বদরুদ্দীন উমর: গণ–অভ্যুত্থান ও জনগণতান্ত্রিক বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা

সারকথা

এই প্রবন্ধে বদরুদ্দীন উমরের বুদ্ধিজীবী ও বিপ্লবী—দুই পরিচয়ের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আলোচনা করা হয়েছে: গণ-অভ্যুত্থানের তত্ত্ব এবং জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ধারণা। ইতিহাস, ভাষা আন্দোলন, কৃষি, সাম্প্রদায়িকতা ও ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার নিয়ে তাঁর গবেষণা কেবল জ্ঞানচর্চা ছিল না; সমাজ বদলের পথ খোঁজাও ছিল এর উদ্দেশ্য। মস্কোপন্থীদের আপসের রাজনীতি এবং পিকিংপন্থীদের সন্ত্রাসবাদ—দুই ধারারই সমালোচনা করেছিলেন তিনি। বাংলাদেশের বাস্তবতায় দীর্ঘ গেরিলা যুদ্ধের বদলে শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণে গণ-অভ্যুত্থানকেই তিনি পরিবর্তনের কার্যকর পথ মনে করতেন। প্রবন্ধটি ১৯৬৯, ১৯৯০ ও ২০২৪ সালের অভিজ্ঞতা থেকে দেখায়, সংগঠিত ও লক্ষ্যনির্দিষ্ট নেতৃত্ব না থাকলে গণ-অভ্যুত্থান সরকার বদলাতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের মূল কাঠামো বদলাতে পারে না। উমরের জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের ধারণায় শ্রমিক-কৃষকের নেতৃত্বে ভূমিসংস্কার, উৎপাদনের বিকাশ ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। এর লক্ষ্য সামন্তীয় অবশেষ, আমলাতান্ত্রিক বাধা ও বিদেশি আধিপত্য দূর করা। চীন ও ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি এই পরিবর্তনকে সমাজতন্ত্রের পথে প্রয়োজনীয় ধাপ হিসেবে দেখেছেন। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান নতুন আশা জাগালেও পুরোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা অক্ষত থাকায় সেই সম্ভাবনা পূর্ণ হয়নি। তাই বাংলাদেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক ও কাঠামোগত সংকট বুঝতে বদরুদ্দীন উমরের চিন্তা এখনো গুরুত্বপূর্ণ।

এক

বদরুদ্দীন উমরের পরিচয় দুটি। তিনি রাজনীতিবিদ ও বিপ্লবী তাত্ত্বিক: একটা রাজনৈতিক বিপ্লব ছিল যার জীবনের উদ্দিষ্ট। অন্যদিকে তিনি বুদ্ধিজীবী, সমাজবিশ্লেষক ও গবেষক। তাঁর অধিকাংশ পাঠক তাঁকে এই দ্বিতীয় পরিচয়েই চেনেন। ‘পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’, ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বাঙলাদেশের কৃষক’ এবং ‘ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও উনিশ শতকের বাঙালী সমাজ’-এর মতো নন্দিত ও বহুলপঠিত গ্রন্থের লেখক বদরুদ্দীন উমরেরই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অন্য সব কাজ—যেমন ‘বাঙলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সমস্যা’র মতো গ্রন্থাবলি—নিয়ে খুব কম মানুষকেই কথা বলতে দেখেছি। এগুলোর মুদ্রণও বেশ সীমিত। রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে ১৯৯০-এর দশক পর্যন্ত এ ঘরানার বইপত্রের কিছুটা প্রচলন ছিল এবং বামপন্থী দলগুলোতেও তা নিয়ে কিছু আলোচনা-সমালোচনা চলত। তবে বৃহত্তর পাঠকসমাজে তখনো এসব গ্রন্থ নিয়ে আলোচনা ছিল বিরল আর এখন তো তা নেই বললেই চলে।

এ নিয়ে বদরুদ্দীন উমরের নিজেরও যথেষ্ট খেদ ছিল। সামনাসামনি অজস্রবার এবং বেশ কিছু সাক্ষাৎকারে এ কথা তিনি বলেছেন যে অনেকেই তাঁর বুদ্ধিজীবী পরিচয়কে গুরুত্ব দিয়ে কৌশলে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়কে আড়াল করতে চান। বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরা এবং শিক্ষিত সমাজ যে রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থায় থাকতে চান, সত্যকথনকে ভয় পান, এড়িয়ে যেতে চান, নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখতে চান—এই বাস্তবতার মধ্যে সেই সত্যই বারবার প্রকাশিত হয়, তা–ও তিনি বলেছেন। তাঁর জীবনের শেষ সাক্ষাৎকারগুলোর মধ্যে একটা প্রকাশিত হয়েছিল প্রথম আলোতে, সেখান থেকে প্রাসঙ্গিকভাবেই তাঁকে উদ্ধৃত করা যাক: 

‘আমি যে একজন কমিউনিস্ট, সেটাই এখানকার লোকে জানে না। তারা আমাকে বুদ্ধিজীবী বলে। ভয় পায় এ কারণে যে আমি লোকের ভণ্ডামি, নির্বুদ্ধিতা, মূর্খতা, এসব প্রকাশ করি। আমি ঘটনা বিশ্লেষণ করি, ভুলত্রুটি নির্দেশ করি এবং অনেকের মুখোশ খুলে দিই। এটাই হচ্ছে আমার ওপর তাদের রাগের কারণ’ (প্রথম আলো, ২০২৫)।

দুই

কিন্তু বদরুদ্দীন উমরের সক্রিয় রাজনৈতিক পরিচয়কে আড়াল ও উপেক্ষা করে তাঁর যে বুদ্ধিজীবিতাকে এত ঊর্ধ্বে তুলে ধরা হয়, সেই বুদ্ধিজীবিতাও তিনি বরাবরই প্রয়োজনের তাগিদেই করেছেন। উনিশ শতক নিয়ে তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল। কারণ, উনিশ শতকেই আবির্ভূত হওয়া বাঙালি মধ্যবিত্তের বর্তমানের সংকট ও মনোবৃত্তিকে তিনি তাঁর সূত্রপাতের সময়টি দিয়েও বুঝতে চেয়েছেন। দেশভাগ নিয়েও তাঁর আগ্রহ ছিল। কারণ, আরও অনেক কিছুর সঙ্গে তা পরবর্তীকালের রাজনৈতিক গতিপথ ও এই জনপদের মানুষকে বহুভাবে প্রভাবিত করেছে। কৃষক ও কৃষি নিয়ে তিনি বিপুল পরিমাণে লিখেছেন। কারণ, এই দেশে সমাজ রূপান্তরের ভিত্তি হিসেবে তিনি ভূমিসংস্কারকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। এ সত্ত্বেও তাঁর রাজনীতির সঙ্গেই যে তাঁর এই বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতাগুলোর গভীর সম্পর্ক রয়েছে, সেই যোগসূত্রই তাঁকে নিয়ে আলোচনায় সর্বদা গৌণ থাকে।

অন্যদিকে এটাও সত্যি যে লেখকের উদ্দিষ্ট লক্ষ্যের বাইরেও যেকোনো সৃষ্টিকর্মের নিজস্ব জীবন ও অস্তিত্ব তৈরি হয়। বদরুদ্দীন উমরের বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের গভীরতা এখান থেকেই বোঝা যায় যে তাঁর রাজনীতি বড় পরিসরে ‘জনপ্রিয়তা’ না পেলেও, চিন্তাশীল লেখার একটি বড় অংশ প্রকাশকদের কাছে আজও আকর্ষণীয় এবং পাঠকসমাজে সেগুলোর ভালো চাহিদা রয়েছে। নিখাদ প্রায়োগিক রাজনীতির বিষয়গুলো বাদ দিলে বাকি সব কটি বিষয়েই বদরুদ্দীন উমরের লেখালেখি ‘চিন্তাশীল’ পাঠকের মধ্যে কমবেশি বেশ জনপ্রিয়, এখনো পাঠকপ্রিয় বলেই নতুন নতুন মুদ্রণ প্রকাশিত হচ্ছে সেগুলোর। ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বাংলাদেশে কৃষক’, ‘ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও উনিশ শতকের বাঙালী সমাজ’, ‘বঙ্গভঙ্গ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি’, ‘ভারতীয় জাতীয় আন্দোলন প্রভৃতি বইয়ের কাছে ইতিহাসবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা ফিরে ফিরে যান; সাম্প্রদায়িকতাবিষয়ক তিনটি চিন্তার মোড় ফেরানো গ্রন্থ এবং ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ শীর্ষক তিন খণ্ডে প্রকাশিত ইতিহাসের গ্রন্থ আরও বহু দশক প্রাসঙ্গিক থাকবে।

কিন্তু এত জনপ্রিয় একজন গবেষকেরই ফলিত রাজনীতিবিষয়ক গ্রন্থাদির চাহিদা পাঠকের কাছে কম, এটা নিশ্চিতভাবেই সমাজ সম্পর্কে একটা বার্তা দেয়। আমরা এখানে শুধু সমসাময়িক রাজনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধসংকলনগুলোর কথা বলছি না, বলছি ১৯৮২ সালে বইঘর থেকে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে মার্কসবাদ’ ১৯৭৪ সালে মুক্তধারা প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সমস্যা’ এবং এমনই অজস্র বইয়ের কথা বলা যায় বিশ্লেষণধর্মী তাত্ত্বিক গ্রন্থাদি ও প্রবন্ধের কথাও।

এই আলোচনায় বদরুদ্দীন উমরের দুটি কাজ নিয়ে কথা বলতে চাই। একটা বিষয়ে বাংলাদেশে তাঁর অবদান মৌলিক বলেই মনে করি। কেননা, তাঁর সমকালীন ব্যক্তিদের মধ্যে তিনিই প্রথম বিষয়টিকে নজরে আনেন এবং বাংলাদেশের ইতিহাসের এই অন্যতম পুনরাবৃত্তিময় প্রবণতার দিকে রাজনীতির তাত্ত্বিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। দ্বিতীয় প্রসঙ্গটির বেলায় তিনি একেবারে মৌলিক না হলেও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক। আমার ব্যক্তিগত বিবেচনায় বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এই বিষয়কে যথাযথভাবে তত্ত্বায়ন করেছেন।

প্রথম প্রসঙ্গটা হলো বাংলাদেশে বিপ্লবী আন্দোলনের একটা রূপ হিসেবে গণ-অভ্যুত্থানের তত্ত্বকে গঠন করা; অন্যটা হলো আমাদের বহুবিধ জাতীয় সংকটের মূল কারণ হিসেবে জাতীয় মুক্তির কাঠামোগত অসম্পূর্ণতাকে চিহ্নিত করে তার সমাধান হিসেবে জনগণতান্ত্রিক বাংলাদেশের তত্ত্বকে উপস্থাপন করা।

এ দুটি বিষয় একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবেও গ্রন্থিত: বাংলাদেশে জাতীয় মুক্তির একটা বিপ্লব কেবলমাত্র জনগণের—বদরুদ্দীন উমরের মতে সশস্ত্র—একটি গণ-অভ্যুত্থানের ওপর দাঁড়িয়েই সংগঠিত হতে পারে। জাতীয় মুক্তির অভাব হলো এখানে একটি সংকট, গণ-অভ্যুত্থান হলো তার সমাধান। গণ-অভ্যুত্থানবিষয়ক তাঁর তত্ত্বের বিকাশের ইতিহাসটা নিয়েই আগে আলোচনা করছি। কারণ, এ ক্ষেত্রে তাঁর অবদানটা মৌলিক।

তিন

আন্তর্জাতিক মহাবিতর্কের সূত্রে ১৯৬৬ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কমিউনিস্ট পার্টি দ্বিধাবিভক্ত হয়। মস্কোপন্থী (বা রুশপন্থী) ও পিকিংপন্থী (বা চীনপন্থী, পরবর্তী সময়ে এঁদের অনেকেই মাওবাদকেও তত্ত্ব হিসেবে গ্রহণ করেন) নামে বিভক্ত এই দুই শিবিরের বিতর্কের সূত্রপাত কিন্তু রাশিয়া ও চীনের অন্ধ অনুগত্য থেকে তৈরি হয়নি (যেমনটা অনেকে মনে করে থাকেন); এই বিতর্কের মূলে ছিল বিপ্লব সম্পন্ন করার প্রক্রিয়াবিষয়ক একটা রাজনৈতিক ভিন্নতা।

বিপ্লবী যেকোনো রূপান্তরে বলপ্রয়োগের ভূমিকা অনিবার্য কি না, এটাই ছিল এই মহাবিতর্কের অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয়। মস্কোপন্থী সবার মধ্যে শুরু থেকেই এবং পিকিংপন্থীদের একটা বড় অংশের মধ্যে পরবর্তী সময়ে রাশিয়া ও চীনের পররাষ্ট্রনীতি অন্ধভাবে অনুসরণের প্রবণতা তৈরি হলেও বিভাজনের প্রসঙ্গ ছিল ওই কেন্দ্রীয় প্রশ্ন। মস্কোপন্থী অংশটি মনে করত যে দেশীয় বুর্জোয়া দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ সম্ভব। ভারতে কংগ্রেস ও বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ এই সূত্রেই মস্কোপন্থী কমিউনিস্ট দলগুলোর শুধু মিত্রশক্তি নয়; বরং বহু ক্ষেত্রে চালিকা শক্তিতে পরিণত হয়। চীনপন্থীরা আবার এমন কৌশলকে সঠিক বলে মনে করতেন না; সীমিত কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় বুর্জোয়া দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বা মিত্রতা সম্ভব বলে মনে করলেও তাঁরা নিজেরা একটা বিপ্লব চাইতেন—বলপ্রয়োগ ছিল তাঁদের রাজনৈতিক তত্ত্বের ভরকেন্দ্র।

বলপ্রয়োগের ধরন বিষয়টা নিয়ে পরবর্তীকালে পিকিংপন্থীদের মধ্যেও বিপুল তর্কের পরিসর তৈরি হয়। চীনা বিপ্লবের অনুসারী বলেই চীনের মতো করে গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাও করা, দীর্ঘমেয়াদি সশস্ত্র সংগ্রাম করা, গেরিলাযুদ্ধ পরিচালনা করা এবং এমনই আরও বহু অনুকরণবাদিতা দেশে দেশে বিপ্লবী কমিউনিস্ট রাজনীতির ভেতর দেখা দেয় মহামারির মতোই। সাধারণভাবে পিকিংপন্থীদের এই অংশ নিজেদের পরিচয় দিত ‘মাওবাদী’ হিসেবে।

এমনকি চীনপন্থী ঐতিহ্যের রাজনৈতিক দল হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত পাওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরেই বলপ্রয়োগের ধারণা ক্রমশ আরও সংকুচিত হতে হতে শ্রেণিশত্রু খতম, গণসংগঠন ভেঙে দিয়ে শুধু দলীয় কর্মীদের নিয়ে সশস্ত্র রাজনৈতিক দল গড়ে তোলা ইত্যাদি বহু ধরনের প্রবণতা শক্তিশালী হতে থাকে। চারু মজুমদারের নকশাল আন্দোলন, আবদুল হকের নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (ইপিসিপিএমএল) এবং সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বাধীন সর্বহারা পার্টি—কোনোটিই এই প্রবণতা থেকে মুক্ত থাকেনি। এরা সবাই পরবর্তীকালের ভিন্নতা সত্ত্বেও একই পিকিংপন্থী>মাওবাদী ঐতিহ্য থেকে এসেছে।

বলা যায়, একদিকে সুবিধাবাদী মস্কোপন্থী ধারা, অন্যদিকে নানান সন্ত্রাসবাদী প্রবণতা বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনকে গ্রাস করে। দ্বিতীয় ধারাটি ওই সময়ের বিশ্বরাজনীতির বাস্তবতার কারণে তরুণদের কাছে জনপ্রিয় হলেও চূড়ান্ত অর্থে সেটি নিশ্চিত জনবিচ্ছিন্ন হওয়ার রক্তাক্ত ও নিতান্তই আত্মহত্যামূলক পথ ছিল। বিস্তারিত বিবরণে না গেলেও এই সশস্ত্র ধারাটির সব কটি উপদলের শুকিয়ে যাওয়া এবং একই সঙ্গে বিপুলভাবে কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি মোটামুটি বোঝা যাবে নিচের এই বিবরণে:

‘তিনি কর্তৃত্ববাদ বা অথরিটির নতুন তত্ত্ব রাখলেন। ভারতের বিপ্লবে সিএম হলেন অথরিটি। এই নিয়ে ৪ দিন আলোচনা হল। আমাদের মধ্যে দুভাগে ভাগ হল কমরেডরা। আমরা ছিলাম সংখ্যালঘু। আমরা ভাবলাম, চারুদা যা বললেন তা করব, কিন্তু মনে মনে নিরুৎসাহ। আমি অবশ্য চারুদার প্রমাণিত যোগ্যতা সম্বন্ধে তখনও নিশ্চিত ছিলাম। কিন্তু হিসাবে মেলাতে পারছিলাম না। আমার কাছে ছিল লেনিনের “হোয়াট ইজ টু বি ডান”। বইটা পড়ছিলাম। নিজের মনে সহজ হতে পারছিলাম না। চারুদা আমায় বললেন, “রিড দ্য বুক অ্যান্ড দ্যাট ইজ টু বি ডান”। আমার একটা কথা মনে হল। আগে চারুদা মানব ছিলেন। তারপর এদের পাল্লায় পড়ে হলেন অতিমানব। অতিরিক্ত ওষুধ খাবার ফলে বাস্তবকে বস্তুগত নিয়ম দিয়ে দেখবার নীতি ক্রমশঃ বর্জন করেছিলেন। এর সঙ্গে মিশে গেল কর্তৃত্ববাদ মানার সংস্কৃতি। আমি একটু অস্বস্তিতে পড়লাম। এই কি সেই চারুদা? সেই প্রাণচঞ্চল, আবেগে টগবগ করা মানুষটা বদলে গেছে। কি রকম একমাত্রিক, কর্তৃত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গী’ (অমিত ১৯৮৯)।

এই যে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাকে ব্যক্তির কর্তৃত্বে নামিয়ে নিয়ে আসা এবং ‘হোয়াট ইজ টু বি ডান’-এর মতো বিশ্লেষণাত্মক গ্রন্থের বদলে ‘রেডবুক’-এর উদ্ধৃতি মুখস্থ করা তরুণ বাহিনী তৃণমূলে ছড়িয়ে পড়ল, সেটা পরবর্তীকালে অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল—দলের জন্য, প্রগতিশীল রাজনীতির জন্যও। সন্ত্রাসবাদী এই ধারাগুলোকে যাঁরা কমিউনিস্ট আন্দোলনের জন্য বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করতে সক্ষম হন, তাঁদের মধ্যে বদরুদ্দীন উমর অগ্রগণ্য। এই রকম একটি ধারা পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির (ইপিসিপিএমএল) সঙ্গে যুক্ত থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের মধ্যেই তিনি তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করেন। শুরুতে মার্ক্স, লেনিন ও মাও সে–তুংয়ের দর্শন, রাজনীতি ও পদ্ধতির মধ্যে সংকটের কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা শুরু করেন, অবশেষে বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য একটি মৌলিক পথেরই সন্ধান পান।

তিনি দেখিয়েছেন, পেটিবুর্জোয়া রোমান্টিকতা ছিল কমিউনিস্ট আন্দোলনে সন্ত্রাসবাদী পন্থার অন্যতম প্রভাবক। এ ছাড়া এখানে আরও ভূমিকা রেখেছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সন্ত্রাসবাদী ধারার ঐতিহ্যও। উপমহাদেশে কমিউনিস্ট রাজনীতির সূত্রপাতের পর এর আগেকার সন্ত্রাসবাদী ধারায় উদ্বুদ্ধ কর্মীদের একটা বড় অংশ দলে দলে সেখানে যোগ দিয়েছিল বলে সেই সূত্রেও তাদের কিছু বৈশিষ্ট্য এখানকার কমিউনিস্ট আন্দোলনের মধ্যে শক্তভাবেই রয়ে গিয়েছিল এবং তারা সময়ে–সময়ে একে প্রভাবিত করেছে। বদরুদ্দীন উমর দেখান যে উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলন বারবার একদিকে হঠকারী উগ্রপন্থা, অন্যদিকে রাজনীতিতে বলপ্রয়োগের ভূমিকাকেই বাতিল করে বুর্জোয়া রাজনীতির সহযোগী ভূমিকা গ্রহণ করার দোলাচলে দুলেছে।

চার

একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বলপ্রয়োগকে বিপ্লবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে ভাবা কমিউনিস্টরা বাংলাদেশে কার্যত বিনাশের শিকার হন। মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের গৌরবময় আত্মত্যাগ ছিল, তাঁদের বড় অংশই মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন এবং দেশের বিভিন্ন অংশে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। তারপরও ঠিক ওই সময়েই তাঁদের বড় আকারে বিপর্যস্ত পরিস্থিতির কারণ ঘটায়।

তাঁদের রাজনৈতিক শক্তি বিনাশের কারণ দুটি। প্রথম কারণ ছিল আন্তর্জাতিক: চীন ও ইন্দো–চীনে বিপ্লবের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত উভয় রাষ্ট্রই বাংলাদেশেও এমন একটি বিপ্লবের সম্ভাবনায় তটস্থ ছিল। পশ্চিমবঙ্গ ভারতের মধ্যে চীনপন্থী রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্র ছিল বলেই সেখানে বিশেষ রকমের নৃশংস সব অভিযান চালানো হয়। হাজার হাজার তরুণ মৃত্যুবরণ করেন। এই সময়েই মুক্তিযুদ্ধ ঘটে বলে বাংলাদেশের তরুণেরা নকশাল আন্দোলনে যুক্ত হতে পারেন, এমন আশঙ্কা অনেককে আতঙ্কিত করেছিল। মঈদুল হাসানের ‘মূলধারা ’৭১’সহ অজস্র সূত্র থেকে আমরা জানতে পারি যে এদের হত্যা করার জন্য রাশিয়ার প্রভাববলয়ে থাকা ভারত এবং সাম্রাজ্যবাদী মোড়ল যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ভূমিকা রেখেছে; মুজিব বাহিনীর মতো প্রধানত পেটোয়া একটি বাহিনী তারা একাত্তর সালেই গড়ে তুলেছিল, যার যুদ্ধকালীন এবং স্বাধীনতাপরবর্তী প্রধান ভূমিকা ছিল বাংলাদেশে কোনো প্রকার বিপ্লবী রাজনীতি গড়ে উঠতে না দেওয়াকে নিশ্চিত করা।

অন্য কারণটি দেশীয়। একদিকে তাঁরা গ্রামাঞ্চলে দেশীয় জোতদার ও প্রবল প্রতিপক্ষগুলোর মুখোমুখি হন, যাঁরা আবার রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক সমর্থনপুষ্ট; অন্যদিকে সন্ত্রাসবাদী রাজনৈতিক কর্মসূচি তাঁদের জনগণ থেকে দ্রুত বিচ্ছিন্ন করে ফেলে, যার মধ্যে অন্যতম ছিল শ্রেণিশত্রু খতমের পন্থা।

সন্ত্রাসবাদী রাজনীতির বিপদ সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং গণযুদ্ধকে সন্ত্রাসবাদী রাজনীতি থেকে পৃথক করার ভূমিকাটি যাঁরা পালন করেছিলেন, বদরুদ্দীন উমর তাঁদের মধ্যে নেতৃস্থানীয়। মুক্তিযুদ্ধের পরপরই সন্ত্রাসবাদী পথটিকে ভুল বলে অনুধাবন করলেও প্রাথমিক অনুসন্ধানে মনে হয়েছে, গণ-অভ্যুত্থানকে পথ হিসেবে তখনো তিনি এবং তাঁর রাজনৈতিক সংগঠন অনুধাবন করেননি। বরং তা ক্রমাগত বিকশিত হতে থাকে বাংলাদেশে তাঁর রাজনৈতিক সংগ্রামের অভিজ্ঞতার পথ ধরেই।

পাঁচ

ঠিক কোন সময়ে গণ-অভ্যুত্থানকে রাজনৈতিক পন্থা হিসেবে প্রস্তাব করেন বদরুদ্দীন উমর, তা আরও পর্যালোচনা করা দরকার। তবে তাঁর লেখালেখির একটা প্রাথমিক অনুসন্ধানে মনে হয়েছে, এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময়ে গণ-আন্দোলনের মধ্যে গণ-অভ্যুত্থান যে বাংলা অঞ্চলের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে প্রভাব বিস্তার করছে, সেই পর্যবেক্ষণ তাঁর মধ্যে দানা বাঁধতে থাকে। কেননা ১৯৭৬ সালেও তাঁর রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিতে দেখতে পাচ্ছি, ‘জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের এই সংগ্রামকে সঠিক ও সাফল্যজনকভাবে পরিচালনার জন্য আমাদের পার্টিকে শক্তিশালী করতে হবে এবং গণসংগঠনগুলির মাধ্যমে জনগণের ব্যাপকতম অংশকে বিপ্লবের সপক্ষে সংগঠিত করতে হবে, সশস্ত্র বাহিনী গঠন করতে হবে এবং সকল গণতান্ত্রিক শক্তির সমন্বয়ে গঠিত ও কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বাধীন একটি জাতীয় যুক্তফ্রন্ট গঠন করতে হবে’ (বদরুদ্দীন ১৯৯১)।

এই রাজনৈতিক দলিলে বদরুদ্দীন উমর বারবার ‘বিলোপবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত করে সিপিবি এবং ‘সন্ত্রাসবাদী’ হিসেবে চিহ্নিত করে নকশালপন্থার বিরোধিতা করলেও ১৯৭৬ সালেও তাঁর নেতৃত্বাধীন দলটির অধীনে সশস্ত্র বাহিনী গঠনের প্রস্তাব থেকে বোঝা যায়, পরবর্তীকালে বাংলাদেশের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য হিসেবে তিনি যাঁকে চিহ্নিত করেছিলেন, সেই ‘গণ-অভ্যুত্থান’ তখনো বিপ্লবের একটি রূপ বা পন্থা আকারে তাঁর ভাবনায় হাজির হয়নি।

অন্যদিকে বিপ্লবের পথ হিসেবে ‘সশস্ত্র বাহিনী’ গঠনের প্রস্তাব তাঁর রাজনৈতিক দলের দলিলগুলোতে তখনো কখনো কখনো থাকলেও তার নির্দিষ্ট রূপটি কী হতে পারে, সেটি কখনো পরিষ্কার হয়নি। যদিও এমন কথা এসেছে যে ‘মেহনতি মানুষকে ভালোভাবে বোঝাতে পারলে এখন বাংলাদেশের জনগণের খণ্ড খণ্ড ও বিচ্ছিন্ন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংগ্রাম দ্রুতগতিতে বিপ্লবী সংগ্রামের পথে মোড় নেবে’, তথাপি এই সময়ে ওই দলিলপত্রে অনেক বেশি কার্যকর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে গণসংগ্রামের ওপর, একটি পার্টিকে যা সচেতনভাবে পরিচালিত করতে হবে, অন্যথায় তা ‘কখনো বৈপ্লবিক রাজনৈতিক সংগ্রামে রূপান্তরিত হতে পারে না’ (বদরুদ্দীন ১৯৯১)।

বদরুদ্দীন উমরের চিন্তার এই পর্বকে এমন একটি পর্যায় হিসেবে দেখা যেতে পারে, যেখানে সশস্ত্র বাহিনী গঠনের চিন্তা ক্রমাগত গৌণ হচ্ছে; কিন্তু একেবারে বাতিল হচ্ছে না, অন্তত উল্লেখে রয়ে যাচ্ছে। ১৯৮৩ সালের একটি দলিলেও এরশাদবিরোধী আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে আবারও ‘রাজনৈতিক চিন্তায় সজ্জিত জনগণের সশস্ত্র শক্তির’ মাধ্যমেই যে সামরিক বাহিনীর শাসনকে উচ্ছেদ সম্ভব, সেটি বলা হয়েছে। বোঝা যাচ্ছে, বদরুদ্দীন উমরের মননে সময়টি দোলাচলের, সম্পূর্ণ নতুন একটি তত্ত্ব অচিরেই জন্ম নেবে (বদরুদ্দীন ১৯৯১)।

এরপর ‘সশস্ত্র গণ–অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সবলে এই রাষ্ট্রযন্ত্রের উচ্ছেদ আমাদের চূড়ান্ত রাজনৈতিক লক্ষ্য’—বাক্যটা পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছে ১৫ ডিসেম্বর, ১৯৮৭ সালের একটি দলিলে সশস্ত্র বাহিনী, সশস্ত্র সংগ্রাম ইত্যাদি বাক্যাবলি অদৃশ্য হচ্ছে। নতুন একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের ধরনের আকৃতি দানা বেঁধেছে, রূপটি প্রকাশ পাচ্ছে।

ছয়

১৯৮৭ সালের ২৪ জানুয়ারি বদরুদ্দীন উমরের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোট প্রতিষ্ঠিত হয়। তারিখটি তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৬৯ সালের এই দিনে আইয়ুব খান উনসত্তরের উত্তাল গণজোয়ারের সামনে নতি স্বীকার করেন, ২৫ মার্চ তিনি পদত্যাগ করেন। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোটের প্রচারপত্রে বলা হয় ‘এক গণ-অভ্যুত্থানের দিনে এর প্রতিষ্ঠা, আরও কার্যকর, সর্বব্যাপী গণ-অভ্যুত্থানের পূর্বপ্রস্তুতি সম্পাদন যার প্রধান ভূমিকা’ (বদরুদ্দীন ১৯৯১)।

অর্থাৎ বাংলাদেশে রাষ্ট্রবিপ্লব ঘটাতে কার্যকর একটা নির্দিষ্ট পথের সন্ধান বদরুদ্দীন উমর ও তাঁর নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলটি পেয়ে গেছে। সে কারণেই বাংলাদেশের ইতিহাসের আরেকটি মহৎ গণ-অভ্যুত্থানের তারিখকে তাঁরা তাঁদের জোটের প্রতিষ্ঠা দিবস হিসেবে গ্রহণ করছেন।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিপ্লবী শক্তির বিজয়ী হওয়ার একমাত্র পথ হিসেবে গণ-অভ্যুত্থানকে উপলব্ধির এই রাজনৈতিক দিশাটি অর্জনের পর থেকে বদরুদ্দীন উমর বরাবর এ পথেই হেঁটেছেন। অন্য সব গতানুগতিক ‘বামপন্থী’ দলের মতো অন্ধ অনুকরণের বিপরীতে তিনি বিপ্লব যে সব রাষ্ট্রে একই পথে হবে না, সেই চিন্তাও হাজির করেছেন। তাঁর এই উপলব্ধির স্বাক্ষর মিলবে যেখানে তিনি লিখেছেন, ‘উপরোক্ত দেশসমূহে যে সফল বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে, তাদের নেতারা যে বিপ্লবের কতগুলো সাধারণ নিয়ম শুধু অধ্যয়ন ও আয়ত্ত করেছিলেন, তা–ই নয়। সেই সাথে তারা আবিষ্কার করেছিলেন তাদের দেশের বিপ্লবের বিশেষ ও নির্দিষ্ট নিয়মাবলী’ (বদরুদ্দীন ১৯৯১)।

একই দলিলে বদরুদ্দীন উমর উল্লেখ করছেন, ‘পরিস্থিতি যেভাবে পরিপক্ব হচ্ছে, তাতে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে অদূর ভবিষ্যতেই রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণরূপে উৎখাত করে আমাদেরকে বিপ্লব সম্পন্ন করতে হবে। এই বিপ্লব কোন দীর্ঘ সশস্ত্র যুদ্ধের রূপ পরিগ্রহ করা এ দেশে প্রাপ্ত শর্তসমূহের অধীনে সম্ভব নয়। আমরা যে সকল শর্তের অধীন, তাতে জনগণের সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমেই ক্ষমতা দখল সম্ভব এবং সেভাবেই ক্ষমতা দখলের প্রস্তুতি আমাদের পরিকল্পিতভাবে নিতে হবে। যেহেতু গণ–অভ্যুত্থানের জন্য জনগণকে ব্যাপকভাবে বিপ্লবী প্রক্রিয়ায় শরিক করা সাফল্যের অন্যতম শর্ত, সে কারণে জনগণকে বিভিন্ন শ্রেণিসংগঠন ও গণসংগঠনের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ও শক্তিশালীভাবে সংগঠিত করতে হবে’ (বদরুদ্দীন ১৯৯১)।

সাত

উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান দেশজুড়ে ছড়িয়ে গিয়েছিল, কৃষকরাও ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। উমর খেয়াল করেছেন, এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ১৯৮৭ সালের নভেম্বরে কৃষকেরা তেমন অংশগ্রহণ করেননি। এমনকি ১৯৯০ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর অভ্যুত্থানেও তাঁদের কোনো বড় অংশগ্রহণ ছিল না। উমরের ভাষায় তাঁরা ‘নিষ্ক্রিয় অবলোকনকারী’ ছিলেন। বদরুদ্দীন উমর এর পেছনে কারণ হিসেবে আন্দোলনের কৌশল হিসেবে শুধু ধর্মঘটকেই গ্রহণ করাকে চিহ্নিত করলেও সম্ভবত বাংলাদেশের গ্রামীণ কৃষকদের ইতিমধ্যে বদলে যাওয়া শ্রেণিগঠনও এতে ভূমিকা রেখেছিল। কৃষক সমাজের এই পরিবর্তিত ভূমিকার কোনো বড় আকারের বিশ্লেষণ খুব সম্ভবত এখনো হয়নি। তবে কৃষক সমাজ নিয়ে বদরুদ্দীন উমরের কিছু পর্যবেক্ষণে এ বিষয়ে তাঁর গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও ভাবনার পরিচয় মিলবে। তেভাগার পর টঙ্ক আন্দোলন ও নানকার বিদ্রোহের মতো খুবই সীমিত কিছু স্থানীয় বৈশিষ্ট্যের তোলপাড়ের পরপর বাংলাদেশে আর কোনো দেশব্যাপী কৃষক আন্দোলন গড়ে না ওঠার বিষয়টি তিনি খেয়াল করেছিলেন; কিন্তু আশা হারাননি।

তখনো সশস্ত্র ও গোপন আন্দোলন চালিয়া যাওয়া রাজনৈতিক দলগুলো প্রসঙ্গে বদরুদ্দীন উমর সত্তরের দশকের শুরু থেকেই যে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছিলেন, তাতে তেমন বদল আর আসেনি। ১৯৯৫ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত কোনো একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের জন্য উপস্থাপিত বদরুদ্দীন উমরের বক্তব্যে তখনো পৃথিবীর নানান দেশে চলমান সশস্ত্র আন্দোলন সম্পর্কে খুব সংক্ষেপে যা লেখা হয়েছে, সেটা বাংলায় অনুবাদ করে দিচ্ছি: ‘যেকোনো ধরনের গেরিলা যুদ্ধকে সম্ভব করে তোলা শর্তগুলো এই দেশে একদমই অনুপস্থিত বলে একটি বিপ্লব এখানে সম্পন্ন হতে পারে কেবল বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে, এমন একধরনের বিদ্রোহ যেখানে বড় আকারে কৃষক, শ্রমিক আর সব ধরনের মেহনতি মানুষ অংশগ্রহণ করবে’ (বদরুদ্দীন ১৯৯১)।

বিদ্রোহের রূপ হিসেবে গণ-অভ্যুত্থানকে চিহ্নিত করার এই তত্ত্বায়নকে ধীরে ধীরে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া বা বোঝার চেষ্টাও হয়েছে। পাকিস্তান আমলের পর থেকে গণ-অভ্যুত্থানই যে এখানে বিজয়ী জনসংগ্রামের প্রধান রূপ, সেটা বেশ পরিষ্কার করেই তিনি দেখিয়েছেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন যে গণ-অভ্যুত্থানের অর্জন, সেটাকেও পেছনের দিকে তাকিয়ে তত্ত্বায়ন করা হয়েছে। বিশেষভাবে উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের পর্যালোচনা বদরুদ্দীন উমর ও তাঁর রাজনৈতিক সাথিদের আলাপে, সাহিত্য ও রাজনৈতিক চিন্তায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

বলা যায়, সব বিবেচনায় উনসত্তর ছিল এই রাজনৈতিক চিন্তার উত্তুঙ্গ মুহূর্ত। শুধু ’৫২, ’৬৯ বা ’৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানের সাফল্য নয়; ফুলবাড়ি, কানসাট, দিনাজপুরসহ দেশের বহু স্থানে আঞ্চলিক পর্যায়ের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যেও বদরুদ্দীন উমর বাংলাদেশের জনগণের বিশেষ ধরনের গঠনকে সন্ধান করেছেন তার ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি, যোগাযোগব্যবস্থা, সমাজের গড়ন, সংবেদনের ধরন ও সংস্কৃতির মধ্যে।

আট

বদরুদ্দীন উমরের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের এ–বিষয়ক অজস্র রচনাও গণ-অভ্যুত্থান সম্পর্কে এখানকার কমিউনিস্টদের দৃষ্টি আকর্ষণে ব্যর্থ হয় কিংবা খুব সীমিত আকারে তা মনোযোগ পায়। তাঁর পার্টির ভাষ্য অনুযায়ী, ‘বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে সংগ্রামের রূপ হিসেবে গণ–অভ্যুত্থানের এই ক্ষমতা ও সাফল্য সত্ত্বেও এ দেশে এ নিয়ে কোন বিশ্লেষণ, এমনকি পর্যালোচনা পর্যন্ত, গতানুগতিকতাবাদী কমিউনিস্ট ও বামপন্থীদের মধ্যে দেখা যায়নি। দেশের পরিস্থিতি, দেশের সংগ্রামের ধরন, দেশের ইতিহাসের দিকে তাকানো এবং সেগুলি বিশ্লেষণ ও সেগুলির থেকে শিক্ষা গ্রহণের কোন প্রয়োজন তারা বোধ করেননি। উপরন্তু, আমরা যখন এদিকে বিপ্লবী ও কমিউনিস্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি, তখন তারা এর বিরুদ্ধে নানান ধরনের সমালোচনা করেছেন’ (বদরুদ্দীন ১৯৯১)।

যদিও পরবর্তী সময়ে গণ-অভ্যুত্থানের কথা অন্যরাও বারবার বলেছেন এবং তাঁদের সেই গণ-অভ্যুত্থানের ভাবনা যে রূপরেখাহীন একটি অস্পষ্ট কথা হিসেবে থেকেছে, সেটাও বদরুদ্দীন উমর উল্লেখ করেছেন। বস্তুত ২০০০ সাল নাগাদ পরিবর্তিত বিশ্বপরিস্থিতি, দেশে দেশে সামরিক বাহিনীগুলোর ক্রমোন্নতি, আধুনিক অস্ত্র ও প্রযুক্তির ব্যবহার, গোয়েন্দা তৎপরতা ও নজরদারির উন্নয়ন এবং সর্বোপরি যোগাযোগব্যবস্থার বিকাশের কারণে সশস্ত্র গেরিলা যুদ্ধ, মুক্তাঞ্চল, ঘাঁটি ইত্যাদি বিষয়ক ‘চীন বিপ্লব’ দ্বারা অনুপ্রাণিত ভাবনাগুলো বাস্তবায়নের কোনো সুযোগ দ্রুতই সীমিত হয়ে আসছিল বলেই বিপ্লবী রাজনীতির ওই রূপগুলো বাস্তব দুনিয়ায় প্রায় সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়ে যায়, যদিও কোনো কোনো খুবই দুর্গম অঞ্চলে তার অবশেষ এখনো অস্তিত্বমান।

বদরুদ্দীন উমর বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এই পন্থার অগ্রহণযোগ্যতার কথা আরও ৩০ বছর আগে থেকেই বলে এসেছেন, আর এই বলার ভিত্তি ছিল চীন ও বাংলাদেশের ভৌগোলিক পার্থক্য, দুটো দেশের রাষ্ট্রীয় গড়নের পার্থক্য, রাজনৈতিক ক্ষমতার পার্থক্য, কৃষকের সঙ্গে গ্রামীণ ধনিক শ্রেণির সম্পর্কের পার্থক্য, শহরের সঙ্গে গ্রামের সম্পর্কের পার্থক্য এবং এমন আরও কিছু বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে।

নয়

১৯৮৭ সালের পর থেকে গণ-অভ্যুত্থান বদরুদ্দীন উমরের বিপ্লবী ভাবনার কেন্দ্রে থেকেছে, এটা তাঁর নিজস্ব ও তাঁর দলের দলিলপত্রে বারবার দেখা যাবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটাকে তাঁর মৌলিক অবদানই বলতে হবে। কারণ, এই ভাবনা তাঁর প্রায় নিজস্ব চিন্তা থেকে সঞ্চারিত। তবে বদরুদ্দীন উমরের এই ভাবনা মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী রাষ্ট্রচিন্তার ওপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে আছে। তিনি তাঁর লেখাগুলোতে অজস্রবার উল্লেখ করেছেন, ‘জনগণ অভ্যুত্থান ঘটালেও সেই অভ্যুত্থানের শক্তিকে জনগণের হাতে ক্ষমতা আনার জন্য ব্যবহার সম্ভব হয়নি।’ এর ফলে বিশাল সব ‘অভ্যুত্থান বড় জোর সরকারকে বিশেষ দাবি আদায়ে বাধ্য করতে পারে। বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে সরকার পরিবর্তন করতে পারে, কিন্তু শোষক শ্রেণির রাষ্ট্র উচ্ছেদ করতে পারে না।’ তার ভাষায় ‘অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী নির্ধারক শক্তির অনুপস্থিতিতে সেই কাজটি করা সম্ভব নয়’ (বদরুদ্দীন ১৯৯১)।

সামনের দিনে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জনগণের গণতান্ত্রিক বিপ্লবী শক্তির উত্থানের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে বদরুদ্দীন উমরের এই ‘গণ-অভ্যুত্থান’–এর রাজনীতির বাস্তবায়ন শুধু নয়, অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে যেন তা আবারও বেহাত না হয়ে যায়, সেই ছিনতাই প্রতিরোধে সংগঠিত বিপ্লবী শক্তির উপস্থিতির শর্তও পূরণ করতে হবে।

সংক্ষেপে বিষয়টা বললে দাঁড়ায় এই যে বলপ্রয়োগ ছাড়া বিপ্লব বা সমাজ রূপান্তর সম্ভব নয়, এই মূলনীতি থেকে বদরুদ্দীন উমর কখনোই সরে আসেননি। কিন্তু বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সেই বলপ্রয়োগের কার্যকর রূপ হিসেবে তিনি সশস্ত্র গেরিলা যুদ্ধের বদলে দেখেছেন গণ-অভ্যুত্থানকে।

দশ

মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক বদরুদ্দীন উমর তাঁর একটি বিশেষ চিন্তার জন্য মাও সে–তুং এবং চীনা বিপ্লবের কাছে অভিজ্ঞতার ঋণী, সেটি হলো বিপ্লবের স্তর নির্ধারণ। তাঁর রাজনৈতিক তত্ত্বে এই বিষয়টিও একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা রেখেছে, বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এককভাবে না হলেও যাঁরা এই বিষয়টিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে রাজনৈতিক তত্ত্ব আকারে আলোচনা করেছেন, তাঁদের মাঝে তিনি অন্যতম। বদরুদ্দীন উমরের এই বিষয় নিয়ে লেখালেখি পাওয়া যায় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সমস্যা গ্রন্থের অনেকগুলো প্রবন্ধে। এই বই ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। বদরুদ্দীন উমরের এ–বিষয়ক ধারণাগুলোকে সারসংক্ষেপ আকারে এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করছি, কেননা বর্তমানে এই আলোচনা বিস্মৃতপ্রায় হলেও বাংলাদেশের বাস্তবতা বুঝতে এবং করণীয় নির্ধারণে তা যথেষ্টই সহায়ক—আজও।

ফরাসি বিপ্লব–পরবর্তী পশ্চিম ইউরোপে ক্রমশ রাজনৈতিক ক্ষমতাটা চলে যেতে থাকে উদীয়মান শিল্পকারখানা ও ব্যাংক–বিমার মালিক পুঁজিপতি শ্রেণির কাছে। এই রাজনৈতিক ক্ষমতা আগে ছিল ভূমিকেন্দ্রিক সামন্ত শ্রেণির দখলে। এই বুর্জোয়া বিপ্লবটা সমাজে গভীর পরিবর্তন আনয়ন করে। উৎপাদনের স্বার্থেই তারা প্রয়োজন অনুযায়ী সামন্ত মালিকদের বিশালাকার ভূমি মালিকানায় হস্তক্ষেপ করে, ভূমিদাসপ্রথা বাতিল হতে থাকে, দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজনে শিক্ষার বিস্তার ঘটে, নতুন জাগ্রত শ্রমিকের আন্দোলনের ফলে ধীরে ধীরে ভোটাধিকার আসতে থাকে। একই সময়ে নতুন পুঁজিপতিদের রাষ্ট্রক্ষমতায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ দেওয়াও ভোটাধিকার আবির্ভাবের অন্যতম কারণ। এর ফলে নতুন ধরনের রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়, যা সাধারণভাবে বুর্জোয়া শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করবে, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখবে।

জনসাধারণকে ‘প্রজা’ থেকে ‘নাগরিকে’ উত্তীর্ণ করেছে এই বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব; জাতীয় উৎপাদনশীলতারও বিকাশ ঘটায় তারা। অন্যদিকে নিজের দেশে শ্রমিক অসন্তোষ দমনে এবং বুর্জোয়াদের মুনাফাকে নিশ্চিত করতে দমনপীড়নেরও নতুন ধরনের বন্দোবস্ত, আইনকানুন ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর উদ্ভব ঘটে, সামন্তবাদের অবসান শেষে পুঁজিবাদের যাত্রা শুরু হয়। এভাবে আধুনিক রাষ্ট্রের আবির্ভাব ঘটে, যা অধিকাংশ এশিয়া ও আফ্রিকার, এমনকি পূর্ব ইউরোপের রাষ্ট্রের ঘটেনি।

এখানেই একটা গভীর প্রশ্নের উদয় ঘটে, যার সূত্রপাত রাশিয়ার মতো অনুন্নত ইউরোপীয় দেশে, যা আকৃতি পায় বিপ্লবোত্তর চীনদেশে। মার্ক্স ও এঙ্গেলসের প্রস্তাবিত কর্মসূচিগুলো সাধারণভাবে এই ‘উন্নত পুঁজিবাদী’ রাষ্ট্রগুলোর জন্য প্রযোজ্য, যেখানে বুর্জোয়া বিকাশের ওপর দাঁড়িয়ে ‘সমাজতান্ত্রিক বন্দোবস্ত’ নির্মাণ করা যাবে। কিন্তু চীনের মতো যে দেশগুলোতে এই বুর্জোয়া বিপ্লব সাধিত হয়নি, তাদের বেলায়? সেখানে যদি এমনকি কোনো কমিউনিস্ট দলও ক্ষমতায় আসে, তারাও কি সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচিগুলো সেখানে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবে? সে রকম একটি কর্মসূচি কি বিপর্যয় ডেকে আনবে না (যেমন কম্বোডিয়া)? অথবা, আদৌ কি তেমন কোনো কর্মসূচি গ্রহণের সক্ষমতা এই বিপ্লবী সরকারগুলোর থাকবে?

এই সমস্যার মুখোমুখি রাশিয়া নিজেও হয়েছিল, কারণ বুর্জোয়া বিকাশের বিবেচনায় রাষ্ট্র হিসেবে তা ছিল অত্যন্ত পশ্চাৎপদ। দেশটি স্বাধীন থাকায় কিছু পরিমাণে শিল্পকারখানা ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি সেখানে হয়েছিল। তথাপি বদরুদ্দীন উমরের ভাষায়, ‘রুশ বুর্জোয়াজীকে ১৯১৭ সালেও একটা পুরোপুরি স্বাধীন শ্রেণি বলা যেতো না’ (বদরুদ্দীন ১৯৭৪)।

এগারো

চীনের অনুন্নয়ন ও অবিকাশের চিত্রটি ছিল আরও ভয়াবহ। দেশটা একদিকে যেমন ছিল প্রায় পুরোপুরি কৃষিপ্রধান, অন্যদিকে এর আগের এক শতক ধরে কার্যত তার সব অর্থনৈতিক খাত ও বন্দর নিয়ন্ত্রণ করেছে নানা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। ব্রিটিশরা চীনের ওপর আফিম যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়; আর ফরাসি, জার্মান, রুশ ও জাপানি সাম্রাজ্যবাদ কায়েম করে নানা মাত্রার দখলদারত্ব। ফলে স্থানীয় উৎপাদনশীলতার বিকাশ তো দূরের কথা, দেশটির ঐতিহ্যবাহী কারিগর শ্রেণি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়; আর যে সামান্য উৎপাদনশীল অবকাঠামো তৈরি হয়, তা–ও গড়ে ওঠে কেবল বিদেশি পুঁজির স্বার্থ রক্ষা করতে।

বিপ্লবের পর একটা কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতা দখল করলেও চীন তাই সমাজতন্ত্র কায়েমের পথে অগ্রসর হয়নি। বিপ্লব-পরবর্তী চীনের অজস্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং সাফল্য-ব্যর্থতার অভিজ্ঞতাকে খুবই মোটাদাগে এভাবে বলা যায়: চীন ভূমিসংস্কারের ব্যাপক কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষকের উৎপাদনশীলতাকে একটা মাত্রায় বৃদ্ধি করেছে, কৃষির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ শিল্পায়নের পরিকল্পনা করেছে, ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ শিল্পের পর্যায়ে রাষ্ট্রকে উন্নীত করেছে। এই পুরো সময়েই দেশটি কঠোর হাতে বুর্জোয়া মালিকদের নিয়ন্ত্রণও করেছে।

চীনের বিকাশের গতিপথ শুরু থেকেই সবার কাছে পরিষ্কার না থাকলেও—বিশ্ব ইতিহাসে তা একদমই নতুন একটি অভিজ্ঞতাও বটে, ফলে তা পরিষ্কার থাকা বা সে বিষয়ে যথাযথ পূর্বানুমান সম্ভবও ছিল না—বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনে চীনের এই নিজস্ব গতিপথ একটি নতুন ধরনের তত্ত্বায়নকে সুদৃঢ় করে। বুর্জোয়া বিপ্লব ইউরোপে যা সম্পন্ন করেছে, সেই কাজটি অনগ্রসর, আধা সামন্তবাদী (কিংবা সামন্ত অবশেষ রয়ে যাওয়া) আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে, এবং বিশেষত উপনিবেশিত রাষ্ট্রগুলোতে বুর্জোয়া শ্রেণি কিছুতেই সম্পন্ন করতে সক্ষম নয়। বুর্জোয়া বিপ্লবের অসমাপ্ত এই কাজটুকু শ্রমিক-কৃষককেই করতে হবে, সেই জন্য বিপ্লব পরবর্তীতে যে বিশেষ ধরনের রাষ্ট্র তারা গঠন করে, সেই স্তরটিকে তারা জনগণতান্ত্রিক স্তর, গণতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তর ইত্যাদি নানান নামে অভিহিত করেছে।

এই জনগণতান্ত্রিক স্তরের অন্যতম লক্ষ্য ঔপনিবেশিক শাসন থেকে জন্ম নেওয়া আমলাতন্ত্র, সামন্ত অবশেষ ও বিদেশি আধিপত্যকে উচ্ছেদ করে পুঁজিবাদী বিকাশকে সম্পন্ন করা, এবং সেটা করা শ্রমিকশ্রেণির রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে। কেননা এই সব দেশের বুর্জোয়ারা স্বাধীনভাবে তার নিজের ঐতিহাসিক কর্তব্য পালনে সক্ষম নয়, তার স্বার্থের গাঁটছড়া বিদেশি শক্তির সঙ্গে বাঁধা, সে প্রধানত বিদেশি পুঁজির মুনাফার ভাগ পেয়েই আনন্দিত থাকে। কিন্তু জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের পর শ্রমিকশ্রেণির পার্টি তাকে কঠোর নিয়ন্ত্রণে রেখে একটা শ্রেণি হিসেবে তাকে গড়ে উঠতে সাহায্য করে, বিনিময়ে এই শ্রেণিটি আকৃতিতে বড় হতে থাকে এবং দেশের ভেতরে শিল্পকারখানা গড়ে তোলা, পুঁজি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও ব্যবস্থাপনাগত দিক দিয়ে সমাজকে অগ্রসর করতে থাকে। প্রতিটি উৎপাদনশীল উদ্যোগ তখন রাষ্ট্রকে আর নিতে হয় না, বরং ব্যক্তিগত উদ্যোক্তারা রাষ্ট্রীয় নীতি ও কাঠামোর মাঝে থেকে তা করেন। তবে এই রাষ্ট্রটি উদ্যোক্তা মালিকদের নয়, বরং উদ্যোক্তা শ্রেণিটি কমিউনিস্ট পার্টির অধীনস্ত থেকেই তার ভূমিকা পালন করে।

বারো

বিপ্লবে সফল হবার অন্যতম শর্ত বিপ্লবের স্তর নির্ধারণ। স্তর নির্ধারণে ভুল হলে তা এমনকি বিপ্লবকে অসম্ভবও করে তুলতে পারে। বদরুদ্দীন উমরের ভাষায়, ‘কোন আধা সামন্ততান্ত্রিক আধা-ঔপনিবেশিক সমাজে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ধ্বনি তুলে ও রণনীতি গ্রহণ করলে শ্রমিক শ্রেণি এবং কৃষকসহ জনগণের অন্যান্য মেহনতি ও দেশপ্রেমিক অংশগুলোর মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব সংঘর্ষের পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে’ (বদরুদ্দীন ১৯৭৪)।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে বদরুদ্দীন উমর ১৯৩৯ সালে মাও সে–তুংয়ের লেখা ‘৪ঠা মে আন্দোলন’ নামের বিখ্যাত প্রবন্ধ থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন, ‘কেউ যদি আমাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, কেন একজন কমিউনিস্ট প্রথমে একটি বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক সমাজ এবং তারপর সমাজতান্ত্রিক সমাজ সৃষ্টির চেষ্টা করবে, সে ক্ষেত্রে আমাদের জবাব হচ্ছে: আমরা ইতিহাসের অমোঘ গতিপথকেই অনুসরণ করছি।’

জনগণতান্ত্রিক বা জাতীয় গণতান্ত্রিক বলতে যে স্তরটিকে বদরুদ্দীন উমর চিহ্নিত করেছেন, সেই পথে ভিয়েতনাম হেঁটেছে প্রায় হুবহু চীনের পথ অনুসরণ করে এবং চীন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার ফলে আরও সুনির্দিষ্টভাবে। এই পর্বগুলো যে জাতীয় শক্তির বিচ্ছুরণ ঘটায়, ব্যক্তিমানুষের মাঝে আত্মবিশ্বাসের জন্ম দেয়, গর্বের বোধ তৈরি করে, তার বিবরণ যেমন বিপ্লব পরবর্তী চীন নিয়ে দুজন বিখ্যাত বাঙালি ব্যক্তিত্বের—মাওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমান—লেখায় মিলবে, তেমনি মিলবে সারা পৃথিবীর আরও অজস্র প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে।

বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের স্বাধীনতা কাছাকাছি সময়ের হলেও এবং ভিয়েতনামের ক্ষয়ক্ষতি বাংলাদেশের চাইতে বহু হাজার গুণ বেশি হলেও আজকে রাষ্ট্রটির যে সমৃদ্ধি আমরা দেখি, যে মর্যাদার বোধ দেখি, তা ওই জনগণতান্ত্রিকতার ফল। অন্যদিকে বাংলাদেশে সমাজতন্ত্রের নামে জাতীয়করণ ও লুণ্ঠনের যে ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে, তার বিবরণ বদরুদ্দীন উমর বহুবার দিয়েছেন। এমনকি রেহমান সোবহানের বাংলাদেশের বুর্জোয়া রাষ্ট্রব্যবস্থার সংকট গ্রন্থেও তার বিবরণ মিলবে। (রেহমান ১৯৮৩) এর কারণ হিসেবে দুজনই মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী আওয়ামী নেতৃত্বের শ্রেণিগত বৈশিষ্ট্যকেই চিহ্নিত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, রাশিয়াসহ সবারই স্বার্থের কাছে তারা জাতীয় স্বার্থকে যেভাবে বিলিয়ে দিয়েছে, সেটাই পরবর্তীকালের বাংলাদেশের গতিপথকে নির্ধারণ করেছে।

তেরো

বদরুদ্দীন উমরের গণ-অভ্যুত্থান আর জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের যে কল্পনা করেছেন, দুইটাই চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর এক অর্থে পরস্পরের ওপর সমাপতিত হয়েছে, সাফল্যের জায়গাতে নয়, বরং জাগিয়ে তোলা সম্ভাবনার তুলনায় অভ্যুত্থানের অর্জনের ঘাটতির জায়গাতেই।

এই প্রসঙ্গে প্যারি কমিউনের অভিজ্ঞতাকে সারসংকলন করা মার্ক্সের কথাকেই আবারও উল্লেখ করা যায়: রাষ্ট্রকে দখল করাই যথেষ্ট নয়, রাষ্ট্রযন্ত্রকে ভেঙেও ফেলতে হবে। প্রতিটা গণ-অভ্যুত্থানের নিজস্ব কিছু অর্জন রয়েছে। ’৬৯, ’৯০ এবং ’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের নানান মাত্রা ও নানান চরিত্র ছিল। ‘চিলেকোঠার সেপাই’ উপন্যাসে আমরা উনসত্তরকে দেখি, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের প্রেরণা হিসেবে যার অসীম ভূমিকা থাকলেও অচিরেই লুটেরা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের খপ্পরে পতিত হয়ে যার সম্ভাবনা ধূলিসাৎ হয়; নতুন জন্ম নেওয়া দেশটিতে উৎপাদিকা শক্তির বিকাশবিরোধী পুরোনো আমলাতন্ত্র, সেনাবাহিনী ও লুটেরা শ্রেণির আধিপত্য এবং বিদেশি নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকে।

জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কের কোনো মৌলিক পরিবর্তন এখানে ঘটেনি, জনগণ সেই প্রজার স্তরেই রয়ে গেছে। ধ্রুপদি বুর্জোয়ার সঙ্গে অনুন্নত দেশগুলোর এই লুটেরা বুর্জোয়াদের পার্থক্য বোঝার জন্য বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর সময়টুকুর মূল্যায়ন খুবই কাজের। বদরুদ্দীন উমরের যুদ্ধপূর্ব বাংলাদেশ ও যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ এবং রেহমান সোবহানের পূর্বোক্ত গ্রন্থটি এই ক্ষেত্রে বিশেষ কাজের হবে।

নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানকে বদরুদ্দীন উমর চিহ্নিত করেছিলেন নাগরিক বুর্জোয়া অভ্যুত্থান হিসেবে। সরকারের পতন ঘটলেও রাষ্ট্রটি নিজেকে অক্ষত রেখেছে সেখানে, যদিও জনগণ তার শক্তির প্রদর্শনী ঘটিয়েছিল। আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদানকারী শক্তিগুলোর কারোই রাষ্ট্রের পুনর্গঠন বা সংস্কার বিষয়ে কোনো ভাবনা ছিল না। ফলে কায়েমি শক্তিগুলো আন্দোলনকারীদের দলগুলোর মাধ্যমেই রাষ্ট্রকাঠামোকে অক্ষুণ্ন  রাখতে সক্ষম হয়।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, বাংলাদেশের পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলো এই অভ্যুত্থানের নিয়ন্ত্রক ছিল না। বরং এই অভ্যুত্থান ছিল স্বতঃস্ফূর্ত ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ, হয়তো তা পুরোনো রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ক্ষয়েরও লক্ষণবাহী। যে তরুণদের দাবিকে কেন্দ্র করে আন্দোলনের বিকাশ, তাঁদের দেশব্যাপী কোনো সংগঠন না থাকলেও তাঁরাই নেতৃত্বের স্থানে আসীন হন, কারণ পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলো ফ্যাসিবাদী একটা শাসনে কার্যকর থাকতে পারেনি, আদর্শিকভাবেও তারা তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়নি। তবে লক্ষণীয় যে রাষ্ট্র তার সুবিধা ও ক্ষমতার মোহ দিয়েই অপ্রস্তুত তরুণদের বেশ বড় একটি অংশকে পুরোনো রাজনীতিতেই অভ্যস্ত করতে সক্ষম হয়। এভাবে রাষ্ট্রের যে গভীর সংস্কারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা অচিরেই বিনষ্ট হয়, রাষ্ট্রীয় কাঠামোগুলোও পুরোপুরি অটুট থেকে যায়।

চৌদ্দ

বদরুদ্দীন উমর বিশেষভাবে আনন্দিত হয়েছিলেন চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে। একটা সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থান শুধু বাংলাদেশে নয়, গোটা ভারতীয় উপমহাদেশে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। ভারত বা পাকিস্তানে এমন জনতার শক্তি ও ব্যাপকতার গণ–অভ্যুত্থান কখনো দেখা যায়নি। বাংলাদেশ নিজেই একটি “গণ–অভ্যুত্থানের দেশ”—১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৯০ সালের ঘটনাগুলো তার উদাহরণ।’ (যুগান্তর, ২০২৫) কিন্তু ২০২৪ সালের মে মাসে তার সম্পাদিত সংস্কৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত জীবনের শেষ রচনায় তিনি এই গণ–অভ্যুত্থানও কীভাবে জনতার হাতছাড়া হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পুরোনো রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রযন্ত্র আবারও প্রতিষ্ঠিত হলো, সেই হতাশাই ব্যক্ত করেছেন।

আমি মনে করি, বাংলাদেশের ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানচর্চায় বদরুদ্দীন উমরের বিদ্যায়তনিক অবদানের পাশাপাশি উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্র উপলব্ধি এবং তার আমূল রূপান্তরে বদরুদ্দীন উমরের অভ্যুত্থানের তত্ত্ব এবং জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন পুষ্টিকর রসদ জোগাতে সক্ষম। সব চিন্তারই সময় দ্বারা আরোপিত সীমাবদ্ধতা থাকে, তিনিও তার ব্যতিক্রম নন। বদরুদ্দীন উমর, অর্থাৎ আমাদের উমর ভাইয়ের কর্মময় জীবনের প্রতি আমরা সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা জানাতে পারব তার রাজনৈতিক চিন্তার প্রাসঙ্গিক অংশগুলোকে আজকের সংকট মোকাবিলায় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করতে পারলে।

তথ্যসূত্র

অমিত ১৯৮৯।। অমিত রায়, অন্তরঙ্গ চারু মজুমদার, কলকাতা: রেডিকাল ইমপ্রেশন।

বদরুদ্দীন ১৯৭৪।। বদরুদ্দীন উমর, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সমস্যা, ঢাকা: মুক্তধারা।

বদরুদ্দীন ১৯৮২।। বদরুদ্দীন উমর, বাংলাদেশে মার্কসবাদ, চট্টগ্রাম: বইঘর।

বদরুদ্দীন ১৯৯১।। বদরুদ্দীন উমর (সম্পাদিত), বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সংগ্রাম [রাজনৈতিক দলিলপত্রের সংকলন], ঢাকা।

বদরুদ্দীন ২০২৫ক।। বদরুদ্দীন উমর, ‘দেশে সবাই আমাকে উপেক্ষা করেছে’, প্রথম আলো, ০৭ সেপ্টেম্বর।

বদরুদ্দীন ২০২৫খ।। বদরুদ্দীন উমর, ‘ট্রাইব্যুনালের কাছে যে লিখিত জবানবন্দি দিয়েছিলেন বদরুদ্দীন উমর’, যুগান্তর, ০৭ সেপ্টেম্বর।

মঈদুল ১৯৮৬।। মঈদুল হাসান, মূলধারা ’৭১, ঢাকা: দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড।

মাও ১৯৩৯।। মাও সে–তুং, ‘৪ঠা মে আন্দোলন’।

রেহমান ১৯৮৩।। রেহমান সোবহান, বাংলাদেশের বুর্জোয়া রাষ্ট্রব্যবস্থার সংকট, ঢাকা: জাতীয় সাহিত্য প্রকাশন। 

লেখক পরিচিতি

ফিরোজ আহমেদ বাংলাদেশের একজন সুপরিচিত প্রাবন্ধিক, অনুবাদক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু এবং তিনি দীর্ঘদিন 'গণসংহতি আন্দোলন'-এর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে যুক্ত ছিলেন। রাজনীতি, ইতিহাস ও পরিবেশ নিয়ে দেশের শীর্ষ দৈনিকগুলোতে তাঁর নিয়মিত কলাম প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক গঠিত 'সংবিধান সংস্কার কমিশন'-এর অন্যতম সদস্য হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।