সম্পাদকীয়

সমসাময়িক প্রসঙ্গ: কয়েকটি নতুন পাঠ

বিজ্ঞাপন

১. বৈষম্য ও উন্নয়ন

১৮৯০ সালে প্রকাশিত প্রিন্সিপলস অব ইকোনমিকস বইয়ে আলফ্রেড মার্শাল বলেছেন, কেন একদল লোক সুসংস্কৃত জীবন যাপন করবে আর অন্য এক দল কায়িক শ্রমে খেটে মরবে, এটা অর্থশাস্ত্রের সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্ন। এ দেশে মার্শালের পরিচিতি নব্য-ধ্রুপদি অর্থশাস্ত্রের অন্যতম স্থপতি হিসেবে, তবে সেখানেই তাঁর পরিচয় সীমাবদ্ধ নয়। উদারনৈতিক অবস্থানে থেকেই তিনি বিশ্বাস করতেন সমাজতন্ত্রে, ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে, নারীশিক্ষা প্রসারে, বৃহত্তর নারীমুক্তিতে, দারিদ্র্যের অবসানে, অর্থনৈতিক বৈষম্যের ব্যাপক হ্রাসে, এক মুক্ত সমাজের আদর্শে। যেমন গণিতবিদ ছিলেন একদিকে, তেমনি অন্যদিকে অর্থশাস্ত্রকে তিনি বৃহত্তর সমাজবিদ্যার অংশ হিসেবেই দেখতেন। রাজনীতি, নীতিশাস্ত্র ও সামাজিক মনস্তত্ত্বকে অর্থনৈতিক বিচারের পাশাপাশি সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করতেন। নব্য-ধ্রুপদি অর্থশাস্ত্রের ‘লিবারেল’ মার্শাল আর সমতাপন্থী ‘র্যাডিক্যাল’ মার্শাল—এই দুই চরিত্রের সমন্বয়ে এক নতুন ধারা গড়ে উঠেছিল প্রথাগত বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মধ্যেই। চলতি সংখ্যার গোড়ার প্রবন্ধে অর্থনীতিবিদ আজিজুর রহমান খান স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে বৈষম্যবিরোধী চেতনা শুধু উদারনীতিকদের মধ্যে নয়, রক্ষণশীলদের একাংশের মধ্যেও উনিশ শতকে জাগ্রত ছিল। তিনি উনিশ শতকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রক্ষণশীল প্রধানমন্ত্রীদের একজন বেঞ্জামিন ডিজরেলির উদ্ধৃতি দিয়ে তাঁর আলোচনা শুরু করেছেন। সেখানে ডিজরেলি বলেছেন, ধনী ও দরিদ্র এরা যেন দুই সামাজিক গ্রহের অধিবাসী, যাদের মধ্যে নেই কোনো যোগাযোগ, কোনো সহমর্মিতাবোধ বা পরস্পরের প্রতি কোনো সহায়-সমর্থন। দরিদ্রদের জগত্ সম্পর্কে এক বিশাল অজ্ঞতা নিয়েই ধনীরা তাদের জীবন অতিবাহিত করে। এ কথা আজকের যুগের সারকোজি-মিট রমনিদের মতো রক্ষণশীলদের কাছে আমরা আশাই করতে পারি না।

অর্থনীতিবিদ আজিজুর রহমান খানের বিভিন্নবিধ গবেষণার অন্যতম ক্ষেত্র সমাজের ভেতরের আয়-বৈষম্য। কিন্তু এই প্রবন্ধে তিনি আয়-বৈষম্যের আলোচনা করতে গিয়ে আরও কিছু মৌলিক প্রশ্নের উত্থাপন করেছেন, যা বৃহত্তর পাঠক-সমাজের মনোযোগ দাবি করে। আমরা এখানে তেমন দু-তিনটি দিকের ওপর জোর দিতে চাই, যা তাঁর দেখা থেকে অনুসিদ্ধান্ত হিসেবে বেরিয়ে এসেছে বলে আমাদের মনে হয়েছে। ‘আমাদের কাল’ বলতে লেখক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে আয়-বৈষম্যের গতিপ্রকৃতির প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন। তিনি তথ্য দিয়েছেন যে গত শতকের পঞ্চাশ-ষাটের দশকে অর্থনৈতিক বৈষম্য বিশ্বজোড়াই ছিল বেশ নিচুতে, সে সময়ে আয়-বৈষম্য বেড়ে থাকলেও সেটা ঘটেছে শ্লথগতিতে। এই অবস্থাটা আশির দশকের গোড়া থেকে পরবর্তী দুই দশকে (অন্তত ২০০৫ সাল অবধি) নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। প্রায় সর্বত্রই আয়-বৈষম্য দ্রুত হারে বাড়তে থাকে। লেখকের একটা প্রধান অবস্থান হচ্ছে, আয়-বৈষম্যের এতটা বৃদ্ধি অনিবার্য ছিল না, অভিপ্রেত তো নয়ই। যে হারে গত তিন দশকে চীনে, ভারতে বা এর আগে আশি-নব্বইয়ের দশকের লাতিন আমেরিকায় আয়-বৈষম্য বেড়েছিল বা বাংলাদেশেও যেভাবে বাড়ছে এখন, তার অনেকটাই ঠিকঠাক উদ্যোগ নিলে এড়ানো সম্ভব ছিল। বিকাশের মূল ধারাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করেই এটা পারা যেত। তা ছাড়া এটা শুধু পারা না-পারার প্রশ্ন নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সামাজিক শান্তি, স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন, টেকসই গণতন্ত্র এ রকম বড় বড় বিষয়ও।

বৈষম্যকে প্রতিহত করার দৃষ্টান্তমূলক অভিজ্ঞতা হিসেবে লেখক দৃষ্টি দিয়েছেন মূলত সামাজিক-গণতান্ত্রিক (সোশ্যাল-ডেমোক্রেটিক) ধারায় এগোনো দেশগুলোর প্রতি। এর মধ্যে থাকছে উন্নত বিশ্বের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, যার সর্বাগ্রে রয়েছে নরডিক দেশগুলো, যেমন: নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ড। সেই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেছেন একটি অতিসাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাও। লাতিন মহাদেশের একটি বড় অংশ—ব্রাজিল, চিলি, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, ভেনেজুয়েলা, বলিভিয়া—প্রায় অসম্ভবকে সম্ভব করতে চেয়েছে আয়-বৈষম্যকে রাশ ধরে টানার প্রশ্নে; কোনো কোনো দেশে (যেমন ব্রাজিলে) আয়-বৈষম্য লক্ষণীয়ভাবে কমে এসেছে যুক্তিযুক্ত রাজস্ব ও আর্থিক নীতি এবং গরিবমুখীন সামাজিক কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে। ইউরোপে কোন প্রেক্ষাপটে, কোন সামাজিক-রাজনৈতিক শক্তিবিন্যাসের পরিপ্রেক্ষিতে এই সমতাবাদী সামাজিক-গণতান্ত্রিক ধারা গড়ে উঠতে পেরেছিল তা একটি পৃথক আলোচনার বিষয়। তবে সমতাবাদী এই ঝোঁক থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারেনি একসময় এক অর্থে গোটা পশ্চিম ইউরোপই। কিন্তু এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হলো, খোলাবাজারসর্বস্ব অর্থনৈতিক মতাদর্শের মধ্য থেকে কীভাবে সামাজিক-গণতান্ত্রিকতার এই ধারা এখনো বহমান রয়েছে, ইউরোপের সেই প্রাণশক্তির দিকটি বোঝার চেষ্টা করা। এর থেকে আমরাও কোনো শিক্ষা নিতে পারি কি না? লাতিন আমেরিকার বেশ কিছু দেশ ২০০০-এর দশকে সচেতনভাবে মোড় নিয়েছে সমতাবাদী সমাজের দিকে। সেখানে শুধু মানবাধিকারের চেতনাসমৃদ্ধ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে তা-ই নয়, আয়-বৈষম্যও কমে এসেছে বা বৈষম্য বাড়ার গতিকে রুখে দেওয়া হয়েছে। এর থেকেও কি আমরা কোনো শিক্ষা নিতে পারি? এসব দেশে আয়-বৈষম্যকে উন্নয়নের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে নয়, বরং আয়-বৈষম্য কমিয়ে আনাকে উন্নয়নের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা এক ভিন্ন সামাজিক পূর্বপ্রস্তুতি নির্দেশ করে। আমাদের দেশেও কি সে রকম কোনো প্রস্তুতি গড়ে উঠতে পারে—যেমনটা হয়েছে নীরবে ব্রাজিলে, চিলিতে বা আর্জেন্টিনায়? আর কতকাল আমরা বিকাশের প্রশ্নটিকে কেবল রাজনৈতিক অকার্যকরতার আর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটিকে কেবল কিছু কিছু ছাড়া ছাড়া ‘সামাজিক নিরাপত্তা জাল’ ফেলার অধীন করে রাখব? খান হয়তো ইঙ্গিত দিচ্ছেন, আমাদের দেশেও বৈষম্যকে সহনীয় মাত্রায় কমিয়ে নিয়ে আসার জন্য দরকার একটি আধুনিক সামাজিক-গণতান্ত্রিক চরিত্রের সরকারব্যবস্থা, যা ধারাবাহিকভাবে বৈষম্যবিরোধী পদক্ষেপ নিতে ভোটারদের কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবে।

প্রথাগত সমাজতন্ত্রের আলোচনাও প্রসঙ্গক্রমে এই লেখায় উঠে এসেছে। একদা সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোয় আমলাতন্ত্রের ওপর ভর করে যে কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা-ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তাতে অদক্ষতা কালক্রমে দেখা দিচ্ছিল। এটি সুবিদিত বিষয়। কিন্তু লেখক এখানে আরও একটি চমকপ্রদ তথ্য হাজির করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ষাট-সত্তরের দশকে এসব ‘সমাজতান্ত্রিক’ দেশে আয়-বৈষম্য মোটের ওপর সামাজিক-গণতান্ত্রিক ধারায় বিকাশমান নরডিক দেশগুলোর চেয়ে কম তো ছিলই না, বরং সামান্য বেশিই ছিল। অর্থাত্ দক্ষতা কম ছিল সেটাই নয়, সমতাবাদী সূচকেও এসব ‘সমাজতান্ত্রিক’ দেশে বেশ খানিকটা ঘাটতি দেখা গিয়েছিল।

প্রথাগত সমাজতান্ত্রিক বিকাশের ভেতর ‘গোড়ায় গলদ’ কোথায় ছিল সে প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠেছে এর পরে। অমর্ত্য সেনের মতো তিনিও মনে করেছেন যে গণতন্ত্র ও বাজার-ব্যবস্থার অনুপস্থিতি এসব দেশের বিকাশে একপর্যায়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ ক্ষেত্রে তৃতীয় আন্তর্জাতিক ও লেনিনকে দুষেছেন তিনি। আন্তোনিও গ্রামশি তো বলেই ছিলেন, ১৯১৭ সালের নভেম্বরের বিপ্লব ছিল ‘রেভল্যুশন অ্যাগেইনস্ট ক্যাপিটাল’। তবে সেদিন যদি রাশিয়া বা ইউরোপ প্লেখানভ-কাউটস্কির লাইনে অগ্রসর হতো, বাম-প্রগতিশীল ধারা বিশ্বজুড়ে আরও মজবুত অবস্থানে যেতে পারত কি না সে প্রশ্নও আজ উঠতে পারে। বিষয়টা শুধু প্রথাগত সমাজতন্ত্রের দেশগুলোয় বহুদলীয় গণতন্ত্রের অনুপস্থিতির সমস্যাই নয়, অর্থনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে বাজার-ব্যবস্থার কার্যত অবসানও একটি আদি ত্রুটি—এটা লেখক গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। তবে নিউ ইকোনমিক পলিসি গ্রহণ করে লেনিন যে এই ত্রুটিটা বেশ কিছু পরিমাণে, হয়তো মৌলিকভাবেই, শুধরে নিতে চেয়েছিলেন, লেখক সে প্রসঙ্গটা কিছুটা এড়িয়েই গেছেন। সমাজতন্ত্র হচ্ছে পুঁজিবাদ থেকে সাম্যবাদে যাত্রার এক দীর্ঘ উত্তরণশীল পর্ব, যেখানে মালিকানা-সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার প্রথাবিরোধী নানা সমাবেশ ঘটতে পারে—এ রকম ইঙ্গিত লেনিনের লেখায় পাওয়া যায়। তার পরও প্রণিধানযোগ্য লেখকের এই মন্তব্য যে মূলধারার বামপন্থীরা অতীতের ভুল-ত্রুটি থেকে প্রায় কিছুই শিখতে চাননি, এখনো চান না, এবং তাঁরা এখনো পুরোনো তত্ত্বের আরও নিখুঁত প্রয়োগের মধ্যেই সমাজতন্ত্রের আদি রূপকল্পের সংকট থেকে মুক্তি খুঁজে চলেছেন। সমাজতান্ত্রিক সমতাবোধকে স্থায়িত্বশীল রূপ দেওয়ার জন্য বাজার-ব্যবস্থার প্রায়োগিক ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তাকে জোরেশোরে স্বীকৃতি দিতে এখনো তাঁরা দ্বিধান্বিত।

সবশেষে লেখক দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন আধুনিক পুঁজিবাদের কতগুলো পরিবর্তনশীল বৈশিষ্ট্যের প্রতি। আন্তেনিও নেগরি ও মাইকেল হার্ডট্-এর এমপায়ার বইয়ের মতোই খানও মনে করেন যে উন্নত বিশ্বে উত্পাদনের প্রকৃতি বদলে যাচ্ছে; বেড়ে যাচ্ছে শ্রমশক্তিতে সেবা খাতের ক্রমবর্ধমান নিয়োজন; ক্রমেই কায়িক শ্রমের জায়গা নিচ্ছে মানসিক শ্রম; পুরোনো শিল্প-প্রলেতারিয়েতের ওপর আর এই পরিস্থিতিতে বিপ্লবের চালিকাশক্তি হিসেবে নির্ভর করা যাচ্ছে না। লেখকের একটি প্রধান পর্যবেক্ষণ হলো, আশির দশক থেকে ক্রমবর্ধিষ্ণু আয়-বৈষম্যের ধারা যে অব্যাহত থাকতে পেরেছিল তার কারণ ছিল—এই পর্বে সমাজে বৈষম্য-সহিষ্ণুতাও আগের চেয়ে আরও বেড়ে গিয়েছিল—অন্তত ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দা পরিস্থিতি পর্যন্ত অবস্থাটা ছিল এমনই। এর পেছনে উত্পাদন খাতের একটু আগেই উল্লেখ করা ‘কাঠামোগত পরিবর্তন’ যেমন কাজ করেছে, তেমনি প্রথাগত সমাজতন্ত্রের বিপর্যয় ও পরে এর কার্যত বিলুপ্তিও বৈষম্য-সহিষ্ণুতাকে প্রভাবিত করে থাকবে। অর্থনৈতিক মতাদর্শের একটি নতুন স্লোগানও উন্নয়নশীল দেশের নীতিপ্রণেতাদের মধ্যে বৈষম্য প্রশ্নে বিভক্তি সৃষ্টি করে থাকবে। এ সময়ের প্রাধান্যশীল উন্নয়ন-আদর্শের একটি স্তম্ভ ছিল আয় প্রবৃদ্ধির তুলনায় আয়-বৈষম্যের প্রশ্নটিকে খাটো করে দেখা। যেমন বলা হচ্ছিল (এটা এ দেশের নীতিনির্ধারক মহলে এখনো চালু): দারিদ্র্য যদি কমতে থাকে, তবে আয়-বৈষম্য বাড়লেও দুশ্চিন্তার তেমন কোনো কারণ নেই। তবে এই অবস্থাটার সম্প্রতি পরিবর্তন হচ্ছে বলে মনে করেন লেখক। আরব-বসন্ত, চীনে বৈষম্য নিয়ে বাড়তে থাকা জন-অসন্তোষ, ভারতের আঞ্চলিক বৈষম্য ও সামাজিক অস্থিরতা, উন্নত বিশ্বে সর্বোচ্চ ১ শতাংশের হাতে জাতীয় সম্পদের উত্তরোত্তর ঘনীভবনের সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে গড়ে ওঠা যুক্তরাষ্ট্রের ‘অকুপাই ওয়ালস্ট্রিট’ আন্দোলন—এসব ঘটনা বিচ্ছিন্নভাবে জন্ম নিলেও সব মিলিয়ে তা বৈষম্য সম্পর্কে সাধারণ জনগোষ্ঠীর মনে সংবেদনশীলতাকে আবার নতুন করে উসকে দিয়েছে। আশা করা যায়, আজিজুর রহমান খানের এই গুরুত্বপূর্ণ লেখাটি বৈষম্য বিষয়ে এ দেশেও নতুন করে মতবিনিময়কে উত্সাহিত করবে।

২. অসম্পূর্ণ গণতন্ত্র

প্রগতির রথের ঘোড়া কেবল সামনের দিকে চলে না, পেছনেও গড়ায়, গড়াতে পারে—এই বোধে রচিত হয়েছে আলী রীয়াজের লেখাটি। যাঁরা ভাবেন যে জিডিপির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে দেশ যেমন নিম্ন-আয়ের স্তর থেকে মধ্য আয়ের স্তরের দিকে এগোয়, আমাদের দেশের ‘অসম্পূর্ণ গণতন্ত্রও’ তেমনই একসময় ‘সম্পূর্ণ গণতন্ত্রের’ চেহারা নেবে—এ রকম মিছে আশাবাদে আস্থা নেই লেখকের। তাঁর যুক্তি, এমনও হতে পারে আমরা যাকে গণতন্ত্র বলছি তা আসলে ছদ্ম গণতন্ত্র বা ছদ্মবেশী অন্য কোনো তন্ত্র বা বড়জোর গণতন্ত্রের বিকৃত রূপ, যার থেকে স্বাভাবিক উত্তরণ সম্ভব নয়। যাঁদের চোখে গণতন্ত্র মানে নির্বাচনী কেন্দ্রের বাইরে ভোটারদের লম্বা লাইন, মন্ত্রীদের শপথ নেওয়া, জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের প্রাথমিক উপস্থিতি ও ক্রমান্বয়ে অনুপস্থিতি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিতর্ক, নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মোটামুটি শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতার হাতবদল, অর্থাত্ যাঁরা নির্বাচন-কেন্দ্রিকতার মধ্যেই গণতন্ত্রের ধারণাকে সীমিত করে রাখতে চান, আলী রীয়াজ সেই অভ্যস্ত পথে হাঁটেননি। নির্বাচনকেন্দ্রিক সংজ্ঞা থেকে বেরিয়ে এসে তিনি গণতন্ত্রকে বড় মাপে ধরতে চেয়েছেন। এ দেশে গণতন্ত্রের মাত্রা, প্রকৃতি বা স্তর নির্ণয় করার দিকে অগ্রসর হওয়াই তাঁর মূল লক্ষ্য।

১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ভেতর দিয়ে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সরকার বদলের যে প্রক্রিয়া এ দেশে শুরু হয়েছে, সে পথ গোড়া থেকেই মসৃণ ছিল না। বাংলাদেশের এই গণতন্ত্র আদৌ ‘গণতন্ত্র’ কি না বা হয়ে থাকলে তা কোন ধরনের সংজ্ঞায় পড়ে, সেটি শুধু তত্ত্বগত কচকচির বিষয় নয়। রীয়াজ যুক্তি দিয়েছেন যে এ দেশের গণতন্ত্রের মধ্যে যেসব অগণতান্ত্রিকতার বৈশিষ্ট্য দৃশ্যমান, তা আসলে ‘একটি বিশেষ ধরনের ত্রুটিপূর্ণ (ডিফেক্টিভ) গণতন্ত্রের লক্ষণ’। বিকাশের নির্দিষ্ট স্তর হিসেবে ‘বিকৃত ধরনের পুঁজিবাদ’ নিয়ে আমাদের দেশে সত্তর-আশির দশকে বেশ কিছু লেখালেখি হয়েছিল। তার সঙ্গে সমান্তরাল রেখে বলা যেতে পারে যে নব্বই-পরবর্তী শাসনব্যবস্থা গণতান্ত্রিক বটে, তবে তা বিষম ত্রুটিপূর্ণ। ‘ত্রুটি’ অবশ্য উন্নত বিশ্বের গণতন্ত্রেও পাওয়া যাবে এবং এ যুক্তিও জানা যে ‘পরিপূর্ণ গণতন্ত্র’ কোথাও নেই। যে গণতন্ত্র আদর্শস্থানীয়, যে গণতন্ত্র ‘এখনো আসতে বাকি’ (জাঁক দেরিদা ডেমোক্রেসি-টু-কাম বলতে যে ব্যবস্থাকে অনুক্ত আদর্শ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন) সে অনেক দূরের স্বপ্ন, সাম্যবাদের মতোই প্রায়। রীয়াজ সেদিকে না গিয়ে শুধু বলছেন, প্রথাগত গণতন্ত্রের মধ্যেও আমাদের গণতন্ত্র বিশেষ ত্রুটিপূর্ণ স্বভাবের, যেন অনেকটা জন্মগতভাবেই তা উত্থানরহিত, ভারসাম্যবিহীন, বিকলাঙ্গ। বিকৃত পুঁজিবাদের মতোই এটি নিজেকে কেবল ত্রুটিপূর্ণভাবেই পুনরুত্পাদিত করতে পারে বা সেই লক্ষ্যে ক্রমাগত পূর্বশর্ত সৃষ্টি করে চলেছে। অর্থাত্ ধীরলয়ে কোনো একটি বা দুটি নীতির বা সংবিধানের এই ধারায় বা ওই ধারায় ‘সংস্কার’ করে এই ত্রুটি সহসা শুধরে নেওয়ার নয়। রীয়াজ এও বলছেন যে এই বিকৃত গণতন্ত্রের প্রশ্ন শুধু আমাদের দেশের সমস্যা নয়। গত এক দশকে নানা দেশেই গণতন্ত্রের ‘তৃতীয় ঢেউ’ বলে যে প্রবণতা দেখা দিয়েছিল, যাকে নিয়ে প্রবল আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছিল একুশ শতকের সূচনা পর্বে, তা আজ ক্রমিক হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে গেছে। এর কারণ, প্রত্যাশা ও অর্জনের মধ্যে বিপুল ফারাক তৈরি হয়েছে। এর ফলে, এসব দেশে এখন দেখা যাচ্ছে ‘গণতন্ত্রের পিছু হটা’-র নতুন প্রবণতা।

ভূতের পা যেমন পেছনে, এই ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্রের পরিণতি হচ্ছে পেছন পানে চলা। আমাদের দেশেও এই পশ্চাদ্যাত্রার সবিশেষ লক্ষণ দেখা দিয়েছে, যা কোনো আদর্শস্থানীয় গণতন্ত্রের দিকে ক্রম-অগ্রযাত্রাকে নির্দেশ করে না। বরং ইঙ্গিত দেয় ‘এক সংকর শাসনব্যবস্থার’ (হাইব্রিড রেজিম) ক্রমেই গেড়ে বসার আশঙ্কার প্রতি। এই সংকর শাসনব্যবস্থার নাম নানাজন নানাভাবে দিয়েছেন—কোথাও আধা গণতন্ত্র, কোথাও ছদ্ম গণতন্ত্র, কোথাও অনুদার গণতন্ত্র, কোথাও নির্বাচনী কর্তৃত্ববাদ, কোথাও আধা বা প্রায় কর্তৃত্ববাদ, কোথাও অসহিষ্ণু গণতন্ত্র। এটি ‘সংকর’ ব্যবস্থাই, কেননা আপাতদৃষ্টিতে নিয়মিত বিরতিতে নির্বাচন হলেও এবং নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হাতবদল হলেও নাগরিকেরা এখানে আদর্শ গণতন্ত্রের বেশির ভাগ নাগরিক অধিকার থেকেই বঞ্চিত। গণতান্ত্রিক দেশে বাস করলেও তাঁরা শেষ পর্যন্ত ‘প্রজাই’ থেকে যান। যেখানে ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়ে থাকে উচ্চবর্গের মুষ্টিমেয় স্বার্থান্বেষীর হাতে। এবং যেখানে অবাধে চলে ‘তস্করের শাসন’ (ক্লেপটোক্রেসির রীয়াজকৃত ভাষান্তর)। এ রকম পরিস্থিতিতে পার্থ চট্টোপাধ্যায় দেখিয়েছেন রিপাবলিক ভাষান্তরে হয় ‘প্রজাতন্ত্র’, যেখানে নাগরিকেরা পর্যবসিত হয় এক আধুনিক রায়ত শ্রেণীতে, আর ক্ষমতার অনুশীলন করে এক আধুনিক জমিদার শ্রেণী।

১৯৯০-এর গণ-আন্দোলনের পর অপসারিত সামরিক স্বৈরতন্ত্রের পরিবর্তে ক্রমেই এক ছদ্ম-গণতন্ত্র গড়ে উঠতে থাকে। কীভাবে এই ছদ্ম গণতন্ত্র গড়ে উঠল কয়েকটি সূচক (ইনডেক্স) ব্যবহার করে লেখক তাঁর যুক্তি প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস পেয়েছেন। সূচকের পরিমাপ বা প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে তর্ক তোলার অবকাশ আছে, কিন্তু লেখকের উদ্দেশ্য ছিল রীতিসর্বস্ব (নির্বাচনকেন্দ্রিক সংজ্ঞায় আবদ্ধ) গণতন্ত্রের ও প্রকৃত গণতন্ত্রের মধ্যে প্রভেদরেখা টানা এবং সময়ের সঙ্গে এই ব্যবধান কীভাবে বেড়ে যাচ্ছে তার প্রতি পাঠকের দৃষ্টি ফেরানো। তাঁর কাজ থেকে দেখা যাচ্ছে, গণতন্ত্রের মাত্রা পরিমাপের বেশির ভাগ সূচকেই বাংলাদেশের অবস্থান হয় এখনো অনেক নিচুতে (যেমন দুর্নীতি ও জবাবদিহির সূচকে) অথবা লক্ষণীয়ভাবে পিছু হটছে (যেমন গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসংক্রান্ত সূচকে)। এই সংখ্যাগত বিচার দেশের গণতন্ত্রের মান সম্পর্কে সাধারণ্যে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণাকে আরও প্রামাণ্যতা দিয়েছে। তবে এসব সূচকে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয়ের সঙ্গে তুলনীয় অন্য দেশসমূহের পরিপ্রেক্ষিতে এমনকি ভিন্ন আয়ের হলেও পার্শ্ববর্তী বিবেচনায় দক্ষিণ এশীয় অন্যান্য দেশের তুলনায়—আমাদের গণতন্ত্রের মান কেমন, সে সম্পর্কে পাঠক স্বাভাবিকভাবেই ধারণা লাভ করতে চাইবেন, যেটি আপাতত পাওয়া গেল না।

তবে এখানে একটি বাড়তি প্রসঙ্গও না উঠে পারে না। এতটা ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্রে থেকেও কী করে আমাদের দেশে প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য দূরীকরণ ও মানব উন্নয়নের অপেক্ষাকৃত সরল সূচকগুলোয় গত দুই দশকে এতটা উন্নতি সাধন সম্ভব হলো? লেখক এ প্রসঙ্গে তাঁর লেখায় যাননি, সেটি হয়তো তাঁর আলোচ্য বিষয়ও ছিল না। ইকোনমিস্ট পত্রিকার সাম্প্রতিক একটি সংখ্যায় বাংলাদেশ বড় আকারে শিরোনাম হয়েছে আবারও, তবে এবার স্নেহপূর্ণ দৃষ্টিতে।

‘অকার্যকর রাজনীতির ভেতরে উন্নয়ন’ ইকোনমিস্ট পত্রিকার এই শিরোনাম এ রকম সম্ভাবনা মনে করিয়ে দেয় যে গণতন্ত্রের মানের বিচারে ত্রুটিপূর্ণ হয়েও এবং চরিত্রের দিক থেকে ‘সংকর’ শাসনব্যবস্থার মধ্যে থেকেই বাংলাদেশ আশাতীতভাবে উন্নতি করেছে কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সূচকে। শত ত্রুটির মধ্যেও তাহলে দেখা যাচ্ছে বেশ কিছু সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত রয়ে গেছে এ রকম গণতন্ত্রেও। নাকি গণতন্ত্রের সঙ্গে এসব উন্নয়ন-অর্জনের আসলে কোনো সম্পর্কই নেই—এসব সূচকে উন্নতি এমনিতেই ঘটত তা দেশে যে প্রকারের শাসনব্যবস্থাই থাকুক না কেন? বিশ্বায়নের চাপে দেশের উত্পাদনকাঠামো ও সামাজিক মূল্যবোধের ক্রমপরিবর্তনশীল চরিত্রের কারণেই, অসম্পূর্ণ গণতন্ত্র সত্ত্বেও, এসব অর্থনৈতিক-সামাজিক সূচকে বেশ তাত্পর্যপূর্ণ উন্নতি ঘটে থাকবে। এ নিয়ে সংগত কারণেই আরও বাড়তি যুক্তি-তর্ক-মীমাংসা বাকি রয়ে গেল। প্রতিচিন্তার পরবর্তী কোনো সংখ্যায় প্রায় অকার্যকর গণতন্ত্রের মধ্যে উন্নয়নের ধাঁধা নিয়ে আমরা আরও লেখা ছাপাব আশা করছি।

৩. নদী ও রাষ্ট্র

ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির বন্ধুত্ব হয়, কিন্তু রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক, কূটনীতির খাতিরে বলা হয় যদিও, কখনো স্বভাবত বন্ধুত্বপূর্ণ বা শত্রুতাপূর্ণ হয় না। রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক চালিত হয় দেশের স্বার্থের দ্বারা এবং স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিকে নিষ্পন্ন হতে হয় দর-কষাকষি বা বোঝাপড়ার ভিত্তিতে। ‘হাত ঘোরালে নাড়ু দেব, নইলে নাড়ু কোথায় পাব’—এই শিশুতোষ বুঝ দিয়ে দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় সম্পর্ক চালনা করা যায় না। যেমন ভারত-বাংলাদেশ এই দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ-চিন্তায় ‘ট্রানজিট’ একটি বিরাট আলোচনার বিষয়। ভারত অনেক কাল ধরেই তার উত্তর-পূর্ব রাজ্যের সঙ্গে যোগাযোগ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সুগম করার জন্য বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ট্রানজিট চাইছে। অন্যদিকে, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের জরুরি স্বার্থ জড়িত এমন অনেক বিষয়ে আলোচনা ঝুলে আছে, তর্কের সুরাহা হয়নি, সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে নিরাপত্তা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সীমান্তরেখা নির্ধারণ, ছিটমহল বিনিময়, পানি বিনিময়, সীমান্তে কাঁটাতার, ভারতীয় মিডিয়ায় বাংলাদেশি টিভি চ্যানেলের কার্যত অনুপস্থিতি, এমনকি ভিসার আবেদন-প্রক্রিয়া ও মাল্টিপল ভিসা সহজতর করার বিবিধ প্রসঙ্গ। ট্রানজিট দিয়ে দিলে বাংলাদেশের স্ট্র্যাটেজিক দর-কষাকষির সুযোগ আরও কমে যাবে—এ রকম একটি ধারণা ব্যাপকভাবে চালু আছে এ দেশের সাধারণ্যে। নজরুল ইসলাম যুক্তি দেখিয়েছেন যে এই ট্রানজিটও ভারতকে দেওয়া যায়, তবে সে ক্ষেত্রে নদীর পানি বণ্টন-বিষয়ক সমুদয় জটিলতা আগে মীমাংসা করতে হবে। যেমন তিস্তা ছাড়াও আরও পঞ্চাশের অধিক নদীর পানি নিয়ে এখনো আলোচনা তোলাই বাকি। লেখকের ভাষায়, ট্রানজিট দেওয়ার মূল সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিক। বাংলাদেশের জন্য এ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তটি কেবল তখনই দেওয়া সংগত, যখন এর বিনিময়ে সে স্ট্র্যাটেজিক সুফল অর্জন করবে। একইভাবে ফারাক্কা, গজালডোবা প্রভৃতি বাঁধ অপসারণ করে নদ-নদীগুলো উন্মুক্ত করা ভারতের জন্যও একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্যও ভারতকে বিনিময়ে একটা স্ট্র্যাটেজিক সুফল পেতে হবে। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ট্রানজিটের সুযোগ ভারতের জন্য তেমনই একটি স্ট্রাটেজিক সুফল। তবে প্রবন্ধটি নিছক নদীর বিনিময়ে ট্রানজিট আলোচনার মধ্যে সীমিত থাকেনি। নদীমাতৃক বাংলাদেশে যেকোনো দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ক্ষেত্রে ‘নদী’ একটি কেন্দ্রীয় ধারণা। ভারতের সঙ্গে অভিন্ন নদ-নদীর ভাগাভাগির প্রশ্নটি আরও তীব্রতা পেয়েছে ভারতে ‘নদী সংযোগ প্রকল্প’ নিয়ে নতুন পদক্ষেপ গ্রহণের পরিপ্রেক্ষিতে। কারণটা বোঝা শক্ত নয়। এই নদী সংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে ভারতের উদ্দেশ্য হলো ব্রহ্মপুত্র নদ, গঙ্গা নদী ও তাদের বিভিন্ন উপনদীর পানি মোট ৩০টি সংযোগ খালের মাধ্যমে পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারত অভিমুখে প্রবাহিত করা। এমনিতেই ফারাক্কার কারণে গঙ্গার প্রবাহ হ্রাসের নেতিবাচক অভিঘাত এখনো এ দেশ সামলে উঠতে পারেনি। এর ফলে এখন বাংলাদেশের ভূপৃষ্ঠস্থ পানির প্রায় ৭০ শতাংশের উত্স হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্রহ্মপুত্র নদ। এই নদী সংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে যদি এবার ভারত ব্রহ্মপুত্র নদের পানিও অপসারিত করে, তাহলে লেখকের ভাষায়, ‘বাংলাদেশের বাকি অধিকাংশ নদ-নদী শুকিয়ে যাবে এবং এ দেশের অর্থনীতি ও প্রতিবেশ এক গভীর সংকটে নিপতিত হবে।’ অথচ ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ইতিমধ্যেই নদী সংযোগ প্রকল্প শুরু করার পক্ষে রায় দিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, এই প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। ২০১৬ সালের মধ্যে প্রকল্পটির পূর্ণ বাস্তবায়নের নির্দেশও আগেভাগে দিয়ে রেখেছেন ভারত সরকারকে। এই প্রকল্পের ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন লেখক বিভিন্ন আঙ্গিকে ও মাত্রায়। এখানে যে যুক্তিগুলো তুলে ধরা হয়েছে তা নিছক একাডেমিক বিচারের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে এ দেশের ১৬ কোটি মানুষের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের প্রশ্ন।

লেখকের যুক্তিতে, যেসব নদ-নদীকে ঘিরে এই নদী সংযোগ প্রকল্প গড়ে উঠবে, সেসব নদী ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এসব নদ-নদী আন্তর্জাতিক নদী এবং এসব আন্তর্জাতিক নদীর বিষয়ে একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত ভারত নিতে পারে না। লেখকের ভাষায়, ‘এ সত্ত্বেও ভারতের সুপ্রিম কোর্ট কীভাবে এ রকম একটি অবিবেচনাপ্রসূত ও অপরিণামদর্শী আদেশ দিতে পারলেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর।’ কিন্তু এই অনিবার্য সমালোচনার পাশাপাশি লেখক আরও মৌলিক প্রসঙ্গের দিকে দৃষ্টি দিয়েছেন। প্রতিবেশী দেশের মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় না নিয়ে অনায়াসে যে সিদ্ধান্ত নিতে পারলেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট, তার পেছনে কাজ করেছে একটি তলবর্তী কারণও। সেটি হচ্ছে নদ-নদীর প্রতি ‘বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি’। ‘নদ-নদীর পানি সমুদ্রে চলে যেতে দেওয়া অপচয়; বরং সবটা পানিই বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রয়োজনে শুষে নিতে হবে’—এই হচ্ছে বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গির স্বরূপ। এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই পশ্চিমে শিল্পবিপ্লবকে ব্যবহার করা হয়েছিল নির্বিচারে প্রকৃতির ওপর আধিপত্য বিস্তারে। আর এখন বিকাশমান চীন ও ভারতের প্রবৃদ্ধির বাণিজ্যিক প্রয়োজনে প্রকৃতিকে ‘শুষে নেওয়ার’ কাজ চলছে। এভাবে তাত্ক্ষণিকের তাগিদ মেটাতে গিয়ে নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা। রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছিলেন, ‘প্রকৃতির বিত্তহরণের’ কাজটি করা হচ্ছে বাণিজ্যিক স্বার্থে—মুনাফা অর্জনের তাগিদে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের উদাহরণ দিয়ে লেখক এই আত্মধ্বংসী কৌশল থেকে সরে এসে নদ-নদীর প্রতি ‘প্রকৃতিসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি’ নিতে বলেছেন। এই সঙ্গে স্মরণ করেছেন ফারাক্কা ও গজালডোবা বাঁধের অভিজ্ঞতা। আধুনিকতার নামে যেকোনো প্রকারের উন্নয়নকে, তা পরিবেশ-প্রতিবেশকে আহত করলেও, মেনে নেওয়ার মনোবৃত্তি হচ্ছে একধরনের উটপাখি মানসিকতা, যেন অন্ধ হলেই প্রলয় বন্ধ থাকবে। লেখকের এই বোধ ‘উত্তর-আধুনিক’। এর আগে বাঁধ দিয়ে বন্যানিয়ন্ত্রণ প্রচেষ্টারও তীব্র সমালোচনা করেছিলেন লেখক ফিউচারস্ পত্রিকার (অক্টোবর ২০০১) একটি স্মর্তব্য লেখায়। তবে সেখানে সমালোচনাটা ছিল আমাদের রাষ্ট্রের ‘অপরিণামদর্শী আধুনিকতা’ নিয়ে। আর এবার তা প্রসারিত হয়েছে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আলোচনায় ভারতীয় রাষ্ট্রের ‘অপরিণামদর্শী আধুনিকতা’ নিয়ে। ঔপনিবেশিক আধুনিকতার চেয়েও আরও ভয়াবহ হতে পারে উপনিবেশ-উত্তর আধুনিকতা—নদ-নদী প্রসঙ্গে ভারতীয় রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি আরও একবার সেটা প্রমাণ করল। এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর জন্য ভারতকে উদ্বুদ্ধ করাতে আমাদের হাতে প্রভাবক খুব বেশি নেই, সে ক্ষেত্রে কৌশলগত হাতিয়ার হতে পারে ট্রানজিট। তবে সেটাই একমাত্র বিবেচনা হতে পারে না ভারতের জন্য। ইতিমধ্যেই জলবায়ু-বিপন্ন দেশের প্রথম কাতারে বাংলাদেশ, তার ওপর নদী সংযোগ প্রকল্পের কারণে নদ-নদী শুকিয়ে গেলে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে এ দেশ। লেখকের বিচারে, ‘প্রায় চার কোটি মানুষ বাস্তুহারা ও জীবিকাহারা হয়ে পড়বে’; এতে জন্ম হতে পারে পরিবেশ-শরণার্থীর বাস্তব সমস্যা, যার আছর থেকে ভারতও নিজেকে বিমুক্ত রাখতে পারবে না। সীমান্তের কাঁটাতার যতই দীর্ঘ হোক না কেন, পরিবেশের বিপর্যয়ে উদ্বাস্তু উন্মূল মানুষ নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে পারে প্রতিবেশী দেশেও। ইতিমধ্যেই যেটা কিছুটা ঘটছে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে। ছিন্নমূল মানুষ নদীভাঙন ও অন্যান্য পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে ১০০ বছর ধরেই স্থানান্তরিত হচ্ছে সেখানে। আশা করি, যাঁদের উদ্দেশ করে নজরুল ইসলামের এই লেখা, বিশেষত দুই দেশের নীতিপ্রণেতারা, এসব জরুরি প্রসঙ্গ নিয়ে দুদণ্ড ভাববেন। মনে রাখতে হবে, নদ-নদী যেমন রাষ্ট্রের সীমানা মানে না, নদ-নদী বিপন্ন হলে তার অভিঘাতও সীমানা মানবে না।

৪. জিন্নাহ ও পাকিস্তান

এবারের বই আলোচনায় একটি ভিন্নধর্মী বিষয় স্থান পেয়েছে। হাসান ফেরদৌস লিখেছেন জিন্নাহকে নিয়ে, পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিকাশে তাঁর চিন্তাধারার ও ব্যক্তিত্বের ছাপ কীভাবে কতটা পড়েছে, তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিচার করেছেন সম্প্রতি বেরোনো তিনটি বইকে কেন্দ্র করে।

‘মুসলিম লীগের মধ্যে সবচেয়ে গর্বিত ফারাও’ এমন একটি তির্যক শব্দবন্ধে জিন্নাহকে চিহ্নিত করেছিলেন শেরেবাংলা ফজলুল হক। তবে সাদত হাসান মান্টোর ‘জিন্নাহ সাহিব’ স্মৃতিচারণায় এক মানবিক জিন্নাহকে খুঁজে পাওয়া যায়। বিপত্নীক জিন্নাহ্ মাঝেমধ্যেই পুরোনো ট্রাংক বের করে তাঁর পার্শি স্ত্রীর কাপড়-চোপড়ের দিকে চেয়ে থাকতেন অথবা তাঁর একমাত্র কন্যা যে পার্শি সমাজে বিয়ে করে তাঁকে ছেড়ে গেছেন তাঁর শিশু বয়সের জামাকাপড়গুলো নেড়েচেড়ে দেখতেন। নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন তাঁর তিন বোন ও ভাইয়ের সঙ্গে। টাকা পাঠাতেন তাঁদের নিয়মিতভাবে, বিশেষত যাঁদের অবস্থা ভালো ছিল না। নিজে খুব স্বল্পাহারী ছিলেন। তবে ভালোবাসতেন চুরুট খেতে চার্চিলের মতো, আর পছন্দ ছিল নানা মডেলের গাড়ি। বাসায় যারা কাজ করত তাদের প্রতি লক্ষ রাখতেন, তাদের খাওয়া-দাওয়া, হাতখরচ সবকিছুর ব্যাপারে ছিলেন উদার। মান্টোর এই স্মৃতিচারণার ভিত্তি ছিল তাঁর ব্যক্তিগত ড্রাইভার মো. আজাদের সঙ্গে কথোপকথন। কিন্তু সেখানেও দেখা যাচ্ছে জিন্নাহর চরিত্রের একটি অনমনীয় দিক, যার প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে হাসান ফেরদৌসের আলোচনার মর্মার্থ বোঝার ক্ষেত্রে। ওই সাক্ষাত্কারে মান্টো জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আচ্ছা, কখনো কি জিন্নাহকে স্যরি বলতে শুনেছ?’ এর উত্তরে আজাদ বলেছিলেন, ‘না, আমার মনে হয় না কখনো তার ঠোঁট গলে এই শব্দটা বেরিয়েছে, আমার ধারণা পারলে ডিকশনারি থেকে চিরদিনের জন্য তিনি এই শব্দটা ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দিতেন।’ ক্ষীণকায় মানুষ ছিলেন জিন্নাহ এবং সে জন্যই তাঁর মধ্যে গড়ে উঠেছিল এক ইস্পাতদৃঢ় অনমনীয় চরিত্র—এ রকমই সিদ্ধান্ত টেনেছেন মান্টো।

হাসান ফেরদৌস যুক্তি দেখিয়েছেন যে স্বৈরতন্ত্রের দিকে পাকিস্তানের ক্রমাগত এগোনোর পেছনে গোড়ার গলদই দায়ী। আর এই গলদের শুরুর বিন্দু খুঁজে পাওয়া যাবে জিন্নাহর চরিত্রে, দৃষ্টিভঙ্গিতে, আচারে-ব্যবহারে, বিশ্বাসে। পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবীদের (এবং জনগণেরও) একটা বড় অংশ বর্তমানের অবক্ষয় থেকে মুক্তির জন্য কায়েদে আযমের মতে ও পথে ফিরে যাওয়ার পক্ষে সোচ্চার হন। একটি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চেতনায় সমৃদ্ধ সমাজে প্রত্যাবর্তনের জন্য জিন্নাহ আলোকবর্তিকার মতো কাজ করতে পারেন—এটাই তাঁদের যুক্তি। তবে এর থেকে ভিন্ন মতামতও রয়েছে, যেখানে জিন্নাহ সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য শোনা গেছে। এ রকম বিভিন্ন মতের ওপর আলোচনা উত্থাপন করেছেন লেখক। আইতাজ আহসান, হুসেইন হাক্কানি ও ফারজানা শেখ—এঁরা কেউই র্যাডিক্যাল চিন্তাবিদ নন এজাজ আহমেদ ও তারিক আলীর মতো। এক অর্থে এঁরা এলিট বুদ্ধিজীবীদেরই অংশ, তাত্পর্যপূর্ণভাবে তিনজনই পাকিস্তান পিপলস পার্টির বা সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন বা এখনো আছেন। ফলে জিন্নাহর মূল্যায়ন নিয়ে তাঁদের জরিপের এক ভিন্ন রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে।

তবে জিন্নাহকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এঁদের মধ্যেই প্রবল ভিন্নমত রয়েছে। আইতাজ আহসান ‘সিন্ধুমানব’-এর ধারণা নির্মাণ করে বলতে চেয়েছেন যে হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো সভ্যতারই উত্তরসূরি পাকিস্তান এবং এর অধিবাসীদের শুধু ইসলামি চেতনায় আবদ্ধ করে দেখা ঠিক হবে না: এরা এক প্রাচীন সভ্যতার উত্তরাধিকারী, যে উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে ইতিহাসের ধারায় অনেকেই। এর মধ্যে যেমন কাব্যকলার খসরু, ইকবাল ও ফয়েজ আছেন; তেমনি আছেন ‘অতুলনীয় প্রগতিশীল ও আলোকিত মানুষ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ’। আহসান জিন্নাহর নানা উদ্ধৃতি দিয়ে যুক্তি দেখিয়েছেন যে রাষ্ট্রযন্ত্রের ইসলামীকরণ প্রকৃতপক্ষে জিন্নাহর স্বপ্নে দেখা পাকিস্তানের পরিপন্থী। এখানে স্বাভাবিকভাবেই মুসলিম লীগে যোগদানের ‘আগের জিন্নাহ’ ও ‘পরের জিন্নাহ’ এটা কোনো মৌলিক বিভাজন, নাকি সেক্যুলার আদর্শের কন্টিনিউটি—এ বিতর্ক ঘটেছে। আইতাজের উদ্ধৃতিগুলো ছিল ১৯১৫ থেকে ১৯২৫ সালের। এর বিপরীতে তাঁর সমালোচকেরা উদ্ধৃতি দিয়েছেন ১৯৪০ থেকে ১৯৪৭ কালপর্ব থেকে। ১৯৪৫-৪৬ সালের রাজনৈতিক আন্দোলনে মুসলিম লীগই মুসলমানদের একমাত্র প্রতিনিধিত্বকারী শক্তি, এ কথা প্রমাণের জন্য জিন্নাহর মতো ‘সেক্যুলার’ রাজনীতিককেও ইসলামি বাগ্মিতায় নামতে হয়েছে। এ কথা হাক্কানী জানিয়েছেন। হতে পারে যে উদারনৈতিকেরা এভাবেই সাময়িক কার্য হাসিলের জন্য রক্ষণশীলদের ক্যাম্পে এমনই ভিড়ে যান যে তাঁদের আর পূর্বতন সত্তায় খুঁজে পাওয়া যায় না। আর এর প্রতিফল ভুগতে হয়েছে পাকিস্তানসহ নানা দেশেই।

৫. আবেগের দ্বন্দ্ব?

বই নিয়ে অপর আলোচনাটি লিখেছেন বদরুল আলম খান দমিনিক মোইসির ‘জিওপলিটিকস অব ইমোশনস’—আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সমাজ-মনস্তত্ত্ব নিয়ে নতুন ডিসকোর্সের ওপর। তবে এক হিসাবে দেখলে পুরোপুরি নতুনও নয় এটি। নব্বইয়ের দশকে স্যামুয়েল হান্টিংটন লিখেছিলেন দ্য ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশনস—সভ্যতার লড়াই। সেখানে হান্টিংটন বলেছিলেন, বার্লিনের দেয়াল পতনের পরে দুনিয়ায় এখন মূল লড়াইটা হচ্ছে ‘সংস্কৃতির’ দ্বন্দ্ব। মোইসি এতে যোগ করেছেন ‘আবেগের দ্বন্দ্ব’। তাঁর ভাষ্যে, এশিয়ায় রয়েছে ‘আশার সংস্কৃতি’, পাশ্চাত্যে ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ আর আরব বিশ্বে স্থান নিয়েছে ‘অপমানের সংস্কৃতি’। আরব বিশ্ব আটকে গেছে এক ঐতিহাসিক নিষ্ক্রিয়তার মধ্যে: কোনো সৃষ্টিশীল সমাধান খুঁজতে সে অপারগ হয়ে পড়েছে। ইসলামি সভ্যতার সোনালি অতীতের স্মৃতি রোমন্থন, পাশ্চাত্যের উত্থানের প্রতি ক্রমাগত সন্দেহ, আর বলদর্পী ইসরায়েল নিয়ে দুর্ভাবনার মধ্যে সে অবশ হয়ে পড়েছে। তবে মোইসির বইটি লেখা ২০০৯ সালে, আরব-বসন্তের মধ্য দিয়ে যে নবজাগরণের লক্ষণ দেখা দিয়েছিল তার বেশ কিছুটা আগে। আরব-বিশ্বে বসন্ত অবশ্য এসেছে কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তা এখন আগের চেয়ে বেশি প্রকট, বিশেষত মিসরের নির্বাচনের পর। তা ছাড়া ইরাক ও লিবিয়ার পরে সিরিয়া নিয়ে পাশ্চাত্যের নতুন করে অঙ্ক কষা তো আছেই।

তার পরও মোইসির বিচার আলোচনার দাবিদার, কেননা এর মধ্য দিয়ে দেখা যায়, কীভাবে পাশ্চাত্যের ক্ষমতা-তত্ত্ব দুনিয়াকে নতুন ভাষা-বিশ্লেষণে ধরতে চাইছে। এশিয়ায় প্রথমে জাপান ও পরে চীনের উত্থান এক ‘আশার সংস্কৃতির’ জন্ম দিয়েছে সেখানে। ভারতের প্রসঙ্গও এনেছেন লেখক। তবে এ তিনটি দেশের মধ্যেই তো এশিয়া সীমিত নয়। গৃহযুদ্ধ-আক্রান্ত শ্রীলঙ্কা, হতাশায় নিমজ্জিত পাকিস্তান বা মধ্য এশিয়ার দেশগুলো লেখকের আলোচনায় আসেনি। বাংলাদেশও নয়। যে তিনটি দেশের প্রসঙ্গ এসেছে সেখানেও সবটা আবার আশা-করোজ্জ্বল নয়। এ সূত্রে তিব্বতের প্রশ্নে চীনের অবস্থান, মিয়ানমারের সামরিক শাসনের সঙ্গে পূর্বাপর সুসম্পর্ক রক্ষা বা ধীরগতিতে হলেও চীনের মধ্যে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা সংগঠিত প্রতিবাদগুলো বিস্মৃত হওয়ার নয়। জাপান এখনো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে সংঘটিত অপরাধগুলোর জন্য চীন বা কোরিয়ার কাছে ক্ষমা চায়নি। আর ভারতের ভবিষ্যত্ নিয়ে উচ্চাশাবাদ আছে ঠিকই, কিন্তু সে দেশের বর্তমান এখনো অস্থিতিশীল, জাতপাতে বিদ্ধ। নাইপলের ভাষায় এখনো দেশটি ‘এক লক্ষ বিদ্রোহের’ ঘটনাস্থল। অন্যদিকে আরব বিশ্বের নিমজ্জমান হতাশার পেছনে রয়েছে এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ তেল নিয়ে পাশ্চাত্যের কূটনৈতিক সামরিক তত্পরতা। শুধু ইসরায়েলের অবস্থানের কারণে এই অঞ্চলের অনেক দেশেই এখনো অগণতান্ত্রিক শাসন টিকে আছে—বিষয়টা এমন নয়। অবাধে বিত্তহরণের তাগিদ থেকেই পাশ্চাত্য নানাভাবে মধ্যপ্রাচ্যের বশংবদ রাষ্ট্রগুলোতে অগণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখেছে। আর তাই সিরিয়ার বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি-সমাবেশ নিয়ে মিডিয়ায় হেডলাইন হয়, কিন্তু বাহরাইনে চলমান বিরোধীদলীয় বিক্ষোভ গুরুত্ব পায় না সংবাদ পরিবেশনে। অর্থাত্ পুরো বিষয়টা কেবল কোনো বিশেষ সভ্যতার একান্তভাবেই আশাবাদী বা নিরাশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সীমিত থাকার ব্যাপার নয়। গত শতাব্দী ছিল ‘ভাবাদর্শের সংঘাতের শতাব্দী’ আর এই শতাব্দী হচ্ছে ‘আত্মপরিচয়ের সংঘাতের শতাব্দী’—মোইসির এ সংক্ষেপিত সরল ভাষ্যের মধ্যে বর্তমান দুনিয়ার পরিবর্তনশীলতাকে বোঝা সম্ভব নয়। মোইসির লেখায় রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের অনুপস্থিতির দুর্বলতার প্রতি সংগত কারণেই তাই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন লেখক।

৬. অন্যান্য রচনা

প্রতিচিন্তার এ সংখ্যায় আরও থাকল সাবেক রাষ্ট্রপতি ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর অপ্রকাশিত দীর্ঘ স্মৃতিচারণার একটি অংশ। বিভাগ-পূর্ব বাংলায়—টাঙ্গাইল জেলার পটভূমিতে—এ স্মৃতিচারণার মধ্যে স্থান পেয়েছে সেকালের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক ও এ রকম কিছু সামাজিক প্রসঙ্গ। আজকের যুগের অসহনশীল গণতন্ত্রের পরিপ্রেক্ষিতে বিভাগ-পূর্ব বাংলার এক মফস্বল শহরে রাজনৈতিক সংস্কৃতি কতটা উদার ছিল, বিভিন্ন রাজনৈতিক মতের অনুসারী ব্যক্তিদের মধ্যে সম্পর্ক কতটা শ্রদ্ধাশীল ও সহনশীল ছিল, তার একটি পাঠ হিসেবে আমরা স্মৃতিচারণার মুদ্রিত অংশটিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করেছি।

১৯৭১-এর গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বিভিন্ন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, বাংলাদেশের বন্ধু, ইয়ান মার্টিনের একটি ছোট্ট লেখাও স্থান পেয়েছে এ সংখ্যায়। লেখাটির বিষয়বস্তু—বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। এর প্রাসঙ্গিকতা সপ্রতিভাত। এটি চলমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক প্রসঙ্গের একটি অন্য প্রেক্ষিত তৈরি করে দেয়।

৭. অনলাইনে প্রতিচিন্তা

প্রতিচিন্তা এবার দেরি, বড় বেশি দেরি করে বেরোল। ২০১২ সালে প্রতিচিন্তা আমরা নিয়মিতভাবে পাঠকদের কাছে দিতে পারিনি। এর জন্য আমরা পাঠকের কাছে ও যাঁদের লেখা এত দেরি করে ছাপা হলো, তাঁদের কাছে একান্তভাবেই ক্ষমাপ্রার্থী। চলতি সংখ্যা (সেপ্টেম্বর-নভেম্বর ২০১২) থেকে নিয়মিত বিরতিতে যেন পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়, তার জন্য নতুন প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ এবার নেওয়া হয়েছে। আশা করছি, এর সুফল আমরা অচিরেই দেখতে পাব।

প্রতিচিন্তার আগের সংখ্যা যাতে অনলাইনে পাওয়া যায়—এ মর্মে দেশ-বিদেশের অনেক পাঠক আমাদের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন। এটি সময়েরও দাবি। প্রতিচিন্তা শিগগিরই নিয়মিতভাবে পাওয়া যাবে প্রথম আলোর অনলাইন সংস্করণের মধ্যে আলাদা বিভাগ হিসেবে www.prothom-alo.com/protichinta ঠিকানায়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন