভিজাত্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। আবুল মনসুর আহমদ (১৯৩৫) যেমনটি পর্যবেক্ষণ করেছেন, মুসলিম পরিচয়টি তখন কেবল ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, বরং একটি সামাজিক শ্রেণি হিসেবে আবির্ভূত হয়, যা হিন্দু সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চায়।

নামের শুরুতে ‘মোহাম্মদ’ বা ‘এম. ডি.’ ব্যবহার: পরিচয়ের রাজনীতি

বাঙালি মুসলিম পুরুষদের নামের শুরুতে ‘মোহাম্মদ’ বা সংক্ষেপে ‘মোঃ’ ব্যবহারের আধিক্য কেবল ভক্তির বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত সচেতন ‘পরিচয়ের রাজনীতি’। এই প্রবণতা বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় মুসলিমদের মধ্যে এক অনন্য মাত্রা পেয়েছে, যেখানে এটি নামের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য হয়।

বৈশ্বিক ইসলামি পরিচয়ের মুখচ্ছবি: নামের শুরুতে নবীর নাম যুক্ত করা ব্যক্তিকে তার স্থানীয় বর্ণ, গোত্র বা পেশাগত পরিচয় থেকে মুক্ত করে একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক মুসলিম পরিচয়ের (Pan-Islamic Identity) সঙ্গে যুক্ত করে। যখন একজন ব্যক্তি নিজেকে ‘মোঃ মাসউদ ইমরান’ হিসেবে পরিচয় দেয়, তখন তার নামের মধ্যে তার পূর্বপুরুষের পেশাগত পরিচয় (যেমন—জোলাহা/মণ্ডল/মিয়া) অনুপস্থিত থাকে। এটি তাকে একটি ‘নিরপেক্ষ’ এবং ‘বিশুদ্ধ’ ধর্মীয় পরিচিতি দান করে, যা তাকে উচ্চবর্গের আশরাফদের কাছাকাছি নিয়ে যায়। এটি মূলত একটি ‘সর্বজনীন মুসলিম পরিচয়’ তৈরির প্রয়াস, যা অভ্যন্তরীণ শ্রেণিবিভাগকে মুছে দিতে সাহায্য করে।

প্রশাসনিক বিবর্তন এবং ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার: নামের এই সংক্ষিপ্ত রূপ ‘মোঃ’ ব্যবহারের পেছনে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনেরও ভূমিকা রয়েছে। ব্রিটিশ রেকর্ড কিপিং ব্যবস্থায় দীর্ঘ মুসলিম নামগুলোকে সংক্ষেপে নথিভুক্ত করার প্রয়োজনে ‘Mohammad’–কে ‘Md.’/‘MD.’ হিসেবে লেখা শুরু হয়। পরবর্তীকালে এটি স্কুল রেজিস্টার, জন্মনিবন্ধন ও ভোটার তালিকায় এতটাই স্থায়ী হয়ে যায় যে অনেক অভিভাবক অসচেতনভাবেই সন্তানের নামের শুরুতে এটি যুক্ত করে দেন। মজার ব্যাপার হলো, খোদ আরব দেশগুলোতে বা বিশ্বের অন্যান্য মুসলিমপ্রধান অঞ্চলে নামের শুরুতে নবীর নাম রাখার প্রচলন থাকলেও সব পুরুষের নামের শুরুতে বাধ্যতামূলকভাবে ‘মোহাম্মদ’ বা তার সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহারের এমন গণপ্রবণতা বিরল (ফোরবিয়ারস ২০২৬)।

‘মোঃ’ বনাম ‘মেডিকেল ডাক্তার’: আধুনিক প্রেক্ষাপটে এই সংক্ষিপ্ত রূপটি বাঙালি মুসলিমদের জন্য আন্তর্জাতিক স্তরে প্রায়শই বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন বা প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ‘Md.’–কে ‘Medical Doctor’–এর সংক্ষিপ্ত রূপ হিসেবে ভুল করা হয়। এটি একটি গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে একটি স্থানীয় সামাজিক সুরক্ষার কৌশল বৈশ্বিক প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। পাসপোর্ট অফিসে একসময় সংক্ষিপ্ত নাম ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলেও এনআইডি কার্ডের ‘মোঃ’–এর প্রভাব কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি, যা নির্দেশ করে যে এই পরিচিতিটি এখন বাঙালি মুসলিমের আত্মপরিচয়ের অস্থিমজ্জায় মিশে গেছে।

‘শেখাইজেশন’-এর মাধ্যমে জাতপাত আড়ালের সূক্ষ্ম কৌশল: গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ করে নিম্নবর্গের মুসলিমরা (যাদের সমাজবিজ্ঞানী ইমতিয়াজ আহমদ (১৯৬৬) ‘Caste-like features’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন) নিজেদের আদি পরিচয় আড়াল করতে নামের শুরুতে ‘মোহাম্মদ’ এবং শেষে ‘শেখ’ বা ‘সৈয়দ’ যুক্ত করে (ইমতিয়াজ ১৯৬৬)। এই প্রক্রিয়াকে ‘শেখাইজেশন’ (Sheikhisation) বলা যেতে পারে, যেখানে ‘শেখ’ শব্দটি কোনো গোত্র পরিচয় নয় বরং একটি সম্মানসূচক পদবি বা ‘Courtesy Title’ হিসেবে ব্যবহৃত হয় (তৌসিফ ২০২৩: ৯২-১০৮)। এটি তাদের জন্য একধরনের সামাজিক স্বীকৃতি লাভের সহজতম উপায় হলেও এর ফলে তারা প্রায়শই রাষ্ট্রীয় কোটা সুবিধার (Reservation) সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, কারণ তারা তাদের প্রকৃত ‘পিছিয়ে পড়া’ পরিচয়টি প্রকাশ করতে লজ্জাবোধ করে।

নাম গ্রহণের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

বাঙালি মুসলিমদের নামের এই পরিবর্তনশীলতা এবং বিস্মৃতির রাজনীতি আধুনিক সময়ে এক ভয়াবহ ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি নিজেই আমার পূর্বজদের থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি। নতুন সংগঠিত পরিচয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি। বাংলাদেশের মুসলিমদের অবস্থা এখন না ঘরকা, না ঘাটকা।

অ্যালগরিদমিক অ্যামনেসিয়া ও প্রশাসনিক হয়রানি: বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় দেখা গেছে, অনেক মুসলিম ভোটারের নাম ‘অসংগতিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, কারণ তাদের নথিপত্রে নামের শুরুতে কখনো ‘Md.’ আছে, আবার কখনো ‘Mohammad’ আছে, অথবা কখনো কিছুই নেই। রাষ্ট্রীয় অ্যালগরিদম এই সূক্ষ্ম সামাজিক পরিবর্তনের ব্যাকরণ বোঝে না। ফলে একজনের নাম ‘মোহাম্মদ আলী’ এবং অন্য নথিতে ‘মোঃ আলী’ থাকাকে দুই ভিন্ন ব্যক্তির পরিচয় হিসেবে গণ্য করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত তাদের নাগরিকত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।

নথিপত্রে নামের অসংগতির কারণে সৃষ্ট প্রশাসনিক জটিলতাগুলো বর্তমানে একটি বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে প্রকট। ভোটার কার্ডে সাধারণত নামের শুরুতে ‘মোঃ’ বা ‘Mohammad’ ব্যবহারের অদলবদল ঘটে, যা মূলত প্রান্তিক ও গ্রামীণ মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য নাগরিক সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। অন্যদিকে ভোটার কার্ডে যখন একই ব্যক্তির নাম ‘মোহাম্মাদ মাসউদ’ হিসেবে নথিভুক্ত হয়, তখন অন্যান্য ডকুমেন্টের সঙ্গে বানান বা দৈর্ঘ্যের পার্থক্যের কারণে বায়োমেট্রিক ও পরিচয়ের অমিল দেখা দেয়, যা সাধারণ নাগরিকদের প্রাত্যহিক প্রশাসনিক কাজে ভোগান্তিতে ফেলে। এই জটিলতা আরও তীব্র হয় পাসপোর্ট বা শিক্ষাগত সনদের ক্ষেত্রে, যেখানে অনেক সময় ‘Md.’/‘MD.’ বা প্রাথমিক অংশটি পুরোপুরি বাদ পড়ে যায় এবং ব্যক্তি কেবল ‘মাসউদ’ হিসেবে চিহ্নিত হয়। এর ফলে বংশীয় সংযোগ প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে, যা উচ্চশিক্ষিত ও প্রবাসী ব্যক্তিদের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বা নাগরিকত্বের প্রমাণ দাখিলের ক্ষেত্রে বড় ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

অ্যামনেসিয়ার ফলাফল, যখন পূর্বপুরুষই শত্রু হিসেবে জ্ঞাত: যারা আভিজাত্যের আশায় নিজেদের ‘দাদার বাবার নাম’ ভুলে গিয়েছিল বা পরিবর্তন করেছিল, আজ তারাই সবচেয়ে বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে নিজেদের সংস্কৃতি থেকে। আজ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরিবারে আদি পূর্বপুরুষের নামের সঙ্গে বর্তমান প্রজন্মের নামের কোনো মিল নেই। পূর্বপুরুষ ছিল ‘বিশ্বাস’ বা ‘মণ্ডল’, নাতি এখন ‘সৈয়দ’ বা ‘শেখ’ (রফিউদ্দিন ১৯৯৬: ৮৫-৯০)। এই পরিচয়ের বিচ্ছিন্নতা ব্যক্তিকে রাষ্ট্রহীন হওয়ার ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়। অর্থাৎ যে অ্যামনেসিয়া একসময় সামাজিক মর্যাদার ঢাল ছিল, আজ তা অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাংস্কৃতিক অ্যামনেসিয়া বনাম রাজনৈতিক বাস্তবতা: একটি তাত্ত্বিক মূল্যায়ন

বাঙালি মুসলিমদের এই ‘অ্যামনেসিয়ার রাজনীতি’ কেবল নামের পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি বৃহত্তর শ্রেণি রাজনীতির অংশ। সমাজবিজ্ঞানী রাজনি কোঠারি যেমনটি বলেছেন, এটি একধরনের ‘ক্রমবর্ধমান অ্যামনেসিয়া’, যা দরিদ্র ও প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলোকে মূলধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে অদৃশ্য করে দেয়। মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলিম শ্রেণি যখন নিজেদের একটি ‘স্যানিটাইজড’ বা মার্জিত ইসলামি পরিচয়ে উপস্থাপন করতে চায়, তখন তারা তাদের গ্রামীণ, কৃষক এবং তথাকথিত ‘নিম্নবর্ণের’ ইতিহাসকে মুছে ফেলতে বাধ্য হয় (রাজনি ১৯৯৫)।

ভাষা ও পরিচয়ের টানাপোড়েন: বাঙালি মুসলিমের পরিচয়ের এই দ্বন্দ্বে ভাষা একটি প্রধান অনুষঙ্গ। উনিশ শতকের শেষের দিকে আশরাফরা উর্দুকে তাদের ভাষা হিসেবে ঘোষণা করেছিল, যাতে তারা হিন্দুদের থেকে আলাদা হতে পারে (রবিনসন ১৯৭৪)। কিন্তু আতরাফ বা সাধারণ বাঙালি মুসলিমদের জন্য বাংলা ছিল তাদের নাড়ির ভাষা। এই ভাষা ও ধর্মের দ্বন্দ্বকে আবুল মনসুর আহমদ  চমৎকারভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, বাঙালি মুসলিমের জন্য ‘মুসলিম’ পরিচয়টি কেবল একটি ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, বরং এটি একটি সামাজিক শ্রেণি গঠন, যা হিন্দু ভূস্বামী ও মহাজনদের শোষণের বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক ব্যারিকেড হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। কিন্তু এ লড়াইয়ে জিততে গিয়ে তারা তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের (যেমন—বাউল, মরমি গান, লোকজ সংস্কৃতি) অনেক কিছুকেই ‘অ-ইসলামিক’ বলে বর্জন করেছে ((মনসুর ১৯৩৫)।

ভাষার টানাপোড়েন যে এখনো বর্তমান, তা আমরা দেখতে পাই ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আন্দোলনকারীদের নেতাদের মুখেই শোনা গেছে আজাদি, বন্দোবস্ত, বয়ান, ইনসাফ, ফয়সালা, মজলুম ইত্যাদি শব্দ। সভা–সমাবেশে কিংবা টেলিভিশনের টক শোতে আলোচনায় তাঁরা এসব শব্দ অনেক বেশি ব্যবহার করছেন বলে অনেকের দৃষ্টিতে এসেছে। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে ইনকিলাব বর্গটি। বাংলাদেশপন্থার ভাষাভঙ্গি হিসেবে এসব বর্গ প্রচলনের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে, যার ভেতর থেকে ভাষার মুসলমানিকরণ অব্যাহত রাখা হয়েছে। এ প্রকল্প আমরা দেখব শুরু হয়েছিল ফরায়েজি আন্দোলনের ভেতর থেকে যখন জলকে সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল পানি শব্দ গ্রহণের মাধ্যমে।

ঔপনিবেশিক সীমানা নির্ধারণ ও দক্ষিণ এশিয়ার ‘ম্যাপিং’: দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচয় বা ‘সাউথ এশিয়া’র ধারণাটি কোনো প্রাকৃতিক বা ভৌগোলিক ধ্রুবক নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক ও আদর্শিক নির্মাণের ফসল। ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশরা যখন এই অঞ্চলের মানচিত্র তৈরি করে, তখন তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল সাম্রাজ্যবাদী শাসনকে বৈধতা দেওয়া এবং বিভাজন সৃষ্টি করা (লুডেন ২০০৪)। এই ‘ম্যাপিং’ বা সীমানা নির্ধারণের প্রক্রিয়াটি উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলোতেও অব্যাহত রয়েছে। স্বাধীন ভারত বা পাকিস্তান রাষ্ট্র যেভাবে তাদের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার বা জাতীয় পরিচয় নির্মাণের চেষ্টা করেছে, তা মূলত সেই ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারেরই ধারাবাহিকতা (লুডেন ২০০৪)।

দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রকল্পে সীমানা কেবল ভূখণ্ডকে আলাদা করে না, বরং মানুষের চলাফেরা, বাণিজ্য এবং বৈধ-অবৈধতার ধারণাকেও সংজ্ঞায়িত করে। বর্তমান বিশ্বায়িত বিশ্বে এই সীমানাগুলো একদিকে যেমন কঠোরভাবে রক্ষা করা হচ্ছে, অন্যদিকে অভিবাসন ও আন্তসীমানা চলাচলের কারণে তা ক্রমাগত অস্পষ্ট হয়ে পড়ছে (পাসি ২০১৫)। বাঙালি মুসলমানদের ক্ষেত্রে এই সীমানা–সংকট অত্যন্ত প্রকট। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ এবং ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এই অঞ্চলের মানুষের আত্মপরিচয়কে রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে বন্দী করে ফেলার চেষ্টা করেছে, যা পরবর্তী সময়ে নানা সংকটের জন্ম দিয়েছে (সিরাজুল ২০১২)।

জিনিয়ালজি-১, ১৯০৫ থেকে ১৯৪৭: দ্বিজাতিতত্ত্ব ও বাঙালি মুসলমানের মোহভঙ্গের প্রাথমিক পর্ব

১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ছিল ব্রিটিশদের একটি সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক কৌশল, যার মাধ্যমে তারা হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করতে চেয়েছিল। তবে পূর্ববঙ্গের মুসলমান মধ্যবিত্তের কাছে এটি ছিল উন্নয়নের একটি সুযোগ (আহমেদ ২০১৩)। কলকাতার হিন্দু জমিদারদের শোষণ থেকে মুক্তি এবং নিজেদের প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসনের আশায় তারা বঙ্গভঙ্গকে সমর্থন করেছিল। ১৯১১ সালে এই বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর মুসলমানদের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হয়, তা পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান আন্দোলনের ভিত্তি মজবুত করে (আহমেদ ২০১৩)।

১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’ ছিল মুসলমানত্বের ওপর ভিত্তি করে একটি রাষ্ট্র নির্মাণের প্রয়াস। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, হিন্দু ও মুসলমানরা সম্পূর্ণ আলাদা দুটি জাতি এবং তাদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র প্রয়োজন। বাঙালি মুসলমানরা শুরুতে এই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল এই আশায় যে পাকিস্তান হবে তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির গ্যারান্টি (শিলা ১৯৮৬: ২১০-২১২)। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর দেখা গেল, পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের ওপর একধরনের অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদ চাপিয়ে দিচ্ছে (বদরুদ্দীন ১৯৭০: ১-১০)। ধর্মীয় ঐক্যের চেয়ে ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক শোষণ যখন বড় হয়ে দেখা দিল, তখন থেকেই বাঙালি মুসলমানের মনে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রকল্প নিয়ে মোহভঙ্গ শুরু হয়।

বাংলার মুসলিম সমাজের রাজনৈতিক ও জাতীয়তাবাদী বিবর্তনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় পরিলক্ষিত হয়। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ছিল এই প্রক্রিয়ার শুরুর দিক, যেখানে প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন লাভ এবং তৎকালীন জমিদারি শোষণ থেকে সাধারণ মুসলিমদের মুক্তি (সিরাজুল ২০১২)। এই পর্যায়ে পরিচয়ের প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছিল আঞ্চলিক ও ধর্মীয় স্বার্থ। পরবর্তী সময়ে, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময়ে লক্ষ্য পরিবর্তিত হয়ে মুসলমানদের জন্য একটি আলাদা আবাসভূমি ও রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের দিকে ধাবিত হয় (সিরাজুল ২০১২)। এই স্তরে দ্বিজাতিতত্ত্ব বা ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদই ছিল পরিচয়ের মূল ভিত্তি। তবে দেশভাগের অল্পকাল পরেই ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এক নতুন মোড় নিয়ে আসে, যেখানে প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় সাংস্কৃতিক অধিকার এবং মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা (আমিন ২০২৬)। এই পর্যায়ে ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে ভাষাগত ও নৃতাত্ত্বিক জাতীয়তাবাদই হয়ে ওঠে বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রধান নিয়ামক, যা পরবর্তী সময়ে একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি তৈরি করে।

জিনিয়ালজি-২, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন: বাঙালিত্বের দ্বিতীয় জাগরণ

ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় বিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এটি কেবল উর্দুর পরিবর্তে বাংলার রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দাবি ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লব, যা দ্বিজাতিতত্ত্বের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছিল (আমিন ২০২৬)। এই আন্দোলনের মাধ্যমেই বাঙালি মুসলমান বুঝতে পেরেছিল যে তার ধর্মীয় পরিচয় আর ভাষাগত পরিচয় পরস্পরবিরোধী নয়, বরং পরিপূরক।

আনিসুজ্জামান (২০২২) ভাষা আন্দোলনের এই রূপান্তরকে একটি সামগ্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য গ্রহণের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেন। তাঁর মতে, এই আন্দোলন হিন্দু ও মুসলমানের যৌথ অবদানে নির্মিত বাংলা সংস্কৃতিকে আপন করে নেওয়ার পথকে প্রশস্ত করেছিল। তবে এই আন্দোলনেও আদর্শিক বিভাজন ছিল। তমুদ্দিন মজলিসের মতো সংগঠনগুলো চেয়েছিল বাংলার একটি ‘ইসলামি সংস্করণ’ প্রচার করতে, যেখানে তারা ভাষার মর্যাদা চাইলেও পাকিস্তানের ইসলামি কাঠামোর মধ্যে থাকতে আগ্রহী ছিল (বদরুদ্দীন ১৯৭০)। অন্যদিকে প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী ও ছাত্ররা একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাঙালিত্বের ধারণা সামনে নিয়ে এসেছিলেন।

বদরুদ্দীন উমর ভাষা আন্দোলনকে ‘শ্রেণি লেন্সের’ মাধ্যমে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি  দেখিয়েছেন যে এই আন্দোলন কেবল শিক্ষিত মধ্যবিত্তের দাবি ছিল না, বরং এটি ছিল একটি বৈশ্বিক জনপ্রিয় কারণ, যা অভিজাত ও সাধারণ মানুষের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে দিয়েছিল। তাঁর বিশ্লেষণে, ভাষা আন্দোলন ছিল পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে প্রথম সার্থক বিদ্রোহ, যা পরবর্তী সময়ে ১৯৭১ সালের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্র তৈরি করেছিল (বদরুদ্দীন ১৯৭০)।

জিনিয়ালজি-৩, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও ধর্মনিরপেক্ষতার সাংবিধানিক ভিত্তি

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, যা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে একটি আধুনিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের মূল স্লোগান ‘জয় বাংলা’ কোনো ধর্মীয় পরিচয় বহন করত না, বরং এটি ছিল এই ভূখণ্ডের মানুষের সামগ্রিক মুক্তির প্রতীক (নুরুল ২০১৪)। স্বাধীন বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’–কে  রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এ ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ ছিল ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের অবসান ঘটানো, ধর্মহীনতা বা নাস্তিকতা নয়। অর্থাৎ ধর্মকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না। এটি ছিল একটি ‘বাঙালিত্ববাদী’ রাষ্ট্রকল্পের সূচনা, যেখানে নাগরিকের পরিচয়ে ধর্মের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় সাংস্কৃতিক পরিচয়ের।

জিনিয়ালজি-৪, ১৯৭২ সালের সংবিধানের সমালোচনা ও চ্যালেঞ্জ

তবে এই ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রকল্প শুরু থেকেই নানামুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। বদরুদ্দীন উমরের মতো বামপন্থী তাত্ত্বিকরা এই সংবিধানের সমালোচনা করে বলেছিলেন, এটি সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছে এবং এটি মূলত একটি বুর্জোয়া শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করছে। অন্যদিকে রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলো মনে করেছিল, ধর্মনিরপেক্ষতা বাঙালি মুসলমানদের তাদের ধর্মীয় শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে।

এ ছাড়া সংবিধানে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’কে যখন নাগরিকত্বের ভিত্তি করা হয়, তখন তা আদিবাসীদের (যেমন পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী) মধ্যে একটি আশঙ্কার সৃষ্টি করে (ইমরান ২০১৫)। তারা মনে করেছিল যে এই উগ্র বাঙালিত্ব তাদের নিজস্ব স্বতন্ত্র পরিচয়কে গ্রাস করে ফেলবে। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা এই সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন, যা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের পরিচয়ের রাজনীতিতে একটি বড় বিতর্কের জন্ম দেয় (ইমরান ২০১৫)।

 

জিনিয়ালজি-৫, ১৯৭৫–উত্তর পরিবর্তন এবং বুদ্ধিজীবিতা: বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনির্ভর রাজনীতির প্রত্যাবর্তন

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ আমূল বদলে যায়। জিয়াউর রহমান ১৯৭২-এর সংবিধানের সেক্যুলার ধারণার বিস্তর পরিবর্তন নিয়ে আসেন। যেখানে ধর্মনির্ভর রাজনীতি বা সংগঠন তৈরি করা সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ ছিল ৩৮ অনুচ্ছেদ দ্বারা, তার পরিবর্তন করা হয় পঞ্চম সংশোধনীর ভেতর থেকে। পাশাপাশি ৪ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিবর্তন করা হয়, যা জাতীয়তার পরিচয়কে নতুন বাঁকে নিয়ে দাঁড় করায়। অর্থাৎ জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’–এর পরিবর্তে মুসলমানিত্বকে গুরুত্ব দিয়ে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’–এর ধারণা প্রবর্তন করা হয় (কবির ১৯৮৩)। এটি ছিল মূলত একটি কৌশলগত পরিবর্তন, যার মাধ্যমে বাঙালিত্বের সঙ্গে মুসলমানত্বের একটি নতুন মেলবন্ধন তৈরির চেষ্টা করা হয়। জিয়াউর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন যে কেবল ভাষাগত পরিচয় মানুষের সব আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারছে না, তাই তিনি এর সঙ্গে ভৌগোলিক অবস্থান এবং ধর্মীয় অনুষঙ্গকে যুক্ত করেন (মনিরুজ্জামান ২০১০)।

এই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দেওয়া হয় এবং ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ যুক্ত করা হয় । পরবর্তী সময়ে এরশাদ সরকারের আমলে ইসলামকে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ হিসেবে ঘোষণা করা হয় (মনিরুজ্জামান ২০১০)। এ ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয় ক্রমাগতভাবে একটি লৈখিক ও ভাষাগত পরিচয় থেকে আবার ধর্মীয় পরিচয়ের দিকে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। একে অনেকেই ‘মুসলিম পরিচয়’–এর পুনঃপ্রতিষ্ঠা হিসেবে দেখেন, যা ১৯৭১ সালের ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার সঙ্গে দ্বান্দ্বিক অবস্থানে রয়েছে।

বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদের বিবর্তন এবং এর বিভিন্ন ধারা বিশ্লেষণ করলে তিনটি প্রধান আদর্শিক অবস্থান পরিলক্ষিত হয়। বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতিনিধিত্ব করেছেন শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগ—মূলত ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। এই জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি ছিল নৃবৈজ্ঞানিক ও ভাষাগত পরিচয়, যা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে প্রধান চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে। এর পরবর্তী পর্যায়ে জিয়াউর রহমান ও বিএনপির হাত ধরে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ সামনে আসে, যা ধর্মীয় অনুষঙ্গ, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড এবং স্বতন্ত্র ভৌগোলিক পরিচিতিকে গুরুত্ব দেয়। এটি মূলত ভৌগোলিক সীমানা এবং ধর্মীয় সংশ্লেষের মাধ্যমে একটি ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণের চেষ্টা করে। অন্যদিকে বিভিন্ন ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলোর পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলামি জাতীয়তাবাদ আরও একটি স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে বিদ্যমান, যার মূল আদর্শ হলো শরিয়াহ্‌ভিত্তিক শাসনব্যবস্থা এবং বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর ঐক্য (রীয়াজ ২০১২)। এই ধারার কাছে ভৌগোলিক বা ভাষাগত পরিচয়ের চেয়ে বিশুদ্ধ ধর্মীয় পরিচয়ই জাতীয়তাবাদের প্রধান ভিত্তি হিসেবে গণ্য হয়।

ইসলামি জনপরিসর ও নারী: তাকওয়া ও রাজনীতির রসায়ন

বাংলাদেশের উত্তর-জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রকল্পে ইসলাম কেবল একটি ব্যক্তিগত ধর্মীয় পরিচয় নয়, বরং এটি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী জনপরিসর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সামিয়া হক তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে বাংলাদেশের ইসলামি জনপরিসর কেবল উগ্রবাদ বা জঙ্গিবাদের সঙ্গে যুক্ত নয়, বরং এটি প্রতিদিনের জীবনের সংস্কৃতি ও রাজনীতির সঙ্গে মিশে আছে। বিশেষ করে নারীদের মধ্যে ‘কোরআন সার্কেল’ বা দাওয়া আন্দোলনের বৃদ্ধি প্রমাণ করে যে ধর্মীয় পরিচয় এখন মানুষের সামাজিক মর্যাদার একটি প্রধান অংশ হয়ে উঠছে (সামিয়া ২০১১)।

এই সার্কেলগুলোতে নারীরা তাদের ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুগুলো নিয়েও আলোচনা করেন। এখানে ‘পবিত্রতা’ বা ‘তাকওয়া’ অর্জনের আকাঙ্ক্ষা অনেক সময় রাজনৈতিক চেতনার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় (সামিয়া ২০১১)। এ ধরনের ধর্মীয় চর্চা কোনো প্রথাগত রাজনৈতিক দলের অধীন নয়, বরং এটি মানুষের ব্যক্তিগত এবং সামাজিক জীবনের একটি ‘ধর্মীয়করণ’ প্রক্রিয়া, যা আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সমান্তরালে নিজের এক শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে।

পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের বাঙালি মুসলমান: এক অদৃশ্য দেয়াল

বাঙালি মুসলমানদের পরিচয় নির্মাণের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের অবস্থান প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এই সম্প্রদায়কে দুই ভাগে বিভক্ত করে ফেলেছিল। বাংলাদেশের মুসলমানরা রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা পেলেও পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা সেখানে একটি ভাষাগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিসেবে টিকে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত হয় (জয়া ২০০৭)।

নব্য-উদারবাদী বিশ্বায়নের যুগে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু বাঙালিরা অনেক সময় তাদের নিজস্ব ভাষাগত পরিচিতির চেয়ে হিন্দি বা ইংরেজি ভাষার হেজিমনি বা আধিপত্যকে গ্রহণ করছে। অন্যদিকে সেখানে বাঙালি মুসলমানদের প্রায়ই ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ হিসেবে তকমা দেওয়া হয়, যা তাদের পরিচয়কে সংকটের মুখে ঠেলে দেয় (জয়া ২০০৭)। বাংলাদেশের মুসলমানদের কাছে বাংলা ভাষা যেখানে রাষ্ট্রীয় গৌরবের প্রতীক, পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের কাছে তা অনেক সময় প্রান্তিকতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই বৈষম্যটি প্রমাণ করে যে জাতীয়তাবাদ কেবল ঐক্য তৈরি করে না, বরং এটি আন্তসীমানা পরিচয়ের মাঝে এক গভীর প্রাচীরও তৈরি করে।

বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মুসলমানদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান বিশ্লেষণ করলে এক বৈচিত্র্যপূর্ণ পার্থক্যের চিত্র ফুটে ওঠে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাঙালি মুসলমানরা দেশের সংখ্যাগুরু ও শাসক শ্রেণি, যেখানে তাদের নিজস্ব রাষ্ট্রীয় সত্তা রয়েছে (জয়া ২০০৭)। এখানে বাংলা ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং তা রাষ্ট্রভাষা ও জাতীয় গর্বের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। তবে পরিচয়ের ক্ষেত্রে এখানে প্রায়ই ‘বাঙালি’ বনাম ‘বাংলাদেশি’ আদর্শিক দ্বন্দ্ব পরিলক্ষিত হয়। সাংস্কৃতিক চর্চার ক্ষেত্রে তারা ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে, যা তাদের আত্মপরিচয়কে সুসংহত করেছে।

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মুসলমানরা ভারতের একটি ধর্মীয় ও ভাষাগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠী হিসেবে বসবাস করে। সেখানে তাদের ভাষাগত চেতনা অনেক সময় প্রান্তিক এবং মূলধারার রাজনীতিতে অবহেলিত থেকে যায়। পরিচয়ের সংকটের ক্ষেত্রে তাদের প্রায়ই ‘ভারতীয়’ বনাম ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ তকমার মতো নেতিবাচক রাজনৈতিক প্রচারণার মোকাবিলা করতে হয়। এই প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে তাদের সাংস্কৃতিক চর্চা অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত এবং নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার তাগিদে অনেকটা আত্মরক্ষামূলক চরিত্র ধারণ করে।

বাবু সংস্কৃতির উদ্ভব ও ভদ্রলোক শ্রেণির গঠন: অদৃশ‍্য দেয়াল নির্মাণের রাজনৈতিক অর্থনীতি

পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের বাংলাভাষীদের ভেতর দেয়াল নির্মাণের প্রেক্ষাপট নির্মিত হয় উনিশ শতকে। এ শতকের বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো ‘বাবু সংস্কৃতি’। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রত্যক্ষ প্রভাবে কলকাতাকেন্দ্রিক যে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব ঘটেছিল, তাদের জীবনধারা, মূল্যবোধ এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিই মূলত এই সংস্কৃতির ভিত্তি (সুমিত ২০২৪) । তবে এই বাবু সংস্কৃতি কেবল হিন্দু ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি বাংলার মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরীণ শ্রেণিবিভাগ এবং পরবর্তীকালে ‘ঘটি’ ও ‘বাঙাল’ বিভাজনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিন্যাসেও গভীর প্রভাব ফেলেছিল (মুরশিদ ২০০৩)। বাংলার মুসলিম সমাজের একটি বড় অংশ যখন ঔপনিবেশিক আধুনিকতাকে গ্রহণ করতে শুরু করে, তখন তাদের মধ্যেও একটি ‘ভদ্রলোক’ বা ‘বাবু’ সুলভ আচরণের বিকাশ ঘটে, যা মূলত পশ্চিম বাংলার (ঘটি) এবং পূর্ব বাংলার (বাঙাল) মুসলিমদের মধ্যে সামাজিক ও রাজনৈতিক দূরত্বের সৃষ্টি করে (খান ২০১৭)। এই প্রতিবেদন বাংলার মুসলিম সমাজের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক রাজনীতিতে বাবু সংস্কৃতির বহুমুখী প্রভাব এবং ঘটি-বাঙাল দ্বৈরথের প্রেক্ষাপটকে বিশ্লেষণ করে।

বাবু সংস্কৃতির শিকড় নিহিত রয়েছে আঠারো ও উনিশ শতকের ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে। মূলত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩) ফলে বাংলার গ্রামীণ সমাজে এক নতুন ভূস্বামী শ্রেণির উদ্ভব ঘটে, যারা কৃষিকাজ থেকে দূরে থেকে শহরে বাস করতে পছন্দ করত (সিরাজুল ২০১৫)। এই শ্রেণিটিই মূলত ‘ভদ্রলোক’ হিসেবে পরিচিতি পায়, যাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল পাশ্চাত্য শিক্ষা, ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা এবং কায়িক শ্রমের প্রতি তীব্র ঘৃণা (সিরাজুল ২০১৫)।

উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক বাংলায় ‘বাবু’ বা ‘ভদ্রলোক’ সংস্কৃতি ছিল একটি বিশেষ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ধারা, যার মূলে ছিল ইংরেজি শিক্ষা এবং পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি গভীর অনুরাগ। হিন্দু কলেজ ও সংস্কৃত কলেজের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এই নতুন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। এই শ্রেণির মানুষ প্রথাগত শিক্ষার চেয়ে পাশ্চাত্য সাহিত্য, দর্শন ও আধুনিক বিজ্ঞানচর্চায় বেশি আগ্রহী ছিলেন, যা তাঁদের চিন্তাধারায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল।

পেশাগত ও অর্থনৈতিক অবস্থানের ক্ষেত্রে এই বাবুরা মূলত ব্রিটিশ প্রশাসনের অধীনে কেরানিগিরি, আইন ব্যবসা বা ওকালতির মতো পেশায় নিয়োজিত ছিলেন (জওহার ২০১৯)। আবার অনেকের আয়ের প্রধান উৎস ছিল বংশানুক্রমিক জমিদারির খাজনা, যা তাদের কায়িক পরিশ্রম ছাড়াই সচ্ছল ও বিলাসী জীবনযাপনের নিশ্চয়তা দিত। তাদের জীবনধারায় এই সচ্ছলতার প্রভাব ছিল সুস্পষ্ট; পোশাকে কোট-প্যান্টের মতো পাশ্চাত্য রুচির অনুসরণ, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এবং প্রদর্শনীমূলক বিলাসিতা তাদের প্রাত্যহিক জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল (জওহার ২০১৯)।

সামাজিক মূল্যবোধের দিক থেকে এই শ্রেণিটি নিজেদের একটি আলাদা আভিজাত্য বা ‘জেন্টেলিটি’-এর আবরণে ঢেকে রাখত (জওহার ২০১৯)। তারা সর্বদা সাধারণ শ্রমজীবী বা নিম্নবিত্ত মানুষের থেকে নিজেদের শ্রেষ্ঠ ভাবত এবং তথাকথিত 'ছোটলোক' শ্রেণি থেকে একটি নির্দিষ্ট সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখত। এই আভিজাত্যবোধ এবং পাশ্চাত্য ও দেশীয় সংস্কৃতির এক অদ্ভুত মিশ্রণই ছিল বাবু বা ভদ্রলোক সংস্কৃতির প্রধান রূপরেখা।

বাবু সংস্কৃতি ছিল মূলত ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক অদ্ভুত মিশ্রণ। একদিকে তারা পাশ্চাত্য রীতিনীতি গ্রহণ করছিল, অন্যদিকে নিজস্ব কুলীন প্রথা ও ধর্মীয় মূল্যবোধকেও টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট ছিল। এই সংস্কৃতির প্রভাবে বাংলায় শিক্ষা এবং সমাজ সংস্কারের জোয়ার আসে, যা ‘বেঙ্গল রেনেসাঁ’ বা বাংলার নবজাগরণ হিসেবে পরিচিত (জওহার ২০১৯)। তবে এই নবজাগরণ ছিল মূলত উচ্চবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা মুসলিম সমাজকে দীর্ঘকাল এই মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে।

মুসলিম সমাজে বাবু সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ: আশরাফ-আতরাফ দ্বন্দ্ব

বাংলার মুসলিম সমাজ ঐতিহাসিকভাবেই আশরাফ (অভিজাত বা বিদেশি বংশোদ্ভূত) এবং আতরাফ বা আজলাফের (নিম্নবিত্ত বা স্থানীয় ধর্মান্তরিত মুসলিম) মতো দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত ছিল। বাবু সংস্কৃতির প্রভাব যখন মুসলিম সমাজে পড়তে শুরু করে, তখন এই শ্রেণিবিভাগ আরও প্রকট হয়ে ওঠে।

আশরাফ শ্রেণির আভিজাত্য ও ‘বাবু’সুলভ আচরণ: আশরাফ মুসলিমরা মূলত নিজেদের আরব, পারস্য বা তুর্কি বংশোদ্ভূত বলে দাবি করত এবং তারা উর্দু ও ফারসি সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরে ছিল (আনসারি ১৯৬০)। ব্রিটিশ শাসনের শুরুতে এই শ্রেণিটি তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা হারায় এবং সামাজিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তবে উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে নওয়াব আবদুল লতিফের মতো নেতাদের নেতৃত্বে মুসলিমদের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ঘটে, যার ফলে একটি মুসলিম ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণির উদ্ভব হয়।

এই নতুন মুসলিম বাবুরা হিন্দুদের মতো পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণ করলেও তাদের সাংস্কৃতিক শিকড় ছিল উর্দু ভাষায়। তারা কায়িক শ্রমকে ঘৃণা করত এবং প্রশাসনিক চাকরিতে হিন্দুদের সমকক্ষ হওয়ার চেষ্টা করত। এর ফলে মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরে একটি গভীর ফাটল তৈরি হয়। আশরাফরা নিজেদের আভিজাত্য প্রমাণের জন্য নারীদের পর্দার কড়াকড়ি এবং বিশুদ্ধ ধর্মীয় আচরণের ওপর জোর দিত, যা ছিল মূলত তাদের সামাজিক শ্রেষ্ঠত্ব টিকিয়ে রাখার একটি কৌশল।

আতরাফ বা বাঙালি মুসলিমের প্রান্তিকতা: অন্যদিকে বাংলার বিশাল কৃষকসমাজ, যারা মূলত বাঙালি মুসলিম হিসেবে পরিচিত ছিল, তারা উভয় বাবু সংস্কৃতি বা আশরাফ আভিজাত্য থেকেই বিচ্ছিন্ন ছিল (রফিউদ্দিন ১৯৯৬)। তারা বাংলায় কথা বলত এবং তাদের জীবনযাত্রা ছিল অনেক বেশি লোকজ সংস্কৃতির কাছাকাছি। ১৮৭১ সালের আদমশুমারিতে ব্রিটিশরা যখন মুসলিমদের ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা করতে শুরু করে, তখন এই বাঙালি মুসলিমদের ওপর ‘ধর্মান্তরিত নিম্নবর্ণের হিন্দু’ তকমা সেঁটে দেওয়া হয় (রফিউদ্দিন ১৯৯৬)। এই তকমাটি আশরাফ মুসলিমদের মনে একধরনের শ্রেষ্ঠত্ববোধ তৈরি করে এবং তারা সাধারণ বাঙালি মুসলিমদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করে।

ঘটি এবং বাঙাল মুসলিম: ভৌগোলিক বিভাজন ও সাংস্কৃতিক রাজনীতি

বাংলার মুসলিমদের মধ্যে ‘ঘটি’ ও ‘বাঙাল’ বিভাজনটি কেবল ভৌগোলিক ছিল না, বরং এর পেছনে কাজ করেছে দীর্ঘদিনের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিবর্তন। পশ্চিম বাংলার মুসলিমরা (ঘটি) মূলত কলকাতাকেন্দ্রিক বাবু সংস্কৃতির সরাসরি সংস্পর্শে এসেছিল, যেখানে পূর্ব বাংলার মুসলিমরা (বাঙাল) ছিল অনেক বেশি কৃষিপ্রধান এবং লোকজ সংস্কৃতির ধারক (ইয়ামিন ২০২৩)।

ঘটি মুসলিম ও কলকাতার বাবুয়ানা: কলকাতায় বসবাসকারী উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মুসলিমরা মূলত ‘ঘটি’ সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত ছিল। তারা কলকাতার অভিজাত পাড়ায় বসবাস করত এবং তাদের আচরণে একধরনের নাগরিক শ্রেষ্ঠত্ববোধ ছিল (ইয়ামিন ২০২৩)। ঘটি মুসলিমদের মধ্যে একটি বড় অংশ ছিল উর্দুভাষী আশরাফ, যারা বাঙালি মুসলিমদের ‘প্রকৃত মুসলিম’ হিসেবে গণ্য করতে দ্বিধা করত। এই শ্রেণির মুসলিমরা ব্রিটিশদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে প্রশাসনিক চাকরিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করত।

ঘটি মুসলিমদের খাদ্যাভ্যাস ও পোশাক-পরিচ্ছদেও বাবু সংস্কৃতির প্রভাব ছিল স্পষ্ট। তারা পোলাও, বিরিয়ানি ও কোফতার মতো মোগলাই খাবারের ভক্ত ছিল, যা ছিল তাদের আভিজাত্যের প্রতীক। বিপরীতে সাধারণ বাঙালি মুসলিমের মাছ-ভাতের সংস্কৃতিকে তারা কিছুটা নিম্নমানের মনে করত।

বাঙাল মুসলিম ও কৃষিভিত্তিক পরিচয়: পূর্ব বাংলার মুসলিমরা বা ‘বাঙাল’ মুসলিমরা ছিল মূলত কৃষিভিত্তিক সমাজের অংশ। তাদের মধ্যে বাবু সংস্কৃতির প্রভাব ছিল সীমিত এবং তারা অনেক বেশি লড়াকু ও পরিশ্রমী হিসেবে পরিচিত ছিল বলে জানা যায় (হাশমি ১৯৯৭)। বাঙাল মুসলিমদের ভাষা ছিল আঞ্চলিক বাংলা, যা কলকাতার ‘ভদ্রলোক’ বাংলায় কথা বলা ঘটিদের কাছে ‘অমার্জিত’ ও ‘কর্কশ’ মনে হতো (হাশমি ১৯৯৭)।

পূর্ব বাংলার মুসলিমদের মধ্যে ফরায়েজি ও ওহাবি আন্দোলনের মতো ধর্মীয় আন্দোলনগুলো গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যা তাদের মধ্যে একধরনের স্বাতন্ত্র্যবোধ এবং হিন্দু জমিদারদের বিরুদ্ধে লড়াই করার মানসিকতা তৈরি করে। এই রাজনৈতিক চেতনাটিই পরবর্তী সময়ে কৃষক প্রজা পার্টি (কেপিপি) এবং ফজলুল হকের রাজনীতির ভিত্তি হিসেবে কাজ করে বলে মনে করা হয়।

 

ঘটি-বাঙাল ফুটবল, মাছ এবং খাদ্যাভ্যাস প্রতিদ্বন্দ্বিতা: ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর যখন পূর্ব বাংলার বিশালসংখ্যক হিন্দু শরণার্থী পশ্চিম বাংলায় আশ্রয় নেয়, তখন ‘ঘটি’ ও ‘বাঙাল’ এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা মুসলিম সমাজ থেকে হিন্দু সমাজেও প্রবলভাবে ছড়িয়ে পড়ে (অরুনশুভ্র ২০১৯)। তবে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার শিকড় মুসলিমদের সামাজিক রাজনীতিতেও একইভাবে কাজ করেছে।

বাঙালি সংস্কৃতির এক চিরন্তন ও মুখরোচক দ্বৈরথের নাম হলো ‘ঘটি’ (পশ্চিমবঙ্গ) বনাম ‘বাঙাল’ (পূর্ববঙ্গ) লড়াই। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার সবচেয়ে বড় মঞ্চ হলো ফুটবল মাঠ, যেখানে ঘটিদের আবেগের নাম মোহনবাগান আর বাঙালদের রক্তে খেলে ইস্ট বেঙ্গল। এ দুই ক্লাবের লড়াই কেবল খেলার মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা ছড়িয়ে পড়ে বাঙালির হেঁশেল পর্যন্ত। ঘটিরা যেখানে গলদা বা বাগদা চিংড়ির মালাইকারিতে মজে থাকে, বাঙালদের কাছে পদ্মার রুপালি ইলিশ হলো শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক।

খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রেও এ দুই গোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে স্পষ্ট বিভাজন; ঘটিদের রান্নায় সাধারণত চিনির আধিক্য এবং ঝালের পরিমিত ব্যবহার দেখা যায়, যাকে অনেকেই ‘মিষ্টি ও মার্জিত’ ঘরানা বলে মনে করেন। অন্যদিকে বাঙালরা পছন্দ করে কড়া মসলা, প্রচুর ঝাল ও শুঁটকি মাছের মতো তীব্র স্বাদের খাবার (অরুনশুভ্র ২০১৯)। আচরণগত দিক থেকেও এ দুই শ্রেণির মানুষের মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য লক্ষ করা যায়। ঘটিদের সাধারণত কিছুটা রক্ষণশীল, ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছুক এবং ‘পলিসড’ বা মার্জিত হিসেবে দেখা হয়। বিপরীতে বাঙালরা পরিচিত তাদের দুঃসাহসী মনোভাব, উচ্চকণ্ঠ এবং যেকোনো বিষয়ে সোজাসাপ্টা ও লড়াকু মানসিকতার জন্য। এই বৈচিত্র্যময় লড়াই বাঙালির আত্মপরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য ও আনন্দময় অংশ।

এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেবল ঠাট্টা-তামাশার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল একধরনের ‘সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই’। ঘটিরা বাঙালদের ‘অশিক্ষিত চাষা’ হিসেবে উপহাস করত, অন্যদিকে বাঙালরা ঘটিদের ‘কুঁড়ে’ ও ‘হাড়কিপটে’ হিসেবে অভিহিত করত (অরুনশুভ্র ২০১৯)। মুসলিম রাজনীতিতে এই বিভাজন ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি (বাঙালকেন্দ্রিক) এবং মুসলিম লীগের (আশরাফ ও ঘটিকেন্দ্রিক) মধ্যে ক্ষমতার লড়াইয়ে প্রতিফলিত হয়েছিল (দ‍্য ডেইলি স্টার ২০২০)।

ঢাকার নওয়াব পরিবার: মুসলিম বাবু সংস্কৃতির একটি উদাহরণ

ঢাকার নওয়াব পরিবার ছিল পূর্ব বাংলার মুসলিমদের মধ্যে বাবু সংস্কৃতির এক অনন্য প্রতিনিধি। যদিও তারা পূর্ব বাংলায় বসবাস করত, কিন্তু তাদের জীবনযাত্রা ছিল মোগল আভিজাত্য এবং ব্রিটিশ নাগরিক সংস্কৃতির এক সংমিশ্রণ (মুনতাসীর ২০১৭)।

নওয়াব আব্দুল গণি ও নওয়াব আহসানউল্লাহ ঢাকার আধুনিকায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁরা ঢাকায় পানীয় জলের ব্যবস্থা, স্কুল, মাদ্রাসা ও হাসপাতাল স্থাপন করেন (মুনতাসীর ২০১৭)। নওয়াব পরিবারের সদস্যরা ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁরা ব্রিটিশদের সঙ্গে নিয়মিত মেলামেশা করতেন (মুনতাসীর ২০১৭)। তাঁদের বাসভবন ‘আহসান মঞ্জিল’ ছিল একাধারে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু এবং আভিজাত্যের প্রতীক (মুনতাসীর ২০১৭)।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, নওয়াব পরিবার সুন্নি মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও শিয়াদের মহরম উৎসবের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন (আনাস ২০২৬)। তাঁরা উর্দু ও ফারসি সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন, যা ছিল মূলত আশরাফ সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ। তবে তাঁরা ঢাকার স্থানীয় ‘পঞ্চায়েত’ ব্যবস্থাকেও সুসংগঠিত করেছিলেন, যা সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁদের একটি সংযোগ তৈরি করেছিল (মুনতাসীর ২০১৭)। নওয়াব সলিমুল্লাহ ১৯০৬ সালে ‘নিখিল ভারত মুসলিম লীগ’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই অভিজাত মুসলিমদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন (মুনতাসীর ২০১৭)।

মুসলিম রাজনীতিতে বাবু সংস্কৃতির প্রভাব: কৃষক বনাম ভূস্বামী

বাংলার মুসলিম রাজনীতি বিশ শতকের শুরুতে মূলত দুটি ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। একদিকে ছিল শিক্ষিত উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যারা বাবু সংস্কৃতির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ব্রিটিশদের থেকে সুযোগ-সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করত। অন্যদিকে ছিল বিশাল কৃষক সমাজ, যাদের কাছে বাবু সংস্কৃতি ছিল শোষণের প্রতীক।

কৃষক প্রজা পার্টি এবং ফজলুল হকের উত্থান: শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন কৃষক প্রজা পার্টি ছিল বাঙাল মুসলিমদের কণ্ঠস্বর। তারা জমিদারি প্রথার বিলোপ এবং কৃষকদের ঋণমুক্ত করার দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলে (সাজেন ২০২০)। ফজলুল হক নিজে একজন শিক্ষিত আইনজীবী ও ‘ভদ্রলোক’ হওয়া সত্ত্বেও তিনি সাধারণ কৃষকদের ভাষায় কথা বলতে পারতেন, যা তাঁকে জনপ্রিয় করে তোলে। বাঙাল মুসলিমদের কাছে তিনি ছিলেন তাদের নিজেদের মানুষ, যিনি কলকাতার ঘটি ও আশরাফ মুসলিমদের একচেটিয়া আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন (বণিক বার্তা ২০২৫)।

মুসলিম লীগ ও আশরাফ রাজনীতির সীমাবদ্ধতা: অন্যদিকে মুসলিম লীগ প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল মূলত কলকাতার আশরাফ মুসলিম এবং ঢাকার নওয়াব পরিবারের মতো ভূস্বামীদের সংগঠন। জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ যখন দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তানের দাবি তোলে, তখন তারা মূলত একটি ধর্মীয় সংহতি তৈরি করতে চেয়েছিল, যা মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরীণ শ্রেণিবিভাগকে ধামাচাপা দেয় (ইশতিয়াক ২০১৩)। কিন্তু এই আন্দোলনের ভেতরেও ঘটি ও বাঙাল মুসলিমদের মধ্যে একধরনের টানাপোড়েন ছিল। ঘটি মুসলিমরা যেখানে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পদগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে চেয়েছিল, বাঙাল মুসলিমরা সেখানে একটি ‘কৃষক স্বর্গ’ বা ইউটোপিয়ার স্বপ্ন দেখেছিল (জয়া ২০০৭: ৫০-৫৫)।

দেশভাগ-পরবর্তী প্রেক্ষাপট: ঘটি মুসলিমদের প্রান্তিকীকরণ এবং বাঙাল মুসলিমদের রূপান্তর

১৯৪৭ সালের দেশভাগ বাংলার মুসলিম সমাজের মানচিত্র পুরোপুরি বদলে দেয়। পশ্চিম বাংলার মুসলিমরা (ঘটি) সংখ্যালঘু হিসেবে ভারতে থেকে যায় আর পূর্ব বাংলার মুসলিমরা (বাঙাল) পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

পশ্চিম বাংলায় ঘটি মুসলিমদের ‘অদৃশ্য’ হওয়া: পশ্চিম বাংলার ঘটি মুসলিমরা দেশভাগের পর এক চরম সংকটের মুখে পড়ে। কলকাতার শিক্ষিত মুসলিমদের একটি বড় অংশ পাকিস্তানে চলে যায়, যার ফলে পশ্চিম বাংলার মুসলিম সমাজ নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে। যারা থেকে গিয়েছিল, তারা একদিকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রান্তিকতার শিকার হয়।

বর্তমানে পশ্চিম বাংলার মুসলিমদের ৯০ শতাংশই দরিদ্র এবং গ্রামীণ জীবন যাপন করেন (এশা ২০১৬)। কলকাতার ‘ভদ্রলোক’ হিন্দু সমাজ এদের প্রায়ই ‘অশিক্ষিত’ বা ‘বাঙালি মুসলিম’ হিসেবে উপেক্ষা করে এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত করে একধরনের ‘ঘৃণা’ বা ‘অস্বস্তি’ প্রকাশ করে (এশা ২০১৬)। ঘটি মুসলিমদের এই করুণ দশা মূলত বাবু সংস্কৃতির সেই এলিট অংশটি চলে যাওয়ার ফল, যারা একসময় মুসলিম সমাজের সামাজিক ও রাজনৈতিক সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করত (এশা ২০১৬)।

বাংলাদেশে বাঙাল মুসলিমের ‘ভদ্রলোক’ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা: অন্যদিকে বাংলাদেশে বাঙাল মুসলিমরা রাষ্ট্রক্ষমতা পাওয়ার পর নিজেদের এক নতুন ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণি হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করে। পাকিস্তান আমলে তারা যখন পশ্চিম পাকিস্তানিদের দ্বারা ভাষাগত ও সাংস্কৃতিকভাবে শোষিত হচ্ছিল, তখন তারা তাদের ‘বাঙালি’ পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিল। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে এই বাঙাল মুসলিমরাই আবার ক্ষমতার কেন্দ্রে এসে নিজেদের মধ্যে ঘটিদের মতো একধরনের বাবু সংস্কৃতি ও আভিজাত্যের চর্চা শুরু করে (এশা ২০১৬)।

বাংলাদেশে বর্তমানে ‘ধর্মীয় আধুনিকতা’ বনাম ‘ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ’-এর যে লড়াই চলছে, তা মূলত সেই পুরোনো বাবু সংস্কৃতিরই আধুনিক সংস্করণ। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলিম আজ নিজেকে এমনভাবে তুলে ধরতে চায়, যা একদিকে আধুনিক ও বৈশ্বিক, আবার অন্যদিকে ধর্মীয়ভাবেও সচেতন।

 

শিল্প ও সাহিত্যে ঘটি-বাঙাল ও বাবু সংস্কৃতি

বাংলার শিল্প ও সাহিত্যে ঘটি-বাঙাল প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বাবু সংস্কৃতির প্রভাব এক দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে গেছে। এই শ্রেণির দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র থেকে শুরু করে মীর মোশাররফ হোসেনের লেখাতেই।

আধুনিক সাহিত্যে আফসার আহমেদের মতো লেখকেরা পশ্চিম বাংলার মুসলিমদের জীবনের জটিলতা ও বাবু সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরেছেন। তাঁর লেখায় উঠে আসে কীভাবে একজন বাঙালি মুসলিম একই সঙ্গে তার ধর্মীয় পরিচয় এবং আঞ্চলিক বাঙালি পরিচয়ের মধ্যে সমন্বয় করার চেষ্টা করে। এটি মূলত সেই ‘ভদ্রলোক’ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং প্রান্তিকতার বাস্তবতার মধ্যবর্তী এক লড়াই।

সিনেমায় মুসলিমদের অনুপস্থিতি ও কার্টুন চরিত্রের রূপায়ণ

দেশভাগ-পরবর্তী ‘সুবর্ণ যুগে’ সত্যজিৎ রায় বা মৃণাল সেনের মতো পরিচালকদের ছবিতে মুসলিমদের উপস্থিতি ছিল নামমাত্র। তাঁরা মূলত হিন্দু ভদ্রলোক সমাজের সমস্যা ও নবজাগরণ নিয়েই কাজ করেছেন। যখনই মুসলিমদের দেখানো হয়েছে, তারা হয় প্রান্তিক চরিত্র, নতুবা কোনো অভিজাত পরিবারের বিশ্বস্ত অনুগত ভৃত্য।

তবে ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকের বাণিজ্যিক সিনেমায় ঘটি-বাঙাল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয় বিষয়। ‘ওরা থাকে ওধারে’ বা ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এর মতো ছবিতে ঘটি ও বাঙাল পরিবারের মধ্যকার ঝগড়া, খাদ্যাভ্যাস নিয়ে বিদ্রূপ এবং শেষ পর্যন্ত প্রেমের মাধ্যমে মিলনের যে চিত্র দেখা যায়, তা ছিল মূলত দেশভাগের ক্ষত নিরাময়ের একটি শৈল্পিক প্রচেষ্টা। বাঙাল চরিত্রে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাস্যরসাত্মক অভিনয় সাধারণ মানুষের কাছে বাঙাল পরিচয়কে একধরনের ‘লড়াকু ও বুদ্ধিদীপ্ত’ মাত্রা দিয়েছিল।

বাবু সংস্কৃতির স্থায়ী উত্তরাধিকার

বাবু সংস্কৃতি বাংলার মুসলিম সমাজের ওপর এক গভীর ও স্থায়ী প্রভাব ফেলে গেছে। এটি কেবল জীবনযাত্রার ধরন বদলে দেয়নি, বরং মুসলিমদের মধ্যে এমন এক শ্রেণিবিভাগ তৈরি করেছে, যা আজও ঘটি-বাঙাল বা আশরাফ-আতরাফ বিতর্কের মাধ্যমে টিকে আছে। বাবু সংস্কৃতির দেওয়া সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর ফসল মূলত ঘটি মুসলিমদের আভিজাত্যের গর্ব এবং বাঙাল মুসলিমদের লড়াকু মানসিকতা।

বর্তমানে বিশ্বায়নের যুগে ইংরেজি ও হিন্দি ভাষার আধিপত্য বাংলার আঞ্চলিক ডায়ালেক্ট বা উপভাষাগুলোকে প্রান্তিক করে দিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ঘটি ও বাঙাল মুসলিমদের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষা করা এবং একই সঙ্গে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা। বাবু সংস্কৃতির যে এলিট মানসিকতা একসময় মুসলিম সমাজকে বিভক্ত করেছিল, আজ হয়তো সেই বিভাজন কাটিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাঙালি পরিচয় গড়ে তোলা সময়ের দাবি। ঘটি মুসলিমের পরিশীলিত ভাষা এবং বাঙাল মুসলিমের অকৃত্রিম প্রাণশক্তি যদি একে অপরের পরিপূরক হতে পারে, তবেই বাংলার মুসলিম সংস্কৃতি তার হারানো গৌরব ফিরে পেতে সক্ষম হবে।

 

বাঙালির জিনতাত্ত্বিক ডিএনএর নতুন পরিচয়

দক্ষিণ এশিয়ার জনতত্ত্বের ভিত্তি মূলত দুটি প্রধান আদিম জনগোষ্ঠী—‘অ্যানসেস্ট্রাল নর্থ ইন্ডিয়ানস (এএনআই)’ এবং ‘অ্যানসেস্ট্রাল সাউথ ইন্ডিয়ানস (এএসআই)’। এএনআই গোষ্ঠীটি মূলত মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে জেনেটিক্যালি সম্পর্কিত, যারা প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করেছিল। অন্যদিকে এএসআই গোষ্ঠীটি উপমহাদেশের আদিম শিকারি-সংগ্রাহক জনগোষ্ঠীর উত্তরসূরি, যারা হাজার হাজার বছর ধরে এই ভূখণ্ডে বসবাস করছিল (রেইখ ও অন্যান্য ২০০৯)।

বাঙালি জনগোষ্ঠীর জেনেটিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে এএনআই এবং এএসআই উভয় উপাদানেরই উল্লেখযোগ্য মিশ্রণ রয়েছে। তবে উত্তর ভারতের জনগোষ্ঠীর তুলনায় বাঙালিদের মধ্যে এএনআই উপাদানের মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম এবং এএসআই উপাদানের আধিক্য লক্ষ করা যায়। এই বিশেষ জেনেটিক ভারসাম্য প্রমাণ করে যে আর্য অভিবাসন যখন উত্তর ভারতে জনতাত্ত্বিক কাঠামো বদলে দিচ্ছিল, তখন বাংলার দুর্গম জলাভূমি ও ঘন জঙ্গল একধরনের ‘জেনেটিক রিজার্ভয়ার’ হিসেবে কাজ করেছে, যা আদিম ভারতীয় বংশধারাগুলোকে অনেকটা সংরক্ষিত রেখেছে (মুরজানি ও অন্যান্য ২০১৩)।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান জেনেটিক উপাদানসমূহের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য

দক্ষিণ এশিয়ার মানবগোষ্ঠীর জেনেটিক গঠন মূলত বিভিন্ন প্রাচীন জনস্রোতের এক জটিল সংমিশ্রণ। বাঙালিদের নৃতাত্ত্বিক ও জেনেটিক পরিচয় বুঝতে হলে এই প্রধান উপাদানগুলোর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য জানা অত্যন্ত জরুরি। নিচে এই উপাদানগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

অ্যানসেস্ট্রাল নর্থ ইন্ডিয়ানস: অ্যানসেস্ট্রাল নর্থ ইন্ডিয়ানস বা এএনআই মূলত মধ্য এশিয়া, পশ্চিম ইউরেশিয়া ও ককেশাস অঞ্চলের আদিবাসীদের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই জেনেটিক উপাদানটি দক্ষিণ এশিয়ায় ভাষা ও সংস্কৃতির প্রসারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাঙালিদের ক্ষেত্রে এর প্রভাবের প্রকৃতি কিছুটা মিশ্র; সাধারণত উচ্চবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে এই উপাদানের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি দেখা গেলেও, সামগ্রিকভাবে বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে এটি একটি মাঝারি মাত্রায় বিদ্যমান। এটি দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আমাদের ঐতিহাসিক সংযোগকে নির্দেশ করে।

অ্যানসেস্ট্রাল নর্থ ইন্ডিয়ানস: অ্যানসেস্ট্রাল নর্থ ইন্ডিয়ানস বা এএসআই উপাদানের মূল উৎস হলো দক্ষিণ এশিয়ার আদিম শিকারি-সংগ্রাহক জনগোষ্ঠী। একে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রাচীন ও মৌলিক জেনেটিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ উপাদানটি মূলত দ্রাবিড় ভাষাগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত। বাঙালিদের মধ্যে, বিশেষ করে গ্রামীণ সাধারণ জনপদ এবং বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জেনেটিক বিন্যাসে এএসআইয়ের প্রভাব অত্যন্ত প্রবল। এটি আমাদের মাটির সঙ্গে হাজার বছরের আদিম ও অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের প্রমাণ দেয়।

অ্যানসেস্ট্রাল অস্ট্রো–এশিয়াটিক: অ্যানসেস্ট্রাল অস্ট্রো–এশিয়াটিক বা এএএ উপাদানটি দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে একটি অনন্য মাত্রা যোগ করে। এর মূল উৎস দক্ষিণ চীন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। ঐতিহাসিকভাবে এটি এই অঞ্চলে ধান চাষের প্রসারের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বাঙালিদের জেনেটিক গঠনে এই উপাদানের উপস্থিতি আমাদের একটি বিশেষ স্বাতন্ত্র্য দান করেছে, যা উত্তর ভারতের অনেক জনগোষ্ঠীতে দেখা যায় না। মুন্ডা বা সাঁওতালদের ভাষার সঙ্গে এএএ উপাদানের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে এবং বাঙালির খাদ্যাভ্যাস ও লোকসংস্কৃতির অনেক গভীরে এর প্রভাব বিদ্যমান।

অ্যানসেস্ট্রাল তিবেতো–বার্মান: অ্যানসেস্ট্রাল তিবেতো–বার্মান বা এটিবি উপাদানটি মূলত তিব্বত, হিমালয় অঞ্চল এবং মিয়ানমার থেকে আসা জনস্রোতের পরিচয় বহন করে। এই উপাদান তিব্বতি-বর্মন ভাষাগোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। বাংলার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে, বিশেষ করে পূর্ববঙ্গ (বর্তমান বাংলাদেশ) এবং উত্তরবঙ্গের মানুষের মধ্যে এই জেনেটিক উপাদানের উল্লেখযোগ্য প্রভাব লক্ষ করা যায়। হিমালয়ের পাদদেশ এবং পূর্ব সীমান্তের পার্বত্য অঞ্চল থেকে আসা এই সংমিশ্রণ বাঙালির শারীরিক বৈশিষ্ট্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

বাঙালি জাতিগতভাবে মূলত এই চারটি প্রধান জেনেটিক উপাদানের এক সার্থক সমন্বয়, যা আমাদের ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে (জিওয়ানি ২০২৩)।

এই উপাদানের বাইরেও বাঙালিদের মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জেনেটিক উপাদান হলো অস্ট্রো-এশীয় (Austroasiatic) বংশধারা। চার হাজার থেকে দুই হাজার খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মাঝামাঝি সময়ে দক্ষিণ চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আগত এ গোষ্ঠীই বাংলার বদ্বীপে ধান চাষের প্রচলন করেছিল। আধুনিক বাঙালিদের মধ্যে ‘এম৯৫’ মাইটোকন্ড্রিয়াল হ্যাপ্লোগ্রুপের উপস্থিতি এই আদি অস্ট্রো-এশীয় প্রভাবের শক্তিশালী প্রমাণ বহন করে (মুরজানি ও অন্যান্য ২০১৩)।

বাঙালি মুসলিম ও হিন্দু: জেনেটিক অভিন্নতা বনাম ধর্মীয় বিভাজন

বাংলাদেশি মুসলিম ও হিন্দু বাঙালিদের জেনেটিক পরিচয়ের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হলো তাদের মধ্যকার অবিশ্বাস্য সাদৃশ্য। আধুনিক জিনোমিক গবেষণায় বারবার প্রমাণিত হয়েছে, ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে এই অঞ্চলের মানুষের জেনেটিক কাঠামো মূলত একই ভৌগোলিক উৎসের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে (জিওয়ানি ২০২৩)। ভারতের বারাক উপত্যকা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের ঢাকা পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, হিন্দু ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে জেনেটিক ডিস্ট্যান্স বা দূরত্ব ০.১২ শতাংশ থেকে ০.১৫ শতাংশের বেশি নয় (সুপ্রিয় ২০১০)।

‘১০০০ জেনোমস প্রজেক্ট’-এর অধীন সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের বাঙালিদের জেনেটিক ক্লাস্টার অত্যন্ত সুসংবদ্ধ। এই ক্লাস্টারে হিন্দু ও মুসলিম উভয় ধর্মাবলম্বীরাই এমনভাবে মিশে আছে যে কেবল ডিএনএ ডেটা ব্যবহার করে ধর্মীয় পরিচয় আলাদা করা প্রায় অসম্ভব (কার্লসন ও অন‍্যান‍্য ২০১৩)। এটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করে যে বাংলার মানুষের মধ্যে ধর্মীয় রূপান্তর মূলত একটি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রক্রিয়া ছিল, যা কোনো বড় আকারের জনতাত্ত্বিক প্রতিস্থাপন ঘটাতে পারেনি (গুটালা ও অন‍্যান‍্য ২০০৬)।

দক্ষিণ এশিয়ার, বিশেষ করে বাংলার হিন্দু ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে জেনেটিক ও রক্তগত সাযুজ্যের হার অত্যন্ত গভীর। ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ দুই ধর্মীয় গোষ্ঠীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় ভিন্ন হলেও তাদের জৈবিক ভিত্তি মূলত এক। নিচে আপনার প্রদান করা উপাত্তের ভিত্তিতে এর একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ দেওয়া হলো (সুপ্রিয় ২০১০):

রক্তগত ও জিনগত অভিন্নতা (এবিও ও আরএইচ ফ্যাক্টর): জেনেটিক সূচকগুলোর মধ্যে এবিও ব্লাড গ্রুপ এবং আরএইচ ফ্যাক্টর সবচেয়ে মৌলিক। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, হিন্দু ও মুসলিম উভয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে এবিও ব্লাড গ্রুপ জিনের অভিন্নতা প্রায় ৯৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ। একইভাবে আরএইচ ব্লাড গ্রুপের ক্ষেত্রে এই সাযুজ্যের হার ৯৯ দশমিক ৯০ শতাংশ। এই উচ্চমাত্রার মিল প্রমাণ করে, উভয় জনগোষ্ঠীর পূর্বপুরুষেরা একই ভৌগোলিক ও নৃবৈজ্ঞানিক উৎস থেকে এসেছেন। ধর্মান্তরের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার ফলে সাংস্কৃতিক পরিবর্তন এলেও রক্তগত উপাদানে কোনো উল্লেখযোগ্য বিভাজন তৈরি হয়নি।

হেটেরোজাইগোসিটি (Heterozygosity) ও জেনেটিক বৈচিত্র্য: হেটেরোজাইগোসিটি মূলত একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে জেনেটিক বৈচিত্র্যের মাত্রা নির্দেশ করে। উপাত্ত অনুযায়ী, এবিও ব্লাড গ্রুপের ক্ষেত্রে হিন্দু জনগোষ্ঠীর হেটেরোজাইগোসিটি মান শূন্য দশমিক ৫৫৯৮ এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে শূন্য দশমিক ৫৩৪৬। যদিও এই দুই মানের মধ্যে সামান্য পার্থক্য রয়েছে, তবু উভয় ক্ষেত্রেই উচ্চ সাযুজ্য লক্ষ করা যায়। হিন্দুদের ক্ষেত্রে কিছুটা বেশি বৈচিত্র্য থাকার কারণ হতে পারে তাদের দীর্ঘকালীন বর্ণভিত্তিক সামাজিক কাঠামো এবং বিভিন্ন উপগোষ্ঠীর সংমিশ্রণ। অন্যদিকে মুসলিমদের মান সামান্য কম হলেও তা সামগ্রিক জিনগত ঐক্যেরই প্রতিফলন।

প্যানমিকটিক ইনডেক্স ও প্রজননধারা: প্যানমিকটিক ইনডেক্স (Panmictic Index) একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে অবাধ প্রজনন বা সংমিশ্রণের হার নির্দেশ করে। হিন্দু জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ সূচক উচ্চতর, যা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী জেনেটিক বিনিময়ের ফল। অন্যদিকে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এ সূচক তুলনামূলক নিম্নতর। এর একটি প্রধান কারণ হতে পারে নির্দিষ্ট কিছু মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত ‘অন্তঃপ্রজনন’ বা আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ের (Consanguinity) প্রভাব। তবে এ পার্থক্য মূলত সামাজিক রীতিনীতির কারণে সৃষ্ট, যা তাদের মৌলিক জেনেটিক কাঠামোকে পরিবর্তন করে না।

সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার হিন্দু ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে জেনেটিক দূরত্বের চেয়ে নৈকট্যই অনেক বেশি প্রবল। আদিবাসী দক্ষিণ এশীয় (এএসআই), উত্তর ভারতীয় (এএনআই) এবং অস্ট্রো-এশীয় (এএআই) উপাদানের যে সংমিশ্রণ আমরা আগের আলোচনায় দেখেছি, তা উভয় ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেই প্রায় সমানভাবে বিদ্যমান। এই বৈজ্ঞানিক সত্য প্রমাণ করে, আমাদের ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হলেও জৈবিক শিকড় মূলত একই সূত্রে গাঁথা।

মজার বিষয় হলো, কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, মুসলিমদের তুলনায় হিন্দুদের মধ্যে জেনেটিক বৈচিত্র্য বা হেটেরোজাইগোসিটি সামান্য বেশি, যার কারণ হতে পারে হিন্দুদের ঐতিহাসিক বর্ণপ্রথার জটিল কাঠামো এবং এর মধ্য দিয়ে হওয়া ধীর জেনেটিক প্রবাহ (সুপ্রিয় ২০১০)। অন্যদিকে মুসলিমদের মধ্যে কাজিন ম্যারেজ বা নিকটাত্মীয়ের মধ্যে বিয়ের প্রচলন থাকায় তাদের মধ্যে সামান্য ইনব্রিডিং কো-ফিশিয়েন্ট লক্ষ করা যায় (পামবার্টো ও অন‍্যান‍্য ২০১৫)।

ইসলামি রূপান্তর এবং ‘বিদেশি বংশোদ্ভূত’ তত্ত্বের বৈজ্ঞানিক অসারতা: ঐতিহাসিকভাবে একটি ধারণা প্রচলিত ছিল, বাংলার মুসলিমরা মূলত আরব, পারস্য বা মধ্য এশিয়া থেকে আগত ধর্মপ্রচারক ও যোদ্ধাদের সরাসরি বংশধর। তবে জেনেটিক তথ্য এ ধারণাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে। ওয়াই ক্রোমোজোম ও মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাংলাদেশি মুসলিমদের সিংহভাগই স্থানীয় হিন্দু, বৌদ্ধ এবং অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উত্তরসূরি, যারা মধ্যযুগে ধর্মান্তরিত হয়েছিল (তুলি ও অন‍্যান‍্য ২০২৫)।

বিশেষ করে ‘এমসিএম৬’ জিনের বিশ্লেষণ থেকে পাওয়া তথ্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই জিনের সি/টি–১৩৯১০ ভেরিয়েন্টটি ইউরোপ ও ইরানের মানুষের মধ্যে প্রচলিত, যা ভারতীয় উপমহাদেশে মধ্য এশীয় অভিবাসনের সংকেত দেয় (মেটসপল ও অন‍্যান‍্য ২০১০)। কিন্তু সৌদি আরবের নির্দিষ্ট ভেরিয়েন্ট টি/জি–১৩৯১৫ বাঙালিদের মধ্যে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত (মেটসপল ও অন‍্যান‍্য ২০১০)। এর অর্থ হলো, বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে যদি সামান্য কোনো বিদেশি রক্ত থেকেও থাকে, তবে তার উৎস সরাসরি আরব নয়, বরং ইরান বা মধ্য এশিয়া, যা মূলত সুলতানি ও মোগল আমলে প্রশাসনিক ও সামরিক প্রয়োজনে আসা অভিবাসীদের মাধ্যমে ঘটেছে (ডকুমেন্টারি ২০২৬)।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৮৭০ সালের আদমশুমারিতে মাত্র ২ শতাংশ মুসলিম বিদেশি বংশোদ্ভূত হওয়ার দাবি করেছিলেন, আর আধুনিক ডিএনএ স্টাডিজ এ তথ্যকেই সমর্থন করে (সলিমুল্লাহ ২০২৪)। মূলত ১২ শতকের পর থেকে ইসলামি সুফি ও ধর্মপ্রচারকদের প্রভাবে স্থানীয় কৃষিভিত্তিক সমাজ এক বিশাল সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়, যা কোনো প্রকার জেনেটিক প্রতিস্থাপন ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছিল (তুলি ও অন‍্যান‍্য ২০২৫)।

 

‘পূর্বাঞ্চলীয় (তিব্বতি-বর্মণ) জেনেটিক শিফট’ (Eastern Shift): বাংলাদেশের বাঙালিদের জেনেটিক পরিচয়ের একটি অনন্য দিক হলো তাদের মধ্যে থাকা তিব্বতি-বর্মণ (Tibeto-Burman) উপাদানের আধিক্য। একে অনেক বিজ্ঞানী ‘Eastern Shift’ হিসেবে অভিহিত করেন (কার্লসন ও অন‍্যান‍্য ২০১৩)। পশ্চিম ও উত্তর ভারতের মানুষের তুলনায় বাঙালিদের মধ্যে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ তিব্বতি-বর্মণ বা পূর্ব এশীয় জেনেটিক মার্কার পাওয়া যায় (সলিমুল্লাহ ২০২৪)।

এ প্রভাব মূলত এসেছে হিমালয় ও মিয়ানমার অঞ্চল থেকে আগত জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল ও উত্তরবঙ্গের সীমান্ত এলাকাগুলো দিয়ে হাজার হাজার বছর ধরে এই অভিবাসনপ্রক্রিয়া চলেছে (ডকুমেন্টারি ২০২৬)। হ্যাপ্লোগ্রুপ ‘ও২’ এবং ‘ডি’-এর উপস্থিতি বাঙালিদের মধ্যে এই পূর্ব এশীয় সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করে (ডকুমেন্টারি ২০২৬)। এই জেনেটিক উপাদান বাংলাদেশি মুসলিম ও হিন্দুদের মধ্যে সমভাবে বিদ্যমান, যা তাদের একটি সুনির্দিষ্ট ‘পূর্ববঙ্গীয়’ জেনেটিক পরিচয় প্রদান করে এবং পশ্চিম ভারতের জনগোষ্ঠী থেকে আলাদা করে (কার্লসন ও অন‍্যান‍্য ২০১৩)।

 

বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি ও জেনেটিক বাস্তবতা

বাংলাদেশের রাজনীতির মূল দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে দুটি প্রধান জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারার মধ্যে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ  (সলিমুল্লাহ ২০২৪)। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের মূল ভিত্তি ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ। শেখ মুজিবুর রহমান মনে করতেন, ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে বাঙালিরা একটি অবিচ্ছেদ্য জাতি, যেখানে ধর্ম কোনো বিভেদ সৃষ্টি করতে পারে না (সলিমুল্লাহ ২০২৪)। জেনেটিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দেখলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল দাবি; অর্থাৎ হিন্দু ও মুসলিম বাঙালি রক্তগত ও সাংস্কৃতিক ঐক্য অত্যন্ত জোরালোভাবে সমর্থিত (কার্লসন ও অন‍্যান‍্য ২০১৩)। ডিএনএ ডেটা স্পষ্টভাবে দেখায়, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের বাঙালির মধ্যে জেনেটিক কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই, যা ১৯৭২ সালের সংবিধানে প্রতিফলিত ধর্মনিরপেক্ষ ও ভাষাকেন্দ্রিক সংহতির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে (সলিমুল্লাহ ২০২৪)। একই রকম জেনেটিক ও সাংস্কৃতিক ঐক‍্য প্রতীয়মান আদিবাসী সম্প্রদায়সমূহের সঙ্গে বাঙালির।

১৯৭৫–পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটে। এই মতবাদ অনুযায়ী, বাংলাদেশের নাগরিকেরা কেবল বাঙালি নন, বরং তারা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের চেয়ে আলাদা একটি স্বকীয় পরিচয়ের অধিকারী (সলিমুল্লাহ ২০২৪)। এই স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠার জন্য ধর্মকে (ইসলাম) একটি প্রধান নিয়ামক হিসেবে যুক্ত করা হয় এবং নাগরিকত্বকে ‘বাঙালি’ থেকে ‘বাংলাদেশি’ নামে সংজ্ঞায়িত করা হয় (সাইমন ২০২৫)। বাবু সংস্কৃতিও এ বিভাজনে একটি শক্তিশালী সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।

তবে জেনেটিক ডেটা এই ‘স্বাতন্ত্র্য’ বা ‘পার্থক্য’-এর দাবিকে খুব একটা সমর্থন করে না। ডিএনএ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশি মুসলিমরা জেনেটিক্যালি পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু বা মুসলিমদের চেয়ে আলাদা কিছু নন (গুটালা ও অন‍্যান‍্য ২০০৬)। অর্থাৎ বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ যতটা না বৈজ্ঞানিক বা বংশগত পার্থক্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, তার চেয়ে বেশি এটি একটি রাজনৈতিক ও কৌশলগত নির্মাণ (imagined community), যার লক্ষ্য ছিল ভারতের সঙ্গে থাকা সাংস্কৃতিক মিলসমূহকে অস্বীকার করে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রীয় পরিচয় তৈরি করা (সলিমুল্লাহ ২০২৪)।

জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞা ও ভিত্তি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভিন্ন ভিন্ন রূপ নিলেও জেনেটিক বা জৈবিক বাস্তবতায় তা এক ধ্রুব ও অবিচ্ছিন্ন সত্য। বাংলাদেশে মূলত দুই ধরনের রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদ প্রচলিত, যার একটির মূল ভিত্তি ভাষা ও সংস্কৃতি এবং অন্যটির ভিত্তি ধর্ম ও ভূখণ্ড। তবে আধুনিক জিনতত্ত্বের নিরিখে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজনৈতিক বিভাজন সত্ত্বেও আমাদের জৈবিক পরিচয় অত্যন্ত সুসংহত ও অভিন্ন।

রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ মূলত ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এটি একটি সেক্যুলার চেতনা। অন্যদিকে ১৯৭৫–পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং সামরিক শাসনের হাত ধরে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ বিকাশ লাভ করে, যার নেতৃত্বে রয়েছে বিএনপি। এ আদর্শ ভাষা অপেক্ষা ধর্ম (ইসলামি প্রভাব) এবং নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানাকে বেশি গুরুত্ব দেয়, যা ভারতকে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গকে সাংস্কৃতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখে নিজেদের স্বতন্ত্র সার্বভৌম পরিচয় জাহির করতে চায়।

বাঙালিদের পাশাপাশি বাংলাদেশের জেনেটিক মানচিত্রে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরার মতো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই জনগোষ্ঠীগুলো মূলত তিব্বতি-বর্মণ বংশোদ্ভূত এবং তাদের জেনেটিক প্রোফাইল বাঙালিদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা (ইশতিয়াক ও অন‍্যান‍্য ২০২৪)। রাজনীতিতে এই জেনেটিক পার্থক্যটি ‘জুম্ম জাতীয়তাবাদ’ হিসেবে রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশের মূলধারার রাজনীতির ‘বাঙালি’ বা ‘বাংলাদেশি’ সংজ্ঞা অনেক সময়ই এই পাহাড়ি আদিবাসীদের অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে দীর্ঘকালীন ভূরাজনৈতিক সংঘর্ষের জন্ম হয়েছে (মাহমুদ ২০২৩)। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ যখন ‘ধর্মীয়’ চরিত্র ধারণ করে, তখন তা এই অমুসলিম পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জন্য আরও বেশি বর্জনীয় হয়ে পড়ে।

কিন্তু রাজনৈতিক এই বিভাজন যখন জেনেটিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়, তখন ছবিটা পাল্টে যায়। আধুনিক জেনেটিক মানচিত্র অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার এই অঞ্চলের মানুষ একটি অভিন্ন জেনেটিক ক্লাস্টারের অন্তর্ভুক্ত। সীমান্তের এপার এবং ওপারের মানুষের রক্তে হাজার বছর ধরে যে অ্যানসেস্ট্রাল নর্থ ইন্ডিয়ান, অ্যানসেস্ট্রাল সাউথ ইন্ডিয়ান, অ্যানসেস্ট্রাল অস্ট্রোএশিয়াটিক ইন্ডিয়ান এবং তিবেতো–বার্মান উপাদানের মিশ্রণ ঘটেছে, তা কোনো রাজনৈতিক দলের নীতি বা ভৌগোলিক সীমারেখা দ্বারা পরিবর্তিত হয়নি। রাজনৈতিক আদর্শ যেখানে নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ক্ষণে (১৯৫২ বা ১৯৭৫) জন্ম নেয়, জেনেটিক বাস্তবতা সেখানে হাজার বছরের ধারাবাহিকতা বহন করে। অর্থাৎ রাজনৈতিকভাবে আমরা ‘বাঙালি’ না ‘বাংলাদেশি’ তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও জৈবিকভাবে আমরা উচ্চমাত্রায় মিশ্র এবং এক অবিচ্ছেদ্য জনগোষ্ঠীর অংশ।

রাজনীতি প্রায়ই মানুষকে বিভক্ত করার ভাষা খুঁজে নেয়, কিন্তু আমাদের ডিএনএ বা জেনেটিক কোড নিরবচ্ছিন্নভাবে আমাদের সাধারণ উৎসের কথাই বলে যায়।

পরিশেষে

সাউথ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো বর্তমানে একটি বিশাল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের যে প্রবল উত্থান দেখা যাচ্ছে, তার ঢেউ বাংলাদেশেও আছড়ে পড়ছে। এই অঞ্চলে বহুত্ববাদ বা প্লুরালিজম এখন হুমকির মুখে। পশ্চিমা ধাঁচের ধর্মনিরপেক্ষতা, যা ধর্ম ও রাষ্ট্রকে পুরোপুরি আলাদা করে দেখে, তা দক্ষিণ এশিয়ার ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে খুব একটা কার্যকর হয়নি (আশিস ১৯৮৭)।

আশিস নন্দীর মতো পণ্ডিতেরা যুক্তি দেন যে আধুনিক রাষ্ট্রীয় ধর্মনিরপেক্ষতা আসলে মানুষের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভেদকে আরও উসকে দিয়েছে। তাঁর মতে, প্রাক্‌-আধুনিক ভারতে যে ধরনের ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও লৌকিক আচার বিদ্যমান ছিল, তা ছিল অনেক বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক (আশিস ১৯৮৭)। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সুফি ও পীরদের যে লোকজ ইসলাম, তা–ও ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। জাতীয়তাবাদ-উত্তর রাষ্ট্রকল্পে এই লৌকিক ও সমন্বয়বাদী ঐতিহ্যগুলো পুনরুদ্ধারের দাবি ক্রমে জোরালো হচ্ছে।

বাঙালি আতরাফ মুসলিমদের ‘দাদার বাবার নাম’ ভুলে যাওয়ার রাজনীতি এবং নামের শুরুতে ‘মোহাম্মদ’ বা ‘মো.’ ব্যবহারের যে বিশ্লেষণ এই প্রবন্ধে তুলে ধরা হয়েছে, তা এক দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিক সংগ্রামের ফলাফল। এটি একদিকে যেমন বর্ণবাদী অপমান এবং সামাজিক বঞ্চনা থেকে মুক্তিলাভের এক মরিয়া চেষ্টা, অন্যদিকে এটি নিজের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার এক করুণ আখ্যান।

আশরাফীকরণের মাধ্যমে যে সামাজিক মর্যাদা তারা অর্জন করতে চেয়েছিলেন, তা অনেক ক্ষেত্রেই একধরনের মরীচিকা হিসেবে ধরা দিয়েছে। কারণ, আজও মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরে বংশীয় আভিজাত্যের সূক্ষ্ম দেয়ালগুলো পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। বরং আধুনিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় এই ‘পরিবর্তিত পরিচয়’ তাদের জন্য নতুন আইনি ও রাজনৈতিক বিপদ তৈরি করছে। নিজের প্রকৃত ইতিহাসকে অস্বীকার করার ফলে তারা আজ রাষ্ট্রের সামনে নিজেদের বৈধতা প্রমাণ করতে হিমশিম খাচ্ছে।

ভবিষ্যতের বাঙালি মুসলিম পরিচিতি নির্মাণের চ্যালেঞ্জ হলো এই বিস্মৃতির কুয়াশা সরিয়ে নিজের প্রকৃত নৃতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক শিকড়কে স্বীকার করা। ‘বাঙালি’ হওয়া এবং ‘মুসলিম’ হওয়ার মধ্যে যে কৃত্রিম দ্বন্দ্ব ঐতিহাসিকভাবে তৈরি করা হয়েছে, তা নিরসন করা প্রয়োজন। নামের শুরুতে ‘মোহাম্মদ’ থাকাটা ভক্তির বহিঃপ্রকাশ হতে পারে, কিন্তু তা যেন নিজের শিকড়কে অস্বীকার করার বা আড়াল করার হাতিয়ার না হয়। বাঙালি মুসলিম সমাজের মুক্তি নিহিত রয়েছে তাদের এই আত্মপরিচয়ের সংকটের একটি সুস্থ ও সাহসী সমাধানে, যেখানে তারা তাদের পূর্বপুরুষের ইতিহাসকে সগৌরবে স্বীকার করেই একটি আধুনিক ও সাম্যবাদী সমাজ অবিনির্মাণ করতে পারবে।

জাতীয়তাবাদ-উত্তর রাষ্ট্রকল্পে মুসলমানিত্বর বাঙালিত্ববাদের সঙ্গে বোঝাপড়া কোনো শেষ হয়ে যাওয়া অধ্যায় নয়, বরং এটি একটি চলমান ও ক্রমবর্ধমান প্রক্রিয়া। ১৯৭১ সালের বাঙালিত্ববাদের প্রকল্প সময়ের পরিক্রমায় অনেক চড়াই-উতরাই পার করেছে। বাংলাদেশের বর্তমান সমাজ ও রাজনীতিতে আমরা দেখতে পাই, মানুষ আর কোনো একটি পরিচয় দিয়ে সন্তুষ্ট নয়। সে একই সঙ্গে বাঙালি, সে একই সঙ্গে মুসলমান, আবার সে একই সঙ্গে বিশ্ব নাগরিক। অমর্ত‍্য সেন (২০০৬) এমন এক সমাজের কথা বলেন, যেখানে মানুষ তাদের বৈচিত্র্য বজায় রেখেও একে অপরের সঙ্গে সাংস্কৃতিকভাবে যুক্ত থাকবে এবং বৃহত্তর মানবিক পরিচয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবে।

বদরুদ্দীন উমরের শ্রেণিকাঠামো, আনিসুজ্জামানের সমন্বয়বাদ এবং সলিমুল্লাহ খানের বিনির্মাণ—এই তিন ধারা আমাদের সামনে তিনটি ভিন্ন পথ নির্দেশ করে। কিন্তু সত্যটি সম্ভবত এদের মাঝামাঝি কোনো স্থানে নিহিত। পরিচয় কোনো স্থির সত্তা নয়, বরং এটি একটি প্রবহমান নদী, যা পরিবেশ ও পরিস্থিতির সঙ্গে তার গতিপথ পরিবর্তন করে। বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজন এমন একটি রাষ্ট্রকল্প, যেখানে নাগরিকের ধর্মীয় চেতনা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় একে অপরের প্রতিপক্ষ হবে না। জাতীয়তাবাদের সংকীর্ণতা থেকে বেরিয়ে এসে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ার জন্য প্রয়োজন সেই ঐতিহাসিক ও দার্শনিক বোঝাপড়া, যা আমাদের শেখায় যে মুসলমানিত্ব ও বাঙালিত্ব একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং একই মানুষের হৃৎস্পন্দনের দুটি ভিন্ন ধ্বনি।

বাঙালি মুসলিম ও হিন্দু এবং জনগোষ্ঠীর জিনগত পরিচয় মূলত একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। বিজ্ঞানের আলোকে আমাদের রক্ত ও ডিএনএতে বিভাজনের কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশি মুসলিমরা তাদের প্রতিবেশী হিন্দুদের মতোই এই বদ্বীপের আদিম ও মিশ্র বংশধারার উত্তরাধিকারী।

বাংলাদেশের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাঙালি জাতীয়তাবাদ যেখানে জিনগত ঐক্যের বৈজ্ঞানিক সত্যের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ মূলত একটি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নির্মাণ, যা ভারতের থেকে স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে উভয় রাজনীতিরই উচিত জিনবিজ্ঞানের বর্তমান বিশ্লেষণকে গ্রহণ করে এই বদ্বীপের সব মানুষের, অর্থাৎ বাঙালি ও আদিবাসীর সমান অধিকার নিশ্চিত করা। ডিএনএ আমাদের পূর্বপুরুষের ইতিহাস জানায়, কিন্তু নাগরিক হিসেবে আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক মানসিকতার ওপর।

জাতীয়তাবাদের তাত্ত্বিক বিবর্তন এবং এর ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জসমূহ বিশ্লেষণ করলে তিনটি প্রধান পর্যায় পরিলক্ষিত হয়। জাতীয়তাবাদী পর্যায়ে মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘এক জাতি, এক ভাষা ও এক রাষ্ট্র’ গঠন, যা একটি ঐক্যবদ্ধ পরিচয় তৈরিতে সহায়তা করলেও এর বড় চ্যালেঞ্জ ছিল আদিবাসী ও ভিন্নমতের বর্জন (ইমরান ২০১৫)। এর পরবর্তী ধাপে ধর্মীয় পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়টি সামনে আসে, যেখানে ধর্মীয় পরিচয় প্রাধান্য পায় এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিলাভের চেষ্টা চলে। তবে এই পর্যায়ের প্রধান ঝুঁকি হলো ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতা এবং বৈশ্বিক আধুনিকতা থেকে বিচ্যুতি। বর্তমানে একটি উত্তর-জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে, যার মূল ভিত্তি হলো পরিচয়ের বহুত্ব এবং নাগরিক অধিকারের প্রাধান্য। এই আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উগ্রবাদ মোকাবিলা করা এবং সমাজের বহুত্ববাদ রক্ষা করে সব শ্রেণির সহাবস্থান নিশ্চিত করা।

এই বিশাল ঐতিহাসিক যাত্রায় বাঙালি মুসলমান বারবার প্রমাণ করেছে যে সে কোনো একটি ছাঁচে বন্দী হতে রাজি নয়। তার ভাষা ও ধর্মের এই দীর্ঘকালীন দর–কষাকষিই তাকে দক্ষিণ এশিয়ার এক অনন্য জনগোষ্ঠী হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে। আগামী দিনের বাংলাদেশ এই দুই পরিচয়ের এক নতুন সিনথেসিস বা সংশ্লেষের দিকে এগিয়ে যাবে, যেখানে মানুষ হবে তার রাষ্ট্রের আসল মালিক আর তার পরিচয় হবে তার কর্ম ও মানবিকতায়। বাংলাদেশের মানুষ মুসলিম হওয়ার জাতীয়তাবাদী তাড়নায় তাই ভুলে যেতে চায় পূর্বজদের নাম ও পরিচয়। জাতীয়তাবাদে ‘অতীতের অনুপস্থিতি’ মানে এই নয় যে অতীত নেই; বরং একটি জাতিকে মানসিকভাবে একতাবদ্ধ রাখার জন্য অতীতের নেতিবাচক বা বিভেদ সৃষ্টিকারী অংশগুলোকে সচেতনভাবে আড়ালে রাখা বা ভুলে যাওয়া। একটি জাতির বর্তমান পরিচয় তার ‘স্মৃতি’ ও ‘বিস্মৃতি’র ভারসাম্যেই গড়ে ওঠে। তবে বাংলাদেশের মুসলমানগণ মুসলিম হিসেবে নিজের পরিচয়ের তাড়নায় পূর্বজদের পরিচয়কেই অস্বীকার করে বসে আছে।

এই প্রবন্ধে এই বিশ্লেষণ হাজির করা হয়েছে যে বিজ্ঞানের কর্তৃত্ব যখন রাজনীতির স্বার্থে ব্যবহৃত হয়, তখন তা প্রায়ই বিভেদ সৃষ্টি করে। কিন্তু যখন তা সত্য উদ্‌ঘাটনে ব্যবহৃত হয়, তখন তা আমাদের অভিন্ন পরিচয়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বাঙালির ডিএনএ পরিচয় কোনো বিভাজনের রাজনীতির হাতিয়ার হওয়া উচিত নয়; বরং তা হওয়া উচিত আমাদের হাজার বছরের সংকর ও সহিষ্ণু ঐতিহ্যের স্মারক।

তথ্যসূত্র

অ্যান্ডারসন ২০০৬।। Benedict Anderson, Imagined Communities: Reflections on the Origin and Spread of Nationalism, Rev. ed., London: Verso।

আনসারি ১৯৬০।। Ghaus Ansari, Muslim Caste in Uttar Pradesh: A Study of Culture Contact, Lucknow: Ethnographic and Folk Culture Society।

আনাস ২০২৬।। Khwaja Anas (ed.), 'Dhaka Nawab Family and Shia Community', Scribd, প্রবেশ: ১৯শে এপ্রিল, ২০২৬, https://www.scribd.com/document/33613407/Shia-Community-the-Dhaka-Nawab-Family-Edited-by-Anas-Khwaja।

আনিসুজ্জামান ২০২২।। আনিসুজ্জামান, 'আনিসুজ্জামানের চিন্তাধারার বিষয়-আশয়', কালি ও কলম, ১৪ই মে, https://www.kaliokalam.com/%E0%A6%86%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%B8%E0%A7%81%E0%A6%9C%E0%A7%8D%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%9A%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%A7%E0%A6%BE/।

নুরুল ২০১৪।। A. B. M. Nurul Absar, 'Muslim Identity, Bengali Nationalism: An Analysis on Nationalism in Bangladesh', Academic Journal of Interdisciplinary Studies, 3, no. 1: 439।

রেজাউল ২০২৬।। Rezaul Amin, 'The Language Movement of 1952: A Struggle for Cultural Self-Determination', Medium, 17 February, https://medium.com/@rezaul.amin/the-language-movement-of-1952-a-struggle-for-cultural-self-determination-1213fc316326।

রীয়াজ ২০১২।। আলী রীয়াজ, বাংলাদেশে ধর্মীয় রাজনীতি: ইসলামীকরণের একটি বিশ্লেষণ, ঢাকা: প্রথমা প্রকাশন।

ইমতিয়াজ ১৯৬৬।। Imtiaz Ahmad, 'The Ashraf-Ajlaf Dichotomy in Muslim Social Structure in India', The Indian Economic & Social History Review, 3, no. 3: 268-278।

তৌসিফ ২০২৩।। Tausif Ahmad, 'Politics of Recognition and Caste among Muslims: A Study of Shekhra Biradari of Bihar, India', CASTE: A Global Journal on Social Exclusion, 4, no. 1 (April): 92–108, DOI: 10.26812/caste.v4i1.401।

রফিউদ্দিন ১৯৯৬।। Rafiuddin Ahmed, The Bengal Muslims, 1871–1906: A Quest for Identity, 2nd ed., Dhaka: University Press Limited।

মোসাররাপ ২০১৭।। Mosarrap H. Khan, 'The construction of Bengali Muslim identity in the late nineteenth and early twentieth century', Café Dissensus, July 15, https://cafedissensus.com/2017/07/15/the-construction-of-bengali-muslim-identity-in-the-late-nineteenth-and-early-twentieth-century/।

ইশতিয়াক ও অন্যান্য ২০২৪।। Ishtiaque Ahammad, Anisur Rahman, Zeshan Mahmud Chowdhury, et al., 'Gut Microbiome Composition Reveals the Distinctiveness between the Bengali People and the Indigenous Ethnicities in Bangladesh' [Preprint], ResearchGate, DOI: 10.13140/RG.2.2.36859.36647।

ইটন ১৯৯৩।। Richard M. Eaton, The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204–1760, Berkeley: University of California Press, pp. 343-344।

ইশতিয়াক ২০১৩।। ইশতিয়াক আহমেদ, Pakistan: The Garrison State; Origins, Evolution, Consequences (1947-2011), করাচি: অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস।

ইয়ামিন ২০২৩।। মোহাম্মদ ইয়ামিন, বাংলার মুসলিম সমাজ: বাঙাল ও ঘটি সংস্কৃতি, কলকাতা: বঙ্গ প্রকাশন।

সিরাজুল ২০২২।। Md. Sirajul Islam, 'Ethnic Identity & Social Stratification of Bengali Muslims', Journal of Historical and Social Research, pp. 87-98।

মাইনুল ২০২৫।। Md Mainul Islam, 'Bengali Muslim Intelligentsia: Socio-Political Ideologies and Trends in Early 20th Century Bengal', NBPA Journal for Arts, Humanities & Social Sciences, 1(2): 45-58, DOI:10.65842/nbpa.v1.i2.004।

ওয়েবার ১৯৭৮।। Max Weber, Economy and Society: An Outline of Interpretive Sociology, ed. Guenther Roth and Claus Wittich, Berkeley: University of California Press, pp. 921-926।

ওয়ালি ১৯০৪।। Maulvi Abdul Wali, 'On the Curious Superstitions, Beliefs and Practices of the Mussalmans of Bengal', Journal of the Anthropological Society of Bombay, 7, no. 7: 574-577।

কবির ১৯৮৭।। Muhammad Ghulam Kabir, The Minority Politics in Bangladesh, New Delhi: Vikas Publishing House।

কার্লসন ও অন্যান্য ২০১৩।। Elinor K. Karlsson, Jason B. Harris, Pardis C. Sabeti, et al., 'Natural Selection in a Bangladeshi Population from the Cholera-Endemic Ganges River Delta', Science Translational Medicine, 5 (192): 192ra86, https://doi.org/10.1126/scitranslmed.3006338।

রাজনি ১৯৯৫।। Rajni Kothari, Poverty: Human Consciousness and the Amnesia of Development, London: Zed Books।

খান ২০১৭।। F. Khan, Between Piety and Politics: Bengali Muslim Masculinities in Bangladesh, Shuddhashar, May 01, 2025।

গেলনার ১৯৮৩।। Ernest Gellner, Nations and Nationalism, Ithaca: Cornell University Press, pp. 1-10।

গুটালা ও অন্যান্য ২০০৬।। Ramana Gutala, Denise R. Carvalho-Silva, Li Jin, et al., 'A Shared Y-chromosomal Heritage between Muslims and Hindus in India', Human Genetics, 120, no. 4: 543–551, DOI: 10.1007/s00439-006-0234-x।

মুরশিদ ২০০৩।। গোলাম মুরশিদ, বাঙালির বাবু সংস্কৃতি, কলকাতা: সাহিত্য সংসদ।

সুপ্রিয় ২০১০।। Supriyo Chakraborty, 'Genetic Distance and Genetic Identity Between Hindu and Muslim Populations of Barak Valley for ABO and Rh Genes', Notulae Scientia Biologicae, 2 (3): 20–25, https://doi.org/10.15835/nsb234758।

জয়া ১৯৯৪।। Joya Chatterji, Bengal Divided: Hindu Communalism and Partition, 1932–1947, Cambridge: Cambridge University Press।

জয়া ২০০৭।। Joya Chatterji, The Spoils of Partition: Bengal and India, 1947–1967, Cambridge: Cambridge University Press।

তুলি ও অন্যান্য ২০২৫।। Samayeta Sarkar Tuli, et al., 'Trajectory of Human Migration: Insights from Autosomal and Non-Autosomal Variant Clustering Patterns', Journal of Advanced Biotechnology and Experimental Therapeutics, 8, no. 1: 139-149, doi:10.5455/jabet.2025.12।

আশিস ১৯৮৭।। Ashis Nandy, 'The Politics of Secularism and the Recovery of Religious Tolerance', Alternatives: Global, Local, Political, 11, no. 4: 451–475।

পাইন ২০১৯।। Arunsubhra Pain, 'The Great Divide: Tracing How the Bangal-Ghoti Divide Extends to Gastronomic Differences', CASS Studies, 3, no. 1 (March): Addendum 5।

পাসি ২০১৫।। Ansi Paasi, 'Border Studies', in International Encyclopedia of the Social & Behavioral Sciences, 2nd ed., Elsevier।

পেম্বারটন ও অন্যান্য ২০১৫।। Trevor J. Pemberton, Evgeny V. Belyaev, and Boris E. Volfovsky, 'High level of inbreeding in final phase of 1000 Genomes Project', Scientific Reports, 5, no. 1: 17453।

ফাহীম ২০১৩।। Faheem Hasan Shahed, ‘Revisiting Bangladeshi Nationalhood: Walking Along Global, Glocal and Local Pathway’, Journal of the Asiatic Society of Bangladesh  (Hum.), Dhaka: 58(2): 239-261 ।

বদরুদ্দীন ১৯৭০, ১৯৭২, ১৯৮৪।। বদরুদ্দীন উমর, পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি (১ম, ২য় ও ৩য় খণ্ড), ঢাকা: আনন্দ পাবলিশার্স।

বণিক বার্তা ২০২৫।। 'বাংলার কৃষকের সামাজিক মুক্তি ও এ কে ফজলুল হকের প্রাসঙ্গিকতা', বণিক বার্তা, ২৬শে এপ্রিল, https://bonikbarta.com/editorial/Zp1hI5T3USJ2PcRO।

বাংলাপিডিয়া ২০২৬।। 'Folk Culture', Banglapedia, প্রবেশ: ১৮ই এপ্রিল, ২০২৬, https://en.banglapedia.org/index.php/Folk_Culture।

ব্রামসন ১৯৮১।। Leon Bramson, Identity and Culture in the Immigrant Experience, New York: Academic Press।

মনিরুজ্জামান ২০১০।। মনিরুজ্জামান তালুকদার, বাংলাদেশে রাজনীতি: ১৯৭২-১৯৮১, ঢাকা: প্রথমা প্রকাশন।

মনসুর ১৯৩৫।। আবুল মনসুর আহমদ, আয়না, কলকাতা: ওরিয়েন্ট বুক কোম্পানি।

মুনতাসীর ২০১৭।। মুনতাসীর মামুন, ঢাকার নওয়াব পরিবার ও তৎকালীন ঢাকার সমাজ, ঢাকা: কথাপ্রকাশ।

মুরজানি ও অন্যান্য ২০১৩।। Priya Moorjani, Qasim Ayub, Carlo Delane, et al., 'Genetic Structure of the People of the Indian Subcontinent', American Journal of Human Genetics, 93, no. 5: 834-846।

মেটস্পালু ও অন্যান্য ২০১০।। Mait Metspalu, Eaaswarkhanth Muthukrishnan, Siiri Rootsi, et al., 'Traces of Sub-Saharan and Middle Eastern Lineages in Indian Muslim Populations', Journal of Human Genetics, 55, no. 3: 179–185।

মোমিন ১৯৭৮।। A. R. Momin, Muslims in India: A Sociological Perspective, New Delhi: Monohar Publication।

রবিনসন ১৯৭৪।। Francis Robinson, Separatism Among Indian Muslims: The Politics of the United Provinces' Muslims, 1860-1923, Cambridge: Cambridge University Press।

রেনান ১৯৯৬।। Ernest Renan, 'What is a Nation?' (lecture), in Becoming National: A Reader, ed. Geoff Eley and Ronald Grigor Suny, New York: Oxford University Press, pp. 41–55।

রেডিট ২০২৬।। 'Bengali DNA Secrets' [Documentary], r/kolkata - Reddit, প্রবেশ: ২৩শে মার্চ, ২০২৬, https://www.reddit.com/r/kolkata/comments/1kjze0s/bengali_dna_secrets_documentary/।

রেইখ ও অন্যান্য ২০০৯।। David Reich, Kumarasamy Thangaraj, Nick Patterson, et al., 'Reconstructing Indian Population History', Nature, 461, no. 7263: 489–494, প্রবেশ: ২৩শে মার্চ, ২০২৬, https://pmc.ncbi.nlm.nih.gov/articles/PMC2842210/।

অসিম ১৯৮৩।। Asim Roy, The Islamic Syncretistic Tradition in Bengal, Princeton: Princeton University Press।

এশা ২০১৬।। Esha Roy, 'Almost 80% of rural Muslims in West Bengal are borderline poor: Report', The Indian Express, February 15।

ভারুন ২০২২।। Varun Kumar Roy, 'The Babus and the Social Body in Conceptual Proposition in Early Colonial Bengal', Karatoya: NBU Journal of History, 13: 146-160।

লুডেন ২০০৪।। David Ludden, 'South Asia: The Invention of a Region', South Asian Journal, 1 (July): 1-15।

শ, চাহাল ও অ্যাটকিনসন ২০০৯।। Alison Shaw, Sarah E. H. S. Chahal, and Susan Atkinson, 'Genetics, Religion and Identity Among British Bangladeshis: Some Initial Findings', Ethnicity and Health, 14, no. 3: 315-328।

জওহার ২০১৯।। Jawhar Sircar, Class, caste and habitus: The rise of Bhadralok in 19th-century Bengal [e-book], Kolkata: The Satyashodhak।

সুমিত ২০২৪।। Sumit Sarkar, 'Class, caste and habitus: The rise of Bhadralok in 19th century Bengal', The Satyashodhak, September 9।

সার্টোরি ২০০৮।। Andrew Sartori, Bengal in Global Concept History: Culturalism in the Age of Capital, Chicago: University of Chicago Press।

সাইমন ২০২৫।। Allen David Simon, 'The Great Identity Tussle: Bangladeshi or Bengali Nationalism', Ramjas Political Review, May 7, https://www.ramjaspoliticalreview.com/post/the-great-identity-tussle-bangladeshi-or-bengali-nationalism।

সাজেন ২০২০।। Shamsuddoza Sajen, 'The Champion of the Bengali Muslim Peasantry', The Daily Star, October 25, https://www.thedailystar.net/slow-reads/focus/news/the-champion-the-bengali-muslim-peasantry-1984161।

সিন্দারপাল ২০০১।। Sinderpal Singh, 'Framing "South Asia": Whose Imagined Region?', প্রবেশ: ২০শে মার্চ, ২০২৬, https://www.rsis.edu.sg/wp-content/uploads/rsis-pubs/WP09.pdf।

সিরাজুল ২০১২।। সিরাজুল ইসলাম (সম্পাদিত), বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ, ২য় সং., ঢাকা: এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বাংলাদেশ।

সিরাজুল ২০১৫।। সিরাজুল ইসলাম, 'চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত', বাংলাপিডিয়া, ঢাকা: এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বাংলাদেশ, ১৭ই এপ্রিল (আপডেটেড ২০২১), banglapedia.org।

সিরাজুল ২০২১।। সিরাজুল ইসলাম (সম্পাদিত), 'বঙ্গভঙ্গ ১৯০৫', বাংলাপিডিয়া, ৩১শে জুলাই, https://bn.banglapedia.org/index.php?title=%E0%A6%AC%E0%A6%99%E0%A7%8D%E0%A6%97%E0%A6%AD%E0%A6%99%E0%A7%8D%E0%A6%97,_%E0%A7%A7%E0%A7%AF%E0%A7%A6%E0%A7%AB।

শিলা ১৯৮৬।। Shila Sen, Muslim Politics in Bengal, 1937–1947, New Delhi: Impex Publications।

অমর্ত্য ২০০৬।। Amartya Sen, Identity and Violence: The Illusion of Destiny, New York: W.W. Norton & Company, pp. 15-20।

রামিয়ানি ২০২২।। Ramyani Sengupta, 'Understanding "Babu Culture" through Kalighat Paintings', The Itihasology Journal, 1, no. 1।

সলিমুল্লাহ ২০২৪।। সলিমুল্লাহ খান, আ মরি আহমদ ছফা: বিষয় বাঙালি মুসলমানের মন, ঢাকা: মধুপোক।

হবসবাউম ও রেঞ্জার ১৯৮৩।। Eric Hobsbawm and Terence Ranger (eds.), The Invention of Tradition, Cambridge: Cambridge University Press, pp. 1–14।

সামিয়া ২০২১।। Samia Huq, 'Recasting Politics and Reimagining Islam: Beyond Contested Nationalisms in Bangladesh', Economic and Political Weekly, 56, no. 3 (January 16), https://www.epw.in/engage/article/recasting-politics-and-reimagining-islam-beyond।

হান্টার ১৮৭১।। W. W. Hunter, The Indian Musalmans: Are They Bound in Conscience to Rebel Against the Queen?, London: Trübner & Co।

হাশমি ২০০০।। Taj Hashmi, Women and Islam in Bangladesh: Beyond the Veil, Dhaka: University Press Limited।

হেক্টার ২০০০।। Michael Hechter, Containing Nationalism, Oxford: Oxford University Press, pp. 20-25।

হেলাল ২০২৬।। হেলাল উদ্দিন আহমেদ, 'বঙ্গভঙ্গ রদ', বাংলাপিডিয়া, প্রবেশ: ১৯শে এপ্রিল, ২০২৬, https://bn.banglapedia.org/index.php?title=%E0%A6%AC%E0%A6%99%E0%A7%8D%E0%A6%97%E0%A6%AD%E0%A6%99%E0%A7%8D%E0%A6%97_%E0%A6%B0%E0%A6%A6।

ইন্তেখাব ২০১৩।। M. Intekhab Hossain, 'Social stratification and Muslim society: Some empirical observations on West Bengal', Muslim Societies: A Social Science Journal, 6(1), https://www.muslimsocieties.org/vol-6-no-1_social_stratification_and_muslim_society/।

লেখক পরিচিতি

মাসুদ ইমরান মান্নু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক। তিনি জাপানের হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে Safeguarding-Governmentality of Cultural Heritage of Bangladesh বিষয়ের ওপর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাঁর ২২টি জার্নাল নিবন্ধ, ৬টি বইয়ের অধ্যায় এবং ৬টি বই প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামে প্রবন্ধ উপস্থাপক, মূল বক্তা এবং সেশন চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষাগত কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 'ড. সুরত আলী খান ও শরফুদ্দীন স্বর্ণপদক' এবং জাপানের হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 'এক্সেলেন্ট স্টুডেন্ট স্কলারশিপ অ্যাওয়ার্ড' লাভ করেন। অতীতকে বোঝার জন্য বিভিন্ন ক্রিটিক্যাল থিওরির প্রতি তাঁর গবেষণার আগ্রহ রয়েছে; বিশেষ করে অতীতের পরিচয় ও প্রতিনিধিত্বের রাজনীতি, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোর স্থানিক বিন্যাস, স্থাপত্যের ভবিষ্যদ্বাণীমূলক ত্রিমাত্রিক মডেলিং এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোর ভার্চুয়াল রিয়েলিটি তৈরি করা তাঁর গবেষণার মূল ক্ষেত্র।