সফিকুর রহমান ও জ্যোতি রাহমান
বিপ্লব নাকি অভ্যুত্থান: এলিট তত্ত্বের আলোকে জুলাই-পরবর্তী রাজনীতি
সারকথা
এই প্রবন্ধে জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতিকে ‘বিপ্লব’ বনাম ‘গণ-অভ্যুত্থান’–কেন্দ্রিক প্রচলিত ব্যাখ্যার বাইরে এনে এলিট তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। লেখকদের প্রধান যুক্তি হলো, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে কেবল মতাদর্শগত বা গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পরিভাষায় বোঝা যথেষ্ট নয়; বরং এটি প্রতিষ্ঠিত এলিট ও উদীয়মান এলিট-আকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে ক্ষমতা, মর্যাদা, প্রবেশাধিকার ও প্রাতিষ্ঠানিক পুঁজির পুনর্বিন্যাসসংক্রান্ত প্রতিযোগিতার ফল। ১৯৪৭, ১৯৭১ ও ২০২৪ সালের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনা করে প্রবন্ধটি দেখায় যে বাংলাদেশের ইতিহাসে বৃহৎ রাজনৈতিক আলোড়নগুলোর পেছনে এলিট চক্রাবর্তন, কাঠামোগত বৈষম্য এবং সামাজিক উত্তরণের আকাঙ্ক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে এসব রূপান্তর অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমাজ-অর্থনীতির মৌলিক পুনর্গঠন ঘটানোর বদলে বিদ্যমান এলিট বিন্যাসের আংশিক বা পূর্ণ পুনর্সংস্থান ঘটিয়েছে। সাম্প্রতিক মধ্যবিত্ত সম্প্রসারণ, নগরায়ণ, প্রযুক্তির বিস্তার, অভিবাসন এবং পাবলিক-প্রাইভেট শিক্ষার বিভাজন আকাঙ্ক্ষী এলিটদের সংখ্যা ও অসন্তোষ বাড়িয়েছে। নির্বাচন-পরবর্তী বাস্তবতায় বিএনপি প্রতিষ্ঠিত ও উদীয়মান উভয় এলিট-পরিসরে প্রভাব বজায় রাখলেও জামায়াত ও এনসিপি তুলনামূলকভাবে আকাঙ্ক্ষী এলিটদের প্রতিনিধিত্ব করছে। প্রবন্ধের উপসংহার হলো, স্থিতিশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য রাজনীতি ও অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ অপরিহার্য; অন্যথায় রুদ্ধ এলিট বিন্যাস নতুন অস্থিরতা ও পরবর্তী এলিট আলোড়নের সম্ভাবনা তৈরি করবে।
ভূমিকা
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকেই এই গণ-অভ্যুত্থানের চরিত্রের সংজ্ঞায়ন নিয়ে রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক-বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই শুরু হয়। এক পক্ষ চব্বিশের জুলাইকে দেশের বৃহত্তম গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসনের অবসান ও গণতন্ত্রের পথে প্রত্যাবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখে। আরেক পক্ষ জুলাইকে দেশের রাজনীতি-সমাজ পুরো পাল্টে দেওয়া একটি গণবিপ্লব বলে অভিষিক্ত করে। দুই বছর পরে এই রাজনৈতিক-বৃদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের তীব্রতা কিছুটা হ্রাস পেলেও, এখনো এটা জারি আছে। কারণ, এই লড়াইয়ের উপযোগিতা রয়েছে দুই পক্ষের কাছেই। আমরা মনে করি, জুলাই-পরবর্তী দেশীয় রাজনীতিকে রাজনীতির এলিট তত্ত্বের আলোকে দেখা যেতে পারে। এই সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বুঝতেও সহায়ক হবে।
এলিট তত্ত্বের আলোকে দেখলে আমরা দেখব, ‘গণ-অভ্যুত্থান বনাম বিপ্লব’ কিংবা ‘শ্রেণিসংগ্রাম বনাম গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন’ সংক্রান্ত বিতর্কগুলো মূলত দেশের প্রতিষ্ঠিত এলিট এবং উদীয়মান এলিট বা এলিট-আকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতারই বহিঃপ্রকাশ। প্রথম পক্ষটি চায় বিদ্যমান এলিট কাঠামোকে মোটামুটি অক্ষুণ্ন রেখে ক্ষমতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে। অন্যদিকে দ্বিতীয় পক্ষটি সেই কাঠামো ভেঙে নিজেদের শীর্ষে বসিয়ে নতুন এক এলিট বিন্যাস গড়ে তুলতে চায়। কিন্তু বাস্তবে কোনো পক্ষই সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর মৌলিক বা আমূল পরিবর্তন চায় না।
আলোচনার সুবিধার্থে, সমাজের যেসব ব্যক্তি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক কাঠামোর দীর্ঘকালীন অবস্থান কিংবা পুঞ্জীভূত সম্পদের প্রভাবে সমাজ পরিচালনা বা পরিবর্তনের ক্ষমতা রাখেন, তাঁরাই প্রতিষ্ঠিত এলিট। সাধারণ জনগণের জন্য নির্ধারিত আইন কিংবা রীতিনীতি সচরাচর এদের ওপর সমভাবে প্রযোজ্য হয় না। বলা বাহুল্য, ‘এলিট’ ধারণাটি কেবল রাজনীতিবিদদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, শীর্ষ আমলা, সামরিক কর্মকর্তা, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ধারক এবং শক্তিশালী সংগঠনের প্রধানেরাও এর অন্তর্ভুক্ত। এমনকি শ্রমিক কিংবা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রভাবশালী নেতারাও এলিট শ্রেণির রূপ নিতে বা অংশ হতে পারেন। ফলে ‘অভিজাত’ আর ‘এলিট’ ধারণাগতভাবে এক নয়।
এলিটদের উপস্থিতি শাসক দলের গণ্ডি পেরিয়ে বিরোধী পক্ষেও বিস্তৃত। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা দেখায়, অধিকাংশ এলিটই সুবিধা পেতে ক্ষমতাসীন দলের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ফলে ক্ষমতা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার এই প্রতিযোগিতা প্রতিষ্ঠিত এবং উদীয়মান এলিটদের মধ্যে আড়াআড়ি ও খাড়াখাড়ি—উভয় অক্ষে সমানভাবে চলতে থাকে।
জনগণের যে অংশটির প্রধান উচ্চাকাঙ্ক্ষা এলিটবর্গে অন্তর্ভুক্ত হওয়া, তারাই মূলত ‘এলিট-আকাঙ্ক্ষী’। সংখ্যাগত দিক থেকে প্রতিষ্ঠিত এলিটদের তুলনায় এরা বহুগুণ বড়। সাধারণত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকেই এদের বড় অংশটি আসে; তবে এলিট হিসেবে স্বীকৃতি না পাওয়া অপেক্ষাকৃত অবস্থাপন্ন ব্যক্তিরাও এর অন্তর্ভুক্ত। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী উভয় রাজনৈতিক দলেই এলিট-আকাঙ্ক্ষীদের প্রতিনিধিত্ব বিদ্যমান, কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যের কারণে এদের একটি বড় অংশ বিরোধী রাজনীতিতে পুঞ্জীভূত হয়। বস্তুত এই প্রতিষ্ঠিত এলিট এবং এলিট-আকাঙ্ক্ষী দুই শ্রেণির বাইরেই বাস করে দেশের মূল ও বিশাল সাধারণ জনগোষ্ঠী।
রাজনীতির ‘এলিট তত্ত্ব’ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠিত ও উদীয়মান (এলিট-আকাঙ্ক্ষী) উভয় পক্ষই সাধারণ জনগণকে প্রভাবিত করতে এবং নিজেদের রাজনৈতিক গোত্রকে সুসংহত রাখতে মতাদর্শকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশে এলিট ও মতাদর্শের এই যুগপৎ ভূমিকা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। বিপ্লব বনাম গণ-অভ্যুত্থান, ধর্ম, জাতীয়তাবাদ, ভারতবিরোধিতা, সাম্যবাদ, সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা কিংবা ব্যক্তি ও পরিবারকেন্দ্রিক আনুগত্য—সবই আসলে একেকটি এলিট গোষ্ঠীর উত্থান, অস্তিত্ব রক্ষা কিংবা প্রভাব বিস্তারের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে কেবল বাহ্যিক মতাদর্শের বিশ্লেষণের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থ, পারিবারিক স্বার্থ এবং গোষ্ঠী বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে পর্যায়ক্রমিক বিশ্লেষণই অনেক বেশি বাস্তবানুগ।
রাজনীতির ‘এলিট-তত্ত্বের’ একটি মূল কথা হলো, সমাজে এলিটদের বিন্যাসের কাঠামোগত পার্থক্যের ওপরই অনেক ক্ষেত্রে কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা ও সামাজিক গতিপথ নির্ভর করে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেও প্রকৃত ক্ষমতা মূলত এলিটদের হাতেই ন্যস্ত থাকে; নির্বাচন কেবল এটিই নির্ধারণ করে যে কোন এলিট গোষ্ঠী গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও নির্বাচনের কৌশল কাজে লাগিয়ে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছাবে এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নেবে। ‘গণতান্ত্রিক এলিট-তত্ত্ব’ আরও স্পষ্ট করে বলে—প্রতিষ্ঠিত এলিটরা মূলত নিজেদের ক্ষমতাকে বৈধতা দিতেই গণতন্ত্রের নীতিগুলোকে ব্যবহার করে। তারা এই নীতিগুলোকে ক্ষমতা প্রয়োগের একধরনের নমনীয় সীমা মনে করে, এগুলোকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে না। তবে অন্য যেকোনো সমাজ বা রাষ্ট্রব্যবস্থার তুলনায় গণতান্ত্রিক সমাজে এলিট বিন্যাস অনেক বেশি বিস্তৃত ও উন্মুক্ত হয়। এর ফলে এসব রাষ্ট্রে সামাজিক অস্থিরতা কম থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সাধন সহজতর হয়। প্রসঙ্গত, এলিটদের এই সামাজিক কাঠামো উন্মুক্ত ও গতিশীল (open-access elite order) থেকে শুরু করে রুদ্ধ ও বদ্ধ (closed-access elite order) ধরন পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
প্রতিষ্ঠিত এলিটরা তাদের অবস্থান ধরে রাখতে নিজস্ব সম্পর্ক, নেটওয়ার্ক ও পারিবারিক উত্তরাধিকারকে ব্যবহার করে। আর দীর্ঘকাল ধরে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকার সুবাদে তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদ বহুগুণে পুঞ্জীভূত হয়। ‘রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তত্ত্বের’ মূল কথাই হলো রাষ্ট্রে রাজনৈতিক ক্ষমতার বিন্যাস এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতার বিন্যাসের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকা। কিন্তু বিদ্যমান এলিটরা যখন রাষ্ট্রক্ষমতা প্রয়োগ করে সমাজের অর্থনৈতিক সুবিধাবলিকে কৃত্রিমভাবে কেবল নিজেদের পক্ষেই পুঞ্জীভূত রাখতে চায়, তখন ক্ষমতাবঞ্চিত এলিট-আকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দানা বাঁধতে শুরু করে। এর ফলে তারা এলিট–কাঠামোয় দ্রুত রদবদল বা চক্রাবর্তন আশা করতে থাকে; এমনকি প্রয়োজনে বিপ্লবের পথ বেছে নিতেও দ্বিধা করে না।
এলিটদের মধ্যকার এই পরিবর্তন, আকাঙ্ক্ষীদের প্রতিষ্ঠা লাভ কিংবা প্রতিষ্ঠিতদের অবক্ষয়—সব সময়ই কোনো না কোনো গতিতে চলতে থাকে। তবে যুদ্ধ, বিদেশি আগ্রাসন বা গণ-অভ্যুত্থানের প্রভাবে এই প্রক্রিয়ায় ব্যাপক ও দ্রুতগতির ‘এলিট চক্রাবর্তন’ বা এলিট টার্নওভার ঘটে। এ ধরনের দ্রুত পরিবর্তন খুব কম ক্ষেত্রেই সমাজ ও অর্থনীতির মৌলিক রূপান্তর ঘটাতে পারে; অধিকাংশ সময়ই তা কেবল একদল এলিটের জায়গায় অন্য দলকে স্থলাভিষিক্ত করে। আর নতুন এই ক্ষমতাবান এলিটরা আসে মূলত আগে ক্ষমতাবঞ্চিত এলিট এবং তৎকালীন এলিট-আকাঙ্ক্ষীদের মধ্য থেকেই। এমনকি যেসব বিপ্লব সমাজে ব্যাপক অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন এনেছিল, সেগুলোর দিকে তাকালেও দেখা যায়, বছরের পরিক্রমায় সেখানেও এক নতুন প্রতিষ্ঠিত এলিট শ্রেণিরই উদ্ভব ঘটেছে, যারা বিপ্লবের আগে ছিল কেবলই এলিট-আকাঙ্ক্ষী। উদাহরণস্বরূপ, সোভিয়েত ইউনিয়নে পার্টি, আমলা ও সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত ‘নোমেনক্লাতুরা’ কিংবা কমিউনিস্ট চীনে আজকের অত্যন্ত প্রভাবশালী ‘তাইজিদাং’-এর কথা বলা যায়। এমনকি রুশ ও চীনের কমিউনিস্ট বিপ্লবের শীর্ষ নেতারাও মূলত এই এলিট-আকাঙ্ক্ষী বর্গ থেকেই এসেছিলেন এবং নিজেদের আকাঙ্ক্ষী বলয়ের ভেতরের অনুভূমিক লড়াইয়ে জিতেই তাঁরা ক্ষমতার শীর্ষে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন।
এই প্রসঙ্গে বিশ শতকের প্রথম দশকেই প্রবর্তিত রবার্ট মিশেলসের বিখ্যাত ‘এলিটতন্ত্রের লৌহ বিধি’ (Iron Law of Oligarchy) অত্যন্ত স্মরণীয়। মিশেলস বলেছিলেন—সব রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক দল ও সংগঠন, সেটির জন্ম গণতন্ত্র কিংবা সাম্যবাদ যার আদর্শেই হোক না কেন, তা অবশ্যম্ভাবীভাবেই স্বল্পসংখ্যক এলিটদের নিয়ন্ত্রণে পর্যবসিত হয়। গত এক শ বছরের ইতিহাস মূলত মিশেলসের সেই ‘লৌহ বিধি’র বারবার সত্যতা প্রমাণেরই ইতিহাস।
১৯৭১ ও ২০২৪: দুই বৃহৎ এলিট আলোড়ন
বাংলাদেশের ইতিহাসের এক ‘এলিট চক্রাবর্তন’ ঘটেছিল ১৯৭১ সালে, দেশের জন্মলগ্নেই। যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয় ও প্রস্থান তাদের দেশীয় সমর্থক প্রতিষ্ঠিত ও উদীয়মান এলিটদেরও রাতারাতি সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, আমলাতন্ত্র, একাডেমিয়া, গণমাধ্যম এবং সংস্কৃতি—সব ক্ষেত্র থেকেই বিচ্যুত করে। ফলে মুক্তিযুদ্ধের পরপরই আওয়ামী লীগের নেতা ও সমর্থকেরা প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে দেশের এলিট বিন্যাসে একচ্ছত্র আধিপত্য স্থাপন করেন, যার রাজনৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে। তবে আওয়ামী লীগকেন্দ্রিক এই রুদ্ধ এলিট বিন্যাসটি ছিল অত্যন্ত দুর্বল ও অস্থিতিশীল। এর প্রথম কারণ ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত ভঙ্গুর অর্থনীতি, যা এই নতুন এলিটদেরও শক্তিশালী হতে দেয়নি। দ্বিতীয়ত, ৯ মাস ধরে চলা জনযুদ্ধ ও নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের মধ্যে এলিট হওয়ার যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছিল, তা এই রুদ্ধ ও সীমিত এলিট বিন্যাস কোনোভাবেই ধারণ করতে সক্ষম ছিল না। ফলে বিপুলসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক সংগঠক, সামরিক কর্মকর্তা ও বিপ্লবী তরুণ আওয়ামী লীগের এই একচ্ছত্র এলিট কাঠামোর বিরুদ্ধে আড়াআড়ি ও খাড়াখাড়ি—উভয় অক্ষে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। এর মধ্যে বামপন্থী বিপ্লবীরা সবচেয়ে বড় ও সুদূরপ্রসারী খাড়াখাড়ি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন; কিন্তু রাষ্ট্রশক্তির চরম প্রয়োগ ঘটিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন এলিট বিন্যাস সেই প্রতিরোধ দমন করতে সক্ষম হয়। তবে এলিট ও এলিট-আকাঙ্ক্ষীদের অভ্যন্তরীণ আড়াআড়ি দ্বন্দ্ব থামেনি; বরং তা আরও তীব্র আকার ধারণ করে। অবশেষে ১৯৭৫ সালের আগস্ট থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে যে সহিংস অভ্যুত্থান ও রদবদল ঘটে, তা ছিল এই দ্বন্দ্বেরই চরম বহিঃপ্রকাশ।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশে দ্বিতীয় বৃহত্তম ‘এলিট চক্রাবর্তন’-এর সূচনা ঘটে। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে চেপে বসা শেখ হাসিনার রুদ্ধ এলিট বিন্যাসের অচলায়তন রাতারাতি ভেঙে পড়ে। এর ফলে ক্ষমতা, প্রশাসন, রাজনীতি, সমাজ, ব্যবসা, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যম—সর্বত্রই একটি বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয় (বা সৃষ্টি করা হয়)। জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান ১৯৭১ সালের মতো দীর্ঘ ও ব্যাপক জনযুদ্ধ না হলেও, দেশজুড়ে এলিট-আকাঙ্ক্ষীদের মনে যুদ্ধ–পরবর্তী সময়ের মতোই এক বিপুল উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্ম দিয়েছে। এর কারণ কেবল হাসিনার রুদ্ধ এলিট ব্যবস্থার হঠাৎ পতনই নয়; বরং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরব্যাপী কৃত্রিম রাজনৈতিক সমতার অবস্থাও সর্বত্র এলিট হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় বাড়তি ইন্ধন জুগিয়েছে। ফলে যাঁরা আগে কখনোই ক্ষমতার কাছাকাছি ছিলেন না, তাঁরাও এই সময়ে বিভিন্নভাবে ক্ষমতার স্বাদ ও সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। তবে অতীতের এলিট চক্রাবর্তনের সঙ্গে বর্তমানের একটি বড় পার্থক্য লক্ষ করা যায়। ২০২৬ সালের নির্বাচন ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের তুলনায় অনেক বেশি উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক এলিট বিন্যাস তৈরির পথ উন্মোচন করেছে। বর্তমানের এই এলিট বিন্যাসের আবির্ভাব ও বিবর্তন নিয়ে সমাজতাত্ত্বিক আলোচনায় গভীরে যাওয়ার আগে, আমাদের এই ভূখণ্ডের আরও অতীতের এলিট চক্রাবর্তনের ইতিহাস পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
ইতিহাসে এলিট চক্রাবর্তন
আমাদের এই ভূখণ্ডে গত এক শ বছরে বেশ কয়েকটি এলিট চক্রাবর্তনের ঘটনা ঘটেছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে বাংলায় এলিট বর্গ মূলত উচ্চবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়কে নিয়ে গঠিত ছিল, যেখানে মুসলমানদের উপস্থিতি ছিল চরমভাবে নগণ্য। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৩১-৩২ সালে বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুসলমানদের হার ছিল ৮ শতাংশের কম, প্রকৌশলে ১১ শতাংশের নিচে এবং আইনবিদ্যায় ১৮ শতাংশের কম। এই চরম বৈষম্য মুসলিম এলিট-আকাঙ্ক্ষীদের মনে এক সর্বব্যাপী ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি করেছিল। অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে স্বল্পসংখ্যার এই মুসলিম এলিটদের জন্য একটি পৃথক মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্রের গঠন ছিল ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক উত্থানের এক অভূতপূর্ব সুযোগ। বস্তুত ১৯৪৭ সালের পার্টিশনের পটভূমি নির্মাণে এই ঐতিহাসিক বৈষম্য এবং এলিট শ্রেণির উচ্চাকাঙ্ক্ষাই যে প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছিল, তা সুবিদিত।
একইভাবে পার্টিশনের পরও পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামোর অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা এক নতুন ধরনের বৈষম্য বাঙালি মুসলিম এলিট শ্রেণির স্বাভাবিক বিকাশকে প্রতিনিয়ত বাধাগ্রস্ত করেছে। কিছু পরিসংখ্যান বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরে। ১৯৫১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ৮ লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষকে ‘মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির পেশাজীবী’ (যাঁরা কারিগরি, ব্যবস্থাপনা, প্রশাসন, বিক্রয় ও সমজাতীয় পেশায় নিয়োজিত ছিলেন) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ১৯৭৪ সালের আদমশুমারিতে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৫ লাখে। উভয় ক্ষেত্রেই এটি ছিল তৎকালীন মোট জনসংখ্যার মাত্র ২ শতাংশের কাছাকাছি। অর্থাৎ পার্টিশনের পর পেশাদার কর্মসংস্থানে নিরঙ্কুশ সংখ্যার বিচারে কিছুটা বৃদ্ধি ঘটলেও এবং বাঙালি মুসলমানরা সেই পদগুলো পূরণ করলেও, জনসংখ্যার অনুপাত বিবেচনায় মধ্যবিত্ত শ্রেণির কোনো প্রকৃত বিস্তার ঘটেনি। ফলে রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থাতেও বাঙালি এলিট-প্রত্যাশীদের পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়নি। সংক্ষেপে, আড়াআড়ি ও খাড়াখাড়ি, এই দুই অক্ষেই বৈষম্য বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের অন্যতম পটভূমি।
শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ব্যক্তিত্ব এবং রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে মূলত তৎকালীন উদীয়মান বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগ হয়ে উঠেছিল এই ভূখণ্ডের আকাঙ্ক্ষী এলিটদের প্রধানতম রাজনৈতিক সংগঠন। তাই মুক্তিযুদ্ধের পরে মুজিবের রাজনৈতিক পতনকে সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় এই নির্দিষ্ট শ্রেণির প্রত্যাশা পূরণে তাঁর সরকারের ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে। এ ক্ষেত্রে কিছু পরিসংখ্যান বিষয়টি অনুধাবনে সহায়ক হতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, ১৯৭০ সালে একজন উচ্চ-মাঝারি পদমর্যাদার সরকারি কর্মকর্তার মাসিক বেতন ছিল ১২০০ রুপি। সেই আয় দিয়ে কয়েক বছরের কঠোর পরিশ্রমের পর তিনি হয়তো একটি পুরোনো গাড়ি কিংবা এক খণ্ড জমি কেনার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্রে তাঁর পেশাগত উন্নতির পথ ছিল সংকুচিত ও সীমাবদ্ধ; আর ঠিক এ কারণেই তিনি শেখ মুজিবের ‘ছয় দফা’ কর্মসূচিতে পূর্ণ আস্থা রেখেছিলেন। ছয় দফার ধারাবাহিক পরিণতিতেই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়। তবে ১৯৭৫ সাল নাগাদ মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসলীলা, আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি এবং ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের পর মুজিব যখন ক্ষমতাচ্যুত হন, তত দিনে সেই সাধারণ সরকারি কর্মকর্তা হয়তো এক চরম ব্যক্তিগত ও সামাজিক বিপর্যয়ের মুখে এসে দাঁড়িয়েছিলেন।
অধ্যাপক মুশতাক খান ও নাওমি হোসেন তাঁদের গবেষণায় তথ্য ও তত্ত্বের সমন্বয়ে দেখিয়েছেন যে ১৯৭৫-পরবর্তী দশকগুলোতে বাংলাদেশ একটি দীর্ঘ, স্থিতিশীল এবং তুলনামূলকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পর্যায় অতিক্রম করেছে। এর বড় কারণ হলো সত্তরের দশকের গোড়ার দিকের অস্থিরতায় দেশের পুরো এলিট শ্রেণি বিচলিত হয়ে পড়েছিল এবং তারা যেকোনো মূল্যে এমন আর্থসামাজিক অস্থিরতার পুনরাবৃত্তি এড়াতে বদ্ধপরিকর হয়েছিল। এই মনোভাব ঢাকা থেকে ধীরে ধীরে দেশব্যাপী সম্পদ ও উন্নয়নের বিস্তার ঘটাতে সহায়তা করেছিল। অর্থনৈতিক প্রসারের মূল চালিকা শক্তি প্রবাসী আয় ও তৈরি পোশাক শিল্প, এটি সুপরিচিত। এ ছাড়া ছিল দারিদ্র্য ও অনগ্রসরতা নিরসনে এনজিও–ভিত্তিক কার্যক্রমে এলিটদের সক্রিয় অংশগ্রহণ (খান ২০১৩, হোসাইন ২০২৬)।
১৯৭৬ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত কয়েক বছরের ব্যবধানে একাধিকবার ক্ষমতার পালাবদল ঘটে, যার প্রত্যক্ষ প্রতিফলন দেখা যায় প্রতিষ্ঠিত এলিটদের অভ্যন্তরীণ বিন্যাসেও। এ সময় পর্যায়ক্রমে সামরিক কর্মকর্তা, বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত এলিটরা প্রভাব বিস্তার করে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিষ্ঠিত ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী উভয় শ্রেণির এলিটদের মধ্যে আড়াআড়ি ও খাড়াখাড়ি প্রতিযোগিতা চললেও, তা বিজয়ী পক্ষের জন্য কখনোই ‘একচ্ছত্র’ বা সর্বগ্রাসী ছিল না; অর্থাৎ ক্ষমতার সমীকরণে কমবেশি সব পক্ষের জন্যই কিছু না কিছু জায়গা উন্মুক্ত ছিল।
২০২৪–এর এলিট আলোড়নের পরিপ্রেক্ষিত
২০১০ সালের কিছু আগে থেকেই দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া বেশ কিছু বড় পরিবর্তন আমাদের এলিট প্রতিযোগিতার মানচিত্রকে অনেকটা পাল্টে দেয়।
১৯৯০-এর দশক থেকে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে অংশগ্রহণের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে গতিশীলতা তৈরি হয়েছিল, একুশ শতকের সূচনালগ্ন থেকে তা আরও জোরদার হয়। রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্স, ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদন খাত, সেবা খাত এবং নতুন তথ্যপ্রযুক্তির সুবাদে এই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। ২০০০ সালে দেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণির আকার ছিল মোট জনসংখ্যার ১০-১২ শতাংশ (প্রায় দেড় কোটি); যা ২০২৫ সাল নাগাদ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ২৫ শতাংশে (প্রায় ৪ কোটি)। মধ্যবিত্তের এই সংখ্যা ও অনুপাত বৃদ্ধির পাশাপাশি চলতি শতকে দেশজুড়ে নগরায়ণও ঘটেছে দ্রুতগতিতে। ২০০০ সালে দেশের মোট জনসংখ্যার ২৩ শতাংশ ছিল নগরবাসী, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩ শতাংশে। দেশব্যাপী নগরবাসী মধ্যবিত্তের সংখ্যাবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সব ক্ষেত্রেই এলিট-আকাঙ্ক্ষীদের সংখ্যা লাফিয়ে বেড়েছে। আর এই এলিট-আকাঙ্ক্ষীদের সংখ্যাস্ফীতির পেছনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে তথ্যপ্রযুক্তির সর্বব্যাপী বিস্তার। প্রযুক্তির সুবাদে প্রতিষ্ঠিত এলিটরা কীভাবে জীবনযাপন করে এবং কীভাবে তারা সামাজিক ও পেশাগত ক্ষেত্রে সফল হয়, সে সম্পর্কে এলিট-আকাঙ্ক্ষীরা এখন সহজেই বাস্তবমুখী জ্ঞান লাভ করতে পারছে।
অর্থনীতিবিদ সৈয়দ আখতার মাহমুদ দেশের সর্বত্র ক্রমবর্ধমান এই গোষ্ঠীকে ‘আকাঙ্ক্ষী এলিট’ এবং তাদের বিপরীতে বিদ্যমান শ্রেণিকে ‘প্রতিষ্ঠিত এলিট’ হিসেবে চিহ্নিত ও সংজ্ঞায়িত করেছেন। এই আকাঙ্ক্ষী এলিটরা ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি, সরকারি চাকরি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, গণমাধ্যমসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেদের এলিট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার নিরন্তর সংগ্রামে লিপ্ত। আখতার মাহমুদের ভাষায়—আকাঙ্ক্ষী এলিটরা প্রতিষ্ঠিতদের চেয়ে সাফল্য অর্জনের জন্য অনেক বেশি ক্ষুধার্ত ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কিন্তু অন্যদিকে প্রতিষ্ঠিত এলিটদের কাছে রয়েছে দীর্ঘ সময় টিকে থাকার মতো অর্থ-সম্পদ, শক্তিশালী সম্পর্কের নেটওয়ার্ক এবং অনেক ক্ষেত্রেই দেশ-বিদেশ থেকে অর্জিত বিশেষ দক্ষতা ও যোগ্যতা (মাহমুদ ২০২৫)।
কিন্তু এই বিপুলসংখ্যক আকাঙ্ক্ষী এলিটের আত্মপ্রকাশের বিপরীতে গত দেড় দশকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বন্দোবস্ত এবং এলিটদের সামাজিক প্রবেশাধিকার চরমভাবে সংকুচিত ও রুদ্ধ করা হয়। পরিণতিতে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন কিংবা সামাজিক গতিশীলতার ক্ষেত্রে নীতিগত যোগ্যতার চেয়ে শাসক দলের অনুকম্পা ও প্রতিষ্ঠিত এলিটদের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করাই পদোন্নতি ও উন্নতির একমাত্র শর্তে পরিণত হয়।
সূচনালগ্ন থেকেই আমাদের সেরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ছিল দেশের ভবিষ্যৎ এলিটদের গড়ে তোলা ও প্রশিক্ষণের প্রধান কেন্দ্র। এসব বিশ্ববিদ্যালয় ছিল মূলত প্রতিষ্ঠিত এলিটদের সন্তান এবং উদীয়মান ‘আকাঙ্ক্ষী এলিটদের’ মেলবন্ধনের প্রধান ক্ষেত্র। এই সামাজিক মেলবন্ধনের মধ্য দিয়ে যে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি হতো, তা-ই পরবর্তীকালে রাজনীতি, আমলাতন্ত্র, ব্যবসা-বাণিজ্য, করপোরেট খাত, গণমাধ্যম ও সংস্কৃতি—সব ক্ষেত্রে নতুন এলিট নেতৃত্ব তৈরি ও প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করত। কিন্তু গত দুই দশকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই এলিট নেটওয়ার্ক তৈরি, তাদের লালন ও সামাজিক উত্তরণের ক্ষেত্র বহুগুণ সংকুচিত হয়েছে। এর প্রধান কারণ হলো, প্রতিষ্ঠিত এলিটদের সন্তান ও আকাঙ্ক্ষী এলিটদের পড়ার ক্ষেত্র দুটি এখন যথাক্রমে প্রাইভেট ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গনে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে আগের মতো এলিটদের সেই মেলবন্ধন আর ঘটছে না। এর পরিণতিতে সরকারি চাকরিই এখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আকাঙ্ক্ষী এলিটদের শ্রেণিগত উত্তরণের প্রায় একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত দুই দশকে বাংলাদেশের এলিট পরিসরে সবচেয়ে বড় সামাজিক পরিবর্তনের একটি হলো বিপুলসংখ্যক মানুষের পশ্চিমা দেশগুলোতে অভিবাসন। এই সময়ে ১০ থেকে ২০ লাখ বাংলাদেশি শিক্ষা ও স্থায়ী বসবাসের উদ্দেশ্যে পশ্চিমাবিশ্বে থিতু হয়েছেন। এই অভিবাসীদের মধ্যে দেশে নিজেদের ক্যারিয়ার নিয়ে হতাশ বহু ‘আকাঙ্ক্ষী এলিট’ থাকলেও, সংখ্যানুপাতে ‘প্রতিষ্ঠিত এলিটদের’ অংশই অনেক বেশি। আশি বা নব্বইয়ের দশকে যাঁরা দেশে প্রতিষ্ঠিত এলিট ছিলেন, তাঁদের একটি বড় অংশ নিজেরা কিংবা তাঁদের নিকটাত্মীয়রা বিদেশে স্থায়ী হয়েছেন। এই প্রবণতা কেবল সামাজিক ক্ষেত্রে নয়, ব্যবসা-বাণিজ্যের রূপরেখাতেও স্পষ্ট। আমাদের পুরোনো প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের অনেকেই বিশ্বজুড়ে নিজেদের ব্যবসার বিস্তার ঘটিয়েছেন এবং তাঁদের অনেকে এখন বিদেশ থেকেই দেশে নিজেদের ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তবে প্রতিষ্ঠিত এলিটদের বিদেশে এভাবে এক পা বাড়িয়ে রাখার উদ্দেশ্য কেবল ব্যবসার প্রসার নয়; বরং সংকটকালে নিরাপদে নিষ্ক্রান্ত করার কৌশলও বটে।
গত দুই দশকে দেশের এলিট পরিসরে আকাঙ্ক্ষী এলিটদের তুলনায় প্রতিষ্ঠিত এলিটদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে; সেটা রাজনীতি, ব্যবসা, সংস্কৃতি, বুদ্ধিজীবী পেশা সর্বক্ষেত্রে। প্রতিষ্ঠিত এলিট অনুপাতে অনেক হ্রাস পেলেও তাঁরা নিজেদের বিপুল সম্পদ, সামাজিক সংযোগ ও প্রাতিষ্ঠানিক পুঁজিকে কাজে লাগিয়ে এখনো নিজেদের প্রভাব অনেকাংশে ধরে রাখতে পেরেছেন সব ক্ষেত্রেই। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরেও ক্ষীয়মাণ এই এলিট গোষ্ঠীর এমন অবস্থানগত রক্ষণশীলতা কিন্তু প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকা আকাঙ্ক্ষী এলিটদের অসন্তোষ ও ক্ষোভকে আরও উসকে দিচ্ছে।
নির্বাচন–পরবর্তী রাজনীতি এবং এলিট পরিসর
আমাদের দৃষ্টিতে, নির্বাচন ও নির্বাচন-উত্তর রাজনীতি মূলত ‘এলিট তত্ত্বের’ সামাজিক ব্যাখ্যাকেই আরও শক্তিশালী করেছে। দেশীয় রাজনীতিতে দীর্ঘকাল ধরে প্রতিষ্ঠিত এবং সর্বস্তরের প্রতিনিধিত্বকারী দল বিএনপি যেমন প্রথাগত প্রতিষ্ঠিত এলিটদের ওপর নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে পেরেছে, তেমনি উদীয়মান আকাঙ্ক্ষী এলিটদের মধ্যেও নিজেদের অবস্থান সফলভাবে বজায় রেখেছে। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের একটি বড় অংশ বংশানুক্রমিকভাবে রাজনীতির অভিজাত বলয়ভুক্ত; অর্থাৎ তাঁদের পূর্বসূরিদের থেকে শুরু করে উত্তরসূরিরা রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত।
ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থীদের দেওয়া হলফনামা মূলত দেশের রাজনীতি ও এলিট পরিসরে দলগুলোর অবস্থানের একটি মোটামুটি প্রতিনিধিত্বশীল নমুনা তুলে ধরে। হলফনামায় প্রার্থীর পেশা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, বার্ষিক আয়, মোট সম্পদসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উপাত্ত থাকে। তবে সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণের স্বার্থে একজন প্রার্থীর ‘মোট পারিবারিক সম্পদকে’ এলিট সমাজে তাঁর সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের একটি উপযুক্ত ‘প্রক্সি চলক’ হিসেবে গণ্য করা যায়। কারণ, সাধারণত একজন ব্যক্তি যত দীর্ঘ সময় ধরে দেশের এলিট পরিসরে অবস্থান করেন, তাঁর সম্পদ পুঞ্জীভূত হওয়ার হারও তত বৃদ্ধি পায়।
হলফনামায় আমরা দেখি যে বিএনপির ২৯১ জন প্রার্থীর মধ্যে ৮৬ জনের (২৯%) সর্বমোট পারিবারিক সম্পদ ২ কোটি টাকার নিচে, ১৪১ জনের (৪৯%) সম্পদ ২ থেকে ২০ কোটি এবং ৬৪ জনের (২২%) সম্পদ ২০ কোটির ওপরে। এই তিন ভাগকে আমরা মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত ধরে নিতে পারি। হলফনামায় দেখা যায় যে জামায়াতে ইসলামীর ২২৮ জন প্রার্থীর মধ্যে মধ্যবিত্ত ১৬৫ জন (৭২%), উচ্চ মধ্যবিত্ত ৫৯ জন (২৬%) এবং উচ্চবিত্ত ৪ জন (১.৫%)। এনসিপির ৩২ জন প্রার্থীর মধ্যে এই সংখ্যা মধ্যবিত্ত ৩০ জন (৯৪%), উচ্চ মধ্যবিত্ত ২ জন (৬%) এবং উচ্চবিত্ত শূন্য জন। এই সংক্ষিপ্ত তথ্যচিত্রটি দেখায় যে তিনটি দলেই আকাঙ্ক্ষী এলিটদের বড় প্রতিনিধিত্ব থাকলেও, বিএনপি বিপুলভাবে প্রতিষ্ঠিত এলিটদেরই প্রতিনিধিত্ব করে (তাবাসসুম ও খান ২০২৬)।
কয়েকজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিএনপির অনেক প্রার্থীকে ‘বংশানুক্রমিক সুবিধাভোগী’ বলে মন্তব্য করেছেন, কিন্তু এই প্রার্থীদের অনেকেই তাঁদের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় প্রকৃত অর্থেই জনপ্রিয়। কারণ, তাঁরা এমন পরিবারের প্রতিনিধিত্ব করেন, যাঁরা হয়তো বহু দশক ধরে তাঁদের এলাকায় পরিচিত। যখন তাঁদের বিপরীতে বিকল্প হিসেবে একজন নব্য ধনী ব্যবসায়ী অথবা মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে আগত নতুন রাজনৈতিক নেতা (সংজ্ঞানুযায়ী যাঁরা অবশ্যই আকাঙ্ক্ষী এলিট) থাকেন এবং তাঁরা নিজের সংকীর্ণ স্বার্থে কাজ করবেন না, ভোটারদের এমন আশঙ্কাও যখন কাটে না, তখন ভোটাররা এই তথাকথিত বংশানুক্রমিক প্রার্থীদেরই বেছে নিতে পারেন। নেত্র নিউজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী ২০২৬ নির্বাচনে বিএনপির ১৭ শতাংশ প্রার্থী সরাসরি বংশানুক্রম রাজনীতিতে যুক্ত; কিন্তু জয়ী প্রার্থীদের মধ্যে তাঁরা ১৮ শতাংশ (শাতিল ২০২৬)।
একই সঙ্গে, বিএনপিতে এমন অনেক সংসদ সদস্যও রয়েছেন, যাঁরা এই আকাঙ্ক্ষী এলিট শ্রেণিরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁদের কেউ কেউ রাজনীতিতে আসা ব্যবসায়ী হলেও, অনেকেই দীর্ঘ ও কঠিন পথ অতিক্রম করে নির্বাচিত প্রতিনিধি হওয়ার স্বপ্ন লালন করেছেন। ১/১১-পরবর্তী দুর্দিন থেকে শুরু করে জুলাই অভ্যুত্থান পর্যন্ত তাঁরা দলের জন্য নিরলস কাজ করে গেছেন। ২০২৩ সালে তৎকালীন সরকারের রাজনৈতিক দমন-পীড়ন উপেক্ষা করে বিএনপির সমাবেশে যাঁরা যোগ দিয়েছিলেন, এঁরা মূলত তাঁরাই। বস্তুত আন্দোলনের সেই গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোতে মাঠপর্যায়ে তাঁদের উপস্থিতিই ছিল সবচেয়ে বেশি।
অন্যদিকে জামায়াত ও এনসিপি অনেকাংশে আকাঙ্ক্ষী এলিট শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করছে এই সময়ে। নির্বাচনে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার ফলাফলও সেটা ইঙ্গিত করছে। ঢাকায় বাংলাদেশের শহুরে মধ্যবিত্ত এবং আকাঙ্ক্ষী এলিটদের সবচেয়ে বড় ঘনত্ব রয়েছে। মেট্রোপলিটন এলাকাতে বিএনপি বনাম জামায়াত-এনসিপি জোটের ভোটপ্রাপ্তি প্রায় সমান। এমনকি পশ্চিমের দেশের অভিবাসীদের ভোটেও দেখা গিয়েছে জামায়াত-এনসিপি এগিয়ে রয়েছে। তবে শহুরে মধ্যবিত্তের এই সমর্থন সত্ত্বেও জামায়াত জোট নির্বাচনে আশানুরূপ ফল করতে পারেনি। আমরা মনে করি, এর মূল কারণগুলো হচ্ছে, তাদের নেতৃত্বের ব্যর্থতা, দেশব্যাপী সংগঠনের অভাব, উচ্চপর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার অভাব এবং সামাজিক-রাজনৈতিক পুঁজির অভাব। অর্থাৎ যে নিয়ামকগুলো রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত এলিটদের এগিয়ে রাখে, সেগুলোর অভাব।
রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মহলের অনেকের কাছে, বিশেষ করে যারা আনুষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতা অর্জন বা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে, তাদের কাছে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন ১৯৪৭ সালের আগস্ট বা ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের মতোই এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। তারা মনে করেন, অতীতের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলোতে যেভাবে তৎকালীন শাসক ও প্রভাবশালী শ্রেণি (যেমন হিন্দু ‘ভদ্রলোক’ শ্রেণি, পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক দল এবং সাম্প্রতিক সময়ের হাসিনা সরকারের সুবিধাভোগীরা) স্থানচ্যুত হয়েছিল, ঠিক একইভাবে বর্তমানেও একদল উচ্চাকাঙ্ক্ষী নতুন শক্তি তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। দীর্ঘ জুলাইকে ‘বিপ্লব’ হিসেবে অভিহিত করার কারণ এই দৃষ্টিকোণ থেকেই সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা সম্ভব।
তা সত্ত্বেও, রাজনীতিতে বিএনপির উপস্থিতি—যা প্রতিষ্ঠিত ও উদীয়মান উচ্চাকাঙ্ক্ষী উভয় এলিট শ্রেণির মধ্যেই গভীরভাবে বিস্তৃত, এমন এক প্রভাব তৈরি করেছে, যার ফলে ১৯৪৭ বা ১৯৭১ সালের মতো কোনো প্রকৃত ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন ঘটেনি। সাম্প্রতিক সময়ে বিদায়ী সরকারের সুবিধাভোগীদের অনেকেই পারিবারিক ও সামাজিক সূত্রে বিএনপি-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠিত ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী এলিট শ্রেণির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সামাজিক ও রাজনৈতিক এই গভীর যোগসূত্র ২০২৪ সালের জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী ঘটনার পরও দেশকে তুলনামূলক স্থিতিশীল রাখতে ভূমিকা রেখেছে; তবে একই সঙ্গে তা বিএনপির রাজনীতির বাইরে থাকা অন্য নতুনদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকেও অনেকটাই রুদ্ধ করে দিয়েছে।
অবিপ্লবী উপসংহার
এখন যখন আমরা স্পষ্টতই এক অবিপ্লবী পর্বে এবং একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের অধীনে অবস্থান করছি, তখন সার্বিক পরিস্থিতি কীভাবে বিবর্তিত হবে? এখান থেকে আমাদের ভবিষ্যৎ গন্তব্যই–বা কোথায়?
২০২৪-এর দীর্ঘ জুলাইয়ের নেপথ্যে রুদ্ধ ও সংকীর্ণ এলিট বিন্যাস ভেঙে একটি উন্মুক্ত ও গতিশীল ব্যবস্থার যে বিপুল আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তা কিন্তু এখনো বিদ্যমান। কাঙ্ক্ষিত ক্ষমতা ও সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ায় অনেক রাজনৈতিক ও সামাজিক উচ্চাকাঙ্ক্ষী আজ আশাহত। বিএনপির রাজনৈতিক বলয়ের বাইরের অধৈর্য উচ্চাকাঙ্ক্ষী গোষ্ঠী, এমনকি দলের ভেতরের অনেক বঞ্চিত অংশও নতুন অস্থির পরিস্থিতির শর্ত তৈরি করতে পারে। কারণ, প্রতিষ্ঠিত এলিটদের প্রতি তাদের যেমন পুঞ্জীভূত ক্ষোভ রয়েছে, তেমনি সমমর্যাদার অনেকে এগিয়ে গেলেও নিজেরা পিছিয়ে পড়ছেন—এই বোধও তাঁদের পীড়িত করছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন এলিট বিন্যাস যদি আকাঙ্ক্ষীদের বিপুল অংশকে স্থান দিতে চায়, তবে তার জন্য প্রয়োজন রাজনীতি ও অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ ও অন্তর্ভুক্তিকর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে রাজনীতি ও অর্থনীতিতে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ দেশের এলিট পরিসরকে বিপুল বিস্তৃত করবে।
রুদ্ধ ও বদ্ধ এলিট বিন্যাস থেকে মুক্ত ও গতিশীল বিন্যাসে উত্তরণের জন্য ক্ষমতাসীন এলিটদের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও পরিপক্বতা থাকা জরুরি। গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার একটি সুদীর্ঘ পর্যায় তাঁদের সেই পরিপক্কতা অর্জনের সুযোগ দিতে পারে, কিন্তু তাঁরা হয়তো অধৈর্য হয়ে পড়তে পারেন! অপর দিকে ক্রমাগত অস্থিতিশীলতা শুধু এলিট ও আকাঙ্ক্ষী সবাইকে আরও অস্থির ও দৃষ্টিক্ষীণতায় আক্রান্ত করবে না, দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিসর সংকোচনের মাধ্যমে প্রতিযোগিতার প্রাপ্তিকেও সংকুচিত করবে সবার জন্য।
তুলনামূলক রাজনৈতিক অর্থনীতি বলে, ক্ষমতাসীন এলিটরা যখন আন্তর্জাতিক হুমকি এবং অভ্যন্তরীণ বিপ্লবাত্মক পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, তখন তারা সাধারণত সংস্কারের মাধ্যমে একটি উন্মুক্ত কাঠামোর পথে হাঁটেন। উদ্দেশ্য হলো, তাঁদের ক্ষমতার ভিত্তি আরও বড় এবং জনসম্মত করে নিরাপদ করা। তবে প্রতিষ্ঠিত এলিটদের বড় অংশের যদি ‘এক পা বাইরে’ থাকে, তবে তারা বড় কোনো টেকসই সংস্কারে উৎসাহিত না–ও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে অর্থনীতি যদি দ্রুত অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে না ধাবিত হয়, তবে পরের এলিট আলোড়ন হয়তো বেশি দূরে নয়।
তথ্যসূত্র
খান ২০১৩।। Mushtaq H. Khan, The Political Settlement, Growth and Technical Progress in Bangladesh, DIIS Working Paper 2013:01, Copenhagen: Danish Institute for International Studies।
তাবাসসুম ও খান ২০২৬।। Most. Munira Tabassum and Mohammad Azam Khan, “Candidate Dataset of 13th Bangladesh National Parliament Election 2026”, Mendeley Data, vol.1, doi: 10.17632/kt6rndj2xs.1 ।
মাহমুদ ২০২৫।। Syed Akhtar Mahmood, ‘Forget the Elite. We Need To Think About Aspiring Elites’, Counterpoint, 31 August,<https://counterpointbd.com/Forget-the-elite,-think-about-aspiring-elites><https://counterpointbd.com/Forget-the-elite,-think-about-aspiring-elites>, প্রবেশ: আগস্ট ২২, ২০২৬।
শাতিল ২০২৬।। Aaqib Md Shatil, ‘How dynasties came to dominate Bangladesh’s parliament’, Netra News, 25 June। <https://netra.news/2026/dynasty-bangladesh-parliament-elections/> প্রবেশ : ২২ জুন, ২০২৬।
হোসাইন ২০২৬।। Naomi Hossain, ‘Theorising the politics of famine: Bangladesh in 1974’, Disasters, vol. 50, no. 1, e70041।
লেখক পরিচিতি
ড. সফিকুর রহমান একজন রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ। তাঁর গবেষণার বিষয় উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনামূলক রাজনৈতিক অর্থনীতি। অর্থনৈতিক নীতি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পানাম ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী এবং বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যানালিসিস অ্যান্ড ইনফরমেশন নেটওয়ার্কের (ব্রেইন) প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
জ্যোতি রাহমান অর্থনীতিবিদ ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ম্যাক্রো-ফিসক্যাল বিশেষজ্ঞ। অর্থনৈতিক নীতি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পানাম ইনস্টিটিউটের চেয়ারপারসন এবং বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যানালিসিস অ্যান্ড ইনফরমেশন নেটওয়ার্কের (ব্রেইন) ট্রাস্টি সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে তিনি কাউন্টারপয়েন্ট বাংলাদেশ শীর্ষক ইংরেজি সাপ্তাহিকীর নির্বাহী সম্পাদক।