সারকথা
পূর্ববঙ্গের দেশীয় ঋণব্যবস্থা ও ব্যাংকিংয়ের ইতিহাস মূলত স্থানীয় আর্থিক ঐতিহ্য, ঔপনিবেশিক রূপান্তর এবং আঞ্চলিক আত্মপ্রতিষ্ঠার একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ইতিহাস। আধুনিক ইউরোপীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠার বহু আগে হুন্ডি, মহাজন, পোদ্দার, শ্রফ ও জগৎশেঠদের মতো দেশীয় আর্থিক গোষ্ঠী ঋণ, আমানত, রাজস্ব পরিবহন ও বাণিজ্যিক লেনদেন পরিচালনা করত। দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা ও ধাতব মুদ্রা পরিবহনের ঝুঁকির কারণে হুন্ডি নিরাপদ এবং কার্যকর অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যম হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব পায়। ঔপনিবেশিক আমলে ইউরোপীয় ব্যাংকের আগমনে বাংলায় এক দ্বৈত ব্যাংকিং কাঠামো গড়ে ওঠে, যেখানে দেশীয় আস্থা-নির্ভর অর্থব্যবস্থার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক আধুনিক ব্যাংকিং বিস্তার লাভ করে; তবে এ প্রক্রিয়া স্থানীয় জনগণের জন্য সমভাবে কল্যাণকর ছিল না। লোন অফিস, লোন কোম্পানি ও দেশীয় ব্যাংকগুলো গ্রামীণ ও মফস্সল অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও উচ্চ সুদ, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক বৈষম্য তাদের সীমাবদ্ধতা তৈরি করে। তবু কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, দিনাজপুর ও ঢাকাকেন্দ্রিক দেশীয় ব্যাংকগুলো প্রমাণ করে যে পূর্ববঙ্গের মানুষ নিজেদের পুঁজি ও প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিতে একটি স্বতন্ত্র ব্যাংকিং ধারা গড়ে তুলেছিল। স্বাধীনতার পর জাতীয়করণের মাধ্যমে সেই ঐতিহাসিক ধারা বাংলাদেশের আধুনিক রাষ্ট্রীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় রূপ নেয়।
ভূমিকা: বাংলার ব্যাংকিং সংস্কৃতির ভিত্তি
পূর্ববঙ্গের লোন অফিস ও স্থানীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার ঐতিহাসিক বিকাশ অনুধাবন করতে হলে বাংলার প্রাচীন আর্থিক কাঠামোর গভীরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করা প্রয়োজন। প্রাচীন ভারতে ঋণদান, আমানত গ্রহণ ও সুদভিত্তিক লেনদেনের যে সুসংগঠিত ঐতিহ্য গড়ে উঠেছিল এবং আব্বাসীয় যুগে বাগদাদকেন্দ্রিক আরব বিশ্বের বিকশিত ব্যাংকিং প্রথার সঙ্গে তার যে মিথস্ক্রিয়া ঘটেছিল—এ দুই ধারার সমন্বয়ে বাংলার অর্থনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি নির্মিত হয়।
গুপ্তযুগীয় শিলালিপি থেকে ব্যবসায়ী গিল্ড বা সংঘভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রমাণ পাওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রে এসব অর্থ ব্যবসায়ী রাজশক্তির সমান্তরালে সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতেন এবং দরবারে বিশেষ মর্যাদা ভোগ করতেন। যদিও সে সময় আধুনিক ব্যাংকিংয়ের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বিদ্যমান ছিল না, তবু ঋণ প্রদান, আমানত সংরক্ষণ ও সুদভিত্তিক লেনদেনের একটি সুস্পষ্ট ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। ব্যবসায়ী শ্রেণি শ্রফ, পোদ্দার, মহাজন ও বেনিয়া নামে পরিচিত ছিল।
ইংল্যান্ডের রাজা তৃতীয় উইলিয়াম ডাচদের সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রীয় ব্যয় নির্বাহে নিজ দেশের বণিক ও মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, তা আধুনিক রাষ্ট্রীয় ঋণব্যবস্থার প্রাথমিক রূপ হিসেবে বিবেচিত হয়। একইভাবে মোগল সাম্রাজ্যেও সম্রাট ও প্রাদেশিক শাসকেরা আর্থিক সংকট মোকাবিলায় দেশীয় মহাজন ও ব্যাংকারদের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। দক্ষিণ ভারতে চেট্টি ও শেঠ সম্প্রদায় যেমন দেশীয় শাসক ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, তেমনি বাংলায় প্রাক্-পলাশী যুগে দেশীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল জগৎশেঠ পরিবার। সমসাময়িক বাংলায় তাদের আর্থিক প্রভাব এতটাই বিস্তৃত ছিল যে ইতিহাসে তাদের ‘বাংলার রথচাইল্ড’ বলেও অভিহিত করা হয়েছে।
জগৎশেঠ পরিবার: বাংলার কেন্দ্রীয় বিনিময় ব্যাংক
১৭১৭ খ্রিষ্টাব্দে মুর্শিদকুলী খাঁর টাঁকশালের কর্মচারী রঘুনন্দনের মৃত্যুর পর জগৎশেঠ পরিবার বাংলার টাঁকশাল ও মুদ্রাব্যবস্থার দায়িত্ব লাভ করে। বর্তমান যুগে রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে ভূমিকা পালন করে, সে সময় বাংলার নবাবি প্রশাসনের জন্য জগৎশেঠ পরিবার অনেকাংশে সেই দায়িত্বই পালন করত। সরকারের বিভিন্ন খাতে সংগৃহীত রাজস্ব তাদের বিভিন্ন কুঠিতে জমা হতো এবং সেখান থেকেই তা পরিচালিত ও হিসাবভুক্ত করা হতো।
ব্যাংকিং কার্যক্রম ছাড়াও জগৎশেঠ পরিবার বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যে যুক্ত ছিল। বিশেষত শস্য ব্যবসায় তাদের অংশগ্রহণ অনেক সময় বাধ্যতামূলক হয়ে উঠত। কারণ, জমিদারদের বকেয়া খাজনার ক্ষেত্রে তারা প্রায়ই জামিনদারের ভূমিকা পালন করত এবং অনেক জমিদার নগদের পরিবর্তে শস্যের মাধ্যমে দেনা পরিশোধ করতেন। ওলন্দাজদের দলিলপত্র থেকে জানা যায়, জগৎশেঠরা চারটি প্রধান মসলার খুচরা ব্যবসার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল; পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বণিকদের এজেন্ট হিসেবেও তারা কাজ করত এবং বিভিন্ন পণ্য বেচাকেনার মাধ্যমে কমিশন লাভ করত।
আঠারো শতকের বাংলায় জগৎশেঠ পরিবারের আর্থিক কর্মকাণ্ডকে মোটামুটি পাঁচটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করা যায়।
প্রথমত, তাদের আয়ের প্রধান উৎস ছিল সরকারের পক্ষে রাজস্ব গ্রহণ ও হিসাব সংরক্ষণ। ধারণা করা হয়, সংগৃহীত রাজস্বের ওপর তারা প্রায় ১০ শতাংশ কমিশন পেত। সমকালীন ইংরেজ কর্মকর্তা লুক স্ক্যাফটনের বিবরণ অনুযায়ী, শুধু এই খাত থেকেই জগৎশেঠ পরিবারের বার্ষিক আয় প্রায় ৪০ লাখ টাকায় পৌঁছেছিল।
দ্বিতীয়ত, টাঁকশালসংক্রান্ত কার্যক্রম থেকেও তারা বিপুল মুনাফা অর্জন করত। মুদ্রা বিনিময় ও টাঁকশাল থেকে আয়ের অর্থ তাদের গদিতে জমা হতো এবং এ খাত থেকে তাদের বার্ষিক আয় সাত থেকে আট লাখ টাকা ছিল। এ কারণেই ইংরেজদের নিজস্ব টাঁকশাল স্থাপনের প্রচেষ্টা কিংবা মুর্শিদাবাদের টাঁকশাল ব্যবহারের উদ্যোগে জগৎশেঠরা বারবার বাধা প্রদান করেছিল; কারণ, এতে তাদের দীর্ঘদিনের লাভজনক ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
তৃতীয়ত, জগৎশেঠ পরিবার ইংরেজ, ফরাসি, ওলন্দাজ ও দেশীয় বণিকদের বিপুল পরিমাণ অর্থ সুদে ধার দিত। সর্বদা বিপুল অর্থভান্ডার হাতে থাকার ফলে তাদের মধ্যে একধরনের একচেটিয়া ব্যাংকিং ক্ষমতা গড়ে উঠেছিল।
চতুর্থত, অন্যান্য দেশীয় ব্যাংকারদের মতো তারাও প্রত্যক্ষ বাণিজ্যে যুক্ত ছিল। বিভিন্ন পণ্যে বিনিয়োগের পাশাপাশি সরকারকে ঋণও প্রদান করত। অনেক সময় সরকারকে ঋণ দেওয়ার বিনিময়ে কয়েকটি জেলার রাজস্ব আদায়ের অধিকার তাদের হাতে ন্যস্ত করা হতো। ওই সব জেলার জমিদারেরা জগৎশেঠদের কুঠিতে যে রাজস্ব জমা দিতেন, তা তাদের পারিবারিক আয়ের অংশে পরিণত হতো।
পঞ্চমত, জগৎশেঠ পরিবার হুন্ডি ব্যবসার মাধ্যমে ভারতবর্ষব্যাপী আর্থিক লেনদেন পরিচালনা করত।
হুন্ডি ব্যবস্থা ও দেশীয় আর্থিক নেটওয়ার্ক
‘হুন্ডি’ ছিল একধরনের লিখিত ও শর্তহীন অর্থ প্রদানের আদেশপত্র, যা আধুনিক যুগের বিল অব এক্সচেঞ্জ ব্যাংক ড্রাফট কিংবা মানি অর্ডারের সমতুল্য। দূরবর্তী অঞ্চলে নিরাপদে অর্থ স্থানান্তরের জন্য এটি ছিল অত্যন্ত কার্যকর একটি ব্যবস্থা।
সুজাউদ্দিন মুহাম্মদ খানের শাসনামল থেকে শুরু করে পরবর্তী দেওয়ানি পর্বেও হুন্ডির ব্যবহার ছিল ব্যাপক। শাহ আলম দ্বিতীয়ের প্রাপ্য রাজস্ব জগৎশেঠদের হুন্ডির মাধ্যমে দিল্লিতে পাঠানো হতো। একইভাবে ইংরেজ, ফরাসি ও ওলন্দাজ বণিকেরা বাংলার বিভিন্ন বাণিজ্যকুঠিতে অগ্রিম দাদন ও পণ্য ক্রয়ের অর্থ প্রেরণে হুন্ডির আশ্রয় নিত। ফলে এটি কেবল বাণিজ্যিক লেনদেনের মাধ্যমই ছিল না; বরং উপমহাদেশজুড়ে বিস্তৃত এক আস্থাভিত্তিক আর্থিক নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল।
হুন্ডির বিপরীতে ব্যাংকাররা যে কমিশন গ্রহণ করত, তাকে বলা হতো ‘হুন্ডি বাট্টা’। এর হার সাধারণত ২ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করত এবং তা নির্ভর করত বাজারে হুন্ডির চাহিদা ও সরবরাহের ওপর। ইউরোপীয় জাহাজ আগমনের মৌসুমে বাণিজ্যিক লেনদেন বেড়ে গেলে হুন্ডির চাহিদা বৃদ্ধি পেত এবং সঙ্গে সঙ্গে বাট্টার হারও ঊর্ধ্বমুখী হতো। আবার জাহাজ প্রস্থান করলে সেই হার কমে আসত। অর্থাৎ, হুন্ডির বাজারও ছিল একধরনের গতিশীল আর্থিক বাজার, যার নিজস্ব চাহিদা-সরবরাহকাঠামো বিদ্যমান ছিল।
দেশীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রধানত দুই ধরনের হুন্ডি প্রচলিত ছিল—দর্শনী হুন্ডি ও মুদ্দতি হুন্ডি। দর্শনী হুন্ডি উপস্থাপনের সঙ্গে সঙ্গেই নগদায়নযোগ্য ছিল; অন্যদিকে মুদ্দতি হুন্ডি নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হওয়ার পর পরিশোধ করা হতো। আধুনিক ব্যাংকিং পরিভাষায় এদের যথাক্রমে Sight Bill ও Usance Bill-এর সমতুল্য ধরা যায়।
উনিশ শতকের গোড়ার দিকে স্কটিশ চিকিৎসক ও পর্যটক ফ্রান্সিস বুকানন উল্লেখ করেছিলেন যে জগৎশেঠ পরিবার বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বিনিময়পত্র সরবরাহ করত, যদিও অধিকাংশ দেশীয় ব্যাংকারের কার্যক্রম কলকাতা, ঢাকা, পাটনা ও মুর্শিদাবাদকেন্দ্রিক ছিল। অঞ্চল ও দূরত্বভেদে বিনিময়হারেরও তারতম্য দেখা যেত। এই বিস্তৃত নেটওয়ার্ক শুধু অর্থ স্থানান্তরের কাজই করেনি; বরং পারস্পরিক আস্থা, সুনাম ও ব্যবসায়িক বিশ্বাসের ভিত্তিতে একটি সুসংগঠিত আর্থিক কাঠামো গড়ে তুলেছিল, যা দীর্ঘকাল বাংলার বাণিজ্যিক অর্থনীতিকে সচল রেখেছিল
তবে আঠারো শতকের শেষ তিন দশকে জগৎশেঠ পরিবারের একচ্ছত্র প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়লে বাংলার ব্যাংকিং জগতে পরিবর্তনের সূচনা ঘটে। অসংখ্য মাঝারি ও ক্ষুদ্র বাঙালি এবং অবাঙালি ব্যাংকার তখন ব্যাংকিং ও অর্থলগ্নির ব্যবসায় প্রবেশ করে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রশাসনিক নথিপত্রে এদের দীর্ঘ তালিকা পাওয়া যায়, যেখানে বাঙালি ব্যাংকারদের সংখ্যাধিক্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এর ফলে বাংলার আর্থিক কাঠামো আরও বিকেন্দ্রীভূত ও বহুমুখী রূপ লাভ করে।
হুন্ডির জনপ্রিয়তার পেছনে আরেকটি মৌলিক কারণ ছিল ধাতব মুদ্রা পরিবহনের বিপুল ঝুঁকি এবং তৎকালীন দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা। সে যুগে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রা বহন করা যেমন ছিল ব্যয়বহুল ও শ্রমসাধ্য, তেমনি দস্যুতা, লুণ্ঠন, নৌকাডুবি কিংবা দুর্ঘটনার আশঙ্কাও ছিল প্রবল। ফলে নিরাপদ, দ্রুত এবং তুলনামূলক সহজ লেনদেনব্যবস্থা হিসেবে হুন্ডি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
রেলপূর্ব বাংলায় যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল নদীপথ। পাশাপাশি গরু ও মহিষের গাড়ি, কোথাও কোথাও হাতিও পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হতো। স্থলপথের অবস্থা এতটাই দুর্বল ছিল যে বহু অঞ্চলে হেঁটেও চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়ত। দিনাক সোহানী কবিরের পূর্ব বাংলার রেলওয়ের ইতিহাস ১৮৬২-১৯৪৭ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, সে সময় সিলেট থেকে কলকাতায় পৌঁছাতে প্রায় ১৩ দিন সময় লাগত। আসাম ও সিলেট অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা ছিল আরও অনুন্নত। ১৮৭৮ সালে দার্জিলিংয়ের পাদদেশ পর্যন্ত রেলপথ পৌঁছালেও আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয় ১৯০৪ সালে এবং চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে রেলসংযোগ স্থাপিত হয় ১৯১০ সালে।
১৯১৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, কলকাতার আর্মেনিয়ান স্ট্রিটঘাট থেকে স্টিমারে শিলচর পৌঁছাতে লাগত ৮ দিন; জগন্নাথঘাট থেকে ধুবড়ি যেতে ৭ দিন, গুয়াহাটি যেতে ৯ দিন এবং ডিব্রুগড় পৌঁছাতে প্রায় ১৩ দিন সময় লাগত। কিন্তু যাত্রাপথের বড় অংশেই স্টিমার চলাচলের সুযোগ ছিল না; সরু খাল ও অগভীর নদীপথে নির্ভর করতে হতো দেশীয় নৌকার ওপর।
১৮৪৭ সালের একটি ঘটনা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কোচ রাজার দেওয়া নজরানার মুদ্রা গদাধর নদীপথে ধুবড়িতে নিয়ে যাওয়ার সময় নৌকাডুবির শিকার হয় এবং সমস্ত মুদ্রা নদীতে তলিয়ে যায়। পরবর্তীকালে এমন ক্ষতি এড়াতে মুদ্রা ছোট ছোট থলেতে ভরে সেগুলো ভাসমান বাঁশের ভেলার সঙ্গে বেঁধে পরিবহন করা হতো, যাতে দুর্ঘটনা ঘটলেও অন্তত থলেগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
মাদারীপুর মহকুমার প্রথম ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট আর্থার লয়েড ক্লে তাঁর লিভস ফ্রম আ ডায়েরি ইন লোয়ার বেঙ্গল গ্রন্থে পূর্ববঙ্গে ধাতব মুদ্রা পরিবহনের এক চিত্র তুলে ধরেছেন। ১৮৬৫ সালে মাদারীপুরে ট্রেজারি সুরক্ষার দায়িত্বে থাকাকালে তাঁকে একবার প্রায় পৌনে দুই লাখ টাকা ঢাকার ব্যাংক অব বেঙ্গলে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রথমে এক হাজার ও পাঁচ হাজার টাকার থলেতে মুদ্রা ভরা হয়। এরপর সেগুলো রাখা হয় মজবুত লোহার সিন্দুকে। সিন্দুকগুলো শক্ত করে বেঁধে গরুর গাড়িতে করে নদীর ঘাটে নেওয়া হয়, সঙ্গে ছিল ১০ থেকে ১২ জন সশস্ত্র পুলিশ প্রহরী। পরে সিন্দুকগুলো বাঁশের সঙ্গে বেঁধে নৌকায় তোলা হয়, যাতে ঝড় বা দুর্ঘটনায় নৌকা ডুবে গেলেও সিন্দুক ভেসে থাকে এবং পরে সহজে উদ্ধার করা যায়।
এ বাস্তবতায় হুন্ডি কেবল একটি আর্থিক দলিল ছিল না; বরং তা ছিল অনিরাপদ ও দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার যুগে বাণিজ্যিক নিরাপত্তা, আস্থা ও গতিশীলতার এক অনন্য সমাধান। বাংলার দেশীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিকাশে হুন্ডি তাই শুধু অর্থ স্থানান্তরের প্রযুক্তিই নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ আর্থিক সভ্যতার ভিত্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
ঢাকার মুদ্রাব্যবস্থা ও পোদ্দার শ্রেণির উত্থান
আঠারো থেকে উনিশ শতকের প্রথমভাগ পর্যন্ত ঢাকা অঞ্চলের মুদ্রা ও বিনিময়ব্যবস্থা ছিল বহুমাত্রিক, অনিয়ন্ত্রিত এবং প্রায়ই অস্থিতিশীল। মোগল শাসনামলে প্রচলিত প্রধান মুদ্রা ছিল ‘সিক্কা’। পরবর্তী সময়ে ১৭৪২ সালে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মোগলদের অনুমতি নিয়ে আর্কট টাঁকশাল থেকে ‘আর্কট মুদ্রা’ চালু করে। গবেষক আবদুল করিমের মতে, সে সময় উপমহাদেশজুড়ে দুই শতাধিক টাঁকশালে মুদ্রা প্রস্তুত হতো এবং শাসকেরা বণিকদেরও নিজস্ব টাঁকশালে মুদ্রা নির্মাণের অনুমতি দিতেন। ফলে প্রতিটি টাঁকশালের মুদ্রার ওজন, বিশুদ্ধতা ও মানে পার্থক্য থাকায় কোনো একক মানদণ্ড গড়ে ওঠেনি। বাজারে মুদ্রার মূল্য নির্ধারিত হতো মূলত তার ধাতব ওজন ও বিশুদ্ধতার ভিত্তিতে।
এই অনিশ্চিত মুদ্রাব্যবস্থার জটিলতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে ১৭৮৭ সালের ঢাকা জেলা কালেক্টরেটের জরিপে, যেখানে ঢাকার বাজারে অন্তত সাত ধরনের মুদ্রার প্রচলনের তথ্য পাওয়া যায়। রাজস্ব আদায় হতো সিক্কায়, অথচ বাণিজ্যিক লেনদেন চলত আর্কট মুদ্রায়। ফলে একই অর্থনীতির ভেতরে দ্বৈত মুদ্রাব্যবস্থা কার্যকর ছিল। এ পরিস্থিতির মধ্যেই শ্রফ, শেঠ ও পোদ্দার শ্রেণির একটি শক্তিশালী মধ্যবর্তী অর্থনৈতিক গোষ্ঠী গড়ে ওঠে, যারা মুদ্রা বিনিময় ও বাট্টা নির্ধারণের মাধ্যমে বাজারে কার্যত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
রাজস্ব পরিশোধের প্রয়োজনে সাধারণ প্রজা, জমিদার, এমনকি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও এদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। মুদ্রার মানের ওঠানামার সঙ্গে সঙ্গে বাট্টার হারও পরিবর্তিত হতো, যা কখনো কখনো ১ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাত। এই অস্থির ও মুনাফানির্ভর কাঠামোই পরবর্তীকালে দেশীয় লোন অফিস এবং স্থানীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার উত্থানের সামাজিক-অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করে।
কারিগর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নির্মাণশিল্পীরা মূলধনের প্রয়োজনে প্রধানত পোদ্দারদের ওপর নির্ভর করতেন। এই নির্ভরশীলতা থেকেই গড়ে ওঠে মহাজনি অর্থায়নব্যবস্থা। অধিকাংশ পোদ্দার ছিলেন সুবর্ণবণিক সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। বন্ধকী সম্পত্তি, বিশেষত জমি ও গয়না চক্রবৃদ্ধি সুদের কারণে অনেক সময় নিলামে উঠে যেত এবং তা ক্রয় করে তাঁরা ক্রমে জমিদার শ্রেণিতে পরিণত হন। এখান থেকেই ‘পরের ধনে পোদ্দারি’ প্রবাদটির সামাজিক ভিত্তি তৈরি হয়।
১৭৯৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রবর্তিত ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ এ প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করে। এ ব্যবস্থায় জমিদারেরা নির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয় হারে রাজস্ব প্রদানের বিনিময়ে জমির স্থায়ী স্বত্বাধিকার লাভ করেন। তবে একই সঙ্গে তাঁরা রাজস্ব আদায়ের দায়ে কঠোরভাবে আবদ্ধ হন। এ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ‘সূর্যাস্ত আইন’, যার অধীন নির্ধারিত সময়ে রাজস্ব পরিশোধে ব্যর্থ হলে জমিদারি নিলামে উঠত। ১৭৯৯ সালে সংশোধনের আগপর্যন্ত এ আইনের ফলে বহু জমিদারি হাতবদল হয়। এমনকি পূর্ববঙ্গের একাধিক বৃহৎ জমিদার পরিবার তাদের সম্পত্তি হারায়।
এই কাঠামোগত পরিবর্তনের ফলে পুরোনো মুসলিম জমিদার পরিবারগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং নতুন হিন্দু জমিদার ও গোমস্তা শ্রেণির উত্থান ঘটে। একই সময়ে মুদ্রা বিনিময়কারী, হুন্ডি ব্যবসায়ী এবং কোম্পানি নিয়োজিত মুন্সি ও দেওয়ানদের নিয়ে গড়ে ওঠে তথাকথিত ‘বাবু শ্রেণি’। এই শ্রেণি অর্থনৈতিক ক্ষমতার পাশাপাশি প্রশাসনিক প্রভাবও অর্জন করে। ১৮০০ সালের দিকে ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট মেলভিল প্রণীত ২৬ জন প্রভাবশালীর তালিকায় এই নতুন নগর অভিজাত শ্রেণির প্রতিনিধিরাই স্থান পায়।
ঢাকার মহাজনি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো মথুরানাথ পোদ্দারের উত্থান। তিনি ১৮২০-এর দশকে বাংলাবাজারে ক্ষুদ্র মুদ্রা বিনিময়ের মাধ্যমে ব্যবসা শুরু করেন। সে সময় ১ রুপি = ১৬ আনা = ৬৪ পয়সা = ১৯২ পাই এবং ১ পাই = ২০ কড়ি—এই জটিল হিসাবব্যবস্থায় ক্ষুদ্র লেনদেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মথুরানাথ এক রুপি ভাঙানোর জন্য নির্দিষ্ট বাট্টা নিতেন এবং পরে হুন্ডি ও সুদে অর্থলগ্নির ব্যবসা শুরু করেন। তাঁর সুদের হার ছিল অত্যন্ত উচ্চ; প্রতি রুপি ঋণে দৈনিক এক পয়সা সুদ আদায় করা হতো, যা চক্রবৃদ্ধিহারে বিপুল অঙ্কে পরিণত হতো।
পরবর্তী সময়ে মথুরানাথের উত্তরসূরিরা—রূপলাল দাস, রঘুনাথ দাস ও মোহিনী মোহন দাস—ঢাকার প্রভাবশালী জমিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও মহাজনি কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন। জমিদারি আয় ও ঋণব্যবস্থা পরস্পরকে শক্তিশালী করত, ফলে অর্থনৈতিক ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত হয়।
উনিশ ও বিশ শতকের ঢাকায় বলরাম, স্বরূপচন্দ্র, মধুসূদন, প্রসন্নকুমার, বংশীচন্দ্র সেন, লালমোহন, ব্রজরঞ্জন সিং ও লালা মৃত্যুঞ্জিত সিংয়ের মতো পোদ্দাররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৭৯৪ সালের একটি সরকারি প্রতিবেদনে ঢাকায় প্রায় ৪৬৪টি পোদ্দার, মহাজন ও ব্যাংকার পরিবারের অস্তিত্বের উল্লেখ পাওয়া যায়, যাদের অধিকাংশই ছিল হিন্দু ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত।
গ্রামীণ ও নগর অর্থনীতিতে কড়ি ছিল ক্ষুদ্র লেনদেনের প্রধান মাধ্যম। সিলেট অঞ্চলে এমনকি রাজস্বও কড়িতে আদায় হতো। ১৭৭০ সালে ডাচ পর্যটক স্টাভোরিনাস বাংলার দৈনন্দিন জীবনে কড়ির ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ করেন। শ্রমিকদের মজুরি কড়িতে প্রদান করা হতো এবং বড় হাটগুলোয় পোদ্দারেরা কড়ির বাণিজ্য পরিচালনা করতেন। সিলেটের নিজস্ব হিসাবব্যবস্থাও ছিল। ১৭৭৮ সালে সেখানে নিযুক্ত রেসিডেন্ট রবার্ট লিন্ডসে উল্লেখ করেন, সিলেটে তখন রৌপ্য বা তাম্রমুদ্রার প্রচলন প্রায় অনুপস্থিত ছিল। হিসাবের ধারা ছিল—৪ কড়ি = ১ গন্ডা, ৫ গন্ডা = ১ বুড়ি, ৪ বুড়ি = ১ পণ, ৪ পণ = ১ আনা, ৪ আনা = ১ কাহন এবং ১০ কাহন = ১ টাকা। তবে ১৮২০ সালের পর ধীরে ধীরে কড়ির প্রচলন বিলুপ্ত হয়।
আসাম অঞ্চলেও ঢাকার অনুরূপ বহুমুদ্রাব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল, যেখানে ব্রিটিশ মুদ্রা, নারায়ণী মুদ্রা, আর্কট, সিক্কা ও রাজা-মোহরি একসঙ্গে চলত। এতে বিনিময়মূল্য নির্ধারণে বাট্টার হার অঞ্চলভেদে ভিন্নতা পেত।
জেমস টেলরের টপোগ্রাফি অব ঢাকা থেকে জানা যায়, পরবর্তী সময়ে আর্কট মুদ্রা বাতিল এবং সুদের হার নিয়ন্ত্রণ (১২ শতাংশ নির্ধারণ) সংক্রান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ফলে মুদ্রা বিনিময় ও মহাজনি ব্যবসায় মন্দা দেখা দেয়। পোদ্দারদের কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ে মূলত হুন্ডি ও বন্ধকি ব্যবসায়। ঢাকার অর্থনৈতিক ইতিহাসে তাঁদের প্রভাবের স্মারক হিসেবে ‘টাকার হাট’ ও ‘মহাজনপুর’ এলাকার নাম আজও বিদ্যমান, যেখানে একসময় মুদ্রা বিনিময়, ঋণ প্রদান এবং স্বর্ণ-রৌপ্য বন্ধক রাখার কার্যক্রম চলত।
সামগ্রিকভাবে ঢাকার এই মুদ্রা বিনিময়ব্যবস্থা কেবল অর্থনৈতিক কাঠামোর অংশ ছিল না; বরং এটি একটি সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস, ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস এবং নতুন নগর সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছিল, যার কেন্দ্রে ছিল পোদ্দার শ্রেণির উত্থান ও মহাজনি অর্থনীতির বিস্তার।
ইউরোপীয় ব্যাংকের আবির্ভাব ও দ্বৈত ব্যাংকিং ব্যবস্থা
বাংলায় আধুনিক ব্যাংকিংয়ের ইতিহাসে ইউরোপীয় ব্যাংকের আবির্ভাব ছিল এক যুগান্তকারী ঘটনা। আঠারো শতকের শেষভাগে বাংলায় যে দ্বৈত ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তা ঔপনিবেশিক অর্থনীতির দ্বিমুখী চরিত্রকে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করে। একদিকে ছিল দেশীয় মহাজনি, হুন্ডি ও পোদ্দারনির্ভর আর্থিক কাঠামো; অন্যদিকে ইউরোপীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা। বিদেশি বণিক ও কোম্পানিগুলো মূলধনের জন্য দেশীয় ব্যাংকারদের ওপর নির্ভর না করে ইউরোপীয় এজেন্সি হাউস ও ব্যাংকের সহায়তা নিতে শুরু করে। ফলে বৃহৎ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আর্থিক নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে কলকাতাকেন্দ্রিক কয়েকটি ইউরোপীয় ব্যাংকের উত্থান ঘটে—ব্যাংক অব হিন্দুস্তান (১৭৭০), বেঙ্গল ব্যাংক (১৭৮৪) এবং জেনারেল ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (১৭৮৬)। এদের কার্যক্রম মূলত ইউরোপীয় বহির্বাণিজ্য ও সরকারি আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হতো। বিশেষত ব্যাংক অব হিন্দুস্তান কার্যত আলেকজান্ডার অ্যান্ড কোং-এর আর্থিক শাখা হিসেবেই কাজ করত।
ইউরোপীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল সীমিত দায়ভিত্তিক শেয়ার কাঠামো, ব্যাংক নোট প্রচলন এবং স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক ও সরকারি ঋণপত্রে বিনিয়োগ। কিছু ক্ষেত্রে তাদের নোট সরকারি স্বীকৃতিও পায়, যদিও এর ব্যবহার মূলত কলকাতার বাণিজ্যিক পরিসরেই সীমাবদ্ধ ছিল। গভর্নর জেনারেল কর্নওয়ালিশের পৃষ্ঠপোষকতায় কয়েকটি ব্যাংক সরকারি রাজস্ব গ্রহণের সুবিধা পেলেও তাদের আর্থিক ভিত্তি ছিল দুর্বল। বিপরীতে দেশীয় ব্যাংকাররা হুন্ডি, সুদভিত্তিক ঋণ ও ব্যবসা-আর্থিক মিশ্র কাঠামোর মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখে।
তবে ১৭৮৭-৮৮ সালের মুদ্রাসংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বাজার অনিশ্চয়তার অভিঘাতে ১৭৯১ সালে জেনারেল ব্যাংক অব ইন্ডিয়া ও বেঙ্গল ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায়। কেবল ব্যাংক অব হিন্দুস্তান ১৮৩২ সাল পর্যন্ত টিকে থাকতে সক্ষম হয়। এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও স্থিতিশীল আর্থিক ভিত্তি ছাড়া আধুনিক ব্যাংকিং দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।
আধুনিক ব্যাংকিংয়ের বিকাশ, মহামন্দা ও কাঠামোগত সংকট
ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার অর্থনীতিতে আধুনিক ব্যাংকিংয়ের বিস্তার নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করলেও এর ভিত ছিল অনিশ্চিত। ঔপনিবেশিক বাণিজ্যের সম্প্রসারণ, জমিদারি অর্থনীতি এবং দেশীয় পুঁজির বিকাশের সংযোগস্থলে প্রাথমিক ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্ম হয়। কিন্তু দুর্বল আর্থিক কাঠামো, সীমিত জন–আস্থা এবং বৈষম্যমূলক ঔপনিবেশিক অর্থনীতি এসব প্রতিষ্ঠানের স্থায়িত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।
১৮২৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ইউনিয়ন ব্যাংক ছিল দেশীয় উদ্যোগভিত্তিক প্রথম দিককার গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকগুলোর একটি। জমিদার, ব্যবসায়ী ও ধনী হিন্দুসমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা এই ব্যাংকের লক্ষ্য ছিল ঋণ প্রদান, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং আর্থিক লেনদেনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। কিন্তু দুর্বল ব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত ঋণ বিতরণ, জল্পনামুখী বিনিয়োগ এবং ঔপনিবেশিক বাজারের অস্থিরতার কারণে ব্যাংকটি দ্রুত সংকটে পড়ে। দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর ১৮৪৮ সালে এর পতন ঘটে, যার অভিঘাত দেশীয় ব্যবসায়ী ও জমিদারসমাজেও গভীর প্রভাব ফেলে।
ঢাকায় আধুনিক ব্যাংকিংয়ের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় ১৮৪৬ সালে ঢাকা ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ইউরোপীয় নীলকর, ব্রিটিশ কর্মকর্তা ও দেশীয় জমিদারদের যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই ব্যাংক নগর অর্থনীতিতে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিংয়ের নতুন ধারা সূচনা করে। এর ফলে সনাতনী লগ্নিকারী ও পোদ্দার শ্রেণির একচেটিয়া প্রভাব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। তবে সীমিত মূলধন, শেয়ারহোল্ডারদের অনাগ্রহ এবং দুর্বল আর্থিক ভিত্তির কারণে ১৮৫৬ সালেই ব্যাংকটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরে ১৮৬২ সালে ব্যাংক অব বেঙ্গল ঢাকা ব্যাংক অধিগ্রহণ করে ঢাকায় শাখা স্থাপন করলে সরকারি রাজস্ব আদায় ও বৃহৎ বাণিজ্যিক লেনদেনে ঢাকার গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়।
এতৎসত্ত্বেও আধুনিক ব্যাংকিং সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। গ্রামীণ ও শহুরে অর্থনীতিতে তখনো পোদ্দার, মহাজন ও ঐতিহ্যগত ঋণদাতাদের প্রভাব ছিল প্রবল। ব্যক্তিগত সম্পর্কনির্ভর মহাজনি ঋণব্যবস্থা ছিল সহজ ও দ্রুত; ফলে আধুনিক ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হলেও অর্থনৈতিক জীবনের বড় অংশ দীর্ঘদিন সনাতনী আর্থিক কাঠামোর অধীনই থেকে যায়।
ঔপনিবেশিক শাসনের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকিং আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে শুরু করে। ১৮৬০ সালের মধ্যে অবিভক্ত ভারতে ৪৪টি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়, যদিও অধিকাংশই ছিল ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রণাধীন। ভারতীয় অংশীদারত্বে প্রতিষ্ঠিত আল্লাহাবাদ ব্যাংক (১৮৬৫) দেশীয় ব্যাংকিংয়ের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। পরবর্তী সময়ে অ্যালায়েন্স ব্যাংক অব সিমলা (১৮৭৪), আউধ কমার্শিয়াল ব্যাংক (১৮৮১), পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংক (১৮৯৪) ও পিপলস ব্যাংক অব লাহোর (১৯০১) প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বদেশি আন্দোলনের উত্থান দেশীয় মালিকানাধীন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রবণতাকে আরও জোরদার করে।
দেশীয় ব্যাংকিং ধারার উত্তরসূরি হিসেবে পরবর্তী সময়ে কিছু বিশেষায়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠানও গড়ে ওঠে। ১৯১২ সালে পুনেতে প্রতিষ্ঠিত ‘হীরা অ্যান্ড ব্রোস ব্যাংকার্স’ যুদ্ধকালে সামরিক কর্মকর্তাদের চেকের বিপরীতে অর্থ প্রদান ও আর্থিক লেনদেন সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ প্রসঙ্গে প্রশাসক ও চিন্তাবিদ আলফ্রেড কমিন লায়াল মন্তব্য করেন যে আঠারো শতকে ভারতজুড়ে এক উদ্যমী ব্যবসায়ী সম্প্রদায় বিনিময়ব্যবস্থাকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করত।
তবে এই বিকাশের মধ্যেও ব্যাংকিং খাত স্থিতিশীল ভিত্তি অর্জন করতে পারেনি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৯) উপমহাদেশের আর্থিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। এর পরপরই ১৯২৯-৩০ সালের বৈশ্বিক মহামন্দা ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে গভীর সংকটে নিমজ্জিত করে। অর্থনীতিবিদ ড. আর এম দেবনাথের তথ্যমতে, ১৯১৩ থেকে ১৯১৭ সালের মধ্যে অবিভক্ত ভারতে ৭৮টি ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায়। ১৯২২ থেকে ১৯৩২ সালের মধ্যে আরও ৩৭৩টি ব্যাংকের পতন ঘটে। এ সংকট মোকাবিলায় ১৯৩৫ সালে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং ১৯৪৭ সালের দেশভাগ ব্যাংকিং খাতকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে। পুঁজি স্থানান্তর, আমানতসংকট এবং ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তার কারণে ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৮ সালের মধ্যে আরও ৬২০টি ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায়।
এই ধারাবাহিক বিপর্যয়ের পেছনে শুধু বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা নয়, ব্যাংকিং কাঠামোর অন্তর্নিহিত দুর্বলতাও দায়ী ছিল। কার্যকর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের অভাব, দুর্বল আইনগত ভিত্তি, অপর্যাপ্ত সরকারি তদারকি এবং ভঙ্গুর মূলধনকাঠামো ব্যাংকগুলোর স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল সীমাহীন দায়ভিত্তিক মালিকানাব্যবস্থা, ফাটকাবাজিমুখী বিনিয়োগ, নিরাপদ বিনিয়োগক্ষেত্রের সীমাবদ্ধতা এবং কিছু ব্যাংক-মালিক ও কর্মচারীর জালিয়াতি এবং অর্থ আত্মসাতের ঘটনা। ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে।
অতএব বাংলায় আধুনিক ব্যাংকিংয়ের ইতিহাস কেবল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিকাশের ইতিহাস নয়; এটি ঔপনিবেশিক অর্থনীতির সীমাবদ্ধতা, দেশীয় পুঁজির সংগ্রাম, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট এবং দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সম্মিলিত প্রতিচ্ছবি। এ অভিজ্ঞতাই পরবর্তীকালে দক্ষিণ এশিয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং, আর্থিক নিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্রীয় তদারকির প্রয়োজনীয়তাকে আরও সুস্পষ্ট করে তোলে।
ঔপনিবেশিক বাংলায় তফসিলি ও অতফসিলি ব্যাংকের বিকাশ
১৯৩৮ সালের ডিসেম্বরে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পাঁচ লাখ টাকার কম মূলধন ও রিজার্ভসম্পন্ন অতালিকাভুক্ত ব্যাংকের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৪২১। এর মধ্যে বাংলা প্রদেশেই ছিল ৯৮৮টি, মাদ্রাজে ২৫২টি, যা বাংলায় ক্ষুদ্র ব্যাংকিং উদ্যোগের ব্যাপক বিস্তারের সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের সব কটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক ব্যাংক ছিল না; প্রায় ৬২৬টি প্রতিষ্ঠান চেকের মাধ্যমে উত্তোলনযোগ্য আমানত গ্রহণ করত। ১৯৩৬ সালের ব্যাংকিং আইন কার্যকর হওয়ার পর ব্যাংকিং খাতে নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে ওঠে এবং কার্যক্রম ধীরে ধীরে অধিক শৃঙ্খলাবদ্ধ রূপ লাভ করে। এ সময় থেকেই ব্যাংকগুলো প্রধানত তফসিলি ও অতফসিলি—এ দুই শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে পরিচালিত হতে থাকে।
তফসিলি বা তালিকাভুক্ত ব্যাংক হলো সেসব ব্যাংক, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (যেমন বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক) নিয়মকানুন মেনে চলে এবং তাদের নির্দিষ্ট তালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকে। এগুলোকে শিডিউলড ব্যাংকও বলা হয়। সেকালে তফসিলি বলতে সেসব ব্যাংককে বোঝানো হতো, যেগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্বিতীয় তফসিলে অন্তর্ভুক্ত এবং সরকারি গেজেটে ঘোষিত ছিল। এদের প্রধান কাজ ছিল চলতি, সঞ্চয়ী ও স্থায়ী আমানত গ্রহণ এবং স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্য ও শিল্প খাতে অর্থায়ন করা। যথাযথ জামানতের ভিত্তিতে ক্যাশ ক্রেডিট, ওভারড্রাফট ও ঋণ হিসাব পরিচালিত হতো। কৃষিজ পণ্যের বিপণনেও তারা অর্থ জোগাত, যদিও এই অর্থায়ন মূলত বৃহৎ জমিদার, ব্যবসায়ী ও চা-বাগানের মালিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সুদের হার অঞ্চল ও প্রতিষ্ঠানভেদে ভিন্ন হতো এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতির সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ সামঞ্জস্য সব সময় বজায় থাকত না। কিছু তফসিলি ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের জন্য পৃথক বিভাগও ছিল, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সহায়ক ভূমিকা পালন করত।
অন্যদিকে অতফসিলি ব্যাংক ছিল কেন্দ্রীয় তফসিলের বাইরে অবস্থানকারী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। প্রচলিত ধারণায় এদের মূলধন তুলনামূলকভাবে কম হলেও বাস্তবে অনেক অতফসিলি ব্যাংক আর্থিক স্থিতি ও জনবিশ্বাসের ক্ষেত্রে দৃঢ় অবস্থান গড়ে তুলেছিল। বাংলার লোন অফিস, সমবায় ব্যাংক এবং দেশীয় মহাজন বা ব্যাংকাররা এই পরিসরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। আমানত ও ঋণের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও গ্রামীণ অর্থনীতি, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও স্থানীয় বাণিজ্যে তাদের প্রভাব ছিল অত্যন্ত গভীর ও কার্যকর। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক, আঞ্চলিক বাজার সম্পর্কে অভিজ্ঞতা এবং দ্রুত ঋণ প্রদানের সক্ষমতার কারণে এসব প্রতিষ্ঠান বহু ক্ষেত্রে গ্রামীণ অর্থনীতির প্রধান অর্থনৈতিক অবলম্বনে পরিণত হয়েছিল।
ঔপনিবেশিক পূর্ব বাংলার ব্যাংকিং খাত একদিকে ইউরোপীয় প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণে বিকশিত হলেও অন্যদিকে দেশীয় উদ্যোগ, স্থানীয় প্রয়োজন ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েই নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য নির্মাণের প্রয়াস চালিয়েছে। ১৯৪৭ সালের আগে ঢাকায় স্থায়ী ও পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক ব্যাংকের অনুপস্থিতি তৎকালীন আর্থিক অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং প্রাদেশিক অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতার একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ঔপনিবেশিক বাংলায় লোন অফিসের আবির্ভাব
বাংলায় লোন অফিসের আবির্ভাব ছিল ঔপনিবেশিক অর্থনীতির এক অনিবার্য পরিণতি। ১৮৬৫ সালে প্রথম লোন অফিস প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে যে ধারার সূচনা ঘটে, তা দ্রুতই গ্রাম ও মফস্সলের আর্থিক জীবনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। ১৯২৯-৩০ সালের প্রভিন্সিয়াল ব্যাংকিং এনকোয়ারি কমিটি রিপোর্টে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে গ্রামীণ ও নগরাঞ্চলের ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতাদের প্রয়োজন পূরণের উদ্দেশ্যেই এসব প্রতিষ্ঠানের উত্থান। দেশীয় মহাজনি প্রথা ও আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মধ্যবর্তী এক কার্যকর সেতুবন্ধ হিসেবেই লোন অফিসগুলো আত্মপ্রকাশ করেছিল।
ঔপনিবেশিক বাংলায় সরকারি ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছিল সীমিত এবং সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। কৃষক, কারিগর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নিম্নমধ্যবিত্ত গৃহস্থদের জন্য দ্রুত নগদ অর্থের সহজলভ্য কোনো উৎস ছিল না। এ বাস্তবতায় লোন অফিসগুলো স্বল্প কাগজপত্র, সহজ শর্ত এবং দ্রুত ঋণ প্রদানের সুবিধা দিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করে। আমানত গ্রহণ ও ঋণ বিতরণই ছিল তাদের প্রধান কার্যক্রম। কিন্তু এ সুবিধার অন্তরালে লুকিয়ে ছিল উচ্চ সুদের কঠোর বাস্তবতা। অনেক ক্ষেত্রে সুদের হার ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাত; তার সঙ্গে যুক্ত হতো গোপন খরচ, যৌগিক সুদ এবং কঠোর আদায়নীতি। ফলে অসংখ্য ঋণগ্রহীতা ধীরে ধীরে ঋণের জালে আবদ্ধ হয়ে পড়তেন।
লোন অফিসগুলোর পরিচালনকাঠামো ছিল বৈচিত্র্যময়। কিছু প্রতিষ্ঠান প্রাদেশিক আইনের অধীন নিবন্ধিত হলেও অনেকগুলো স্বাধীনভাবে কিংবা সমবায়ের কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত থেকে পরিচালিত হতো। কিন্তু কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার অভাবে তদারকি ছিল দুর্বল এবং আর্থিক শৃঙ্খলার পরিবর্তে মুনাফাকেন্দ্রিক প্রবণতাই ক্রমে প্রাধান্য লাভ করে।
অর্থনীতিবিদ এস কে মুরঞ্জন তাঁর মডার্ন ব্যাংকিং ইন ইন্ডিয়া (১৯৪৫) গ্রন্থে বাংলার লোন অফিসগুলোর একটি সুসংবদ্ধ চিত্র তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির উত্থান-পতনের সঙ্গে লোন অফিসের বিস্তার নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত ছিল। ১৯২৯ সালের মার্চ মাসে বাংলায় সক্রিয় লোন অফিসের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭৮২; এর মধ্যে প্রায় ৪০০টি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে ১৯২৫-২৬ সালের পর। এই দ্রুত বিস্তার ছিল ঔপনিবেশিক বাংলায় ঋণনির্ভর বাজার অর্থনীতির সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগ-আশাবাদের প্রত্যক্ষ প্রতিফলন।
লোন অফিসগুলোর মূলধন ছিল স্বল্প ও সীমিত। মাত্র পাঁচটির মূলধন এক লাখ টাকার বেশি এবং তিনটি ঠিক এক লাখ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ফলে তাদের টিকে থাকার প্রধান ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায় আমানতনির্ভর কার্যকর তহবিল। সমকালীন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৩৮১টি লোন অফিসের মধ্যে মাত্র ১৫টির কার্যকর তহবিল ছিল ১০ লাখ টাকার ওপরে, আর ১৯৯টির ক্ষেত্রে তা নেমে আসে ৫০ হাজার টাকার নিচে। সব মিলিয়ে তাদের মোট কার্যকর তহবিল প্রায় ৯ কোটি টাকার কাছাকাছি ছিল। সংগৃহীত অর্থের উল্লেখযোগ্য অংশ তারা প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকে, বিশেষত বেঙ্গল ন্যাশনাল ব্যাংক ও বেঙ্গল সেন্ট্রাল ব্যাংকে আমানত হিসেবে রাখত।
এ প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানতকাঠামো ছিল মূলত স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি। অধিকাংশ আমানতের মেয়াদ পাঁচ বছরের কম এবং এক মাসের নোটিশে উত্তোলনযোগ্য ছিল। সুদের হার সাধারণত ৪ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে থাকলেও প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অস্বাভাবিক উচ্চ সুদের প্রতিশ্রুতি এবং দালালনির্ভর আমানত সংগ্রহের প্রবণতা দেখা দেয়। এতে আর্থিক ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
সমকালীন সংবাদপত্র ও পত্রিকায় এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা পাওয়া যায়। ব্যবসা ও বাণিজ্য পত্রিকার সপ্তম বর্ষে প্রকাশিত ‘ভারতে জয়েন্ট স্টক কোম্পানী’ শীর্ষক নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়, ১৯২৬ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে নিবন্ধিত ১০৭টি কোম্পানির মধ্যে ৫৬টি ছিল বাংলাদেশে, যার ৩০টি কেবল ঋণ ও সুদভিত্তিক কার্যক্রমে নিয়োজিত। সমালোচকদের ভাষায়, এসব প্রতিষ্ঠান কার্যত ‘টাকা দাদন দিয়া সুদ খাওয়া’র যন্ত্রে পরিণত হয়েছিল; অর্থাৎ সংগঠিত মহাজনিব্যবস্থার আধুনিক রূপ।
তবে একই সঙ্গে যৌথ মূলধনি উদ্যোগ ও বাণিজ্যিক সংগঠনের সম্ভাবনাও এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কিছুটা সম্প্রসারিত হয়। ফলে পূর্ববঙ্গের গ্রামীণ অর্থনীতি ধীরে ধীরে একটি ঋণনির্ভর কাঠামোয় রূপ নেয়, যেখানে অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি ঋণের সম্পর্কও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের শক্তিশালী উপাদান হয়ে ওঠে।
পূর্ববঙ্গে লোন কোম্পানির আঞ্চলিক বিস্তার
ব্রিটিশ শাসনামলে পূর্ববঙ্গে লোন কোম্পানিগুলো দ্রুত শক্তিশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে নাসিরাবাদ, যশোর, মুন্সিগঞ্জ, সিলেট, পাবনা, কিশোরগঞ্জ, নোয়াখালী, খুলনা, মাদারীপুর, টাঙ্গাইল, নীলফামারীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এসব প্রতিষ্ঠানের বিস্তার ঘটে। কৃষিনির্ভর ও বাণিজ্যপ্রবণ অঞ্চলে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিংয়ের সীমাবদ্ধতার কারণে লোন কোম্পানিগুলোই দ্রুত নগদ অর্থের প্রধান উৎসে পরিণত হয়। ফলে একদিকে তারা স্থানীয় অর্থনীতিতে তারল্য সরবরাহ করে, অন্যদিকে জয়েন্ট-স্টক কাঠামোর মাধ্যমে আধুনিকীকৃত দাদনি অর্থনীতিকেই নতুন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।
আব্দুল হান্নান চৌধূরী তাঁর ‘ভারতীয় ব্যাঙ্কিং ও মুছলমান’ (১৯৪০) গ্রন্থে এসব প্রতিষ্ঠানের কঠোর সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, বাংলার লোন কোম্পানিগুলো প্রকৃত আধুনিক ব্যাংকে রূপান্তরিত হতে পারেনি; বরং সংঘবদ্ধ মহাজনি ব্যবস্থাকেই নতুন অবয়বে টিকিয়ে রেখেছিল। ত্রিপুরা, ফরিদপুর, বরিশাল, বগুড়া ও ঢাকা ছিল প্রাচীন লোন কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। প্রাথমিক পর্যায়ে তাদের মূলধন সীমিত হলেও পরবর্তীকালে তা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ১৯৩৩ সালে প্রায় ৮০০ এবং ১৯৩৫ সালে প্রায় ৫০০ প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বের উল্লেখ পাওয়া যায়।
কিন্তু বৈশ্বিক অর্থমন্দা তাদের ভিতকে দুর্বল করে দেয়। স্বল্প সুদে আমানত গ্রহণ করে উচ্চ সুদে ঋণদান, স্বর্ণ-রৌপ্য বন্ধক রাখা এবং দ্রুত নিলামের মাধ্যমে ঋণ আদায় ছিল তাদের সাধারণ পদ্ধতি। হান্নান চৌধূরীর ভাষায়, এ ধরনের সংকীর্ণ ব্যাংকিং ব্যবস্থা বিলুপ্ত হলেও সমাজে বিশেষ অনুশোচনা সৃষ্টি হতো না।
তবে লোন কোম্পানির চরিত্র ছিল বহুমাত্রিক। ১৮৭৮ সালে ঢাকায় শিক্ষিত মধ্যবিত্তের উদ্যোগে একটি যৌথ মূলধনী লোন কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল উচ্চ সুদি প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ শোষণের বিকল্প তৈরি করা। ১ লাখ রুপি মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত জন–আস্থা অর্জন করে এবং পরবর্তীকালে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও গৃহস্থের পাশাপাশি জমিদার ও পেশাজীবীদের কাছেও ঋণ বিতরণ শুরু করে।
ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুনের ‘উনিশ শতকের পূর্ববঙ্গের সমাজ’ গ্রন্থে ১৮৭১ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ময়মনসিংহ লোন অফিস লিমিটেড’-এর উল্লেখ রয়েছে। এতে অনুমান করা যায় যে পূর্ববঙ্গে লোন অফিসধর্মী প্রতিষ্ঠান উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধেই প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি লাভ করেছিল।
তারল্যসংকট মোকাবিলায় লোন অফিস প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ ছিল ‘রংপুর লোন অফিস’। ১৯০৭ সালে রংপুর টোব্যাকো কোম্পানি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকঋণ না পেয়ে নিজস্ব ঋণপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটি গড়ে তোলে। একইভাবে যশোর ও বগুড়া লোন কোম্পানিও মফস্সলের বৃহৎ ঋণপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এসব প্রতিষ্ঠান শুধু তাৎক্ষণিক ঋণদাতা ছিল না; স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পোদ্যোগ ও আঞ্চলিক অর্থনীতির বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
লোন কোম্পানির কার্যপরিধি যে শিল্পপুনর্গঠন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল, তারও প্রমাণ পাওয়া যায়। ১৯৪০ সালের ২২ জানুয়ারি প্রকাশিত আর্থিক জগৎ পত্রিকায় চট্টগ্রাম লোন কোম্পানির পুনর্গঠনের বিবরণ প্রকাশিত হয়। সেখানে জানা যায়, হাইকোর্টের নির্দেশে পাওনাদারদের সভা আহ্বান করা হয় এবং ইস্টার্ন মার্চেন্টস লিমিটেড আড়াই লাখ টাকা প্রদানের শর্তে দেশপ্রিয় কটন মিল পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণে সম্মত হয়। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে লোন কোম্পানিগুলো শুধু ব্যক্তিগত ঋণদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন ও আর্থিক পুনরুজ্জীবনেও তারা সক্রিয় ভূমিকা পালন করত।
নিখিল বঙ্গীয় ব্যাংক সংঘ এবং প্রস্তাবিত ফেডারেল ব্যাংকের উদ্যোগ
এই উদ্যোগ বঙ্গদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণের প্রতিফলন। ১৯২৮ সালে ব্যবসা ও বাণিজ্য পত্রিকার ফাল্গুন সংখ্যায় প্রকাশিত ‘নিখিল বঙ্গীয় ব্যাংক সংঘ’ শীর্ষক নিবন্ধে তৎকালীন ব্যাংকিং জগতে উদীয়মান এক সমবেত প্রয়াসের বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায়। ওই বছরের ২৮ ও ২৯ ডিসেম্বর কলকাতায় বেঙ্গল সেন্ট্রাল ব্যাংকের কার্যালয়ে বঙ্গীয় ব্যাংক ও লোন অফিসসমূহের প্রতিনিধিদের এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনেই ‘নিখিল বঙ্গীয় ব্যাংক সংঘ’ গঠনের পাশাপাশি একটি প্রস্তাবিত ‘ফেডারেল ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, যা দেশীয় আর্থিক শক্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার এক সচেতন ও সংগঠিত উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই প্রয়াস পরিচালনার জন্য ৯ সদস্যবিশিষ্ট একটি অস্থায়ী কমিটি গঠিত হয়। এতে মফস্সলের বিভিন্ন লোন অফিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বেঙ্গল সেন্ট্রাল ব্যাংক ও মহালক্ষ্মী ব্যাংকের প্রতিনিধি, নর্থ বেঙ্গল ব্যাংকের সুপার, হিন্দুস্থান কো-অপারেটিভ ব্যাংকের পরিচালক এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালকাটার অধ্যাপক হরিশ্চন্দ্র সিংহ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। অধ্যাপক সিংহকে সম্পাদক এবং রংপুর লোন অফিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অতুলকৃষ্ণ রায়কে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়, যা উদ্যোগটির সাংগঠনিক দৃঢ়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিকে আরও সুসংহত করে।
উদ্যোক্তাদের প্রচারপত্রে স্বীকার করা হয় যে বঙ্গদেশের লোন অফিসগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রচেষ্টা পূর্বেও গ্রহণ করা হয়েছিল, কিন্তু তা সফল হয়নি। সেই ব্যর্থতার মূল কারণ হিসেবে দুটি বিষয় বিশেষভাবে চিহ্নিত হয়। প্রথমত, মফস্সল থেকে সংগৃহীত মূলধন কলকাতাকেন্দ্রিক ঋণবণ্টনে ব্যবহৃত হবে—এই আশঙ্কা স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস সৃষ্টি করেছিল। দ্বিতীয়ত, সঞ্চিত মূলধনের ওপর স্থানীয় অংশীদারদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার কোনো সুস্পষ্ট কাঠামো ছিল না। এই অভিজ্ঞতা থেকেই উদ্যোক্তারা উপলব্ধি করেন যে আঞ্চলিক স্বার্থ ও নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে স্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য কাঠামো ছাড়া কোনো সমবেত উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। ফলে প্রস্তাবিত ফেডারেল ব্যাংকের পরিকল্পনায় লোন অফিসগুলোর অংশীদারত্ব ও নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্রীয় নীতিতে পরিণত করা হয়, যাতে কেন্দ্র ও মফস্সলের সম্পর্ক পারস্পরিক আস্থা ও স্বার্থের ভারসাম্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল এমন একটি আর্থিক কেন্দ্র গড়ে তোলা, যা কলকাতার অর্থবাজার থেকে তুলনামূলক স্বল্পসুদে মূলধন সংগ্রহ করে মফস্সলভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা প্রদান করবে। ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা অর্জিত হলে আরও অনুকূল শর্তে নগরভিত্তিক উৎস থেকে মূলধন সংগ্রহের সম্ভাবনাও কল্পনা করা হয়। এর মাধ্যমে মূলধনের সুষম প্রবাহ নিশ্চিত করে মফস্সলের আর্থিক কাঠামোকে শক্তিশালী করার একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গড়ে ওঠে।
তবে এ সময়ের অর্থনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত ছিল গভীর অনিশ্চয়তায় আচ্ছন্ন। ১৯২৭ সালে বেঙ্গল ন্যাশনাল ব্যাংকের পতনের পর বাঙালি-পরিচালিত ব্যাংকগুলোর ওপর জন–আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক লোন অফিস জমিদারি বন্ধক ও স্থাবর সম্পত্তিনির্ভর দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বিতরণের কারণে তীব্র তারল্যসংকটে পড়ে। কাগজে-কলমে সম্পদের পরিমাণ যথেষ্ট হলেও নগদ অর্থের ঘাটতি তাদের স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন করে তোলে। ফলে আকস্মিক আমানত প্রত্যাহারের চাপ সামাল দেওয়ার সক্ষমতা অনেক প্রতিষ্ঠানেরই ছিল না। এই পরিস্থিতিতে সমগ্র ব্যবস্থার ওপর আস্থাহীনতা আরও গভীর হয়ে ওঠে এবং একটি সমন্বিত কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য হয়ে পড়ে।
এই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯২৯ সালে ‘ব্যবসা ও বাণিজ্য’ পত্রিকার নবম বর্ষের পঞ্চম সংখ্যায় নিখিল বঙ্গীয় ব্যাংক ও লোন অফিস সম্মেলনে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের অভিভাষণ প্রকাশিত হয়। তাঁর বক্তব্য উদ্যোগটিকে কেবল আর্থিক নয়, বরং বৌদ্ধিক ও নৈতিক সমর্থনও প্রদান করে। দেশীয় পুঁজি সংগঠন, আঞ্চলিক স্বার্থ সংরক্ষণ এবং সুশাসিত ব্যাংক কাঠামো প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তাঁর বিশ্লেষণ এই উদ্যোগকে বৃহত্তর জাতীয় অর্থনৈতিক বিতর্কের পরিসরে স্থাপন করে।
পরবর্তী সময়ে ১৯৩৫ সালে ঢাকায় ফেডারেল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বাস্তব রূপ নিতে শুরু করে। ওই বছরের ২৯ ডিসেম্বর ঢাকা প্রকাশ পত্রিকায় উল্লেখ করা হয় যে ২৭ নভেম্বর ৩ নম্বর জনসন রোডে ঢাকা ফেডারেল ব্যাংক লিমিটেডের কার্যালয় উদ্বোধন করা হয়, যেখানে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। পরিচালকদের দায়িত্বশীলতা জন–আস্থা পুনর্গঠনে সহায়ক হবে, এমন প্রত্যাশাও ব্যক্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৩৭-৩৮ সালের ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার জয়েন্ট স্টক কোম্পানির তালিকায় ঢাকা ফেডারেল ব্যাংকের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়া এই উদ্যোগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও কার্যকর বাস্তবায়নের সাক্ষ্য বহন করে।
লোন অফিসগুলোর পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা অতিক্রম করে একটি সমন্বিত আর্থিক কাঠামো নির্মাণের যে প্রয়াস ১৯২৮ সালের সম্মেলন থেকে শুরু হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। এই উদ্যোগের পেছনে ছিল মফস্সলভিত্তিক আর্থিক শক্তিকে সংগঠিত করা এবং কেন্দ্রীয় মূলধন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা।
এই ইতিহাস নিছক ব্যাংকিং বিকাশের বিবরণ নয়; বরং এটি ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস, শ্রেণিসংঘাত এবং ঔপনিবেশিক পুঁজির বিস্তারের এক গভীর রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রতিচ্ছবি।
পূর্ববঙ্গে দেশীয় ব্যাংকিং: ঔপনিবেশিক আমল
বিশ্বব্যাপী মহামন্দার অভিঘাতে বাংলার পল্লি অঞ্চলের বহু লোন অফিস কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। তবে এই সংকটই এক নতুন আর্থিক রূপান্তরের পথ উন্মোচন করে। লোন কোম্পানির অভিজ্ঞ উদ্যোক্তাদের একাংশ তখন কেবল ঋণদান ব্যবসায় সীমাবদ্ধ না থেকে পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকিং কার্যক্রমে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁদের উদ্যোগে গড়ে ওঠে কুমিল্লা ইউনিয়ন ব্যাংক এবং কুমিল্লা ব্যাংকিং করপোরেশনের মতো প্রতিষ্ঠান, যা পূর্ববঙ্গের বাণিজ্য সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে এই উত্তরণ সম্পূর্ণ মসৃণ ছিল না। সুশাসনের অভাব, পেশাদার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধতার কারণে বহু ক্ষুদ্র ব্যাংক দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি। কিছু প্রতিষ্ঠান আবার ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি পণ্য বাণিজ্যেও সম্পৃক্ত ছিল। ফলে তাদের কার্যক্রমে ‘ব্যাংকিং ও ট্রেডিং’-এর এক দ্বৈত চরিত্র গড়ে ওঠে। কিন্তু পরবর্তীকালে আইনগত বিধিনিষেধ ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কঠোর হলে ট্রেডিং কার্যক্রম ধীরে ধীরে পৃথক বা বিলুপ্ত করতে হয়। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান প্রকৃত ব্যাংকিং কার্যক্রমে অধিক মনোযোগী হয়ে ওঠে এবং দেশীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা ক্রমে আরও প্রাতিষ্ঠানিক, নিয়ন্ত্রিত ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোর দিকে অগ্রসর হয়।
পূর্ববঙ্গের ব্যাংকিং বিকাশের ইতিহাস বুঝতে হলে অবিভক্ত ভারতের বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ ছিল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ঔপনিবেশিক শোষণ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বাজার অনিশ্চয়তার যুগ। এই বহুমাত্রিক সংকটের প্রত্যক্ষ প্রভাব পূর্ববঙ্গের আর্থিক কাঠামোতেও প্রতিফলিত হয়। তবু কিছু তফসিলভুক্ত দেশীয় ব্যাংক সংগঠিত ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় জনগণের আস্থা এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতার কারণে দীর্ঘকাল টিকে থাকতে সক্ষম হয়।
মহালক্ষ্মী ব্যাংক
স্বদেশি আন্দোলনের পটভূমিতে ১৯১০ সালে চট্টগ্রামে মাত্র ৬০০ রুপি মূলধন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত এই ব্যাংক বাঙালির প্রাচীনতম উদ্যোগগুলোর একটি। প্রতিষ্ঠাতা ত্রিপুরাচরণ, কংগ্রেস নেতা ও সাহিত্যিক। ব্যাংকটির সঙ্গে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সুভাষচন্দ্র বসু, অনন্ত সিংহ, ত্রিপুরাচরণসহ বহু বিপ্লবী নেতা ব্যাংকটির গোপন কক্ষে আয়োজিত বৈঠকে অংশগ্রহণ করেছেন, যার উল্লেখ তাঁদের আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথায় পাওয়া যায়।
যদিও ব্যাংকটির কার্যক্রমের সূচনা হয় চট্টগ্রামে, তবে এর নিবন্ধিত কার্যালয় ছিল কলকাতার ১৫ ক্লাইভ স্ট্রিটে। ১৯৪১ সালে মহালক্ষ্মী ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার দ্বিতীয় তফসিলে অন্তর্ভুক্ত হয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ তফসিলি ব্যাংকের মর্যাদা লাভ করে। ১৯৪৫ সালের মধ্যে অনুমোদিত মূলধন ২৫ লাখ টাকা, পরিশোধিত ১০ লক্ষাধিক এবং কার্যকর মূলধন ১ কোটির বেশি টাকায় উন্নীত হয়। চট্টগ্রাম, ঢাকা, রেঙ্গুন, আকিয়াব, কক্সবাজারসহ ৩১টি শাখা নিয়ে এটি আঞ্চলিক ব্যাংকিংয়ে শক্ত অবস্থান গড়ে তোলে। ঢাকার ১৬টি ক্লিয়ারিং হাউসে অন্তর্ভুক্ত হওয়া ছিল তৎকালীন ব্যাংকগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক গ্রহণযোগ্যতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এই ব্যাংক সেই ক্লিয়ারিং ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৪৭ সালে সিলেট ইন্ডাস্ট্রিয়াল ব্যাংককে মহালক্ষ্মী ব্যাঙ্কের সঙ্গে একীভূত করা হয়।
দিনাজপুর ব্যাংক
দিনাজপুর ব্যাংক ১৯১৪ সালের ২৮ মার্চ নিবন্ধিত হয় এবং প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করত। ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয় ছিল দিনাজপুরে, তবে কলকাতা ও রাজশাহীসহ এর মোট পাঁচটি শাখা ছিল। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন যতীন্দ্রমোহন সেন। উত্তরবঙ্গ অঞ্চলে এটিই ছিল একমাত্র তফসিলভুক্ত দেশীয় ব্যাংক, যা সেই সময়ের আঞ্চলিক আর্থিক কাঠামোয় এর বিশেষ গুরুত্ব নির্দেশ করে।
১৯৪০ সালে দিনাজপুর ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংকের তফসিলে অন্তর্ভুক্ত হয়। সে সময় ব্যাংকটির আদায়কৃত মূলধন ছিল প্রায় ৪ লাখ ৮৮ হাজার টাকা এবং মজুত তহবিল ছিল ১ লক্ষাধিক টাকা। অর্থবছর শেষে এর নিট মুনাফা দাঁড়ায় ১৮ হাজার ৮৯৮ টাকা, যা দক্ষ ব্যবস্থাপনা, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং স্থিতিশীল কার্যক্রমের সাক্ষ্য বহন করে। সীমিত আঞ্চলিক পরিসর সত্ত্বেও দিনাজপুর ব্যাংক উত্তরবঙ্গের কৃষি ও বাণিজ্যিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল এবং দেশীয় ব্যাংকিংয়ের বিকাশে একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
কুমিল্লা ব্যাংকিং করপোরেশন
১৯১৪ সালে নরেন্দ্র চন্দ্র দত্তের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই ব্যাংক দ্রুত বিস্তার লাভ করে। তিনি ছিলেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকও। এটি বাংলার অন্যতম তফসিলভুক্ত ব্যাংক হিসেবে সকল প্রকার ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করত। কুমিল্লার কান্দিরপাড়ে বর্তমানে পূবালী ব্যাংকের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত ঐতিহ্যবাহী লাল দালান ছিল এর প্রধান কার্যালয়। পূর্ববঙ্গ ছাড়িয়ে আসাম, বিহার, উড়িষ্যা, দিল্লি, বোম্বে—এমনকি লন্ডনেও শাখা ও এজেন্সি গড়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠাকালে ১৯১৪ সালে ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন ছিল মাত্র ২ হাজার ৫০০ রুপি, যা ১৯৪০ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ৪০ লাখ রুপিতে উন্নীত হয়। প্রেফারেন্স শেয়ার ইস্যু ও ৩০টি শাখার নেটওয়ার্ক ব্যাংকটিকে তৎকালীন আর্থিক ব্যবস্থায় প্রভাবশালী অবস্থানে নিয়ে যায়। ১৯৪৫ সালের মধ্যে অনুমোদিত মূলধন ৩ কোটি টাকা, পরিশোধিত ৫৭ লক্ষাধিক এবং কার্যকর মূলধন ১২ কোটির বেশি রুপিতে উন্নীত হয়। ১৯৪৬ সালের মধ্যে ব্যাংকটির শাখা সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৩০ হয়। ক্লিয়ারিং ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত ছিল কুমিল্লা ব্যাংকিং করপোরেশন।
কুমিল্লা ইউনিয়ন ব্যাংক
বাংলার আইনসভার সদস্য কুমিল্লার ইন্দুভূষণ দত্ত ১৯২২ সালে এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। সীমিত মূলধন ও স্বল্প পরিসরে যাত্রা শুরু করলেও অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই ব্যাংকটি নিজস্ব কার্যালয় ভবন নির্মাণে সক্ষম হয়। বর্তমানে কুমিল্লা শহরের মনোহরপুরে সোনালী ব্যাংকের যে করপোরেট কার্যালয় অবস্থিত, সেটিই একসময় কুমিল্লা ইউনিয়ন ব্যাংকের নিবন্ধিত অফিস ছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৪৩ সালের অক্টোবরে ব্যাংকটির নিবন্ধিত কার্যালয় কলকাতার ক্লাইভ স্ট্রিট রোডে স্থানান্তরিত হয়। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের পৃষ্ঠপোষকতা এই প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা ও মর্যাদা আরও সুদৃঢ় করে।
ব্যাংকটি বরিশালের অপেক্ষাকৃত অনুন্নত অঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় শাখা স্থাপনের মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বিস্তারে ভূমিকা রাখে। ৩১ ডিসেম্বর ১৯৪৫ সাল নাগাদ তফসিলভুক্ত এই ব্যাংকের অনুমোদিত, পরিশোধিত ও কার্যকর মূলধনের পরিমাণ যথাক্রমে ২ কোটি, ৬০ লাখ ও ১৩ কোটি রুপিতে উন্নীত হয়। ব্যাংকটি সকল প্রকার ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি বৈদেশিক রেমিট্যান্স ও টেলিগ্রাফিক ট্রান্সফার সেবাও প্রদান করত। কুমিল্লায় পাটকল স্থাপনে অর্থায়নের মাধ্যমে শিল্পায়নেও এর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। ১৯৪৬ সালের মধ্যে ব্যাংকটির শাখার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৩০-এ পৌঁছায়। এ ছাড়া লন্ডন ও আমেরিকায় ব্যাংকের এজেন্ট কার্যক্রম পরিচালিত হতো এবং ক্লিয়ারিং ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত ছিল এই ব্যাংক।
১৯৫০ সালে কুমিল্লা ব্যাংকিং করপোরেশন, বেঙ্গল সেন্ট্রাল ব্যাংক ও হুগলি ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হয়ে ব্যাংকটি ‘ইউনাইটেড ব্যাংক অব ইন্ডিয়া’তে (ইউবিআই) রূপান্তরিত হয়। উল্লেখ্য যে এই চার ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতাই ছিলেন বাঙালি। ইউবিআই প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করে। একসময় সুন্দরবনের দুর্গম এলাকায় নৌপথ ছাড়া যোগাযোগের অন্য কোনো মাধ্যম না থাকায় ব্যাংকিং সুবিধা ছিল প্রায় অনুপস্থিত। এ পরিস্থিতির উত্তরণে দুটি ভ্রাম্যমাণ লঞ্চের মাধ্যমে ব্যাংকের শাখা পরিচালনা করা হয়, যা বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিত।
নাথ ব্যাংক
১৯২৬ সালে নোয়াখালীতে প্রতিষ্ঠিত নাথ ব্যাংক দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দ্রুত আস্থা অর্জন করে। কে এন দালালের নেতৃত্বে ব্যাংকটি ছয়-সাত বছরের মধ্যেই স্থিতিশীলতা লাভ করে এবং ১৯৩২ সালে কলকাতায় শাখা খোলে। ১৯৩৬ সালে কলকাতার ১৩৫ নম্বর ক্যানিং স্ট্রিটে অবস্থিত শাখাটি প্রধান কার্যালয়ে উন্নীত হয়। তফসিলভুক্ত এই ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত ছিল এবং কলকাতা ক্লিয়ারিং ব্যাংকস অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যপদ অর্জন করে।
১৯৩৯ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে আদায়ীকৃত মূলধন ও আমানতের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ব্যাংকটির আর্থিক সক্ষমতার পরিচায়ক। স্থায়ী আমানত, সঞ্চয়ী ও চলতি হিসাব এবং ক্যাশ সার্টিফিকেট মিলিয়ে আমানতের পরিমাণ এক কোটির বেশি অতিক্রম করে। ১৯৪০ সালে নিট মুনাফা দাঁড়ায় ৮৮ হাজার টাকার বেশি। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটি অংশীদারদের শতকরা সাড়ে ৭ টাকা হারে লভ্যাংশ প্রদান করে।
নূর মিয়া বনাম নোয়াখালী নাথ ব্যাংক লিমিটেড
ব্রিটিশ আমলে বাংলায় কৃষিজীবী ঋণগ্রস্ত মানুষের সুরক্ষার জন্য প্রণীত হয়েছিল বেঙ্গল অ্যাগ্রিকালচারাল ডেটর্স অ্যাক্ট, ১৯৩৬। এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল ঋণের বোঝায় জর্জরিত কৃষকদের কিছুটা স্বস্তি দেওয়া এবং ডেট সেটেলমেন্ট বোর্ডের মাধ্যমে তাঁদের দেনা নিষ্পত্তির সুযোগ সৃষ্টি করা। কিন্তু ‘ঋণ’ বলতে ঠিক কী বোঝাবে এবং কোন দায় এই আইনের আওতায় পড়বে, সে প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই সৃষ্টি হয় নূর মিয়া বনাম নোয়াখালী নাথ ব্যাংক লিমিটেড মামলার।
নূর মিয়াসহ কয়েকজন নোয়াখালী নাথ ব্যাংক থেকে ধার নিয়েছিলেন। পরে আর্থিক সংকটে পড়ে তাঁরা ডেট সেটেলমেন্ট বোর্ডে আবেদন করেন। বোর্ড ধারা ৩৪ অনুযায়ী দেওয়ানি আদালতকে নোটিশ দিয়ে জানায় যে সংশ্লিষ্ট মামলা স্থগিত রাখতে হবে। কিন্তু এর মধ্যেই নোয়াখালী নাথ ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া অ্যাক্ট অনুযায়ী ‘শিডিউলড ব্যাংক’ অর্থাৎ তফসিলি ব্যাংক হিসেবে স্বীকৃতি পায়। আইনে স্পষ্ট ছিল—তালিকাভুক্ত ব্যাংকের কাছে প্রদেয় দায় ‘কৃষিঋণ’ হিসেবে গণ্য হবে না।
এ অবস্থায় ব্যাংকের দাবি ছিল, যেহেতু এটি এখন শিডিউলড ব্যাংক, তাই এই দায় আর আইনের অর্থে ‘ঋণ’ নয় এবং ডেট সেটেলমেন্ট বোর্ডের এখতিয়ারও এখানে প্রযোজ্য নয়। বিপরীতে নূর মিয়ার বক্তব্য ছিল, তিনি যখন বোর্ডে আবেদন করেছিলেন তখন ব্যাংকটি তালিকাভুক্ত ছিল না; ফলে তাঁর আবেদন বৈধ।
মামলার মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, ধারা ৩৪-এর নোটিশ পেলেই দেওয়ানি আদালত বাধ্যতামূলকভাবে মামলা স্থগিত করবেন নাকি প্রথমে নিজেই নির্ধারণ করবেন সংশ্লিষ্ট দায় আদৌ আইনের অর্থে ‘ঋণ’ কি না।
বিচারপতি ঘোষ ও বিচারপতি মুখার্জি গুরুত্বপূর্ণ এক নীতিগত সিদ্ধান্ত দেন। তাঁরা বলেন, কোনো দায় ‘ঋণ’ হিসেবে গণ্য হবে কি না, সেই প্রশ্ন নির্ধারণের ক্ষমতা ডেট সেটেলমেন্ট বোর্ডের নয়; এটি দেওয়ানি আদালতের এখতিয়ার। বোর্ড কেবল তখনই কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে, যখন প্রকৃতপক্ষে আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ী একটি ‘ঋণ’ বিদ্যমান থাকে। আদালত আরও স্পষ্ট করেন, এই প্রশ্ন নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক সময় হলো আদালত যখন বিষয়টি বিবেচনা করবেন সেই সময়; বোর্ডে আবেদন দাখিলের সময় নয়।
ফলে আদালত সিদ্ধান্ত দেন, নোয়াখালী নাথ ব্যাংক যেহেতু ইতিমধ্যে শিডিউলড ব্যাংকে পরিণত হয়েছে, তাই সংশ্লিষ্ট দায় আর বেঙ্গল অ্যাগ্রিকালচারাল ডেটর্স অ্যাক্টের অধীনে ‘ঋণ’ নয়। সুতরাং ডেট সেটেলমেন্ট বোর্ডের নোটিশ আদালত মানতে বাধ্য নন এবং দেওয়ানি মামলার কার্যক্রম চলতে পারে।
এই রায় পরবর্তীকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে স্বীকৃতি পায়। কারণ, এটি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দেয় যে বেঙ্গল অ্যাগ্রিকালচারাল ডেটর্স অ্যাক্টের অধীনে দেওয়ানি আদালত ও ডেট সেটেলমেন্ট বোর্ডের ক্ষমতার সীমারেখা কোথায়। বিশেষত কোনো দায় আইনের অর্থে ‘ঋণ’ কি না, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা যে দেওয়ানি আদালতের; এই মামলা সেই নীতিকে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করে।
নোয়াখালী ইউনিয়ন ব্যাংক
নোয়াখালী ইউনিয়ন ব্যাংক পূর্ববঙ্গের দেশীয় ব্যাংকিং উদ্যোগের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ১৯২৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ব্যাংক অতি সীমিত মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও অল্প সময়ের মধ্যেই বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। কলকাতার ১০ ক্যানিং স্ট্রিটে প্রধান কার্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে ব্যাংকটি তৎকালীন বঙ্গদেশের কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংযোগ স্থাপন করে। বড়বাজার ও দক্ষিণ কলকাতার পাশাপাশি পূর্ববঙ্গ ও বিহারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে শাখা বিস্তার করে তারা আঞ্চলিক বাণিজ্য, পুঁজি স্থানান্তর ও আমানত সংগ্রহে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। মাত্র ২৫ হাজার টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে কার্যক্রম শুরু হলেও সতীশচন্দ্র পালের দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও দূরদর্শী নেতৃত্বের ফলে ব্যাংকটি দ্রুত স্থিতিশীলতা অর্জন করে এবং সাধারণ ব্যবসায়ী ও আমানতকারীদের আস্থা লাভ করে।
সার্বিকভাবে দেখা যায়, ঔপনিবেশিক আমলে পূর্ববঙ্গের দেশীয় ব্যাংকগুলো কেবল অর্থ লেনদেনের প্রতিষ্ঠান ছিল না; বরং তারা ছিল স্থানীয় উদ্যোগ, পুঁজি সংগঠন ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তি। বৈশ্বিক মন্দা, সীমিত মূলধন, ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও এসব ব্যাংক সংকটকে সম্ভাবনায় রূপান্তর করতে সক্ষম হয়। উদ্ভাবনী উদ্যোগ, স্থানীয় জনগণের আস্থা ও অভিযোজনক্ষমতার ভিত্তিতে তারা আঞ্চলিক অর্থনীতিকে সচল রাখে, বাণিজ্য সম্প্রসারণে সহায়তা করে এবং দেশীয় উদ্যোক্তা শ্রেণির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই ধারাবাহিক প্রয়াসই পরবর্তীকালে বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং কাঠামোর ভিত্তি সুদৃঢ় করে এবং দেশীয় আর্থিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের জন্ম দেয়।
পূর্ববঙ্গে ব্যাংকিং: পাকিস্তান আমল
১৯৪৭ সালে দেশে অতফসিলি ব্যাংকের সংখ্যা ছিল ৭০৪টি। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এসব ব্যাংকের গুরুত্ব দ্রুত হ্রাস পায়; ১৯৬৩ সালের মধ্যে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় মাত্র ৪৯টিতে। বিপরীতে তফসিলি ব্যাংকসমূহ পাকিস্তান আমলে ক্রমেই শক্তিশালী ও প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। ১৯৪৭ সালে যেখানে তফসিলি ব্যাংক ছিল মাত্র ২টি, ১৯৬৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫টিতে। শাখা বিস্তারও ছিল লক্ষণীয়। ১৯৬২ সালে সারা দেশে ব্যাংক শাখার সংখ্যা ছিল ৮৩১টি; ১৯৬৩ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয় ১ হাজার ১৩০টি। তবে এই সম্প্রসারণ ছিল ভৌগোলিকভাবে অসম, ৩৬২টি শাখা পূর্ব পাকিস্তানে এবং ৭৬৮টি পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থিত ছিল। এ পরিসংখ্যান ব্যাংকিং খাতে তৎকালীন আঞ্চলিক বৈষম্যের সুস্পষ্ট প্রতিফলন।
পূর্ব ও পশ্চিম উভয় অংশে ব্যাংকের কেন্দ্রীয় দপ্তরের মোট নয়টি অফিস ছিল; এর মধ্যে তিনটি পূর্ব পাকিস্তানে এবং ছয়টি পশ্চিম পাকিস্তানে। কেন্দ্রীয় পরিদপ্তরের অধীনেই ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালিত হতো। দেশভাগের প্রাক্কালে ১৯৪৭ সালে, পাকিস্তানভিত্তিক আধুনিক ব্যাংক ছিল কার্যত একটি, ব্যাংক অব অস্ট্রেলেশিয়া। দেশভাগের পর প্রতিষ্ঠিত হয় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান এবং এর পরপরই গঠিত হয় ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট করাচিতে স্টেট ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় স্থাপিত হয়। ১৯৭০ সালের মধ্যে পাকিস্তানে তফসিলি ব্যাংকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬টিতে। এর মধ্যে ১৩টি ব্যাংক পূর্ব পাকিস্তানে কার্যক্রম পরিচালনা করলেও, মাত্র ১টি ছিল সম্পূর্ণ বাঙালি মালিকানাধীন এবং আরেকটি আংশিক বাঙালি মালিকানায় পরিচালিত।
১৯৬২ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, হাবিব ব্যাংক লিমিটেড ও মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংকের একাধিক শাখা ঢাকায় কার্যরত ছিল। হাবিব ব্যাংকের শাখা ছিল নবাবপুর রোড, তেজগাঁও, মৌলভীবাজার, সদরঘাট ও রমনায়। অন্যদিকে মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংকের শাখা ছিল মিটফোর্ড রোড, জনসন রোড, নিউমার্কেট ও রমনায়। তবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার এক যুগ পরেও পূর্ব পাকিস্তানভিত্তিক শক্তিশালী আধুনিক ব্যাংক গড়ে না ওঠায় জনমনে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। পুঁজির স্বল্পতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে পূর্ব পাকিস্তানের উদ্যোক্তারা দীর্ঘ সময় ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেননি। তবে ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে বাঙালিদের প্রথম তাৎপর্যপূর্ণ ও দৃশ্যমান অংশগ্রহণ শুরু হয়। এটি ছিল বাঙালি ও অবাঙালি উদ্যোক্তার যৌথ উদ্যোগ। ১১ মে ১৯৫৯ চট্টগ্রামে প্রধান কার্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে ব্যাংকটি কার্যক্রম শুরু করে।
সরকারি সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত এই ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ও আর নিজাম (গ্রাহামস ট্রেডিং কোম্পানি), এম আর সিদ্দিকী (এ কে খান অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড), খান বাহাদুর মুজিবুর রহমান, মির্জা মোহাম্মদ আলী ইস্পাহানী, হাবিবুর রহমান এবং এ এইচ খান। ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন ছিল ৫০ লক্ষ টাকা। ১৯৬০-এর দশকের গোড়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় ইউনাইটেড ব্যাংক লিমিটেড। হাবিব ব্যাংক থেকে বেরিয়ে এসে আগা হাসান আবেদী এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের মাধ্যমে তিনি পূর্বাঞ্চলে ব্যাংকটির অবস্থান সুদৃঢ় করেন। গ্রামাঞ্চলে শাখা বিস্তারের পাশাপাশি ঢাকাতেই ইউনাইটেড ব্যাংকের চারটি শাখা সক্রিয় ছিল। পাকিস্তান আমলে ব্যাংকিং খাতে পরিমাণগত সম্প্রসারণ ঘটলেও মালিকানা, নিয়ন্ত্রণ ও মূলধনের ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তান ছিল সুস্পষ্টভাবে বঞ্চিত। এ বৈষম্য পরবর্তী রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অস্থিরতার অন্যতম পটভূমি রচনা করে।
১৯৬৫ সালের ২৮ জানুয়ারি সম্পূর্ণ বাঙালি মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত প্রথম বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ইস্টার্ন ব্যাংকিং করপোরেশন। সরকারের কোনো পুঁজি বিনিয়োগ ছাড়াই ঢাকাকে প্রধান কার্যালয় করে যাত্রা শুরু করা এই ব্যাংকের প্রারম্ভিক পরিশোধিত মূলধন ছিল ১৪ লাখ ২১ হাজার টাকা। নাথ ব্যাংক ও এর শাখাসমূহের সম্পদ ও দায়দায়িত্ব অধিগ্রহণের মাধ্যমে ব্যাংকটি দ্রুত কার্যক্রম সম্প্রসারণ করে। এর প্রধান উদ্যোক্তাদের মধ্যে ছিলেন ব্যবসায়ী জহুরুল ইসলাম, সাবেক চিফ ইঞ্জিনিয়ার আবদুল জব্বার ও ক্যাপ্টেন জগদীশ দেবনাথ।
ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক এবং ইস্টার্ন ব্যাংকিং করপোরেশনের কার্যক্রম প্রধানত পূর্ব পাকিস্তানকেন্দ্রিক ছিল। বৃহৎ পাকিস্তানি ব্যাংকগুলোর তুলনায় আকার ও সম্পদ সীমিত হলেও স্থানীয় অর্থনীতিতে তাদের প্রভাব ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংকের শাখা ছিল ২১টি এবং ইস্টার্ন ব্যাংকিং করপোরেশনের ৫৮টি। তৎকালীন ঢাকায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানও কার্যক্রম পরিচালনা করত, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক অব পাকিস্তান এবং অ্যাগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক অব পাকিস্তান। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে এরা যথাক্রমে বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে রূপান্তরিত হয়। ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ঢাকায় পাঁচটি বিদেশি ব্যাংকও সক্রিয় ছিল।
উপসংহার
স্বাধীনতার পর নবগঠিত রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠনের অন্যতম প্রধান পদক্ষেপ ছিল ব্যাংকিং খাতের পুনর্বিন্যাস ও জাতীয়করণ। বাঙালি মালিকানাধীন দুই ব্যাংকসহ পাকিস্তানি মালিকানাধীন মোট ১০টি বাণিজ্যিক ব্যাংক জাতীয়করণ হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক সাময়িকভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব গ্রহণ করে; পরবর্তী সময়ে ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর ৩ কোটি টাকার সম্পূর্ণ সরকারি পরিশোধিত মূলধন নিয়ে এটি পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রূপান্তরিত হয়। এর পরপরই একাধিক পাকিস্তানি ব্যাংকের সম্পদ ও দায় একীভূত করে নতুন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক গঠন করা হয়। হাবিব ব্যাংক লিমিটেড ও কমার্স ব্যাংক লিমিটেডের সম্পদ নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় অগ্রণী ব্যাংক। ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান, ব্যাংক অব ভাওয়ালপুর ও প্রিমিয়ার ব্যাংক একীভূত হয়ে গড়ে ওঠে সোনালী ব্যাংক। ইউনাইটেড ব্যাংক লিমিটেড ও ইউনিয়ন ব্যাংকের সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় জনতা ব্যাংক। মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংক, অস্ট্রেলেশিয়া ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের সম্পদ ও দায় একীভূত করে গঠিত হয় রূপালী ব্যাংক। জাতীয়করণের ফলে ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক রূপ নেয় পূবালী ব্যাংকে এবং ইস্টার্ন ব্যাংকিং করপোরেশন পরিণত হয় উত্তরা ব্যাংকে।
পূর্ববঙ্গের উপরিউক্ত ব্যাংকিং ও অর্থনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ থেকে এই উপসংহারে উপনীত হওয়া যায় যে ঔপনিবেশিক শাসন, বৈশ্বিক মন্দা ও আঞ্চলিক বৈষম্যের প্রতিকূল পরিবেশেও দেশীয় উদ্যোক্তারা ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রয়াস থামাননি। নিখিল বঙ্গ ব্যাংক সংঘের মতো সংগঠন স্থানীয় আর্থিক শক্তিকে সংগঠিত ও সমন্বিত করেছিল। কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রামসহ পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠা দেশীয় ব্যাংকগুলো কেবল ঋণদানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; তারা ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পোদ্যোগ ও আঞ্চলিক পুঁজির সঞ্চালনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। এই দীর্ঘ উত্থান-পতন, রূপান্তর ও পুনর্গঠনের ধারাই স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকিং কাঠামো নির্মাণে ভিত্তি জুগিয়েছে। আধুনিক এই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকব্যবস্থা দেশীয় উদ্যোগ, ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতা ও স্বাধীন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণের সম্মিলিত ফসল। ইতিহাসের এই ধারাবাহিকতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠান কেবল লেনদেনের কাঠামো নয়; বরং তা একটি জাতির অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতার সংগঠিত প্রকাশ।
তথ্যসূত্র
অনামা ১৩৩৭।। ব্যবসা ও বাণিজ্য, বাঙ্গলার লোন কোম্পানী, ১০ম বর্ষ ৪র্থ ও ৫ম সংখ্যা
অনামা ১৯৪০-৪১।। আর্থিক জগৎ (ব্যবসা-বাণিজ্য-কৃষি-শিল্প-অর্থনীতি বিষয়ক বাংলা সাপ্তাহিক পত্রিকা), তৃতীয় বর্ষ, ০৬ মে ১৯৪০-২৮ এপ্রিল ১৯৪১
কাওছার ২০১৪।। চাঁদ সুলতানা কাওছার, ঢাকার ব্যাংক ব্যবস্থা ১৯২১-১৯৭১, ঢাকাঃ বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি পত্রিকা, দাত্রিংশ খণ্ড
কুমার ১৯৫৮।। সুবোধ কুমার মুখোপাধ্যায়, বাংলার আর্থিক ইতিহাস (অষ্টাদশ শতাব্দী), কলকাতাঃ কে পি বাগচী এন্ড কোম্পানী\
ক্লে ১৮৯৬।। Arthur Lloyd Clay, Leaves from a diary in Lower Bengal, London: Macmillan and Co. Limited
জেইন ১৯২৯।। L. C. Jain, Indigenous Banking In India, London: Macmillan and Co. Limited
জেইন ১৯৪৬।। J. P. Jain, Indian Banking Analysed, Delhi: Rajhan Press
টেইলর ১৮৪০।। James Taylor, Topography and Statistics of Dacca, Calcutta: G.H.Huttmann, Military Orphan Press
দেবনাথ ২০২২।। ড. আর এম দেবনাথ, বাঙালির ব্যাংক ব্যবসা, ঢাকাঃ নবযুগ প্রকাশনী
প্রতিবেদন ১৯৩০।। Report of the Bengal Provincial Banking Enquiry Committee, 1929-30 (Volume: 1,2 &3), Calcutta: Bengal Government Press
প্রতিবেদন ১৯৩৮।। Indian Law Reports, Nur Mia And Anr. vs Noakhali Nath Bank Ltd., Calcutta High Court
ফজলুল ১৯৯৩।। সরদার ফজলুল করিম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজঃ অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের আলাপচারিতা, ঢাকাঃ সাহিত্য প্রকাশ
মহসীন ১৯৯৩।। কে এম মহসীন, মুগল আমলে ব্যাংকিং, বাংলাদেশের ইতিহাস ১৭০৪-১৯৭১, অর্থনৈতিক ইতিহাস, সিরাজুল ইসলাম সম্পাদিত, ঢাকাঃ বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি
মানিক ২০০৩।। আবদুল হামিদ মানিক (ভাষান্তর), মূলঃ রবার্ট লিন্ডসে, সিলেটে আমার বারো বছর, সিলেটঃ কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ
মুরঞ্জন ১৯৪০।। S. K. Muranjan, Modern Banking in India, Bombay: Hind Kitabs Limited
মুহিবউল্লাহ ১৯৯৪।। ড. মোহাম্মদ মুহিবউল্যাহ ছিদ্দিকী (অনুবাদ), মূলঃ ড. আবদুল করিম, মোগল রাজধানী ঢাকা, ঢাকাঃ বাংলা একাডেমী
সিরাজুল ২০১৫।। সিরাজুল ইসলাম, ঢাকার বাণিজ্যিক ইতিহাসঃ প্রাচীনকাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত, দেলওয়ার হাসান সম্পাদিত, ঢাকাঃ ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি
সেন ১৯৭৪।। সত্যেন সেন, শহরের ইতিকথা, ঢাকাঃ স্টুডেন্ট ওয়েজ
হান্নান ১৯৪০।। আব্দুল হান্নান চৌধূরী, ভারতীয় ব্যাংকিং ও মুছলমান। ব্যাংকের উৎপত্তি ও ক্রমোন্নতি, চট্টগ্রাম
হোসাইন মোহাম্মদ জাকি, লেখক ও গবেষক। জন্ম ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে ফেনী জেলার পরশুরাম উপজেলার পূর্ব অলকা গ্রামে। বেড়ে ওঠা ঢাকার মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। পেশাগত জীবনে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আইএমই বিভাগে ডাটা এন্ট্রি/কন্ট্রোল সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করছেন। আগ্রহের বিষয়ঃ সাহিত্য, শিল্প, ইতিহাস ও ঐতিহ্য। এমবিএ এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ম্যাব) এর সঙ্গে যুক্ত। ইতোমধ্যে ডজেনখানিক উপসম্পাদকীয় ও মতামত কলাম এবং ইতিহাস-ঐতিহ্য বিষয়ক দুই শতাধিক নিবন্ধ প্রকাশ পেয়েছে। প্রকাশিত গ্রন্থঃ ঘাটের কথা গোয়ালন্দ ও Peace and Human Security in Asia and the Pacific (সহযোগী লেখক)। সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা পরিষদ, পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ), পুলিশ স্টাফ কলেজসহ আরো বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে গবেষণা কর্ম সম্পাদন। প্রকাশিত গবেষণা কর্মঃ নিরাপদ সবজি, ফুলের অর্থনীতি, উপকূলীয় অঞ্চলের মহিষ কথা ও Drug Addiction among the Youths in Dhaka City: The Causes and Consequences।
নোট: ট্রেজারি চালান (১৮৯৫) এর ছবিটি এ-আই ব্যবহার করে উন্নত ও রঙ্গীন করা হয়েছে। মূল ছবির প্রতিলিপি রয়েছে এই বইতে, হারিয়ে যাওয়া দেশ, ইউরোপীয় চিত্রকরের চোখে পূর্ববঙ্গ, মুনতাসীর মামুন, ফেব্রুয়ারি ২০১৭, জার্নিম্যান বুকস।
















