সম্পাদকীয়

সম্পাদকীয়

বিজ্ঞাপন

দুনিয়াজোড়া একধরনের পরিবর্তন ঘটে চলেছে। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা চলছে পশ্চিমা বিশ্বের গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠান এবং মূল্যবোধের ওপর ভর করে। সেসব মূল্যবোধের অন্যতম একটি হলো বিশ্বায়ন। কিন্তু ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার পর থেকে বিশ্বব্যাপী একধরনের অস্থিরতা প্রকট হয়ে উঠছে। জাতীয়তাবাদ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক রক্ষণশীলতা, ধর্মীয় উগ্রবাদ ইত্যাদি বিভিন্ন দেশে জেঁকে বসছে ধীরে ধীরে। পশ্চিমা বিশ্ব অনেকাংশেই এই ধরনের সমস্যা থেকে নিজেদের মুক্ত মনে করত। কিন্তু সেখানেই এখন এসব সামাজিক অসুস্থতা প্রকটভাবে দৃশ্যমান। যার ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো বিশ্বায়নের জোরালো সমর্থকেরাও এখন বিশ্বায়নবিরোধী অবস্থান নিয়েছে। নিজেদের অর্থনীতিকে রক্ষা করার নামে তারা বিশ্বায়ন ও অভিবাসনবিরোধী পদক্ষেপ নিচ্ছে। সেসব পদক্ষেপ নেওয়ার সামাজিক সমর্থনও তাদের সমাজে সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতায় চলে আসছে রক্ষণশীল ধারার রাজনীতিকেরা। বিশ্বব্যাপীই এই পপুলিজম বা জনতুষ্টিবাদী ধারা ক্রমশই শক্তিশালী হয়ে উঠছে।

আমরা দেখেছি যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী ইশতেহারে বিশ্বায়নবিরোধী সব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সেগুলো বাস্তবায়ন বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার অবসানের শামিল। ট্রাম্প স্পষ্ট করেই ঘোষণা করেছেন যে তিনি বর্তমান বাণিজ্য চুক্তি সব বাতিল করবেন, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কোম্পানি বিদেশে বিনিয়োগ করলে শাস্তি হিসেবে অতিরিক্ত করারোপ করবেন এবং অভিবাসী ঠেকাতে সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ করবেন।

বিশ্বায়ন একটি বহুল বিতর্কিত ধারণা। এর পক্ষে-বিপক্ষে অসংখ্য যুক্তি রয়েছে। সব ধারণারই যেমন এপিঠ-ওপিঠ থাকে, বিশ্বায়নেরও তা রয়েছে। বিশ্বায়ন নিয়ে বিভিন্ন সমাজে একাংশের মধ্যে সন্দেহ শুরু থেকেই ছিল। পুঁজিবাদবিরোধীরাই সাধারণত বিশ্বায়নের বিরোধিতা করে থাকে। আবার ইসলামি জঙ্গি সংগঠনগুলোও বিশ্বায়নকে ইসলাম ধ্বংস করার জন্য পশ্চিমা বিশ্বের এক ‘কূটচাল’ হিসেবে দেখে থাকে। এ ছাড়া অন্যান্য ধর্মীয় ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোষ্ঠীও নিজেদের অস্তিত্ব হারিয়ে যাচ্ছে বলে বিশ্বায়নবিরোধী অবস্থান নেয়। কিন্তু সাম্প্রতিক ধারাটি এসবের বিপরীত। বিশ্বায়নবিরোধিতা আসছে এখন স্বয়ং সেসব পুঁজিবাদী সমাজগুলো থেকেই, যারা সমাজতন্ত্র বা কমিউনিজমেরও বিরোধী। ফলে একটি নতুন ধারা তৈরি হচ্ছে, যা পুঁজিবাদের ভেতর থেকেই আসছে। পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনৈতিক দুরবস্থার জন্যই যে এমনটি ঘটছে, তা নিয়ে সন্দেহ খুব কমই আছে। কারণ, বিশ্বায়নের ধারণা এখন চীন বা ভারতের মতো নতুন অর্থনৈতিক শক্তিগুলো এগিয়ে নেওয়ার জোরালো চেষ্টা করছে। পুঁজির ধর্মই স্থানান্তরিত হওয়া এবং ছড়িয়ে পড়া। পুঁজি তার নিজের বিকাশের স্বার্থেই এক জায়গায় থাকে না। ফলে যেখানে পুঁজি সৃষ্টি হবে, সেখান থেকে নতুন নতুন স্থানে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ খুঁজতে থাকে। বর্তমানে চীন বা ভারতের মতো দেশে পুঁজি পুঞ্জীভূত হচ্ছে। তাই তারাই এখন বিশ্বায়নের সমর্থক হয়ে উঠছে। কিন্তু বেশি দিন আগের কথা নয়, যখন ঠিক একই ভূমিকা পালন করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা বিশ্ব।

বিশ্বায়নের ব্যাপারে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের এক প্রদর্শনী আমরা দেখতে পাই ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়া বা ব্রেক্সিট এবং যুক্তরাষ্ট্রে রক্ষণশীল ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণের মধ্য দিয়ে। এসব ভোটে আমরা দেখতে পাই জনতুষ্টিবাদের ক্ষমতা, যাদের বেশির ভাগই বিশ্বায়নবিরোধী। তবে ঢালাওভাবে এটাও বলা যাবে না যে পশ্চিমা বিশ্বের জনগণ বিশ্বায়নবিরোধী। উভয় ক্ষেত্রে ভোটারদের বয়স ও আর্থসামাজিক বৈশিষ্ট্য দেখলে দেখা যায় ভিন্ন রূপ। ব্রেক্সিটের ক্ষেত্রে বয়স্ক ও শহুরে নয় এমন জনগোষ্ঠীই বেশি ভোটকেন্দ্রে গেছে এবং কম বয়সী তরুণদের সংখ্যা ছিল কম। তরুণেরাও সমানভাবে ভোট দিলে ফলাফল ভিন্ন হতে পারত। আবার যুক্তরাষ্ট্রে আমরা দেখি যে ডোনাল্ড ট্রাম্প হিলারি ক্লিনটনের চেয়ে প্রায় ৩০ লাখ ভোট কম পেয়েছেন। তা ছাড়া ট্রাম্পের সব ভোটারই যে বিশ্বায়নবিরোধী, সেটাও যেমন বলা যায় না, তেমনি হিলারির সব ভোটারই যে বিশ্বায়নের সমর্থক, সেটাও বলা যায় না। কিন্তু সামাজিক পরিবর্তনের ধারা যে স্পষ্ট হচ্ছে, সেটা এসব নির্বাচনের মাধ্যমে বোঝা যায়।

চীন, রাশিয়া ও ভারতের মতো দেশগুলোয় আমরা আবার ভিন্ন চিত্র দেখতে পাচ্ছি। এসব দেশের নেতারা সবাই যদিও জাতীয়তাবাদী দুয়ো তুলেই ক্ষমতায় এসেছেন, কিন্তু তাঁরা আবার নিজেদের দেশকে এমনভাবে বহির্মুখী করছেন এবং বৈশ্বিক কৌশল তৈরি করছেন, যা বিশ্বায়নের ধারণার ওপরই প্রতিষ্ঠিত। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি উভয়ই বাণিজ্য, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক জোট গঠন এবং তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহারে মনোযোগ দিয়েছেন। এ জন্য তাঁরা বিভিন্ন পদক্ষেপও গ্রহণ করছেন। মোদি ৪৫টি দেশ ভ্রমণ করেছেন এবং তাঁদের অনেকেই পাল্টা ভ্রমণে ভারতে এসেছেন। এর ফলে অনেক চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। চীনের প্রচেষ্টাগুলো সাম্প্রতিক সময়ে এসে সপ্রতিভ হয়ে উঠেছে। এশীয় অবকাঠামো ও বিনিয়োগ ব্যাংক তৈরি, এক অঞ্চল বা সিল্ক রোড উদ্যোগ, আঞ্চলিক সামগ্রিক অর্থনৈতিক অংশীদারি ইত্যাদি সবই বিশ্বায়নের প্রতি চীনের আরও ঝুঁকে পড়ার নিদর্শন। ভূ-অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক চিন্তাভাবনা থেকেই চীন তার নেতৃত্বে বিশ্বায়নের গতিপথকে নতুন করে এগিয়ে নিতে চাইছে। তবে চীনের এই তত্পরতাকে কোনো কোনো বিশ্লেষক নব্য-উপনিবেশবাদের সঙ্গে তুলনা করতেও দ্বিধা করছেন না। বৈশ্বিক এসব পরিবর্তনের সঙ্গে বাংলাদেশ তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টা করছে। নতুুন নতুন সুযোগ গ্রহণে বাংলাদেশের সক্ষমতা বিষয়ে আরও আলোচনা-পর্যালোচনা হওয়া দরকার।

বিভিন্ন জরিপে আমরা দেখছি যে উন্নত দেশগুলোর তুলনায় উন্নয়নশীল দেশগুলোয় অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের প্রতি সমর্থন বাড়ছে, যার বেশির ভাগ সমর্থকই তরুণ প্রজন্মের। আবার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন চিত্র ধরা পড়ছে। এসবই বিশ্বায়নের ধারণা নিয়ে অস্পষ্টতা ও বহুমুখিনতার উদাহরণ। যে কারণে বিশ্বায়ন বিষয়ে একমত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

তবে অনেক বিশ্লেষক বলতে চান যে বিশ্বায়ন নতুন মোড়কে আবির্ভূত হবে। গত তিন দশকের বিশ্বায়ন ছিল ভারসাম্যহীন। সেখানে অর্থায়ন এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির আদান-প্রদান ছিল খুব বেশি, কিন্তু পণ্য ও সেবার চলাচল ছিল মধ্যম মানের, আবার মানুষের চলাচল এবং জাতীয় ও বৈশ্বিক পর্যায়ে নিয়ন্ত্রক ও অন্যান্য নীতির উন্নয়ন ছিল কম। কিন্তু যদি সংবেদনশীলভাবে বৈশ্বিক পুঁজি চলাচল ব্যবস্থাপনা করা হয়, সবুজ প্রযুক্তি নির্মাণ ও বিস্তারে সহায়ক প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়, উন্নত দেশগুলোয় অভ্যন্তরীণ সামাজিক নীতি তৈরি করা হয় এবং আরও ব্যাপকভাবে বললে বিশ্বে একটি দেশের অবস্থান কী, সে বিষয়ে জাতীয় মতৈক্য তৈরি করা যায়, তাহলে হয়তো বিশ্বায়নের সংকট অনেকাংশেই হ্রাস করা সম্ভব।

তবে এরই মধ্যে আমরা দেখতে পাই যে বিশ্বায়নের এমন একটি তাস সচল হয়েছে, যার সঠিক নিয়ন্ত্রণ কারও হাতে নেই। এই প্রাযুক্তিক পরিবর্তনকে বলা হচ্ছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব। আমরা কেউই ভালো করে জানি না এই বিপ্লবের ঝুঁকি ও সম্ভাবনাগুলো কেমন। আরও স্পষ্ট করে বললে এর সুফল গ্রহণ করে এমন সব গোষ্ঠী তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করছে, যা প্রকারান্তরে সামাজিক কুফলে পরিণত হচ্ছে। কিন্তু এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে অর্থনৈতিক পরিবর্তনে প্রযুক্তি অত্যন্ত শক্তিশালী একটি অস্ত্র। এই নতুন ধারা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকলে যে নীতিই নেওয়া হোক না কেন, সেটা ত্রুটিপূর্ণ থেকে যাবে।

বিশ্বায়নের প্রভাব সমাজের সর্বক্ষেত্রেই আমরা দেখি। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দিকের পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও বিশ্বায়নের রয়েছে অভূতপূর্ব প্রভাব। শিক্ষা-সংস্কৃতিতে বিশ্বায়নের প্রভাব উল্লেখযোগ্য। সমাজ ও রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাবের সঙ্গে বিশ্বায়নের রয়েছে এক নিবিড় সম্পর্ক। আমাদের মতো উন্নয়নশীল সমাজে মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে চলা মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ভিন্ন। এর ফলে তৈরি হচ্ছে বিরোধপূর্ণ মানসিকতার নাগরিক শ্রেণি, যারা মননের দিক থেকে একে অপরের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রতিটি ধারাই বিশ্বায়ন দ্বারা প্রভাবিত এবং ক্রমে সক্রিয় হচ্ছে। তাই সামাজিক দ্বন্দ্ব ধীরে ধীরে বেড়ে চলেছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার কোনো নতুন বিষয় নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে রাজনীতিতে মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠনগুলোর তত্পরতা অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসাগুলোর আবদ্ধ পরিবেশে ইসলামভিত্তিক জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটে থাকে বলেও মত চালু রয়েছে। এসব মাদ্রাসা সংস্কার ও আধুনিকায়নে সময়ে সময়ে চেষ্টা করা হলেও জোরালো কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ে না। সাম্প্রতিক কালেও কওমি মাদ্রাসাগুলোকে সমাজের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করতে বর্তমান সরকার এসব প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে একধরনের সমঝোতা করেছে। এই প্রেক্ষাপটে মাদ্রাসাশিক্ষার প্রকৃতি ও পদ্ধতি এবং এসব মাদ্রাসাভিত্তিক ওলামাদের সংস্কারবিমুখতা নিয়ে লিখেছেন আলী রীয়াজ। এসব প্রতিষ্ঠানের ওলামারা কেন মাদ্রাসাশিক্ষার সংস্কার ও আধুনিকায়নে বরাবরই বাধা দিয়ে এসেছেন, তার কারণ ও ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে এই লেখায়। এ ছাড়া মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক তত্পরতার কারণ যে ধর্মীয় ব্যাখ্যার মধ্যেই নিহিত রয়েছে, তা-ও জানা যাবে এই লেখায়।

ব্যাংকিং ব্যবস্থা বিশ্বায়নের ধারণার সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। বৈশ্বিক পুঁজি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভূমিকাই মুখ্য। তাই বিশ্বায়নের সংকটের সঙ্গে ব্যাংকিং ব্যবস্থার একটি প্রত্যক্ষ সংযোগ রয়েছে। সে জন্য বিশ্বায়নের সমালোচনার পাশাপাশি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নৈতিকতার প্রশ্নটিও সামনে চলে আসে। নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে দেখার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রতিচিন্তার এবারের সংখ্যায় ভারতের বিশিষ্ট রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ অমিয় কুমার বাগচির একটি নিবন্ধ ছাপছি। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের একজন অন্যতম পথিকৃত্ নুরুল মতিনের স্মরণে ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত স্মারক বক্তৃতায় অমিয় বাগচি এই বক্তব্য দেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) ইংরেজিতে বক্তৃতাটি প্রকাশ করেছে।

আঞ্চলিক জোটকে অনেক সময় বিশ্বায়নের বিরুদ্ধব্যবস্থা হিসেবে দেখা হয়। বিশ্বায়নের প্রভাব মোকাবিলায় বিভিন্ন অঞ্চলভিত্তিক অর্থনৈতিক জোট গঠনের ঘটনা আমরা দেখেছি। দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিকতাবাদ অন্যান্য অঞ্চলের মতো জোরালো শিকড় গাড়তে পারেনি। এই অঞ্চলের দেশগুলোর ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব ও সন্দেহের ফলে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমমর্যাদাভিত্তিক সম্পর্ক বাধাগ্রস্ত হয়েছে বারবার। আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ হিসেবে ভারতের ভূমিকাই মুখ্য বলে মনে করে থাকেন বিশ্লেষকেরা। কিন্তু ভারত সেই ভূমিকা পালন করতে প্রায়ই ব্যর্থ হয়। ভারতের সঙ্গে এই অঞ্চলের বাকি দেশগুলোর সম্পর্কের জটিলতা আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য সহায়ক নয়। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কগুলোই বহুপক্ষীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার প্ল্যাটফর্মগুলোকে সবল বা দুর্বল করার জন্য দায়ী। সে জন্য দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক শুরু থেকেই উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অসামান্য অবদানের সুবাদে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশ ভারতের মিত্র হিসেবেই তার যাত্রা শুরু করে। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে সেই সম্পর্কের দীর্ঘস্থায়ী বুনিয়াদ গড়ে ওঠেনি। ভূবাস্তবতা বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। দুই দেশের একই ঐতিহাসিক স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক সাদৃশ্য সেই সম্পর্ক উন্নয়নের পক্ষেই কথা বলে। তবু, আমরা দেখেছি বাস্তবতা আশানুরূপ ছিল না কখনোই। সময়ে সময়ে সম্পর্কের উন্নতি হলেও তা বেশি দিন স্থায়ী করা সম্ভব হয়নি।

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুদেশের সম্পর্ক ধীরে ধীরে ইতিবাচক দিকে মোড় নেয়। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করার ক্ষেত্রে অনেক অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে। নদীর পানিবণ্টন, বাণিজ্য ঘাটতি এবং সমুদ্র ও স্থলসীমান্তকেন্দ্রিক সমস্যা ছিল দুদেশের সম্পর্ক উন্নয়নের প্রধান প্রতিবন্ধকতা। তবে সমুদ্রসীমার মীমাংসা, স্থলসীমান্ত সমস্যার সমাধান ও বিচ্ছিন্নতাবাদ দমনের ফলে সম্পর্কের যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। তবু আন্তর্জাতিক নদীগুলোর সুরাহা ও বাণিজ্যবৈষম্য এখনো দুদেশের সম্পর্কের গলায় কাঁটা হয়ে বিঁধে আছে। ভাটির দেশ হওয়ায় উজানের পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়া বাংলাদেশের কৃষি তথা অর্থনীতির অভাবনীয় ক্ষতি ঘটে চলেছে। এসব সমস্যার আশু মীমাংসা দুদেশের সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। সারা বিশ্ব যখন সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে চলেছে, তখন এই দুই দেশের প্রায় দেড় শ কোটি মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করতে না পারাটা হবে রাজনীতিকদের চরম ব্যর্থতা।

২০১৫ সালে স্থলসীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার ফলে ছিটমহলের মানুষের দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রহীনতার অবসান ঘটে। কিন্তু তারপরও কিছু সমস্যা যেমন রয়েই গেছে, তেমনি যোগ হয়েছে নতুন করে আরও কিছু সমস্যা। অনেকে আবার নাগরিকত্বও পাননি। এসব সমাধানকল্পে ছিটমহলের সমস্যা ও সংকট নিয়ে এই সংখ্যায় আলোচনা করেছেন মোহাম্মদ গোলাম রব্বানী।

সারা বিশ্বে পারস্পরিক আস্থা ও সম্পর্ক তথা বিশ্বায়নের ধারণা যখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, তখন বাংলাদেশ ও ভারতের সামনে সেসব কাটিয়ে ওঠার সুযোগ রয়েছে। সে পথে এই দুই দেশ কতটুকু সফল হবে, তার ওপরই নির্ভর করছে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতার ভবিষ্যত্।

বর্তমানে বিশ্বায়ন-সম্পর্কিত নানা আলোচনা-সমালোচনা বিবেচনা করে আমরা এবারের সংখ্যায় বিশ্বায়নের গতিপথ বোঝার চেষ্টা করেছি। বদরুল আলম খানের লেখায় বিশ্বায়নের ধারণা যে বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত বিষয়, তা ধরা পড়েছে। বিশ্বায়নের ইতিহাস টেনে এনে তিনি বর্তমানকালের বিশ্বায়নের গতি-প্রকৃতি বোঝার চেষ্টা করেছেন। অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বায়নের ফলে সৃষ্ট আত্মপরিচয়ের সংকট, সংস্কৃতির উচ্ছেদ, ক্ষমতাকাঠামোর মতো ক্ষমতার রাজনীতি ও সামাজিক পরিবর্তনের ফলে গড়ে ওঠা নানামুখী ধারার মধ্যে দ্বন্দ্ব-কলহ উঠে এসেছে এই প্রবন্ধে।

প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিত্স বিশ্বায়নের অনেক বিষয়ে খোলামেলা সমালোচনা করেছেন। বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ স্টিগলিত্স তাঁর বই মেকিং গ্লোবালাইজেশন ওয়ার্ক গ্রন্থে বিশ্বায়নকে আরও কার্যকর করার ওপর জোর দিয়েছেন। বিশ্বায়ন বিষয়ে ধনী ও গরিব দেশগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্বের একটি বড় কারণ বাণিজ্য ও মেধাসম্পদ। এ দুই বিষয়ে কীভাবে উন্নত নীতি ও প্রতিষ্ঠান তৈরির মাধ্যমে বিশ্বায়নকে আরও বেশি কার্যকর করা যায়, এই বইয়ের আলোকে সেই আলোচনাই করেছেন প্রতীক বর্ধন।

বিশ্বায়নের উল্টোরথ বিবেচনায় রেখে এই সংখ্যায় আমরা চেষ্টা করেছি বিশ্বায়নের পক্ষের মৌলিক যুক্তিগুলোয় পুনরায় দৃষ্টিপাত করতে। এর ফলে বর্তমান বিশ্বে বিশ্বায়নবিরোধী যে ধারা সৃষ্টি হয়েছে তা পাঠকের জন্য বোঝা সহজতর হবে। বিশ্বায়নের অন্যতম প্রবক্তা জগদীশ ভাগবতী তাঁর ইন ডিফেন্স অব গ্লোবালাইজেশন গ্রন্থে বিশ্বায়নবিরোধিতার জবাবগুলো বিভিন্ন বিষয়ের আলোকে ব্যাখ্যা করেছেন। সেসব যুক্তির আলোকে বইটি আলোচনা করেছেন খলিলউল্লাহ্। বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে যেসব যুক্তি দেওয়া হয়, তার অনেকগুলোই যথাযথ। সেগুলো কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, সেটাই বিশ্বায়নের ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। খলিলউল্লাহ্ এই আলোচনায় এই বিষয়টির ওপরই বেশি আলোকপাত করেছেন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন