মধ্যদ্বিত্ব সমাজ : রাজনৈতিক মধ্যবর্গ পরিচিতি

সারকথা


এই প্রবন্ধে লেখক ‘মধ্যদ্বিত্ব’ ধারণার মাধ্যমে বাংলাদেশসহ বিশ্বপরিসরে মধ্যবিত্তের দ্বৈত, দোদুল্যমান ও স্বার্থরক্ষামুখী চরিত্র বিশ্লেষণ করেছেন। লেখকের মতে, মধ্যবিত্ত কেবল আয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত কোনো অর্থনৈতিক শ্রেণি নয়; বরং এটি একটি মানসিকতা, সাংস্কৃতিক অবস্থান ও সামাজিক বর্গ। এই বর্গ অন্যায়-অবিচারে ক্ষুব্ধ হলেও দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামে স্থির থাকে না; ন্যায়, সাম্য ও গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নিলেও ক্ষমতা, যশ, নিরাপত্তা ও জাগতিক সুবিধার প্রলোভনে দ্রুত আপস করে। মার্ক্সীয় ব্যাখ্যায় মধ্যবিত্তের শ্রেণিচেতনার অভাব, উৎপাদনযন্ত্রে অস্পষ্ট ভূমিকা এবং রক্ষণশীল প্রবণতা তাকে ‘মধ্যদ্বিত্ব’ চরিত্রে রূপ দেয়। প্রবন্ধে রিচ ড্যাড, পুওর ড্যাড দর্শন, স্মার্ট ইনভেস্টমেন্ট, এমএলএম বা পিরামিড স্কিম এবং আত্মোন্নয়ন-বাণিজ্যের উদাহরণ দিয়ে দেখানো হয়েছে কীভাবে বিশ্বায়ন ও নয়া-উদার বাজারচিন্তা মধ্যবিত্তকে চিত্তের উন্নয়ন থেকে সরিয়ে বিত্তকেন্দ্রিক উদ্বেগে আবদ্ধ করছে। পশ্চিমে কল্যাণরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা মধ্যবিত্তকে একসময় গণতান্ত্রিক ও সামাজিক নেতৃত্বে শক্তিশালী করলেও সাম্প্রতিক সময়ে তারাও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ও আত্মোন্নয়ন-নির্ভর উদ্বেগে আক্রান্ত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে লেখক দেখান, এখানকার মধ্যবিত্তের বিকাশ ঐতিহাসিকভাবে অসম্পূর্ণ; ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা ও নগরায়নের পরও গণতন্ত্রহীনতা, দুর্নীতি, সুবিধাবাদী রাজনীতি এবং দুর্বল নাগরিক সমাজ তাকে পরিণত মধ্যবিত্তে নয়, বরং দিকনির্দেশনাহীন মধ্যদ্বিত্বে রূপ দিয়েছে। ফলে বাংলাদেশে গণতন্ত্রহীনতা ও সর্বাত্মকবাদী রাষ্ট্রের ঝুঁকির পেছনে এই মধ্যদ্বিত্ব বর্গের আপসকামীতা ও রাজনীতিবিযুক্ততাকে লেখক গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

কৈফিয়ত

‘মধ্যদ্বিত্ব' ধারণাটির সঙ্গে ‘দ্বৈততা’ শব্দটির যতটা যোগাযোগ, ‘বিত্তের’ সংযোগ ততটাই কম। সাধারণভাবে (বিশেষ ব্যতিক্রম ছাড়া) মধ্যবিত্ত বর্গটির দ্বৈততার মূলে রয়েছে বৈপরীত্য, দোদুল্যমানতা ও ভীতিপ্রবণতা। রাষ্ট্র ও সমাজের যেকোনো অন্যায়-অনাচারে তারা বিক্ষুব্ধ হয়। পরিবর্তনের জন্য মাঠেও নামে দ্রুততার সঙ্গে। আবার মাঠ ছাড়েও ততোধিক দ্রুততার সঙ্গেই। বর্গটি সত্য, ন্যায় ও সামাজিক সাম্যের বাণীতে আকৃষ্ট হয়—এসবের প্রতিষ্ঠায়ও নামে। আবার নাকের সামনে যশ-ক্ষমতা-প্রতিপত্তি ও জাগতিক লাভ-লোভের মুলা ঝুলিয়ে দিলে বর্গটির বড় অংশই পিঠটান দেয় । এই আলোচনা একেবারে নতুন তা-ও নয় । কার্ল মার্ক্স মধ্যবিত্তকে শ্রেণি না বলে ‘লুম্পেন বুর্জোয়া’ বলেছেন। কারণ, শ্রেণি হতে ‘শ্রেণিচেতনা' লাগে। সেই গোষ্ঠীতাড়না এই বর্গটির মধ্যে নেই। উৎপাদনযন্ত্রেও তাদের ভূমিকা এক রকমের নয়, বরং বহুধাবিভক্ত ও বহুবিচিত্র । তারা নিজেদের বর্তমান অবস্থা ছাড়িয়ে তরতরিয়ে দ্রুত ওপরে উঠে যেতে আপ্রাণ চেষ্টা করে। কিন্তু কোনোভাবেই নিচে নেমে যাওয়া মেনে নিতে পারে না। দৈবক্রমে ঘটলেও না। যদিও তারা উঠে আসে ওই নিম্নবর্গ থেকেই । ‘স্ট্যাটাস ক্যু’ বা বহাল অবস্থা টিকিয়ে রাখার দুর্লঙ্ঘ্য তাগিদে তাদের চেষ্টাই এ রকম—ওপরে ওঠা না যাক, কোনোভাবেই যেন নিচে নামতে না হয় ।

মধ্যদ্বিত্বের এই বৈপরীত্য রাজনীতির মাঠের মধ্যম বর্গকে স্বৈরাচারী ও লুটেরা বানায়, নতুবা স্বৈরাচারের সহযোগী বানিয়ে ছাড়ে। তারা ‘টু বি অর নট টু বি’, ‘হব কি হব না’, ‘করব কি করব না’, ‘ঠিক হবে কি হবে না'-জাতীয় দোদুল্যমানতার ধ্রুপদি দৃষ্টান্ত। তবে পশ্চিমে, বিশেষত কল্যাণরাষ্ট্রগুলোর মধ্যম বর্গ দোদুল্যমানতাসহ অন্য সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে উঠতে পেরেছে। সে দিকটি বিবেচনায় নিলে মধ্যম বর্গটিও তিন রকমের : মধ্যবিত্ত (পশ্চিমে), মধ্যম বর্গ (এশিয়ায়, বিশেষত সার্কভুক্ত দেশগুলোতে) এবং মধ্যদ্বিত্ব (বাংলাদেশে)। বাংলাদেশের মধ্যম বর্গটি শুধু মধ্যদ্বিত্ব রয়েই যায়নি, মধ্যম বর্গ বা মধ্যবিত্ত হওয়ার রাস্তা থেকে ছিটকেও পড়ছে। এ অবস্থানের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। মোটাদাগে এই নিবন্ধের পাদটীকাধর্মী সিদ্ধান্ত এই যে গণতন্ত্রহীনতাসহ বাংলাদেশ যে সর্বাত্মকবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে, তার পেছনে মধ্যদ্বিত্ব অনেকটাই দায়ী। ‘শ্রেণি’ ও ‘বর্গ’ ধারণা দুটিকে এই আলোচনায় পরস্পরনির্ভর হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাই স্থানে স্থানে ইচ্ছাকৃতভাবে দুটি প্রত্যয়ই ব্যবহার করা হয়েছে। এই নিবন্ধটি ‘মধ্যদ্বিত্ব' আলোচনার প্রথম পর্ব। পরিচিতি পর্ব বা প্রাক্-বিশ্লেষণ পর্বও বলা যেতে পারে। পরবর্তী আরেকটি পর্বে ‘বাংলাদেশের মধ্যদ্বিত্ব’ বিকাশধারার পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনার চেষ্টা থাকবে।

‘রিচ ড্যাড, পুওর ড্যাড’ দর্শন ও বিশ্বের মধ্যবিত্ত


রিচ ড্যাড, পুওর ড্যাড শিরোনামে একটি বই যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বে বিপুল পাঠকপ্রিয় হয়েছে। বইটির মূল বক্তব্য মজাদার। মাঝারি চিন্তার বোকাসোকা, অনুদ্যোগী ও সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা মধ্যবিত্ত রয়ে গেলেন তো সব শেষ । আগামী দিনগুলো ভীষণ নাজুক হয়ে উঠবে মধ্যবিত্তের জন্য। তারা গরিব হয়ে পড়বে। প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকতে হলে শুধু জ্ঞানবিজ্ঞান ও মানুষের ভালোমন্দ ভাবলে হবে না। তাতে ব্যক্তিগত ভালোমন্দ শিকেয় উঠবে। রবার্ট কিয়োসাকি ও রবার্ট লেকটার নামের দুজন লেখকের লেখা এই বই কোনো গবেষণাধর্মী জ্ঞানদানকারী বিদ্যা নয়। কিন্তু বইটির প্রচার-প্রচারণা ও দর্শনের আলোকে পাশ্চাত্যে 'স্মার্ট ইনভেস্টমেন্ট' নামে একটি ধারণা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। মধ্যম আয়ের এক বিশাল জনগোষ্ঠী স্মার্ট ইনভেস্টর হতে গিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে। বইটির সারকথা : 'নগদ যা পাও হাত পেতে নাও' দর্শন ছাড়া স্মার্ট দর্শন আর কিছুই নেই । নিজের ভালো পাগলকেও বুঝতে হবে। নজর একদিকেই নিবদ্ধ করে রাখতে হবে । জানতে হবে, কোথায় কোন বিনিয়োগ লাভ আনবে । নজর রাখতে হবে পত্রিকার বাণিজ্য পাতায়, টিভির বাণিজ্য চ্যানেলে স্টক মার্কেটে দর ওঠা-নামার ধরনের দিকে।

কিয়োসাকি ও লেকটার অজস্র লেখা, সাক্ষাৎকার ও ভিডিও আলোচনা দিয়ে মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক ত্রাতা হিসেবে হাজির হয়েছেন। তাঁদের এককাট্টা বক্তব্য এই যে, একবিংশ শতাব্দীকে চিহ্নিত করতে হলে স্মার্ট ইনভেস্টমেন্ট দিয়েই চিনতে হবে। উন্নয়নতত্ত্ব, অনুন্নয়ন ও নির্ভরশীলতার ধ্রুপদি তত্ত্বগুলোর আলোচনাকালেও আমরা আধুনিকায়নের তাত্ত্বিকদের জেনেছিলাম ও চিনেছিলাম। তাঁরাও এ রকমই ভাবতেন যে আধুনিকায়ন হলে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন কানায় কানায় পূর্ণ হলে তার প্রভাবে অতিরিক্ত উন্নয়ন নিচে চুইয়ে পড়বে বা ‘ট্রিকল ডাউন' হবে। অর্থাৎ উচ্ছিষ্টভোগের অর্থনীতিও একটা অর্থনীতি। তবে সমাজবিজ্ঞানীদের পক্ষে এ অবস্থান মেনে নেওয়া কষ্টকর। কারণ, এ অবস্থায় সমাজ-সংগঠন ও সামাজিক স্তরবিন্যাসের ধরন-ধারণ বোঝা কঠিন। সে কারণে সামাজিক সংস্কার বা মানবকল্যাণ বিষয়ে কার্যকর কোনো নীতিমালা তৈরি বা পরামর্শ প্রদানও তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।

কিয়োসাকি ও লেকটারের মনোভাব বইটির সংক্ষিপ্ত কলেবরে না আঁটলেও বইয়ের বাইরের আলোচনা-বিতর্ক থেকে স্পষ্ট। দেশ-সমাজ-মানুষ কিংবা নৈতিকতা-সামাজিক ন্যায়বিচার-শান্তি-সুস্থিতি ইত্যাদি নিয়ে ভাবার জন্য রয়েছে রাষ্ট্র ও জনপ্রতিনিধিরা। বিনিয়োগকারী মধ্যবিত্ত গোষ্ঠী রাষ্ট্রের শিরা-উপশিরায় অর্থ সঞ্চালন করতে পারলে রাষ্ট্রও তাদের স্বার্থ রাখবে এবং ভালোমন্দের দেখভাল করবে । রাষ্ট্র তাদের ওপরই নির্ভরশীল হবে। তাই রাষ্ট্রকেই ছেড়ে দিতে হবে স্থান । বাজারে যারা টিকে থাকবে—যারা যোগ্যতমের ঊর্ধ্বতম—রাষ্ট্র তাদের কথাই শুনবে। সেটিই স্বাভাবিক। পিছিয়ে পড়া, পরাজিত, অথর্ব, কর্মোদ্যোগহীন, অহেতুক মালটানা-ঠেলাটানা মেহনতিদের দুর্ভাগ্যের দায় তাদের নিজেদেরই। অস্কার লিউইস যেমনটি বলেছেন ‘কালচার অব পোভার্টি’–দারিদ্র্যের সংস্কৃতি। দরিদ্ররা দারিদ্র্যের কারণেই নিজেদের আচার-আচরণে নানা রকম দারিদ্র্য আমদানি করে। তাদের আচরণগত কারণে দরিদ্রতা আরও বাড়ে। মধ্যবিত্ত পিছলে পড়ে ভুলেভালেও কখনো দরিদ্রের কাতারে পড়ে গেলে, দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে তাদের আরও বেশি তলিয়ে যেতে হবে। তখন উঠে আসার বা ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনারও বিনাশ ঘটবে। এমন মনোভাবই কিয়োসাকি ও লেকটারের নানা আলোচনায় কখনো স্পষ্ট, কখনো প্রচ্ছন্নভাবে দেখা যায়। তাঁদের বক্তব্যে ছলচাতুরী নেই। তাঁরা সরাসরিই প্রশ্ন তুলছেন যে মধ্যবিত্ত কেন প্রযুক্তি ও আধুনিকতার ধারক-বাহক ও উদ্ভাবক হওয়ার জন্য চেষ্টারত থাকবে না? অন্য যত রকম চাপই থাকুক না কেন, মধ্যবিত্তকে সবকিছুর আগে অর্থনৈতিক চাপ কাটিয়ে ওঠার সক্ষমতা অর্জন করতেই হবে। শুধু ধনিক গোষ্ঠী ও শিল্পোদ্যোক্তারাই বাণিজ্য ও বিনিয়োগ করবে—এ রকম ধারণা ছেড়ে মধ্যবিত্তকে বিত্তনির্ভর জীবনধারা টিকিয়ে রাখার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। রিচ ড্যাড, পুওর ড্যাড দর্শন কীভাবে বিশ্বময় মধ্যবিত্তকে মধ্যদ্বিত্বে পরিণত করছে, বিষয়টি বুঝতে মধ্যবিত্ত ও মধ্যদ্বিত্ব ধারণায় আলোকপাত করা প্রয়োজন। দুনিয়ার মধ্যবিত্ত যে রিচ ড্যাড, পুওর ড্যাড দর্শনের ফাঁদে পড়েছে, তার বিস্তারিত প্রমাণ উপস্থাপনের আগে মধ্যবিত্তের শ্রেণিচরিত্রেও আলোকপাত করা দরকার ।

মধ্যবিত্ত, বিত্ত ও চিত্তসম্পর্ক

‘মধ্যবিত্ত’ শব্দটির শরীরে ‘বিত্ত’ শব্দটি লেপ্টে থাকায় স্থূল অর্থে ‘মধ্যবিত্ত’র অর্থবান চেহারা আমাদের মানসে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেছে। মধ্যবিত্ত আসলে শ্রেণি নয়। কারণ, মধ্যবিত্ত কোনো অর্থনৈতিক বর্গ নয়। বর্গটি উৎপাদনযন্ত্রের মালিকানা-অমালিকানার ছকে পড়ে না। সোজা কথা, মধ্যবিত্তরা মালিকও নয়, শ্রমিকও নয়। তাদের শ্রেণিচেতনাও নেই। তারা পরিবর্তন বা বিপ্লবের উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক সংঘও গড়ে না। মার্ক্সীয় 'শ্রেণি' বিচারের ছকেও পড়ে না তারা। কার্ল মার্ক্স তাই তাদের খেতাব দিয়েছেন 'লুম্পেন বুর্জোয়া' বা নিম্নতর ধনিকমনা গোষ্ঠী বলে। মার্ক্সীয় সমাজবিজ্ঞানীদের বিচারে তারা ধনিক নয়, উৎপাদনযন্ত্রে মালিকানাও নেই। তবে তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং আগ্রহ রয়েছে উভয়টিই অর্জন করার। তারা সেই অর্জনটিও চায় সহজসাধ্য ও অবৈপ্লবিক উপায়ে। কারণ, বিপ্লব-বিদ্রোহকে মধ্যবিত্ত বিশৃঙ্খলা ও অস্থিতিশীলতা মনে করে।

মার্ক্সীয়দের সঙ্গে সহমত রেখে অমার্ক্সীয়রাও মনে করেন, মধ্যবিত্তের কতগুলো সর্বজনীন বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন তারা শহুরে বা শহরমুখী। বিদ্যাশিক্ষা ও জ্ঞান- বিজ্ঞানের প্রতি ঝোঁক থাকে তাদের। ফলে তারা শিক্ষিত ও সংবেদনশীল। বিশ্বের আনাচকানাচে কী ঘটছে, সেসব তথ্য জানা ও কাজে লাগানোয় তারা খুব পটু। ধর্ম, ন্যায়শাস্ত্র ও নীতিশাস্ত্রের প্রতি তাদের অগাধ ভক্তি। সমাজপাঠ ও বিশ্লেষণে তারা যুক্তি ও বিজ্ঞানের আশ্রয় নিয়ে থাকে। সর্বোপরি, সংস্কৃতি- শিল্পকলা, নন্দনতত্ত্ব ও সাহিত্যের চর্চা ও বিকাশে বর্গ-সদস্যদের আগ্রহের কমতি হয় না । অর্থাৎ মধ্যবিত্ত একটি সাংস্কৃতিক বর্গও বটে। ধনী ও দরিদ্রদের মাঝামাঝি সামাজিক অবস্থানে থাকায় শ্রেণিটি স্থিতিস্থাপক ও উদার। তারা দরিদ্রদের জীবনধারার সঙ্গেও পরিচিত, ধনীদের মনোভাব পাঠেও সক্ষম। ওয়েবারিয় ভাবধারা অনুযায়ী মধ্যবিত্ত অবশ্যই একটি ‘শ্রেণি’। অমার্ক্সীয় ঘরানা, বিশেষত ম্যাক্স ওয়েবারপন্থীদের বিচারে সব বর্গকেই শ্রেণি বলা যায়; তাতে দোষ হয় না। সে অর্থে মধ্যবিত্তও একটি শ্রেণি। তবে তাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের গুণাবলি ও ধীমত্তা এবং নমনীয় মধ্যমপন্থী অবস্থানের কারণে তাদের মধ্য থেকে সহজেই 'ব্যবস্থাপক শ্রেণি'র উদ্ভব ঘটে। ব্যবস্থাপকদের মধ্যে পরিচালক, সংগঠক, আয়োজক এমনকি স্বেচ্ছাসেবক শ্রেণিরও উদ্ভব ঘটে। রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনায় যারা উঠে আসে, তারাও সামাজিক মধ্যম বৰ্গ থেকেই এসে থাকে। ফলে বিশ্বজুড়েই 'মধ্যবিত্ত' রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজনীতির অন্যতম প্রভাবক শক্তি। ওয়েবারও বর্গটিকে দেখেছেন একটি ‘আইডিয়াল টাইপ’ বা আদর্শ নমুনা হিসেবে। 'সিভিল সোসাইটি' আধুনিক মধ্যবিত্তের শাণিত ও সরব অংশ। তারাই ‘আইডিয়াল টাইপ'। কারণ, তারা বুদ্ধি, প্রজ্ঞা, শিক্ষা ও দেশপ্রেমের আলোকে রাজনীতি এবং সমাজনীতিকে গণতান্ত্রিক ও জনবান্ধব করে তোলায় সবচেয়ে শক্তিশালী ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। (সিভার্স ২০১০, হজকিনসন ২০০৩ )

‘মধ্যদ্বিত্ব’ : মধ্যবিত্ত-শ্রেণিচরিত্র

সামাজিক কাঠামো ও স্তরায়ন আলোচনায় সামাজিক বিজ্ঞান যথেষ্ট অগ্রগামী। তবু উনিশ শ ষাটের দশক থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত সামাজিক স্তরবিন্যাসের ছকে মধ্যবিত্তের অবস্থান বিষয়ে সমাজবিজ্ঞানীরা ভিন্ন ভিন্ন ধারণা-দলে বিভক্ত হয়ে পড়েন। বিভক্তির কারণ, মার্ক্সীয় বিপ্লবপন্থীরা মনে করছিলেন, মধ্যবিত্ত বিপ্লব ও সমাজ পরিবর্তনের জন্য ক্ষতিকর একটি বর্গ। কারণ, বর্গটি দ্বিচারী। দ্বৈততা, দোদুল্যমানতা ও সংশয় তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। কোথাও লাভের বা অর্জনের সম্ভাবনা দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের বেলায়ও তারা অতিরিক্ত সতর্ক। আগপাছ ভাবাভাবিতেই বেশি মত্ত থাকে তারা। তারা পুঁজিবাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী, পৃষ্ঠপোষক এবং তারা ধনিকপন্থী। সামাজিক- অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে মাঝারি অবস্থানে থাকায় তাদের সমাজসচেতনতাও মাঝারি মানের। উন্নত দর্শনের চর্চার বদলে স্বাচ্ছন্দ্যে খেয়ে-পরে শান্তিতে দিন কাটানোর বাইরে তাদের বড় কোনো লক্ষ্য বা ভুবনদৃষ্টি নেই।

মধ্যবিত্ত মাঠের বিপ্লবী রাজনীতির মাধ্যমে সামাজিক সাম্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বদলে নিজেদের টিকে থাকাকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। স্বার্থপরতাই তাদের বৈশিষ্ট্য। নিম্নবর্গের সামাজিক ও রাজনৈতিক অর্থনৈতিক বঞ্চনা তাদের তাড়িত করে না। তারা আপসকামী। দুর্নীতিতেও সমান পারদর্শী। বিপদ দেখলেই সটকে পড়ে। সর্বোপরি তারা অনির্ভরশীল ও অনির্ভরযোগ্য। আন্দোলন-সংগ্রামে টিকে থাকার দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি তাদের নেই। যেকোনো প্রলোভনে তারা নীতি-আদর্শ জলাঞ্জলি দেয়। নিজের স্বার্থ ও জাগতিক সুবিধা- অসুবিধাকে প্রাধান্য দিয়ে প্রাপ্তির পেছনে ছোটে তারা। লাভ-ক্ষতির হিসাব কষা তাদের মজ্জাগত। সমাজ-পরিবর্তনের আন্দোলনে নিঃস্বার্থ অংশগ্রহণের বেলায় তারা অনুদার। এই শ্রেণিচরিত্র চিত্রণের আলোকে মধ্যবিত্তকে ‘মধ্যদ্বিত্ব’ বলা চলে। কার্ল মার্ক্স মনেও করতেন পেটি বুর্জোয়ার পক্ষে চেষ্টা করলেও বুর্জোয়ার স্থান দখল করা সম্ভব নয়। এঙ্গেলসের কাছে লেখা চিঠিতে মার্ক্স এদের সম্পর্কে বলেছেন যে এরা শাসক বুর্জোয়া শ্রেণির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে শুধু নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য। ‘...all these fights against the bourgeoisie, to save from extinction their existence as fractions of the middle class’ (মার্ক্স ও এঙ্গেলস ১৯৭৫: ৩৯৪-৯৫)। মার্ক্স আরও লিখলেন, 'not revolutionary but conservative, Nay more, they are reactionary, for they try to roll back the wheel of history' (মার্ক্স ও এঙ্গেলস ১৯৭৫) — এই শ্রেণি রক্ষণশীল ও প্রতিক্রিয়াশীল। তারা বিপ্লবী তো নয়ই, বরং ইতিহাসের চাকাকে পেছনে ঠেলে দিতে চেষ্টা করে।

মধ্যবিত্তের মধ্যদ্বিত্বে রূপান্তরের সাম্প্রতিক ধরন

রিচ ড্যাড, পুওর ড্যাড দর্শন অনুযায়ী মাঝারি আয়রোজগার নিয়ে টিকে থাকার চাপ সইতে পারার জন্য প্রাণপাত করতে থাকা জনগোষ্ঠীটিই মধ্যবিত্ত। তাদের নিরন্তর দৌড়ঝাপ 'বিত্ত' সম্পর্কিত। তাই এই পর্যায়ে তাদের 'মধ্যবিত্ত' বলতে আমাদেরও আপত্তি নেই। জোসেফ স্টিগলিজ বা অমর্ত্য সেন উন্নয়ন অর্থনীতি আলোচনায় কিয়োসাকি-লেকটারের বয়ানকে অপ্রয়োজনীয় জ্ঞানে আলোচনায় আনেননি, এড়িয়ে গিয়েছেন। অর্থনীতিবিদদের বেশির ভাগই মনে করেন, লোক দুটি ফাটকাবাজ এবং তাঁদের পাত্তা দেওয়ার বিশেষ কিছু নেই। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানীদের রিচ ড্যাড, পুওর ড্যাড দর্শনের সামাজিক প্রভাব আলোচনা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, দর্শনটি উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোতে ‘মধ্যদ্বিত্ব’ বিকাশের অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কীভাবে, সেটি বুঝতে হলে কিয়োসাকি-লেকটার প্রকল্পের অন্যতম একটি প্রায়োগিক দিক 'পিরামিড স্কিম'-এর কয়েকটি উদাহরণ টানা যেতে পারে।

মার্ক্সীয় ধারায় আমরা ‘মধ্যদ্বিত্ব' ধারণা ব্যবহার করে দেখছি কিয়োসাকি-লেকটারের দর্শনের বিপদ। এই দুজন একবিংশ শতকের শুরু হতেই মাল্টিলেভেল মার্কেটিং বা এমএলএম ধারণাটিকে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় করে তুলেছেন। শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বেই নেটওয়ার্কিং ব্যবসা বা এমএলএম ব্যবসায় লগ্নিকারী হতে গিয়ে একদল মানুষ সর্বস্ব খুইয়েছে। লগ্নিকারীদের সিংহভাগ মধ্যবিত্ত ও উঠতি মধ্যবিত্ত। বাংলাদেশের ডেসটিনি এবং ইভ্যালির ব্যবসাপদ্ধতি কিয়োসাকি-লেকটার মডেলের একটি উদাহরণ।

বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশেই কয়েক হাজার এমএলএম কোম্পানির অস্তিত্ব মিলেছিল গত বছর। অথচ ২০১৩ সালেই ৭৮টি কোম্পানির রেজিস্ট্রেশন বাতিল করা হয়েছিল (প্রথম আলো  ২০১৩)। 'পিরামিড স্কিম' নাম পেয়েছে এই ব্যবসাপদ্ধতি। এর মূল দর্শন কাঁচা টাকার লোভ বাড়াতে হবে। এর পদ্ধতি একজন নয়, শত এবং হাজার ছাড়িয়ে অসংখ্য মানুষকে লগ্নিকারক বানাতে হবে। তারাই আবার ভোক্তা হবে। বিক্রয়যোগ্য পণ্যের একাংশ নিজেরাই কিনবে ও ভোগ করবে । তারা নিজেরাই আবার চলমান বিজ্ঞাপন। নতুন ভোক্তা-লগ্নিকারক খুঁজে পাওয়ার বিদ্যা করায়ত্ত করতে হবে। খুঁজে পেলেই চলবে না। তাকে ছলে- বলে-কলে-কৌশলে এবং ভাষার কারুকার্যে বিমোহিত করা শিখতে হবে। তার বিশ্বাস অর্জন করার কৌশলই নয়, তাকে লগ্নিকারক হওয়ার লাভ দেখিয়ে যতটা সম্ভব লোভী করে তুলতে হবে। মধ্যম আয়ের মানুষদের লোভী করে তোলার এসব ‘পিরামিড স্কিম' বিশ্বময় কোটি কোটি উঠতি মধ্যবিত্ত ফড়িয়া তৈরি করেছে । তাদের বড় অংশই জমিজিরাত খুইয়েছে। ২০১৯ সালে হায়দরাবাদে বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর তদন্ত করে জেনেছে যে মাত্র দুটি এমএলএম কোম্পানি ভারতে ৬০০০ কোটি রুপির প্রতারণা করেছে (রেড্ডি ২০১৯)

যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তাসচেতনতা প্রতিষ্ঠানের প্রধান ড. জন টেইলর ২০১১ সালে দীর্ঘ প্রতিবেদনে দেখালেন যে এই বহুজাতিকেরা রাজনীতিকে প্রভাবিত করে ব্যবসা চালিয়ে যায়। মার্কিন সিনেটরদের বড় অংশ এবং দুটি বড় দলই এমএলএম করপোরেশনগুলো থেকে বড় অঙ্কের অর্থসহায়তা পায়। ভুক্তভোগীদের নব্বই ভাগের বেশি মধ্যবিত্ত এবং নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে দ্রুত মধ্যবিত্ত হয়ে উঠতে চাওয়া জনগোষ্ঠী। এদের ক্ষুদ্র অংশ উচ্চাকাঙ্ক্ষী নিম্ন আয়ের মানুষজন (টেলর ২০১১)। আশঙ্কার বিষয়, বড় বড় এমএলএম কোম্পানি অর্থনীতিতে গবেষণা বৃত্তি দিয়ে থাকে। উদ্দেশ্য ফরমায়েশি গবেষণাপত্র তৈরি করা। প্রশস্তিমূলক গবেষণাপত্রগুলোতে দেখানো হয়, অর্থনীতিতে এমএলএম কোম্পানিগুলোর অসামান্য অবদান। বিশেষত মধ্যবিত্তদের জন্য অসংখ্য কর্মসংস্থানের বয়ানে ভরপুর থাকে প্রতিবেদনগুলো। যাঁরা বৃত্তি ও অর্থসহায়তা পেয়ে থাকেন, তাঁদেরও প্রায় শতভাগই মধ্যবিত্ত।

কিয়োসাকি ও লেকটারের নয়া-উদার বাজারি চিন্তার বিকাশ বিশ্বায়নের স্বাভাবিক অনুষঙ্গ। ভাবনাটি একেবারে নতুনও নয়। ১৯৫০ সালের দিকে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে 'পিরামিড স্কিম' লগ্নি ব্যবসা। এই ব্যবসার মাধ্যমেই বিশ্বের অন্যতম বড় বহুজাতিক কোম্পানি হার্বাল-লাইফ, এভন, এমোয়োসহ আরও বেশ কয়েকটি দানবাকৃতির ব্যবসা বিশ্ববাজারে ঠাঁই করে নেয়। যে তিনটি বহুজাতিকের নাম উল্লেখ করেছি, তাদের বার্ষিক মুনাফা গড়ে কুড়ি বিলিয়ন ডলার (আরিফ ২০১৯) বাণিজ্য তাদের মূল লক্ষ্য। ‘নিজে বাঁচলে বাপের নাম’ মূল দর্শন। নিজের পকেট তাজা থাকলে বাজার তাজা থাকবে। গত কুড়িটি বছরে ধনী-দরিদ্র সবাই দেশেই উঠতি মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠীর এক বড় অংশ এই আরাধ্য স্রোতের যাত্রী হয়ে পড়েছে। মধ্যবিত্তের একাংশের বিভ্রান্তি বেড়েছে। লগ্নি না করে তারা ভুল করছে বা পিছিয়ে পড়ছে কি না, এই ধন্দ ও অস্থিরতা তাদের নিত্যসঙ্গী। কিন্তু এই বিষয়ে দেশে-বিদেশে তেমন গবেষণা নেই। কারণ, মধ্যবিত্তের চিহ্নিত হয়ে পড়ায় অনাগ্রহ।

বাংলাদেশের প্রসঙ্গে ফেরা যাক। ডেসটিনি, ইভ্যালিসহ এমএলএম ব্যবসায় লগ্নিকারী কতজন মধ্যবিত্ত নিঃস্ব হয়েছেন, তাঁদের নিয়ে বিশেষ কোনো গবেষণা এখনো হয়নি। একই অবস্থা বিশ্বের অন্যান্য দেশেও।

আত্মোন্নয়ন বাণিজ্যের বলি বিশ্ব মধ্যবিত্ত

বিশ্বময় আত্মোন্নয়ন-বাণিজ্য শিল্পে রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশেও। সহজবোধ্য করে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করা যাক। ‘মোটিভেশনাল স্পিচ' বা 'উদ্দীপনামূলক ভাষণ'-এর বাজার রমরমা। এগুলোর লক্ষ্য হতাশ ও আত্মবিশ্বাসহীন মধ্যবিত্ত। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেও আত্মোয়ন্নয়নমূলক বইয়ের প্রকাশনা ও বাজার প্রকাশনা জগতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থকরী ও লাভজনক। জন লারোসা মার্কেটডেটা এলএলসি নামের বিশ্বখ্যাত বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রেসিডেন্ট এবং ‘হানড্রেড প্লাস ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড মার্কেট স্টাডিজ’-এর রচয়িতা। চমকজাগানিয়া সাম্প্রতিকতম গবেষণায় তিনি দেখান, ২০২০ সালে কোভিডের কারণে বই ব্যবসায় ধস নামার পরও আত্মোন্নয়নমূলক বইয়ের প্রকাশকেরা মুনাফা করেছেন ১০.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। মার্কেটডেটার ভবিষ্যদ্বাণী : প্রতিবছর ৬ শতাংশ হারে এই খাতে প্রবৃদ্ধি ঘটবে। ২০২৫ সাল নাগাদ এই খাতটি বার্ষিক ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মুনাফার বাজারে পরিণত হবে। পাঁচ হাজারের বেশি মোটিভেশনাল স্পিকারের বার্ষিক আয় কমপক্ষে ১.৬ বিলিয়ন ডলার। এসব কর্মকাণ্ডের প্রধান ভোক্তা মধ্যবিত্ত। (লারোসা ২০২১)

আত্মোন্নয়নের চেষ্টাই বলে দেয় মধ্যবিত্ত দিকনির্দেশনাহীনতায় বেশি ভোগে। ইউরোপিয়ান কমিশনের সহযোগিতায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গত বছরের গবেষণা অনুযায়ী বিশ্বে বিষাদ-বিষণ্নতায় আক্রান্ত মানুষের ৮০ শতাংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের জনগণ। ২০১৩ সালে প্রকাশিত ‘আই ক্যান, দেয়ারফোর আই মাস্ট ফ্র্যাজিলিটি ইন দি আপার মিডল ক্লাসেস’ শিরোনামের একটি গবেষণা প্রবন্ধের মাধ্যমে তিনজন মনোবিজ্ঞানী জানান যে উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যদের বিশেষত তরুণ যুবাদের মানসিক স্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখোমুখি। তাদের আত্মবিশ্বাস নড়বড়ে, মনোবল ভঙ্গুর। অনিশ্চয়তা ও অনাগত ভবিষ্যতের চিন্তায় তাদের মধ্যে ব্যাকুলতা বেশি। বিপন্নতাবোধের পেছনে বয়স বা মাদকের প্রভাবের চেয়ে বেশি দায়ী মধ্যবিত্তসুলভ আত্মবিশ্বাসহীনতা ও বর্তমান অবস্থান থেকে ছিটকে নিচে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা। সপ্তম শ্রেণিতে ওঠা থেকেই কিশোর- কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যহানির ঘটনা ঘটে। তার পেছনের কারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের দোদুল্যমানতার চাপ। পরিবারের বয়স্ক সদস্যরা মধ্যবিত্তসুলভ নীতিনৈতিকতা এবং মূল্যবোধের জোয়াল কিশোর-কিশোরীদের কাঁধে তুলে দেয় বটে, নিজেদের বেলায় তার ব্যত্যয় ঘটায়। সেসব আচরণের বৈপরীত্য কিশোর-কিশোরীদের নজর এড়ায় না। ফলে তারা কোন আচরণটি কাম্য, কোনটি কাম্য নয়—এ বিষয়েও স্বাভাবিক স্থিতিশীল অবস্থান নিতে পারে না। (লুথার ও অন্যান্য ২০১৩)

মধ্যদ্বিত্বরা আশঙ্কাজনকভাবে রাজনীতিবিযুক্ত

পশ্চিমের প্রতিটি দেশেই রাজনৈতিক দলগুলোর ম্যানিফেস্টোতে 'মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষা' ধারণাটি জোর দিয়ে উল্লেখ করা থাকে। রিপাবলিকান- ডেমোক্র্যাট, কনজারভেটিভ-লিবারেল—সবারই লক্ষ্য মধ্যবিত্ত ভোটারদের টাকাপয়সার জোগান ও স্বাচ্ছন্দ্য অব্যাহত রাখা। তাদের সন্তুষ্ট রাখা। কারণ, পশ্চিমের দেশগুলোর উন্নয়নের মূল ক্রীড়নক শক্তিশালী মধ্যবিত্ত শ্রেণি। মধ্যম বর্গটি স্থিতিস্থাপক। মার্ক্সীয় বিপ্লবতত্ত্ব থেকে শিক্ষা নিয়ে পশ্চিমা পুঁজিবাদী দেশগুলো নিজস্ব পদ্ধতিতে দরিদ্র এবং ধনী উভয় বর্গের সংখ্যা কমিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর ছিল । সামাজিক বিপ্লবে-বিদ্রোহের আশঙ্কা দূর করতে ধনী ও দরিদ্র শ্রেণিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা দরকার ছিল। সেটি তারা করতে সক্ষমও হয়েছিল। এ বছরের ২২ জুলাই দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় হেদার কক্স রবিনসনের নিবন্ধটির কথা ধরা যাক । নিবন্ধের শিরোনামটিই ছিল ‘বাইডেন ইজ ট্রাইং টু রিবিল্ড আমেরিকার্স মিডল ক্লাস। আওয়ার লোপসাইডেড ইকোনমি নিডস ইট’। এত কিছুর পরও লাভ হচ্ছে না। রিচ ড্যাড, পুওর ড্যাড দর্শনে আচ্ছন্ন অর্থনৈতিক আত্মোন্নয়ন ছাড়া অন্য কিছুতেই সংযুক্ত হতে পারছে না তারা। এত চেষ্টার পরও মধ্যবিত্ত আরও বিকশিত হওয়ার বদলে হারিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ববিখ্যাত পিউ সেন্টারের ২০২১ সালের গবেষণার সিদ্ধান্ত—মধ্যবিত্ত সংকুচিত হয়ে আসছে। খোদ যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭১ সালে জনসংখ্যার ৬১ শতাংশ ছিল মধ্যবিত্ত। ২০২১ সালে কমে সেটি দাঁড়িয়েছে ৫০ শতাংশে (আর্টেগা ২০২২)।

একটি বিষয় স্পষ্ট। বিশ্বায়নকালে মধ্যবিত্তের জীবনদর্শন বিত্তের উন্নয়ন, চিত্তের উন্নয়ন নয় । মধ্যবিত্ত ক্রমশই রাজনীতি ও সমাজচিন্তা-বিযুক্ত বর্গের রূপ নিচ্ছে। উইলিয়াম ডারল্যান্ড দেখিয়েছেন যে গণতন্ত্র পতনোন্মুখ। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও বিশ্বের প্রায় সব দেশেই মধ্যবিত্ত যুবসমাজ বিত্তচিন্তায় অস্থির। তারা একান্তই রাজনীতিবিমুখ (ডারল্যান্ড ২০১৭)। শ্যারন গোল্ডম্যানের একটি গবেষণায় আরেকটি সত্যও উঠে এসেছে। চিরকাল মধ্যবিত্তের চিত্ত- প্রশান্তির মূল কারণ উচ্চশিক্ষা। অথচ বর্তমান সময়ে বিশ্বময়, বিশেষত শিল্পোন্নত দেশগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগামী মধ্যবিত্ত ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা প্রতিদিনই কমছে (ওয়াকার ২০১৩)। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার চাকরির বাজারবিষয়ক পরিসংখ্যান বলছে, ‘ওয়ার্কিং ক্লাস' হিসেবে অন্তর্ভুক্তদের নব্বই ভাগের বেশি মধ্যবিত্ত শ্রেণির সদস্য। তাদের পরিচিতি ‘পে-চেক টু পে-চেক কমিউনিটি মেম্বার্স' (হেজ ও অন্যান্য ২০২২)। সম্প্রতি 'হারিয়ে যাওয়া মধ্যবিত্ত শ্রেণি’ (ডিসঅ্যাপিয়ারিং মিডল ক্লাস) কথাটা আহাজারির মতো করে নিয়মিত শোনা যাচ্ছে। অর্থনীতির পেছনে দৌড়াতে গিয়ে অর্থনীতি ও রাজনীতি উভয় ময়দান থেকেই মধ্যবিত্তের বিযুক্তি নির্দেশ করা এই শিরোনাম পাশ্চাত্যে রাজনীতিকদের মুখেও উঠে এসেছে (ডগার্টি ও কেলি ২০২১)।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের অন্যতম নির্বাচনী ওয়াদা ও রূপকল্পের (ভিশন) একটি আন্তর্জাতিক নীতি অবাক করার মতো । এটিকে মূলনীতিও মনে করে ডেমোক্র্যাটরা । ভিশনটির মূল কথা ‘ফরেন পলিসি ফর দ্য মিডল ক্লাস'। প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের মধ্যবিত্তের উন্নয়ন বাইডেনের লক্ষ্য কী রকম হতে পারে? যুদ্ধ নয়, গণতন্ত্র সুরক্ষার জন্য চেষ্টা নয়, সামরিক শাসনের কবল থেকে উদ্ধার পেতে সহায়তা দেওয়া নয়, দুর্ভিক্ষ-ক্ষুধামুক্তি নয়— পরদেশে মধ্যবিত্তের উন্নয়নই লক্ষ্য? অন্তর্গত মূল উদ্দেশ্য যা-ই হোক, বাইডেনের এই ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রে তো বটেই, উন্নত-অনুন্নত সব দেশেই ‘মধ্যবিত্ত’বিষয়ক ভাবনা উসকে দিয়েছে। কারণ, নির্বাচনে জিতে সত্যি সত্যিই তিনি 'করপোরেট কর সংস্কার'-এর কাজে হাত দিয়েছেন। উদ্দেশ্য, নিজ দেশে ধনীদের কর ফাঁকি দেওয়ার পক্ষে কাজে লাগা আইনকানুন থেকে শুরু করে অন্যান্য পদ্ধতির রশি টেনে ধরা । উদ্ধার করা বিশাল অঙ্ক মধ্যবিত্তের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, আবাসন সংস্থানের কাজে লাগানো। তবু লাভ হচ্ছে না।

মার্কিন প্রভাবে গত বছরের শেষ দিকে কুড়িটি শিল্পোন্নত দেশের মহাসম্মেলনে (জি-২০ সামিট) ‘আন্তর্জাতিক করপোরেট কর সংস্কার চুক্তি'সহ নীতিমালাও গৃহীত হয়। চুক্তিটি অভিনব। উদ্দেশ্য ধনীদের চুরি বন্ধ করা অথবা কমিয়ে আনা এবং বাঁচিয়ে আনা অর্থ বিশ্বের মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশে ব্যবহার করা। এই আলোকে নভেম্বরে ফরেন পলিসি পত্রিকায় বিখ্যাত ইয়েল ল স্কুলের গবেষক টিম হার্শেল বার্নস প্রতিক্রিয়া জানিয়ে লিখলেন যে পরদেশের মধ্যবিত্ত উন্নয়নের পেছনে ক্ষমতা, অর্থ ও শক্তির অপচয় ঘটাতে গেলে মার্কিন মধ্যবিত্তের উন্নয়নই ব্যাহত হবে। দুনিয়াময় সব দেশের জন্য 'ন্যূনতম করপোরেট ট্যাক্স' নীতি গ্রহণেরও চাপ রয়েছে। উচ্চ মুনাফা ও সুদের আশায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর ধনীরা অফশোর ব্যাংক ও উন্নত দেশের লাভজনক বহুজাতিক কোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগ করে। বার্নস হিসাব কষে দেখালেন যে 'ন্যূনতম করপোরেট ট্যাক্স' নীতিতে দেশগুলো রাজি হলে অতিরিক্ত অর্জিত অর্থ লগ্নিকারক দেশগুলোর মধ্যবিত্তদের কোনো কাজে না এসে জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর অর্থনীতিকে লাভবান করবে। তিনিও দেখালেন, মধ্যবিত্তকে রাজনীতিতে যুক্ত করার চেষ্টা করা হলেও বর্গটি অর্থনৈতিক আত্মোন্নয়নের ফাঁদে এমনভাবে আটকা পড়েছে যে তাদের আর অন্যদিকে তাকানোর ফুরসতও নেই। এদিকে যে 'সিভিল সোসাইটি' ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হতে পারত, তারাও দুর্বল হয়ে পড়ছে। সিভিকাস নামের সিভিল সোসাইটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির একদল গবেষক বাংলাদেশ, জিম্বাবুয়ে ও ফিলিস্তিনি অঞ্চলগুলোতে সিভিল সোসাইটি কর্মকাণ্ডের আলোকে দেখিয়েছেন, তৃতীয় বিশ্বে সর্বাত্মকবাদী রাষ্ট্রগুলোতে সিভিল সোসাইটি মৃতপ্রায়। ফলে মধ্যবিত্তের মেধাজাগতিক অবদানও পড়তির দিকে। সক্ষম মধ্যবিত্তের জন্য সামাজিক নেতৃত্ব গ্রহণও দুরূহ হয়ে পড়েছে (পেরিয়া ও অন্যান্য ২০১৯) এসব কারণেই কিছু প্রশ্ন তোলা জরুরি।

'রিচ ড্যাড, পুওর ড্যাড' দর্শনের পরিপ্রেক্ষিতে ‘মধ্যবিত্ত' প্রশ্ন

তাহলে কিছু প্রশ্ন তোলা দরকার নয় কি? বিশ্বজুড়ে মধ্যবিত্তের পরিচিতি কি আসলেই মাত্র দুধারি? 'হয় রিচ ড্যাড হতে হবে, নয়তো পুওর ড্যাড থাকতে হবে'? সিদ্ধান্ত গ্রহণে অক্ষমতা, জীবনজটিলতা, অস্থিরতার জন্য যাঁরা যাঁরা স্মার্ট ইনভেস্টর হতে পারবেন না, বিপর্যস্ততার দোলাচলই কি তাদের নিয়তি? আয়রোজগারের সক্ষমতা বিচারেও তাদের জন্য মাঝামাঝি কোনো বর্গে থাকা কি নিরাপদ নয়? মাঝারি আয়ে সন্তুষ্ট থাকা মানেই কি বিপন্ন হয়ে পড়া বা দরিদ্র হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা? মধ্যবিত্তকে কি 'বিত্ত' দ্বারাই পরিচিত হতে হবে? চিত্তসৌন্দর্য, সমাজভাবনা, মানবহিতৈষী সামাজিক দায়বোধ, সমাজ- সংস্কারচিন্তা ও কর্মোদ্যোগ—এগুলো কি করের অর্থে রাষ্ট্রের পক্ষে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় আসলেই করা সম্ভব? রাষ্ট্রকে অতটা ক্ষমতাবান করে তোলার মাধ্যমে অতিক্ষমতায়িত সর্বাত্মকবাদী রাষ্ট্র নির্মাণ করা গেলে মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠী কীভাবে বেশি উপকৃত হবে? প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা রোগশোকের কারণে মাঝারি আয় ও সামাজিক অবস্থানের বর্গটি বিপর্যস্ত হলেও সেই দায় কি তাদেরই, যারা দুর্বিপাক মোকাবিলায় অক্ষম রয়ে গেছে? এই ‘ব্লেইমিং দ্য ভিকটিম' বা বিপন্নকেই দোষী করার প্রবণতা কতটা মানবিক? তাদের বিপর্যয়কালে অতিক্ষমতাধর সর্বাত্মকবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার ত্রাতা হিসেবে আবির্ভাবের কোনো দায়িত্ব ছিল না কি? মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিলুপ্তি কি আসলেই কাম্য সমাজ গড়ে তুলবে? সবশেষে দক্ষিণ এশিয়ায় এবং বাংলাদেশের বাস্তবতায় মধ্যবিত্ত বর্গে রিচ ড্যাড, পুওর ড্যাড দর্শন অভিযোজনের পরিণাম কী হতে পারে?

‘মধ্যদ্বিত্ব' বা মধ্যবিত্ত শ্রেণিচরিত্রের এশীয়-বাস্তবতা ও বাংলাদেশ

প্রাচ্যের, বিশেষত ভারতবর্ষের মার্ক্সবাদীদের মধ্যবিত্তবিরোধী অবস্থান অতীতেও যেমন ছিল, এখনো তেমনই আছে । রমাপদ চৌধুরী লিখেছিলেন ভারতবর্ষের ‘মধ্যবিত্ত' কোনো দল বা শ্রেণি নয় । এটি একটি 'মানসিকতা'। বনফুল মধ্যবিত্ত নাটকে দেখালেন মধ্যবিত্তের উন্নাস ও স্বজন-সমাজ থেকে বিযুক্ত থাকার আকুতি। আমাদের গল্প-উপন্যাসে, সাহিত্যে মধ্যবিত্তের চরিত্রচিত্রণও অনেকটাই ষাটের দশকের মার্ক্সবাদীদের মতো। নীতিকথা ও নৈতিকতার তুবড়ি ফোটানো মানুষেরা মুহূর্তেই উল্টো আচরণ করছেন। দুর্নীতি-দুরাচারেও মধ্যবিত্ত পিছিয়ে নেই। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী সব রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক আন্দোলনে ‘মধ্যদ্বিত্ব' চরিত্রের প্রতিফলন দিনের আলোর মতো জ্বলজ্বলে। স্বৈরাচারী সামরিক সরকারগুলোর শাসনকালের পুরো সময়েই দেখা গেছে, রাজনৈতিক মধ্যবিত্ত নীতিনৈতিকতা জলাঞ্জলি দিতে দ্বিধা করছে না। বৰ্তমান সময়েও মধ্যবিত্তনির্ভর রাজনীতির লুটেরা ও সুবিধাবাদী চরিত্রই জ্বলজ্বলে ।
কারণও বোধগম্য। প্রাচ্যের মধ্যবিত্ত এখনো উত্থানপর্বই সমাপ্ত করে উঠতে পারেনি। প্রতিদিনই মধ্যবিত্ত বিকাশের একেকটি শর্ত দৃশ্যমান হয়ে উঠছে ভারত উপমহাদেশে ‘মধ্যবিত্ত' বিকাশের একটি সাধারণ ছক আছে। একটি ছক বহুল প্রতিষ্ঠিত। সেটি এই যে ব্রিটিশ শাসনের আগে এই উপমহাদেশে মধ্যবিত্ত বিকশিত ছিল না। পাল যুগ, সেন যুগ, সুলতানি আমল এবং মোগল আমলেও রাজা-প্রজা, ধনী-দরিদ্র বিদ্যমান থাকলেও মধ্যবিত্ত বিকশিত ছিল না। পাশ্চাত্যের মতো প্রাচ্যে রেনেসাঁ বা শিল্পবিপ্লবের শর্ত তৈরি হয়নি । সামন্তবাদের ধস এবং পুঁজিবাদের উত্থানেরও কার্যকারণ ছিল না। প্রাচ্যের কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থা শতবর্ষের পর শতবর্ষ অনেকটাই অপরিবর্তিত ছিল। পাশ্চাত্যের ফরাসি বিপ্লবের মতো কোনো রাজনৈতিক সংস্কারের তোড়ে মধ্যবিত্তের উত্থানের সমান্তরাল কোনো ঐতিহাসিক আলোড়ন-বিলোড়নও নেই। ১৭৫৭ সালের পরপরই ব্রিটিশ প্রভাবিত ভারতে মধ্যবিত্ত বিকাশের ধরনটি ছিল একরৈখিক, সামাজিক নয় । ‘দারুল হারব' বা বিধর্মী রাজ্য ঘোষণার মাধ্যমে অভিমানাহত মুসলমানদের ইংরেজ ও ইংরেজি ভাষাবিরোধী অবস্থান পরের শতবর্ষজুড়ে এই জনগোষ্ঠীকে দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর করেছিল। সে সুযোগে অমুসলমান জনগোষ্ঠী এগিয়ে গেলেও তাদের কদম ছিল সতর্ক। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ইউরোপীয় আদলে ভারতীয় নব্য সামন্তবাদের জন্ম দিয়েছিল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রকৃতপক্ষে মধ্যবিত্তের উত্থানের সম্ভাবনা আরও দূরে সরিয়ে দেয়। ঔপনিবেশিক শাসনে ধনী ও দরিদ্র উভয় গোষ্ঠীর জন্ম হলেও মধ্যবিত্ত বিকাশের সম্ভাবনা বিঘ্নিত হয়। সে কারণে ১৮১৭ সাল থেকে ১৮২৪ সালের মধ্যে কলকাতায় হিন্দু কলেজ ও সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠা লাভের পরও মধ্যবিত্তশ্রেণি বিকাশের ক্ষেত্রই প্রস্তুত হচ্ছিল মাত্র; তাদের পূর্ণাঙ্গ আবির্ভাব আরও পরের বিষয়।

ঊনবিংশ শতকের কুড়ি ও তিরিশের দশকে ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলন, ব্রাহ্মসমাজ আন্দোলন ও ফরায়েজি আন্দোলন সেই সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করে তুললেও আন্দোলনগুলো রাতারাতিই সর্বজনগ্রাহ্য বা পছন্দনীয় হয়ে ওঠেনি আন্দোলনগুলোর অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক দুর্বলতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল সাধারণ মানুষের সন্দেহপরায়ণতা, ধর্মীয় বাধা, কূপমণ্ডূকতা এবং পূর্বসংস্কারজনিত দ্বন্দ্ব। ১৮৩৫ সালে মেকেলের ভাষা সংস্কার এবং ইংরেজিভাষী ভারতীয় গড়ে তোলার বিষয়টিকে যেভাবে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়, বাস্তবে তা ১৮৫৭ সালের আগে প্রভাববিস্তারী হয়ে ওঠেনি। মেকেলে মিনিটস প্রয়োগের আয়োজন ও নানা বিতর্ক সামলানোর ডামাডোলের মধ্যেই ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ সংগঠিত হয়। এই ২২ বছর সময়ে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় মধ্যবিত্ত বিকাশের দালিলিক প্রমাণ নেই । প্রকৃতপক্ষে মেকেলের ভাষা-শিক্ষা- দর্শন প্রকাশের কয়েক বছর আগে থেকেই হিন্দু কলেজ ও সংস্কৃত কলেজের বদৌলতে ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ঘটতে থাকে। কিন্তু মধ্যবিত্ত বিকাশের শর্ত তখনো অঙ্কুর পর্যায়েই রয়ে গিয়েছিল। ভারতীয় জাতীয়তাবাদী ভাবনার বিকাশপর্বের শুরু সিপাহি বিপ্লবের মাধ্যমেই। সে সময় থেকেই ভারতীয় চরিত্রের স্বদেশি মধ্যবিত্তের বিকাশের প্রয়োজন অনুভবের সূত্রপাত। সিপাহি বিদ্রোহ জাতীয়তাবাদী ভাবনা উসকে দিলে রাজনীতিভাবনাও শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকে। নিম্নমধ্যবিত্ত রয়ে যাওয়া ও শিক্ষিত হতে চলা তরুণদের মধ্যবিত্ত বনে যাওয়ার পথচলাও শুরু হয়। একই সময়ে নেতৃত্ববোধও বিকশিত হয়। ১৮৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা এবং ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠালাভের পরও সেগুলো উচ্চবর্ণের ধনী হিন্দু এবং উচ্চবর্গের ধনী মুসলিম এলিটদের নেতৃত্বাধীন রয়ে গিয়েছিল।

পূর্ব বাংলার মধ্যবিত্ত বিকাশের সময়কাল আরও সাম্প্রতিক। বয়স বড়জোর ৭২ বছর। প্রথম ক্ষেত্রটি প্রস্তুত হয়েছিল ১৯৫০ সালে। জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ ছিল প্রথম ক্রীড়নক। কিন্তু মূলধারাকরণ হয়েছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা লাভ একটি বড়সড় সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। কিন্তু ১৯৪৭-এর দেশ বিভাজন-পূর্ববর্তী ধর্মীয় বিভাজন ও বিভেদের রাজনীতির কারণে মধ্যবিত্তের বিকাশে প্রতিষ্ঠানটি তখনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেনি। ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশিদের আত্মপরিচয় নির্ধারণ করে দিয়েছিল। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের একটি মানসচিত্র কৃষিনির্ভর পূর্ব পাকিস্তানকে নগর-সংযোগে শুধু সাহসীই করেনি, গ্রামীণ নিম্ন ও নিম্নবিত্তদের শহরে স্থানান্তর, অভিগমন ও আবাস সৃষ্টিতে আগ্রহী করে তুলেছিল। করেছিল শিক্ষাদীক্ষা ও অকৃষিজ জীবনধারামুখী। ধীরে হলেও মধ্যবিত্তশ্রেণি গড়ে উঠছিল সেই সময়। তবে মধ্যবিত্ত বিকাশে বৈপ্লবিক পরিবর্তনটি আসে বাংলাদেশের স্বাধীনতালাভের পরপরই। এই বাস্তবতাকে আমলে নিলে বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের প্রকৃত বিকাশ শুরু হয়েছে মাত্র ৫২ বছর আগে। অন্যভাবে বলা চলে বাংলাদেশি মধ্যবিত্তের উত্থানপর্ব এখনো শেষই হয়নি। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসনাধীনে বাংলাদেশে শিল্প-কলকারখানার বিকাশ ঘটলেও মধ্যবিত্ত বিকাশের শর্ত ছিল না বলা চলে। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের হয়তো উদ্দেশ্যই ছিল পূর্ব পাকিস্তানে একটি শ্রমজীবী শ্রেণি গড়ে তোলা। একটি ‘রিজার্ভ আর্মি অব লেবার' সৃষ্টি করা। তাদের সে উদ্দেশ্যটিও সফল হয়নি। স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পেরোনোর পরও দেশে সস্তা শ্রম আর বিদেশে শ্রম রপ্তানি দেখায় যে ‘রিজার্ভ আর্মি অব লেবার’ সৃষ্টি করার নীতি স্বাধীন দেশেও কার্যকর। অন্যদিকে লাগাতার গণতন্ত্রহীনতার কারণে শিক্ষিত, রাজনীতিসচেতন ও জনবান্ধব মধ্যবিত্তশ্রেণি গড়ে ওঠেনি । সংশয়গ্রস্ত ও প্রভাবহীন একটি ‘মধ্যদ্বিত্ব’ সিভিল সোসাইটির প্রচ্ছন্ন অস্তিত্ব মাঝেমাঝেই টের পাওয়া যায় যদিও।

উপসংহার

‘মধ্যবিত্ত’ আলোচনার পরিসরটি ব্যাপক। ষাটের দশকে সমাজতন্ত্রপন্থীদের মধ্যবিত্তবিরোধী অবস্থান পাশ্চাত্যে হালে পানি পায়নি। মার্ক্সবাদীরা মধ্যবিত্তের যে ‘মধ্যদ্বিত্ব' শ্রেণিচরিত্রটি নির্মাণ করেছিলেন, সেটি পাশ্চাত্যে ষাটের দশকের অকাট্য বাস্তবতা ছিল না। ষাটের দশকের উন্মাতাল ছাত্র আন্দোলন, যুবক- যুবতীদের সাংস্কৃতিক মুক্তির আন্দোলন, বর্ণবাদবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ আন্দোলন, নারীবাদী আন্দোলন—সবকিছুর নেতৃত্ব হাতে নিয়েছিল মধ্যবিত্ত তারুণ্য। বঞ্চিত ও নিম্নবর্গের জনগণ সার বেঁধেছিল তাদের নেতৃত্বের পেছনেই। পশ্চিমা সমাজে রাষ্ট্র পরিচালনা পর্যায়েও রাজনৈতিক নেতৃত্ব চলে গিয়েছিল মধ্যবিত্তশ্রেণির হাতে। নর্ডিক দেশগুলোতে কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হলো সে সময়। ধনী পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের বদলে রাষ্ট্রচরিত্র নির্মিত হতে থাকল মধ্যমপন্থী রাষ্ট্রদর্শন ও মধ্যম আয়ের মানুষের প্রয়োজনের নিরিখে। সুতরাং সমাজবাদী, মানবিক ভাবনার সংশ্লেষে শক্তিশালী মধ্যবিত্তশ্রেণি গড়ে উঠেছিল পশ্চিমে তবে উল্লেখ্য, মার্ক্সীয় মধ্যবিত্ত চরিত্র বিশ্লেষণ পাশ্চাত্যকে উপলক্ষ করার বদলে বৈশ্বিক বাস্তবতাকেই অবলম্বন করেছিল। ষাটের দশকের পশ্চিম মধ্যদ্বিত্বমুক্ত হলেও তাদের সাম্প্রতিক জীবনধারা মধ্যবিত্তীয় নয়, মধ্যদ্বিত্বীয়। রিচ ড্যাড, পুওর ড্যাড দর্শন আবারও মধ্যবিত্তকে 'মধ্যদ্বিত্ব' বর্গের রূপ দিচ্ছে।

বিশ্বায়ন পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের মধ্যদ্বিত্বদের বিত্তগত দূরত্বটি ঘুচিয়ে দিয়েছে । বিশ্বায়নের প্রভাবে বাংলাদেশও বিশ্বসমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশের মধ্যবিত্তও রিচ ড্যাড, পুওর ড্যাড দর্শনে প্রভাবিত। এটি বিশ্বময় নৈতিক শূন্যতার সংকট তৈরি করেছে । বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত এখনো অবিকশিত ও উঠতি স্তরে রয়ে গেছে। নাগরিক সমাজের ভূমিকাহীনতা বাংলাদেশের মধ্যদ্বিত্বকে দিকনির্দেশনাহীন একটি বর্গে পরিণত করছে । এই প্রবন্ধে মধ্যম বর্গের সামাজিক- রাজনৈতিক চরিত্র বা আচরণধারা বোঝাতে ‘মধ্যদ্বিত্ব' শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। মধ্যবিত্তকে মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠী ভেবে নেওয়ার চিরাচরিত চর্চাটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করাও প্রবন্ধটির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল । কারণ, মধ্যবিত্ত যতটা না মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠী, তার চেয়ে অনেক বেশি এটি একটি ‘মানসিকতা' ও ‘অনুভূতি'। বর্গটিকে ‘শ্রেণি' বলার সুযোগও কম। তাই এই আলোচনায় ‘বর্গ' প্রত্যয়টিই ব্যবহার করা হয়েছে। 'মধ্যবিত্ত' প্রত্যয়টিকে খারিজ করে দেওয়া এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। মধ্যবিত্তের স্বাভাবিক বর্গচরিত্র আছে, শ্রেণিচরিত্র নেই । একই ধরনের ভুবনায়ননির্ভর অর্থনীতির চাপে পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য উভয় জগতেই মধ্যম- বর্গটি ‘মধ্যদ্বিত্ব'র রূপ নিচ্ছে।

এই উপমহাদেশে মধ্যবিত্ত বিকাশের প্রতিষ্ঠিত কালানুক্রমিক ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা রয়েছে। এত দিন সেগুলো প্রায় বিনা প্রশ্নে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়ে এসেছে। বর্তমান সময়ে এসে আমরা কিছু প্রশ্ন তুলছি । কারণ, অখণ্ড ভারতবর্ষে মধ্যবিত্তের বিকাশের ধরনধারণ অঞ্চলভেদে ভিন্ন ছিল। পশ্চিমবঙ্গে মধ্যবিত্ত বিকাশের সঙ্গে পূর্ববঙ্গে মধ্যবিত্ত বিকাশের যথেষ্ট অমিল রয়েছে। মেকেলের ইংরেজি শিক্ষা, হিন্দু কলেজ ও সংস্কৃত কলেজের প্রতিষ্ঠা, ব্রাহ্ম আন্দোলন, ফরায়েজি আন্দোলন, ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলন এবং স্বদেশি ও সমাজতন্ত্রী ভাবধারার প্রভাব, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা এবং ভারতীয় জাতীয়তাবোধ ও জাতীয়তাবাদবিষয়ক অতিপরিচিত বয়ানগুলো দ্বারাই উভয় অঞ্চলের মধ্যবিত্ত বিকাশের ধারণাটি বিদ্বৎত্মহলে এখনো সচল। এসব ব্যাখ্যায় সাতচল্লিশের দেশবিভাগ-পূর্ববর্তী সময়কে অনেকটা বিস্তারিতভাবে ধারণ করা আছে। দেশবিভাগ-পরবর্তী মধ্যবিত্তের বিকাশ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের কয়েকজন বুদ্ধিজীবীর ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশ আন্দোলনের ভূমিকা গবেষণার সঙ্গে আমাদের পরিচিতি রয়েছে। কিন্তু সেগুলোকে যথেষ্ট বা সন্তুষ্ট হওয়ার মতো মনে করার কারণ নেই। খোলা চোখে দেখা অনুভবের আলোকে বলা যায় যে নব্বইয়ের গণ-আন্দোলন-পরবর্তী বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভিন্ন এবং বেশি ‘মধ্যদ্বিত্ব' চরিত্রসম্পন্ন। এ বিষয়েও নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে নতুনভাবে দৃষ্টিপাত করা প্রয়োজন।

রচনাপঞ্জি  

আরিফ ২০১৯।। Halim-Joshua Arief, ‘Multi-level marketing companies profit off of economic exploitation’, The Titan, California State University, 21 March, https://dailytitan.com/opinion/multi-level-marketing-companies-profit-off-of-economic-exploitation/article_3ae748fd-4a4e-5e0d-a493-9cd1c1cea723.html , প্রবেশ: ৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২২।

আর্টেগা ২০২২।। A. Ortega, ‘The Depletion of the Middle Class’, Real Instituto Elcanohttps://www.realinstitutoelcano.org/en/the-depletion-of-the-middle-class/, প্রবেশ: ৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২২।

ইর্ভিন ২০০৮।। G. Irvin, Super Rich: The Rise of Inequality in Britain and The United States, Cambridge: Polity Press।

ওয়াকার ২০১৩।। S. G. Walker, Avoiding the Demise of Democracy: A Cautionary Tale for Teachers and Principals, Maryland: R&L Education।

গিডেন্স ২০০৯।। A. Giddens, Sociology, 6th edition, Cambridge: Polity Press।

ডগার্টি ও কেলি ২০২১।। G. Daugherty and R. Kelly, ‘America's Middle Class Is Losing Ground Financially’, Investopediahttps://www.investopedia.com/insights/americas-slowly-disappearing-middle-class/, প্রবেশ: ৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২২।

ডারল্যান্ড ২০১৭।। William R. Durland, The Demise of American Democracy: Understanding the Crisis and Resisting the Threats, 2nd edition, California: CreateSpace Independent Publishing Platform।

টেলর ২০১১।। Jon M. Taylor, The Case (for and) against Multi-level Marketing- Villains and Victims, Consumer Awareness Institute।

নাভী ১৯৯৪।। S. N. H. Naqvi, Islam, Economics, and Society, London: Kegan Paul।

পেরিয়া ও অন্যান্য ২০১৯।। D. R. Perea et al., The Impact of Non-State Actors (NSAs) on Civic Space in Bangladesh, Palestinian Territories and Zimbabwe: How Do Resources Influence NGO Resilience? Literature Review, Civicus।

মার্ক্স ও এঙ্গেলস ১৯৭৫।। K. Marx and F. Engels, Selected Correspondence, Moscow: Progress Publishers।

রান্সিম্যান ১৯৯০।। W. G. Runciman, ‘How Many Classes are There in Contemporary British Society?’, Sociology, vol. 24, no. 3, pp. 377-396।

রেড্ডি ২০১৯।। U. Sudhakar Reddy, ‘Hyderabad: ED to probe Rs 6,000 crore MLM fraud by two companies’, The Times of Indiahttp://timesofindia.indiatimes.com/articleshow/69779586.cms, প্রবেশ: ১৭ই সেপ্টেম্বর, ২০২২।

লারোসা ২০২১।। John LaRosa, ‘$10.4 Billion Self-Improvement Market Pivots to Virtual Delivery During the Pandemic’, Market Research Blog, 2 August, https://blog.marketresearch.com/10.4-billion-self-improvement-market-pivots-to-virtual-delivery-during-the-pandemic, প্রবেশ: ৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২২।

লিফটন ১৯৭৮।। M. Lipton, Why Poor People Stay Poor, London: Temple Smith।

লুথার ও অন্যান্য ২০১৩।। S. Luthar et al., ‘‘I can, therefore I must’: Fragility in the upper-middle classes’, Development and Psychopathology, Vol. 25, No. 4, pp. 1529-1549, https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC4215566/, প্রবেশ: ৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২২।

সিভার্স ২০১০।। Bruce R. Sievers, Civil Society, Philanthropy, and the Fate of the Commons, New Hampshire: University Press of New England।

হেজ ও অন্যান্য ২০২২।। A. Hayes et al., ‘Middle Class: Definition and Characteristics’, Investopediahttps://www.investopedia.com/terms/m/middle-class.asp, প্রবেশ: ৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২২।

হার্জবার্গ ও অন্যান্য ১৯৫৯।। F. B. Herzberg, Bernard Mausner, and Barbara Bloch Snyderman, The Motivation to Work,  New York : John Wiley & Sons।

হজকিনসন ২০০৩।। Virginia Hodgkinson, The Civil Society Reader, New Hampshire: University Press of New England International।

লেখক পরিচিতি

ড. হেলাল মহিউদ্দীন বাংলাদেশি সমাজবিজ্ঞানী এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক। বর্তমানে ড. হেলাল মহিউদ্দিন কানাডার কনফ্লিক্ট অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স রিসার্চ ইনস্টিটিউট (CRRIC)-এর গবেষণা ও যোগাযোগ পরিচালক এবং যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটার মেভিল স্টেট ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক। ম্যানিটোবা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের পর থেকে তিনি দীর্ঘ দিন ধরে সমাজবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন, আঞ্চলিক পরিকল্পনা ও জেন্ডার স্টাডিজের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে অধ্যাপনা করে আসছেন। 

নোট: প্রথম প্রকাশ: প্রতিচিন্তা, দ্বাদশ বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা, অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০২২।