দক্ষিণপন্থীরা কেন সাবঅলটার্ন সাজে

সারকথা

এ প্রবন্ধে রাজনৈতিক সাহিত্যে ‘সাবালটার্ন’ বা নিম্নবর্গীয় ধারণার অপব্যবহার এবং দক্ষিণপন্থীদের কৌশলগত রূপান্তর নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। লেখকের যুক্তি হলো, প্রকৃত অধিকারবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর হওয়ার পরিবর্তে দক্ষিণপন্থীরা এখন নিজেদের ‘মজলুম’ বা অবদমিত হিসেবে তুলে ধরছে। এর মাধ্যমে তারা মানুষের জরুরি অর্থনৈতিক ও শ্রেণিগত সংকটগুলোকে আড়াল করছে। তারা সাংস্কৃতিক যুদ্ধ ও কৃত্রিম পরিচয়বাদী ইস্যু সামনে এনে সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে করপোরেটতন্ত্র ও সামরিকায়নের পক্ষে চালিত করার চেষ্টা করে থাকে। এই বুদ্ধিবৃত্তিক কারসাজি মূলত বিদ্যমান আধিপত্যবাদী কাঠামো ও এলিটদের স্বার্থ রক্ষার একটি নতুন প্রতিরক্ষাব্যূহ হিসেবে কাজ করছে। এমন প্রেক্ষাপটে, লেখক নিম্নবর্গের মুক্তির জন্য নিজস্ব অর্গানিক বুদ্ধিজীবী তৈরির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। পরিশেষে, এ লেখায় দক্ষিণপন্থীদের সাবালটার্ন সাজার প্রবণতাকে বিশ্বব্যাপী প্রগতিশীল রাজনীতির জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ভূমিকা

রাজনৈতিক সাহিত্যে ব্রাত্যজন, অন্ত্যজ, কণ্ঠহীন ও নিম্নবর্গীয়দের বোঝাতে সাধারণভাবে ‘সাবঅলটার্ন’ শব্দ ব্যবহার করা হয়। তবে এটা কেবল একটা সাধারণ শব্দ নয়, গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ধারণাও বটে। নানান শ্রেণি ও উপশ্রেণিতে জটিলভাবে বিভক্ত একালের সমাজ। এখানে কারা ব্রাত্যজন বা নিম্নবর্গ, কারা নয়, সে বিষয়ে বিতর্কের শেষ নেই।

সাবঅলটার্ন শব্দের ব্যবহারের সঙ্গে আন্তোনিও গ্রামসির (১৮৯১-১৯৩৭) নাম জড়িয়ে আছে। কারাগারে লেখা ডায়েরিগুলোতে ইতালির দার্শনিক গ্রামসি মূলত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিকভাবে অধিকারবঞ্চিত ও সামাজিক পরিসরে কণ্ঠস্বরহীনদের বোঝাতে এই শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। তাঁর কাছে ‘সাবঅলটার্ন’ ছিল ‘সর্বহারা’র সমার্থক ধারণা। তবে সাবঅলটার্ন কেবল সম্পদহীন জনতাকে বোঝায় না। যে ‘জনতা’ চাওয়া-পাওয়ার কথা বলার কাঠামোও হারিয়ে ফেলেছে বা শাসকগোষ্ঠী যাদের থেকে ওই সব কাঠামো নিয়ে নিয়েছে, সে রকম সর্বহারা হলো সাবঅলটার্ন। যারা অধস্তন ও উপনিবেশিত, যারা ‘বৈধ অধিকারের’ চৌহদ্দির বাইরে, তাদের কথা বলা হচ্ছে এ ধারণায়।

ইতিহাসের শ্রেণিবিভক্ত সব সমাজেই নানান সাবঅলটার্ন গোষ্ঠী ছিল। একই সঙ্গে ছিল তাদের প্রতিপক্ষ ‘ডমিনেন্ট গ্রুপ’ বা অধিপতি গোষ্ঠী।

সাবঅলটার্ন যখন তার অবস্থার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কারণগুলো সঠিকভাবে বুঝতে পারে, তার মুক্তির পথ চিহ্নিত করতে পারে এবং ওই পথে পদক্ষেপ ফেলে, তখন সে হয়ে দাঁড়ায় সাবঅলটার্ন ক্লাস বা অন্ত্যজ শ্রেণি।

একইভাবে অধিপতি গোষ্ঠীও যদি তার এত দিনকার ‘সফলতা’র সমাজকাঠামো টিকিয়ে রাখার পক্ষে রাজনৈতিক অবস্থান নেয়, তখন তারা অধিপতি শ্রেণি।

যার যার ‘গোষ্ঠী’র সাধারণ সদস্য হওয়া এবং শ্রেণিভুক্ত হয়ে ওঠার ফারাকটা রাজনৈতিকভাবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

ব্রাত্যজনেরা বিশ্বব্যাপী কতটা যে কোণঠাসা, সেটা সবার জানা। এই কয় দিন আগেই আমরা দেখলাম, সাবঅলটার্ন গণ–অভ্যুত্থানে শহীদ হয় কিন্তু পার্লামেন্টে আসতে পারে না। গায়ত্রী চক্রবর্তীর ভাষায়, অধস্তনের কথা শোনার জন্য কেউ নেই। অনেক সময় অন্যরা নিজেদের কথা সাবঅলটার্নের নামে চালিয়ে দেয়। অনেক অভিজাত নারী মিডিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে বলে দেয়, ‘নারী সমাজের নির্বাচনী সংগ্রামে নামার দরকার নেই। তারা সেটা চায় না! তারা চায় ঘরে থাকতে!’ এ রকম বয়ান আসলে অন্ত্যজ হিসেবে নারীর উপনিবেশিত অবস্থা লুকানোর চেষ্টা। অন্য ব্রাত্যদের নিয়েও এ রকম নির্মম কৌতুক হামেশা দেখি আমরা। আরেকটি মজার ঘটনা ঘটছে আজকাল।

দক্ষিণপন্থীরা বৈশ্বিক পরিসরে এবং বাংলাদেশেও নিজেদের সাবঅলটার্ন শ্রেণিভুক্ত দাবি করে বক্তৃতা-বিবৃতি-তত্ত্ব দিয়ে চলেছেন। সাবঅলটার্ন ধারণার এ রকম ব্যবহার বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। ‘বিপ্লব স্পন্দিত বুকে সাবঅলটার্ন’ সাজার ব্যাপারটা সমাজে শব্দটিকে ঘিরে একধরনের ধারণাগত বিকৃতির শঙ্কা তৈরি করেছে।

দক্ষিণপন্থীরা কোন শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করছে

রাজনীতির ময়দানে ও সমাজজীবনে যারা রূপান্তর ও প্রগতির বিরোধী; কোনো বিশেষ উগ্র জাতিবাদের ভক্ত; ধর্মীয় বা জাতিগত বা বর্ণগত শ্রেষ্ঠত্ববাদে আসক্ত; জাতপাতের সমীকরণ বদলানোর কথা শুনলে বিব্রত হয়, বৈষম্যে ভরা বর্তমান অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থাকে যারা নিত্যনতুন প্রলেপ দিয়ে ধরে রাখতে চায়, নারী-পুরুষের সম্পর্কের চলতি ধরনকে আরও পাকাপোক্ত করতে ইচ্ছুক এবং নানান ধর্মীয় বিধিবিধানের দোহাই দিয়ে আরও কর্তৃত্ববাদী, আরও রক্ষণশীল সমাজ-রাষ্ট্র কায়েম করতে ইচ্ছুক, তাদেরই সাধারণভাবে দক্ষিণপন্থী বা ডানপন্থী ধরা হয়। এসব আদর্শ পরোক্ষে একটা ‘শ্রেণি’রও প্রতিনিধিত্ব করছে এবং সেটা হলো বর্তমান অধিপতি শ্রেণি; যে অধিপতি শ্রেণি একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অধিপতি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে অর্গানিকভাবে সম্পর্কিত। এরা একটা বড় গাছের ডালপালার মতো।

দক্ষিণপন্থীদের হঠাৎ জোট বেঁধে নিম্নবর্গ সাজতে চাওয়া অনেক কারণে বিস্ময়কর। আবার স্ববিরোধীও। তবে ভীষণভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। স্ববিরোধী কেন, সেটা আগে বলা যাক।

অনেক দেশেই দক্ষিণপন্থীদের হাতে এখন অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বিমা, মিডিয়া, ওষুধ কোম্পানি। সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সাপ্লাই চেইনগুলোও তারা নিয়ন্ত্রণ করে।

ধরা যাক, একটা দেশে দক্ষিণপন্থীদের হাতে বড় অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান আছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিক ও পরিচালক দল সমকালীন পুঁজিতান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্কে ‘সফল’ হওয়া মানুষ। এই অর্থনৈতিক সম্পর্কের সামাজিক ‘সুফল’ (পড়ুন উদ্বৃত শ্রম) আত্মসাৎ করে এবং রাজনৈতিক-প্রশাসনিক কাঠামোর বন্ধুত্বে ভর করেই তাঁরা ‘সফল উদ্যোক্তা’। এ রকম সফল ব্যক্তিরা যদি এত দিনকার রাজনৈতিক-প্রশাসনিক-দার্শনিক কাঠামোর অনুরাগী থাকেন এবং তাকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে জ্বালানি জুগিয়ে যেতে থাকেন, তাহলে কোন শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করছেন তাঁরা? উত্তর সহজ। কিন্তু তারপরও হঠাৎ নিজেদের যদি তাঁরা ব্রাত্যজন দাবি করে প্রচার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন, তাহলে নিশ্চয়ই ধাঁধায় পড়তে হয়।

বিদ্যমান অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ‘সফল’ হয়েও নিজেদের ‘দমিত’ ও ‘ক্ষমতাহীন’ দাবি নিশ্চয়ই সন্দেহ তৈরি করে। এমনও দেখা যায়, বক্তৃতা-বিবৃতিতে নিজেদের মজলুম দাবি করা এসব শক্তি কোনো দেশে বেলচা, কিরিচ, তলোয়ার হাতে, কোনো কোনো দেশে ত্রিশূল হাতে ভিন্নমতালম্বীদের দৌড়াচ্ছে।

রাজনৈতিকভাবে সাবঅলটার্নদের এ রকম অধিপতি শ্রেণির বিরুদ্ধে থাকার কথা। তাদের চ্যালেঞ্জ করার কথা। কিন্তু সব সময় সে রকম ঘটে না। কেন ঘটে না, তার বিস্তর আর্থসামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কারণ আছে। সাবঅলটার্নদের মধ্যে দক্ষিণপন্থার আদর্শিক প্রভাব বা হেজিমনিই বরং বেশি দেখছি আমরা। আত্মঘাতী হলেও এটাই অহরহ ঘটছে। বাংলাদেশে তো বটেই।

একজন অন্ত্যজ যদি দক্ষিণপন্থী চিন্তায় ঝোঁকেন, তখন তিনি অধিপতি শ্রেণির মানুষ। তখন আর তিনি মজলুম শ্রেণির সদস্য থাকেন না। অন্যদিকে দক্ষিণপন্থীরা আধিপত্যবাদী কাঠামো ও প্রথার সমর্থক বলেই দক্ষিণপন্থী।

রাজনৈতিক-দার্শনিকভাবে কার কোন ‘শ্রেণি’তে অবস্থান, সেটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষ বা একদল মানুষ কোন শ্রেণির এবং কোন ধরনের সামাজিক কাঠামোর পক্ষে বলছেন, সেটাই তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ঠিক করে দেয়। একজন দক্ষিণপন্থী অধিপতি গোষ্ঠীর আন্তরিক সদস্য থেকে একই সঙ্গে সাবঅলটার্ন দাবি করলেও তিনি অধিপতি শ্রেণিরই সদস্য থাকেন। একই সঙ্গে তাঁর এই দাবি দুরভিসন্ধিমূলকও হতে পারে।

কেন দক্ষিণপন্থীরা নিজেদের সাবঅলটার্ন দাবি করে

বর্তমান বিশ্বে দক্ষিণপন্থার বেশ বসন্তকাল যাচ্ছে। তার বিরুদ্ধে সমতাবাদী, রূপান্তরবাদী, উদারনৈতিক সংস্কৃতির সংগ্রামও আছে। এ সংগ্রামে সব শ্রেণি-উপশ্রেণিরই স্বার্থ আছে।

সমাজে যারা সুবিধাজনক অবস্থায় আছে, তাদের নিশ্চয়ই পরিবর্তন দরকার নেই। তারা চাইবে সবকিছু যেভাবে আছে, সেভাবে থাকুক। তাদের দরকার ‘স্থিতিশীলতা’। সে কারণে দক্ষিণপন্থার বিজয় তাদের কাম্য। দক্ষিণপন্থার সঙ্গে তার মৈত্রী ও স্বার্থের জায়গা এখানেই।

অন্যদিকে নিপীড়িত গোষ্ঠী তথা ব্রাত্য শ্রেণির এই সংগ্রামে স্বাভাবিকভাবে দক্ষিণপন্থীদের বিরুদ্ধে থাকার কথা। তাদের জন্য সমাজের বর্তমান ক্ষমতা-সম্পর্ক পরিবর্তন দরকার। সেই পরিবর্তন যত আমূল হয়, তত নতুন বন্দোবস্ত তৈরির সুযোগ আসে তাদের সামনে।

সমাজে ক্রমে এই দুই ধারার মেরুকরণ তীব্রতা পাচ্ছে। এ রকম মেরুকরণে কাদের অস্বস্তি, সেটা বিস্তারিত আলাপ না করলেও চলে।

অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা নানান জনগোষ্ঠী, নারীসমাজ, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুসহ বহু গোষ্ঠী মিলে চারদিকে ব্রাত্যরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। এই সংখ্যাগুরুরা যদি চিন্তা ও তৎপরতায় প্রগতিমুখী হয়ে পড়ে, সব শিকল ছিন্ন করতে চায়, মুরব্বিদের মুখরোচক বয়ানের ফাঁকিজুঁকি বুঝে ফেলে, তাহলে বহু পক্ষের সমস্যা। সচেতন সাবঅলটার্ন শ্রেণিকে নিয়ে আমলাতন্ত্রের সমস্যা, বিদ্যমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সমস্যা, শত শত বছরের নিয়ম-কানুন-প্রথার বাজারের সমস্যা, অনেক রাজনৈতিক দলেরও সমস্যা।

এরা সবাই মিলে সাবঅলটার্নদের তাই টার্গেট করে। সাবঅলটার্নদের দক্ষিণপন্থী পরিসরে ধরে রাখতে, টেনে আনতে অনেক কায়দা করা হয়। অনেক কৌশল করা হয় নিম্নবর্গের সহানুভূতি পেতে, তাদের বিভ্রান্ত করতে। তাদের বোকা বানাতে। তাদের প্রিয়ভাজন হতে। দক্ষিণপন্থীদের সে রকমই এক কৌশল নিজেদের সাবঅলটার্ন হিসেবে হাজির করা। ‘প্রকল্প’ হিসেবে এটা বেশ সফলও।

নিম্নবর্গের জন্য যেভাবে ফাঁদ পাতা হয়

নিম্নবর্গের কাছে নিজেদের তুলে ধরতে প্রাথমিক পথ-পদ্ধতি হিসেবে দক্ষিণপন্থীরা নানা ধরনের সাংস্কৃতিক ও পরিচয়বাদী ইস্যু নিয়ে হাজির হয়। এতে সমাজে অন্ত্যজদের মূল যেসব সমস্যা, সবকিছু সুন্দরভাবে আড়ালে চলে যায়। অন্ত্যজদের মূল সমস্যা কী? তাদের সঙ্গে আলাপে বসলেই আমরা শুনব—কর্মসংস্থান না থাকা, মজুরিবঞ্চনা, শিক্ষা-চিকিৎসা-পরিবহনসুবিধা না পাওয়া, বাসস্থানের অভাব, কলোনিয়াল প্রশাসনের নিপীড়ন, কোর্ট-কাছারির হয়রানি, সংঘবদ্ধ হতে না পারা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের অভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হওয়া—এ রকম বহু কিছুতে হাবুডুবু খাচ্ছে তারা।

দক্ষিণপন্থীরা ‘সাংস্কৃতিক যুদ্ধ’ লাগিয়ে এসব সমস্যাকে আলোচনার জগৎ থেকে তাড়িয়ে দেয়। এতে শাসক এলিটদের এবং করপোরেট শক্তির বিপুল উপকার করে চলে তারা। এটা তারা ‘দায়িত্ব’ হিসেবেও করে, স্বতঃস্ফূর্তভাবেও করে।

বাংলাদেশে গণ–অভ্যুত্থানের পর সচেতনভাবে এ রকম অনেক সাংস্কৃতিক বিষয় তুলে আনা হয়েছিল। ওড়না, ভাস্কর্য, মাজার, গানের অনুষ্ঠান—এসবকে কেন হঠাৎ মহা জাতীয় সমস্যা হিসেবে দাগানো-পোড়ানো শুরু হয়েছিল? উত্তর খুব সোজা।

এ রকম সাংস্কৃতিক বিতর্কে কখনো সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র বা বড় মার্কেট প্লেয়ারদের লক্ষ্যবস্তু করা হয় না। ‘আমরা’ বনাম ‘তোমরা’ ভাগাভাগি ছড়িয়ে দেওয়া হয় সমাজের নিচুতলায়।

দক্ষিণপন্থী বুদ্ধিজীবীরা সচরাচর জনতার অনুভূমিক পরিসরে (Horizontal Space) বিতর্ক ছুড়ে দেন। উলম্ব (Vertical Space) পরিসরে সংঘাত চান না তাঁরা। তখন দেখা যায়, একই লেবার লাইনের দুই সহকর্মী দল পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে এবং একাংশ এমন এক বুদ্ধিজীবীকে পথপ্রদর্শক ভাবছে, যিনি আসলে দক্ষিণপন্থী গুরু। যিনি ওই লেবার লাইনের শিল্পমালিকের রাজনৈতিক আদর্শের সহযোগী।

বাংলাদেশে গণ–অভ্যুত্থানের পর নির্বাচনের ঠিক আগে আগে ব্যাপক সাংস্কৃতিক যুদ্ধ দেখেছি আমরা। ওই যুদ্ধ থেকে এখানকার ব্রাত্য সমাজ কতটা লাভবান হলো আর ব্রাত্যদের প্রতিনিধি দাবি করে কারা বড় বড় পদ-পদবি দখল করল এবং ব্রাত্যদের ভোটে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে কারা লাভবান হলো, সেসব খতিয়ে দেখলে আমরা এ রকম যুদ্ধের রাজনীতিটা ভালোভাবে বুঝতে পারব। বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক যুদ্ধ লাগিয়ে কীভাবে একটা নিষ্ক্রিয় বিপ্লব (passive revolution) এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে, সেটা বুঝতে দক্ষিণপন্থীদের সাবঅলটার্ন সাজার সাধনাটাও অনিবার্য মনোযোগ দাবি করে।

দক্ষিণপন্থা যাদের ‘প্রতিপক্ষ’ হিসেবে দেখায়

কেবল সাংস্কৃতিক বিতর্ক তোলা নয়, ব্রাত্যদের বোকা বানাতে দক্ষিণপন্থীরা নিজেদের বিদ্যমান সমাজব্যবস্থার বিরোধিতাকারী মহল হিসেবেও দেখায়। বোঝাতে চায়, তারাও এলিটদের প্রভাব-প্রতিপত্তি কমুক এটা চায়; তারাও মজলুম, চিন্তার জগতে তারাও কোণঠাসা। তারা আসলে সাবঅলটার্ন। কণ্ঠহীন।

কেন এই কৌশল নিতে হয় তাদের?

কারণ, সমাজে প্রকৃত মজলুমদের মধ্যে নিজেদের যাবতীয় নিত্যদিনের অভিজ্ঞতার কারণে পরিবর্তনকামী প্রগতিশীল চিন্তাবিদদের প্রভাব থাকে। প্রতিদিনের অভিজ্ঞতায় কণ্ঠহীনেরা দেখে, বিশ্বের সব দেশের অতীত ও বর্তমানের গ্রামসিরাই তাদের অবস্থা সবচেয়ে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ঠিক এ কারণেই ব্যাপক ধন এবং আয়বৈষম্য আছে—এমন দেশগুলোতে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সমাবেশশক্তিতে পিছিয়ে থাকলেও চিন্তার জগতে রূপান্তরবাদী বুদ্ধিজীবীদের বেশ প্রভাব। নোয়াম চমস্কি থেকে শুরু করে অরুন্ধতী রায় পর্যন্ত চিন্তাবিদদের শক্তির জায়গাটা এখানেই।

এ রকম সমাজে যেসব দৈনিক পত্রিকা, ম্যাগাজিন, টিভি চ্যানেল দীর্ঘকাল ধরে বঞ্চনা ও নিপীড়নের বিবরণ প্রকাশে সাহসী ও স্বচ্ছ অবস্থান নেয়, তাদেরও পাঠক-শ্রোতা কম নয়। তাদের সমর্থনকারী রাজনৈতিক গোষ্ঠী কম থাকলেও এসব মিডিয়া বা বুদ্ধিজীবীর সমাজে অর্গানিক একটা প্রভাব থাকে। এ রকম চিন্তাকেন্দ্রগুলো নিজস্ব বুঝ থেকেই দক্ষিণপন্থারও অনিবার্য বিরোধী থাকে। কেবল অর্থনৈতিক শোষক সমাজই নয়, রাজনৈতিক দক্ষিণপন্থার বিরুদ্ধেও পরিবর্তনকামী বুদ্ধিজীবীদের ঝুঁকি নিয়ে অবস্থান নিতে হয়। তাদের এই নিঃসঙ্গ বহুমুখী প্রতিরোধী ভূমিকার নিশ্চিতভাবে একটা নৈতিক শক্তি ও ভাবমূর্তি তৈরি হয় সমাজে।

এই পরিবর্তনবাদী বুদ্ধিকেন্দ্রগুলোকে দক্ষিণপন্থীরা ইদানীং ‘এলিট চিন্তাশক্তি’ হিসেবে সাবঅলটার্নদের সামনে প্রতিপক্ষ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। ভারতে রমিলা থাপার, প্রভাত পট্টনায়েক, ইরফান হাবিবদের সেভাবে দেখায় আরএসএসপন্থীরা। পাকিস্তানেও দক্ষিণপন্থীরা অসিম সাজ্জাদ আখতার বা আম্মার আলীদের সেভাবে দেখে। দক্ষিণপন্থীদের একই রকম টার্গেট তালিকা আছে বাংলাদেশেও। ইউরোপ-আমেরিকাতেও আছে। নিজেদের সাবঅলটার্ন দাবিদার আরএসএস পরিবারের বেলায় দেখা গেছে, প্রান্তিক ও দরিদ্র এলাকাগুলোর যেখানেই তারা মায়াকান্নায় রাজনৈতিকভাবে সফল হয়েছে, সেখানেই শিগগির স্থানীয় ভূসম্পদ আদানির মতো করপোরেটদের হাতে তুলে দিয়েছে।

বাংলাদেশে যেসব রাজনৈতিক মহল আজ নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক মজলুমের দাবি তুলেছে, বিগত দশকগুলোতে এরাই শ্রমজীবীদের আন্দোলনগুলোকে শিল্প-ধ্বংসের বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে বিবৃতি দিত। আদিবাসীদের দাবিদাওয়াকে এরা রাষ্ট্র ভাঙার ষড়যন্ত্র হিসেবে এখনো বিবৃতি দেয়। দলিতদের নিয়ে কথা বললে বলা হতো, এটা ভারত থেকে আমদানি করা বিষয়। বাংলাদেশে দলিত, হরিজন বলে কিছুই নেই!

সাবঅলটার্ন বলে দাবিদার এই গোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউনূস সরকারের বহুল বিতর্কিত চুক্তিটি নিয়ে যে চুপ থাকে, সে–ও একই কারণে। একই কারণে এই চুক্তির বিরোধিতাকারী বুদ্ধিজীবীদের থেকে অন্ত্যজদের বিচ্ছিন্ন করতে বহু ফন্দি করে তারা। যেসব বুদ্ধিজীবী শ্রম অধিকার, নারী অধিকার, দলিত অধিকার নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কথা বলেছেন, তাঁদের মূল সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে নাস্তিক-মুরতাদসহ নানা ধরনের মিথ্যাচারের আশ্রয় নেওয়া হয়। মধ্যযুগের সাহিত্যে মুসলমানদের অবদান ও ঐতিহ্য নিয়ে এ দেশের সেরা এক বুদ্ধিজীবী ছিলেন অধ্যাপক আহমদ শরীফ। তাঁর ওই গবেষণা মুসলমানদের জন্য বিপুল বুদ্ধিবৃত্তিক গৌরব তৈরি করেছে। সামাজিক পরিবর্তনের প্রশ্নে তাঁর চিন্তাধারা ছিল র‌্যাডিক্যাল। কেবল সে কারণে মুরতাদ ট্যাগ দিয়ে হরতাল ডেকে ‘গণশত্রু’ হিসেবে তাঁকে হত্যাযোগ্য করার অপচেষ্টার কথা অনেকের হয়তো এখনো মনে আছে।

এ রকম চিন্তাবিদদের থেকে জনতাকে দূরে রাখার বিবিধ চেষ্টার পাশাপাশি পরিবর্তনবাদী চিন্তা ও তৎপরতার কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে দক্ষিণপন্থীদের আরও কিছু বক্তব্য আছে। তারা এ–ও দেখাতে চায়, প্রভাবশালী বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলে তাদের যে দুর্বল অবস্থা—জনসভায় অনেক বড় হয়েও, ভোটে এগিয়ে থেকেও যুক্তির যুদ্ধে যে তারা দুর্বল, সেটা অবমূল্যায়নজনিত। তারা চিন্তার জগতে অবহেলার শিকার! তারা ‘ভিকটিম’! তারা বঞ্চিত! অবদমিত! তারা বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের অব্যবস্থাপনা ও অসাম্যের বলি! সমাজে মেঠো রাজনীতিতে বড় মালিকানার পরও চিন্তার জগতে নেতৃত্বশীল স্থান দেওয়া হচ্ছে না তাদের! যা অন্যায়, অন্যায্য! এভাবে তারা আমজনতার বঞ্চনার নিজস্ব ঐতিহাসিক বোধে নিজেদেরও স্থাপন করতে চায়, যুক্ত করতে চায়। বঞ্চিত ও নিপীড়িত হওয়ার স্বকল্পিত একটা ব্যানার বানিয়ে তারা সাবঅলটার্নের সঙ্গে একটা অর্গানিক বা জৈব সম্পর্ক দেখাতে চায়। নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও আদর্শিক করুণ হালকে ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ (victimhood) মোড়কে হাজির করে তারা। বোঝাতে চায়, তাদের দুর্বলতা আসলে ব্রাত্যদের প্রতি শাসকগোষ্ঠীর বৃহত্তর বঞ্চনার ক্ষুদ্র এক অংশ।

অন্ত্যজদের মধ্যে জাতিবাদী, বর্ণবাদী, নারীবিদ্বেষী, সমরবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ছড়ানোর বাজার এখন কিছুটা পড়তির দিকে। কিন্তু ‘ভিকটিমহুড’ কারেন্সি হিসেবে বেশ চলছে। এটা অনেকটা জেলেসমাজের কাছে চীন থেকে আসা দুয়ারি জাল/কারেন্ট জালের মতো। বেশ কার্যকর, কিন্তু বেশ সর্বনাশা।

পুরোনো সিস্টেমের বিরুদ্ধে, পুরোনো বন্দোবস্তের বিরুদ্ধে সাবঅলটার্নের বহুকালের ক্ষোভ জমে আছে। সেটাকে কাজে লাগিয়ে, নিজেদের কল্পিত অসহায়ত্বকে তাতে যুক্ত করে চিন্তা ও তৎপরতার পরিসর বাড়াতে চায় দক্ষিণপন্থীরা। এভাবে তারা ব্রাত্যদের ধোঁকায় ফেলে। আবার সাংস্কৃতিক যুদ্ধের পাতানো খেলার মাধ্যমে তারা এলিটদের মূল ঐতিহাসিক অপরাধও আড়াল করে চলে।

করপোরেটতন্ত্রের নতুন প্রতিরক্ষাব্যূহ?

দক্ষিণপন্থীরা সাবঅলটার্ন হওয়ার প্রচেষ্টা নিলেও সারবস্তুর বিবেচনায়, রাজনৈতিক লক্ষ্যের বিবেচনায়, শ্রেণিগত বৈপরীত্যে দক্ষিণপন্থা হলো সাবঅলটার্নের যম। অভিজাতদের মিত্র। সাবঅলটার্ন শ্রেণি চায় আরও আরও স্বশাসিত জীবন, অথচ দক্ষিণপন্থার বাসনায় থাকে আরও আরও নিয়ন্ত্রণ আরোপ; নানান গোষ্ঠীর মধ্যে আরও আরও ব্যবধান তৈরি, বিভেদ বাড়ানো।

সাবঅলটার্ন প্রতিপক্ষ হিসেবে অধিপতি শ্রেণির চিন্তাগত প্রভাব তথা হেজিমনি ভাঙতে চায়। তার চাওয়া, অন্ত্যজ সবার ভাষা-সংস্কৃতির উত্থান ঘটুক সমাজে। কর্তৃত্বের কেন্দ্রগুলো ভেঙে পড়ুক। অন্যদিকে দক্ষিণপন্থা চায়, তার কর্তৃত্বে সবাই অনুগত হয়ে উঠুক। তার আদর্শ সবার মতাদর্শ হোক। সবাই দেশের সংখ্যাগুরুর [পড়ুন: তার] সংস্কৃতি চর্চা করুক।

রাষ্ট্রকে সুরক্ষার আধার মনে করে দক্ষিণপন্থা। রাষ্ট্র দখল করে সংখ্যাগুরুর সংস্কৃতি অন্ত্যজ সবার ওপর আরোপ করা তার গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক লক্ষ্য থাকে। কিন্তু প্রলেতারিয়েত প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ‘রাষ্ট্র’কে দেখেছে এলিটদের নিপীড়ন ও বল প্রয়োগের যন্ত্র আকারে। এলিটদের সহযোগী আকারে। ফলে সাবঅলটার্নরা রাষ্ট্রপ্রেমে মুগ্ধ নয়; তারা বরং সমাজের ভেতর (রাষ্ট্রীয় খবরদারির বাইরে) সাংস্কৃতিক মুক্তাঞ্চল গড়াকে বেশি জরুরি মনে করে। কিন্তু দক্ষিণপন্থা তাদের রাষ্ট্রবাদী করতে চায়। এটা দক্ষিণপন্থার সঙ্গে সমরবাদীদের মৈত্রী তৈরি করে।

যেকোনো দেশে সামরিকায়ন বাড়াতে হলে ‘শত্রু’র দরকার হয়। প্রকাশ্য শত্রু পাওয়া না গেলে ছদ্মশত্রু খুঁজে বের করা হয়। শত্রুতার অনেক গল্পও লাগে তখন। ষড়যন্ত্র ও ভীতির আবহ তৈরি করতে হয় এ সময়।  জাতীয় বাজেটের বড় অংশ কেটে সামরিকায়নের পেছনে ব্যয়ের পক্ষে জনমত তৈরি করতে দক্ষিণপন্থীদের তৈরি রাষ্ট্রপ্রেম ভালো কাজে দেয়। কড়াইল বস্তিতে উচ্ছেদের মুখে থাকা রিকশাচালকেরও তখন মনে হয়, বাংলাদেশের সর্বাগ্রে মিসাইল ও সাবমেরিন কেনা উচিত। এভাবে সে বৈশ্বিক যুদ্ধবাজ ব্যবস্থার খুদে সমর্থক হয়ে ওঠে। এ সময় যে বুদ্ধিজীবী তার মতো মানুষদের বাসস্থান, কাজ ও মজুরির প্রশ্ন নিয়ে কথা বলে, তাকে বেশ অপ্রাসঙ্গিক মনে হয় ওই কড়াইলবাসীর। এ রকম কোটি কোটি রিকশাচালক, ভূমিহীন, নারী, দলিত, শ্রমিকদের কাছে পৌঁছাতেই দক্ষিণপন্থার সাবঅলটার্ন হওয়ার সাধনা। এটা যেমন দেশীয় রাজনৈতিক প্রকল্প, তেমনি আন্তর্জাতিক যোগসূত্রও তার বিপুল। এতে যে তারা সফল হয়, তাতে সাবঅলটার্নের কোনো দায় নেই? আছে।

সাবঅলটার্নের অর্গানিক বুদ্ধিজীবীর অভাব আছে। ‘অর্গানিক বুদ্ধিজীবী’ বা জৈব বুদ্ধিজীবী বলতে বোঝানো হয় কোনো ‘শ্রেণির ভেতরকার নিজস্ব বুদ্ধিজীবী’। পেশায় তাঁরা যা–ই হোন না কেন। এ রকম বুদ্ধিজীবীর কাজ হলো সাবঅলটার্নদের ভেতরে থেকে বিপরীত মতাদর্শের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রাম গড়ে তোলা। তাঁরা বাস্তব পরিস্থিতির মূল দ্বন্দ্বগুলো (প্রিন্সিপাল কন্ট্রাডিকশনস) এবং সেসবের সঠিক ব্যাখ্যা হাজির করেন ব্রাত্যদের মধ্যে। তখন নিম্নবর্গ দক্ষিণপন্থীদের সাংস্কৃতিক ছকের বাইরে আসতে শুরু করে। তাদের মধ্যে শ্রেণিগত স্বার্থের জায়গা স্পষ্ট হয়। তারা পাল্টা হেজিমনি তৈরির উপযোগী হয়ে ওঠে। তবে এ রকম অবস্থা তৈরির জন্য সাবঅলটার্নকে তার শ্রেণির অর্গানিক বুদ্ধিজীবীদের মদদ দেওয়ার দরকার আছে। কারণ, দক্ষিণপন্থীরা ব্রাত্যজনের নিজস্ব বুদ্ধিজীবীদের ভাবনাচিন্তা ও বিশ্লেষণের প্রচার ও প্রসারকে সব সময় বাধাগ্রস্ত করে।

নিজস্ব বুদ্ধিজীবী দল ছাড়া সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিদ্বন্দ্বী শ্রেণিকে মোকাবিলা করা যায় না। বাংলাদেশের অন্ত্যজরা এ ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবেই বেশ পিছিয়ে। যদিও এমন বুদ্ধিজীবী আছেন, তাঁরা এখানকার সাবঅলটার্নের লড়াই-সংগ্রাম-জয়-পরাজয়ের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার সারসংকলন প্রয়োজনমতো করে উঠতে পারেন না। সে কারণেই আজকের সাবঅলটার্ন অতীত সাবঅলটার্নের শত্রু-মিত্রের কথা ভুলে যাচ্ছে। ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাকে।

১৯৭১–এ জাতিগত ও ভূখণ্ডগত বঞ্চনার বিরুদ্ধে তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের সাবঅলটার্ন কৃষক-শ্রমিকের সশস্ত্র সংগ্রামকে ইদানীং অনেকগুলো বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র থেকে যে ‘প্রতিক্রিয়াশীল কাজ’ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, সেটা দক্ষিণপন্থীদের পরিকল্পিত কর্মসূচিরই অংশ। এ কাজে মুক্তিযুদ্ধের পরের ক্ষমতাসীনদের দুঃশাসনকে তারা কেবল ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে মাত্র। বিশ্বজুড়েই এ রকম হচ্ছে। প্রতিটি দেশের সাবঅলটার্ন বৈশ্বিক দক্ষিণপন্থার এ রকম চাতুরিগুলো সবিস্তার জানে না। সে কারণে প্রায় সব দেশে কমবেশি ধোঁকায় পড়ে তারা। কেবল সাবঅলটার্ন নয়, এ রকম ধোঁকায় পড়ে সাবঅলটার্নদের অনেক কথিত মিত্রও।

সমকালীন এই ধোঁকাবাজির মূল রাজনৈতিক লক্ষ্য সমাজের পলিটিক্যাল ইকোনমিতে পরিবর্তন ঠেকানো। আগে এই কাজ অধিপতি শ্রেণি করত। রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে সেটা করা হতো। এখন দক্ষিণপন্থীরা এ ক্ষেত্রে অধিপতি শ্রেণির সহযোগী শক্তি হিসেবে কাজ করছে। এলিটদের আন্তর্জাতিক মুরব্বিরা বহুকালের সাধনায় দেশে দেশে এ রকম শক্তিগুলোকে নতুন প্রতিরক্ষাব্যূহ হিসেবে তৈরি করেছে।

বৈশ্বিক করপোরেটতন্ত্র, সমরবাদ এবং মুনাফাভিত্তিক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একালের একটি গণলাইন হলো ব্রাত্যদের ভেতর দক্ষিণপন্থীদের প্রবেশ ঘটানো। সেই প্রকল্পের অংশ হিসেবেই দক্ষিণপন্থীরা সাবঅলটার্ন সাজে। এটা অন্ত্যজ ও ব্রাত্যদের রাজনৈতিক অবস্থার দুর্বলতাই বরং প্রকাশ করে।

লেখক পরিচিতি

আলতাফ পারভেজ পড়েছেন দর্শন বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছাত্রাবস্থায় সামরিক জান্তা বিরোধী আন্দোলনের একজন কর্মী ছিলেন এবং ডাকসু'র সদস্য হিসেবেও নির্বাচিত হন তখন। পরবর্তী জীবনে সাংবাদিকতা, শিক্ষকতা ও গবেষণাধর্মী কাজ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা ২০ এর অধিক। এর মধ্যে রয়েছে, লাল জুলাই (প্রথমা প্রকাশন, ২০২৫), যোগেন মণ্ডলের বহুজনবাদ ও দেশভাগ (প্রথমা প্রকাশন, ২০১৯), মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী: ইতিহাসের পুনর্পাঠ (ঐতিহ্য, ২০১৫), পাকিস্তান আন্দোলন: জিন্নাহ মওদুদী ভাসানীর ভূমিকা, পার্টিশন-বিতর্কের পুনর্পাঠ (প্রথমা প্রকাশন, ২০২৬), ইত্যাদি।