মোবাইল গেমের প্রতি ‘অনুরাগ’ই কি প্রজন্ম আলফার পরিবর্তিত মননের পেছনের নিয়ামক? প্রশ্নটি আমার মাথায় আসে নিজের ছেলেকে বিদ্যালয়ে দেওয়ার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে। তিনবার বিদ্যালয় বদলের পথে পরিচিত অভিভাবকেরা যখন নিজ নিজ সন্তানের পরিবর্তিত আচরণের পেছনে বারবার মোবাইল গেমের দিকে আঙুল তোলেন, তখন থেকেই এই অন্বেষণের শুরু। উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা গেল, প্রশ্নটি যত সহজ মনে হচ্ছে, এর ব্যাখ্যাটা মোটেও ততটা সরল নয়।
অনেকের মনেই প্রশ্ন আসতে পারে, অনেকেই তো গেমের প্রতি ‘আসক্তি’ শব্দ ব্যবহার করেন, তাহলে আমি কেন ‘অনুরাগ’ শব্দ ব্যবহার করলাম? আসলে ‘আসক্তি’ বললেই একধরনের নেতিবাচক ধারণা কাজ করে। বর্তমানে সামাজিক মিডিয়ার কোনো প্ল্যাটফর্মকেই নেতিবাচক হিসেবে দেখার উপায় নেই। কারণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে অফিস, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, যাতায়াত প্রভৃতি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে এই মাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছি। আর প্রজন্ম আলফার কাছে মোবাইল গেম কেবল অবসরের সঙ্গীই নয়, বরং এটা তাদের সামাজিক জীবন, বন্ধুত্ব এবং নিজেকে উন্মোচন করার মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। সুতরাং এই দাবিটা এখানে করাই যায় যে গেম এই প্রজন্মের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটা অংশেই পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের গবেষণায় দেখা গেছে, ভিডিও গেম খেলা ৭২ শতাংশ কিশোর-কিশোরীর কাছে গেম খেলার একটি অন্যতম কারণ হলো অন্যদের সঙ্গে সময় কাটানো। আর তাদের মধ্যে ৪৭ শতাংশ জানিয়েছে, গেম খেলতে গিয়ে তারা অনলাইনে বন্ধুও তৈরি করেছে (গটফ্রিড ও সিদোতি ২০২৪)। ২০২৫ সালের আরও একটি গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুরা গেমে একধরনের ভার্চ্যুয়াল রূপ তৈরি করার মাধ্যমে নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করে (ম্যাকক্রিন্ডল ও ফেল ২০২০)।
আবার প্রজন্ম আলফা—যাদের জন্ম সাল ২০১০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে, এখন তারা তাদের শৈশবকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং এটুকু বলাই যায়, সর্বোচ্চ ১৪ বছরের একটা শিশু এটাকে নিতান্তই একটা ‘খেলা’ হিসেবেই গ্রহণ করে এবং রঙিন ও বৈচিত্র্যময় বৈশিষ্ট্যের জন্যই ক্রমেই এটার প্রতি তার একধরনের ঝোঁক তৈরি হয়। এটা কখনোই ‘আসক্তি’ নয়। এটাকে গেমের প্রতি তাদের অনুরাগ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। অনুরাগ শব্দটি সংস্কৃত শব্দ থেকে এসেছে। ‘অনু’ শব্দের অর্থ অনুসরণ বা সান্নিধ্য এবং ‘রাগ’ শব্দের অর্থ আবেগ বা উষ্ণতা। এই দুই উপাদান একত্রে ‘অনুরাগ’ শব্দটি গঠন করে, যার মাধ্যমে বোঝানো হয় এমন এক আবেগ, যা কোনো ব্যক্তি, বস্তু, আদর্শ বা সৃষ্টির প্রতি গভীর আকর্ষণ ও ভালোবাসা থেকে উৎসারিত হয়।
কিন্তু এর বিপরীতেও একটা যুক্তি আছে। মানুষ আসক্ত হয় তার ভেতরের ‘প্রোথিত ভীতি কিংবা যন্ত্রণা’ থেকে। শিশুর বিকাশ এবং মনস্তত্ত্ব নিয়ে কাজ করা কানাডিয়ান চিকিৎসক ডা. গাবোর মেইট আসক্তির পেছনের কারণ হিসেবে এটাকে উল্লেখ করে বলেছেন, মনোযোগ কম পাওয়া, একাকিত্ব আর মানসিক চাপের জন্য মানুষ আবেগাপ্লুত হয়ে ওঠে। তাঁর মতে, যাদের শৈশব খুব খারাপ কেটেছে, তাদের বেশির ভাগের নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে (ল্যাং ২০১৯)। অর্থাৎ একটা শিশুর শৈশবের নেতিবাচক অবস্থা তার নেশাগ্রস্ত হয়ে ওঠার কারণ। অর্থাৎ বলা যায়, গেমের প্রতি একটা শিশুর অনুরাগ নিয়ন্ত্রণ হারালে সেটা ‘আচরণগত আসক্তি’তে পরিণত হতে পারে। এখানে ‘আচরণগত’ শব্দটা লক্ষণীয়। এ ক্ষেত্রে মাদক বা অ্যালকোহলের মতো কোনো রাসায়নিক পদার্থ ছাড়াই শুধু একটা কাজ ব্যক্তি আচরণে আসক্তি তৈরি করছে। এ জন্য এ ধরনের আসক্তিকে ‘আচরণগত আসক্তি’ বলাটাই শ্রেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রোগের আন্তর্জাতিক শ্রেণিবিভাগের ১১তম সংস্করণে গেমিং ডিজঅর্ডারকে এই শ্রেণিতেই রেখেছে (স্কুটি ২০১৭)। সুতরাং এই আচরণগত আসক্তির প্রবণতাকে ব্যতিক্রম হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।
যাহোক, এই অভিভাবকেরা তাঁর পরিবারের প্রজন্ম আলফার অন্তর্ভুক্ত সদস্যের পরিবর্তিত যে আচরণগত বৈশিষ্ট্যগুলোর উল্লেখ করেছেন, সেগুলোর একটা তালিকা করলে দেখা যায়: শিশু জেদি, কথা শুনতে চায় না, অবাধ্য ও একগুঁয়ে, শাসন কোনো প্রভাব ফেলে না, নিজের মতো কাজ করতে চায়, বিদ্রোহী আচরণ করে, সবকিছু দ্রুত করতে চায় ও অধৈর্য এবং বড়দের গুরুত্ব দেয় না। আর কোনো ধরনের দ্বান্দ্বিকতা এবং দ্বিধাগ্রস্ততা ছাড়াই এই আচরণগুলোর জন্য তারা মোবাইলে খেলা গেমকে কারণ হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন। বর্তমান এই নিবন্ধে এই বিষয়টাকেই খুঁটিয়ে দেখার প্রয়াস চালানো হয়েছে।
প্রজন্ম আলফার পরিবর্তিত আচরণ: কাঠগড়ায় গেম, নাকি কেবল একটি উদ্দীপক
প্রজন্ম আলফার আচরণগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে অভিভাবকদের এই পর্যবেক্ষণগুলো কি বিচ্ছিন্ন? নাকি এর পেছনে কোনো গভীর প্রবণতা আছে? তবে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, যে কারণেই হোক, শিশুদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে, তাদের মনস্তাত্ত্বিকতায় যে একটা বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে—এটা আমাদের সমাজে দৈনন্দিন ঘটনাগুলো থেকেও প্রমাণ পাওয়া যায়। বিষয়টার প্রতি তীব্র আগ্রহের কারণে ২০১৯ সাল থেকে প্রজন্ম, প্রজন্মের পরিবর্তন, তাদের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলোর ওপরে নজর রাখার চেষ্টা করছিলাম। এরই প্রেক্ষাপটে শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনগুলো বোঝার জন্য তখন থেকে এ–সংক্রান্ত সংবাদগুলো সংগ্রহে রাখা শুরু করি। সংবাদকক্ষে সংবাদ নিয়ে নাড়াচাড়া করার কারণে কাজটা আমার জন্য কিছুটা সহজই হয়।
মোবাইলে গেম খেলতে বারণ করার জন্য কিংবা খেলার জন্য মোবাইল না পাওয়ার কারণ-সংক্রান্ত কিছু ঘটনা এখানে উল্লেখ করা হলো এবং সেগুলোর প্রবণতা বিচার করা হলো। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সংগঠিত এ ধরনের পাঁচটি ঘটনা নিয়ে এই অংশের আলোচনা এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।
প্রথম: গেম খেলতে মোবাইল ফোন না দেওয়ায় সাত বছরের শিশু মহিবুল্লাহকে কুপিয়ে হত্যা করে তার সহপাঠী ১১ বছরের নয়ন মিয়া। ঘটনাটি ২০২১ সালের জাতীয় দৈনিক ইত্তেফাক–এ মে মাসের ৯ তারিখে প্রকাশিত নাটোর জেলার গুরুদাসপুর উপজেলার সাবগাড়ী গ্রামের। পুলিশের মাধ্যমে জানা যায়, শিশুটির দেহ উদ্ধার করা হয় ভুট্টাখেত থেকে। তারা আরও জানায়, নয়ন মহিবুল্লাহের কাছে গেম খেলার জন্য পূর্বে কোনো একটা সময় মোবাইল চেয়েছিল। কিন্তু মহিবুল্লাহ সেটা তাকে দেয়নি। এই ক্ষোভের জের ধরেই নয়ন তাকে হত্যা করে। ঘটনার দিন নয়ন মহিবুল্লাহকে পাখির বাসা দেখানোর কথা বলে বাড়ির পাশে একটা ভুট্টাখেতে নিয়ে যায়। প্রথমে তার শ্বাসরোধ করে, কিন্তু সেটায় সফল না হলে সে ছুরি দিয়ে কুপিয়ে তাকে হত্যা করে।
দ্বিতীয়: অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগো নিউজ–এর ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ৪ তারিখে প্রকাশিত একটা সংবাদে দেখা যায় মোবাইলে গেম খেলতে না দেওয়ায় আট বছরের শিশু ইয়ামিন আত্মহত্যা করে। প্রকাশিত খবর থেকে জানতে পারি, সে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার আলেয়াবাদ গ্রামের মাদ্রাসায় পড়ত। থানা ও পরিবারের সদস্য থেকে জানা যায়, সকালে গেম খেলতে মায়ের কাছে মোবাইল চায় ইয়ামিন। পড়াশোনার ক্ষতি হওয়ায় মা তাকে সেই সময় মোবাইল দিতে সরাসরি ‘না’ করেন। এরপরই সে বাসার একটা খালি কক্ষে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে।
তৃতীয়: ২০২৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি আরেকটি সংবাদ নজরে আসে। মোবাইলে গেম খেলতে নিষেধ করায় বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়া ১১ বছরের শিশু রাইমুল হাসান ওরফে সাইমুমকে দীর্ঘ চার মাস পর উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাটি ছিল নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানাধীন মুরাদপুর এলাকার। উদ্ধারের পর শিশু সাইমুমকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, মোবাইলে গেম খেলা, কার্টুন দেখা তার ভালো লাগে। তার বাবা কাজে যাওয়ার সময় তার মোবাইল যেন সে রেখে যায়, এই বায়না করত সাইমুম। কিন্তু বাবা তাকে গেম খেলার জন্য প্রায়ই বকাঝকা করতেন এবং বাসায় মোবাইল রেখে যেতেন না। এ জন্য তার প্রচণ্ড অভিমান হয় এবং একপর্যায়ে সে গত বছর (২০২২ সালে) ১৪ অক্টোবর বিকেলে কাউকে কিছু না বলে বাসা থেকে বের হয়ে যায়।
চতুর্থ: গাজীপুর সদরের উত্তর ছায়াবীথি এলাকায় ছয় বছর বয়সী শিশু রাফিয়া মুনতাহা মোবাইল গেমে দেখে সে নিজেও তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। এই ঘটনা ছিল ২০২৪ সালের মার্চ মাসের ৩০ তারিখের। ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারসহ বেশ কিছু সংবাদপত্রেই এ ঘটনাটা প্রকাশ পায়। ঘটনায় তার শরীরের ১২ শতাংশ পুড়ে যায়। সে প্লে শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার মা থেকে জানা যায়, মুনতাহা স্মার্ট টিভিতে সার্চ করে ও সঙ্গে মোবাইল ফোনে বিভিন্ন কার্টুন দেখে। ফায়ার গেমসসহ অন্য অনেক গেমও দেখে।
সেখানকার চরিত্রগুলো সে অনুকরণ করতে চায়। তার দেখা গেমের একটা চরিত্র গায়ে আগুন ধরিয়ে আবার নেভালে সে–ও একই কাজ করতে চায়। মুনতাহা চুলার সামনে গিয়ে শরীরের সুতি জামায় আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে আবার নেভানোর চেষ্টা করে। কিন্তু নেভাতে পারে না।
পঞ্চম: মোবাইলে গেম খেলানোর প্রলোভন দেখিয়ে আট বছরের শিশুকন্যাকে যৌন নির্যাতনের চেষ্টা করা হয়। ২০২৫ সালে সংগঠিত ঘটনাটি ছিল বগুড়ার শেরপুরের নওদাপাড়ার। শিশুটি দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। এলাকাবাসী এবং পরিবারের কাছ থেকে জানা যায়, বাড়ির পাশের একটা দোকান থেকে ছোটখাটো কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার জন্য মেয়েকে পাঠানো হয়। এ সময় এলাকার এক কিশোর তাকে মোবাইলে গেম খেলতে দেবে বললে শিশুটি তার সঙ্গে যেতে রাজি হয় এবং সে শিশুটিকে একটা অন্ধকার গলিতে নিয়ে যায়।
প্রথম ঘটনা থেকে বোঝা যায়, অতীতে কোনো একসময় মহিবুল্লাহর কাছে গেম খেলতে চেয়ে মোবাইল না পাওয়ায় নয়নের মস্তিষ্কে একধরনের রাগ–ক্ষোভ জমা থাকে। গেম খেলতে না পাওয়ার তাড়নায় সৃষ্ট এই ক্ষোভের পরিমাণ এতটাই অধিক যে সে শিশু মহিবুল্লাহকে হত্যা করার পরিকল্পনা করে এবং শ্বাসরোধে হত্যা করতে ব্যর্থ হলেও সে এটা থেকে সরে না এসে ছুরি দিয়ে হত্যা করে। শিশুটির ক্ষোভ জমা রাখা এবং সেটাকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা করা দেখে মনে হয়, তার সহপাঠীর কাছ থেকে গেম খেলার জন্য মোবাইল চেয়েও না পাওয়ায় তার ইগোতে আঘাত লেগেছে।
দ্বিতীয় ঘটনাটি ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, মোবাইলে গেম খেলতে বারণ করায় আট বছরের শিশু নিজেই নিজেকে হত্যা করে এবং এটা সে জেনে-বুঝেই করে। কারণ, সে এটার জন্য খালি একটা ঘরে যায়। ছোট এই শিশু ধর্মীয় একটা সংস্কৃতির মধ্যে থেকেও এ ধরনের একটা পদক্ষেপ গ্রহণ করে। মোবাইলে গেম খেলার প্রতি তীব্র আগ্রহ আর সেখানে তার মা সরাসরি ‘না’ করায় শিশুটির অভিমান থেকেই এ ঘটনাটা ঘটেছে বলেই ধারণা করা যায়।
তৃতীয় ঘটনায় দেখা যায়, শিশুটি নিজেই বলেছে যে মোবাইলে গেম খেলতে না দেওয়ায় ‘অভিমান’ করেই বাসা থেকে বের হয়ে যায়। সঙ্গে সে এটাও বলে যে গেম খেলার জন্য তার বাবা তাকে প্রায়ই ‘বকাঝকা’ করত।
চতুর্থ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, উল্লেখ্য শিশুটির কাছে মোবাইলটাই বাস্তব একটা পৃথিবী। সেটাই তার শেখার জায়গা। আমরা জানি, শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। সে তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকেই প্রথম শিক্ষাটা গ্রহণ করে। সে শেখে তার মা-বাবা থেকে, তার পরিবারের গুরুজনদের দেখে, তার শিক্ষকদের দেখে, তার বন্ধুদের দেখে। ছোট্ট ছয় বছরের শিশু মুনতাহার সঙ্গে মোবাইল ফোনের অ্যাটাচমেন্ট এতটাই প্রবল যে সে গেমের ঘটনা, চরিত্রগুলোকে অনুকরণ করতে চায়!
পঞ্চম ঘটনায় আমরা দেখি, শিশুর প্রলোভনের জায়গায় চকলেট কিংবা আইসক্রিমের জায়গা দখল করেছে মোবাইলের গেম! নব্বইয়ের দশকে আমরা যখন স্কুলে যাওয়া-আসা করতাম, আমাদের মা ‘ছেলেধরা’ সম্পর্কিত বিপদ সম্পর্কে অবগত করতেন। বলতেন, ‘কেউ যদি তোমাকে চকলেট বা আইসক্রিম দিতে চায়, নেবে না। নিলে কিন্তু সে তোমাকে ধরে নিয়ে যাবে। মাকে আর দেখতে পারবা না!’ আজকের দিনে চকলেট কিংবা আইসক্রিম নয়, এখন সন্তানদের উদ্দেশে মাকে বলতে শোনা যায়, ‘কেউ যদি তোমাকে মোবাইলে গেম খেলার কথা বলে, যাবা না। সে কিন্তু দুষ্টু লোক। তোমাকে ধরে নিয়ে যাবে। মাকেও আর পাবা না!’
ওপরের পাঁচটা ঘটনা ব্যাখ্যা করলে আমরা বেশ কিছু সাংস্কৃতিক পরিবর্তন লক্ষ করতে পারি—
১। ইগো, অভিমানের মতো আত্মসম্মানবোধমূলক আচরণগুলো প্রজন্ম আলফার মধ্যে প্রকট। অর্থাৎ ৬ থেকে ১১ বছরের শিশুর মধ্যে সেটা গড়ে উঠেছে।
২। মা-বাবার সরাসরি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার স্বাভাবিক বিষয়টা প্রজন্ম আলফার আত্মসম্মানবোধে আঘাত করে।
৩। একটা শিশুর মনস্তত্ত্বের পুরোটাজুড়েই এখন প্রযুক্তি। কারণ পরিবার, সমাজ থেকে শেখার পরিবর্তে তারা এখন ডিভাইস থেকে শিখছে।
প্রকৃতপক্ষে একটা শিশুর পরিবর্তিত এই মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এটা বললে ভুল হবে না যে মোবাইল গেমের স্বতন্ত্র কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যা শিশুর মনন পরিবর্তনে সহায়ক ভূমিকা রাখে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এটাই কি প্রধান কারণ, নাকি গেম কেবল একটা উদ্দীপক হিসেবে কাজ করছে?
গেমই শিশুর বিকাশের প্রধান প্ল্যাটফর্ম, তারা নিজেরাই নিয়ন্ত্রক!
অভিভাবকদের দাবি, শিশুর এই পরিবর্তিত মননের পেছনে একমাত্র মোবাইল গেমই দায়ী। অভিভাবকদের এই দাবিকে খুঁটিয়ে দেখতেই প্রথমেই বোঝার চেষ্টা করেছি, একটা শিশু দিনের আসলে কতটা সময় মোবাইল গেম নিয়ে থাকে। বাংলাদেশে এ ধরনের গবেষণা নেই বললেই চলে। অনেক নেট ঘাঁটাঘাঁটি করে একটাই মাত্র গবেষণা পাওয়া গেল। ২০২৩ সালে প্রকাশিত এই গবেষণাটিতে দেখা যায়, তিন থেকে পাঁচ বছরের শিশুদের ৪৯ শতাংশ মোবাইল ব্যবহার করে গেম খেলার জন্য। স্কুলে যাওয়ার পূর্ব থেকেই এসব শিশুর ৮৬ শতাংশ মোবাইল ব্যবহার করে। আর শিশুর এই মোবাইল ব্যবহারের বিষয়টি প্রতি ১০ জন মায়ের মধ্যে ৪ জনই জানেন না! চিত্রটা সত্যিই ভয়ংকর।
আরও মজার ব্যাপার হলো, প্রজন্ম আলফার আচরণগত যেসব বৈশিষ্ট্যের কথা অভিভাবকেরা উল্লেখ করেছেন, এই গবেষণায় সেই বিষয়গুলোরও উল্লেখ আছে। গবেষণায় বলা হয়, অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের কারণে শিশুদের আবেগ কমে যায়, বৃদ্ধি পায় রাগ ও হতাশা, ধৈর্য ও মনোযোগ কমিয়ে দেয়, পিতামাতা ও খেলার সাথিদের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হতে থাকে।
শিশুদের আচরণগত এসব বৈশিষ্ট্য লক্ষ করেই ২০১৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গেমের প্রতি এই অনুরাগকে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্যে তালিকাভুক্ত করেছে (স্কুটি ২০১৭)। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রোগব্যাধির শ্রেণিবিন্যাসের তালিকায় এটাকে ‘গেমিং ডিজঅর্ডার’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। বারবার খেলার ইচ্ছা অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম নয় এবং জীবনের সবকিছু ছাপিয়ে যখন গেম খেলাই প্রাধান্য পায়—এই বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়েই এই প্রবণতাকে ‘রোগ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
তাহলে কি প্রজন্ম আলফার পরিবর্তিত আচরণের জন্য মোবাইলের গেমকে দোষারোপ করার বিষয়টি যথার্থ? এই প্রশ্ন সামনে রেখে একটা শিশুর গেমের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং তার মস্তিষ্ক বিকাশ এবং এর ওপর মোবাইল কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে—এ বিষয়টি দেখার চেষ্টা করি।
আসলে ভিডিও গেমগুলো তৈরি করা হয় একটা পুরস্কারকাঠামো পদ্ধতির (রিওয়ার্ড সিস্টেম) মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণ হলে একজন খেলোয়াড় পুরস্কারটা পাবে। কিন্তু এটা সম্পূর্ণই অপ্রত্যাশিত থাকে যে এটা কখন হবে! অর্থাৎ আপনি কোনো দুষ্ট লোককে হত্যা করতে পারেন কিংবা গোল করতে পারবেন। কিন্তু সেটা খেলার কোন পর্যায়ে—এটা জানা থাকে না। আর এ কারণেই এটা একজন খেলোয়াড়কে সেখানে আটকে রাখে। পূর্বেই উল্লেখ করেছি, শিশুরা গেম খেলে কারণ এটা তাদের আনন্দ দেয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে জয়ী হয়ে পুরস্কারও পাওয়া যায়। আর এ কারণেই স্কোর বাড়ানোর জন্য তারা দীর্ঘ সময় এটার মধ্যে থাকতে চায় বা বারবার খেলতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। এখন প্রশ্ন হলো এটা তাদের মস্তিষ্কে কোনো প্রভাব ফেলছে কি না?
আমেরিকার স্বাস্থ্যসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান মায়ো ক্লিনিক হেলথ সিস্টেমের মতে, একজন খেলোয়াড় যখন গেম খেলেন, তখন গেমের ঘটনাকে বাস্তব জীবনের বলেই মনে করেন। এ জন্যই তাদের মনোযোগ স্ক্রিনের ওপর নিবদ্ধ থাকে। এটাকে তারা আকর্ষণীয় মনে করেন এবং এটায় মগ্ন হয়ে ওঠে। এতেই শরীর থেকে ডোপামিন নামের একধরনের হরমোন নিঃসৃত হয়। ডোপামিন একটা নিউরোট্রান্সমিটার। এটা মানুষকে কাজের প্রতি আগ্রহ খুঁজতে এবং সেই আগ্রহ ধরে রাখতে সাহায্য করে। অর্থাৎ আমাদের আনন্দ, ভালো লাগা এবং প্রেরণার মতো সুখের অনুভূতিগুলো তৈরির পেছনে ডোপামিন কাজ করে। সঙ্গে শরীরের নিয়ন্ত্রণ, মেজাজ, মনোযোগও নিয়ন্ত্রণ করে। মায়ো ক্লিনিক হেলথ সিস্টেমের মতে, শিশুরা যত বেশি ভিডিও গেমে আগ্রহী হয়, তত বেশি ডোপামিন নিঃসৃত হয় এবং তারা গেমটি খেলার প্রয়োজন তত বেশি অনুভব করতে থাকে।
আবার হার্ভার্ড সেন্টার ফর দ্য ডেভেলপিং চাইন্ড তাদের গবেষণায় দেখিয়েছে, পাঁচ বছর বয়সের মধ্যেই একটা শিশুর মস্তিষ্কের ৯০ শতাংশ বিকশিত হয়ে যায়। আর বাকি ১০ শতাংশ গঠিত হয় পাঁচ বছরের পরে। অস্ট্রেলিয়ান কাউন্সিল ফর এডুকেশনাল রিসার্চের গবেষণাতেও এমনটাই দেখা যায়।
অর্থাৎ বলা যায়, একটা শিশুর মস্তিষ্কের গঠন, তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তৈরি করা গেমের বৈশিষ্ট্য এবং ক্রমশ মুঠোফোনের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে অতিসহজেই একটা শিশুর বিনোদনের জগতের পুরোটাই দখল করে নিয়েছে গেম। শুধুই বিনোদনের জগৎ বললে ভুল হবে, এখন এটাই তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, মূল্যবোধ, জীবন শুরুর প্রথম শিক্ষণগুলো শেখারও একটা প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে। আর এখানে তারাই কর্তা, নিয়ন্ত্রক। এটা কেবল তাদের নতুন জিনিস শেখার বিষয়কেই প্রভাবিত করছে না; বরং তাদের আচরণ, যোগাযোগের ধরন, ভাষার বিকাশকেও প্রভাবিত করছে।
‘রিওয়ার্ড’ না পেয়েই কি খেলা শেষ করা যায়!
বেশ কয়েক দিন আগে খাবার টেবিলে আমার ছেলে জিজ্ঞেস করে, ‘মিমনি, ক্রেজি শব্দের অর্থ কী?’ আমি তাকে পাল্টা প্রশ্ন করি, ‘কোথা থেকে শুনেছ?’ সে উত্তর দিল, ‘বন্ধুর কাছ থেকে।’ সে আরও যা বলল, সেটা হলো তার স্কুলের সেই বন্ধু তাকে ‘ক্রেজি ওয়াইফ’ নামের একটা গেম খেলার পরামর্শ দিয়েছে! আমি গেমের নাম শুনেই একদৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম। কৌতূহলী হয়ে আরও জানতে চাইলাম, ‘এই গেম কি তুমি খেলেছ? এই গেমে কী হয়?’ সে এখনো খেলেনি জানিয়ে যেমনটা বলল, গেমের মধ্যে হাজব্যান্ডকে ওয়াইফ আটকে রাখে। এখন হাজব্যান্ডকে সেই বাড়ি থেকে পালাতে হবে। এমনভাবে পালাতে হবে, যেন ওয়াইফ না দেখে! শুধু তা-ই না, আমি অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, আমার ৯ বছরের ছেলে অনেক সাবলীলভাবেই ‘হাজব্যান্ড’, ‘ওয়াইফ’ এবং সেই ওয়াইফ যে ‘ক্রেজি’—এ–সংক্রান্ত ধারণাগুলো আমাকে বলছে! আমার বিস্ময় বাড়তেই লাগল! সঙ্গে গেমের বিষয়বস্তুগুলোও আমাকে আগ্রহী করে তুলল!
মনে পড়ল, ‘প্রযুক্তি পাঠ’ নামের আমার ফেসবুক পেজের মেসেঞ্জারে বেশ কয়েকজন অভিভাবক লিখেছিলেন, গেম খেলা দেখাকালীন নির্দিষ্ট সময় পর তার সন্তানকে মুঠোফোন রাখতে বললেই সে বলে ওঠে, ‘দাঁড়াও! আমার পয়েন্ট তো এখনো পাইনি!’ অর্থাৎ এখান থেকে এটাও বোঝা যায়, মুঠোফোনে যে গেমটা খেলছে, সে নিজেও এই গেমের একজন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী বা গেমের কোনো নির্দিষ্ট চরিত্র। এবং গেমের ওই কাল্পনিক পরিবেশের নিয়ন্ত্রণ তার হাতেও আছে।
গেম সম্পর্কে ব্যক্তিগত এই অভিজ্ঞতা দুটোকে মিলিয়ে পড়লে এটার জন্য শিশুদের তীব্র আকাঙ্ক্ষা, বারবার পেতে চাওয়ার ইচ্ছা, দীর্ঘ সময় সেটাতেই বুঁদ হয়ে থাকার প্রবণতার পেছনের যে কারণ, সেটা সম্পর্কে আমার তিনটা পর্যবেক্ষণ গড়ে ওঠে:
১. গেমের বিষয়বস্তু;
২. গেমের রিওয়ার্ড সিস্টেম; এবং
৩. খেলোয়াড় নিজেই গেমের একজন চরিত্র যে সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
ডিভাইসকেন্দ্রিক পারিপার্শ্বিকতায় স্কিনটাইম শিশুর কাছে খুবই স্বাভাবিক
এখন প্রশ্ন, মিডিয়া আসলে স্বতন্ত্র একজন ব্যক্তিমানুষের আচরণকে, মনস্তত্ত্বকে কতটা প্রভাবিত করতে পারে? এই প্রশ্নটা আসলে এতটা সরল না, যতটা ভাবা হয়। কারণ, এই প্রভাব সব সময় পরিমাপ করা যায় না। এটা সব সময় একই ব্যাপ্তিতেও হয় না, আবার সবার ওপরে সমানভাবেও প্রভাব ফেলে না। কিন্তু প্রভাবন প্রক্রিয়াটা সব সময় চলতেই থাকে। কারণ, গণযোগাযোগ এমন একটা প্রক্রিয়া, যেটা মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের তৈরিকৃত সহজলভ্য কনটেন্ট এবং অডিয়েন্সের নির্মিত বার্তা—এই দুইয়ের মধ্যে সব সময় সাংকেতিক মিথস্ক্রিয়া সম্পাদন করতে থাকে (বারান ১৯৮৪)। এই প্রশ্নের উত্তরে যাওয়ার আগে প্রজন্ম আলফার বেড়ে ওঠা পারিবারিক কাঠামো, পারিপার্শ্বিকতার দিকে সংক্ষিপ্ত করে একবার নজর দেব।
এক: শিল্পায়নের কারণে মানুষ অনেক আগে থেকেই শহরমুখী হয়েছে, ছেড়েছে পৈতৃক ভিটাও। নতুন নতুন পেশার খোঁজে মানুষ এক শহর থেকে আরেক শহরে ছুটে গেছে। শহরের ছোট পরিসরে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট পরিবার, ভেঙে গেছে যৌথ পরিবার। এই সময় নারীশিক্ষার হার বৃদ্ধি পায়। শিল্পায়ন আর শহরমুখিতা মানুষের মননে যোগ করে আধুনিকায়ন। পরিবারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি এবার ব্যক্তিমানুষের নিজস্ব প্রয়োজন তৈরি হয়। পণ্যের প্রচার ও প্রসারে তত দিনে বিজ্ঞাপনের প্রচার শুরু হয়ে গেছে। গড়ে ওঠে ভোগবাদী সমাজ। ক্রমেই নারীরাও অর্থনৈতিক কাজে সংশ্লিষ্ট হয়ে ওঠে। যৌথ পরিবারের অনেক সদস্যের পরিবেশ আর নেই বললেই চলে। এ ধরনের একটা নিউক্লিয়ার পরিবারেই বেড়ে উঠছে প্রজন্ম আলফা, যার মা-বাবা মূলত প্রজন্ম মিলেনিয়াল কিংবা প্রজন্ম জুমার্স।
দুই: অতীত পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, প্রতিটা নতুন প্রযুক্তিই যোগাযোগে যুক্ত করেছে দ্রুতগতির বৈশিষ্ট্য। যোগাযোগের এই দ্রুততা বৃহৎ অর্থে সমাজে, মানুষের জীবনে যোগ করেছে তাৎক্ষণিকতার একটা প্রবণতা। প্রতিদিনকার প্রতিযোগিতার বাজারে আমরা প্রত্যেকেই এখন অনেক ব্যস্ত। এবং আমাদের অবসর সময়ও এখন দখল করেছে কাজের চাপ। এর অর্থ নির্দিষ্ট সময়ে সীমাবদ্ধ কর্মক্ষেত্রের বৈশিষ্ট্য প্রায় হারিয়েই যাচ্ছে বলা যায়। কর্মক্ষেত্র থেকে ফিরেও ডেস্কটপ, ল্যাপটপ কিংবা মুঠোফোনের মাধ্যমে প্রায় সব সময়ই আমরা আমাদের কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত। সব সময়ই কোনো না কোনো তথ্য আদান-প্রদান করতে হচ্ছে। ‘এখনই দরকার’—এই তাৎক্ষণিকতার একটা পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির গোলকধাঁধায় বন্দী হয়ে পড়েছে প্রজন্ম মিলেনিয়াল কিংবা প্রজন্ম জুমার্স। এ ধরনের একটা কাঠামোতে বেড়ে উঠছে প্রজন্ম আলফা।
এই দুই আর্থসামাজিক আর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব একটা শিশুর বেড়ে ওঠা এবং তার জগৎকে ক্রমেই আচ্ছন্ন করেছে। তারা মা-বাবার দীর্ঘ সান্নিধ্য, তাদের প্রাণোচ্ছল অবসর সম্পর্কে প্রজন্ম আলফার শিশুরা অবগত নয়। গুরুজনদের মায়াময় সাহচর্য যে আসলে কী—সেটা তারা জানেই না। মা-বাবার ডিভাইসকেন্দ্রিকতায় তারা অভ্যস্ত, সুতরাং যেকোনো ধরনের স্কিনটাইম তাদের কাছে খুবই স্বাভাবিক।
মিথক্রিয়াশীল ও অংশগ্রহণমূলক গেমের প্রভাব স্বভাবতই আরও বিস্তৃত
এবার শুরুর প্রশ্নে ফিরে আসা যাক, মিডিয়া স্বতন্ত্র একজন ব্যক্তির আচরণকে, মনস্তত্ত্বকে কতটা প্রভাবিত করতে পারে? মিডিয়া আবির্ভাবের পর থেকেই এই ক্ষেত্রের বেশির ভাগ গবেষণাই হয়েছে এই প্রশ্নকে সামনে রেখে। ১৯৬০ সালে আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী জোসেফ ক্যাপলার তাঁর একটা গবেষণায় উল্লেখ করেছিলেন, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়াদি সব সময়ই মিডিয়ার সরাসরি প্রভাবের মধ্যে ‘মধ্যস্থতা’ করে। তিনি এর পেছনে যুক্তি দেন, এসব মধ্যস্থতাকারী বিষয়াদির জন্যই মিডিয়া আরও নিয়মিতভাবে একজন ব্যক্তির আচরণ, মনোভাব এবং মূল্যবোধকে দৃঢ় করে এবং এরপর এটাকে পরিবর্তন করে। তিনি তাঁর গবেষণার পরিসমাপ্তি ঘটান এভাবে যে যদিও মিডিয়া দর্শকের উদাসীন, নিষ্ক্রিয় অথবা আক্রমণাত্মক আচরণের কারণ না, তবে দর্শকের মধ্যে যে আচরণগুলো বর্তমান থাকে, সম্ভবত সেটাকেই শক্তিশালী, দৃঢ় করে তোলে (ডমিনিক ১৯৯০)।
১৯৬১ সালে কানাডিয়ান মনোবিজ্ঞানী আলবার্ট বান্দুরা এবং তাঁর সহকর্মীরা দেখান যে কীভাবে শিশুরা অন্যদের পর্যবেক্ষণ করে এবং সেটা অনুকরণ করে নতুন আচরণ আয়ত্ত করে। তাঁদের গবেষণায়, প্রি-স্কুল শিশুদের এমন কিছু সিনেমা দেখানো হয়, যেখানে মডেলগুলো বোবো পুতুলের ওপর সহিংস আচরণ করে। সিনেমায় দেখানো হয়, এই আচরণের জন্য কিছু মডেলকে পুরস্কৃত করা হয়, আর কিছু মডেলকে শাস্তি প্রদান করা হয়। যখন শিশুদেরকে একই পরিস্থিতিতে খেলার জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়, লক্ষ করা যায় যে তারাও মডেলগুলোর অনুকরণে একই কাজ করছে। এটাও দেখা যায় যে যারা এই কাজের জন্য পুরস্কৃত হয়েছে, কিংবা যদি তারা সিনেমায় দেখে যে মডেলগুলোকে তাদের সহিংসতার জন্য পুরস্কৃত করা হয়েছে, তাহলে সেই শিশুরা অধিক সহিংস আচরণ করছে। যারা সহিংস সিনেমাটা দেখেনি, তাদের মধ্যে এই আচরণ দেখা যায়নি।
অর্থাৎ শিশুরা যে অনুকরণপ্রিয়—এই বাক্যটির যথার্থ প্রমাণ বহন করে ওপরের গবেষণা। আর এটার পেছনের কারণ হিসেবে মানুষের মস্তিষ্কের মিরর নিউরনের কথা বলা হয়। মিরর নিউরন একটা বিশেষ ধরনের স্নায়ুকোষ, যেটা একজন ব্যক্তি যখন কোনো কাজ করে এবং যখন সে অন্যের করা কোনো কাজ পর্যবেক্ষণ করে—এই দুই ক্ষেত্রেই প্রতিক্রিয়া প্রদান করে, বা সক্রিয় থাকে। অর্থাৎ আমাদের মস্তিষ্ক অন্যদের ক্রিয়াগুলোকে প্রতিবিম্বিত করে, যা সম্ভাব্যভাবে অন্যদের বোঝার, তাদের থেকে শেখার এবং সমানুভূতির ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে (উইনারম্যান ২০০৫: ৪৮)।
আলোচনার এই পর্যায়ে আরেকটা গবেষণার উল্লেখ না করলেই নয়। ১৯৭২ সালে টেলিভিশন অ্যান্ড সোশ্যাল বিহেবিয়ার শীর্ষক পাঁচ খণ্ডের সার্জন জেনারেল রিপোর্ট প্রকাশ হওয়ার পর কানাডিয়ান গবেষক মনস্তত্ত্ববিদ এবং শিক্ষক ট্যানিস ম্যাকবেথ উইলিয়ামস জানতে পারেন, কানাডার ছোট একটা শহরে তখন পর্যন্ত টেলিভিশন পৌঁছায়নি। কিন্তু এক বছরের মধ্যেই এটা পৌঁছে যাবে। এই সময়েই তিনি দ্রুত কোনো কৃত্রিমতাবর্জিত একটা প্রাকৃতিক জায়গা থেকে গবেষণার সুযোগ পেয়ে যান। অর্থাৎ এই গবেষণায় গবেষকরা টেলিভিশন দেখার ক্ষেত্রে কৃত্রিম উপায়ে পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করেননি। এ জন্যই এই গবেষণাকর্ম ব্যতিক্রম।
এই গবেষণার মাধ্যমে দেখার চেষ্টা করা হয়, শিশুদের ওপরে টেলিভিশনকেন্দ্রিক সহিংসতা কী ধরনের প্রভাব ফেলে—এই প্রসঙ্গে শহরে টেলিভিশন আসার আগে এবং পরে তাদের আচরণগুলো পর্যবেক্ষণ করা হয় (মারে ১৯৯৪)। এই আচরণের তুলনা করা হয় তাদের পার্শ্ববর্তী দুটি শহরে, যেখানে টেলিভিশন প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। এই গবেষণায় তিনটা শহরকে বাছাই করা হয়। তিনটা শহর হলো নোটেল (যেখানে টেলিভিশন পৌঁছায়নি), ইউনিটেল (একমাত্র সরকার-মালিকানাধীন বাণিজ্যিক চ্যানেল সিবিসি প্রচারিত হয়) এবং মাল্টিটেল (সিবিসি এবং আমেরিকান বাণিজ্যিক টেলিভিশন নেটওয়ার্ক—এবিসি, সিবিএস ও এনবিসি আছে)। এই গবেষণায় এটা বোঝার চেষ্টা করা হয় যে টেলিভিশন কীভাবে শিশুদের চিন্তা, পড়াশোনা, শব্দভান্ডার এবং অবসরের কাজের পরিবর্তন করে। একই সঙ্গে বড়দের কোনো সমস্যার সমাধানের পদ্ধতি, শিশুদের সহিংসতামূলক আচরণ এবং জেন্ডারসংক্রান্ত বিষয়ে তাদের আচরণের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে।
এই তিন শহরের শিশুদের পর্যবেক্ষণ করা হয়, প্রথমত, যখন নোটেল শহরে টেলিভিশনের সংযোগ পৌঁছায়নি। দ্বিতীয়ত, সেখানে টেলিভিশন সংযোগ পৌঁছানোর দুই বছর পর। গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, প্রথম সময়ে তিনটা শহরের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু দ্বিতীয় সময়ে নোটেল শহরের শিশুরা ইউনিটেল অথবা মাল্টিটেল শহরের তুলনায় শারীরিক ও ভাষাগত—দুই দিক থেকেই অধিক সহিংস। অধিকন্তু প্রথম পর্যায় থেকে দ্বিতীয় পর্যায় পর্যন্ত, শুধু নোটেল শহরের শিশুদের ক্ষেত্রেই শারীরিক ও মৌখিক আগ্রাসনের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গেছে। একই সঙ্গে পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ হ্রাস, জ্ঞানীয় দক্ষতা কমতে থাকে, তথাকথিত প্রচলিত জেন্ডার ভূমিকা ধারণ করা, দলীয় কার্যক্রমে কম অংশগ্রহণ।
এখানে আরও একটা বিষয় লক্ষণীয়, যে শহর দুটিতে আগে থেকেই টেলিভিশন ছিল, সেখানকার তুলনায় নতুন টেলিভিশন আসা শহর নোটেলে তুলনামূলক বেশি সহিংসতামূলক আচরণ লক্ষ করা যায়।
অর্থাৎ মিডিয়া শিশুর আচরণে প্রভাব ফেলছে কি না—এ–সম্পর্কিত আলোচনা থেকে পাঁচটা নিয়ামক পাওয়া যায়:
১. সামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিক বিষয়াদির উপস্থিতি;
২. অনুকরণপ্রবণতা;
৩. পুরস্কারের মাধ্যমে উৎসাহিত;
৪. দীর্ঘ মেয়াদে প্রভাব; এবং
৫. নতুন জিনিসের প্রতি মানুষের স্বভাবজাত আগ্রহ।
উল্লেখ্য, টেলিভিশন একমুখী মাধ্যম অন্যদিকে মোবাইল গেম দ্বিমুখী বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। একমুখী মাধ্যম হিসেবে টেলিভিশনই যদি শিশুদের আচরণ ও মননে এতটা গভীরভাবে বিস্তার করতে পারে, সেখানে গেমের মতো মিথক্রিয়াশীল ও অংশগ্রহণমূলক মাধ্যম যে আরও বিস্তৃত প্রভাব ফেলতে সক্ষম—এটা সহজেই অনুমান করা যায়।
আপাতত অনুসন্ধানে শুধু বর্তমানকে অনুধাবন
বেশ কয়েক দিন আগে আমার ছেলে বলছিল, ‘মিমনি, জানো, আমি দেখেছি, রিকশাগুলোর নিচে গেমের মতো ক্রোবার আছে! তুমি দেখোনি? আচ্ছা তোমাকে দেখাব!’ আমি মৃদু হাসলাম। সে তার জগৎকে গেমে দেখা ভিজ্যুয়ালের সঙ্গে মিলিয়ে পাঠ করছে!
আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির স্নায়ুবিজ্ঞানীদের পরিচালিত এক গবেষণায় দেখেছিলাম, মস্তিষ্ক মাত্র ১৩ মিলিসেকেন্ডের মধ্যে দেখা একটা ছবি শনাক্ত করতে পারে (ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি ২০১৪)।
প্রজন্ম আলফা আচরণগতভাবে, মনস্তাত্ত্বিকভাবে যে ভিন্ন একটা ছাঁচে কাঠামোবদ্ধ হচ্ছে, এটার ইশারাগুলো খালি চোখেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। তাদের অভিভাবক হিসেবে প্রজন্ম মিলেনিয়ালের ’৯০-এর দশকের শৈশবকাল আর আজকের প্রজন্ম আলফার গড়ে ওঠা, বেড়ে ওঠার সময়কাল, পারিপার্শ্বিকতা, সমাজব্যবস্থার মধ্যে গুণগত অমিলগুলোও স্পষ্ট। অভিভাবক হিসেবে তাদের কেন্দ্র করে আমাদের নিজেদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাগুলো, আমাদের গণ্ডি পার হয়ে একটু দূরের ঘটনাগুলো—সবগুলো থেকে প্রাপ্ত ভিন্ন ভিন্ন প্রভেদগুলোকে একটা সুনির্দিষ্ট পাটাতনে দাঁড় করানো যায়। দাঁড় হওয়া সেই পাটাতনের বৈশিষ্ট্যগুলো নিশ্চিতভাবে আর ভিন্ন যে হবে না, এটাও জোরগলায় দাবি করাই যায়। এই কাজটাই পরবর্তী সময়ে করার ইচ্ছা থাকল। বর্তমান আলোচনায় তাদের এই অভিন্ন পাটাতনের পেছনে সরলভাবে যে মোবাইলে গেমের দিকেই আঙুল তোলা হচ্ছে, এটা আসলে কতটা প্রাসঙ্গিক, তার জন্যও গবেষণার প্রয়োজন আছে। তবে আপাতত এই বিষয়টা আমাদের পারিপার্শ্বিকতা পরিমিত কিছু ঘটনা, প্রাসঙ্গিক গবেষণা এবং সামাজিক সত্তা-প্রতিষ্ঠান-কাঠামোগুলোর মধ্যকার সামগ্রিক সম্পর্কতত্ত্বের দিক থেকে আলোচনা করার চেষ্টা করা হলো। এটা আমাদের বর্তমান অবস্থা বুঝতে সহায়তা করবে— বলেই প্রত্যাশা।
তথ্যসূত্র
উইনারম্যান ২০০৫।। Lea Winerman, ‘The Mind’s Mirror’, Monitor on Psychology, বর্ষ ৩৬, সংখ্যা ৯, অক্টোবর, পৃ. ৪৮, <https://www.apa.org/monitor/oct05/mirror>, প্রবেশ: ২২ মে ২০২৬।
ডমিনিক ১৯৯০।। Joseph R. Dominick, The Dynamics of Mass Communication, তৃতীয় সংস্করণ, ম্যাকগ্রো-হিল পাবলিশিং কোম্পানি।
বারান ১৯৮৪।। Stanley J. Baran, Self, Symbols & Society: An Introduction to Mass Communication, Addison Wesley Publishing Company ।
গটফ্রিড ও সিদোতি ২০২৪।। Jeffrey Gottfried and Olivia Sidoti, ‘Teens and Video Games Today’, ৯ মে, পিউ রিসার্চ সেন্টার, <https://www.pewresearch.org/internet/2024/05/09/teens-and-video-games-today/>, প্রবেশ: ২২ মে ২০২৬।
মারে ১৯৯৪।। John P. Murray, ‘Impact Of Televised Violence’, Hofstra Law Review, জানুয়ারি, পৃ. ৪, file:///C:/Users/Hp/Downloads/IMPACT_OF_TELEVISED_VIOLENCE.pdf।
ম্যাকক্রিন্ডল ও ফেল ২০২০।। Mark McCrindle and Ashley Fell, Understanding Generation Alpha, McCrindle Research, <https://generationalpha.com/wp-content/uploads/2020/02/Understanding-Generation-Alpha-McCrindle.pdf>, প্রবেশ: ২২ মে ২০২৬।
ম্যাসাচুসেটস ২০১৪।। Massachusetts Institute of Technology, ‘In the Blink of an Eye’, MIT News, <https://news.mit.edu/2014/in-the-blink-of-an-eye-0116y>, প্রবেশ: ২২ মে ২০২৬।
ল্যাং ২০১৯।। অলিভিয়া ল্যাং, ‘যেকোনো বিষয়ে মানুষের মধ্যে আসক্তি তৈরি হয় কেন?’ ২২ নভেম্বর, বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস, <https://www.bbc.com/bengali/news-50511343>, প্রবেশ: ২২ মে ২০২৬।
স্কুটি ২০১৭।। Susan Scutti, ‘WHO to Recognize Gaming Disorder as Mental Health Condition in 2018’, ২৭ ডিসেম্বর, সিএনএন, <https://edition.cnn.com/2017/12/27/health/video-game-disorder-who>, প্রবেশ: ২২ মে ২০২৬।
লেখক পরিচিতি
জান্নাতুল রুহী বর্তমানে কর্মরত আছেন ঢাকার দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস সংবাদপত্রের জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক হিসেবে। স্নাতকোত্তর ও স্নাতক ডিগ্রি নিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে। জাতীয় দৈনিকগুলোতে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করছেন। ২০২৪ সালের বইমেলায় অন্তর্জাল গণমাধ্যমের বাণিজ্যিকতা: যোগাযোগ, সাংবাদিকতা এবং সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে একটি বিশ্লেষণ (শ্রাবণ) শিরোনামে তার প্রথম মৌলিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া করপোরেট মিডিয়ার সাংস্কৃতিক আগ্রাসন (শ্রাবণ, ২০০৯) এবং সংবাদ উৎপাদনের সমাজতত্ত্ব (শ্রাবণ, ২০১৪) শিরোনামে যৌথ চেষ্টায় তাঁর দুটি অনুবাদগ্রন্থ রয়েছে। তাঁর আগ্রহের জায়গা হলো জেনারেশন-মিডিয়া রিলেশনশিপ, মিডিয়া-স্পোর্টস আন্তসম্পর্ক, সামাজিক মিডিয়া এবং সংবাদ কনসেপ্ট নিয়ে।