এক

জার্মানির ট্রায়ের শহর। ইংরেজিতে একে ট্রেভেস নামে ডাকা হয়। শহরটি জার্মানি-লুক্সেমবার্গ সীমান্তের একেবারে কাছে। এখানকার অধিবাসীর সংখ্যা এক লাখের মতো। তবে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে মোট জনসংখ্যা ছিল ঊর্ধ্বে ১১ হাজার। শহরের বুক চিরে বইছে মোজেল নদী। শুনেছি অপরূপ শোভা নাকি এই মোজেল উপত্যকার। তারই প্রচ্ছায়ায় ট্রায়ের শহরের গোড়াপত্তন হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব ১৫ সালে। রোম সম্রাট অগাস্টাস নিজেই শহরটি নির্মাণের আদেশ দিয়েছিলেন। সে অবশ্য বাণিজ্য এবং প্রতিরক্ষার কথা ভেবে। সম্রাট একে তাঁর আঞ্চলিক রাজধানীও বানিয়েছিলেন। এর সবচেয়ে পুরোনো যে ক্যাথিড্রাল, সেটি নির্মাণ করেছিলেন সম্রাট কনস্টানটিনোপল। আর তাঁর নামকরণ মা সেন্ট হেলেনার নামে। কী অপরিসীম গুরুত্ব দিয়ে শহরের ক্যাথলিক ধর্ম বিশ্বাসীরা এই ক্যাথিড্রালের দিকে তাকাত, ভাবাই কঠিন। এর গেট অতিক্রম করে ভেতরে প্রবেশ করলেই দৃষ্টি আটকে যাবে খ্রিষ্টীয় আধ্যাত্মিকতার সবচেয়ে মূল্যবান নিদর্শনের ওপর। যে লোহার কাঁটা দিয়ে যিশুখ্রিষ্টকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল, তার একটি এখনো এখানে সুরক্ষিত আছে। আরও আছে যিশুর গায়ের লম্বা সেই ঢিলেঢালা পোশাক, যে পোশাক তাঁর গায়ে ছিল শূলে চড়ানোর সময়। মূল্যবান এসব প্রদর্শনী সেন্ট হেলেনার চার দেয়ালে আশ্রিত আছে নানা ভাগ্যগুণে। প্রদর্শনীর সবই এসেছিল পবিত্র শহর জেরুজালেম থেকে। ট্রায়ের শহরের ওপর ধর্মের এই যে আধিপত্য, এগুলো বলতে গেলে খুঁটিনাটি। কিন্তু তার সঙ্গে আরও যোগ করতে পারি বাড়তি তথ্য। যে সময়ের কথা বলছি, সে সময় নগরপালের দায়িত্বে ছিলেন স্বয়ং আর্চ বিশপ। অন্য কথায় শহরের ধর্মগুরু। ১৮১৮ সালের ৫ মে ভোররাতের কথা। এই শহরে জন্ম নিল এক শিশুসন্তান। তার নাম রাখা হলো কার্ল মার্ক্স।

বিখ্যাত জার্মান কবি গ্যেটে এই শহরে এসেছিলেন ১৭৯৩ সালে। কবির মনের ওপর শহর যে ছাপ ফেলেছিল, সেটি প্রকাশ পেল এভাবে ‘ট্রায়ের শহর রাইনল্যান্ডের সবচেয়ে পুরোনো। কিন্তু তার চার দেয়ালের মধ্যে মানুষগুলো অবরুদ্ধ আছে ধর্মের কড়া অনুশাসনে। চার্চ বা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বহু উপাসনা কেন্দ্র রয়েছে এর অলিগলিতে। নানা ধরনের ধর্মীয় সংগঠনের (অর্ডার) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও চোখে পড়বে। প্রতাপ নিয়ে আরও আছে নানা কনভেন্ট।’ গ্যেটের ভাষ্য যা-ই হোক রক্ষণশীল এই ক্যাথলিক শহরের নিথর ডোবায় অনুকম্পন অনুভব না করলেও কয়েক বছরের মধ্যে শহরটি বদলে গেল। শহর থেকে দু-পা ফেললেই ফ্রান্স। সেখানে অভূতপূর্ব সব ঘটনা ঘটছে। ফরাসি বিপ্লব ইতিমধ্যে তার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। সবকিছু উল্টেপাল্টে গেছে বিপ্লবের অপ্রতিরোধ্য গতির ধাক্কায়। ফরাসি বিপ্লবের বাহক নেপোলিয়ন গোটা ইউরোপে তাঁর দেশের বিপ্লবের বাণী ছড়িয়ে দিতে চান। উদ্দেশ্য পূরণে দখল করলেন জার্মানি। বিপ্লবের অগ্নি আভা ট্রায়ের শহরের গায়ে পড়তে দেরি হলো না। এমন এক প্রশান্ত বাতাস তার ওপর দিয়ে বয়ে গেল, যা জার্মান ঐতিহ্যের একেবারে বিপরীত। বদলে গেল রাইনল্যান্ডের পুরো চেহারা। গণতান্ত্রিক ধারণার শক্তিশালী প্রভাব জার্মান রাজতন্ত্রের ওপর প্রতিফলিত হলো এই প্রথম।

পরিবর্তন কত গভীর ছিল তা অনুভব করা সহজ। জার্মানিতে কেউ সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা এর আগে শোনেনি। এবার শুনতে হলো। সংবিধানে সমঅধিকারের কথা ভাবাই দুরূহ। এবার সেই অধিকার এল একেবারে ফরাসি বিপ্লবের অগ্নিগর্ভ থেকে। ধর্মীয় সহনশীলতার নীতি? সে কথা তো জানা ছিল না। এবার জানা গেল। সঙ্গে এল ভোট দেওয়ার স্বাধীনতা। নাগরিক সমঅধিকারের কথা বা প্রশাসনিক বিভাগ থেকে আইন বিভাগের পৃথক্করণের নীতিও বাদ পড়ল না। এসব বিপ্লবী কথাবার্তা যে আইনি দলিলে লিপিবদ্ধ ছিল, তাকে বলা হতো নেপোলিয়নিক কোড। নেপোলিয়নের দেশে সেই আইন ইতিমধ্যে চালু। এবার হলো জার্মানিতে। ১৮০৮ সালের দিকে রাইন অঞ্চল বলতে চুনোপুঁটি ধাঁচের ক্ষুদ্র মাঝারি মাপের শাসকদের বোঝাত। তার বদলে রাইন নদীর পশ্চিম অংশকে নেপোলিয়নের আদেশ বলে একক প্রশাসনিক এলাকায় আনা হলো। নাম দেওয়া হলো রাইনল্যান্ড। নেপোলিয়নের শাসন অবশ্য বেশি দিন টেকেনি। ১৮১২ সালে রাশিয়ার হাতে পরাজিত হওয়ার পর সারা ইউরোপের রাজা-বাদশারা জোট বাঁধলেন। নেপোলিয়নবিরোধী আন্দোলন প্রবল। ১৮১৫ সালে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হলেন। রাইনল্যান্ডের ভাগ্য মন্দ। আবার ফিরে এল প্রুশিয়া রাজতন্ত্রের পূর্ণ কর্তৃত্ব। সেই সঙ্গে এল প্রুশীয় রক্ষণশীলতার শীতল ঢেউ। তবে এ কথা ঠিক ফরাসি সম্রাট বিদায় নিলেও বিপ্লবের আদর্শ ও প্রশাসনিক পরিবর্তনগুলো বিনষ্ট হলো না; বরং দেখা গেল চিন্তার দুই শক্তিশালী ধারা জার্মানিতে স্থান পেয়েছে। একদিকে ফরাসি বিপ্লব থেকে জাত সমাজ বিবর্তনের ভাবনা, অন্যদিকে প্রুশীয় রাজতন্ত্রের অতিমাত্রিক ধর্মীয়-সামাজিক রক্ষণশীলতার ধারা।

এই দুই ধারার প্রতিফলন ঘনীভূত আকারে প্রকাশ পেয়েছিল জার্মানির আপাত অপলিমাটিতে। সে সময়কার সবচেয়ে নামী দার্শনিক হেগেল অভিভূত হয়েছিলেন ফরাসি বিপ্লবে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনের গভীরতা দেখে। তারই আলোকে দাঁড় করিয়েছিলেন সমাজ বিবর্তনের তত্ত্ব। তবে তাঁর তত্ত্বের বাইরের খোসাটা নিরেট ভাববাদী হলেও ভেতরের সারবত্তা ছিল সাংঘাতিকভাবে বৈপ্লবিক এবং অন্তঃরসে টইটম্বুর, যা এর আগে ইউরোপীয় ভাবনায় কেউ কখনো দেখেনি। তাঁর দাবি, সামাজিক পরিবর্তন ঘটে মানুষের চেতনায়। আর সমাজদেহে যে পরিবর্তন লক্ষ করি, সেটি তার প্রতিফলন মাত্র। চেতনার বিবর্তন বলতে তিনি ব্যক্তি চেতনাকে বোঝেননি। তাঁর আগ্রহের সবটুকুই সমষ্টিবদ্ধ চেতনার আবর্তে বাঁধা। সমষ্টিবদ্ধ চেতনা তাঁর দর্শনে স্থান পেয়েছিল ‘চূড়ান্ত ধারণা’ বা অ্যাবসলিউট আইডিয়া নাম নিয়ে। এই অ্যাবসলিউট চেতনা ইতিহাসের নানা পর্যায়ে নানা পথ পরিক্রম করেছে বলে হেগেলের সুদৃঢ় দাবি। তার প্রতিফলন থেকেই নানা সভ্যতার জন্ম—নানা দেশ ও অঞ্চলে। হেগেলের বিশ্বাস মতে, অ্যাবসলিউট চেতনা প্রথমে আশ্রয় নিয়েছিল চীনে। তারই প্রভাবে গড়ে উঠেছিল চীনা সভ্যতা। চীন থেকে অ্যাবসলিউট চেতনা এল ভারতবর্ষে। সেখানেও গড়ে উঠল বিশেষ এক সভ্যতা। তারপর পারস্য। সেখানেও জন্ম নিল আরও উন্নততর সভ্যতা। এভাবে ব্যাবিলন মিসরীয় ধাপ পেরিয়ে ওই চেতনা পৌঁছাল গ্রিস ও রোমে। সব শেষে তার চূড়ান্ত আশ্রয় খুঁজে পেল জার্মানির প্রুশিয়ায়।

হেগেলের দর্শনচিন্তার মধ্যে গভীর স্ববিরোধিতা ছিল। সেটি লক্ষ করতে সেকালের দার্শনিকেরা ভুল করেননি। বিবর্তনের প্রবাহকে হেগেল ঠিক ঠিকই চিহ্নিত করেছিলেন এবং নির্দিষ্ট করেছিলেন পরিবর্তনের অন্তর্নিহিত উত্সকে। তাঁর মতে, অ্যাবসলিউট চেতনা দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ায় নানা রূপ ও আকার ধারণ করে। যেকোনো বস্তু বা চেতনায় দুটি উপাদান আছে। হেগেলের এই দাবির পেছনে যুক্তি ছিল। দেখা গেছে একে অপরের বিপরীতের দ্বন্দ্ব্বে জন্ম নেয় নতুন কিছু। নতুনের গর্ভে পুনরায় স্থান করে নেয় ভিন্ন দুই বিপরীত। নতুন করে দ্বন্দ্ব্ব দেখা দেয়। সেই দ্বন্দ্বের নিরসনও হয়। এই দ্বান্দ্বিক ধারা অনুসৃত পথে সমাজ এগিয়ে যায়। হেগেলের স্ববিরোধিতা হচ্ছে পরিবর্তনকে যদি শাশ্বত ধরি তাহলে জার্মান রাজতন্ত্র অ্যাবসলিউট চেতনার চূড়ান্ত আশ্রয়স্থল হতে পারে না। নব্য হেগেলপন্থী নামে যেসব প্রগতিশীল দার্শনিক জার্মানিতে বিশেষ সম্মান ভোগ করতেন, তাঁরা হেগেলের এই দিকটিকে সমালোচনা করেছিলেন। তাঁদের বলা হতো নব্য এই কারণে যে হেগেলীয় দর্শনের অনুসারী হলেও তাঁরা তাঁর বিরোধিতা করতে পিছপা হননি। বলা বাহুল্য, মার্ক্সের চেতনার প্রারম্ভিক উন্মীলনে নব্য হেগেলীয় দর্শনের আলোকচ্ছটার অবদান অপরিসীম। কিন্তু সেটি সম্ভব হলো কেবল বন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বার্লিনে যাওয়ার পর। দর্শনের প্রতি মার্ক্সের আকৃষ্ট হওয়ার সূত্রপাত সেখানেই ঘটে। শহরটি ছিল নব্য হেগেলীয়দের ঘাঁটি। নানা ক্লাব বা আলোচনা সভায় তাত্ত্বিক আক্রমণের মূল লক্ষ্য হেগেলের রক্ষণশীল দিক। তবে তার অর্থ এই নয় যে তাঁরা তাঁকে প্রশংসা করেননি। বস্তুত, সত্যি কথাটা হচ্ছে সমাজ পরিবর্তনের দ্বান্দ্বিক তত্ত্ব উদ্ভাবন তাঁর হাতেই হয়েছিল। সেটি তাঁর সমালোচকেরা উল্লেখ করতে ভোলেননি। মার্ক্সের বাবার কাছে পুত্রের এই দর্শনপ্রীতি ছিল সবিশেষ আতঙ্কের। কিন্তু তাঁর অসন্তোষের প্রতি যুবক মার্ক্স ভুলেও কর্ণপাত করেননি।

(বিস্তারিত দেখুন এপ্রিল-জুন ২০১৮ সংখ্যায়)

বিজ্ঞাপন
প্রতিচিন্তা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন