অর্থনীতি

নজরদারির পুঁজিবাদ: একচেটিয়া-ফিন্যান্স পুঁজি, সামরিক শিল্প কমপ্লেক্স ও ডিজিটাল যুগ

বিজ্ঞাপন

সারসংক্ষেপ

‘সাম্রাজ্যবাদের সর্বোচ্চ পর্যায় হলো পুঁজিবাদ।’ একুশ শতকে এসে সাম্রাজ্যবাদের ধরনে পরিবর্তন এলেও আদর্শের দিক থেকে এটি অবিচল রয়ে গেছে। নব্য উদারবাদ অর্থনীতির যুগে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো ভূখণ্ডভিত্তিক উপনিবেশ স্থাপনের পরিবর্তে অন্য রাষ্ট্রের বাজার দখলের মাধ্যমে তাদের সাম্রাজ্যবাদী নীতি বহাল রেখেছে। সামরিক শিল্প কমপ্লেক্সের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ উত্পাদন বৃদ্ধি ঘটানোর ফলে সৃষ্ট উদ্বৃত্ত পুঁজিই বিদেশি বাজার দখলের পেছনে তাড়না হিসেবে কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে তার সামরিক শিল্প কমপ্লেক্সকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে সেই সাম্রাজ্যবাদী নীতিটি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি পণ্যের চাহিদা বাড়িয়ে দিয়ে একদিকে যেমন ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে তেমনি কর্মসংস্থান ধরে রাখতেও সহায়তা করে। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রাযুক্তিক বিকাশ ত্বরান্বিত করে জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতেও এই প্রক্রিয়া বহুল ফলদায়ক। বিশ শতকের মার্কিন এই সাম্রাজ্যবাদ নীতিটি যেমন যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধবাজ ও নজরদারি রাষ্ট্রে পরিণত করেছে, তেমনি একুশ শতকের তথ্যপ্রাযুক্তিক বিপ্লব বা ডিজিটাল বিশ্বব্যবস্থা সেই যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখার মূল হাতিয়ার—নজরদারি ব্যবস্থা জোরদারকরণে আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি উপকরণগুলো এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। যুদ্ধবাজ রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হওয়া, বিক্রয় প্রচেষ্টা জোরদার, ফাইন্যান্সিয়ালাইজেশন, ডেটা মাইনিং ও সাইবার যুদ্ধ, ইন্টারনেটভিত্তিক একচেটিয়া পুঁজি ইত্যাদি সবই এই সামরিক শিল্প কমপ্লেক্সকে টিকিয়ে রাখার মাধ্যমে নজরদারির পুঁজিবাদ বা নতুন ধারার সাম্রাজ্যবাদকেই প্রকারান্তরে বাস্তবায়ন করছে।

মুখ্য শব্দগুচ্ছ: পুঁজিবাদ, নজরদারি, একচেটিয়া-ফিন্যান্স পুঁজি, সামরিক শিল্প-ডিজিটাল কমপ্লেক্স, রাজনৈতিক অর্থনীতি, সাম্রাজ্যবাদ/সমরবাদ

প্রারম্ভিক কথা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দুনিয়ার অর্থনীতির প্রভু হয়ে ওঠে। এই যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ত্রিশের দশকের মহামন্দা কাটিয়ে ওঠে; সারা দুনিয়ায় অস্ত্র ও সেনার যে চাহিদা সৃষ্টি হয়, তা সরবরাহ করে দেশটির অর্থনীতি উঠে দাঁড়ায়। ১৯৪০ থেকে ১৯৪৪-এর মধ্যে প্রকৃত দেশটির উত্পাদন বৃদ্ধি পায় ৬৫ শতাংশ, শিল্প উত্পাদন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে ৯৫ শতাংশ।১ যুদ্ধের পরপরই ইউরোপ ও জাপানের উত্পাদনব্যবস্থা ধসে পড়ায় এ সময় দুনিয়ার মোট উত্পাদনের ৬০ শতাংশই হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে।২ সমাজের উচ্চকোটিতে একটি ভীতি কাজ করছিল, পাছে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর দেশটির অর্থনীতি আবার যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে যায়: দেশের অভ্যন্তরের চাহিদা দেশটির উত্পাদনব্যবস্থা থেকে সৃষ্ট বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্তের তুলনায় কম, ফলে নতুন করে মন্দা ও নিশ্চলতা সৃষ্টি হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের তত্কালীন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডিন একিসন ১৯৪৪ সালের নভেম্বর মাসে যুদ্ধপরবর্তী অর্থনৈতিক নীতি ও পরিকল্পনাসংক্রান্ত বিশেষ কংগ্রেশনাল কমিটির সামনে ঘোষণা করেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি যদি যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরে যায়, তাহলে ‘দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের সামনে ঘোর বিপদ। বিশের দশক ও ত্রিশের দশক শুরুর আগের ১০টি বছর আমাদের যেভাবে কেটেছে, সেরূপ আরও ১০টি বছর আমাদের জাতীয় জীবনে ফিরে আসুক, আমরা তা চাই না (স্টক মার্কেট ধস ও মহামন্দা)। সেটা হলে আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে’। একিসন এটাও পরিষ্কার করে বলেন, সমস্যাটা আমাদের উত্পাদনের নয়, বরং এটা অধিক উত্পাদনের সমস্যা। ‘সমস্যাটা খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে, এটা বাজারের সমস্যা। উত্পাদনের সমস্যা আমাদের নেই। আমাদের সৃজনশীলতা অফুরান, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বাজার’।৩

দেশটির সরকার ও শিল্পের যুদ্ধোত্তর পরিকল্পনাবিদেরা দ্রুতই এ অবস্থা কাটিয়ে উঠে স্থিতাবস্থা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বিক্রয়ব্যবস্থায় জোর দেন। এ প্রক্রিয়ায় ম্যাডিসন অ্যাভিনিউ-কেন্দ্রিক করপোরেট বিপণন বিপ্লব ঘটে যায়। একই সঙ্গে নানা দেশে চিরস্থায়ী যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি করা হয়। এর মাধ্যমে বিশ্ববাজারের ওপর সাম্রাজ্যবাদী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়, শীতল যুদ্ধে লড়াই করাও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সুবিধাজনক হয়, যার কেন্দ্র ছিল পেন্টাগন। একদিকে বিক্রয়ব্যবস্থা ও অন্যদিকে সামরিক শিল্প কমপ্লেক্স, এ দুই মাধ্যমে (ভোগ ও বিনিয়োগ ছাড়া) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের ২৫ বছর যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বৃত্ত মূল্য আহরণ-প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। তারপর ১৯৭০-এর দশকের সংকটের পর উদ্বৃত্ত মূল্য আহরণের তৃতীয় প্রক্রিয়া হিসেবে ফাইন্যান্সিয়ালাইজেশন সামনে চলে আসে—বিক্রয়ব্যবস্থা ও সামরিক শিল্প থেকে উদ্বৃত্ত মূল্য আহরণের পরিমাণ কমে আসায় এই প্রক্রিয়ায় গতি সঞ্চার করে ফাইন্যান্সিয়ালাইজেশন।

এসব প্রক্রিয়া কোনো না কোনোভাবে যোগাযোগব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটানোয় তেল-জল জোগায়। প্রতিটি মাধ্যমই নতুন ধরনের নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি করে। ফলে সারা দুনিয়াই নজরদারির আওতায় চলে আসে, নিম্নোক্ত তিনটি মাধ্যমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই নজরদারি প্রক্রিয়া: ১. সমরবাদ/ সাম্রাজ্যবাদ/ নিরাপত্তা, ২. করপোরেটভিত্তিক বিপণন ও মিডিয়াব্যবস্থা, ৩. ফাইন্যান্সিয়ালাইজেশন।

যুদ্ধরাষ্ট্র

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই ওয়াশিংটনে এক নতুন পেন্টাগন পুঁজিবাদ গড়ে ওঠে। যুদ্ধোত্তরকালে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে যুদ্ধরাষ্ট্রের সৃষ্টি, এর মূল নিহিত রয়েছে সামরিক শিল্প কমপ্লেক্সে। দেশটির সেনাপ্রধান জেনারেল ডউইট ডি, আইসেনহাওয়ার ১৯৪৬ সালের ২৭ এপ্রিল নিম্নোক্ত ব্যক্তি/ বিভাগের উদ্দেশে একটি মেমো প্রদান করেন: ‘সাধারণ যুদ্ধ বিভাগসমূহের পরিচালক ও প্রধান, বিশেষ কর্মী বিভাগ, ব্যুরোসমূহ, প্রধান কমান্ডসমূহের কমান্ডিং জেনারেলগণ’। এর বিষয় ছিল ‘সামরিক পরিসম্পদ হিসেবে বৈজ্ঞানিক ও প্রাযুক্তিক সম্পদ’। আইসেনহাওয়ার ১৯৬১ সালের ১৭ জানুয়ারির জাতির উদ্দেশে দেওয়া তাঁর প্রখ্যাত বিদায় ভাষণে যে ‘সামরিক শিল্প কমপ্লেক্স’-এর কথা বলেছিলেন, সেই মৌর মেলম্যান এই মেমোকে তার ভিত্তি হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এই মেমোতে আইসেনহাওয়ার জোর দিয়ে বলেছিলেন, সামরিক ও বেসামরিক বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ, শিল্প ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ, নিরবচ্ছিন্ন ও চুক্তিভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তোলা হোক। তিনি এতে লিখেছিলেন, ‘আমাদের যে বেসামরিক সম্পদ জরুরি অবস্থায় প্রধান সহায় হিসেবে ব্যবহার করা হয়, সেগুলো শান্তির সময়েও সেনাবাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকা আমাদের ভবিষ্যত্ নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন।’ ফলে জাতীয় নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যাপক সম্প্রসারণ প্রয়োজন হয়—বেসামরিক বিজ্ঞানী, শিল্প ও ঠিকাদারদের সরকারের ক্রমবর্ধমান ও গোপন জালের মধ্যে আনা হয়। ‘এই বেসামরিক প্রতিভাবানদের ঠিকঠাক কাজে লাগাতে হলে তাঁদের ভবিষ্যত্ সামরিক সমস্যায় যুক্ত করতে হবে, তাঁদের পরিকল্পনা ও গবেষণা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। একটি পন্থা হতে পারে পরিকল্পনায় অর্থসহায়তার চুক্তির অনুমোদন দেওয়া। এরূপ একটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলে আমাদের পরিকল্পনার কার্যকারিতা বহুগুণ বেড়ে যাবে এবং কৌশলগত কর্মসূচি আরও নিবিড়ভাবে পালন করা সম্ভব হবে।’ আইসেনহাওয়ার বলেছিলেন, বিজ্ঞানীদের গবেষণার জন্য যতটা সম্ভব স্বাধীনতা দেওয়া যায় ততটা দিতে হবে, তবে তা অবশ্যই সমরশিল্পের ‘মৌলিক সমস্যার’ আলোকে প্রণীত শর্ত মেনে।

আইসেনহাওয়ারের মতে, এ পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে জাতির জরুরি অবস্থার সময় সমর খাত যেন শিল্প ও প্রাযুক্তিক সক্ষমতার একটি বড় অংশ আত্তীকরণ করতে পারে, যাতে এগুলো দেশটির ‘সামরিক কাঠামোর অবিভেদ্য অংশে পরিণত হতে পারে’। বিজ্ঞান ও শিল্পের সঙ্গে সমর খাতের যে সম্পর্ক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গড়ে উঠেছে, সেটাকে কোনোভাবেই চূড়ান্ত বিবেচনা করা যাবে না। এ সম্পর্ককে আরও প্রসারিত করতে হবে। তিনি লিখেছেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৃহত্তর পরিসরে গবেষণায় সহায়তা করা আমাদের কর্তব্য। সেটা যদি শিল্পেও হয়, তাহলেও আমাদের সেখানে সহায়তা দিতে হবে। মানে সামরিক ও বেসামরিক সম্পদের সম্মিলন ঘটলে তা শুধু সেনাবাহিনীর জন্যই লাভজনক হবে না, দেশের নিরাপত্তার জন্যও তা সহায়ক হবে।’ যে সমন্বয়ের কথা তিনি বলেছেন, সেটা ‘যুদ্ধ বিভাগের চূড়ান্ত পর্যায়ের, ইতিমধ্যে তা অর্জন হয়ে গিয়েছিল’৪।

১৯৪৬ সালে আইসেনহাওয়ার যে সামরিক বিদ্যার সঙ্গে বেসামরিক প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের সমন্বয়ের কথা বলেছেন, সেটা আসলে যুদ্ধ অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সেটার ভিত্তি হচ্ছে সামরিক কেইনসবাদ, আর এর উত্পত্তি হয়েছে ট্রুম্যান প্রশাসনের জামানায়। ১৯৪৬ সালের এমপ্লয়মেন্ট অ্যাক্ট অনুসারে একটি অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়, যাদের কাজ ছিল অর্থনীতির বার্ষিক প্রতিবেদন দাখিল করা এবং হোয়াইট হাউসের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নীতি প্রণয়ন করা। এই পরিষদের প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন এডউইন নৌর্স, ১৯৩৪ সালের ব্রুকিং ইনস্টিটিউশন স্টাডি আমেরিকার উত্পাদনের ক্ষমতা (আমেরিকাস ক্যাপাসিটি টু প্রডিউস) শীর্ষক একটি প্রকাশনার জন্য তিনি খ্যাত ছিলেন। তিনি এতে বাজারের সম্পৃক্ততা ও মার্কিন অর্থনীতির অতি উত্পাদনক্ষমতায় আলোকপাত করেছেন। সংস্থাটির ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন লিও কেইসারলিং, পরবর্তীকালে তিনিই সামরিক কেইনসবাদের প্রধান প্রবক্তায় পরিণত হন। ১৯৪৯ সালে নৌর্স সরে গেলে কেইসারলিং তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। অন্যদিকে, ন্যাশনাল সিকিউরিট অ্যাক্ট ১৯৪৭-এর আওতায় জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ (ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল) গঠিত হয় (এই অ্যাক্টের আওতায় পরে সিআইএ গঠিত হয়)। এই অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদ ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ যুক্তরাষ্ট্রকে একটি যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রে পরিণত করার সব আয়োজন সম্পন্ন করে। ট্রুম্যান ১৯৫২ সালে জাতীয় নিরাপত্তা এজেন্সি (ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি) গঠন করেন, এটি ছিল খুবই ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। এটা সামরিক বাহিনীর একটি অঙ্গ হিসেবে সম্ভাব্য বিদেশি (ও অভ্যন্তরীণ) নাশকতামূলক কাজের ওপর নজরদারি করার জন্য গঠিত হয়৫।

১৯৫০ সালে একিসনের অধীন যুক্তরাষ্ট্রের পলিসি প্ল্যানিং স্টাফের পরিচালক পল এইচ. নিটজেকে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ ৬৮-এর প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। এতে শীতল যুদ্ধ ও বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারে যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনীতিগত এক মহাকৌশলের রূপরেখা প্রণীত হয়। তাত্পর্যপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, অর্থনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার: ‘সরকার আরও ইতিবাচক কর্মসূচি প্রণয়নে মনোযোগ না দিলে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য মুক্ত দেশগুলোর অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ভাটা পড়বে’। এতে শুধু ভূরাজনৈতিক বিবেচনা ছাড়াও ‘বন্দুক ও মাখনের’ নীতি সামরিক কেইনসবাদের ওপর ভর করে ব্যাপক পুনঃশস্ত্রীকরণ ঘটে।

এই প্রতিবেদন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে মার্কিন অর্থনীতির ব্যাপক প্রসারের সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। মার্কিন অর্থনীতিতে শতভাগ কর্মসংস্থানের লক্ষ্য থাকলেও তা ক্রমবর্ধমান সামরিক ক্রয় ও উচ্চ মাত্রার অভ্যন্তরীণ ভোগের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। অন্য কোনোভাবে সেটা অর্জন করা সম্ভব নয়। এ ধরনের অর্থনীতিতে বন্দুক ও মাখন দুই-ই উত্পাদন সম্ভব। এই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক হারে উত্পাদন পেতে পারে। সে কারণে জীবনমানের অবনমন না ঘটিয়েও দেশটি নিজের ও তার সহযোগীদের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি নির্মাণ করতে পারে’। বটেই, ‘কোনো জরুরি অবস্থার সময়’ যুক্তরাষ্ট্র তার মোট জাতীয় উত্পাদনের ৫০ শতাংশ সামরিক খাত, বিদেশি সহায়তা ও বিনিয়োগে ব্যয় করতে পারে বা ‘বর্তমানের চেয়ে অন্তত পাঁচ বা ছয় গুণ বেশি ব্যয় করতে পারে’। প্রতিবেদনে জোর দিয়ে বলা হয়, ব্যাপক হারে পুনঃ শস্ত্রীকরণ ঘটলে অর্থনীতিতে যে চাপ পড়বে ব্যাপারটা তেমন নয়, কারণ, ‘এতে হয়তো জনগণের জীবনমানের অবনমন ঘটবে না’, বরং এর উল্টোটাও ঘটতে পারে:

সামরিক ও বিদেশি সাহায্যে যে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হবে, তার চেয়ে জাতীয় মোট উত্পাদনের প্রবৃদ্ধি বেশি হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে আমাদের সবচেয়ে তাত্পর্যপূর্ণ শিক্ষা হচ্ছে, মার্কিন অর্থনীতি পূর্ণাঙ্গ সক্ষমতায় কাজ করলে বেসামরিক খাতের ভোগের চেয়ে অন্য খাতে বেশি সম্পদ সৃষ্টি করতে পারে, তবে একই সঙ্গে যাপিত জীবনের উচ্চমানও বজায় রাখা সম্ভব। পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি মাথায় রাখলেও ১৯৩৯-৪৪ সালের মধ্যে ব্যক্তিগত ভোগের খাতে মানুষের ব্যয় এক-পঞ্চমাংশ পরিমাণ বেড়েছে। যদিও এ সময় সরকারি খাতে বরাদ্দের পরিমাণ বেড়েছে, ১৯৩৯ সালের হিসাবে সেটা ৬০-৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার৬।

কাউন্সিল অব ইকোনমিক অ্যাডভাইজার্সের চেয়ারম্যান কেইসারলিংকে এনএসসি-৬৮-এর একটি অর্থনৈতিক সমীক্ষা দিতে বলা হয়েছিল, যদিও প্রতিবেদনটি প্রস্তুতে তাঁর প্রভূত ভূমিকা রয়েছে। তিনি ১৯৫০ সালের ৮ ডিসেম্বর তিনি একটি মেমো পাঠান। এতে তিনি দেখান, এনএসসি-৬৮ এ জাতীয় নিরাপত্তায় যে ব্যয়ের হিসাব দেওয়া হয়েছে, সেটা অর্থনীতির সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম। ১৯৫২ সালে এর পরিমাণ জাতীয় উত্পাদনের ২৫ শতাংশ হবে, যেখানে ১৯৪৪ সালে জাতীয় নিরাপত্তায় ব্যয়ের পরিমাণ ৪২ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল। অভ্যন্তরীণ ভোগে ব্যয়ের পরিমাণ কমানোর সম্ভাবনা সত্ত্বেও ‘প্রস্তাবিত কর্মসূচির আওতায় সাধারণভাবে বেসামরিক লোকেদের ভোগের যে অবস্থা দাঁড়াবে, সেটাকে খুব বেশি বলা যাবে না’। অন্যদিকে, উত্পাদন ও কর্মসংস্থান সাধারণভাবে বাড়বে৭।

এনএসসি-৬৮-এ শুধু সামরিক ব্যয় তিন গুণ বাড়ানোর কথাই বলা হয়নি। প্রতিবেদনে যে পুনঃশস্ত্রীকরণের কথা বলা হয়েছে, সেটা মূলত শীতল যুদ্ধের কথা মাথায় রেখেই করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ১৯৪৭ সালের মার্চে ট্রুম্যানের তথাকথিত ‘সংবরণ’ নীতির সহায়তায় এটা করা হয়েছে। আর গৌণ বিবেচনাটা হচ্ছে অর্থনীতির৮। কিন্তু উভয় লক্ষ্যই এক জায়গায় এসে মিলে যায়। ১৯৫০ সালের কোরীয় যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাস দুয়েক আগে বিজনেস উইক-এ ঘোষণা করা হয়, সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির আবেদনের দুটি কারণ রয়েছে, একটি হচ্ছে ‘রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন’ এবং আরেকটি হচ্ছে ‘দেশে বেকারত্বের হার বৃদ্ধির আশঙ্কা’৯। এটাই হচ্ছে শীতল যুদ্ধের রাজনৈতিক অর্থনীতি। এ প্রসঙ্গে হ্যারি ম্যাগডফের ১৯৬৯ সালে লিখিত এজ অব ইমপেরিয়ালিজম গ্রন্থের শেষের একটি মন্তব্য স্মর্তব্য: ‘কমিউনিজমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালালে যেমন মুনাফা লাভ সহজ হয়, তেমনি মুনাফার খোঁজে নামলে কমিউনিজমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানো সহজ হয়। এর চেয়ে ভালো জুটি আর কী হতে পারে?’১০

হ্যাঁ, এরপর এনএসসি-৬৮ পরিকল্পনা শিগগিরই বাস্তবায়ন করা হয়েছে, কোরীয় যুদ্ধের কারণে নীতিগত অবস্থান সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির পক্ষে সরে আসায় এ যুদ্ধ মার্কিন অর্থনীতির জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসে। এ যুদ্ধের শেষের দিকে সামরিক ব্যবস্থা আরও বড় আকার লাভ করে। আইসেনহাওয়ার যুদ্ধের পরে সামরিক ব্যয় হ্রাসের চেষ্টা করলেও ‘কোরীয় যুদ্ধ ও এনএসসি-৬৮ প্রতিবেদনের আগের চেয়ে সামরিক ব্যয় তিন গুণ বেড়ে যায়’১১। ১৯৫৭ সালে আইসেনহাওয়ার দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতা গ্রহণের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় ছিল দেশটির মোট দেশজ উত্পাদনের ১০ ভাগ১২। এর মাধ্যমে যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এ প্রসঙ্গে ১৯৬৪ সালের মান্থলি রিভিউ পত্রিকায় স্কট নেয়ারিং বলেন, এ রাষ্ট্র ‘যুদ্ধ ও যুদ্ধের হুমকিকে তার পররাষ্ট্রনীতির প্রধান অস্ত্র হিসেবে গণ্য। এই যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রের করণীয়ের তালিকায় সবার ওপরে রয়েছে যুদ্ধের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি, সুযোগ পেলেই এরা যুদ্ধ লাগিয়ে দেয়’১৩।

কোরীয় যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্র চারিত্রিকভাবে যুদ্ধবাজ রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। আইসেনহাওয়ারের প্রথম প্রতিরক্ষামন্ত্রী চার্লস আরউইন উইলসন (জেনারেল মোটরসের সাবেক সভাপতি হিসেবে কখনো কখনো তাঁকে ‘জেনারেল মোটরস উইলসন’ নামেও ডাকা হতো। চার্লস ই. উইলসন আর তিনি যে এক ব্যক্তি নন, সেটা বোঝাতে তাঁকে এ নামে ডাকা হতো—নিচে দেখুন) কংগ্রেসের উদ্দেশে বলেন, সমরতন্ত্রকে একবার মাথায় তোলা হলে সেখান থেকে এটাকে নামানো একপ্রকার অসম্ভব: ‘প্রতিরক্ষা ব্যবসার একটি গুরুতর ব্যাপার হলো অনেক মার্কিনের স্বার্থই এর সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে—সম্পদ, ব্যবসা, চাকরি, কর্মসংস্থান, ভোট, পদোন্নতির সুযোগ, অগ্রগতি, বিজ্ঞানীদের মোটা অঙ্কের বেতন প্রভৃতি। এটা একটা সমস্যাজনক ব্যবসা...হঠাত্ করে পরিবর্তন আনতে গেলে আপনি বিপদে পড়বেন...পুরো ব্যবসাটা বন্ধ করে দিলে ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যটি বিপদে পড়ে যাবে, কারণ বিমান নির্মাণ কারখানার একটি বড় অংশ এই রাজ্যে অবস্থিত’১৪। জেনারেল ইলেকট্রিকের সাবেক সভাপতি ও ওয়ার প্রডাকশন বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান চার্লস ই. উইলসন ১৯৪৪ সালের যে চিরস্থায়ী যুদ্ধ অর্থনীতির জন্য দেন-দরবার করেছেন, সেই রাষ্ট্র ও তার সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ‘যুদ্ধের শিল্প ও গবেষণা সক্ষমতা’ সম্পৃক্ত হয়ে গেছে১৫।

ফলে এই সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে কার্যকর চাহিদা সৃষ্টি হওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা অবগত ছিলেন। হার্ভার্ডের অর্থনীতিবিদ সামনার সিলচটার ১৯৪৯ সালের শেষের দিকে একটি ব্যাংকিং সম্মেলনে বলেছিলেন, শীতল যুদ্ধে যে পরিমাণ ব্যয় হয়েছে, তাতে নতুন করে ব্যাপক মন্দা হওয়ায় আশঙ্কা কম। তিনি বলেন, সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি হলে পণ্যের চাহিদা বাড়ে। ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ধরে রাখা সম্ভব হয়, প্রাযুক্তিক বিকাশ ত্বরান্বিত হয় এবং জীবনমানের উন্নয়ন ঘটে। ১৯৫৪ সালে হাইড্রোজেন বোমার উদ্ভাবনের পর ইউএস নিউজ অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট-এ লেখা হয়: ‘ব্যবসার ক্ষেত্রে হাইড্রোজেন বোমার তাত্পর্য কী? এই পণ্যটি ক্রয়ের বড় বড় আদেশ আসবে...দীর্ঘদিন ধরে। সামনের বছরগুলোতে এই নতুন বোমার কার্যকারিতা বাড়তেই থাকবে।’ একজন ভাষ্যকারের মতে, ‘হাইড্রোজেন বোমা মন্দার আশঙ্কা জানালা দিয়ে ফেলে দিয়েছে’১৬।

বামদের মধ্যে পল এ. বারান ও পল এম. সুইজি ১৯৬৬ সালে লিখিত তাঁদের মনোপলি ক্যাপিটাল গ্রন্থে দেখিয়েছেন, মার্কিন সাম্রাজ্যের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবেই সমরবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বাড়বাড়ন্ত হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, অর্থনীতিতে যে বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত তৈরি হচ্ছে, সে কারণেও এমনটা হচ্ছে—পুঁজিবাদী ভোগ ও বিনিয়োগের পরও বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত থেকে যাচ্ছে। সরকার যে অন্য কোনো খাতে সে ব্যয় করবে, তারও উপায় নেই। শক্তিমান করপোরেট খাত সে ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ১৯৩৮-৩৯ সালে সরকারের বেসামরিক ক্রয় ও বিনিয়োগ মোট দেশজ উত্পাদনের ১৪ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছায়—এ পরিসংখ্যানটা একপ্রকার ধ্রুব হয়ে গেছে। অন্যদিকে, বেসামরিক ব্যয় (ভোগ ও বিনিয়োগ) ২০১৩ সালে মোট দেশজ উত্পাদনের ১৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। (এতে আবার ‘সামাজিক উন্নয়নে’ সরকারের ব্যয়ের পরিসংখ্যানের অতিরঞ্জন রয়েছে। কারণ, সরকারের বেসামরিক খাতে ব্যয়ের বেশির ভাগটাই চলে যায় কারাগার ও অভ্যন্তরীণ পুলিশিং কার্যক্রমে)। সে কারণে বেসামরিক খাতের ব্যয়ের চেয়ে সামরিক খাতে ব্যয় অধিকতর ভ্যারিয়েবল বলে প্রতীয়মান হয়। সেটা অর্থনীতির ফুলে ওঠার ক্ষেত্রেও ইন্ধনের মতো কাজ করে১৭।

বারান ও সুইজির মতে, এই সামরিক ব্যয়ের অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্যও রয়েছে। এটা একেবারে মুক্ত ভ্যারিয়েবল নয়। কারণ, আর্থিক খাতের হোমরাচোমরা ব্যক্তিরা চাইলেই এখানে কারসাজি করতে পারে না। প্রধান সীমাবদ্ধতা হচ্ছে যুদ্ধ। মানে, দুই পরাশক্তির মধ্যকার তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ যেকোনোভাবেই এড়াতে হতো। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার প্রান্তস্থ অর্থনীতিগুলোই উন্মুক্ত যুদ্ধের লক্ষ্যবস্তু, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ‘বৈশ্বিক সামরিক অস্ত্র নিয়ে এই সাম্রাজ্যের সুরক্ষায় নিয়োজিত’ রয়েছে। ১৯৬০-এর মধ্য দশকেই সারা দুনিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের শতাধিক সামরিক ঘাঁটি ছিল, ফলে দেশটি চাইলেই যেকোনো সময় যেকোনো স্থানেই সেনা মোতায়েন করতে পারে।

বাস্তব কারণেই যুক্তরাষ্ট্রকে নানা প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হতো। সেটা যেমন ভিয়েতনামের মতো প্রান্তিক দেশে হয়েছে, তেমনি মার্কিন জনগণের মধ্য থেকেও প্রতিরোধ এসেছে১৮। ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে ভিয়েতনামে মার্কিন স্থলসেনারা বিদ্রোহ করে বসে। ফলে সেনাবাহিনীও তৃতীয় বিশ্বের দেশে দেশে এরূপ আক্রমণ ও দখলের পরিকল্পনা বাদ দিয়ে একটি পেশাদার সেনাবাহিনীতে রূপান্তরিত হতে বাধ্য হয়১৯। তার আগে দুই দশক ধরে মার্কিন বাহিনী যে দখলদারি চালিয়েছে, সেটা যদি আইন করে বন্ধ করা হতো, তাহলে মার্কিন বাহিনীর কপালে অনেক দুঃখ ছিল।

পুরো দুনিয়াটা এভাবে পাহারা দেওয়ার জন্য দুটি বিষয় খুব জরুরি: প্রথমত ঢোল পিটিয়ে এটা জানান দেওয়া যে আমরা খুব উদার, গণতান্ত্রিক ও প্রয়োজনীয়; যেটা মার্কিনদের খুব সহজাত বৈশিষ্ট্য। ফলে আইনগত দিক দিয়ে এটা বৈধ। যেকোনো প্রচারণার একটি উল্টো দিকও আছে: জনপ্রিয় অজ্ঞতা। ভিয়েতনাম যুদ্ধের পরপরই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি ভালো শিক্ষা হয়, এরপর কোনো দেশের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধে লিপ্ত হলে জনরোষ সৃষ্টি করা যাবে না’—প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট ম্যাকনামারার ভাষ্যে এটাই নাকি এই যুদ্ধের ‘মহত্তম অবদান’। ম্যাকনামারার মতে, এটা খুব দরকার ছিল, কারণ পরবর্তী ৫০ বছরে যুক্তরাষ্ট্রকে এরূপ অনেক যুদ্ধের মুখোমুখি হতে হবে২০। আর মার্কিন গণমাধ্যম কেরানির মতো সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার সমর্থনে যুক্তি সৃষ্টি করেছে, মানুষের উপলব্ধিকে প্রতি পদক্ষেপে বাধাগ্রস্ত করেছে। দ্বিতীয়ত, এই প্রচারণাযজ্ঞ চালানোর জন্য হাতে বেত তো একটা ছিলই—প্রান্তিক দেশগুলোতে নগ্ন হস্তক্ষেপ ও দেশের ভেতরে নজরদারি ও নিপীড়ন।

বিক্রয় প্রচেষ্টা

১৯৫০-এর দশকে মার্কিন একচেটিয়া পুঁজির সফলতার অন্যতম কারণ হচ্ছে ম্যাডিসন অ্যাভিনিউ-ভিত্তিক বিক্রয় প্রচেষ্টা। অর্থনৈতিক উদ্বৃত্ত শুষে নেওয়ার ক্ষেত্রে এটা ছিল খুবই কার্যকর একটা মাধ্যম। পুঁজিবাদের বিলাসবহুলতার বাইরে এই বিক্রয় এক নতুন দিক উন্মোচন করে। বারান ও সুইজি এটাকে ‘কর্তনের মাধ্যমে মুনাফা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। শ্রমিকদের (বা এই শ্রেণির একটি সুবিধাপ্রাপ্ত অংশকে) বেশি বেতন দিয়ে তাদের অপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে প্রলুব্ধ করে বা তাদের অপব্যয়ী করে তোলার মাধ্যমে এই মুনাফা অর্জিত হয়েছে। পরিণামে উত্পাদন সম্পর্কের তুলনায় শ্রমিকদের জীবনমানের প্রকৃত উন্নতি না ঘটলেও তারা এই চাকরির গ্যাঁড়াকলে আটকা পড়ে২১। থর্সটেইন ভেবলেনের মতে, উত্পাদন ক্রমেই তার প্রকৃত ব্যবহারমূল্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ‘বিক্রয়যোগ্য পণ্যের’ প্রস্তুতকরণে পর্যবসিত হয়েছে২২। যুদ্ধোত্তরকালে এক নতুন ভোক্তা পুঁজিবাদের উদ্ভব হয়। মার্টিন মেয়ারের মতে, ‘এটি ম্যাডিসন অ্যাভিনিউ-ভিত্তিক এক ত্রিপক্ষীয় ব্যবসা। এর এক প্রান্তে রয়েছে উত্পাদক (যারা ব্র্যান্ডের পণ্য উত্পাদন করছে ও সেগুলোর প্রচারে ব্যয় করছে), এজেন্সি (যারা বিজ্ঞাপন বানায় ও সম্প্রচার করে) এবং গণমাধ্যম (সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, টিভি—এগুলো সবই একেকটা বিজ্ঞাপন প্রচারের মাধ্যম, এদের মাধ্যমে জনগণের কাছে তথ্য পৌঁছে যায়)’২৩। বিজ্ঞাপন ছাড়াও করপোরেট বিপণনের অন্যান্য ক্ষেত্রে হচ্ছে গ্রাহক নির্ধারণ, প্রণোদনাসংক্রান্ত গবেষণা, পণ্য ডিজাইন, বিক্রয়ে উত্সাহ দান ও সরাসরি বিপণন২৪।

১৯৫০-এর দশকে বিপণন-প্রক্রিয়া একটি সংগঠিত ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়। ভোক্তা নিরীক্ষা, প্রচারণা কার্যক্রম, জনগণের মনস্তাত্ত্বিক গড়নকে প্রভাবিত করা প্রভৃতি উপাদান যুক্ত হয়ে বিপণন এক কর্মযজ্ঞে রূপ নেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দেশটির মানুষের সঞ্চয় স্থিতি ব্যাপক পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। এরপর ম্যাডিসন অ্যাভিনিউয়ের ‘বিজ্ঞাপন মানবদের’ কল্যাণে শ্রমিকেরা একেকজন ভোক্তায় পরিণত হয়। এতে চাকরির ওপর তাদের নির্ভরতা বেড়ে যায় আর অর্থনীতিও ফুলে-ফেঁপে ওঠে। এভাবে বিক্রয়-প্রক্রিয়া একচেটিয়া পুঁজিবাদের এক অন্যতম সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গে পরিণত হয়২৫।

বিপণন ও বিজ্ঞাপন ব্যয় ১৯৫০-এর দশকে বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পায়, ১৯২৯ সালে এর পরিমাণ ছিল বছরে তিন বিলিয়ন ডলার, ১৯৫৭ সালের তা এসে দাঁড়ায় ১২ বিলিয়ন ডলার। এতে অর্থনীতিতে কার্যকর চাহিদা বৃদ্ধি পায়, বাজারের সম্প্রসারণ হয়, কর্মসংস্থান বাড়ে। একই সঙ্গে নতুন নতুন পণ্যে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়। এ প্রক্রিয়ায় বহু পণ্য সেকেলে হয়ে যায়, আবার অনেক নতুন ও অপ্রয়োজনীয় পণ্য ভোক্তাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়। এই পুরো বিপণন-প্রক্রিয়া সঞ্চয়ের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করে২৬। ১৯৫০-এর দশকের শেষের দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক বিজ্ঞাপন ব্যয়ের পরিমাণ ছিল সামরিক ব্যয়ের ২০-২৫ শতাংশ। বিজ্ঞাপন বিপণনের একটি অংশ মাত্র। আর বিজ্ঞাপন যেহেতু পুরো প্রক্রিয়ায়ই ছড়িয়ে রয়েছে, ফলে এ খাতে ঠিক কত ব্যয় হয়, সেটা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নিরূপণ করা সম্ভব নয়। ১৯৫০ ও ৬০-এর সেই ‘স্বর্ণালি সময়ে’ উদ্বৃত্ত শোষণে বিক্রয়-প্রক্রিয়া ও সামরিক ব্যয়ের মধ্যে এক দারুণ সামঞ্জস্য দেখা যায়২৭।

বিপণনের এই অভূতপূর্ব বিকাশের সঙ্গে একচেটিয়া পুঁজির সংহতকরণ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। মূল্য প্রতিযোগিতার আর কোনো বালাই থাকল না, ওলিগোপলিক বাজারের খেলোয়াড়েরা নিজেদের মধ্যে দফারফা করে পণ্যের দাম নির্ধারণ করে। এ প্রক্রিয়ায় পণ্যের দাম শুধু একদিকেই প্রবাহিত হয়, মানে শুধু বাড়তেই থাকে, কমার কোনো ব্যাপার আর থাকে না। এই ওলিগোপলিক বাজারের প্রতিযোগিতার নামকরণ হয় ‘একচেটিয়া প্রতিযোগিতা’, এখানে প্রতিযোগিতা হয় বাজারের দখল নেওয়ার জন্য, দাম কমানোর মাধ্যমে সেটা হয় না, হয় বিক্রয় প্রচেষ্টার ওপর ভর করে। কল্যাণমূলক অর্থনীতিবিদ টিবর স্কিটভস্কি বলেন: ‘বিজ্ঞাপনের এই সেক্যুলার বাড়বাড়ন্তের অর্থ হচ্ছে, মুনাফার পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া—মূল্যের প্রতিযোগিতা লোপ পাওয়া।’ বারান ও সুইজির বিশ্লেষণ অনুসারে, ‘মূল্য প্রতিযোগিতা’ নাই হয়ে গেছে ‘জনগণের অভ্যাসে নাড়া দেওয়ার জন্য’। এর ফলে ‘নতুন নতুন বিক্রয় কৌশলের (অপচয়মূলক) উদ্ভব হয়েছে: বিজ্ঞাপন, পণ্যের চেহারা ও মোড়কে ভিন্নতা, পরিকল্পিত বিলোপ, মডেল পরিবর্তন, ঋণ প্রকল্প ও আরও হরেক রকম’২৮।

১৯৫০-এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিজ্ঞাপনের পেছনে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করেছে জেনারেল মোটরস। এই কোম্পানি পণ্যে ভিন্নতা ও মডেল পরিবর্তনের ধারা প্রবর্তন করে। এরা গাড়ির মডেলের মধ্যে সেকেলে হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটি নিয়ে আসে, মানসিকতার মধ্যেও তারা এ ব্যাপারটি নিয়ে আসে। অন্য গাড়ি নির্মাতারা ক্রমেই পিছিয়ে পড়ে, লুটের ভাগ থেকে বঞ্চিত হয়।

জেনারেল মোটরসের পর যুক্তরাষ্ট্রে সর্বাধিক মোড়কজাত পণ্যের বিপণনকারী ও বিজ্ঞাপন প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হচ্ছে প্রোক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল। এদের উত্পাদিত পণ্যের মধ্যে রয়েছে আইভরি, টাইড, ক্যামেই, অক্সিডল, ক্যাসেকড, কোমেট, জয়, লাভা ও আরও অনেক। এরাই প্রথম সফল আধুনিক ব্র্যান্ড ব্যবস্থাপনা প্রচলন করে, এর শুরু হয়েছিল নেইল ম্যাকেলরয়ের বিখ্যাত এক অভ্যন্তরীণ দাপ্তরিক মেমোর মাধ্যমে। এই ব্যক্তি ক্যামেই সাবানের বাজারজাত করতে গিয়ে দেখলেন, এটি তাদের কোম্পানিরই আইভরি সাবানের সম্পূরক পণ্য হিসেবে বিক্রি হচ্ছে। এতে তিনি আহত হয়ে প্রস্তাব করেন, কোম্পানির প্রতিটি ব্র্যান্ডের জন্য আলাদা আলাদা বিপণন দল রাখা হোক, প্রতিটি ব্র্যান্ডকে ভিন্ন ভিন্ন পণ্য হিসেবে বিবেচনা করে বাজারজাত করা হবে। প্রতিটি পণ্যের জন্য পৃথক ভোক্তাকুল সৃষ্টি করা হয়। পরবর্তীকালে, প্রোক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ম্যাকেলরয় বিপণনের জন্য সোপ অপেরার দ্বারস্থ হন। বিজ্ঞাপনের জন্য সহায়ক কর্মসূচি প্রণয়ন করেন তিনি, বিজ্ঞাপনের গল্প ও পণ্যের গুণাগুণ বারবার পুনরুক্তি করে ভোক্তার মাথায় পণ্যটি একপ্রকার ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ভোক্তা খুঁজে বের করার জন্য কোম্পানিটি বাজার গবেষণা শুরু করে। পাশাপাশি ম্যাকেলরয় বৃহত্ পরিসরে ‘ব্লু স্কাই’ বৈজ্ঞানিক গবেষণা ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা করেন। এখানকার গবেষকেরা গ্রাহকদের চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণভাবে নতুন ধারণা সৃজন ও পণ্য তৈরিতে একরকম স্বাধীন ছিলেন২৯।

১৯৫০-এর দশকে প্রোক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল বেসরকারি সম্প্রচার মাধ্যমে বিজ্ঞাপন ও অনুষ্ঠানের সমন্বয় ঘটিয়ে যে উল্লেখযোগ্য সফলতা অর্জন করে, সেটাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে মার্কিন গণমাধ্যমব্যবস্থায় বাণিজ্যের জয়জয়কার হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। হার্ব স্কিলার তাঁর গ্রন্থ মাস কমিউনিকেশন অ্যান্ড এম্পায়ার-এ লিখেছেন, ‘১৯২০-এর দশকে রেডিও থেকে শুরু হয়ে ১৯৪০ ও ১৯৫০-এর দশকের শুরুতে টেলিভিশনের প্রসারের মাধ্যমে এই বৈদ্যুতিন মাধ্যমটি ব্যবসার হাতে চলে যায়, মানে ‘জাতীয় বিজ্ঞাপনদাতাদের’ হাতে চলে যায়...যোগাযোগের উন্নত মাধ্যমের ব্যবহার ও অন্যান্য সহায়ক আয়োজন যেমন: সমীক্ষা, ভোক্তাদের নির্দেশনা, উপদেশ প্রভৃতি বিকশিত পুঁজিবাদের বৈশিষ্ট্যে দাঁড়িয়ে যায়...সংস্কৃতির এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যা এই বাণিজ্যের আওতার বাইরে৩০। সরকার তড়িঘড়ি করে বিনা পয়সায় আকাশতরঙ্গ করপোরেশনগুলোর হাতে তুলে দেয়। সরকারের করপোরেশনের স্বার্থরক্ষাকারী হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়, নিয়ন্ত্রক নয়৩১।

সমরশিল্প কমপ্লেক্স এবং আরপানেট

প্রোক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বলে নয় বছর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ম্যাকেলরয় আইসেনহাওয়ারের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। ১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর মনোনীত প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যালাবামার রেডস্টোন আর্সেনাল সফরে ছিলেন। এটা ছিল সেনাবাহিনীর রকেট কর্মসূচির সূতিকাগার, তিনি সেখানে জার্মান দেশত্যাগকারী বিজ্ঞানী ওয়ের্নহার ভন ব্রাউনের সঙ্গে কথা বলছিলেন। এই ব্যক্তিকে আধুনিক রকেটবিজ্ঞানের জনক হিসেবে অভিহিত করা হয়—সোভিয়েত ইউনিয়ন রকেট স্পুটনিক বানিয়েছে, এমন খবর আসার পর যুক্তরাষ্ট্রও রকেট বানানো শুরু করে। তার পাঁচ দিন পর ম্যাকেলরয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন, সেদিন ওয়াশিংটনের আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রাযুক্তিক উত্কর্ষের খবর। এক মাস পর সোভিয়েত ইউনিয়ন স্পুটনিক-২ উেক্ষপণ করলে আইসেনহাওয়ার প্রশাসন আরও চাপের মধ্যে পড়ে যায়। ম্যানহাটান প্রকল্পের অন্যতম প্রবক্তা আর্নেস্ট ও. লরেন্সের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ও করপোরেট উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিভাবান বিজ্ঞানীদের নিয়ে অগ্রসর বৈজ্ঞানিক গবেষণা সংস্থা গঠনের প্রস্তাব দেন। ১৯৫৭ সালের ২০ নভেম্বর তিনি প্রথমবারের মতো ক্যাপিটাল হিলে যান। সেখানে তিনি প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত সব গবেষণার জন্য একজন ‘একক ব্যবস্থাপকের’ প্রস্তাব দেন। সংস্থাটির প্রাথমিক কাজ হবে দূরপাল্লার রকেট, স্যাটেলাইট, মহাশূন্য গবেষণা ও উন্নয়ন কর্মসূচি পরিচালনা করা। সংস্থাটি চুক্তি করার ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকবে, আর এর গবেষণার ক্ষেত্র হবে অসীম। ১৯৫৮ সালের ৭ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ার এই অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্টস এজেন্সির (আরপা) তহবিল অনুমোদনের জন্য কংগ্রেসকে অনুরোধ করেন। সংস্থাটির প্রথম পরিচালক হিসেবে ম্যাকেলরয় বেছে নেন জেনারেল ইলেকট্রিকের ভাইস প্রেসিডেন্ট রয় জনসনকে। এই আরপা শুরুতেই তার লক্ষ্য ঠিক করে ফেলে: মহাশূন্যের সামরিকায়ন, সারা দুনিয়ায় নজরদারির জন্য স্যাটেলাইট, যোগাযোগ স্যাটেলাইট, কৌশলগত ও কক্ষপথসংক্রান্ত অস্ত্রব্যবস্থা ও চন্দ্রাভিযান। তবে ১৯৫৮ সালে ন্যাশনাল অ্যারোনটিক অ্যান্ড স্পেস এজেন্সি (নাসা) গঠনের পর আরপা মহাশূন্যসংক্রান্ত বেসামরিক গবেষণার এখতিয়ার হারায় এবং ১৯৫৯ সালের মধ্যে সংস্থাটি মহাশূন্যসংক্রান্ত সামরিক কর্মসূচিও হারায়। একই সঙ্গে সংস্থাটির তহবিলও চলে যায় আর জনসন ইস্তফা দেন। অন্যদিকে, ম্যাকেলরয় আরপা বিলোপ না করে এটাকে পরিষ্কারভাবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ব্লু স্কাই টেকনোলজি পরিচালনা কেন্দ্রে রূপান্তরিত করেন। সশস্ত্র বাহিনীর সব শাখাকে স্থলাভিষিক্ত করে এ কাজ করা হয়। পরবর্তীকালে এর নামকরণ হয় ডারপা (ডিফেন্স অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্টস এজেন্সি-১৯৭২)। সংস্থাটি ক্ষেপণাস্ত্রবিধ্বংসী রকেট নির্মাণে কাজ করে। কক্ষপথসংক্রান্ত গবেষণায় এটা জিপিএস বা গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেমের পূর্বসূরি। শুরুর দিকে এটা সত্যি এক উল্লেখযোগ্য ব্যাপার ছিল। প্যাকেট সুইচিং ডিজিটাল যোগাযোগ-প্রযুক্তির সঙ্গে এটা সম্পর্কিত ছিল। এর পেছনে রয়েছে রান্ড করপোরেশনের প্রকৌশলী পল বারানের অন্তর্দৃষ্টি। ১৯৮০-এর দশকে ডারপা দ্বিতীয় শীতল যুদ্ধের প্রস্তুতিতে তেল-জল জোগায়—এটা ছিল রোনাল্ড রিগ্যানের তারকা যুদ্ধ। ১৯৯০ ও ২০০০-এর শুরুর দিকে এনএসএর সঙ্গে যুক্ত হয়ে ডিজিটাল নজরদারির প্রযুক্তি বিকাশে গবেষণা করে সংস্থাটি, সামরিক ড্রোন প্রযুক্তি তৈরির কাজেও তারা এ সময় হাতে নেয়৩২।

১৯৬১ সালে জ্যাক পি. রুইনাকে আরপার তৃতীয় পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, তাঁর আমলেই প্রতিষ্ঠানটি কম্পিউটার গবেষণায় শীর্ষে উঠে আসে। রুইনা বিমানবাহিনীর কাছ থেকে একটি বিশাল কিউ-৩২ বিমান কেনেন, তার গবেষকেরা এটা নিয়ে সামরিক কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোলবিষয়ক গবেষণা শুরু করেন। রুইনা এমআইটির জে সি আর লিকলিদারকে আরপার কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল ও আচরণবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করেন। লিকলিদার সে দেশের সেরা কম্পিউটার বিজ্ঞানীদের একটি চুক্তিতে আবদ্ধ করে নেটওয়ার্কভিত্তিক আন্তসম্পর্কিত কম্পিউটারের ধারণা প্রবর্তন করেন। এর ফল হিসেবে ১৯৭০-এর দশকে আরপানেটের উদ্ভব হয়, যেটা আজকের যুগের ইন্টারনেটের অগ্রদূত।

আরপা ছিল আইসেনহাওয়ার প্রশাসনের ফসল, এর পাশাপাশি ট্রুম্যান ও আইসেনহাওয়ারের জামানায় আরও অনেক প্রতিরক্ষা এজেন্সির সৃষ্টি হলেও এটা ছিল সেই বর্ধিষ্ণু সামরিক শিল্প কমপ্লেক্স যুগের বৈজ্ঞানিক-প্রাযুক্তিক উত্কর্ষের শীর্ষবিন্দু। ম্যাকেলরয়ের প্ররোচনায় ও আইসেনহাওয়ারের নির্দেশে যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত-অধিকৃত মহাশূন্যে ইউ-২ গোয়েন্দা বিমান পাঠায়, যদিও সোভিয়েতরা ১৯৬০ সালে এটা ভূপাতিত করে। একই সঙ্গে ইন্দোচীন ও অন্যান্য স্থানে পাল্টা গোয়েন্দা তত্পরতা শুরু করে৩৩। আইসেনহাওয়ারের সামরিক নীতি ছিল সম্প্রসারণমূলক। তবুও ১৯৬১ সালের ১৭ জানুয়ারি আইসেনহাওয়ারের বিদায়ী ভাষণে তাঁর সৃষ্টিবিষয়ক দ্বিতীয় চিন্তা, অনিশ্চয়তা, দোদুল্যমানতা ও এমনকি ভয়ের আভাসও পাওয়া যায়। তিনি সুনির্দিষ্টভাবে বলেন, ‘আমরা এক বিরাট ও স্থায়ী অস্ত্রশিল্প নির্মাণ করেছি...সে খাতে আমাদের বার্ষিক ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের করপোরেশনগুলোর ব্যয়ের চেয়ে বেশি।’ তিনি তাড়া দিয়ে বলেন,

‘সামরিক শিল্প কমপ্লেক্স যাতে দেশের ভেতরে মাত্রাতিরিক্ত প্রভাবশালী হয়ে না ওঠে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।’ তাঁর কণ্ঠে শঙ্কার নিনাদ শোনা যায়, আমাদের সমাজ ‘বৈজ্ঞানিক-প্রাযুক্তিক অভিজাতদের দাসে পরিণত হতে পারে’। পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে ‘অর্থের সর্বময় ক্ষমতা’ সবকিছুই গ্রাস করে নিয়েছে।

আইসেনহাওয়ারের এই সতর্কবার্তা সুচিন্তিতভাবেই ছিল ভাসা ভাসা। তিনি ‘সামরিক শিল্প কমপ্লেক্স’ বিষয়টির কোনো সংজ্ঞা দেননি, শুধু তাঁর বক্তব্যে সেটা একবার উচ্চারণ করেছেন মাত্র। তার পরও তাঁর মন্তব্যে সামরিক-প্রাযুক্তিক-করপোরেট শিল্পবিষয়ক আভাস পাওয়া যায়, ১৯৪৬ সাল থেকে শুরু করে এ শিল্প নির্মাণে তিনি নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেছেন। আর তাঁর আমলে এ শিল্পের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধন হয়েছে। ১৯৬২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বছরে যে বৈদ্যুতিন যন্ত্র কেনাবেচা হয়েছে, তার ৫৬ দশমিক ২ শতাংশের খরিদ্দার ছিল সামরিক খাত ও সংশ্লিষ্ট বেসামরিক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান৩৪।

ভিয়েতনাম যুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ নজরদারি

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অর্থনৈতিক অগ্রগতি সবচেয়ে বেশি হারে ঘটেছে ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে, প্রায় শতভাগ কর্মসংস্থান হয়েছে এ সময়ে। আবার ভিয়েতনাম ও কোরীয় যুদ্ধও এ সময়েই যুগপত্ভাবে সংঘটিত হয়েছে। ‘কমিউনিজম ঠেকাও’ এবং ‘মুক্ত দুনিয়া রক্ষা’র নামে এসব যুদ্ধ হলেও এর আসল উদ্দেশ্য ছিল পুঁজিবাদ ও মার্কিন আধিপত্য বজায় রাখা। এই দুটোই সে সময় হুমকির মুখে পড়লে যুক্তরাষ্ট্র এ পথ বেছে নেয়। মূলত সাম্রাজ্যের ভূরাজনীতি ও শীতল যুদ্ধের কারণে এসব যুদ্ধ সংঘটিত হলেও সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি এর অন্যতম কারণ, পুরো অর্থনীতিই এর ফলে ফুলে-ফেঁপে ওঠে। প্রভাবশালী রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক শক্তির যুপকাষ্ঠে সেটা বিনষ্ট হয়নি, বরং তা ক্ষমতালোভী অভিজাতদের হিসাবের খাতায় ঢুকে যায়।

এরূপ সামরিক-সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা ও পুঁজি আহরণের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের শুধু বহিঃস্থ শত্রুই নয়, অনেক ‘অভ্যন্তরীণ শত্রু’ও জুটে যায়। এদের মধ্যে পুঁজিবাদ ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি যেমন রয়েছে, তেমনি সমাজের নানা রকম ধ্বংসাত্মক শক্তিও রয়েছে।

১৯৫০-এর দশকের শেষে ও ৬০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিক অধিকার আন্দোলন গড়ে ওঠে, পরবর্তীকালে যা ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনে মোড় নেয়। ফলে রাষ্ট্র নাগরিকদের ওপর সামরিক ও আধা সামরিক (গোপন পুলিশ) নজরদারি ব্যাপক হারে বাড়ায়ুংু। ১৯৭০-৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ‘আর্মি ফাইলস’ কেলেঙ্কারি ফাঁস হয়। জানা যায়, সেনাবাহিনী দেশটির লাখ লাখ মানুষের ওপর গোয়েন্দাগিরি করছে এবং এমনকি তাদের সম্পর্কিত বিশেষ তথ্যসারণিও প্রস্তুত করেছে। এসব নথি মেরিল্যান্ডে অবস্থিত হোলাবার্ড দুর্গে একটি ইস্পাত-নির্মিত কক্ষে সংরক্ষণ করা হয়েছিল, যেটাকে বলে ইনভেস্টিগেটিভ রেকর্ডস লাইব্রেরি। এটির উচ্চতা ছিল দোতলার সমান, লম্বায় অর্ধেক ব্লকের সমান। এসব নথির সঙ্গে স্যাটেলাইট ফাইল ও একটি ‘বিরাট নাশকতামূলক ফাইল’ ছিল সেখানে, এতে নাগরিক অধিকার ও যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের তথ্য ছিল। আরও সাধারণভাবে, সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী ও সেনাবাহিনীর মধ্যকার বিরোধিতাকারীদের তথ্য ছিল। সেনাবাহিনী ১৯৬৭ সালে একটি গোপন জাতীয় টেলিটাইপ সেবার নির্মাণকাজ সমাপ্ত করে, এর মাধ্যমে জনগণসংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য দ্রুত বিনিময় করা সম্ভব হয়।

কাউন্টার ইনটেলিজেন্স অ্যানালাইসিস ব্রাঞ্চের দায়িত্ব ছিল একটি বিশাল তথ্যবিবরণী তৈরি করার। নজরদারির ফাইল থেকে এতে তথ্য যুক্ত করা হয়; লক্ষ্য ছিল এসব তথ্য কম্পিউটারে সংরক্ষণ করার। ১৯৬৮ সালের ওয়াশিংটন অভিমুখে গরিব মানুষের মিছিল হয়েছিল, এতে অংশগ্রহণকারীদের ওপর নজরদারি করা হয়। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের কবরে যাওয়া মানুষ, কালো জাতীয়তাবাদী, সমাজতান্ত্রিক সংগঠন কেউই এই নজরদারির বাইরে ছিল না। সেনাবাহিনীর এক হাজার ৫০০ সাদাপোশাকের গোয়েন্দা ছিল। তারা ৩০০ কার্যালয়ে বিন্যস্ত হয়ে কাজ করত৩৫।

সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা ফাইলবিষয়ক কংগ্রেসের তদন্তে সেনা কর্তৃপক্ষ বলেছে, নাশকতামূলক কাজের ফাইলসহ এসব ফাইল ধ্বংস করা হয়েছে। পরে দেখা গেল, এসব ফাইল আরপানেটের মাধ্যমে এনএসএকে সরবরাহ করা হয়েছে। এটি এক বিশেষ ধরনের নেটওয়ার্ক, এর মাধ্যমে ৫০টি সরকারি সংস্থা পরস্পর যুক্ত রয়েছে। এই নেটওয়ার্কের অর্থায়ন করেছে ডিপার্টমেন্ট অব ডিফেন্স অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্ট এজেন্সি (আরপা)...গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, এসব তথ্য মেরিল্যান্ডের ফোর্ট মিডে ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সির (এনএসএ) সদর দপ্তরে সংরক্ষিত রয়েছে। সেনা ফাইলগুলো ১৯৭২ সালে আরপানেটে স্থানান্তর করা হয়েছে, অর্থাত্ এসব ধ্বংস করার আদেশ দেওয়ার দুই বছর পর—এর সঙ্গে সেনাবাহিনীর ফোর্ট হোলাবার্ডের ব্যবস্থাপনায় যেসব তথ্য ছিল, সেগুলোও ধ্বংসের আদেশ দেওয়া হয়েছিল৩৬।

বহু মার্কিন এই প্রথমবারের মতো জানতে পারে যে আরপানেট বলে কিছু একটা আছে। ১৯৭০-এর দশকেই এনএসএ যুক্তরাষ্ট্রে নজরদারির অংশ হিসেবে প্রথম যুগের প্রোটো ইন্টারনেট ব্যবহার করেছে বলে জানা যায়। এই উদ্ভাবনের হুলে বিদ্ধ হয়ে সিনেটর স্যাম আরভিন ১৯৭৫ সালে এমআইটিতে একটি ভাষণে বলেন, কম্পিউটারের কারণে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন হুমকির মুখে পড়েছে, এই যন্ত্রে ‘বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করা যায় এবং বিদ্যুত্-গতিতে তা নিয়ে নেওয়া যায়’৩৭। সেনাবাহিনীর এই জনগণ ও ডেটাবেইসে নজরদারির ঘটনায় সিনেট যে তদন্ত করে, তাতে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনের অধ্যাপক আর্থার আর. মিলার সাংবিধানিক অধিকারসংক্রান্ত সিনেট উপকমিটির সামনে ঘোষণা করেন, এতে সভাপতিত্ব করেন আরভিন:

যখন কোনো ব্যক্তি কর রিটার্ন দাখিল করে বা ক্রেডিট কার্ড ও জীবন বিমার আবেদন করে, সরকারি সেবাপ্রাপ্তি ও চাকরির আবেদন করে, তখন তার নামে একটি তথ্যসারণি খোলা হয়, তার জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে। ব্যাপারটা এখন এমন পর্যায়ে গেছে যে, কোনো বিমান সংস্থার টিকিট কাটলে বা জাতীয় হোটেল চক্রের কোথাও ঘর ভাড়া করলে বা গাড়ি ভাড়া করলে সেই ব্যক্তির তথ্য কম্পিউটারে জমা হয়ে যায়। এসব তথ্য বিশ্লেষণ ও সারণি করলে সেই ব্যক্তির তত্পরতা, অভ্যাস ও সম্পৃক্ততা সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করা সম্ভব। খুব কম মানুষই আছে, যারা আধুনিক প্রযুক্তির এই নজরদারির ক্ষমতাবিষয়ক ধারণা রাখে। ফলে এমন ভীতির সম্ভাব্যতা মোটেও অমূলক নয় যে প্রত্যেক মার্কিনের ভ্রূণ থেকে কবর পর্যন্ত তথ্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর হাতে রয়েছে।

মার্কিন নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যসংক্রান্ত হুমকি যতই বাড়ুক না কেন, অধিকাংশ মার্কিনই জানে না ফেডারেল সংস্থা ও বেসরকারি কোম্পানিগুলো কীভাবে এই কম্পিউটার ও মাইক্রোফিল্ম প্রযুক্তি ব্যবহার করে নাগরিকদের সম্পর্কে কী পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ ও বিনিময় করছে। এমন কোনো দিন নেই যে সেদিন একটি না একটি তথ্য ব্যাংক বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। এ বছরের শুরুতে জানা যায়, মার্কিন সেনাবাহিনী কিছু সময়ের জন্য আইন সিদ্ধ রাজনৈতিক তত্পরতায় অংশগ্রহণকারী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগুলোর ওপর সুনির্দিষ্টভাবে নজরদারি করছে ৩৮।

১৯৭০-এর দশকে এফবিআই কীভাবে ব্যাপক নজরদারি চালিয়েছে ও আন্দোলন ধ্বংস করেছে সেটাও আমরা জানি, কইনটেলপ্রো (কাউন্টার ইনটেলিজেন্স প্রোগ্রামের আদ্যক্ষর)। জে. এডগার হুভারের নেতৃত্বে ১৯৬৫ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত এফবিআই ব্যাপক নজরদারি ও অবৈধ তত্পরতা চালিয়েছে—বলপূর্বক প্রবেশ, জালিয়াতি, উসকানিমূলক কাজ, অবৈধ গ্রেপ্তার ও সহিংসতা প্রভৃতি। ইতিপূর্বে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে তারা যেভাবে লেগেছে, ঠিক সে কায়দায় তারা তখন ভিন্নমতাবলম্বী গোষ্ঠী, সমাজতান্ত্রিক সংগঠন, নাগরিক অধিকার নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক ও নিউ লেফট ওয়ার ক্রিটিকদের বিরুদ্ধে অভিযানে নামে। এফবিআইয়ের কাছে এসব ছিল ‘যুক্তিসিদ্ধ’, বিশেষ করে সোশ্যালিস্ট ওয়ার্কার্স পার্টি কোনো নির্বাচনে প্রার্থী দিলে আর তিনি ‘ক্যাস্ট্রোর কিউবা এবং...দক্ষিণের অন্তর্ভুক্তিকরণ’-এর সমর্থন দিলে এই নিপীড়ন বৈধতা পেয়ে যায়। অন্যদিকে, নিউ লেফট গোষ্ঠীগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে এই ভিত্তিতে যে তারা সাধারণভাবে বিপ্লব এবং ‘ভিয়েতনামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পতনের ডাক দেয়’৩৯।

‘মিনারেত’ সংকেত নামের অধীনে জনসন ও নিক্সন যুগে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধ সমালোচকদের বৈদ্যুতিন যোগাযোগে নজরদারি করা হতো, এদের মধ্যে এক হাজার ৬০০ নাগরিকও ছিল—এদের এনএসএর নজরদারির তালিকায় রাখা হয়েছিল। যে ব্যক্তিবর্গকে নজরদারিতে রাখা হয়েছিল তাঁরা হলেন মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র, হুইটনি ইয়ং, এলড্রিজ ক্লিভার, স্টোকলি কারমাইকেল, জেন ফন্ডা, টম হেইডেন ও মোহাম্মদ আলী। এর বাইরে এনএসএর নজরদারির তালিকায় ক্ষমতকাঠামোর বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও ছিলেন, যেমন সিনেটর ফ্রাঙ্ক চার্চ ও হাওয়ার্ড বেকার, নিউইয়র্ক টাইমস-এর কলামিস্ট টম উইকার ও ওয়াশিংটন পোস্ট-এর কলামিস্ট আর্ট বুচওয়াল্ড। এনএসএর এই প্রজেক্ট ‘মিনারেত’ ও কইনটেলপ্রো ফাঁস হয়ে গেলে ফরেন ইনটেলিজেন্স সারভেলেন্স অ্যাক্ট, ১৯৭৮ প্রণয়ন করা হয়। এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারের জনগণের ওপর নজরদারি করার ক্ষমতা সীমিত করা হয়৪০।

১৯৭০-এর দশকের শুরুর দিকে এনএসএ তার কোড নামের প্রকল্প একিলন ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে যৌথভাবে শুরু করে। এর লক্ষ্য ছিল স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পরিচালিত বেসামরিক টেলিযোগাযোগ নজরদারিতে রাখা। উইলিয়াম ব্লাম ২০০৫ সালে তাঁর রগ স্টেট গ্রন্থে বলেন, ‘একিলন প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ যোগাযোগ নজরদারির আওতায় আনা হয়, আর কম্পিউটার ব্যবহারের মাধ্যমে তা চিহ্নিত করা হয়। এমনকি অপরিচিত ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় মেসেজও আহরণ করা হয় সেখান থেকে। এর মধ্যে ছিল দূতাবাসের আলাপচারিতা, ব্যবসায়িক যোগাযোগ, যৌনালাপ, জন্মদিনের শুভেচ্ছা প্রভৃতি। মূল শব্দ দিয়ে এসব মেসেজ খোঁজ করা হয়েছে, তাদের কাছে যা প্রয়োজনীয় বোধ হয়েছে।’ ইংল্যান্ডে এনএসএর যে লিসেনিং বেস আছে তার পরিধি ৫৬০ একর। জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ ছাড়াও এনএসএ বিভিন্ন করপোরেশনের হয়ে গোয়েন্দাগিরি করেছে, চুরি করার প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। ১৯৯৪ সালে সিআইএ ও এনএসএর কল্যাণে ইউরোপীয় এয়ারবাস শিল্প লাভজনক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য হারায়, যা আবার দখল করে নেয় মার্কিন কোম্পানিগুলো।

ফাইন্যান্সিয়ালাইজেশন, তথ্য মাইনিং ও সাইবার যুদ্ধ

ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর মার্কিন অর্থনীতিতে সংকট দেখা দেয়। ফলে এক দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা সৃষ্টি হয় সেখানে। প্রবৃদ্ধি কমে যায়, বেকারত্ব ও কর্মহীনতা বেড়ে যায়৪২। সামরিক ব্যয় ও ম্যাডিসন অ্যাভিনিউ-ভিত্তিক বিক্রয় প্রচেষ্টার কারণে ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে অর্থনীতিতে সৃষ্ট উদ্বৃত্ত হজম করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু ১৯৮০-এর দশকে এসে তার সেই কার্যকারিতা কমে যায়, যদিও এ সময় ভোক্তা ঋণের পরিমাণ বেড়ে যায় (ক্রেডিট কার্ডসহ)। কৃত্রিমভাবে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়িয়েও লাভ হয়নি বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রিগ্যান যে সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তাতেও কাজ হয়নি। রিগ্যান কার্যত একটি সামরিক কেইনসবাদ চালু করেছিলেন। করপোরেশন ও ধনীদের কর কমিয়েছিলেন তিনি, আর সামরিক ব্যয় বাড়িয়েছিলেন। এর মধ্যে আছে তাঁর সেই ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্রবিরোধী স্টার ওয়ার্স কর্মসূচি, এতে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেছে ডারপা। শ্রমিক ইউনিয়ন, মজুরি ও শ্রমিক কল্যাণে ব্যয় কমানো হয়, দরিদ্রদের অবস্থা আরও খারাপ হয় আর চালু হয় নব্য উদারবাদের যুগ।

রিগ্যান যুগের যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রের যুদ্ধ তত্পরতার পরিসর ও গোয়েন্দা তত্পরতার ওপর ক্ষণিকের জন্য আলো ফেলা হয়, ইরান-কন্ট্রা সম্পর্কের বিষয়টিও জনসমক্ষে চলে আসে। এর ফলে ১৯৯০ সালের ৭ আগস্ট রিগ্যান আমলের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অ্যাডমিরাল জন পয়েনডেক্সটারকে পাঁচ দফা কংগ্রেসের কাছে মিথ্যা বলা ও ইরান-কন্ট্রা সম্পর্কবিষয়ক কংগ্রেস কমিটির তদন্তে বাধা দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। যার মধ্যে রয়েছে অবৈধভাবে ইরানের কাছে অস্ত্র বিক্রি। এর মাধ্যমে কন্ট্রা বিদ্রোহীরা নিকারাগুয়ার সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই চালানোর অর্থ জোগাড় করত (এই রায় পরবর্তীকালে অবশ্য বদলে যায়)।

একই সঙ্গে এই পয়েনডেক্সটার আরেকটি কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে ধরা পড়েন। রিগ্যানের স্বাক্ষর করা ন্যাশনাল সিকিউরিটি ডেসিশন ডিরেকটিভ-১৪৫ (এনএসডিডি) প্রণয়ন করার কারণে তিনি আটক হন। এই এনএসডিডি-১৪৫-এর হাতে যুক্তরাষ্ট্রের সব ডেটাবেইসের নিয়ন্ত্রণ থাকার কথা, এর মাধ্যমে তারা সে দেশের সব ব্যক্তিগত কম্পিউটারে তল্লাশি করে ‘চাঞ্চল্যকর কিন্তু অশ্রেণিকৃত’ তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে—এমন ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। ফলে এনএসএ কম্পিউটার জগতের সম্রাটে পরিণত হয়। বেসরকারি খাতের প্রতিবাদ ও ইরান-কন্ট্রাবিষয়ক বিতর্কের কারণে এই এনএসডিডি-১৪৫ প্রত্যাহার করা হয়। কিছু সময় পর সিনটেক নামের একটি বেসরকারি ফার্মে কাজ করে ২০০২ সালে পয়েনডেক্সটার আবারও দৃশ্যপটে আবির্ভূত হন। তিনি ডারপার হেড অব দি ইনফরমেশন অ্যাওয়ারনেস অফিসের প্রধান হিসেবে কাজ শুরু করেন। এর কাজ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য টোটাল ইনফরমেশন অ্যাওয়ারনেসের (টিআইএ) প্রাযুক্তিক ভিত্তি নির্মাণ করা। এ কাজ করার দায়িত্ব ছিল এনএসএর। লক্ষ্য ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সব মানুষের ডিজিটাল যোগাযোগ জড়ো করে তা বিশ্লেষণ করা। খোদ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যে, এটা ‘ভার্চুয়াল সেন্ট্রালাইজড গ্র্যান্ড ডেটাবেইস, সব বৈদ্যুতিন যোগাযোগের তথ্য এতে থাকবে। টিআইএ কর্মসূচির একটি বড় ঠিকাদার ছিল বুজ অ্যালেন হ্যামিল্টন, এটি একটি বৃহত্ প্রতিরক্ষা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। বুজ অ্যালেনের গোয়েন্দা ব্যবসার প্রধান মাইক ম্যাককনেল (জর্জ এইচ ডব্লু বুশের জামানার এনএসএ পরিচালক ও পরবর্তীকালে জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলে ন্যাশনাল ইনটেলিজেন্সের পরিচালক) পয়েনডেক্সটারের একজন ঘনিষ্ঠ মানুষ ছিলেন। কংগ্রেসে ২০০৩ সালে এ কর্মসূচিতে অর্থায়ন বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে এর নামকরণ করে টেররিজম ইনফরমেশন অ্যাওয়ারনেস। লক্ষ্য ছিল, এটা চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হবে। এ কর্মসূচির আওতায় একটি অনলাইনভিত্তিক ফিউচার ট্রেডিং শুরু হয়েছিল, যেখানে সন্ত্রাসী হামলার বিষয়ে অনুমান করা হয়েছিল আর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছিল পয়েনডেক্সটার ও টিআইএর৪৩।

যদিও রিগ্যান জামানার বৈশিষ্ট্যসূচক ব্যাপার হচ্ছে নব্য উদারনীতিক ফাইন্যান্সিয়ালাইজেশন, এ প্রপঞ্চটি যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রের তকমাও ছাপিয়ে ওঠে। উদ্বৃত্ত পুঁজি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থনীতিবিদদের ভাষায় ‘প্রকৃত অর্থনীতি’ বিনিয়োগের জন্য ততটা লাভজনক না হওয়ায় বিপুল পরিমাণ পুঁজি ফিন্যান্সের আবছায়ার জগতে প্রবেশ করে। আর ভিয়েতনাম যুদ্ধের কারণে বিদেশে এত পরিমাণ ডলার পড়ে ছিল যে তা থেকে মুনাফা করার সুযোগও ছিল অনেক কম। ফলে তাকে দেশের ভেতরেই নতুন কোনো বিনিয়োগ ক্ষেত্র তৈরি করতে হতো। পুঁজির এ ডাকে সাড়া দিল যুক্তরাষ্ট্রের ফিন্যান্স জগত্, তারা নানা রকম ফিউচার, অপশন ও ডেরিভেটিভ তৈরি করল, যেখানে বিনিয়োগ করা ছিল অন্ধকারে ঢিল ছোড়ার মতো। তারপর মার্কিন ও বৈশ্বিক অর্থনীতি এক স্পেকুলেশনের খেলা দেখাল। ডেবট লিভারেজে পরিবর্তন দেখা গেল, ফিন্যান্সিয়াল করপোরেট ঋণ ধাই ধাই করে বাড়তে শুরু করল। ১৯৭০ সালে এর পরিমাণ ছিল মার্কিন জিডিপির ১০ শতাংশ, ১৯৯০ সালে তা দাঁড়াল ৪০ শতাংশে। তারপর এর পরিমাণ আরও বাড়ল৪৪। এটা শুধু নির্ধারিত বিনিয়োগে বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত পুঁজির বিনিয়োগ হলো (মূলত ব্যবসায়িক কাঠামো ও কম্পিউটার) বা কর্মসংস্থান সৃষ্টির মধ্য দিয়ে প্রকৃত অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলল না, এটা আর্থিক পরিসম্পদের যে সন্দেহজনক বাড়বাড়ন্ত ঘটাল, তাতে একটি শ্রেণি প্রকৃত অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্ক ছাড়াই বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক বনে গেল। এর একটি বড় অংশ বিলাসপণ্য ক্রয়ে বিনিয়োগ হলো, ফলে উদ্বৃত্ত যেমন বিনিয়োগ হলো, তেমনি অর্থনীতিতেও তেজি ভাব দেখা গেল।

সেই ১৯৮৩ সালেই মান্থলি রিভিউয়ে ‘প্রোডাকশন অ্যান্ড রিভিউ’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধে হ্যারি ম্যাগডফ ও পল এম. সুইজি এই অতিকায় পালবদলের কাহিনি বয়ান করেছেন। অর্থাত্ উত্পাদন থেকে আর্থিক খাতের ওপর অর্থনীতির নির্ভরশীলতা। ফলাফল হচ্ছে, অর্থনীতি দৃশ্যত আর্থিক খাতে সৃষ্ট বুদ্বুদের ওপর চিরতরে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই অর্থনীতি স্থিতিশীল নয়, আর এর প্রকৃতি পরজীবীর মতো। সব সময়ই ভয় থাকে, আর্থিক খাত ধসে পড়বে। আর তাকে এসে উদ্ধার করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই ভঙ্গুর খাত জোড়াতালি দিয়ে দাঁড় করাতে হর-হামেশাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্বারস্থ হতে হয়। সুইজি পরবর্তীকালে এর নামকরণ করেন, ‘পুঁজি সংগ্রহের প্রক্রিয়ার ফিন্যান্সিয়ালাইজেশন’৪৫।

অ্যালান গ্রিন্সপ্যান ১৯৮৭ সালে ফেডারেল রিজার্ভ বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর দুই দশক ধরে এই ফাইন্যান্সিয়ালাইজেশন প্রক্রিয়া তদারক করেন। তিনি বাজারও নিয়ন্ত্রণমুক্ত করেন। এসব কারণে ওয়াশিংটনে ওয়াল স্ট্রিটের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, সরকারের উচ্চ মহলে তার প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে উত্পাদকেরা যে স্বাধীনতা ভোগ করেছেন, তার চেয়েও বেশি প্রতিপত্তি ছিল তাদের৪৬।

দ্রুতগতির কম্পিউটার নেটওয়ার্কের কারণেও ফিন্যান্সিয়ালাইজেশনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। নব্য বিকশিত সন্দেহমূলক বাজারের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয় এই কম্পিউটার নেটওয়ার্ক। এই প্রক্রিয়ার কারণে নজরদারি পুঁজিবাদের ধারণা আরও হূষ্টপুষ্ট হয়। বিজ্ঞাপন ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য তারও তথ্যের চাহিদা ছিল অমিত। এর লাভজনক সম্প্রসারণের জন্য গৃহঋণের মর্টগেজের নিরাপত্তা, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য বিমা ও পেনশন তহবিলের বৃদ্ধি, ছাত্রঋণ ও ব্যক্তিক ফিন্যান্সের প্রসার প্রয়োজন। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ ৩০ শতাংশ বেড়ে যায়। ক্রিস্টিয়ান প্যারেন্টি ১৯৯১ সালে লিখিত গ্রন্থ দ্য সফট কেজ-এ বলেছেন, এসব ফাইন্যান্স পণ্য বিক্রয়ের জন্য আমাদের জীবনের ডিজিটাল ফাইল তৈরি হয়, যার স্থান হয় করপোরেট তথ্য ভান্ডারে৪৮। ২০০০ সালে মাইকেল ডসন দ্য কনজ্যুমার ট্র্যাপে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সব বড় করপোরেশন বিশাল তথ্যভান্ডার তৈরি করেছে, এরা আবার মাইনিংয়ের সঙ্গেও জড়িত। ‘সিমেট্রিক্যাল রিসার্চ উন্নত বিশ্লেষণাত্মক সমাধান দেওয়ার বিজ্ঞাপন দিয়েছে। তারা তাদের করপোরেট গ্রাহকদের দুনিয়ার সবচেয়ে উন্নত তথ্য বিশ্লেষণ দলের মাধ্যমে সেবা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তারা ৩৫ টেরাবাইট মাস্টার কার্ড তথ্যেও পরিসংখ্যানগত সেবা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। টেরাবাইট হচ্ছে কম্পিউটারে সংরক্ষিত এক ট্রিলিয়ন ইউনিট কম্পিউটার তথ্য’৪৯।

যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বৃহত্ তথ্য ব্রোকার বিপণন জগতের মহিরুহ অ্যাক্সিকমের ২৩ হাজার কম্পিউটার সার্ভার রয়েছে, তারা বছরে ৫০ ট্রিলিয়ন তথ্য প্রক্রিয়াজাত করে। তারা ২০ কোটি মার্কিনের ওপর গড়ে এক হাজার ৫০০ তথ্য পয়েন্ট সংরক্ষণ করে থাকে। প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য তারা একটি ‘ডিজিটাল ডসিয়ার’ সংরক্ষণ করে, প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য ১৩ সংখ্যার একটি কোড তৈরি করেছে তারা। ফলে সেসব ব্যক্তি যেখানেই যাক না কেন, তারা তাদের অনুসরণ করতে পারে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিসংক্রান্ত অনলাইন ও অফলাইন তথ্যের মেলবন্ধন ঘটায় তারা। অধিকাংশ তথ্যই এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সংগৃহীত হয়, যেমন ফেসবুক। অ্যাক্সিকম এসব তথ্য গুছিয়ে ‘প্রিমিয়াম প্রোপ্রাইটারি বিহেভিয়ারাল ইনসাইট’ তৈরি করে। যাপিত জীবনের ধরনের ওপর ভিত্তি করে ৭০টি গুচ্ছ প্রস্তুত করা হয়। প্রত্যেক ব্যক্তিকে এর মধ্যে যেকোনো একটিতে ফেলা হয়। এটা করতে শ্রেণি, খরচের অভ্যাস, ভৌগোলিক অবস্থান-প্রভৃতি মানদণ্ড বিবেচনায় আনা হয়। অ্যাক্সিকম এসব তথ্য তার ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করে। তার ক্রেতাদের তালিকায় আছে শীর্ষ ক্রেডিট কার্ড প্রদানকারী শীর্ষ ১৫টি কোম্পানির শীর্ষ ১২টি প্রতিষ্ঠান, শীর্ষ ১০টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের সাতটি, শীর্ষ ১০টি বিমা কোম্পানির পাঁচটি, শীর্ষ ১০টি ব্রোকারেজ ফার্মের ছয়টি, শীর্ষ ১০টি মিডিয়া/ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানির আটটি, শীর্ষ ১০টি খুচরা বিক্রেতার সাতটি, শীর্ষ ১৪টি গাড়ি নির্মাতার ১১টি ও শীর্ষ ১০টি ওষুধ প্রস্তুতকারকদের তিনটি। এর ক্রেতাদের তালিকায় আরও আছে যুক্তরাষ্ট্রের ১০০টি শীর্ষ করপোরেশনের প্রায় অর্ধেক প্রতিষ্ঠান।

২০০১ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে অ্যাক্সিকম এফবিআই, পেন্টাগন ও হোমল্যান্ডের সঙ্গে তথ্য বিনিময় করছে, তাদের সম্পর্ক বেশ নিবিড়। ২০০১ সালে অ্যাক্সিকম জেনারেল ওয়েসলি ক্লার্ককে তাদের পরিচালনা পর্ষদে নিয়োগ দেয়। এই ব্যক্তি ইউরোপে ন্যাটোর প্রধান কমান্ডার। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটির সঙ্গে যোগাযোগের জন্য অ্যাক্সিকম তাঁকে আট লক্ষ ডলার দেয়। এই ক্লার্কের মাধ্যমে অ্যাক্সিকম পয়েনডেক্সটারের ডারপা-ভিত্তিক টিআইএর সঙ্গে কাজ শুরু করে, যার লক্ষ্য ছিল মার্কিন ও সারা দুনিয়ার জনগণের ওপর নজরদারি চালানোর জন্য প্রাযুক্তিক ভিত তৈরি করা৫০।

সিবিএসের সিক্সটি মিনিটস ২০১৪ সালের মার্চে জানায়, নিউইয়র্ক টাইমস-এর ওয়েবক্ষেত্রে ঢোকা মানে আরও ডজন খানেক তৃতীয় পক্ষকে নিজের গতিবিধি নজরদারি করার সুযোগ করে দেওয়া। যারা স্মার্টফোনে ‘ব্রাইটেস্ট ফ্ল্যাশ লাইট’ বিনা মূল্যে ডাইনলোড করে ব্যবহার করছে, তারা জানেই না যে এর মাধ্যমে ওই কোম্পানিকে তাদের গতিবিধি অনুসরণ করার সুযোগ করে দিচ্ছে। আইফোনের অ্যাপ ‘পাথ সোশ্যাল’ ব্যবহারকারীদের ছবি বিনিময় করার সুযোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি হলেও এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীর সব তথ্য চুরি হচ্ছে। ডেটা ব্রোকার ফার্ম এপসিলনের কাছে বিপণন তথ্যসারণি আছে, যেখানে আট বিলিয়নের অধিক ভোক্তা লেনদেনের তথ্য রয়েছে। অনুরূপ আরেকটি প্রতিষ্ঠান চয়েজপয়েন্টের কাছে ব্যবসা ও ব্যক্তির ১৭ বিলিয়ন রেকর্ড আছে, তারা এখন ডেটার মহিরুহ এলসেভিয়ারের অংশ। এসব তথ্য তারা ১০ হাজার ক্রেতার কাছে বিক্রি করেছে, তাদের মধ্যে সরকারি অনেক এজেন্সিও আছে৫১।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও এভাবে তথ্য বিক্রি করে থাকে। ফোর্বস ম্যাগাজিন ২০১৩ জানায়, ‘কোম্পানি ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের জীবনের নানা দিকের তথ্য সংগ্রহ করে বিনা বাধায় সেগুলো যেকোনো কারও কাছে বিক্রি করতে পারে।’ যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এরূপ তথ্য বিক্রয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা আছে। তার পরও ফোর্বস জানিয়েছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ভোক্তাদের তথ্য নানাভাবে বিক্রি করে থাকে। এর মধ্যে অন্তত ২৭ শতাংশ ক্ষেত্রে আইনি নিয়ন্ত্রণের কোনো তোয়াক্কাই করা হয় না৫২।

ফিন্যান্সিয়ালাইজেশনের জন্য জীবনের সব ক্ষেত্রে অর্থের অনুপ্রবেশ দরকার। আর্থিক ঝুঁকি হ্রাস করার ক্ষেত্রে নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন, তথ্য নিয়ন্ত্রণও জরুরি। অর্থনীতি আর্থিক খাতের ওপর অধিক হারে নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় যেকোনো সময় তা ধসে পড়তে পারে। ফলে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকিও বেড়েছে আর তা হ্রাস করার জন্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, তথ্য গোপন রাখা ও তার নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তাও বেড়েছে।

আজকের দুনিয়ায় জাতীয় নিরাপত্তার প্রধান ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে আর্থিক খাত ও সামরিক ব্যবস্থা। সাইবার যুদ্ধের প্রধান লক্ষ্যবস্তুও হচ্ছে আর্থিক খাত। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা পরিচালক ম্যাককনেল প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে বলেছিলেন, ‘নাইন-ইলেভেনের হামলাকারীরা যদি এই বিমান হামলা না করে সে দেশের কোনো একটি ব্যাংককে লক্ষ্য করে সাইবার হামলা চালাত, তাহলে মার্কিন অর্থনীতির জন্য তা আরও বেশি ক্ষতিকর হতো।’ যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব ট্রেজারি হেনরি পলসন তা স্বীকারও করেছিলেন। বুশ এতে এতটাই সতর্ক হয়ে যান যে তিনি কিছুদিনের মধ্যেই ন্যাশনাল সাইবার নিরাপত্তা পদক্ষেপ (২০০৮) গ্রহণ করেন। এর মধ্য দিয়ে অভ্যন্তরীণ ইন্টারনেট ব্যবস্থার ওপর এনএসএর নজরদারির ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এর ধারাবাহিকতায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে একটি ডেটা কেন্দ্র নির্মিত হয়৫৩। ওবামার প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিও পানেটা হুঁশিয়ারি করে দিয়েছেন, মার্কিন আর্থিক খাতে সাইবার হামলা চালানো হলে তা হবে ‘পরবর্তী পার্ল হারবারের’ শামিল। ২০১১ সালের জুলাই মাসে ওবামা এক নির্বাহী আদেশ জারি করেন, আন্তদেশীয় অপরাধী সংগঠনগুলো তাদের দেশের আর্থিক বাজারে ঢুকলে তা হবে জাতীয় জরুরি অবস্থার শামিল। সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সিম্যানটেক ২০১০ সালে জানায়, জনগণকে আর্থিক তথ্য দেওয়ার জন্য যে তথ্য সংগ্রহ অভিযান চালানো হয়েছিল, তার লক্ষ্য ছিল আসলে আর্থিক খাত, ব্যক্তি নয়।

ব্যক্তি পর্যায়ের হ্যাকিং ছাড়াও পুরো ব্যবস্থার ওপর হামলারও আশঙ্কা করা হচ্ছে। ২০১০ সালের ৬ মে স্টক বাজারের হঠাত্ পতনের পেছনেও এ রকম কিছু থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। হ্যাকাররা ক্ষতিকর কোড ব্যবহার করে পুরো নেটওয়ার্ক ধসিয়ে দিতে পারে, তারা লাখো কম্পিউটারের বটনেট ও রোবটিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে পারে। ইউএস নিউজ অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট-এর সম্পাদক মর্টিমার জাকারম্যান বলেছেন, ডিজিটাল ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক, যেকোনো সময় এর ওপর হামলা হতে পারে: ‘গড়ে একটি ম্যালওয়্যারের (আক্রমণাত্মক) ১৭৫ লাইন কোড থাকে, সেগুলো পাঁচ থেকে ১০ মিলিয়ন কোড লাইন ব্যবহার করে প্রতিরক্ষা সফটওয়্যার আক্রমণ করতে পারে’। মার্কিন/ইসরায়েল নির্মিত ‘স্টাটনেক্স’ পোকাটি ইরানকে উদ্দেশ্য করে ছাড়া হয়েছিল, যেগুলো ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রাভিমুখী ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়েছিল। এ থেকেই বোঝা যায়, সাইবার যুদ্ধ কত নিখুঁতভাবে চালানো যায়, এর ক্ষতির পরিমানই বা কত বড়৫৫। ইন্টারনেট ও একচেটিয়া পুঁজি

যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগ প্রতিরক্ষা বাজেট পেত বা যাদের নিরাপত্তা ছাড়পত্র ছিল, আরপানেট শুধু তাদের সঙ্গেই যুক্ত ছিল। এর সফলতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগ ও ব্যক্তিগত শিল্প এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে। এর ফলে ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন কম্পিউটার সায়েন্স রিসার্চ নেটওয়ার্ক (সিএসএনইটি) তৈরি করে। এর মধ্যে ছিল আরপানেট, টেলিনেট ব্যবস্থা ও ফোননেট বা ই-মেইল। এর কিছুদিন পরেই ব্যক্তিগত ইন্টারনেট ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। ১৯৮৫ সালে ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন পাঁচটি সুপার কম্পিউটার তৈরি করে তা দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করে। এটি এনএসএফএনইটির বৃহত্তর মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করেছে। এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্যক্তি খাতে করপোরেশনগুলো একটি বিরাট ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের আওতায় চলে আসে, যার প্রটোকল ছিল অভিন্ন। এর ফলে ব্যবহারকারীর সংখ্যা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়, যারা ব্যক্তিগত কম্পিউটার দিয়ে ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারীর মাধ্যমে ইন্টারনেটে ঢোকার সুযোগ পায়।

আরপানেটের কাজ বন্ধ হয়ে যায় ১৯৮৯ সালে। ১৯৯০-এর দশকে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব তৈরি হয়। এর ফলে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বিপুল হারে বেড়ে যায়, আর এর বাণিজ্যিকীকরণও ঘটে। এরপর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে: ১. ১৯৯৫ সালে এনএসএফএনইটি ব্যক্তিগত খাতে চলে যায়,৫৬ ২. ১৯৯৬ সালের টেলিকমিউনিকেশন আইনের ফলে এ খাত ও গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়, এতে এ খাতে পুঁজি বিনিয়োগের দ্বার উন্মুক্ত হয়৫৭, ৩. বর্ধিষ্ণু আর্থিক খাতের আরও বাড়বাড়ন্ত ঘটানোর লক্ষ্যে ১৯৯৯ সালে ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস মর্ডানাইজেশন অ্যাক্ট করা হয়৫৮। এ তিনটি উপাদানের সমন্বয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় একীভবন ঘটে, যেটা ডট কম বা নতুন অর্থনীতি বুদ্বুদ নামে পরিচিত। প্রযুক্তি ও আর্থিক খাতে বিনিয়োগ বাড়তে শুরু করে, যা প্রকারান্তরে একচেটিয়া ক্ষমতা আরও সংহত করেছে।

এই ডট কম বুদ্বুদ ২০০০ সালে এসে ফেটে যায়। যদিও সে সময়ের মধ্যে ইন্টারনেটের বাজারে একটি কার্টেল গড়ে উঠেছে, আর বিল গেটস ও অন্যরা ‘দ্বন্দ্ববিহীন পুঁজিবাদের’ অনেক কাহিনি শুনিয়েছেন আমাদের৫৯। সেই দশকের শেষ ভাগে এসে পুঁজি আহরণের প্রক্রিয়ায় ইন্টারনেট একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করতে শুরু করে। এর মানে এই নয় যে এই ফার্মগুলো তাদের সম্পদের শতভাগই বিক্রি করেছে; বরং দেখা গেছে তারা পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণের জন্য তাদের উত্পাদনের একটি নির্দিষ্ট অংশই বিক্রি করে। প্রতিযোগিতার পরিসর ঠিক করার ক্ষেত্রেও এটা জরুরি ছিল। (এমনকি জন ডি. রকফেলারের স্ট্যান্ডার্ড অয়েল মনোপলিও তার ভরা যৌবনে বাজারের ৮০ শতাংশের মতো নিয়ন্ত্রণ করেছে) আর আজ ২০১৪ সালে এসে প্রযুক্তি দুনিয়ার তিনটি প্রধান করপোরেশন ইন্টারনেট জগতের একচেটিয়া প্রভু হয়ে উঠেছে: অ্যাপল, মাইক্রোসফট ও গুগল। এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ৩০টি করপোরেশনের ১২টিই গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট বড় প্রতিষ্ঠান বা ইন্টারনেট জগতের একচেটিয়া প্রতিষ্ঠান: ভেরিজোন, আমাজন, ডিজনি, কমকাস্ট, ইনটেল, ফেসবুক, কুয়ালকোম ও ওরাকল। এই ফার্মগুলো নেটওয়ার্ক, প্রাযুক্তিক মান, মেধাস্বত্ব আইন ও পুরোনো দিনের কায়দায় বাজারে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করে নিজেদের বাজারের শক্তিতে পরিণত করেছে। একচেটিয়া হওয়ার হাতিয়ার ব্যবহার করে তাদের ডিজিটাল সাম্রাজ্য আরও বড় করেছে। এই অর্থনৈতিক সফলতার সঙ্গে তারা ব্যাপক রাজনৈতিক ক্ষমতাও লাভ করে। তাদের রোখার মতো কোনো আইনই হয়নি। এমনকি ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার পারলে তাদের জন্য ব্যক্তিগত সেনাবাহিনী তৈরি করে দেয়৬০।

ইন্টারনেট ও মালিকানা স্বত্বের মাধ্যমে টাকা কামানোর সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হচ্ছে জনগণের ওপর পরিচালিত নজরদারি। এর ফলে হাতে গোনা কয়েকটি ফার্ম মার্কিন অর্থনীতিতে বিক্রয় প্রচেষ্টার মাধ্যমে অর্জিত বিপুল পরিমাণ মুনাফার সিংহভাগই গ্রাস করার সুযোগ পায়। নজরদারি ডিজিটাল হয়ে যাওয়ায় বিজ্ঞাপনের খোলনলচে বদলে গেছে। আগের দিনের মতো বিজ্ঞাপনের জায়গা বা সময় কেনা সেকেলে হয়ে গেছে, এ ব্যবস্থায় সংবাদ বা বিনোদনধর্মী অনুষ্ঠান দেখা বা পড়ার সময় ব্যবহারকারীদের তা চোখে পড়ে যেতে পারে। বিজ্ঞাপনদাতাদের এখন আর সাংবাদিকতায় ভর্তুকি দেওয়ার প্রয়োজন নেই, গণমাধ্যমের আধেয় তৈরি করার দরকার নেই, তারা এখন অন্যভাবেও ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাতে পারে। ব্যাপক নজরদারির মাধ্যমে তারা এখন চাইলে তাদের ভোক্তাদের অনলাইনে চিহ্নিত করতে পারে, তারা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তাদের অবস্থান নির্ণয় করে কাউকে জানিয়ে দিতে পারে। এমনকি তাদের শারীরিকভাবেও চিহ্নিত করতে পারে। এ ব্যবস্থার ভিত্তি হচ্ছে, এখানে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার কোনো বালাই নেই। ফলে সাংবাদিকতার মতো গণমাধ্যমভিত্তিক আধেয় তৈরির সংস্কৃতি প্রায় অচল হওয়ার পথে। একে প্রতিস্থাপন করার মতো কিছু নেই।

এই একচেটিয়া করপোরেট/বাণিজ্যিক সংস্থাগুলো স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রের দমনমূলক অঙ্গগুলো, অর্থাত্ এর সামরিক, গোয়েন্দা ও পুলিশি কার্যক্রমের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে। ফলাফল হচ্ছে, এতে জাতীয় গোপন নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে শক্তিশালী হয়, যা পুরোপুরি সরকারের সঙ্গে সম্পর্কিত এডওয়ার্ড স্নোডেন, অন্যান্য তথ্য ফাঁসের সঙ্গে, এনএসএর প্রিজম ব্যবস্থার রহস্য উদ্ঘাটন করে দৈত্যাকার কম্পিউটারভিত্তিক করপোরেশন/বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সামরিক বাহিনীর শক্তিশালী যোগাযোগের চিত্র তুলে ধরেছেন। যার মধ্য দিয়ে তৈরি হয় ‘সামরিক-ডিজিটাল কমপ্লেক্স’৬১। সরকারি জবাবদিহি পরিকল্পনার কার্যনির্বাহী পরিচালক বিয়েট্রিস এডওয়ার্ডস বলেছেন, যা বেরিয়ে এসেছে, তা আসলে ‘সরকারি করপোরেট/বাণিজ্যিক নজরদারির এক জটিল অন্তর্জাল’৬২।

এটা বিস্তৃত বেসরকারি নেটওয়ার্কের প্রচলিত সীমানার গণ্ডি ছাড়িয়ে প্রধান ইন্টারনেট এবং টেলিকম কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ‘গোপন আঁতাতে’ জড়িয়ে পড়ে৬৩। এই তথ্য বিনিময়ের আংশিক সহযোগিতামূলক ও আংশিক জোরপূর্বক ঘটনার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ এরূপ:

*২০০৯ সালে একজন এনএসএর মহাপরিদর্শকের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এনএসএ ‘১০০-এর বেশি কোম্পানির সঙ্গে’ সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে৬৪।

*মাইক্রোসফট এনএসএকে তাদের জনপ্রিয় ই-মেইল পোর্টাল আউটলুক ডট কম-এর স্কাইপের ইন্টারনেট ফোনকল (এর ৬৬৩ মিলিয়ন ব্যবহারকারীসহ), এমনকি স্কাইড্রাইভ, মাইক্রোসফট ক্লাউডের সংরক্ষণব্যবস্থা (যার ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২৫০ মিলিয়ন) সংগুপ্ত হওয়ার আগেই গোপন প্রবেশাধিকার দিয়েছে। স্নোডেনের নথিপত্রে দেখা যায়, মাইক্রোসফট সক্রিয়ভাবেই এনএসএকে সহযোগিতা করেছে। গ্লেন গ্রিনওয়াল্ড লিখেছেন, ‘মাইক্রোসফট বহু মাস ধরে চেষ্টা করে সরকারকে সহজে ওই [স্কাইড্রাইভ] তথ্য পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছে।’ স্কাইপের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে, আউটলুক ডট কমের ক্ষেত্রে সরকারের কয়েক মাস লেগে যায়, এর জন্য মাইক্রোসফট ও এনএসএ যৌথভাবে কাজ করেছে, যাতে এই তথ্যভান্ডারে সরকারের পূর্ণাঙ্গ প্রবেশ নিশ্চিত করা যায়৬৫।

*এনএসএ সংগুপ্ত পণ্যসমূহ অবৈধভাবে পাওয়ার জন্য আরএসএ নামক কম্পিউটার নিরাপত্তা কোম্পানিকে ১০ মিলিয়ন ডলার দিয়েছিল। এনএসএ সংগুপ্তকরণের জন্য একটি এলোমেলো সূত্র তৈরি করে, আরএসএ তাদের বিসেফ নামক সফটওয়্যারে তা প্রয়োগ করে, এই বিসেফ বানানো হয়েছিল ব্যক্তিগত কম্পিউটার আর অন্যান্য ডিজিটাল পণ্যের নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য৬৬।

* এটি অ্যান্ড টিসিআইয়ের পাল্টা সন্ত্রাসবাদের তদন্তের নামে নিজেই সিআইয়ের কাছে এক বছরে ফোনকলের মেটাডেটা বিক্রি করে দেয় ১০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি দামে৬৭।

 * ভেরিজোন (এটিঅ্যান্ডটি ও স্প্রিন্টও) তাদের সংরক্ষণে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্যান্য দেশের সব ফোনকলের মেটাডাটা এনএসএকে সরবরাহ করে । বুশ আর ওবামা উভয় সরকারের আমলেই এ রকম মেটাডাটা এনএসএর কাছে সরবরাহ করা হয়েছে৬৮।

* মাইক্রোসফট, গুগল, ইয়াহু আর ফেসবুক তাদের হাজার হাজার স্বতন্ত্র অ্যাকাউন্টের সব তথ্য প্রতি ছয় মাসে এনএসএ এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার কাছে তুলে দিয়েছে। সরকারের গোপন অংশের কাছে এরূপ তথ্য তুলে দেওয়ার প্রবণতাও ক্রমেই বাড়ছে৬৯।

২০১২ সালে ডারপার পরিচালক রেজিনা ডুগান গুগলে যোগ দেওয়ার জন্য পদত্যাগ করেন। তাঁর সময়ে ডারপা ড্রোন গবেষণায় সবচেয়ে এগিয়ে ছিল। এরাই ১৯৯০ সালের প্রথম দিকে এর প্রথম মডেল নমুনার উত্পাদন করে। যদিও যুদ্ধক্ষেত্রে সাধারণ আণবিক বৈমানিক শিকারি ড্রোন হিসেবে এর ব্যবহার ১৯৯০-এর শেষের দিকে কসোভো যুদ্ধের আগে হয়নি, যেখানে ক্লার্ক ছিলেন যৌথ বাহিনীর প্রধান কমান্ডার। বৈশ্বিকভাবে ভূখণ্ডের বাইরে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর জন্য যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে এ রকম ড্রোনের ব্যবহার, যা এখন ওবামার সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধপদ্ধতির একটি মুখ্য হাতিয়ার, শুরু হয় ২০০২ সালে৭০। এই শতকের শুরুর বছরগুলোয় ডারপা তাদের গবেষণার পরিসর বাড়াতে থাকে, যাতে করে এসব ড্রোন দূরবর্তী ওয়াই-ফাই সংযোগের মাধ্যমে কাজে লাগানো যায়। ডুগান যখন গুগলে চলে আসেন, তখন তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি তদন্ত চলছিল। অভিযোগ ছিল, তিনি তড়িঘড়ি করে ডারপার অনেক কাজ রেডেক্সেকে দিয়েছেন। এটি একটি বোমা খুঁজে বের করা প্রতিষ্ঠান, সেখানে তাঁর মালিকানা ছিল। এটা গুগলের স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল, যাতে অনেক উচ্চতায় ওয়াই-ফাই পদ্ধতিতে ড্রোন চলতে পারে। ২০১৪ সালে গুগল ঘোষণা দেয়, তারা টাইটান মহাকাশ কোম্পানি কিনে নেবে। লক্ষ্য হচ্ছে, এমন ড্রোন বানানো যা বায়ুমণ্ডলের ঠিক সীমানা দিয়ে উড়ে বেড়াতে পারে। এরই মধ্যে ফেসবুক যুক্তরাজ্যভিত্তিক কোম্পানি এসেন্টা কিনে নেয়, যারা অধিক উচ্চতায় ওড়ার ক্ষমতাসম্পন্ন সোলার ড্রোন বানাতে পারদর্শী। এ রকম ড্রোন নতুন নতুন স্থানে ইন্টারনেট-সুবিধা পৌঁছে দিতে কাজ করবে। লক্ষ্য ছিল, নতুন সামরিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করা আর বৈশ্বিক ইন্টারনেট-ব্যবস্থায় একচেটিয়া প্রভাব সৃষ্টি করা, একই সঙ্গে সামরিক ডিজিটাল কমপ্লেক্সের জাল বিস্তার করা৭১। ২০০৫-০৭ সালের আনুমানিক হিসাবে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র বিপণনে ব্যয় করেছে (খুব সূক্ষ্ম হিসাবে) প্রতিবছরে প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলার; প্রকৃত সামরিক বার্ষিক ব্যয় (স্বীকৃত/অস্বীকৃত উভয় মিলেই) প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলার আর এফআইআরই (বিনিয়োগ, বিমা আর স্থাবর সম্পত্তি) ব্যয় হলো প্রায় ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার৭২। এই ডিজিটাল যুগে, রাজনৈতিক অর্থনীতির এই তিনটি খাতের প্রতিটিই পরগাছার মতো বেড়ে উঠেছে অর্থনীতির উত্পাদনশীল ভিতের ওপর, আর এগুলো প্রযুক্তি আর তথ্য আদান-প্রদানের জালে জড়িয়ে আছে। সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তি চলে গেছে বেসরকারি খাতে। এই খাতসংশ্লিষ্ট অনেকেই যুক্ত ছিলেন যুদ্ধ অর্থনীতির সঙ্গে, যেমন ডিএআরপিএর ডুগান। অবস্থানগত কারণেই তিনি তাঁর অর্জিত জ্ঞান সহজেই তিনি বেসরকারি খাতে কাজে লাগাতে পেরেছেন। তিনি অনায়াসে নিরাপত্তা আর নজরদারির এক ব্যবস্থা থেকে অন্যটিতে পৌঁছাতে পেরেছেন।

ডিজিটাল নজরদারির এই যুগে ‘সুরক্ষাকরণের’ নামে একধরনের ভাষাবিদ্যার অভিসরণ—একচেটিয়া বিনিয়োগ পুঁজির কেন্দ্রীভূত কাঠামোকে প্রতিফলিত করে—সারা দুনিয়ায় প্রভুত্ব করছে: ১. অর্থ আহরণভিত্তিক বাণিজ্য, ২. সরকারি আর ব্যক্তি খাত নজরদারি নেটওয়ার্ক, ৩. নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতির সামরিকীকরণ এবং ৪. কার্যকরী নাগরিক নিয়ন্ত্রণ থেকে বিচারিক পদ্ধতির দূরীকরণ৭৩।

পূর্ণাঙ্গ তথ্য সচেতনতা, প্রিজম আর স্নোডেন

মার্কিন সাম্রাজ্যের গভীর পর্যবেক্ষকদের মতে, পয়েনডেক্সটারের টিআইএ কর্মসূচি কংগ্রেস কর্তৃক বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা কেবল আংশিকভাবে সফল হয়েছে। কংগ্রেসের বাধার মুখে পরে ডিআরপিএ ও এনএসএ এই কর্মসূচি বেসরকারি খাতে বাস্তবায়ন শুরু করে। সেখানে গোপনীয়তার ব্যাপার আরও কড়া, কারণ সরকারের জবাবদিহি আরও কম। চামার্স জনসন ২০১০ সালে তাঁর ডিসম্যান্টলিং দ্য এম্পায়ার গ্রন্থে বলেছেন:

কংগ্রেসের তত্পরতার কারণে ‘পূর্ণাঙ্গ তথ্য সচেতনতা’ কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যায়নি। জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা একে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে চালু রেখেছে। কংগ্রেস যাকে আমেরিকান জনগণের গোপনীয়তার অধিকারের পরিপন্থী বলে ঘোষণা করেছে, তাকে এনএসএ সহজেই এসএআইসি [বিজ্ঞান ব্যবহারের আন্তর্জাতিক সংস্থা] ও বুজ অ্যালেন হ্যামিল্টনের মাধ্যমে রাজি করিয়ে করে চলেছে—একটা নির্দিষ্ট মূল্যের জন্য। আমরা যতদূর জানি, অ্যাডমিরাল পয়েনডেক্সটারের ‘সমগ্র তথ্য সচেতনতা কর্মসূচি’ আজকের দিনেও খুব জোরালোভাবেই এগিয়ে চলেছে৭৪।

এমন স্থানান্তর খুব সহজেই সম্পন্ন হয়েছে। কারণ, বুজ অ্যালেনের পরিচালক ম্যাককনেল এই পূর্ণাঙ্গ তথ্য সচেতনতা কর্মসূচি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে ইতিমধ্যে পয়েনডেক্সটারের সঙ্গে চুক্তি করেছেন। যেখানে কর্মসূচির ডিজাইন, প্রযুক্তি আর বিনিয়োগ খুব সহজেই সরকারি খাত থেকে সরিয়ে সামরিক প্রতিষ্ঠানের অস্বচ্ছ জগতে নেওয়া হয়েছে। এটা এখনো এনএসএর সঙ্গে যুক্ত আছে আর এর নাইন-ইলেভেনের পরের আমেরিকানদের ওপর অভ্যন্তরীণ চরম গোপন নজরদারি এখনো বহাল আছে, যা দাপ্তরিক নথিপত্রে ‘প্রেসিডেন্টের নজরদারি কর্মসূচি’ নামে পরিচিত আর ভেতরের লোকেদের কাছে কেবল ‘কর্মসূচি’ নামে পরিচিত। এটা চলছিল ২০০৫ পর্যন্ত এনএসএর পরিচালক মাইকেল ভি হ্যাডেনের তদারকিতে, যিনি পরে সিআইএর পরিচালক হন। হ্যাডেনের পরিবর্তে আসেন একরোখা জেনারেল কেইথ অ্যালেকজান্ডার, যার লক্ষ্য ছিল ‘সবকিছু সংগ্রহ করো’। স্নোডেনের তথ্য ফাঁসের পর ২০১৪ সালে অ্যালেকজান্ডার এনএসএর পরিচালকের পদ থেকে সরে আসেন আর তার স্থানে বসানো হয় অ্যাডমিরাল মাইক রজার্সকে৭৫।

গোয়েন্দা সংস্থা আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সম্পর্ক হলো একটি চক্রাকার দরজা। বুশের এনএসএর পরিচালক ম্যাককনেল ফের বুজ অ্যালেনের উপচেয়ারম্যান হলেন; যখন ওবামার জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক জেমস ক্ল্যাপার ছিলেন বুজ অ্যালেনের সাবেক কার্যনির্বাহী কর্মকর্তা। বুজ অ্যালেনের প্রধান মালিকানা কারলাইল গ্রুপের হাতে, এরা বেসরকারি নিরপেক্ষ বিনিয়োগ আর সামরিক ঠিকাদারি মালিকানায় পারদর্শী। এ ক্ষেত্রে কারলাইল গ্রুপ বেশ কিছু অধিক লাভপ্রত্যাশী কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত মুনাফা আর অনেক দিন ধরেই বুশ পরিবারের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান৭৬।

স্নোডেনের নথিপত্র থেকে দেখা যায়, ডিএআরপিএর মধ্যে পয়েনডেক্সটারের টিআইএ কর্মসূচির তহবিল কংগ্রেস বাতিল করেছিল, কংগ্রেস তখন ছিল খুব ক্রুুদ্ধ। ততক্ষণে এনএসএ নিজেদের প্রাসঙ্গিক গোপন কর্মসূচি শুরু করে দিয়েছে, প্রেসিডেন্টের নজরদারি কর্মসূচির অংশ হিসেবে। আর নাইন-ইলেভেনের কিছুদিনের মধ্যেই শুরু হয়ে যায় সীমাহীন খবরদারি, টেলিফোন আর ই-মেইল উভয় ক্ষেত্রেই। প্রিজম পর্যন্ত যেতে অনেক দিন লেগে যায়, যার (পয়েনডেক্সটারের টিআইএর মতো) লক্ষ্য ছিল ইন্টারনেটের ওপর পূর্ণাঙ্গ নজরদারি চালানো। কারণ, এর জন্য যেমন দরকার ছিল নতুন প্রযুক্তির, তেমনি প্রধান ইন্টারনেট সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে দরকার ছিল সহযোগিতামূলক সম্পর্কের। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন আর প্রকৃত নজরদারির অনেকটাই ক্রমবর্ধমান হারে কেন্দ্রীভূত করতে হয়েছিল বুজ অ্যালেন আর অন্যান্য বেসরকারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে। যদিও এনএসএর নিজস্ব ৩০ হাজার লোক আছে, একে নির্ভর করতে হয় ৬০ হাজার মানুষের বিশাল লোকবলের ওপর। যাদের নিয়োগ দিয়েছে বেসরকারি ঠিকাদারি৭৭।

২০১৩ সালের মে মাসে বুজ অ্যালেন হ্যামিলটনের একজন মধ্যম মানের যন্ত্রবিদ এডওয়ার্ড স্নোডেন তাঁর কাছে থাকা ১ দশমিক ৭ থেকে ১ দশমিক ৮ মিলিয়ন নথি কয়েকটি ছোট আকারের ড্রাইভে নিয়ে দেশ ছেড়ে হংকং পালিয়ে যান। সেখান থেকে তিনি সাহসের সঙ্গে মার্কিন ও সারা পৃথিবীর মানুষের ওপর চলমান এনএসএর বিস্তর গোয়েন্দাগিরির ফিরিস্তি ফাঁস করে দেন৭৮। তিনি দালিলিক প্রমাণসহ পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনায় দেখিয়ে দেন, এনএসএ কোনো ধরনের মধ্যস্থতা ছাড়াই মার্কিন মুলুকে ইন্টারনেট জগতের সব তথ্যে ‘সরাসরি প্রবেশাধিকার’ অর্জন করেছে। কয়েক শ মিলিয়ন আমেরিকান ও বিদেশি জনগণের ব্যবহূত মোবাইল ফোনেরও সব তথ্যও তার হাতে এসেছে। এনএসএর একটি স্লাইড থেকে জানা যায়, নয়টি প্রযুক্তি কোম্পানি (মাইক্রোসফট, অ্যাপেল, গুগল, ইয়াহু, ফেসবুক, ইউটিউব, প্যাল্টক, স্কাইপে, এওল), সবাই প্রিজমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, একভাবে বলতে গেলে বাণিজ্যিক অংশীদারে পরিণত হয়েছে। স্লাইড অনুযায়ী, এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে ‘সরাসরি এসব সেবা প্রদানকারী মার্কিন সংস্থার সার্ভার থেকে’৭৯। স্নোডেনের ফাঁস করা একটি নথির তথ্যানুসারে, এনএসএর অধিগ্রহণ পরিচালক ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই পেছন দরজার সুবিধা এনএসএকে শ শ মিলিয়ন ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্টে প্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছে। হংকং থেকে স্নোডেন নিজেই বলেছেন:

মার্কিন সরকার নিজের পছন্দমতো কয়েকটি করপোরেট শক্তি বেছে নিজের কাছে এনেছে। গুগল, ফেসবুক, অ্যাপেল আর মাইক্রোসফটের মতো কোম্পানিগুলো এনএসএর সঙ্গে একত্রে কাজ করছে । তারা এনএসএকে আপনার ব্যবহূত যেকোনো যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি ঢোকার অনুমতি দিয়ে রেখেছে, যেখানে আপনি তথ্য সংরক্ষণ করেন, ক্লাউডে কোনো কিছু রাখেন, আর যার মাধ্যমে জন্মদিনের শুভেচ্ছা পাঠান বা যেখানে আপনি জীবনের রেকর্ড রাখেন। তারা এনএসকে সবকিছুতে সরাসরি প্রবেশের সুযোগ দিয়েছে যাতে তাদের নিজেদের আর তদারকি করতে না হয়। ফলে এর দায়ও আর তাদের ওপর বর্তাবে না৮০।

স্নোডেন বুঝিয়েছেন, তার মতো বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত একজন মধ্যম মানের যন্ত্রবিদও যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো ব্যক্তিমানুষের ওপর নজরদারি করতে বিদেশি সরকার বা সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো ব্যক্তিকে যখন তারা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে, তখন তারা সেই ব্যক্তির যোগাযোগের রেকর্ড সংগ্রহ করে। যেকোনো বিশ্লেষক যখন-তখন যাকে খুশি তাকেই লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারেন। যেকোনো জায়গার যে-কাউকে নির্বাচন করতে পারেন। এই যোগাযোগগুলোকে বেছে নেওয়ার ব্যাপার নির্ভর করে সেন্সর নেটওয়ার্ক বিশ্লেষকের ক্ষমতার ওপর। অবশ্য সব বিশ্লেষকের যাকে-তাকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর ক্ষমতা থাকে না। কিন্তু আমি আমার ডেস্কে বসে নিশ্চিতভাবে চাইলেই কাউকে ট্যাপ করতে পারতাম; আপনাকে দিয়ে শুরু করে আপনার হিসাবও আমার নজরদারির মধ্যে ছিল, তা হোন আপনি একজন ফৌজদারি বিচারক, এমনকি খোদ প্রেসিডেন্টও আমার আওতার বাইরে ছিল না, যদি তার একটা ব্যক্তিগত ই-মেইল [ঠিকানা] থাকে৮১।

স্নোডেনের দলিলগুলো থেকে দেখা যায় যে এনএসএর এখন আর প্রধান প্রধান ইন্টারনেট ও টেলিকম কোম্পানিগুলোর সক্রিয় সহযোগিতা দরকার হচ্ছে না, তারা সরাসরি এদের সিস্টেমে ঢুকে নজরদারি করতে পারছে। ২০১০ সাল নাগাদ তাদের বুলরান আর এডগেহিল কর্মসূচির মাধ্যমে এনএসএ প্রায় সব ধরনের গুপ্ত কোড ভাঙার ক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করে, সুপার কম্পিউটার ব্যবহার করে তারা অ্যালগরিদম ভাঙতে সক্ষম হয়। এই অ্যালগরিদম দিয়েই সব গুপ্ত কোড নির্মাণ করা হয়, এটা ভাঙার সক্ষমতা অর্জন করায় তারা প্রায় সব মেইলই হ্যাক করতে সক্ষম হয়। উপরন্তু, দলিলগুলো থেকে আরও দেখা যায়, এনএসএ জাতীয় মান ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের তৈরি করা সাইবারস্পেস নিরাপত্তা বলয়ের ভেতরে সিঁধ কেটে ঢুকেছে। এনএসএ দাবি করেছে, এর ফলে এতে বাণিজ্যিক গুপ্ত কোডের ক্ষেত্রে ‘রূপান্তর’ আনা গেছে, যাতে দেখে মনে হয় নিরাপত্তাবেষ্টনী অটুট আছে, যদিও এনএসএর অনুপ্রবেশের জন্য এটা উন্মুক্তই থাকে৮২। ফলস্বরূপ ওয়াশিংটন পোস্ট ব্যাখ্যা করেছে, এনএসএ কোনো সার্ভারের তথ্যভান্ডারে ঢুকতে পারেনি। তারা ‘উড়ে উড়ে তথ্য’ ধরেছে। এনএসএ আর জিসিএইচকিউ [ব্রিটেন সরকারের যোগাযোগ কেন্দ্র] ইয়াহু আর গুগলের কম্পিউটারে সংরক্ষিত অ্যাকাউন্টগুলোয় সরাসরি ঢুকতে পরে না। ফাইবার অপটিক কেবেলর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময়ই তারা তথ্য সংগ্রহ করে। এনএসএ ইয়াহু আর গুগলে সংরক্ষিত ব্যক্তিগত ক্লাউডগুলোয় প্রবেশের জন্য তাদের ব্রিটিশ পরিপূরক জিসিএইচকিউ-এর সঙ্গে কাজ করছে, এসব ক্লাউড তথ্যের সুরক্ষার জন্য গণ-ইন্টারনেটের বাইরে বিকল্প ফাইবার অপটিক ব্যবহার করে৮৩।

এনএসএ ৮০ শতাংশেরও বেশি আন্তর্জাতিক টেলিফোন কলে ঢুকতে পারে, যার জন্য তারা মার্কিন একচেটিয়া টেলিকম ব্যবসায়ীদের প্রতিবছর শত শত মিলিয়ন ডলার দেয়। আর এটা বিদেশের ইন্টারনেট তথ্যের ভেতরেও ঢুকে পড়েছে৮৪। এভাবে তারা তাদের বন্ধুরাষ্ট্রের প্রধানদের ওপরেও গোয়েন্দাগিরি চালাচ্ছে।

সরকার আর করপোরেট গণমাধ্যম স্নোডেনকে একজন দেশদ্রোহী হিসেবে আখ্যা দিতে ব্যস্ত। দুজন বিশেষ ব্যক্তিত্ব গণমাধ্যমে স্নোডেনের মুন্ডুপাত করতে ব্যস্ত, যার একজন হচ্ছেন ক্লার্ক, যিনি অপরিবর্তনীয়ভাবেই নজরদারির পুঁজিবাদ থেকে নিজেকে আলাদা করতে ব্যর্থ হচ্ছেন (যিনি অ্যাক্সিকম ছেড়ে এখন টিভেসেরা সাইবার-গোয়েন্দা সংস্থার উপদেষ্টা পরিষদে আছেন) এবং ম্যাককনেল (যিনি অনবরত বদলের দরজায় অবস্থান করছেন, যেটা তাঁকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাসমূহ আর বুজ অ্যালেনের মধ্যে যাওয়া-আসা করার বন্দোবস্ত করে দিচ্ছে)। উভয়েই দাবি করছেন, স্নোডেন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংকটাপন্ন করে তুলেছেন। স্নোডেন দেশের আর বিশ্বের জনগণকে এটা জানিয়ে দিয়েছেন, তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ কী পরিমাণে নজরদারির মধ্যে আছে৮৫।

স্নোডেনের তথ্য ফাঁস মার্কিন জনগণের একটি অংশকে হতভম্ব করে দেয়। এসব মানুষ আগে থেকেই তাদের ব্যক্তিগত জীবনে অসংখ্য অনধিকার অনুপ্রবেশ আর সর্বব্যাপী নজরদারির বিরুদ্ধে লড়াই করছে। ভিন্নমতাবলম্বী হ্যাকাররা যুক্ত হচ্ছে উইকিলিকস ও অজ্ঞাতনামা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। স্নোডেন ও ম্যানিংয়ের মতো তরুণ তুর্কিরা হাজারে হাজারে শ্রেণীকৃত দলিল ফাঁস করে দিচ্ছে। তারা গোপন সরকার-করপোরেট নিরাপত্তার রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছে৮৬। অসংখ্য প্রতিষ্ঠান এই নজরদারি পুঁজিবাদের মধ্যে লড়ে যাচ্ছে বাক্স্বাধীনতা আর গোপনীয়তার অধিকারের জন্য৮৭। যদিও সামগ্রিকভাবে জনগণ এখনো বুঝতে পারছে না ‘ডলারতন্ত্রের’ রাজনীতির বিপদটা ঠিক কোন জায়গায়। যে রাজনীতি  সামরিক-অর্থনৈতিক-ডিজিটাল কমপ্লেক্সের মুখোমুখি হয়েছে, যার পরিধি আমাদের কাছে অবিশ্বাস্যই মনে হবে। যারা ইতিমধ্যে এসব নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভিন্নমতাবলম্বীদের দমন করার চেষ্টা করছে৮৮।

এখন পর্যন্ত অভিজাতরাই স্নোডেনের তথ্য ফাঁসের ঘটনায় মূলত ঝামেলায় পড়েছে। এতে এটা পরিষ্কার, একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তারকারী করপোরেট সংস্থা, বিশেষ করে গোয়েন্দারা সমাজের যেকোনো অংশের গভীরতম গোপনীয়তার মধ্যে কীভাবে অনুপ্রবেশ করতে সক্ষম। এনএসএর হয়ে কাজ করা কিছু করপোরেট সংস্থার কর্মীরা প্রায় সব করপোরেট সংস্থারই তথ্যের ভান্ডার হ্যাক করে ঢুকতে পারে। যার সবচেয়ে সম্ভাব্য ফলাফল হচ্ছে বৃহত্ অর্থে জনগণের পয়সা খরচ করে সরকারের নিরাপত্তা বিধানের যন্ত্রপাতি কাজে লাগিয়ে বিশালাকার ফার্মগুলোর একত্র হওয়া।

এর মধ্যে সাইবার যুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়ছে, সমগ্র পুঁজিবাদী ব্যবস্থা হুমকির সম্মুখীন। খোদ মার্কিন সাম্রাজ্যই হুমকির মুখে পড়েছে। হাস্যকরভাবে, খোদ সাম্রাজ্যবাদের কাঠামোই নিরাপত্তা হুমকি বাড়িয়ে তুলছে। (আর আবশ্যিকভাবেই সাইবার যুদ্ধের হুমকি ব্যবহার করা হবে ব্যক্তিমানুষের অধিকার হ্রাস করা ও অবাণিজ্যিক মূল্যবোধকে দমিয়ে রাখার যৌক্তিকতা হিসেবে।) বৈশ্বিক শ্রম সালিসির মাধ্যমে চিপসসহ অন্যান্য কম্পিউটার যন্ত্রাংশ এখন প্রধানত বিদেশে বানানো হচ্ছে, প্রধানত এশিয়ায়। এর সুবিধা নেয় মূলত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহুজাতিক কোম্পানিগুলো৮৯। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এখন হ্যাকিংয়ের ভীতিতে রয়েছে। এতে তার আর্থিক ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার পদ্ধতি উদ্ভাবনে ডিএআরপিএ নয়টি বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করেছে৯০।

তদুপরি আজকের এই অতি-সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থায় এরূপ দুর্বলতা কাটানো একপ্রকার অসম্ভব ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। একচেটিয়া ফাইন্যান্স ক্যাপিটালের গর্ভ থেকে যার জন্ম হয়েছে। সারা বিশ্বের মানুষের, এমনকি নিজেদের জনগণের ওপরে চালানো অর্থনৈতিক শোষণের কারণে মার্কিন সাম্রাজ্য নানা আক্রমণের মুখে পড়েছে। আর সাম্রাজ্য নিজেকে রক্ষা করতে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। এটা এক মৃত্যুপথযাত্রী সাম্রাজ্যের লক্ষণ। সমগ্র মানবতার আর বৈশ্বিক বিপর্যয় রক্ষা করতে হলে জনগণের কথা আরও একবার শোনা খুব জরুরি, আর সাম্রাজ্যের সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্যও এটা দরকার। ডিজিটাল বিপ্লব অবশ্যই বেসামরিকীকরণ করতে হবে। এর পুরো ব্যাপারটিই গণতান্ত্রিক মূল্যায়ন ও শাসনের আওতায় আনতে হবে, যার প্রয়োজনীয়তা সে নিজেই তৈরি করেছে। এর আর বিকল্প কোনো পথ নেই।

অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন

তথ্যসূত্র

1.      Richard B. DuBoff, Accumulation and Power (Armonk, NY: M.E. Sharpe, 1989), 91.

2.     William H. Branson, “Trends in United States International Trade and Investment Since World War II,” in Martin Feldstein, ed., The American Economy in Transition (Chicago: University of Chicago Press, 1980), 183.

3.     Dean Acheson, quoted in William Appleman Williams, The Tragedy of American Diplomacy (New York: Dell, 1962), 235–36.

4.     General Dwight D. Eisenhower, “Memorandum for Directors and Chiefs of War Department General and Special Staff Divisions and Bureaus and the Commanding Generals of the Major Commands; Subject: Scientific and Technological Resources as Military Assets,” April 1946. Published as Appendix A in Seymour Melman, Pentagon Capitalism (New York: McGraw Hill, 1971), 231–34.

5.     “‘No Such Agency’ Spies on the Communications of the World,” Washington Post, June 6, 2013, http://washingtonpost.com.

6.     U.S. State Department, Foreign Relations of the United States, 1950. National Security Affairs; Foreign Economic Policy, vol. 1, http://digital.library.wisc.edu, 258–61, 284–86.

7.     S. Nelson Drew, ed., NSC-68: Forging the Strategy of Containment; With Analyses by Paul H. Nitze (Washington, DC: National Defense University, 1994), 117; “The Narcissism of NSC-68,” November 12, 2009, http://econospeak.blogspot.com.

8.     Dean Acheson, Present at the Creation (New York: W.W. Norton, 1987), 377; Thomas H. Etzold and John Lewis Gaddis, Containment: Documents on American Policy and Strategy, 1949–50 (New York: Columbia University Press, 1978), chapter 7; Institute for Economic Democracy, “NSC-68, Master Plan for the Cold War,” http://ied.info; Fred Block, “Economic Instability and Military Strength: The Paradoxes of the Rearmament Decision,” Politics and Society 10, no. 35 (1980): 35–58.

9.     Business Week, April 15, 1950, 15, quoted in Harold G. Vatter, The U.S. Economy in the 1950s (New York: W.W. Norton, 1963), 72.

10.     Harry Magdoff, The Age of Imperialism (New York: Monthly Review Press, 1969), 200–201.

11.     Lynn Turgeon, Bastard Keynesianism: The Evolution of Economic Thinking and Policymaking Since World War II (Westport, CT: Greenwood Press, 1996), 13; Noam Chomsky, Necessary Illusions (Boston: South End Press, 1989), 183.

12.     Paul A. Baran and Paul M. Sweezy, Monopoly Capital (New York: Monthly Review Press, 1966), 152.

13.     Scott Nearing, “World Events,” Monthly Review 16, no. 2 (June 1964): 122.

14.     Quoted in Fred J. Cook, The Warfare State (New York: Macmillan, 1962):165–66.

15.     “WPB Aide Urges U.S. to Keep War Set-Up,” New York Times, January 20, 1944; Charles E. Wilson, “For the Common Defense,” Army Ordnance 26, no. 143 (March–April 1944): 285–88.

16.     Slichter and U.S. News and World Report, quoted in Cook, The Warfare State, 171.

17.     Bureau of Economic Analysis, “National Income and Product Accounts,” Table 1.1.5 (Gross Domestic Product), and Table 3.9.5 (Government Consumption Expenditures and Gross Investment), http://bea.gov; Baran and Sweezy, Monopoly Capital, 161, 207–13; John Bellamy Foster and Robert W. McChesney, “A New New Deal under Obama?” Monthly Review, 60, no. 9 (February 2009): 1–11; Hannah Holleman, Robert W. McChesney, John Bellamy Foster, and R. Jamil Jonna, “The Penal State in an Age of Crisis,” Monthly Review 61, no. 2 (June 2009): 1–17.

18.     Baran and Sweezy, Monopoly Capital, 191, 206, 213–17.

19.     For an excellent discussion of this, see Andrew J. Bacevich, Breach of Trust: How Americans Failed Their Soldiers and Their Country (New York: Metropolitan Books, 2013), 48–79.

20.     Barbara W. Tuchman, The March of Folly: From Troy to Vietnam (New York: Random House, 1984), 326.

21.     See Paul A. Baran and Paul M. Sweezy, “Some Theoretical Implications,” Monthly Review 64, no. 3 (July–August 2012): 45–58; John Bellamy Foster, The Theory of Monopoly Capitalism, new edition (New York: Monthly Review Press, 2014), xiv–xviii.

22.     Thorstein Veblen, Absentee Ownership and Business Enterprise in Recent Times (New York: Augustus M. Kelley, 1964), 300.

23.     Martin Mayer, Madison Avenue (New York: Harper, 1958), 13–14.

24.     See Michael Dawson, The Consumer Trap (Urbana: University of Illinois Press, 2005).

25.     On the concept of the cultural apparatus, see John Bellamy Foster and Robert W. McChesney, “The Cultural Apparatus of Monopoly Capital,” Monthly Review 65, no. 3 (July–August 2013): 1–33.

26.     Baran and Sweezy, Monopoly Capital, 118–28.

27.     Advertising spending, as noted above, was $10 billion in 1957, while annual military spending in the Eisenhower administration was $40–$50 billion. On the latter figure see Turgeon, Bastard Keynesianism, 13.

28.     Baran and Sweezy, Monopoly Capital, 115–17.

29.     Dennis Daye, “Great Moments in Branding: Neil McElroy Memo,” June 12, 2009, http://brandingstrategyinsider.com; Mayer, Madison Avenue, 26; Editors of Advertising Age, The House that Ivory Built (Lincoln, IL: National Textbook Co., 1988), 20–21, 158; Katie Hafner and Matthew Lyon, Where Wizards Stay Up Late (New York: Simon and Schuster, 1996), 14.

30.     Herbert I. Schiller, Mass Communications and American Empire (Boulder: Westview Press, 1992), 8–9.

31.     See the detailed critique of the Federal Communications Commission in this respect in Monthly Review in the late 1950s: Leo Huberman and Paul M. Sweezy, “Behind the FCC Scandal,” Monthly Review 9, no. 12 (April 1958): 401–11.

32.     Hafner and Lyon, Where Wizards Stay Up Late, 14–21, 255; L. Parker Temple III, Shades of Gray: National Security and the Evolution of Space Reconnaissance (Reston, VA: American Institute of Aeronautics and Astronautics, 2005), 132–33, 142, 146, 192–200, 208–18, 233, 242.

33.     Bury, Eisenhower and the Cold War Arms Race (New York: I.B. Tauris, 2014), 205; William Conrad Gibbons, The U.S. Government and the Vietnam War: Executive and Legislative Roles and Relationships; Part IV: July 1965–January 1968 (Princeton: Princeton University Press, 1995), 3–4.

34.     President Dwight D. Eisenhower, “President Eisenhower’s Farewell to the Nation.” Published as Appendix B in Melman, Pentagon Capitalism, 235-39; Charles E. Nathanson, “The Militarization of the American Economy,” in David Horowitz, ed., Corporations and the Cold War (New York: Monthly Review Press, 1969), 209.

35.     Christopher H. Pyle, Military Surveillance of Civilian Politics, 1967–1970 (New York: Garland Publishing, 1986), 69–81, “Military Intelligence Overkill,” in Sam J. Ervin, et. al., Uncle Sam is Watching You: Highlights from the Hearings of the Senate Subcommittee on Constitutional Rights (Washington, DC: Public Affairs Press, 1971), 74–147; Christopher H. Pyle, “Be Afraid, Be Very Afraid, of Spying by U.S. Army,” December 5, 2002, http://bintjbeil.com; Seth F. Kreimer, “Watching the Watchers: Surveillance, Transparency, and Political Freedom in the War on Terror,” University of Pennsylvania Journal of Constitutional Law 133 (September 2004): 138–44; Frank J. Donner, The Age of Surveillance (New York: Alfred A. Knopf, 1980), 287–320.

36.     “Computers Carried Army Files; MIT Investigation Underway,” The Tech, April 11, 1975, http://tech.mit.edu; Hafner and Lyon, Where Wizards Stay Up Late, 231; Gibbons, The U.S. Government and the Vietnam War, 854.

37.     “Ervin Discusses Privacy,” The Tech, April 11, 1975, http://tech.mit.edu.

38.     Arthur R. Miller, “The Surveillance Society,” in Ervin, et. al., Uncle Sam is Watching You, 25–26.

39.     FBI COINTELPRO documents quoted (and displayed) in Noam Chomsky, “Introduction,” in Nelson Blackstock, ed., COINTELPRO: The FBI’s Secret War on Political Freedom (New York: Pathfinder, 1988), 15–16, 25–33.

40.     Matthew M. Aid and William Burr, “Secret Cold War Documents Reveal NSA Spied on Senators,” Foreign Policy, September 25, 2013, http://foreignpolicy.com.

41.     William Blum, Rogue State (Monroe, ME: Common Courage, 2005), 271–74, and “Anti-Empire Report #118,” June 26, 2013, http://williamblum.org.

42.     See John Bellamy Foster and Robert W. McChesney, The Endless Crisis (New York: Monthly Review Press, 2012).

43.     William Safire, “You Are a Suspect,” New York Times, November 14, 2002, http://nytimes.com; Shane Harris, The Watchers: The Rise of America’s Surveillance State (New York: Penguin, 2010), 194–235, and “Total Recall,” Foreign Policy, June 19, 2013, http://foreignpolicy.com; “Threats and Responses,” New York Times, July 29, 2003, http://nytimes.com; “Pentagon Prepares a Future Market on Terror Attacks,” New York Times, July 29, 2003; Whitfield Diffie and Saul Landau, Privacy on the Line (Cambridge, MA: The MIT Press, 1998), 66–67; “Chief Takes Over New Agency to Thwart Attacks on U.S.,” New York Times, February 13, 2002; White House, National Security Decision Directive Number 145, “National Policy on Telecommunications and Automated Information Security Systems,” September 17, 1984, http://fas.org; Chalmers Johnson, Dismantling the Empire (New York: Henry Holt, 2010), 104–5.

44.     Fred Magdoff and John Bellamy Foster, “Stagnation and Financialization: The Nature of the Contradiction,” Monthly Review 66, no. 1 (May 2014): 9.

45.     Harry Magdoff and Paul M. Sweezy, “Production and Finance,” Monthly Review 35, no. 1 (May 1983): 1–13; Paul M. Sweezy, “More (or Less) on Globalization,” Monthly Review 49, no. 4 (September 1997): 1–4.

46.     See Nomi Prins, All The Presidents’ Bankers: The Hidden Alliances that Drive American Power (New York: Nation Books, 2014).

47.     See Michael Lewis, Flash Boys (New York: W.W. Norton, 2014).

48.     Christian Parenti, The Soft Cage: Surveillance in America (New York: Basic Books, 2003), 91–92,96.

49.     Dawson, The Consumer Trap, 51.

50.     CBS 60 Minutes, “The Data Brokers: Selling Your Personal Information,” March 9, 2014, http://cbsnews.com; “Never Heard of Acxiom?,” Fortune, February 23, 2004, http://money.cnn.com.

51.     CBS 60 Minutes, “The Data Brokers”; “Never Heard of Acxiom?”; Lois Beckett, “Everything We Want to Know About What Data Brokers Know About You,” Propublica, September 13, 2013, https://propublica.org; U.S Senate, Staff Report for Chairman [Jay] Rockefeller, Office of Oversight and Investigations Majority Staff, Committee on Commerce, Science, and Transportation, “A Review of the Data Broker Industry,” December 18, 2013, 29; http://commerce.senate.gov; Alice E. Marwick, “How Your Data Are Being Deeply Mined,” New York Review of Books, January 9, 2014, http://nybooks.com.

52.     “What Chase and Other Banks Won’t Tell You About Selling Your Data,” Forbes, October 17, 2013, http://forbes.com.

53.     Harris, The Watchers, 322–29.

54.     “Financial Terrorism: The War on Terabytes,” Economist, December 31, 2011, http://economist.com.

55.     Ibid; Mortimer Zuckerman, “How to Fight and Win the Cyberwar,” Wall Street Journal, December 6, 2010, http://online.wsj.com.; James Bamford, “The Secret War,” Wired, June 12, 2013, http://wired.com.

56.     Haftner and Lyon, Where Wizards Stay Up Late, 242–56; Robert W. McChesney, Digital Disconnect (New York: New Press, 2013), 102–4.

57.     On the Telecommunications Act of 1996, see Robert W. McChesney, The Problem of the Media (New York: Monthly Review Press, 2004), 51–56.

58.     John Bellamy Foster and Hannah Holleman, “The Financial Power Elite,” Monthly Review 62, no. 1 (May 2010): 1–19.

59.     Bill Gates, The Road Ahead (New York: Viking, 1995), 171, 241–42, and “Keynote Address,” in O’Reilly Associates, ed., The Internet and Society (Cambridge, MA: Harvard University Press, 1997), 32; Michael Dawson and John Bellamy Foster, “Virtual Capitalism,” in Robert W. McChesney, Ellen Meiksins Wood, and John Bellamy Foster, eds., Capitalism and the Information Age (New York: Monthly Review Press, 1998), 51–67.

60.     McChesney, Digital Disconnect, 103–37.

61.     McChesney, Digital Disconnect, 158.

62.     Beatrice Edwards, The Rise of the American Corporate Security State (San Francisco: Berrett-Koehler, 2014), 41 (reprinted in this issue, 54); Mark Karlin, “Six Reasons to Be Afraid of the Private Sector/Government Security State” (interview with Beatrice Edwards), Truthout, May 16, 2014, http://truth-out.org.

63.     Glenn Greenwald, No Place to Hide: Edward Snowden, the NSA, and the U.S. Surveillance State (New York: Henry Holt, 2014), 114.

64.     Luke Harding, The Snowden Files (New York: Vintage, 2014), 202.

65.     “Revealed: The NSA’s Secret Campaign to Crack, Undermine Internet Security,” ProPublica/New York Times, September 5, 2013, http://propublica.org; “Microsoft Handed the NSA Access to Encrypted Messages,” Guardian, July 11, 2013, http://theguardan.com; Greenwald, No Place to Hide, 112–15.

66.     “Exclusive: Secret Contract Tied NSA and Security Industry Pioneer,” Reuters, December 20, 2013, http://reuters.com.

67.     “C.I.A. Is Said to Pay AT&T for Call Data,” New York Times, November 7, 2013, http://nytimes.com.

68.     Glenn Greenwald, “NSA Collecting Phone Records of Millions of Verizon Customers Daily,” Guardian, June 6, 2013, http://theguardian.com; “CIA is Said to Pay AT&T for Call Data,” New York Times, November 7, 2013, http://nytimes.com; Electronic Frontier Foundation, “NSA Spying on Americans,” https://eff.org.

69.     “Microsoft, Facebook, Google, and Yahoo Release US Surveillance Requests,” Guardian, February 3, 2014, http://theguardian.com.

70.     Larry Greenemeir, “The Drone Wars,” Scientific American, September 2, 2011, http://scientificamerican.com.

71.     “Why Facebook and Google Are Buying Into Drones,” Guardian, April 20, 2014, http://theguardian.com; Denise Young, “The Edge of Possibility: Regina Dugan,” Virginia Tech Magazine 35, no. 4, Summer 2013, http://vtmag.vt.edu; Alan McDuffie, “Darpa Turns Aging Surveillance Drones Into Wi-Fi Hotspots,” Wired, April 14, 2014, http://wired.com.

72.     “U.S. Marketing Spending Exceeded $1 Trillion in 2005,” Metrics 2.0, June 26, 2006, http://metrics2.com; John Bellamy Foster, Hannah Holleman, and Robert W. McChesney, “The U.S. Imperial Triangle and Military Spending,” Monthly Review 60, no. 5 (October 2008): 1–19; U.S. Bureau of Economic Analysis, Survey of Current Business, May 2008, 43, http://bea.gov.

73.     Max Haiven, “Financialization and the Cultural Politics of Securitization,” Cultural Politics 9, no. 3 (2013): 239–62.

74.     Johnson, Dismantling the Empire, 104–5.

75.     Frontline, “United States of Secrets,” May 13, 2014, http://pbs.org; Ryan Lizza, “State of Deception,” New Yorker, December 16, 2013, http://newyorker.com; Greenwald, No Place to Hide, 95–97; Electronic Frontier Foundation, “How the NSA’s Domestic Spying Program Works,” https://eff.org.

76.     “Booz Allen, the World’s Most Profitable Spy Organization,” Bloomberg Business Week, June 20, 2013, http://businessweek.com; “Booz Allen Executive Leadership: John M. (Mike) McConnell, Vice Chairman,” accessed May 30, 2014, https://boozallen.com.

77.     Greenwald, No Place to Hide, 101; Glenn Greenwald and Ewen MacAskill, “Boundless Informant,” Guardian, June 11, 2013, http://theguardian.com.

78.     Greenwald, No Place to Hide, 48; “Ex-NSA Chief Details Snowden’s Hiring at Agency, Booz Allen,” Wall Street Journal, February 4, 2014, http://online.wsj.com.

79.     Greenwald, No Place to Hide, 108.

80.     Harding, The Snowden Files, 197–99.

81.     Harding, The Snowden Files, 204.

82.     Harding, The Snowden Files, 208–14.

83.     “How We Know the NSA had Access to Internal Google and Yahoo Cloud Data,” November 4, 2013, http://washingtonpost.com; Electronic Frontier Foundation, “How the NSA’s Domestic Spying Program Works.”

84.     Harding, The Snowden Files, 203.

85.     James Ridgeway, “Wesley Clark Remains Cagey on the Stump,” Village Voice, January 13, 2004, http://villagevoice.com; “Tiversa Advisory Board: General Wesley Clark,” accessed May 30, 2014, http://tiversa.com; “Ex-NSA Chief Details Snowden’s Hiring at Agency, Booz Allen.”

86.     “Similarities Seen in Leaks by Snowden, Manning,” Baltimore Sun, June 10, 2013, http://articles.baltimoresun.com.

87.     On such groups see Heidi Boghosian, Spying on Democracy (San Francisco: City Light Books, 2013), 265–89.

88.     John Nichols and Robert W. McChesney, Dollarocracy (New York: Nation Books, 2013).

89.     On the global labor arbitrage see Foster and McChesney, The Endless Crisis, 137–54.

90.     Adam Rawnsley, “Can Darpa Fix the Cybersecurity Problem from Hell?,” Wired, August 5, 2011, http://wired.com.    2014, Volume 66, Issue 03 (July-August).

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন