রাজনীতি

জঙ্গিবাদের আবর্তে বিশ্বরাজনীতি

বিজ্ঞাপন

“Fascism psychologically far sounder than any hedonistic conception of life...Whereas Socialism, and even Capitalism in a more grudging way, have said to people “I offer you a good time,” Hitler said to them, “I offer you struggle, danger, and death,” and thus a whole nation flings itself at his feet ... We ought not to underrate its emotional appeal.—জর্জ অরওয়েল।

সারসংক্ষেপ

‘জঙ্গিবাদের আবর্তে বিশ্বরাজনীতি’—এই প্রবন্ধের মূল আলোচ্য বিষয় ‘ইসলামিক স্টেট’। ইসলামিক স্টেট ইসলামি জঙ্গিবাদের মূর্ত প্রতীক। এই ধর্মীয় আন্দোলনের আবির্ভাব কী কারণে হলো, কেন এত বর্বরতা দিয়ে সে তার আদর্শকে প্রকাশ করছে এবং তার ভবিষ্যত্ কী—এই দিকগুলো এখানে আলোচিত হয়েছে। ‘ইসলামিক স্টেট’-এর উত্থানের চারটি কারণ রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। একটি পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রয়োগ এবং ব্যাখ্যা। তবে সেটি মুখ্য কারণ নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোকে খুঁজতে হলে তিনটি দিককে এই আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। একটি মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক রাজনীতি, দ্বিতীয়টি মার্কিন আধিপত্যবাদ এবং নিওকনভিত্তিক তার বৈদেশিক নীতি এবং তৃতীয়টি আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের সংকট। ইসলামি জঙ্গিবাদ সামাজিক ও রাজনৈতিক নানা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। তাকে একচেটিয়াভাবে দোষারোপ করে আত্মতৃপ্তি পাওয়া সে কারণে কোনো কাজের কথা নয়। ওই সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণগুলোকে দূর করাই হচ্ছে জঙ্গিবাদের একমাত্র সমাধান।

মুখ্য শব্দগুচ্ছ

‘ইসলামিক স্টেট’, জাতিরাষ্ট্রের সংকট, মার্কিন আধিপত্যবাদ, মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক রাজনীতি, শিয়া-সুন্নি বিভেদ, লিও স্ট্রস, ইসলামিক জঙ্গিবাদ, জিহাদি আদর্শ।

প্রাক্-কথন

এই লেখাটি ‘ইসলামিক স্টেট’ নামে একটি ধর্মীয় আন্দোলনের ওপর। কিন্তু একচেটিয়াভাবে তার ওপর কেবল নয়। এখানে আরও রয়েছে রাজনৈতিক ইসলামের ভবিষ্যত্ নিয়ে কিছু সার্বিক আলোচনা। সাম্প্রতিক কালে ‘ইসলামিক স্টেট’ সারা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কী নাটকীয়ভাবে সিরিয়া ও ইরাকের কিছু অংশ দখল করে নিয়ে ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসের দিকে এই ‘ইসলামিক স্টেট’-এর জন্ম হলো সেটি আমরা স্থানীয় খবরের কাগজ বা বিদেশি সংবাদ সংস্থার মাধ্যমে পেয়েছি। এপ্রিলের পর ১০ জুন ২০১৪ সালে ইসলামিক রাষ্ট্রের যোদ্ধারা ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তর শহর মসুল (২০ লাখ অধিবাসী) দখল করে নেয়। এরপর তাদের অধীনে আসে তিকরিতসহ অন্যান্য আরও কিছু শহর এবং অঞ্চল। প্রায় একই সময়ে সিরিয়ায় ‘আরব বসন্তের’ ঢেউ লাগে এবং সেখানেও শুরু হয় সরকারবিরোধী অভ্যন্তরীণ সংঘাত। তারই সুযোগ নিয়ে নানা জঙ্গিবাদী ইসলামি সংগঠন জিহাদে যোগ দেয়। রাকা, আলেপ্পো, হোমস পালমিরার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিরিয় শহরগুলো দ্রুত তাদের দখলে এলে এসব দখলকৃত অঞ্চল নিয়ে ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ আরও বৃহত্ ও শক্তিশালী হয়।

হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মৃত্যুর পর ইসলামি খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেই খিলাফত নানা চরাই-উতরাই পার হয়ে অবশেষে ১৯২৪ সালে বিলুপ্ত হয়। সেটি ঘটেছিল প্রথম মহাযুদ্ধে তুরস্কের পরাজয়ের কারণে। তা ছাড়া তার অবসানে আরও ভূমিকা রেখেছিল কামাল আতাতুর্ক, যিনি তুরস্ককে ধর্মনিরপেক্ষ আধুনিক একটি রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার ঘটনাকে আমরা সামান্য ভাবতে পারি না। অনেকে তাঁকে ওই হারিয়ে যাওয়া খিলাফতের মূর্ত রূপ হিসেবে দেখে। ইসলাম ধর্মের বিশুদ্ধ ও গৌরবময় যুগে ফিরে যাওয়ার যতটুকু সম্ভাবনা তারা স্বপ্নে ভেবেছে সেটি তাঁর মধ্য দিয়ে সম্ভব বলে তাদের দৃঢ় বিশ্বাস। এই ইসলামিক স্টেটের খলিফা হলেন আবু বকর আল বাগদাদী। তিনি একজন ইরাকি এবং কোরেশি বংশ (অর্থাত্ হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বংশ) থেকে আগত। ইসলামের ওপর তাঁর গভীর জ্ঞান আছে বলে আমরা জানি এবং শান্ত-শিষ্ট প্রকৃতি এবং একজন বিশেষ তাত্ত্বিক হিসেবে তাঁর পরিচিতির কারণে এই রাষ্ট্রের প্রতি অনেকে আকৃষ্ট হয়েছে। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত এই আন্দোলনের প্রাথমিক উদ্দেশ্য হচ্ছে সদ্যোজাত এই ‘ইসলামি রাষ্ট্রের’ ভিতকে শক্ত করা। কারণ ওই রাষ্ট্রের সঙ্গে তারা ইসলাম ধর্মের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সম্পৃক্ততা অনুভব করে। ফলে প্রায় ১০০ বছর পর (খিলাফতের শাসন শেষ হয় ১৯২৪ সালে) ‘পুনঃপ্রতিষ্ঠিত খিলাফতের’ অধীনে বাস করা তাদের জন্য বিশেষভাবে গৌরবময়। তা ছাড়া গোটা বিশ্বে ইসলামি শরিয়া শাসন প্রতিষ্ঠা করার যে জিহাদি আহ্বান সম্পর্কে আমরা জানি সেটিও মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। নানা দেশের মুসলিম যোদ্ধারা এই রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছে। এই আনুগত্যের মধ্যে আরও রয়েছে বিশেষ আবেগ। কারণ ইসলামিক স্টেটের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী এবং ইউরোপীয় দেশের তাঁবেদার হিসেবে সিরিয়া ও ইরাকের ক্ষমতাসীন সরকারকে উত্খাত করা। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিশ্বব্যাপী ইসলামি শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠার সংকল্পও তাদের সহিংস সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করছে। অনেক মুসলিম যুবক অনুপ্রাণিত হয়ে সিরিয়া ও ইরাকে গেছে যুদ্ধে অংশ নিতে। বাংলাদেশ থেকেও বেশ কিছু তরুণ সিরিয়ায় ইসলামি রাষ্ট্রের হয়ে সংগ্রামে ব্রত আছে বলে আমরা জানি। সেরান্তিনী নামে একজন অস্ট্রেলিয়ান আইএস নেতা দাবি করেছেন কেবল এক সৃষ্টিকর্তার প্রতি আনুগত্য দেখানো একজন মুসলমানের জন্য যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে খিলাফতের প্রতি আনুগত্য দেখানো প্রতিটি মুসলমানের কর্তব্য, যাকে আরবি ভাষায় বলা হয় বায়া। খিলাফতের প্রতি আনুগত্য না দেখিয়ে মৃত্যু হলে জাহিল হিসেবে মৃত্যু হবে বলে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন। কেবল তিনিই নন, ‘ইসলামিক স্টেট’-এর আরও অনেক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ওই একই ধারণা পোষণ করেন। তার অর্থ হচ্ছে ১৯২৪ সালে খিলাফতের পর ৯২ বছরে যেসব মুসলমান মারা গেছে তারা জাহিল হিসেবে মারা গেছে বলে আমাদের ধরে নিতে হবে (দেখুন: গ্রাহাম উড ২০১৫)। তবে এমনও হতে পারে যে তাদের মন খিলাফতের আহ্বানে আন্দোলিত হয়েছিল। কিন্তু হলেও ‘ইসলামিক স্টেটের’ মতো কোনো এজেন্সি বা বাহক না থাকায় তাদের অনুভূতি বাস্তব রূপ নেয়নি।

‘ইসলামিক স্টেট’ সিরিয়ার শহর দাবিককে তাদের আন্দোলনে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। তারা তাদের প্রোপাগান্ডা পত্রিকার নাম ওই শহরের নাম অনুসারে রেখেছে। যদিও আমরা জানি সেটি অনেকাংশে প্রতীকী। ধর্মীয় বিশ্বাস মতে, হজরত মুহাম্মদ (সা.) কোনো এক সময়ে বলেছিলেন যে রোমের খ্রিষ্টান বাহিনীর সঙ্গে ইসলামের জিহাদি বাহিনীর শেষ যুদ্ধটি অনুষ্ঠিত হবে ওই শহরের কাছে। সেই যুদ্ধে গোটা বিশ্ব ধ্বংস হয়ে শেষ বিচারের পথকে প্রশস্ত করবে বলেও অনেকে বিশ্বাস করেন। এই ভবিষ্যদ্বাণীকে সত্য ভেবে ‘ইসলামিক স্টেট’ তার সমর্থক যোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করছে। তাদের মধ্যে এই আত্মবিশ্বাস সঞ্চালিত করা হচ্ছে যে তারাই হচ্ছে সেই গোষ্ঠী যারা বিশ্বব্যাপী ইসলামের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার একমাত্র শক্তি এবং তাদের হাতেই সব বিধর্মীর পতন অনিবার্য। এসব প্রতীকী ব্যবহারিক প্রবণতার সঙ্গে আরও রয়েছে তাদের সামরিক কৌশল, যেটি দৃশ্যত বর্বর ও নৃশংস। ওই বর্বরতার পেছনে যে বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য নেই তা নয়। রুশ সাহিত্যিক দস্তয়ভস্কি যেমন মনে করেছিলেন যে সন্ত্রাসী আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করে মানুষকে বশ করা সহজ। সেটি তাঁর লেখা ‘ব্রাদারস কারামোজভ’ নামের রচনায় আমরা উল্লেখ হতে দেখেছি। ইসলামিক স্টেটও কিন্তু ওই সন্ত্রাসকে তাদের দেওয়া ইসলামি জীবনের ব্যাখ্যার প্রতি আনুগত্য প্রকাশে মানুষকে বাধ্য করার হাতিয়ার হিসেবে দেখছে। আজ ইসলামি জঙ্গিবাদের অকুস্থল হিসেবে আমরা মধ্যপ্রাচ্যকে দেখছি বটে কিন্তু তা হলেও প্রতিটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ আজ ওই আগুনের তাপ অনুভব করছে নানাভাবে—হয় সন্ত্রাসী আক্রমণের শিকার হয়ে অথবা জঙ্গি জিহাদি তৈরি করে। কেবল মুসলিম দেশে নয়, ওই আগুন জ্বলছে ইউরোপ-আমেরিকার মতো দূরের দেশেও। ইসলামিক স্টেটের সবকিছু যদি বিচার করা হয় তাহলে আমরা দেখব যে তাদের এই আক্রমণাত্মক কৌশলকে তারা সুচিন্তিত একটি নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছে। সেটি তাদের জন্য যে আকস্মিক কিছু নয় এবং একটি বিশেষ তত্ত্বীয় কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত, সেটিও আমরা প্রত্যক্ষ করব পরবর্তী সময়ে।

কয়েকটি কারণে জিহাদি জঙ্গিবাদকে নিয়ে আমাদের এই আলোচনা প্রাসঙ্গিক। প্রথমত, এই বিশেষ জঙ্গিবাদী আন্দোলন আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশকে সাম্প্রতিক কালে বিশেষভাবে আলোড়িত করে গেছে। আমাদের দেশে ইসলামিক স্টেটের পক্ষে কাজ করে এমন সমর্থকেরা ব্লগার বা সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ চালিয়ে অনেককে হত্যা করেছে। সেই সঙ্গে রয়েছে ভবিষ্যতে আরও আক্রমণের হুমকি। যেটি তাদের এই অভিযানে লক্ষণীয় তা হচ্ছে বিধর্মীর সংজ্ঞায়ন। ওই বিধর্মীর দলে তারা অন্তর্ভুক্ত করে খ্রিষ্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ, সামাজিক কর্মী, শিয়াসহ পুস্তক প্রকাশক, অধ্যাপক এবং মুক্তমনা ব্যক্তিদের। বাংলাদেশ সরকার ইসলামি স্টেটের উপস্থিতিকে দীর্ঘকাল ধরে অস্বীকার করে এলেও গুলশান রেস্তোরাঁয় নৃশংস ঘটনার পর সরকারের কিছুটা হলেও টনক নড়ে। তবে এ কথা সত্য যে, যে পথ বা কৌশল অবলম্বন করে সরকার জঙ্গিবাদের মোকাবিলা করার পরিকল্পনা করছে সেটি ভবিষ্যতের জন্য কতটুকু উপকার বয়ে আনবে, সে প্রশ্ন রয়ে গেছে। ফলে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই আন্দোলনের তাত্পর্য ও ভবিষ্যত্ কী এবং আমাদের করণীয় কী হতে পারে সেটি যেকোনো সচেতন নাগরিকের জন্য ভাববার বিষয়।

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক বা জঙ্গিবাদী ইসলামের উত্থান এই প্রথম নয়। বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আমাদের মতো দেশকে পরাভূত করে তাঁদের শাসন প্রতিষ্ঠা করার পর থেকে (অষ্টাদশ শতাব্দী) আমরা ইসলাম ধর্মকে বিশুদ্ধ রাখার আন্দোলন প্রত্যক্ষ করেছি। সেই আন্দোলন কখনো এসেছে সহিংস পথ ধরে। কখনো বা গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে (আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ফরায়েজি আন্দোলন, তিতুমীরের আন্দোলন ইত্যাদি)। ‘ইসলামিক স্টেট’ও বিশুদ্ধ ইসলামি সমাজ নির্মাণ করতে চায়। কিন্তু তা হলেও এই আন্দোলনের প্রকৃত চরিত্র কী, কী কারণে তার উদ্ভব হলো, তার আদর্শ ও কার্যকলাপ ইসলামি আদর্শের সঙ্গে কতটুকু সংগতিপূর্ণ সেসব প্রশ্নের উত্তর আজ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়। তারা কি পবিত্র কোরআনের সুরা বা হাদিস অনুসরণ করে তাদের কার্যক্রম নির্ণয় করে? নাকি তাদের কার্যক্রম রাজনীতি ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ মাত্র, যা আজ নানাভাবে প্রকাশ পাচ্ছে ধর্মীয় বাণীর মোড়কে। নাকি দুটির কোনোটিই এককভাবে এর উত্স নয়। বরং দুইয়ের সমন্বয় থেকে জাত। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা যে আজ কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেটি না বললেও চলে।

তৃতীয় প্রশ্ন হচ্ছে, এই ইসলামি জঙ্গি আন্দোলনের ভবিষ্যত্ কী? ‘ইসলামিক স্টেট’ ভিত্তিক আন্দোলন কি রাজনৈতিক ইসলামের শেষ অধ্যায়? আমরা জানি এ ব্যাপারে অভিন্ন কোনো মতামত দেওয়া কঠিন। সে যা-ই হোক ওই প্রশ্নকেন্দ্রিক আলোচনাকে অর্থবহ করতে হলে আমাদের তিনটি নির্দিষ্ট ধারা, যা কিনা আমরা রাজনৈতিক এবং জঙ্গি ইসলামের ইতিহাসে লক্ষ করেছি তা বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা আছে। তাদের মধ্যে কোনো বিশেষ প্যাটার্ন আছে কি না সেটিও অনুসন্ধান করা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের বিশ্বাস, তাত্ত্বিকভাবে এই সহিংস পথ ইসলামি আন্দোলনের সর্বশেষ ধাপ। যদিও এই দৃষ্টিকোণটির সত্যতা নির্ভর করছে আরও বহু ফ্যাক্টরের ওপর। তবে এ কথা সত্য যে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদী ইসলামের ভবিষ্যত্ কী, সে প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানে আমাদের এই দৃষ্টিকোণটি বিশেষভাবে তাত্পর্যপূর্ণ হতে পারে বলে আমরা মনে করি।

পূর্বকথা

মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে কিছু কথা আছে, যা এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন। যেহেতু মধ্যপ্রাচ্য ইসলামিক স্টেটের মূল কেন্দ্র বা যাকে বলে এপিসেন্টার, সেহেতু তাকে নিয়ে দুটি কথা বলে শুরু করা আমি যৌক্তিক বলে মনে করি। মধ্যপ্রাচ্যকে আমরা দীর্ঘকাল ধরে বিশ্বরাজনীতির সবচেয়ে উত্তপ্ত অঞ্চল হিসেবে জেনে এসেছি। কেবল সাম্প্রতিক কালে নয়, অতীতেও সেখানে যে সংঘাত সৃষ্টি হয়েছিল তার জন্য কেবল রাজনীতিকে দোষ দেওয়া যায় না। রাজনীতির সঙ্গে আরও যোগ হয়েছে ধর্ম। ধর্ম এমন একটি অনুভূতি যার আকর্ষণক্ষমতা মানুষকে আবেগপ্রবণ করে। রাজনীতির সঙ্গে ধর্মকে যোগ করার কারণে যেকোনো অশান্ত পরিবেশ আরও অশান্ত হয়ে ওঠে। মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রে ঘটেছেও তা-ই। তিনটি বিশ্বধর্মের (খ্রিষ্টান, ইহুদি ও ইসলাম) কথা আমরা জানি, যার সবগুলোরই জন্ম এই মধ্যপ্রাচ্যে। তাদের প্রতিটিই শান্তির বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি লক্ষ করেছি আমরা কদাচিত্। অতীতে যেমন তেমনি আজও এ অঞ্চল জ্বলছে ধর্মীয় সংঘাতের আগুনে। এই অশান্ত পরিবেশের ইতিহাস সাম্প্রতিক কালের নয়। তার শেকড় গভীর অতীতে প্রোথিত। ধর্মীয় দ্বন্দ্বের নানা রূপ অতীতকাল থেকে এখানে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, যার খণ্ডাংশ আজকের বিক্ষুব্ধ পরিবেশ সৃষ্টির পেছনে কিছুটা হলেও হয়তো ইন্ধন জোগাচ্ছে বলে আমরা ধারণা করতে পারি। হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মৃত্যুর পর মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে যে অন্তর্দ্বন্দ্বের আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল তা থেকে এখানে জন্ম নিয়েছে শিয়া-সুন্নির আত্মঘাতী এবং রক্তক্ষয়ী ইতিহাস। সেই সংঘাত আজ স্থায়ী রূপ লাভ করেছে। ক্রুসেড নামের ধর্মযুদ্ধের কথা আমরা জানি। খ্রিষ্টান ও মুসলমানদের মধ্যকার সেই দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্ব অতীতে বিলীন হলেও তার প্রভাব এবং প্রচ্ছন্ন উপস্থিতি এখানকার রাজনীতিকে অতীতে কলুষিত করে গেছে। আজও করছে। ইহুদি-মুসলিম দ্বন্দ্ব আধুনিক কালের একটি দ্বন্দ্ব হিসেবে আমরা জানি। কিন্তু তা হলেও সে সংঘাতও শান্তিকে বিনষ্ট করার ক্ষেত্রে কম ভূমিকা রাখেনি। ফলে সব মিলিয়ে এ অঞ্চল রাজনৈতিক হিংসার বিষে বিষাক্ত হয়ে আছে। আরও যেটি এ অঞ্চলের জন্য কাল হয়েছে তা হলো তার তেলসম্পদ, ইংরেজিতে যাকে বলা হয় রিসোর্স কার্স। এই তেলসম্পদকে কেন্দ্র করে বিশ্বের ক্ষমতাশালী দেশগুলো নানা ধরনের কূট রাজনীতির আশ্রয় নেয়, কখনো ব্যবহার করে ধর্মকে, কখনো তাঁবেদার শাসক তৈরি করে সম্পদের ওপর কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখে। সেখানে কোনটি সত্য কোনটি মিথ্যা, কোনটি নৈতিকভাবে সংগত কোনটি সংগত নয়, কোনটি গ্রহণযোগ্য এবং কোনটি গ্রহণযোগ্য নয়, সে ভেদাভেদ এখানে মুছে যায়। ফলে ধর্ম-রাজনীতি-গোত্রবিভক্তির এক জগাখিচুড়ি মধ্যপ্রাচ্যকে পরিণত করেছে সংঘাতময় ও ভয়ংকর এক অঞ্চলে।

একেশ্বরবাদী ধর্মের আবির্ভাবের আগে মধ্যপ্রাচ্যে মানুষ বহু ঈশ্বরবাদী নানা ধর্মে বিশ্বাস করত। সুমেরীয়, ব্যবিলনীয় এবং অ্যাসিরীয় নামে যেসব অঞ্চলকে প্রাচীন কাল থেকে আমরা জেনে এসেছি তারাই আজকের ইরাক কিংবা তার গা ঘেঁষে থাকা সিরিয়া, জর্ডান, ইসরায়েল বা তুরস্ক। এসব অঞ্চল প্রাচীনকাল থেকে বিশ্বাস জগতের বিচিত্র সব কাঠামো গড়ে তুলেছিল। বহুদেবতার প্রতি প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাসের ওপর ভর করে যে অভূতপূর্ব অতীন্দ্রিয় জগতের জন্ম হয়েছিল তার প্রভাবে মেসোপটেমিয়া, ব্যবিলন, মিসরের নীল নদ, ইউফ্রেটিস, টাইগ্রিস নদীর অববাহিকা ধরে আরব মরুভূমির বালুরাশির ওপর দিয়ে বয়ে গেছে বিশ্বাসের বিচিত্র ঢেউ। কিন্তু বড় মাপের ধর্মীয় সংঘাতের কোনো উদাহরণ ওই পর্যায়ের ইতিহাসে আমরা লক্ষ করিনি। নানা ধর্মবিশ্বাস মানুষকে প্রেরণা জুগিয়েছে। বাতাসে ভেসেছে নানা গুজব, মুক্তির নানা বাণী। ফুলের সুগন্ধ যেমন বাতাস বয়ে নিয়ে আসে, মানুষের মনোজগত্ তেমনি সিক্ত হয়েছে অতীন্দ্রিয় চিন্তার অনুধ্যানে। দেবতাকুল মানুষের ভাগ্যকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। মানুষকে পাপকাজে প্রবৃত্ত করেছে, আবার তা থেকে উদ্ধারও করেছে। তীব্র কোনো সংঘাতে লিপ্ত হওয়ার কোনো উদাহরণ সে কালে ছিল না বললেই চলে।

এই বিশ্বাসকাঠামো যখন তার শক্তি ও প্রভাব হারিয়ে ফেলে তখন তার স্থান দখল করে নেয় একেশ্বরবাদী ধর্ম। একেশ্বরবাদী ধর্ম হিসেবে ইসলাম ধর্ম ঠিক খ্রিষ্টধর্ম এবং ইহুদি ধর্মের মতো আরবের অত্যন্ত কর্কশ, কঠোর এক গোত্রশাসিত মরুভূমি অঞ্চলে জন্ম নেয়। ৬৩২ সালে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মৃত্যুর পর আরবের মুসলমান সম্প্রদায় মধ্যপ্রাচ্যের নানা অঞ্চল জয় করে নেয়। ৬৩৩ সালে দামেস্ক, ৬৩৮ সালে জেরুজালেম, ৬৪০ সালে সিসারিয়া, ৬৪১ সালে সিরিয়া, মেসোপটেমিয় শহর হারান, এদেসা, নাসিবিন দখল করে। এরপর পতন ঘটে মিসরের এবং ওই একই বছর হেলিওপলিস এবং ব্যবিলন মুসলমানদের অধীনে আসে। ৬৪৩ সালে গুরুত্বপূর্ণ শহর আলেকজান্দ্রিয়া এবং ৬৪৩ সালে ত্রিপলি মুসলমানদের দখলে আসে। ৬৩৭ সালে কাদিসিয়ার যুদ্ধে সাসানিয় সাম্রাজ্যের রাজধানী তেসিফন মুসলমানদের অধীনে আসার পর মুসলিম বাহিনী ইরানে অভিযান চালায়। ৬৪৩ ও ৭১১ সালের মধ্যে উত্তর আফ্রিকা তাদের দখলে আসে। ৭১১-৭৫৯ সালের মধ্যে স্পেন মুসলমানদের হাতে পরাজয় বরণ করে। ৭১২ ও ৭১৩ সালে বুখারা, সমরখন্দের পতন ঘটে। এভাবে এই বিশাল অঞ্চল ইসলামের অধীনে এক অভিন্ন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। তুর্কিদের নেতৃত্বে অটোমান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর (১২৯৯-১৯২২) তুর্কি সুলতান বিশ্বের সব মুসলমানকে এক খিলাফতের অধীনে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। ১৬৮৩ সালে ভিয়েনার যুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের পরাজয় মুসলিম প্রভাবকে কিছুটা খর্ব করলেও ইসলাম ধর্মের প্রসার তেমন ব্যাহত হয়নি। সে কারণে এ যুগ ছিল ইসলাম ধর্মের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় পরিপূর্ণ। পরবর্তী সময়ে ইসলামি সভ্যতায় ভাটা নামে। ইউরোপ শক্তিশালী হয়ে পঞ্চদশ শতাব্দী (১৪৯২) থেকে নানা মাত্রায় মুসলিম জগতের ওপর কর্তৃত্ব স্থাপনে সক্ষম হয়। এই মোড় পরিবর্তনের পর থেকে মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরে ক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে। সেই ক্ষোভের তিনটি উত্সকে আজকের দিনের ভয়ংকর ‘সামরিকতান্ত্রিক ইসলামের’ উত্সমূল হিসেবে বিচার করতে পারি। সেগুলো মুসলিম উম্মার জন্য এসেছে তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে। সেই চ্যালেঞ্জগুলোর সমাধান বের করতে গিয়ে নানা ধরনের আন্দোলন হয়েছে, যার সঙ্গে আমরা কমবেশি পরিচিত আছি।

প্রথম চ্যালেঞ্জের সঙ্গে মুসলিম সমাজ মুখোমুখি হয় যে সময় থেকে মধ্যপ্রাচ্য বা তার বাইরে নানা দেশ ও সমাজ ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। তখন দেখা গেল সেসব সমাজে বিদ্যমান আচার-ঐতিহ্য এবং প্রথা ইসলাম ধর্মের প্রাক্সিসের ওপর প্রভাব রাখতে শুরু করেছে। সে কারণে ঠিক অভিন্ন এবং বিশুদ্ধ ধর্মীয় নিয়মিক কাঠামোর কোনো রূপ কোথাও গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি বা আমরা দেখিনি। ধর্ম এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা এই বিশেষ ধরনের সংশ্লেষণী সংস্কৃতির স্বাক্ষর আমরা লক্ষ করেছি ভারতের মোগল সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে অটোমান সাম্রাজ্য, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের নানা সমাজে। খ্রিষ্টধর্ম এবং ইহুদি ধর্ম যেমন গোত্র প্রথা মেনে চলার ওপর কঠোর বিধান আরোপ করে, ইসলাম ধর্মেও তেমনি নিয়মের বিচ্যুতিকে আমরা কঠোরতা দিয়ে বিচার করতে দেখেছি। যাঁরা ধর্মের বিশুদ্ধতার কথা বলেন তাঁরা ধর্মের প্রাক্সিসের ওপর স্থানীয় সংস্কৃতির এই প্রভাবকে এক জাতীয় বিচ্যুতি হিসেবে বিবেচনা করেছেন। ধর্মীয় অনুশাসনের ওপর স্থানীয় সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের এই প্রভাবের কারণে ইসলাম ধর্ম পালনে আমরা লক্ষ করেছি নানা বৈচিত্র্য। সে কারণে যে মুসলিম সভ্যতা পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠে সেটি ইসলামকে গৌরবময় করলেও অনেকে তাকে পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করে নেয়নি ওই বিচ্যুতির কারণে। ফলে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়েছে। সেই প্রতিবাদের একাধিক উদাহরণ আমরা ইতিহাস থেকে পাই। ধর্মের পবিত্রতা রক্ষার আন্দোলনে যাঁরা জীবন দিয়েছেন তাঁদের মধ্যে প্রখ্যাত দার্শনিক আহমেদ ইবনে হাম্বলের (৭৮০-৮৫৫) নাম প্রথমেই উল্লেখ করতে হয়। বাগদাদের আব্বাসিয় খলিফার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় তিনি শাস্তি ভোগ করেছিলেন। ওই একই কারণে ইবনে তাইমিয়াকে (১২৬৩-১৩২৮) দামেস্কের জেলে মৃত্যু বরণ করতে হয়েছে। পরবর্তী সময়ে সালাফি বা সঠিক পথের জন্মদাতা হিসেবে এই দুজন ইসলামের ইতিহাসে বিশেষভাবে পরিচিত। বস্তুত তাদের দেওয়া ইসলামি ব্যাখ্যায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সৌদি আরবের মোহাম্মাদ ইবনে আব্দেল ওহাব (১৭০৩-১৭৯২) বিশুদ্ধকরণের আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন এবং সেই ধারার প্রধান নেতা হিসেবে তিনি আত্মপ্রকাশ করেন। এই ধারাই আজকের ‘ইসলামি রাষ্ট্রের’ তাত্ত্বিক ভিত।

দ্বিতীয় আরও একটি কারণে মুসলিম সমাজে ক্ষোভের জন্ম হয়েছে। এক কালের গৌরবময় মুসলিম সমাজ ইউরোপীয় উপনিবেশের কঠোর অনুশাসনের অধীনে এসে পতনের মুখোমুখি হয়। সেটি মুসলিম সমাজের জন্য বিশেষ পীড়াদায়ক। সে কারণে ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের পতনের পর যে ইউরোপীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হয়েছিল সেটি মুসলিমদের মনে আত্মপরিচয়ের গভীর সংকট সৃষ্টি করে গেছে। সেই সংকটের সমাধান হিসেবে নানা পথ, মতের জন্ম হয়েছে। কীভাবে বা কেন মুসলমান সমাজ পতনের শিকার হলো, কীভাবে তারা অমুসলিম শক্তির হাতে পরাধীন হলো তার অন্তর্নিহিত কারণ অনুসন্ধানে অনেকেই নিজের জীবন উত্সর্গ করেছেন। স্থানীয় সংস্কৃতির প্রভাব তো বটেই সেই সঙ্গে ঔপনিবেশিক শাসনের প্রভাব, সেই শাসন থেকে সৃষ্ট আধুনিকতা, জাতীয়তাবাদ (জাতিরাষ্ট্র) এবং ইংরেজি শিক্ষাকে অনেকে ভর্ত্সনা করেছেন এবং তাকেই মুসলিম অধঃপতনের পেছনে কারণ হিসেবে দায়ী করেছেন। ভারতবর্ষে মোহাম্মাদ ইকবাল (১৮৭৭-১৯৩৮), আবুল কালাম আজাদ (১৮৮৮-১৯৫৮), মাওলানা মাদানি (১৮৭৯-১৯৫৭) এবং মাওলানা মওদুদী (১৯০৩-১৯৭৯) এই বিদ্রোহের নেতা হিসেবে পরিচিত। এমনকি এই প্রতিবাদের ঢেউ কেবল ভারতবর্ষকে স্পর্শ করে যায়নি। ভারতবর্ষের বাইরেও এই প্রতিবাদের ঢেউ আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। ইরানে মির্জা হাসান সিরাজি (১৮১৫-১৮৯৪), শেখ ফাদুল্লা নুরি (১৮৪৩-১৯০৯), জামাল উদ্দিন আফগানি (১৮৩৮-১৮৮৭), আলজেরিয়ার আমির আবদুল কাদেরের (১৮০৮-১৮৮৩) মতো কিছু নাম এখানে আমরা উল্লেখ করতে পারি। আর যদি ইসলামিক আন্দোলনের কথা ভাবি তাহলে তার মধ্যে রয়েছে মিসরে ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’, মালয়েশিয়ায় ‘হিজবুল ইসলাম’, ভারতের ‘জামিয়াতি উলামা এ হিন্দ’ বা ‘জামাতে ইসলামি’। প্রথম মহাযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তুরস্কের খিলাফতের অবসান ঘটেছিল। সেটিও কিন্তু মুসলিম সমাজের জন্য কম পীড়াদায়ক ছিল না।

তৃতীয় আরও একটি চ্যালেঞ্জ আছে। সেটি বলতে আমরা ধর্মের মূল আদর্শ থেকে ব্যক্তি পর্যায়ে মুসলমানদের বিচ্যুতিকে বুঝি। এই বিচ্যুতির কারণে মুসলমানরা যে সমাজে বাস করে তাকে অনেকে জাহেলিয়া সমাজ নামে অভিহিত করেছেন। ব্যক্তি পর্যায়ে ওই বিচ্যুতি থেকে কীভাবে মুক্তি পাওয়া যায় তার জন্য নানা আন্দোলন হয়েছে। সেসব আন্দোলনের মধ্যে আমরা নানা ধরনের সমাধানের পথও দেখেছি। অন্যতম একটি পথ হিসেবে অনেকে ব্যক্তির আত্মশুদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন। অনেকে আবার আধুনিক শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। অনেকে একই সঙ্গে জোর দিয়েছেন রাজনৈতিক আন্দোলনের ওপর। তার মাধ্যমে ভাগ্যবদল সম্ভব বলে ধারণা করা হয়েছে। একটি উদাহরণ এ ক্ষেত্রে আমরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখি। সেটি হচ্ছে সৈয়দ কুতুব (১৯০৬-১৯৬৬) নামে মিসরীয় এক পণ্ডিতের লেখা। কুতুবের জন্ম হয়েছিল ১৯০৬ সালে। ১৯৪০ সালের দিকে দুই বছরের জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন মিসরীয় শিক্ষা বিভাগ থেকে ট্রেনিং নেওয়ার উদ্দেশ্যে। কিন্তু সেখানে ভোগবাদী সমাজের মানসিকতা তাঁকে বিদ্রোহী করে তোলে। দেশে ফিরে তিনি সরকারি পদ থেকে ইস্তফা দেন এবং ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’ নামে সংগঠনে যোগ দেন। মিসরের প্রেসিডেন্ট নাসের তাঁকে ১৯৬৬ সালে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেন। তাঁর যে লেখাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তার নাম ‘মাইলস্টোন’। কুতুব সেই লেখায় দাবি করেছেন যে তাঁর দেশের মানুষ মুসলমান হয়েও এমন অজ্ঞতার মধ্যে বাস করছে যে তাকে তিনি জাহেলিয়া বা অজ্ঞতার যুগ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ফলে তাঁর মতে, প্রথমেই সংগ্রাম করা প্রয়োজন তাদের বিরুদ্ধে যারা ওই অন্ধকারের মধ্যে বাস করছে, যাদের অন্তরে ইসলামের বাণী এখনো প্রবেশ করেনি।

ওই জাহেলিয়া সমাজ থেকে মুক্তি পেতে তিনি চারটি মূল যুক্তি তুলে ধরেন। প্রথমত, সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলা হচ্ছে সব রাজনৈতিক কর্তৃত্বের মূল। অন্য কোনো বৈধ রাজনৈতিক কর্তৃত্ব পৃথিবীতে নেই। ফলে আল্লাহর আইন ছাড়া কোনো আইন পৃথিবীতে থাকা উচিত নয় বলে তিনি দাবি করেছেন। তার অর্থ হচ্ছে, বিদ্যমান সব রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে অবৈধ বলে ধরে নিতে হবে, কেবল সালাফ ছাড়া, যা বলতে কুতুব বুঝিয়েছেন প্রথম প্রজন্মের মুসলমানদের, যারা নবী হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর সাহচর্যে ছিলেন। আর সেই অভ্যন্তরীণ সংগ্রামকে তিনি জিহাদের সঙ্গে তুলনা করেছেন। দ্বিতীয়ত, আল্লাহর অধিকার বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবকিছুর ওপর। রাজনৈতিকভাবে এর অর্থ দাঁড়ায়, শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠা করা, যার আওতায় পড়ে অর্থনীতি, প্রার্থনা, খাবার, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য, বৈবাহিক সম্পর্ক এবং পোশাক। এ ক্ষেত্রে অন্যান্য সব ধর্মের সঙ্গে ইসলাম ধর্মের পার্থক্যকেও তিনি সুনিশ্চিত করেছেন। খ্রিষ্টান ধর্ম বস্তুজগেক বাদ দিয়ে আধ্যাত্মিক জগত্ নিয়ে ব্যস্ত থাকে বলে তিনি অভিমত পোষণ করেছেন। অন্য সভ্যতা মানুষের জৈবিক এবং বন্য দিককে গুরুত্ব দেয়। তা ছাড়া রয়েছে বৈষম্যের প্রশ্ন। রোম সাম্রাজ্য এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্য শ্রেণিভিত্তিক সমাজকে উত্সাহিত করেছে, যেখানে মানুষের স্বার্থপরতার দিককে বিশেষ মূল্য দেওয়া হয়েছে। একই দোষে আক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। তারাও বস্তুগত দিককে প্রাধান্য দিয়েছে। এসব সমাজ বা আদর্শের তুলনায় ইসলামি সমাজকে তিনি শ্রেণি ও জাতিভেদবিহীন সঠিক সমাজ হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গিগুলো কিছু পরিমাণে হলেও আমরা ‘ইসলামি স্টেটের’ মূল নীতিমালায় প্রতিফলিত হতে দেখি।

সব শেষে আসে জিহাদ-সম্পর্কিত ধারণা এবং একটি ইউটোপীয় ইসলামি সমাজ গড়ে তোলার প্রত্যয়। সে ধরনের সমাজ গড়ে তুলতে সন্ত্রাসের প্রয়োজন হলেও হতে পারে। সে ব্যাপারে কুতুবের মতো আরও অনেক চিন্তাবিদ ছিলেন স্পষ্টবাদী। কুতুবের রচনায় সন্ত্রাসকে ন্যায়সংগত ভাবা হয়েছে। রাজনৈতিক সন্ত্রাস দিয়ে ওই সব প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করার আহ্বান আছে, যেগুলো মানুষ ও ধর্মের মধ্যবর্তী অবস্থানে বিরাজ করে, যার মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ গোটা বিশ্বের ধর্মনিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো অন্তর্ভুক্ত। ১৯৪১ সালে মাওলানা মওদুদী ভারতে জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কারণ তিনি বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন ছিলেন ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন নিয়ে। ওই আন্দোলন ভারতকে ধর্মনিরপেক্ষ এবং সব জাতি-গোষ্ঠী নিয়ে গঠিত একটি জাতিরাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিল। মওদুদী সে কারণে ভারতবর্ষকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জাহেলিয়া প্রত্যয়কে তাঁর নানা রচনায় ব্যবহার করেছেন। তবে এসব ‘বিশুদ্ধবাদী’ চিন্তাপ্রবাহের মূল শেকড় হচ্ছে ওহাবি ধারা, যা কিনা ইসলামের অভ্যন্তরে এক বিশেষ ধারা এবং যার জন্ম হয়েছিল সৌদি আরবে। সে কারণে আজকের আতঙ্কবাদকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হলে এই ধারার সঙ্গে পরিচিত হওয়া জরুরি, যদিও বলে নেওয়া ভালো যে ওহাবি ধারার মধ্যে অতীত কাল থেকে লক্ষ করা গেছে নানা বিবর্তন এবং তার আধুনিক সংস্করণের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই আগের সংস্করণের অমিল আছে। আবদুল ওহাবের নেতৃত্বে এই আন্দোলন শুরু হলেও তাঁর আদর্শের সঙ্গে যে জঙ্গিবাদী উপাদানের সংযুক্তিকরণ ঘটেছে, সেটি অতি সাম্প্রতিক কালের। এই ওহাবি আদর্শের কাঠামোটি আমাদের কাছে যে অপরিচিত তা নয়, যার মূল দিকগুলো হচ্ছে: ক. পীরতন্ত্র, মাজার এবং মাজারে নানা ধরনের ভক্তিবাদী তত্পরতার বিরুদ্ধে খ. কোরআন ও হাদিস পড়া এবং তা থেকে শিক্ষা নেওয়া গ. ইসলামের আদি যুগের শিক্ষায় ফিরে যাওয়া ঘ. সুফিবাদ এবং শিয়াবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া, যেহেতু তারা বিধর্মী।

জঙ্গিবাদের ধরন

‘ইসলামিক স্টেট’ নামে যে জঙ্গিবাদের উত্থান আজ আমরা প্রত্যক্ষ করছি সেটি অবশ্য অতীতে সব আন্দোলনের তুলনায় চরিত্রে ভিন্ন। যেসব ক্ষোভ মুসলিম সমাজের মধ্যে রয়েছে এবং যেগুলো ইতিমধ্যে আমরা উল্লেখ করেছি সেগুলোর ঘনায়িত রূপ যে এর মূলে রয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই, সে ক্ষোভ অতীতের বা সাম্প্রতিক কালের হলেও হতে পারে। কিন্তু তার প্রকৃত রূপকে বুঝতে হলে ইসলামি রাষ্ট্র সম্পর্কে দুটি কথা না বললেই এখানে নয়। ইসলামিক স্টেট একটি তাত্ত্বিক ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠিত। সেখানে ধর্মীয় গ্রন্থ পবিত্র কোরআন থেকে নানা উদ্ধৃতি আছে। কিন্তু ইসলামের ওপর অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন সেগুলোকে ব্যবহার করা হয়েছে অনেকটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে। কখনো তাকে পরিবর্তিত করে, কখনো খণ্ডিত বা আংশিকভাবে ব্যবহার করে অথবা কখনো তার ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে। এসব কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে মূলত নিজেদের অবস্থানকে ধর্মগ্রন্থের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করে উপস্থাপন করার জন্য। ধর্মগ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতির পাশাপাশি এই কাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যেসব রচনার আরও ভূমিকা দেখি সেগুলো হচ্ছে আল-কায়েদার নেতা আল জাওয়াহিরির নাইটস আন্ডার দ্য প্রফেটস ব্যানার। আরও উল্লেখ করতে হয় আব্দ-আল-আজিজ আল মুকরিনের আ প্র্যাকটিক্যাল কোর্স ফর গেরিলা ওয়ার বা আবু মুসাব আল-সুরির দ্য কল টু গ্লোবাল ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স। এই কৌশলগত কাঠামোর মূলে আরও রয়েছে আবু অবায়েদ আল কোরেশির সম্পাদনায় প্রকাশিত স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিস নামে একটি পত্রিকা। ওই পত্রিকায় প্রকাশিত নানা লেখায় তিনি পশ্চিমা গবেষণা থেকে প্রচুর উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছেন। উদাহরণ হিসেবে আমরা বলতে পারি পল কেনেডির দ্য রাইজ অ্যান্ড ফল অব গ্রেট পাওয়ারস নামে বিখ্যাত গবেষণাগ্রন্থটি। ওই গ্রন্থ থেকে নানা উদ্ধৃতি ব্যবহার করে প্রমাণ করা হয়েছে যে অতি সত্বর পশ্চিমা সভ্যতার পতন ঘটতে বাধ্য। আরও উল্লেখ করতে হয় উইলিয়াম লিন্ডের আন্ডারস্ট্যান্ডিং ফোর্থ জেনারেশন ওয়ার নামের গ্রন্থ। সেখানে আমাদের সমকালীন যুদ্ধের ধরন সম্পর্কে যে নতুন ব্যাখ্যা আছে তাকে ব্যবহার করে ইসলামিক স্টেটের সামরিক কৌশলের মূল কাঠামোর একটি আকৃতি দেওয়া হয়েছে। তবে যে ম্যানিফেস্টো তাদের কার্যকলাপের মূল তাত্ত্বিক ভিত হিসেবে কাজ করে এবং জিহাদিদের আদর্শিকভাবে উদ্বুদ্ধ করে সেটি লিখেছেন আবু বকর নাজি। তাঁর নাম দেওয়া হয়েছে দ্য ম্যানেজমেন্ট অব স্যাভিজেরি (২০০৪ সাল)। আফগানিস্তানে তালিবান শাসনের সমাপ্তির পর আল-কায়েদার অন্যতম নেতা আইমান আল জাওয়াহিরি নতুন স্ট্র্যাটেজি এবং সামরিক কৌশল তৈরির একটি নির্দেশনামা প্রচার করেছিলেন, যার প্রত্যুত্তরে এটি লেখা হয়েছিল। সেখানে যেটি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তা হচ্ছে, ধর্মীয় অবস্থানের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং সামরিক কৌশলের সঙ্গে তাকে এক করে একটি বিশেষ সংশ্লেষণ তৈরি করা, যা কিনা ইসলামি জিহাদের পরিপূর্ণ এক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে সাহায্য করে। প্রথমেই আসে সামরিক কৌশলের দিক। ইসলামিক স্টেটের স্ট্র্যাটেজি কী হবে, তার সঙ্গে এখানে মাও সে তুং বা চে গুয়েভারার গেরিলা যুদ্ধের নীতিমালার সাদৃশ্য লক্ষ করার মতো। যে গেরিলা যুদ্ধের কৌশল এখানে বর্ণনা করা হয়েছে সেটি দ্য ওয়ার অব দ্য ফ্লি গ্রন্থ থেকে নেওয়া, যার লেখক হিসেবে রবার্ট ট্যাবের বেশ খ্যাতি রয়েছে। আবু বকর নাজি দেখিয়েছেন যে আজকের দিনে এক জাতীয় নেতৃত্বহীন প্রতিরোধ গড়ে তোলা অনেক বেশি যৌক্তিক। সেখানে কেন্দ্রীয় কোনো সংগঠনের স্থান নেই। কেন্দ্রীয় সংগঠন না থাকার সুবিধা হচ্ছে, জিহাদিরা নিজেরাই স্বাধীনভাবে তাদের দায়িত্ব বুঝে নেবে এবং তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু কী হবে, সেটি তারাই নির্ধারণ করবে। এই পদ্ধতি যদি প্রয়োগ করা যায়, তাহলে মাঠপর্যায়ে ক্ষমতায়নের সম্ভাবনা সৃষ্টি করা যাবে। সামরিক নানা কৌশলের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমরতাত্ত্বিক উইলিয়াম লিন্ডের ফোর্থ জেনারেশন ওয়ার-এর এ দেওয়া যুদ্ধের ধারণা, যেটি আমরা ইতিমধ্যে উল্লেখ করেছি। সেখানে ‘চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধ’ সম্পর্কে কথা আছে এবং সেই যুদ্ধে এমন কোনো কৌশল নেই যাকে অবাঞ্ছনীয় মনে করা হবে। ইসলামিক স্টেট এই কৌশলকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়, কারণ সে ক্ষেত্রে শরিয়া আইনের অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না। ফোর্থ জেনারেশন যুদ্ধ এমনই এক যুদ্ধ, যা কিনা কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত হয় না। সেটি আল-কায়েদা, হামাস, হিজবুল্লাহর মতো সংগঠনের যুদ্ধকৌশল থেকে আমরা অনুধাবন করতে পারি। সেখানে রাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য নেই। কারণ যুদ্ধ কেবল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয় না, তার সঙ্গে সংস্কৃতিও যুদ্ধের একটি ফ্রন্ট হিসেবে কাজ করে। সে কারণে এই যুদ্ধে বিশেষ একটি দিকের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ধরে নেওয়া হয়েছে যে যেসব ইউরোপীয় দেশে মুসলমান নাগরিক বাস করে তারা সেসব দেশকে তাদের অধীন করতে পারে, যদি স্থানীয় পর্যায়ে তারা নানা সন্ত্রাসী তত্পরতা গড়ে তোলার দিকে নজর দেয়। মাদ্রিদে যে বোমা বিস্ফোরণ হয়েছিল তার সঙ্গে এই স্ট্র্যাটেজির বিশেষ সাদৃশ্য লক্ষ করার মতো। কিন্তু এসব সত্ত্বেও যেটি আরও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত সেটি হচ্ছে, মুসলিম দেশগুলোতে মার্কিন সেনাবাহিনীর উপস্থিতি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এসব স্থানীয় পর্যায়ের যুদ্ধে জড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তার ফলে এই বৃহত্ ও ক্ষমতাবান সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অন্তঃসারশূন্যতা ধরা পড়বে। রক্তক্ষরণের কারণে তার বিনাশ সহজ হবে। ফলে কৌশলগতভাবে ইসলামিক স্টেট এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায়, যার ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই বাধ্য হবে ওই সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে।

এই ‘ফোর্থ জেনারেশন’ যুদ্ধের ধারণাকে বাস্তব ও আধুনিক রূপ দেওয়া হয়েছে দ্য ম্যানেজমেন্ট অব স্যাভিজেরিতে। সেখানে বিশেষ তিনটি ধাপ আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সেই ধাপগুলো বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে ইসলামি জিহাদ পরিপূর্ণতা লাভ করবে বলে ইসলামিক স্টেটের নেতৃত্ব আশা করে। প্রথম ধাপকে বলা হয়েছে রিজিয়নস অব স্যাভিজেরি। তার অন্য আরও একটি নাম আছে। সেটি হচ্ছে পাওয়ার অব ভেক্সেশন অ্যান্ড এক্সজোশন। এই পর্বে প্রধান কৌশল হচ্ছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এক জাতীয় অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা। তারপর চরম হিংস্রতা দেখিয়ে সবকিছুকে ধ্বংস করা, নিঃশেষিত করা। এর ফলে স্থানীয় প্রশাসন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে, বিশেষ করে মনোবলের দিক থেকে। এটি সম্পন্ন হলে পরের ধাপকে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। সেই ধাপকে অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব স্যাভিজেরি বলা হয়েছে। সেখানে জিহাদিদের নিয়ে বর্বর প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করার উল্লেখ আছে। এই বর্বরতার অভিঘাতে বিশেষ করে নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে সাধারণ জনগণ জিহাদিদের প্রতি আনুগত্য দেখাতে বাধ্য হবে এবং তাদের শাসন মেনে নেবে (বর্বরতাকে প্রতিষ্ঠিত করা)। ‘ইসলামিক স্টেট’ এখানে একটি বিশেষ প্রত্যয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়, যাকে তারা পেয়িং দ্য প্রাইস বলে থাকে। তার অর্থ হচ্ছে পুরোনো অনৈসলামিক রাষ্ট্রের প্রশাসনে নিযুক্ত ব্যক্তিদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার সুযোগ করে দেওয়া। তার অর্থ অবশ্য আরও সন্ত্রাস। সেই সন্ত্রাসী অবস্থা প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে যেন কোনো দুর্বলতা না দেখানো হয় তার প্রতিও সতর্ক নির্দেশ আছে। এই পর্যায়ে বন্দীদের নির্বিশেষে হত্যা করা হবে, যেন ভীতির এক প্রবাহ সবাইকে গ্রাস করে। এই সন্ত্রাস হবে নিয়ন্ত্রণহীন, এলোপাতাড়ি, যা জন্ম দেবে ত্রাসের। এরপর আসে তৃতীয় এবং সর্বশেষ ধাপ বা যাকে বলে পাওয়ার অব এসটাবলিশমেন্ট। এই পর্যায়ে বর্বর প্রশাসনের পরিবর্তে সালাফি মতাদর্শের ওপর প্রকৃত ইসলামি রাষ্ট্র গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু করা মূল লক্ষ্য। বর্বরতার চরম অভিঘাতে মানুষ ইসলামি জিহাদে অংশ নিতে বাধ্য হবে। কারণ সেখানে তাদের জীবন-মরণের প্রশ্ন জড়িত। এ পর্যায়ে ইসলামি রাষ্ট্র প্রত্যেক মুসলমানকে তাদের ঘর থেকে বেরিয়ে বিধর্মীদের হত্যার আহ্বান জানাবে। যোদ্ধা নয় এমন কাউকে হত্যা করায় কোনো বাধা নেই। যদিও শাহরিয়ার সিদ্দিকী নামে একজন ইসলামি চিন্তাবিদ তাঁর প্রবন্ধে এই দৃষ্টিভঙ্গিকে ইসলামবিরোধী হিসেবে দেখিয়েছেন। তিনি এই তিনটি পর্যায়কে ইসলামবিরোধী মনে করেছেন। কারণ হজরত মুহাম্মদ (সা.) অযোদ্ধা বা মানুষকে জিম্মি করে প্রতিরোধ করার কথা কখনো বলেননি। তিনি রাতে আক্রমণ করা থেকে বিরত থাকার বিধান রেখে গেছেন, কারণ ঘুমন্ত অবস্থায় মানুষ হত্যা পাপ। শিরশ্ছেদ করা এবং দেহকে টুকরো টুকরো করা বা যুদ্ধবন্দীদের হত্যা করার ওপরও হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নিষেধাজ্ঞা ছিল বলে তিনি দাবি করেছেন। শাহরিয়ার সিদ্দিকী আরও দেখিয়েছেন (ফেব্রুয়ারি ২০১৫, পৃ. ৪) ইসলামিক স্টেটের নেতারা পবিত্র কোরআন থেকে উদ্ধৃতি ব্যবহার করেন ঠিকই কিন্তু অসম্পূর্ণ উদ্ধৃতি ব্যবহার করায় সেই উদ্ধৃতির মর্মবাণী সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয় না।

এই স্ট্র্যাটেজি যে নানা উপায়ে আজ বাস্তবায়িত হচ্ছে সেটি আমরা সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে লক্ষ করি। ইসলামিক স্টেটের বর্বরতার নানা উদাহরণ সেখান থেকে প্রতিনিয়ত আমাদের কানে পৌঁছাচ্ছে। ব্রিটিশ সাংবাদিক রবার্ট ফিস্কের সঙ্গে পাল্মিরায় সিরিয় বাহিনীর একজন ক্যাপ্টেনের আলাপচারিতা থেকে তার একটি নমুনা পাওয়া যায়। সিরিয়ার সেনাবাহিনীর ২৫ জন যুদ্ধবন্দীকে ইসলামিক স্টেটের একজন খুনি এক এক করে গুলি করে হত্যা করে। রবার্ট ফিস্ক ক্যাপ্টেনকে জিজ্ঞেস করেন খুনি কে ছিল? সে কি ধরা পড়েছে? ক্যাপ্টেন উত্তরে বলে, না, তার বয়স ছিল মাত্র ১০ বছর। ঘটনার পর ইসলামিক স্টেটের জিহাদিরা তাকে সঙ্গে করে নিয়ে যায়। এই দশ বছর বয়সের খুনির পক্ষে ইসলামি আদর্শকে বোঝা বা তার মন ইসলামি শিক্ষায় কতটুকু উদ্বুদ্ধ সে প্রশ্ন অপ্রাসঙ্গিক নয় (ফিস্ক ২০১৬)। বর্বরতার আরও উদাহরণ মেলে তাদের সদ্য প্রকাশিত ভিডিওতে, যার নাম চেঞ্জিং দ্য সোর্ডস: পর্ব ৪। কীভাবে ৩৮ জনকে এক এক করে হত্যা করা হচ্ছে, কীভাবে একজন পালিয়ে যাওয়ার সময় গুলি করে হত্যা করা হলো, ঘরে ঢুকে শিরশ্ছেদ করা হলো, লাইন করে বন্দীদের দাঁড় করিয়ে পেছন থেকে গুলি করে মারা হলো, আইএস যোদ্ধারা শহরের ভেতর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় নির্বিচারে পথযাত্রীদের ওপর গুলিবর্ষণ করল—সেসব অমানবিক দৃশ্যে ওই ভিডিও ভরপুর।

এ ক্ষেত্রে অবশ্য যে প্রশ্নকে এড়িয়ে যাওয়া কঠিন সেটি হচ্ছে বুশ প্রশাসনের ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণ। ওই আক্রমণের পর মার্কিন সেনারা ইরাকি জনগণের ওপর যে বর্বরতা দেখায় আবু গারাইব কারাগারে বন্দীদের ওপর নৃশংস আক্রমণের লোমহর্ষকতা থেকে কিছুটা হলেও আমরা সেটি অনুভব করি। বস্তুত ইসলামিক স্টেট আজ ওই একই ধরনের দ্য ম্যানেজমেন্ট অব স্যাভিজেরি-এর আশ্রয় নিয়েছে, ঠিক যেভাবে মার্কিন বাহিনী ইরাকি প্রশাসনকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে আজকের ইসলামিক রাষ্ট্রের মতো জোন অব স্যাভিজেরি সৃষ্টি করেছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Shock and Awe নীতির সঙ্গে ইসলামিক স্টেটের কোনো পার্থক্য দেখি না। ওই জোন অব স্যাভিজেরি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য মার্কিন প্রশাসক এবং একজন নিওকন হিসেবে পরিচিত পল ব্রেনারকে আনা হয়েছিল। আমেরিকায় বসবাসরত ইরাকি নেতা আহমেদ সালাবিকে ব্যবহার করা হয়েছিল। ব্যবহার করা হয়েছিল মার্কিন সামরিক শক্তিকে। মার্কিন সৈন্যরা নিরীহ পথচারীকে গুলি করে হত্যা করেছে। নিরীহ মানুষকে ক্ষুধার্ত রেখেছে। মানুষকে জিম্মি করেছে নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী, ওই সব দেশে তাদের মতো করে পরিবর্তন আনতে চেয়েছে। বিদেশের মাটিতে কয়েক দশক ধরে আমেরিকা এ ধরনের সন্ত্রাসী তত্পরতা চালিয়ে যাচ্ছে। গালফ যুদ্ধের সময় মার্কিন সেনাবাহিনী যখন নির্বিচারে মানুষ হত্যা করছে তখন তত্কালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের একটি উক্তি প্রণিধানযোগ্য। তিনি লিখেছিলেন,

There is another way for the bloodshed to stop, and that is for the Iraqi military and the Iraqi people to take matters into their own hands, to force Saddam Hussein , the dictator, to step aside... (ˆ`Lyb The Symbiosis of Savagery, page 4)

তার অর্থ হচ্ছে জর্জ বুশ যুদ্ধ বন্ধ করবে যদি ইরাকিরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছা অনুযায়ী তাদের সরকার পরিবর্তন করে। ৬০ মিনিটের সাক্ষাত্কারে ডিপার্টমেন্ট অব স্টেটের তত্কালীন প্রধান মেডেলিন অলব্রাইট বলেছিলেন, ৫ লাখ ইরাকি শিশু মারা গেছে বটে কিন্তু আমি মনে করি এটাই তাদের প্রাপ্য ছিল (The Symbiosis of Savagery, page 5)। Glen Greenwald নামের একজন মার্কিন চিন্তাবিদ ওই উক্তিকে স্মরণ করে লিখেছেন,

When we invaded Iraq, we called our invasion ‘Shock and Awe’. The purpose of it was to do so much violence that we would terrorise the civilian population into submission, to surrendering.

মার্কিন এই নৃশংসতার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের ওপর বোমাবর্ষণ, ইরাকের অবকাঠামো ধ্বংস করে দেওয়া, ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে প্রাপ্তবয়স্কদের নির্বিচারে হত্যা করা, নৈশ অভিযান চালিয়ে মানুষ হত্যা করা। আজ ওই একই সন্ত্রাসের পথ বেছে নিয়েছে ‘ইসলামিক স্টেট’। যেভাবে আমেরিকার নিওকনরা বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসের পথ ধরে রাষ্ট্রের ক্ষমতা পরিবর্তন করতে উদ্যোগী হচ্ছে, ইসলামি রাষ্ট্র ঠিক একই পথ অনুসরণ করে তার প্রত্যুত্তর দিচ্ছে। এভাবে এক সন্ত্রাস থেকে জন্ম হয়েছে আরও ভয়ংকর এক সন্ত্রাসের। সেদিক থেকে ভাবলে ইসলামিক রাষ্ট্রের স্যাভিজেরি তত্ত্ব (দেখুন Neeva Steve 2015) বস্তুত মার্কিন বাহিনীর বর্বরতার পরোক্ষ ফলাফল এবং সেখানে আমি দুঃখ করি না। কারণ ইসলামিক স্টেটের বর্বরতা মার্কিন বর্বরতার ঠিক উল্টো পিঠ। ইসলামিক স্টেট যুদ্ধ করছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু যেটি এ ক্ষেত্রে প্যারাডক্স তা হচ্ছে এসব সহিংসতা থেকে যারা মৃত্যুবরণ করছে বা যারা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তারা সাধারণ মুসলিম। তারা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্যদিকে উপকৃত হচ্ছে আমেরিকার সামরিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ থেকে এ পর্যন্ত তারাই লাভবান হয়েছে সবচেয়ে বেশি। এবং গবেষণা করলে হয়তো দেখা যাবে যেসব নিওকন রাজনীতিবিদ এই যুদ্ধের জন্য দায়ী তারা পরোক্ষভাবে হোক বা প্রত্যক্ষভাবেই হোক ওই সমরশিল্পের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত আছে। ফলে ইসলামিক স্টেটের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতাও যে ফলপ্রসূ হচ্ছে তা বলা কঠিন।

তবে মার্কিন বর্বরতাকে ইসলামিক স্টেটের উত্থানের পেছনে মূল কারণ ভাবাও যুক্তিযুক্ত নয়। মার্কিন বর্বরতা পরোক্ষ কারণ হতে পারে। কিন্তু আন্দোলন হিসেবে ‘ইসলামিক স্টেট’ এবং তার সঙ্গে সম্পৃক্ত ইসলামি জঙ্গিবাদের জন্মের মূল কারণ কী সেটি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে আমাদের দেখা প্রয়োজন। দুটি প্রধান ব্যাখ্যা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বলে নানা মহলে বিবেচিত হচ্ছে। কোরআনের নানা ব্যাখ্যায় বিধর্মীদের বিরুদ্ধে জিহাদের আহ্বান আছে বলে অনেকে দাবি করেন, সেই আহ্বানই জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীকে সশস্ত্র সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করছে বলেও অনেকে মনে করেন। অন্যদিক থেকে আদর্শের ওই গুরুত্বকে বোঝানোর জন্য অনেকে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে হিটলারের বর্বরতার উদাহরণ উল্লেখ করে থাকেন এবং কী কারণে হিটলারের সমর্থকদের মনে ইহুদি নিধন এবং শত্রুর প্রতি চরম নৃশংসতা দেখানোর প্রবণতা স্থান পেয়েছিল সেটি দেখানোর চেষ্টা করেন। Daniel Goldhagen তার Hitler’s Willing Executioner এ লিখেছেন, হিটলারের সমর্থকেরা বর্ণবাদী তত্ত্বে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল একমাত্র আদর্শের কারণে। তারা তাদের নেতা হিটলারের দেওয়া ব্যাখ্যা, ইহুদি জাতি সম্পর্কে হিটলারের ধারণার যুক্তিসিদ্ধতাকে সঠিক মনে করে ইহুধি নিধনে অনুপ্রাণিত হয়েছিল। প্রখ্যাত সাহিত্যিক আয়ান হিরসি আলিও সেভাবে ব্যাপারটিকে দেখেন। তাঁর মতে, সন্ত্রাসী গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আদর্শের বড় ভূমিকা থাকে। ফলে ইসলাম ধর্মের আহ্বানের মধ্যে জিহাদের যে বীজ নিহিত, তাকে এই জঙ্গিবাদের উত্স হিসেবে অনেকে ধরে নেন। আদর্শ যে মানুষের কার্যকলাপে ভূমিকা রাখে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মানুষের কাজের সঙ্গে বিশ্বাসের কিছু না কিছু মিল থাকে। বিশ্বাস মানুষকে কাজে উদ্বুদ্ধ করে। ফলে আদর্শের ভূমিকাকে একেবারে বাদ দেওয়া কঠিন। একটি উদাহরণ এখানে সংগত বলে মনে হতে পারে। আমরা যদি মনে করি, ইউরোপের ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ আমাদের সন্তানদের বিপথগামী করছে তাহলে ওই সমাজের বিরুদ্ধে আদর্শগত অবস্থান নিতে আমরা অনেকেই আগ্রহী হব। ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের বদলে ভিন্ন কোনো ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে অনেকে এমনকি সন্ত্রাসী হলেও হতে পারে। তবে ব্রাউনিং নামে মার্কিন এক গবেষকের মতো অনেকেই আবার আদর্শের ভূমিকাকে খাটো করে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দিকের প্রতি জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি তাঁর ‘অর্ডিনারি ম্যান’-এ আদর্শের চেয়ে অবস্থানগত কারণকে (situational factors) এ ধরনের সন্ত্রাসী উন্মাদনায় প্রবৃত্ত হওয়ার জন্য দায়ী করেছেন। গ্রুপের প্রতি আনুগত্য, প্রশংসিত হওয়ার তাড়না বা কাজের ক্ষেত্রে প্রমোশন লাভের আকাঙ্ক্ষা বা নিজেকে দুর্বল না ভাবার মতো মনস্তাত্ত্বিক উপাদানগুলোর ভূমিকাকেও বাদ দেওয়া যায় না।

জঙ্গিবাদ এবং পবিত্র কোরআন

তবে যদি ধরে নেওয়া হয় যে ইসলামি আদর্শই ইসলামি রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি তাহলে জঙ্গিবাদের উত্থানকে পবিত্র কোরআন বা কোরআনের নানা ব্যাখ্যা থেকে বাদ দেওয়া কঠিন। পবিত্র কোরআনের একটি আয়াতে আছে:

And kill them wherever you find them, and turn them out from where they have turned you out. And Al-Fitnah [disbelief or unrest] is worse than killing... but if they desist, then lo! Allah is forgiving and merciful. And fight them until there is no more Fitnah [disbelief and worshipping of others along with Allah] and worship is for Allah alone. Quran (2:191-193)|

তবে এ কথা সত্য যে জিহাদ শব্দকে নানাভাবে নানা মহল ব্যবহার করে থাকে এবং তা নিয়ে বিভ্রান্তি আছে। অনেকে মনে করেন জিহাদ বলতে মূলত আত্মশুদ্ধি বোঝায়, ঠিক যে আত্মশুদ্ধির কথা মনে রেখে প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকেরা নিজেকে জানার (know thyself) উপদেশ দিয়ে গেছেন। জিহাদের ব্যাখ্যা পরিবর্তিত হয়েছে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। আজকাল জিহাদ বলতে আত্মশুদ্ধি না বুঝিয়ে বিধর্মীদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামকে বোঝায়। তবে বিধর্মী কে সেটিও অনেক ক্ষেত্রে অস্পষ্ট থাকে। বিধর্মী হতে পারে শিয়া সম্প্রদায়। কারণ শিয়া সম্প্রদায় মাজার শরিফে প্রার্থনা অনুমোদন করে। কারবালার করুণ কাহিনিকে নাটকীয় করে রাজপথে শোভাযাত্রা করে, যা কিনা বিশুদ্ধ ধর্মীয় অবস্থানের বিপরীত বলে অনেকে মনে করেন। সেই সঙ্গে আরও রয়েছে সুফিবাদের ভক্ত গোষ্ঠী। তাদেরও বিধর্মী হিসেবে ধরা হয়, এমনকি যারা মুসলমান কিন্তু ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেনি তারাও বিধর্মী। বিধর্মী হতে পারে ইয়াজিদি, খ্রিষ্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ, ইহুদি। মোট কথা কিছু সীমিত সংখ্যক আত্মনিবেদিত মুসলমান ছাড়া বাকি সবাই ‘ইসলামিক স্টেটের’ সংজ্ঞায় বিধর্মী। এসব কারণে ইসলাম ধর্মকে অতীতে ও বর্তমানকালে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে বা হচ্ছে।

ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামকে একপর্যায়ে যুদ্ধের ধর্ম হিসেবে দেখা হতো। ১৯২৬ সালে স্বামী সারদানন্দ নামে একজন উগ্রপন্থী ধর্মীয় নেতা একজন মুসলমানের হাতে নিহত হয়েছিলেন। এই হত্যা ভারতে বিশেষ আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং ইসলাম ধর্মকে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করা হয়। অভিযোগ করা হয় যে ইসলাম নিজের প্রচারের কাজে তলোয়ারের ওপর নির্ভর করে। সে সময় অবশ্য মাওলানা মওদুদী ইসলামের পক্ষে অবস্থান নিয়ে কিছু লেখা প্রকাশ করেন। তিনি সেখানে ইসলাম যে শান্তির ধর্ম সেটি প্রমাণ করেছিলেন কোরআন ও হাদিস থেকে নানা উদ্ধৃতি ব্যবহার করে। ইসলাম শান্তির ধর্ম হিসেবে ধরে নিতে হবে, যারা শান্তির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয় তারা যেমন মুসলিম, তেমনি যারা সশস্ত্র জিহাদের কথা বলে তারাও কিন্তু মুসলিম। অর্থাত্ কোরআন শরিফে দুটি বিষয়ই থাকায় নিজের পছন্দমতো করে কোনো একটির পক্ষে দাঁড়ানো অনেকের পক্ষে সম্ভব হয়। এই দুই ধরনের অবস্থান—শান্তি ও জিহাদ—গড়ে উঠেছিল সম্ভবত নানা পরিস্থিতির কারণে। ধর্ম প্রচারের সময় হজরত মুহাম্মদ (সা.) নানা সময়ে নানা বিরোধিতার মুখোমুখি হয়েছেন। তাঁকে নানা অনুকূল ও প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়েছে। ফলে কখনো তাকে ভয়ংকর যোদ্ধা হতে হয়েছে এবং নবজাত ইসলামের শত্রুর বিরুদ্ধে যোদ্ধার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়েছে। কখনো শান্তির বাণী দিয়ে তিনি নিশ্চিত করেছিলেন ইসলামের গ্রহণযোগ্যতাকে। ইসলামের ইতিহাসে সে কারণে যেমন রয়েছে মদিনার সনদ, তেমনি রয়েছে শত্রুকে ধ্বংস করার আহ্বান। ফলে ইসলামিক স্টেটের পক্ষে যারা জিহাদে যোগ দিয়েছে তাদের বিধর্মী বলা কঠিন। যারা আইসিস বা ইসলামিক রাষ্ট্রের যোদ্ধা বা নেতৃত্বে আছে তারা সঠিক মুসলমান কেন নয়, সেটিও প্রমাণ করা কঠিন।

২০১৫ সালের মার্চ মাসে দ্য আটলান্টিক পত্রিকায় প্রকাশিত What the ISIS Wants নামে প্রবন্ধে গ্রাহাম উড ইসলাম ধর্মের সঙ্গে জঙ্গিবাদের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক তুলে ধরেছেন। অনেকে ইসলামিক স্টেটের সমর্থক জিহাদিদের সঠিক মুসলিম হিসেবে দেখার বিপক্ষে, কারণ তাদের মতে তারা ধর্মীয় আদর্শের অপব্যাখ্যা করে, অপব্যাখ্যা দিয়ে উগ্র প্রথাকে যুক্তিসিদ্ধ করে। কিন্তু তা সত্ত্বেও Bernard Haykel নামে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক দাবি করেছেন, যারা ইসলামিক স্টেটের যোদ্ধা তারাই হচ্ছে ইসলামের সঠিক প্রবক্তা। কারণ বাস্তব জীবনে মুসলিমরা যা কিছু করে সেটিই ইসলাম (Dagli 2015)। অর্থাত্ ধর্মের ক্ষেত্রে আদর্শ বা সেই আদর্শের সঠিকতা বলে কিছু নেই। ধর্মের অনুসারীরা যা করে তাই ধর্ম। দৃষ্টিভঙ্গিটি সঠিক বলে মনে করার কারণ নেই। সমাজে নানা ধরনের মানুষ নানা কারণে ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করতে পারে। সেসব কারণের মধ্যে রাজনীতি অন্যতম বলে আমরা জানি। তাহলে কি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে ধর্মের ব্যবহার বা অবমাননা, যা-ই বলি না কেন তাকেই কি সত্যিকার ইসলাম বলে ধরে নিতে হবে? আরও যে জটিলতা নেই তা নয়। হজরত মুহাম্মদ (সা.) যে পরিবেশে যে জীবন কাটিয়েছেন তার দেওয়া প্রতিটি উপদেশ বা আদেশকে সেই পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা কঠিন। পরিপ্রেক্ষিত থেকে ছিন্ন করে তার উপদেশের মর্মবাণী বোঝাও কঠিন। কোনো কোনো হাদিসের সত্যতা নিয়েও ইসলামি চিন্তাবিদদের মধ্যে মতবিরোধ আছে। ইবনে খালদুন থেকে শুরু করে ইসলামের নানা পণ্ডিত ব্যক্তি সে কারণে হাদিসকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছেন—সঠিক এবং সঠিক নয় হিসেবে। ইসলামিক রাষ্ট্র হাদিস বা কোরআনের বাণী ব্যবহার করে। কিন্তু তারা ব্যবহার করে যেগুলো তাদের জঙ্গি এবং উগ্রবাদী রাজনীতির উদ্দেশ্যকে তুলে ধরতে সাহায্য করে। ইসলামিক স্টেট মূলত হাদিস থেকে নেওয়া উদ্ধৃতি ব্যবহার করে থাকে। তাদের বাক্য বিন্যাসে ধর্মীয় নানা শব্দ ও নিয়মাবলি উপস্থিত থাকে এবং তারা ওই বহুমুখী ইসলামি ব্যাখ্যার সুযোগ নেয়। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তারা ইসলামের ওপর সত্যিকার জ্ঞানী। রবীন্দ্রনাথের কাব্যভান্ডার থেকে নানা শব্দ ও বাক্য বা কথোপকথন মুখস্থ করে ব্যবহার করার অর্থ এই নয় যে কেউ রবীন্দ্রসাহিত্যের ওপর পণ্ডিত হয়ে গেছে। খ্রিষ্টান ধর্মের প্রসঙ্গকেও ওই একইভাবে বিচার করা যায়। যারা মধ্যযুগে খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে ইসলামিক স্টেটের মতো একই ধরনের অত্যাচার করেছে, বিচার করেছে, হত্যা করেছে তারা কি খ্রিষ্টান ছিল না? যারা ইনকুইজিশনের মাধ্যমে অনেককে মৃত্যুর মুখে পাঠিয়েছে তারা কি চার্চের সঙ্গে যুক্ত ছিল না? অনেক ক্ষেত্রে ভ্যাটিকানের অনুমোদন নিয়ে ওই ধরনের সন্ত্রাসী কাজ চালানো হয়েছে। মধ্যযুগে ধর্মের যে ব্যাখ্যা ভ্যাটিকান দিয়েছে এবং নানা ধরনের উত্পাত অত্যাচার করেছে সেটি তারা করেছে খ্রিষ্টান হিসেবেই। সেটি করতে হয়েছে সময়ের দাবি অনুযায়ী, বিশেষ সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে। ফলে যেটি আমাদের বোঝা প্রয়োজন তা হচ্ছে ধর্মের বাণী বিশুদ্ধ আকারে আমাদের হাতে আসে কিন্তু আমাদের বাস্তব জীবন বিশুদ্ধ নয়। ধর্মের বিশুদ্ধ বাণী বিশুদ্ধ নয়, এমন বাস্তবতার সংস্পর্শে এসেই কেবল সমাজে স্থান করে নেয়। ফলে যত বিশুদ্ধই হোক বা যত বিশুদ্ধ ধর্মীয় জীবনের কথা আমরা বলি না কেন ধর্ম পালনে একধরনের বিশুদ্ধ ও কলুষিতের মিশ্রণ ঘটার যথেষ্ট সুযোগ থেকে যায়, যাকে বলা যেতে পারে a mixture of the sacred and the profane A^ev profanation of the sacred।

সে কারণে আমাদের নানা ধরনের অসংগতির মুখোমুখি হতে হয়। কেবল এখন নয়, অতীতেও। ধর্মকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের মিথ্যাচারিতার আশ্রয় নেওয়া সম্ভব হয়েছে বা হচ্ছে। সেই অসংগতির নানা উদাহরণের সঙ্গে আমরা আমাদের বাস্তব জীবনে মুখোমুখি হই। যেমন আদি ওহাবি আন্দোলন সৌদি আরবে জন্ম নিয়েছিল। ওই আন্দোলন একসময় অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে জিহাদের আহ্বান জানিয়েছিল। অটোমান সাম্রাজ্যকে আমরা ইসলামি রাষ্ট্র হিসেবে জেনে এসেছি। ওই বিরোধিতা কেন করা হয়েছিল বা তার যৌক্তিকতা কতটুকু ছিল তা নিয়ে প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক। সে সময় অবশ্য কারণ দেখানো হয়েছিল যে অটোমান সুলতান খিলাফতকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সে কারণে তাকে সত্যিকার অর্থে ইসলামি বলা সংগত ছিল না। কিন্তু মূল কারণ ছিল রাজনৈতিক, যেটি আমরা পরবর্তী সময়ে লক্ষ করব। দ্বিতীয় বড় অসংলগ্ন সৌদি রাজতন্ত্রের অবস্থানগত নানা সিদ্ধান্তে। সৌদি আরব সরকারিভাবে ইসলামি রাষ্ট্রের সন্ত্রাসকে বরাবর অস্বীকার করে এসেছে। বর্তমানে সৌদি আরবের বাদশাহ প্রিন্স সালমান ২০০৭ সালে বিদায়রত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত জেমস অবেরওয়েটারকে বলেছিলেন, ‘সন্ত্রাসবাদ বা মৌলবাদ ইসলামকে অন্য সবকিছুর চেয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে। এটিই সৌদি পরিবারের প্রকৃত অবস্থান’ (Chomsky, 2015)। এই একই কথা আমরা শুনেছি বাদশাহ আবদুল্লার কাছ থেকে। মৃত্যুর কিছু আগে তিনি মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুড এবং ইসলামিক স্টেটকে ভর্ত্সনা করে গেছেন। কারণ তাঁর ধারণায় তারাই ইসলামকে হাইজ্যাক করেছে এবং তাকে ঘৃণার ধর্ম হিসেবে বিশ্বব্যাপী প্রচার করছে। অথচ ওহাবি ইসলামের যে বিশেষ ধারার প্রতি ইসলামিক স্টেট অনুগত এবং যার সঙ্গে আল-কায়েদার নেতা ওসামা বিন লাদেনের যোগসূত্র প্রবল সেই ওহাবি আদর্শ বস্তুত অর্থে সৌদি আরবের ইসলামি শাসনব্যবস্থা এবং শরিয়া আইনের মূল ভিত। মার্কিন কংগ্রেসের অত্যন্ত গোপন দলিলে আল-কায়েদা সন্ত্রাসী জাকারিয়া মুসায়ি বলেছেন যে নয়-এগারো টুইন টাওয়ারে আঘাত হানার বেশ অনেক কাল আগে থেকে সৌদি আরব সুন্নি উগ্রবাদীদের মধ্যে বিপুল অর্থ বিলি করেছে। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করা উগ্রপন্থীরা (Chomsky 2015)। আঞ্চলিক রাজনীতিতে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বে ইরানের বিপরীতে নিজেকে সুন্নি সম্প্রদায়ের মুখপাত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে সৌদি আরব ওহাবি আদর্শকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে লিপ্ত রয়েছে। ওহাবি আন্দোলন গড়ে উঠেছিল পবিত্র কোরআনের বিশেষ ব্যাখ্যা থেকে, যার প্রণেতা ছিলেন আবদুল ওহাব। কিন্তু ওহাবের ব্যাখ্যায় অনেক ভালো দিক ছিল যেগুলো কালের পরিবর্তনে বিশেষ করে রাজনৈতিক কারণে পরবর্তী সময়ে বাতিল করা হয়েছিল। ওহাব পবিত্র কোরআনে যে ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার নির্দেশ আছে তার ভিত্তিতে অর্থনীতিকে সমতা এবং সম্মানের ওপর প্রতিষ্ঠিত করার ওপর জোর দিয়েছিলেন। মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মঙ্গলভাবনা কোরআনের মূলে থাকায়, তার মতাদর্শে দরিদ্র নিপীড়িত মানুষের স্বার্থে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতি থেকে মুক্ত রাখার নির্দেশনা আছে। এই দিকগুলো আবদুল ওহাব বিশেষ করে তুলে ধরেছেন এবং এ পর্যন্ত ইসলামের যেসব ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে সেগুলোকে বর্জন করে তার মত বিশ্বাসে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর এই মতবাদে আরও ছিল যুদ্ধবন্দীদের হত্যা বন্ধ করার নির্দেশ, বিনা কারণে সম্পত্তি ধ্বংস করার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা, সাধারণ মানুষ নারী ও শিশুদের হত্যার ওপর নিষেধাজ্ঞা। তিনি আরও ঘোষণা দেন যুদ্ধে যারা মারা গেছে তাদের শহীদ হিসেবে দেখা বা তারা বেহেস্তে যাবে, এ ঘোষণা দেওয়া ভুল। কারণ তাঁর ধারণায় এর মধ্য দিয়ে আত্মগরিমা প্রকাশ পায়। সে কারণে ওহাব নিজেও তকফির দেওয়ার বিপক্ষে ছিলেন। তাঁর মতে, একমাত্র আল্লাহ তাআলা মানুষের মন বুঝতে পারে, মানুষের মনের অন্তর্নিহিত চরিত্র জানে, এই ছিল তাঁর অবস্থান। সে কারণে কাউকে কাফের বলাও তিনি সঠিক মনে করেননি। আজকের দিনের ওহাবি ইসলামি ব্যাখ্যা বা প্রয়োগের সঙ্গে যে এর অনেক বৈসাদৃশ্য আছে, সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না।

কারণ আদর্শ সর্বকালে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়, বিশেষ করে যখন রাষ্ট্রের কৃতকর্মের ব্যাখ্যা হিসেবে তাকে ব্যবহার করা হয়। সেটি কেবল ওহাবি আদর্শে নয়, অন্যান্য আদর্শের ক্ষেত্রেও আমরা লক্ষ করি। সমাজতান্ত্রিক আদর্শ মার্ক্স, এঙ্গেলস, লেনিন, ট্রটস্কি, বার্নস্তেটনের হাতে পরিবর্তিত হয়ে একে অপরের বিরোধী আদর্শে পরিণত হয়েছিল। এই কথাটি ১৯৩০ সালে প্রকাশিত লুইস নামিয়ের (Lewis Namier) তাঁর লেখা ইংল্যান্ড ইন দ্য এজ অব দ্য আমেরিকান রেভল্যুশন (England in the Age of the American Revolution) গ্রন্থে আমরা উল্লেখ হতে দেখি। ওহাবি আন্দোলন ইসলাম ধর্মের বিশুদ্ধতা দাবি করে আন্দোলনে নামলেও সৌদি রাজতন্ত্র ওতপ্রোতভাবে তার সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় সময়ের ব্যবধানে সে আদর্শ পরিবর্তিত হয়েছে রাজতন্ত্রের স্বার্থকে রক্ষা করতে গিয়ে। ওহাবি ইসলাম বাস্তব জীবনে দুই ধারায় গড়ে ওঠে। প্রাথমিক পর্যায়ে ওহাব জোর দিয়েছিলেন শিক্ষা, পড়াশোনা এবং বিতর্কের ওপর। কিন্তু বাদশাহ ইবনে সাউদের হাতে এসে সেই জ্ঞান শক্তিভিত্তিক মতাদর্শ তলোয়ারের ধর্মে পরিণত হয়েছিল। ওহাবের মৃত্যুর পর রাজতন্ত্রের আদর্শে পরিণত হয়ে ওহাবি আদর্শ সন্ত্রাসের আশ্রয় নেয়। কারণ সৌদি আরবে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সন্ত্রাস ছাড়া সে সময় সম্ভব ছিল না। কীভাবে ওহাবি আদর্শে সন্ত্রাসী উপাদান সংযুক্ত হয়েছিল, সেটি সৌদি রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে আমরা লক্ষ করি। প্রথম মহাযুদ্ধের পর আবদুল আজিজ ওহাবি মতাদর্শের ওপর নির্ভর করে বেদুইন গোত্রদের নিয়ে এক বিশেষ বাহিনী গড়ে তোলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলা। যে বেদুইন বাহিনী তাকে সাহায্য করেছিল তাকে Ikhwan Brotherhood নাম দেওয়া হয়েছিল। কারেন আর্মস্ট্রংয়ের মতে, এই বাহিনী বস্তুত আজকের ‘ইসলামিক স্টেটের’ মূল শেকড়। সৈয়দ কুতুব বা হাসান আল বান্না নামে যে ইসলামি চিন্তাবিদের নাম আমরা আগেই উল্লেখ করেছি, তাঁরাও ১৯২৮ সালে যে রাজনৈতিক ইসলামি সংগঠন গড়ে তোলে তাকে ইখওয়ান নাম দিয়েছিলেন (দেখুন Asyraf Rahman & Nooraihan Ali 2012)। ইখওয়ান আন্দোলন প্রথমে বেদুইনদের যাযাবর জীবন থেকে সরিয়ে এনে স্থায়ীভাবে বসবাসের ব্যবস্থা করে দেয়। যাযাবর জীবন ওহাবি ধারণায় ইসলামবিরোধী। সেখানে তারা কৃষিকাজের সঙ্গে পরিচিত হয় এবং ওহাবি মতবাদে দীক্ষা নেয়। যাযাবর অবস্থায় বেদুইনরা গরু ছাগল উট অপহরণ করত। একে ghazu বলা হতো। কিন্তু জিহাদি আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তারা হিংস্র হয়ে ওঠে। এরা যুদ্ধ করত তলোয়ার দিয়ে, কারণ হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সময়ে তলোয়ার ছাড়া অন্য কোনো অস্ত্রের ব্যবহার ছিল না। গাজু ঐতিহ্যে বেদুইনরা কখনো বেসামরিকদের হত্যা বা আক্রমণ করেনি। কিন্তু ইখওয়ানরা অস্ত্রবিহীন গ্রামবাসীদের হত্যা শুরু করে। বন্দীদের গলা কেটে হত্যা করা এবং নারী-শিশুদের হত্যা করা তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়। ১৯১৫ সালে আবদুল আজিজ হিজাজ নামে এলাকাকে (যেখানে মক্কা ও মদিনা অন্তর্ভুক্ত) নিয়ে পারস্য, সিরিয়া ও জর্ডান দখলের পরিকল্পনা করে। কিন্তু ইখওয়ানরা আরও এক ধাপ এগিয়ে ব্রিটিশের অধীনে থাকা ইরাক, কুয়েত ও জর্ডান আক্রমণ করে। তারা আবদুল আজিজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, কারণ বাদশাহ আজিজ টেলিফোন, মোটর গাড়ি, টেলিগ্রাফ, সংগীত ও ধূমপানের অনুমতি দিয়েছিলেন, যেগুলো হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আমলে ছিল না। ১৯৩০ সালে আবদুল আজিজ এই বিদ্রোহ দমন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

সরকারি মতাদর্শে পরিণত হওয়ার পর জিহাদি ধারণা পরিত্যাগ করে ওহাবি আদর্শ একধরনের রক্ষণশীল ইসলামি ধারায় পরিণত হয় কিন্তু ইখওয়ানের স্পিরিট সৌদি আরবে ধ্বংস হয়নি। সেটি সৌদি সরকারি মতাদর্শে আমরা লক্ষ করি। ১৯৭৩ সালে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার পর যে বিপুল পেট্রোডলার সৌদি সরকারের হাতে জমা হয়েছিল সৌদি আরব ওহাবি মতাদর্শ প্রচারের কাজে ওই অর্থ ব্যবহার করতে থাকে। সৌদি আরবের মুসলিম ওয়ার্ল্ড লীগ সারা বিশ্বে আজ ওই জিহাদি মতবাদ প্রচার করছে। কোরআনের ওহাবি অনুবাদ সারা বিশ্বে বিতরণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রচার করা হচ্ছে ওহাবি মতাদর্শের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ অন্যান্য মতবাদ বিশেষ করে মওদুদী এবং কুতুবের লেখা রচনাগুলো। সৌদি ধাঁচের মসজিদ নির্মাণে অর্থ দেওয়া থেকে শুরু করে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা, সেখানে গরিব ছাত্রদের থাকা-খাওয়া এবং বাসস্থানের ব্যবস্থা এবং ওহাবি মতাদর্শে দীক্ষা দেওয়া আজকের সৌদি কৌশলের অন্যতম রূপ। সৌদি আরব নানা মুসলিম ও অমুসলিম দেশে ওহাবি আদর্শের আদলে নানা ধরনের চ্যারিটি এবং রয়্যাল ট্রাস্ট গড়ে তুলেছে। মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ১৫০০ মসজিদ, ২১০টি মুসলিম সংস্কৃতি কেন্দ্র, ২০২টি ইসলামি কলেজ, ২০০ মাদ্রাসা নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে ৪০০০ শিক্ষক নিয়োজিত আছেন। ওহাবি মতবাদে বিশ্বাসীদের তত্ত্বাবধানে রয়েছে সৌদি আরবের তিন-চতুর্থাংশ প্রকাশনার ভার। ২০০১ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের ১২০০ মসজিদের প্রায় ৮০ শতাংশ সৌদি টাকায় নির্মিত হয়েছে। ২০১১ সালের পর ফ্রান্সে মসজিদ নির্মাণে ব্যয় করা হয়েছে সৌদি টাকা। বসনিয়ায় কিং ফাহাদ মসজিদ সৌদি টাকায় নির্মিত। ইতালির ৬০ শতাংশ মসজিদের তত্ত্বাবধানে রয়েছে সৌদি ওহাবি আদর্শের মানুষ। কাজাখস্তানে মক্কাভিত্তিক বিশ্ব মুসলিম লীগ নানা মসজিদ নির্মাণ করেছে। ভারতীয় গোয়েন্দা বিভাগের মতে, সৌদি আরব অন্তত ২৪৪ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে মসজিদ ও ইসলামিক কেন্দ্র নির্মাণে। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে কোনো অংশে ব্যতিক্রম নয়। মুসলিম দেশ থেকে নেওয়া যেসব শ্রমিক সৌদি আরবে কাজ শেষ করে দেশে ফিরে আসে তারাও ওহাবি ইসলাম প্রচারে কাজ করে। তাদের অর্থ থেকে যেসব শপিং মল নির্মাণ করা হয়, সেখানে থাকে নারী-পুরুষের জন্য আলাদা ব্যবস্থা। ফলে আজ এমন এক প্রজন্মের জন্ম হচ্ছে যারা ওই ওহাবি আদর্শে দীক্ষিত হচ্ছে এবং যারা অন্য ধর্মবিশ্বাসের প্রতি সহনশীল নয়। এই আদর্শের পরিমণ্ডল এমনই যে এরই অভ্যন্তরে জঙ্গিবাদ ও অসহনশীল নানা মতাদর্শ জন্ম নিতে বাধ্য।

এ ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ধোয়া তুলসী পাতা ভাবা যায় না। ভূকৌশলগত স্বার্থের দিকে লক্ষ রেখে তারা সৌদি ওহাবি আদর্শ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, যদিও পরোক্ষভাবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই তত্পরতা বিশেষভাবে লক্ষণীয় ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে স্নায়ুযুদ্ধের সময়, বিশেষ করে ১৯৭৬ এবং ১৯৯১ সালের মধ্যবর্তীকালে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি প্রতিষ্ঠান US Agency for International Development ১৯৮৪ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যবর্তী সময়ে আফগানিস্তানের স্কুলে পাঠ্যপুস্তক বিতরণের জন্য ৫১ মিলিয়ন ডলার অনুদান দিয়েছিল। তখন পাকিস্তানে জেনারেল জিয়ার শাসন চলছে এবং আফগানিস্তানে সোভিয়েত দখল বলবত্ আছে। সোভিয়েত দখলকালে আঞ্চলিক মুজাহিদিনদের এসব বই (১০০ পৃষ্ঠা এবং সেখানে ৪৩টি হিংস্রতাসম্পন্ন ছবি আছে) পাকিস্তান থেকে আফগানিস্তানে পাচার করার কাজে যুক্ত করা হয়। ওই সব বইয়ে ট্যাংক, মিসাইল, মাইন, কালাশনিকভ রাইফেল এবং বিধর্মীদের বিরুদ্ধে জিহাদের আহ্বান লিপিবদ্ধ রয়েছে। যেসব কোরআনের আয়াত এসব পাঠ্যপুস্তকে ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো সংঘাতের কথা বলে, জিহাদের গুরুত্ব তুলে ধরার জন্য নানা পদ্ধতি এবং উপায় ব্যবহার করা হয়েছে। তালিবান শাসনকালে (১৯৯৬ সাল থেকে) এই বই ব্যবহার করা হয়েছে। আফগানিস্তানে সোভিয়েত দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধরত মুজাহিদদের প্রায় সব গ্রুপই ওহাবি আদর্শের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাদের অর্থ সাহায্য এসেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার বিশ্বস্ত সহযোগী সৌদি আরব থেকে। যারা ইরাকে মার্কিন আক্রমণের (২০০৩) পর উগ্রবাদী হয়ে ওঠে তারাও এ ওহাবি আদর্শের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে শিয়াবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়। দখলদারি সৈন্য অপসারণের পর নব্য প্রতিষ্ঠিত সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অর্থ এসেছে সৌদি আরব থেকে। প্রকৃতপক্ষে ইয়েমেন, ইরাক, সিরিয়া, লেবাননে শিয়া-সুন্নি সংঘর্ষে মূল ভূমিকা পালন করছে সৌদি আরব এবং একধরনের প্রক্সি-যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারিভাবে সাহায্য ছাড়াও জিহাদি যোদ্ধা এবং অস্ত্রশস্ত্রের মূল সরবরাহকারী হচ্ছে সৌদি আরবের ব্যক্তিভিত্তিক দাতারা। দুর্বল ব্যাংকিং নিয়মকানুনের সুযোগ নিয়ে তারা উগ্রবাদীদের তহবিলে অর্থ পাচার করেছে। জাকাতের অনেক অর্থ যায় উগ্রপন্থীদের তহবিলে। এই অর্থ থেকে ধ্বংস করা হচ্ছে সুফি নানা নিদর্শন (যেমন তিম্বুকতু (Timbuktu) বা আফগানিস্তানের বামিয়ানের (Bamiyan Buddhist statues) বৌদ্ধ নিদর্শনগুলো বা শিয়া নানা প্রতিষ্ঠান অথবা পাল্মিরার মতো গ্রিক বা রোমান সভ্যতার অমূল্য নিদর্শন। এ ছাড়া রয়েছে অসংখ্য ইন্টারনেট ওয়েবসাইট। তার মধ্যে উল্লেখ করার মতো যেমন সালাফি টক, ইসলামিক অ্যাওকেনিং, সুন্নি ফোরাম ইত্যাদি। লাখ লাখ মানুষের কাছে ধর্মোপদেশ রেকর্ড করে পৌঁছে দেওয়ার জন্য যে বিপুল পরিমাণের অর্থের প্রয়োজন হয় সেটিও সৌদি আরব জোগান দিয়ে থাকে। যেমন দ্য রেভাইভাল। সেখানে ধর্মীয় বিদ্বেষ এবং উগ্র পন্থার পক্ষে বলা হয়। ডালরিম্পল নামে একজন সাহিত্যিককে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে পাকিস্তানের হাক্কানি মাদ্রাসার মাওলানা সামিউল হক বলেছেন, স্বাধীনতাকালে পাকিস্তানে যত মাদ্রাসা ছিল তার সংখ্যা ২৭ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে আজ দাঁড়িয়েছে ২৪৫ থেকে ৬৮৭০-এ (২০০১ সালের হিসাব) এবং এদের অর্থায়নে সৌদি সাহায্য বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। এই মাদ্রাসাগুলো পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্কিত। মিসরেও মাদ্রাসার সংখ্যা ১৯৮৬ সালে ১৮৫৫ থেকে ৪৩১৪ (ডালরিম্পল ২০০৫) বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রবণতাটি বৈশ্বিক হলেও মাদ্রাসায় ছাত্রদের আধুনিক জীবনের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে এই অর্থায়নের উদ্দেশ্য রাজনৈতিক এবং মূলত শিয়াবিরোধী।

তবে কেবল ধর্মীয় নির্দেশ বা ধর্মীয় প্রচারের অবকাঠামোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে ইসলামিক স্টেটের উত্থানকে বোঝা কঠিন। রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতকে দৃষ্টির বাইরে রেখে কোনো আলোচনা সফলভাবে ইসলামিক স্টেটের মূল চরিত্র উদ্ঘাটন করতে পারে না বলে আমাদের বিশ্বাস। স্লাভাক দার্শনিক জিজেক (Neeva Steve 2015) ইসলামিক স্টেটকে আধুনিক এক জাতীয় সর্বত্যাগবাদী আদর্শের ধারক হিসেবে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। ইসলামিক স্টেট ঐশ্বরিক কোনো আদর্শের ভিত্তিতে গড়ে ওঠেনি। যে বর্বরতার আশ্রয় নিয়ে তারা তাদের রাজনীতি করে তার সঙ্গে ইসলামের সম্পর্ক নেই বলেও তিনি মত দিয়েছেন। এদের মতাদর্শ কঠোর এবং আদি ইসলামিক নিয়ম দিয়ে পরিচালিত নয়। বরং তারা তাদের হাতকে কলুষিত করছে নানা অপকর্ম দিয়ে এবং সেগুলোকে যুক্তিসিদ্ধ করছে ইসলামিক নানা শব্দ ব্যবহার করে। ফলে তাদের প্রকৃত চরিত্র বুঝতে হলে যতটুকু না ধর্ম তার চেয়ে রাজনীতি এবং সামাজিক কারণকে দেখতে হবে। যদি কেবল ধর্মই হতো তাহলে ব্রিটিশ সাংবাদিক মেহেদি হাসান যেমন লিখেছেন সবচেয়ে ধার্মিক মুসলিম সন্ত্রাসী বা জিহাদি হতেন। কিন্তু দেখা গেছে সবচেয়ে ধার্মিক যিনি তিনি জিহাদি হচ্ছেন না। জিহাদি হওয়ার ক্ষেত্রে ধর্ম বিশেষ কোনো ভূমিকা পালন করে না। ধর্ম বা ধর্মগ্রন্থের চেয়ে অনেক বড় কারণ হচ্ছে সামাজিক ও রাজনৈতিক। জিয়া মেরাল তাঁর The Question of Theodicy and Jihad-এ অথবা কারেন আর্মস্ট্রং তাঁর প্রবন্ধে জঙ্গিবাদের উত্থানের প্রধান কারণ হিসেবে সামাজিক এবং বিশ্বরাজনীতিকে দোষারোপ করেছেন। জিয়া মেরাল লিখেছেন, ধর্মীয় উগ্রবাদীরা তাদের পথকে ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিয়ে যুক্তিসিদ্ধ করে বটে কিন্তু সেটিই উগ্রবাদের একমাত্র কারণ নয়। ধর্মই কেবল সহিংস সেটি ভাবা ভুল। ইতিহাসে ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ, মানবতবাদী আদর্শ, জাতীয়তাবাদী আদর্শ, সমাজতন্ত্র বা উদারনীতিবাদের মতো প্রতিটি আদর্শ সহিংসতাকে ব্যবহার করেছে তাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য। তারা সবাই একধরনের কাল্পনিক সমাজ গড়তে চেয়েছে। কারেন আর্মস্ট্রং তাঁর প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, সহিংসতা এমনকি গণহত্যা যেটি আমরা লক্ষ করি ইসলামিক স্টেটের কার্যকলাপে সেটি কেবল যে আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে তা নয়। ১৭৮৯-১৭৯৩ সালের ফরাসি বিপ্লবে জ্যাকবিনরা ১৭ হাজার পুরুষ, নারী এবং শিশুকে জনসমক্ষে হত্যা করেছিল। প্রথম মহাযুদ্ধে তুর্কি বাহিনী দশ লাখ আর্মেনীয় নারী-শিশুকে হত্যা করেছিল। সেই গণহত্যার ওপর আধুনিক তুর্কি রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে। সোভিয়েত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বা খেমাররুজ রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করতে গিয়ে বা দুর্নীতি থেকে সমাজকে মুক্ত করতে গিয়ে সন্ত্রাস ও গণহত্যা ঘটেছে। ১৯২২ সালে কামাল আতাতুর্ক গ্রিক ভাষাভাষি তুর্কিদের তার দেশ থেকে বের করে দিয়েছিলেন। দ্য আটলান্টিক পত্রিকায় ক্যাথি গিলসিনান লিখেছেন আইসিস ইসলাম ধর্মের যে ব্যাখ্যা দেয় তা থেকে হিংস্রতা ও উগ্রবাদের জন্ম হয় না। উগ্রবাদের জন্ম হয় ওই গ্রুপের মনোজগতের উগ্রতা থেকে, যার ভিত্তি রাজনীতিতে, ধর্ম কারণ নয়। ফলে আঞ্চলিক রাজনীতি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা বিশ্বের প্রভুত্বের রাজনীতি এবং সামাজিক দিক বিশেষ করে নানা ধরনের ইসলামবিরোধী প্রবণতা, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং তার মূর্ত প্রতীকগুলোকে হিসাবে না নিয়ে জঙ্গিবাদকে বোঝা কঠিন হবে। এই তিনটি প্রবণতার মিলন থেকে আজকের ইসলামি জঙ্গিবাদের আবির্ভাব হয়েছে, যার মূর্ত প্রকাশ হচ্ছে ইসলামিক স্টেট। সে কারণে এই আন্দোলনকে দেখা উচিত একধরনের পবিত্র এবং অপবিত্রের মিশ্রণ (Hybrid of the Sacred and the Profane) হিসেবে (দেখুন Niva Steve, 20 February 2015 ব্লগ থেকে নেওয়া)। পবিত্র এই কারণে যে তাদের কার্যকলাপে ধর্মের দিক যে নেই তা নয়। কিন্তু তার চরিত্রে অপবিত্র দিক আছে। কারণ নানা ধরনের স্থানীয়, জাতীয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, স্বার্থ, ষড়যন্ত্র, কুট চক্রান্ত তাকে ছাড়েনি।

জাতিরাষ্ট্রের সংকট

‘ইসলামি রাষ্ট্রের’ উদ্ভবের সঙ্গে বেশ কয়েকটি সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণ যুক্ত আছে। সেই কারণগুলোর মধ্যে তিনটি প্রধান বলে মনে করি। একটি কারণ, তৃতীয় বিশ্বে আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের সংকট। দ্বিতীয়, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্যবাদী বৈদেশিক নীতি। তৃতীয় হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক রাজনীতি। ইসলামিক স্টেটের জন্ম হয়েছে ওই তিন কারণের মিথস্ক্রিয়া থেকে। এই মিথস্ক্রিয়ার শুরু বিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশক থেকে। সে কারণে আমি ওই সময়কালকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখি। ১৯৭৮ সালে ইরানে আয়াতুল্লাহ খোমেনির সফল ইসলামি বিপ্লব, ১৯৭৮ সালে সোভিয়েত সামরিক বাহিনীর আফগানিস্তান দখল, ১৯৭৮ সালে পাকিস্তানে জিয়াউল হকের সামরিক অভ্যুত্থান এবং ১৯৭৩ সালে লিও স্ট্রস নামে মার্কিন রাজনৈতিক চিন্তাবিদের মৃত্যু এই ধারাবাহিকতার খণ্ড খণ্ড রূপ। ১৯৭৮ সালের ইরান বিপ্লব আধুনিক রাষ্ট্রের সংকটের কারণে হয়েছিল। রেজা শাহ পাহলভি যে আধুনিক ইরান গড়ে তুলেছিলেন সেটি ইরানি জাতীয়তাবাদের ওপর ভর করে হলেও ওই শাসন ছিল দুর্নীতিগ্রস্ত, পাশ্চাত্য শক্তির ওপর নির্ভরশীল এবং জাতি পরিচয় বর্জিত। ১৯৭৮ সালে আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের কারণ আফগান জাতিরাষ্ট্রের সংকট থেকে। সমাজতন্ত্রের অধীনে বহু জাতিভিত্তিক একটি দেশকে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের অধীন করার প্রক্রিয়া ব্যর্থ হওয়ার কারণে সোভিয়েত সৈন্যের উপস্থিতি সে সময় জরুরি হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে ওই জাতিরাষ্ট্রের সংকট থেকে। যিনি ক্ষমতা গ্রহণ করেন, তিনি প্রতিষ্ঠিত জাতিরাষ্ট্রের ভিতকে ভেঙে দিয়ে শরিয়া আইন প্রবর্তনের ব্যবস্থা নেন। ১৯৭৩ সালে লিও স্ট্রসের মৃত্যু হয়। ওই ব্যক্তির দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে ইউরোপীয় জাতিরাষ্ট্রের সংকটের সম্পর্ক আছে।

জাতিরাষ্ট্রের এই সংকট কেবল ইরান, আফগানিস্তান বা পাকিস্তানে অনুভূত হয়নি। সংকটের অশনিসংকেত আজ শোনা যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে সবখানে। কী কারণে পুরোনো জাতিরাষ্ট্রের সংকট দেখা দিল তার অন্তর্নিহিত কারণ অনুসন্ধানের কাজটি কঠিন ভাবার যৌক্তিকতা নেই। আধুনিক এবং ধর্মনিরপেক্ষ জাতিরাষ্ট্র ইউরোপ ও আমেরিকায় আধুনিক দর্শন, জীবনধারা এবং রাজনৈতিক দর্শন থেকে জন্ম নিয়েছিল; বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ঠিক যখন ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। ইউরোপের রাষ্ট্রপুঞ্জ সবচেয়ে সফল রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে আসে সপ্তদশ শতাব্দীতে ১৬৪৮ সালে ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তি স্বাক্ষরের পর। তার প্রভাবে এশিয়া, আফ্রিকা বা দক্ষিণ আমেরিকার অনুন্নত অঞ্চলে ইউরোপের অনুকরণে জাতিরাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। এই জাতিরাষ্ট্রের গঠন কিন্তু এমন সব অঞ্চলে ঘটেছিল, যেখানে জাতি বোধ হয় অনুপস্থিত ছিল অথবা প্রকৃত জাতিবোধকে সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের কারণে ধ্বংস করা হয়েছিল কৃত্রিমভাবে। সেটি আমরা লক্ষ করেছি ভারতবর্ষে (ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম দিয়ে), ডুরান্ড লাইন দিয়ে আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানের মধ্যে বিভেদরেখা এঁকে, কৃত্রিম রাষ্ট্রের জন্ম দিয়ে অথবা মধ্যপ্রাচ্যে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর যেভাবে জাতিরাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল তার মধ্য দিয়ে। ঔপনিবেশিক শক্তি প্রথম মহাযুদ্ধের পর তুরস্কের খিলাফতের পতন ঘটিয়ে যেভাবে জাতিরাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছিল, তাতে করে জাতীয়তাবাদ গড়ে ওঠেনি। একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে যে জাতিরাষ্ট্রকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল সেটি ছিল আপাদমস্তক কৃত্রিম।

দ্বিতীয়ত, কয়েক যুগ ধরে জাতীয়তাবাদের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা জাতিরাষ্ট্র পরিণত হয়েছে স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায়। এসব রাষ্ট্র উনবিংশ শতাব্দীতে বেশ প্রভাবশালী ছিল। গণতন্ত্রের নাম ব্যবহার করা হলেও সেসব রাষ্ট্র শাসিত হয়েছে স্বৈরতান্ত্রিক কায়দায়। প্রতিটি দেশ পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতরা দেশ শাসন করেছে আইনের ঊর্ধ্বে দাঁড়িয়ে। সেসব দেশের প্রতিটি সমাজ দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারের অধীনে আজ নিপীড়িত হচ্ছে। এই বিশেষ শ্রেণিকে মধ্যপ্রাচ্যে বলা হতো হোগ্রা (দেখুন Sachdev, Mahesh 2015)। এরা শক্তি দিয়ে শাসন করায় বিদ্রোহ দমনে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। ১৯৫০ সাল থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে এসব রাষ্ট্রের সরকার হয় সোভিয়েত অথবা মার্কিন সাহায্য নিয়ে টিকে ছিল। ফলে তাদের অভ্যন্তরীণ চরিত্র ও দুর্বলতা প্রকাশ পায়নি। বরং ঢাকা পড়ে ছিল ঠান্ডা যুদ্ধের দ্বিমুখী সংঘাতের আড়ালে (Patrik Cockburn, 28 June 2016)। আজ সেই পর্দা সরে গেছে। আজ তাদের সংকট দিবালোকের মতো স্বচ্ছ ও পরিষ্কার।

একদা ব্রিটিশ ও ফরাসিদের ষড়যন্ত্রে মধ্যপ্রাচ্যে যে ধরনের জাতিরাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল (Sykes-Picot Agreement in 1916) সেসব জাতিরাষ্ট্রের সীমানাকে ইসলামিক রাষ্ট্র ভেঙে দিয়ে নতুন ইসলামিক রাষ্ট্রের ভিত গড়তে চায়। এতকাল টিকে থাকলেও জাতিরাষ্ট্রের অন্তঃসারশূন্যতা আজ ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে এবং সে ক্ষেত্রে ইসলামিক স্টেট বা তালিবান বা আল-কায়েদার মতো ঠিকানাবিহীন সব সংগঠনের তত্পরতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। জাতিরাষ্ট্রের ব্যর্থতার যে ব্যাখ্যা ইসলামিক স্টেটের কাছ থেকে আমরা পাই তার সঙ্গে আমরা একমত নাও হতে পারি। কিন্তু জাতিরাষ্ট্রের ব্যর্থতা যে মিথ্যা নয়, সেটি তো সত্য। তাদের ব্যাখ্যা হচ্ছে মানুষনির্মিত নিয়মকানুন ব্যর্থ হতে বাধ্য এবং সে কারণে মুসলমানদের জন্য সেসব আইনকানুন বা রাষ্ট্রকাঠামো অগ্রহণযোগ্য। আধুনিকতার বিরুদ্ধে ইসলামিক স্টেটের এই যে সংগ্রাম তাকে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। কারণ যারা আজ ইসলামি সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত, তারা ইসলামি রাষ্ট্রের মধ্যে তাদের পূর্বপুরুষের ইতিহাস খুঁজছে, তাদের ঐতিহ্য ধারণ করতে চাইছে, তাদের বীরদের আদর্শকে প্রতিফলিত করতে চেষ্টা করছে। নোয়াম চমস্কির মতে, এরা যে সম্পূর্ণভাবে কোরআনের আদেশ পালন করার জন্য জিহাদে অংশ নিচ্ছে তা নয়। তারা অংশগ্রহণ করছে এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতায় অংশ নেওয়ার জন্য। ইসলামিক স্টেটের মতো ধর্মীয় ও গোত্রভিত্তিক আত্মপরিচয়কে প্রাধান্য দিয়ে যে আন্দোলনের ধারা আজ গড়ে উঠেছে সেটি একমাত্র মধ্যপ্রাচ্যীয় দেশগুলোর প্রবণতা হিসেবে যদি দেখা হয় তাহলে ভুল করা হবে। এটি আজ বিশ্বব্যাপী একটি প্রবণতা। ইউরোপে নানা ধরনের আন্দোলনের মূলে আমরা একই প্রবণতা বা কার্যকারণ সম্পর্ক লক্ষ করছি। বস্তুত সবখানেই আজ আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের ভাঙনের অশনিসংকেত লক্ষ করা যাচ্ছে। সেখানে সংখ্যালঘু ইস্যু আজ প্রধান একটি ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। সংখ্যালঘুদের ভূখণ্ড থেকে বের করে নতুন ধাঁচের রাষ্ট্র গড়ে তোলা এবং একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করা এসব আন্দোলনের মুখ্য উদ্দেশ্য। ভারতে বিজেপির উদ্দেশ্য ওই। বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর উদ্দেশ্য হিন্দুদের তাদের মাতৃভূমি থেকে উচ্ছেদ করা। মিয়ানমারে বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ রোহিঙ্গাদের উত্খাত করতে চায়। পাকিস্তানে সুন্নিরা মোহাজিরদের উত্খাত করতে আগ্রহী। আফগানিস্তানে হাজরা সম্প্রদায়কে দেশান্তরিত করা সুন্নি সম্প্রদায়ের প্রধান লক্ষ্য। শিয়াপ্রধান দেশকে সুন্নিমুক্ত করা, সুন্নিপ্রধান দেশকে শিয়ামুক্ত করা, ইউরোপকে মুসলিমমুক্ত করা আজ সামাজিক আন্দোলনের বিশেষ প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে এসব প্রবণতা থেকে বোঝা যায় যে, যে জাতিরাষ্ট্র আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেই জাতিরাষ্ট্র আজ আদর্শগতভাবে গভীর সংকটে নিমজ্জিত হয়ে আছে। তার কাঠামো ভেঙে পড়ছে। আর সেই সংকটকে তুলে ধরছে ইসলামিক স্টেট বা আল-কায়েদা বা তালিবানের মতো একনায়কতান্ত্রিক ধর্মভিত্তিক, গোষ্ঠীভিত্তিক সব আন্দোলন। এরাই আজকের দিনের সাম্রাজ্যবিরোধী জাতীয়তাবাদ ভিত্তিক স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধ শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। তাদের এই প্রতিবাদের ভাষা কেন ধর্মীয় হলো তার কারণ যে নেই তা নয়। জাতিরাষ্ট্রের যাঁরা এতকাল কর্ণধার ছিলেন তাঁরা তাঁদের স্বৈরাচারী শাসনকে টিকিয়ে রাখতে সমাজতান্ত্রিক শক্তিকে ধ্বংস করেছে। তারা জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধ শক্তিকেও ধ্বংস করেছে এবং মাঝেমধ্যে ধর্মীয় শক্তির সঙ্গে আঁতাত করেছে নিজের কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখতে। সে কারণে আজ তাদের দুর্বল জায়গাটি পূর্ণ করার একমাত্র শক্তি, যা অবশিষ্ট আছে তা হচ্ছে ধর্মীয়, আমাদের ক্ষেত্রে ইসলামি, সে জঙ্গিবাদ হোক বা হোক নরম কোনো ইসলামি আন্দোলন।

মার্কিন আধিপত্যবাদ

জাতিরাষ্ট্রের সংকট কেবল ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যকে আঘাত করেনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ ওই একই সংকটকাল অতিক্রম করছে, যদিও তাদের ক্ষেত্রে সংকটের চরিত্র ভিন্ন। ইতিমধ্যে আমরা মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী লিও স্ট্রসের নাম উল্লেখ করেছি ৭০ দশকের জাতিরাষ্ট্রের সংকটের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে। লিও স্ট্রস ইউরোপীয় জাতিরাষ্ট্রের সংকটকে একটি বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছিলেন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংকটকে উদারনীতিবাদী দর্শনের সঙ্গে যুক্ত করে দেখেছিলেন। পশ্চিমা বিশ্বের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা বস্তুত ওই দর্শনের ওপর ভর করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। উদারনীতির সংকট কেন হলো তার কারণ আছে। উদারনীতিভিত্তিক সমাজে মানুষ ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়, মানুষ তার প্রাপ্য নিয়ে উত্সাহিত থাকে, দায়িত্বের কথা ভুলে যায়। ফলে সমাজের সংহতি বিনষ্ট হয় এবং মানুষ স্বার্থপরে পরিণত হয়। ওই সংকট নিরসনের পথ কী? লিও স্ট্রস রাজনীতিবিদের পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা যেন এমন সব কল্পকথা সৃষ্টি করেন (প্লেটোর নোবেল লাই) যেগুলো মিথ্যার ওপর প্রতিষ্ঠিত কিন্তু মানুষ সত্য হিসেবে সেগুলোকে গ্রহণ করে। স্ট্রসের প্রধান বক্তব্য হচ্ছে এমন রাজনৈতিক কর্মসূচি হাতে নেওয়া প্রয়োজন, যেখানে সাধারণ মানুষ বুঝবে একরকমভাবে। আর মুষ্টিমেয় এলিট গোষ্ঠী বুঝবে ভিন্নভাবে। নব্য রক্ষণশীল এই রাজনৈতিক আন্দোলন সত্তরের দশকের মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। রোনাল্ড রিগ্যান, জর্জ বুশ ছাড়া আরও বাদবাকি যেসব নিওকন মার্কিন নীতিকে প্রভাবিত করেছে তাঁদের মধ্যে পল উলফভিচ, জন বলটন, রিচার্ড পার্ল, পল ব্রেমার, ডিক চেনি, ডোনাল্ড রামসফেলড, সিনেটর হেনরি জ্যকসন প্রমুখ। তাঁরা জাতিরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সংকটকে বুঝেছিলেন এবং সেই সংকট থেকে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি সাময়িকভাবে হলেও সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন মিথ্যার আশ্রয়ে।

এ ক্ষেত্রে সত্তর দশকের মার্কিন বৈদেশিক নীতির সঙ্গে ইসলামিক স্টেটের উত্থানের গভীর সম্পর্ক অস্বীকার করা কঠিন। স্ট্রসের রাজনৈতিক আদর্শ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতিতে বাস্তবায়িত হওয়ার কারণে সাদ্দাম হোসেনের উত্খাত সম্ভব হয়েছিল। গণবিধ্বংসী অস্ত্র বা রাসায়নিক অস্ত্র বা নয়-এগারো আক্রমণে সাদ্দাম হোসেনের কোনো সম্পৃক্ততা না থাকার সত্য যে ওয়াশিংটনের কাছে অজানা ছিল তা নয়। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মহত্ মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে সাদ্দাম হোসেনকে উত্খাত করে। লিবিয়ায় গাদ্দাফিকে উত্খাত করা হয় ওই একই কারণ দেখিয়ে। এভাবে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে সুপরিকল্পিতভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এসব দেশের রাষ্ট্রকাঠামোকে ধ্বংস করেছে। আফগানিস্তানকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়। মার্কিন নাগরিকদের দৃষ্টিকে দেশীয় সংকট থেকে বের করে অন্যদিকে নেওয়া যদিও এ সবকিছুর মূল উদ্দেশ্য ছিল। এই নীতির আরও একটি দিক ছিল ইসলাম ধর্মকে জঙ্গিবাদী রূপ দেওয়া। তার কয়েকটি উদাহরণ এখানে দেওয়া হলো। ইসলামের ইতিহাসে জিহাদ শব্দকে কখনো জঙ্গি প্রত্যয় হিসেবে ব্যবহার করা হয়নি। ১৯৮০ সালের দিকে পাকিস্তানে জেনারেল জিয়াউল হক ক্ষমতায় আসার পর এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার সহযোগিতায় ‘সৃষ্টিকর্তাহীন’ কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে এক সশস্ত্র আন্দোলন গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের আফগানিস্তানে সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য সিআইএ রিক্রুট করে এবং প্রশিক্ষণ দেয়। এই অপারেশনের নাম দেওয়া হয় অপারেশন সাইক্লোন। রোনাল্ড রিগ্যান, তত্কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট মুজাহিদিনদের সঙ্গে তাঁর ওভাল অফিসে সাক্ষাত্ করেন। ১৯৯০ সালে গালফ যুদ্ধের সময় আমেরিকা সৌদি আরবে সৈন্য পাঠিয়েছিল কুয়েত আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য। সে যুদ্ধে সাদ্দাম পরাজিত হয়েছিলেন। কিন্তু মার্কিন সৈন্যরা ইসলামের সবচেয়ে পবিত্র স্থান মক্কা নগরী ছেড়ে যায়নি। সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তান ত্যাগ করার পর আফগানিস্তানে মুজাহিদিনদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় এবং তালিবান বাহিনী ক্ষমতায় আসে। তারা আফগানিস্তানে মধ্যযুগীয় এক ধর্মীয় রাষ্ট্র গড়ে তোলে। বস্তুত সেটিই ছিল ইসলামিক স্টেটের প্রথম ট্রায়েল বা ফলস স্টার্ট।

ইসলামিক স্টেটের জন্ম হয়েছে জর্জ বুশের হাতে। ক্ষমতায় থাকাকালে সিরিয়াকে তিনি অ্যাক্সিস অব এভিলের সঙ্গে যুক্ত করে মিথ্যা প্রচার চালিয়েছিলেন। বুশ সিরিয়া পরিস্থিতিকে অশান্ত করার নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। উইকিলিকসে প্রকাশিত স্টেট ডিপার্টমেন্টের নথিপত্রে দেখা যায়, ২০০৬ সালে মার্কিন দূতাবাস সিরিয়াকে নানাভাবে অস্থিতিশীল করার বেশ কিছু পথ বাতলে দেয়। তার মধ্যে সৌদি আরব ও মিসরের সঙ্গে মিলে সিরিয়ার গোত্রবিভক্তিকে তীব্র করা, কুর্দি সুন্নিদের সিরিয়া সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো ছিল অন্যতম। এই কৌশল বাস্তবায়নের জন্য ন্যাশনাল স্যালভেশন ফ্রন্ট নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলা হয়। ওই সংগঠনের নেতা আবুল হালিম খাদ্দামকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দেয়। ২০০৬ সালের ওই রিপোর্টে উল্লেখ আছে যে আমেরিকা ৫ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে আসাদবিরোধী সংসদ সদস্যদের পেছনে। লিবিয়া থেকে তুরস্ক হয়ে সিরিয়ায় যে সমরাস্ত্র পাচার হয়েছে তার দায়িত্বে ছিল সিআইএ। ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, ত্রিপলিতে নিহত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মৃত্যুর আগে আল-মারফা শিপিং অ্যান্ড মেরিটাইম সার্ভিসেসের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। এটি ত্রিপলিভিত্তিক একটি কোম্পানি, যেটি অবৈধ অস্ত্র পাঠানোর কাজে নিয়োজিত ছিল (সেমর এম হার্শ, ৭ জানুয়ারি ২০১৬)। উইকিলিকস প্রকাশিত তথ্যে আরও জানা যায়, ২০০৬ ও ২০১০ সালের মধ্যে স্টেট ডিপার্টমেন্ট নানা ধরনের ইসলামিক গ্রুপকে ৬ মিলিয়ন ডলার সাহায্য দিয়েছে। লন্ডনে প্রতিষ্ঠিত আসাদবিরোধী তথাকথিত দ্য মুভমেন্ট ফর জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এমজেডি) আন্দোলনকে অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করেছে। যারা ইসলামি জঙ্গি তাদের নরম ও উদারনৈতিক হিসেবে প্রচার করে তাদের হাতে অত্যাধুনিক অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়েছে। সেগুলো অবশেষে পৌঁছেছে ইসলামিক স্টেটের যোদ্ধাদের হাতে। সেমর হার্শ নামে প্রখ্যাত সাংবাদিক ‘দ্য র্যাট লাইন’ নামে প্রবন্ধে লিবিয়া থেকে তুরস্ক হয়ে সিরিয়াতে অস্ত্র পাচারের সঙ্গে সিআইএকে জড়িত করেছেন। এই অপারেশনের নেতৃত্বে ছিলেন সিআইএর তত্কালীন প্রধান ডেভিড পেত্রিয়াস এবং বেনগাজি শহরের মার্কিন কনস্যুলেট (নিলস উইলিয়ামসন, ২০১৪)। এ ছাড়া ওই একই প্রবন্ধে ইসলামিক স্টেটের খলিফা বাগদাদি এবং ইসলামিক স্টেটের যুদ্ধমন্ত্রী শিসানির সঙ্গে সিআইএ ও এফবিআইয়ের যোগসূত্রের কথাও উল্লেখ আছে।

বস্তুত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতিহাস থেকে কোনো শিক্ষা নেয়নি। প্রখ্যাত মার্কিন চিন্তাবিদ গোর ভিডাল আমেরিকাকে কেন ইউনাইটেড স্টেটস অব এম্নেসিয়া বলেছেন তার কারণ যে নেই তা নয়। সেই একই উপলব্ধি আমরা আরও লক্ষ করি চীনা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে। তিনি আরও একটু বাড়িয়ে আমেরিকানদের সম্পর্কে বলেছেন যে তারা এমন এক জাতি যার বিশেষত্ব হচ্ছে ঐতিহাসিক জ্ঞানের অভাব। কামারের ভারী হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করার মতো করে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আমেরিকা যে সামরিক সংগ্রাম আফগানিস্তানের মতো ক্ষুদ্র একটি দেশে ২০০১ সালে শুরু করেছিল তার ফলে ওই জঙ্গিবাদ কি নিঃশেষ হয়েছে? হয়নি। বরং তার আগুন ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের বেশির ভাগ অঞ্চলে। নোয়াম চমস্কি লিখেছেন (চমস্কি ২০১৬) বস্তুত ইরাকে মার্কিন অভিযানের পর বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার হিসেবে জঙ্গিবাদী আক্রমণ সাত গুণ বেড়ে গেছে। ইরাক, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে গত ১২ বছরে অত্যন্ত রক্ষণশীল হিসেবে ১.৩ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। অসলোভিত্তিক শান্তি গবেষণা ইনস্টিটিউটের হিসাবমতে, এর কারণ অভ্যন্তরীণ। যেসব অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বিগত বছরগুলোতে আমরা লক্ষ করেছি সেগুলো ৯৮ শতাংশ ক্ষেত্রে সৃষ্টি হয়েছে মার্কিন নীতির কারণে। তারা বাইরে থেকে তাদের দেওয়া নিয়মকানুন কোনো দেশের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে (চমস্কি ২০১৬ থেকে নেওয়া)। একটি উদাহরণ ব্যবহার করে নোয়াম চমস্কি দেখিয়েছেন যে আমেরিকা যদি ইসলামিক স্টেটের খলিফা বাগদাদিকে হত্যা করতে সক্ষম হয় তাহলেও কিন্তু আল-কায়েদা এবং ইসলামিক স্টেট (বর্তমানে তাদের মধ্যে বিরোধ আছে) ধ্বংস হবে না। বরং তারা এক হয়ে অতি শক্তিশালী এক জঙ্গি বাহিনী গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। এই দুই সংগঠনের মধ্যে বর্তমানে যে মতবিরোধ সেটি নিতান্তই ব্যক্তিগত এবং সেটি দুই নেতা বাগদাদি এবং আইমান জাওয়াহিরির মধ্যেকার দ্বন্দ্ব্ব। বাগদাদির বিদায়ের পর ইসলামিক স্টেটের পরবর্তী নেতা আল-কায়েদার সঙ্গে আঁতাতে কোনো বাধা দেখবে (চমস্কি ২০১৬) কি না সে বিষয়ে সন্দেহ আছে।

আঞ্চলিক রাজনীতি

প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক নিল ফার্গুসন ২০০১ সালে নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার আক্রমণের পর ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে পরবর্তী বিশ্ব সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হবে ইসলামের অভ্যন্তরীণ দুই গোষ্ঠী শিয়া ও সুন্নি সম্প্রদায়ের দ্বন্দ্ব। সে সময় ফার্গুসনের ওই উক্তিকে অনেকেই পাশ কাটিয়ে গিয়েছিলেন। তখন ভিন্ন এক সংঘাতের সম্ভাবনা নিয়ে অনেকে ব্যস্ত ছিলেন। রাজনীতি বিজ্ঞানের প্রথিতযশা অধ্যাপক সামুয়েল হান্টিংটনের তত্ত্ব সে সময় ভবিষ্যত্ বিশ্ব সংঘাতের চরিত্রকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আন্তঃসভ্যতার সংঘর্ষের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছিল। সেই আন্তঃসভ্যতার সংঘাত বলতে তিনি ইসলামভিত্তিক সভ্যতার সঙ্গে খ্রিষ্টীয় ধর্মভিত্তিক সভ্যতার মধ্যকার দ্বন্দ্বকে বুঝেছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ঘটনা কিন্তু আন্তঃসভ্যতার চেয়ে শিয়া-সুন্নি বিভেদকে আজকের অশান্ত রাজনীতির উত্স হিসেবে প্রমাণিত করছে বলেই মনে হয়। এই দ্বন্দ্বকে ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে আমরা সংঘাতের জন্ম দিতে দেখেছি, যদিও এর পেছনে প্রকৃত কারণ হচ্ছে ক্ষমতার লড়াই। ইরাক ও সিরিয়াকে কেন্দ্র করে যে গৃহযুদ্ধ আজ আমরা প্রত্যক্ষ করছি (একে গৃহযুদ্ধ না বলে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সংঘাত বলা উচিত) সেটি ওই অঞ্চলের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব নিয়ে ঘটেছে। ১৯৭৯ সালে ইরানে শিয়া ইসলামি বিপ্লব এবং বিশেষ করে ইরাকে মার্কিন দখল এবং সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতা থেকে উত্খাত করার পর (২০০৩ সালে) মধ্যপ্রাচ্য কার্যত দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। ইরান, ইরাক, সিরিয়াকে (সেখানে আলউয়ি নামে সংখ্যালঘিষ্ঠ শিয়া গ্রুপ শাসন করে) নিয়ে এক শিয়া শক্তির আঁতাত গড়ে ওঠে। ওই আঁতাতের বাকি অংশ লেবাননের হিজবুল্লাহ বাহিনীসহ আরও কিছু স্থানীয় শিয়া বাহিনী। অন্যদিকে সুন্নিপ্রধান দেশ সৌদি আরব, গালফ রাষ্ট্র এবং অন্যান্য দেশ শিয়া উত্থানকে তাদের আঞ্চলিক ক্ষমতার প্রতি হুমকি হিসেবে দেখে। এর সঙ্গে আরও যুক্ত রয়েছে নানা ধরনের স্থানীয় ও আঞ্চলিক কিছু দ্বন্দ্ব। তারই মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছে অবিশ্বাস্যভাবে জঙ্গি এবং হিংস্র এই ‘ইসলামিক স্টেট’ভিত্তিক আন্দোলন।

এই বিরোধের শেকড় অতীত ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। সুন্নি ও শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে এই দ্বন্দ্ব যতটুকু না ধর্মীয় তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতাকেন্দ্রিক এবং আঞ্চলিক রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করার উপায় ব্যতীত কিছু নয়। এ দ্বন্দ্ব প্রাথমিক পর্যায়ে যে ধর্মীয় পার্থক্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল সেটি পরবর্তী সময়ে আরও গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে। যদিও তাদের বিশ্বাসজগতের মধ্যে পার্থক্য খুবই সামান্য। হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মৃত্যুর পর ইসলামিক বিশ্ব খলিফা দ্বারা শাসিত হতো। শেষ খলিফা ছিলেন নবীর জামাতা আলী। আলীর মৃত্যুর পর নেতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মুসলিম বিশ্ব দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। এক গ্রুপ মুসলিম বিশ্বের নেতা হিসেবে নবীর উত্তরসূরি বা আলীর পুত্রকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পক্ষে ছিল। অন্য অংশের মতে মুসলিম বিশ্বের নেতা যে কেউ হতে পারেন, যদি সেই নেতা রসুলের সুন্না অনুসরণ করে খিলাফত শাসন করে। এই গ্রুপের প্রথম নেতা ছিলেন মুয়াবিয়া। সিরিয়ায় তিনি উমাইয়া বংশের শাসন (৬৬১-৭৫০) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই বংশ পরবর্তী সময়ে প্রতিপক্ষ আব্বাসীয় বংশের হাতে (৭৫০ থেকে ১২৫৮ সাল পর্যন্ত শাসন করার পর) পরাজিত হয়। উমাইয়ারা সুন্নি ইসলামের অনুসারী অন্যদিকে আব্বাসীয়রা শিয়া মুসলমান। শিয়া-সুন্নি এই বিভেদ আব্বাসীয় এবং উমাইয়া শাসন চরিত্রে প্রতিফলিত হয়েছে। উমাইয়া শাসনের সময় খিলফাতের বিশেষ কোনো বিস্তার লক্ষ করা যায়নি। যত বিস্তার ঘটেছে সেটি আব্বাসীয় আমলে। যদিও ইসলামের ধর্মীয় নীতিমালার মূল ভিত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উমাইয়া শাসনের প্রধান ভূমিকা ছিল বলে অনেকের ধারণা। উমাইয়াদের মূল লক্ষ্য ছিল সিরিয়া, ইসরায়েল, লেবানন, মিসর ইত্যাদি অঞ্চলে তাদের প্রভাব বিস্তার করা। উমাইয়া শাসনকালে নারীদের বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হতো। নারীরা কোনো হিজাব পরত না। তাদের মতামত ও উপদেশকে গুরুত্ব দেওয়া হতো। আব্বাসীয় শাসনামলে নারীদের এই মর্যাদা দেওয়া হয়নি। উমাইয়া শাসনামলে ধর্মান্তরিত করার ক্ষেত্রে তেমন চাপ ছিল না। আরও একটি বিভেদ লক্ষ করার মতো। উমাইয়ারা আক্রমণাত্মক সামরিক দখলের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। অন্যদিকে আব্বাসীয়রা গুরুত্ব দিয়েছে জ্ঞানের ওপর।

আজকের মধ্যপ্রাচ্যে যে সংঘর্ষ চলছে তার মূলে রয়েছে সৌদি আরব ও ইরানের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার দ্বন্দ্ব। সৌদি আরব সুন্নি মুসলমানদের পবিত্র স্থান মক্কা শরিফের রক্ষাকর্তা। সে কারণে সুন্নি বিশ্বের নেতা। ইরান শিয়া মুসলমানদের নেতা (১৩ শতাংশ মুসলমানের)। এরা প্রত্যেকে ধর্মকে প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। সিরিয়া থেকে শুরু করে ইয়েমেন, লেবানন, বাহরাইন, ইরাকসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্য সব দেশ এই দুই শক্তির দ্বন্দ্বে জর্জরিত। এই দুই দেশের দ্বন্দ্বই সেখানকার রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। এসব সংঘর্ষের কারণে আজ ৬ মিলিয়ন উদ্বাস্তু সৃষ্টি হয়েছে। তাদের মধ্যেকার ঠান্ডা যুদ্ধ গোটা বিশ্বকে প্রভাবিত করছে। ১৯৭৯ সালে ইরানি বিপ্লবের পর থেকে সৌদি আরব তার প্রভাব ও শক্তিকে বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে ওহাবি ইসলামের ধারাকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রকল্প হাতে নেয়, যার কিছু দিক আমরা ইতিমধ্যে উল্লেখ করেছি। একইভাবে ইরান তার শক্তি বৃদ্ধি করেছে শিয়া অধ্যুষিত দেশে। ইসলামের দুই সম্প্রদায়ের এই দ্বন্দ্ব ইতিহাসে প্রায় সব ক্ষেত্রে আমরা লক্ষ করেছি। স্থানীয় ক্ষমতার লড়াইয়ে আন্তর্দেশীয় সম্পর্কে নানা মতবিরোধ মেটাতে এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন প্রভাবিত হয়েছে শিয়া-সুন্নি বিভেদ দিয়ে। সেটি ইসলামিক স্টেটের উদ্ভবে লক্ষ করা যায়। ২০০১ সালে আফগানিস্তান আক্রমণের পর আল-কায়েদার শক্তি যখন একেবারে নিঃশেষিত তখন এই শিয়া-সুন্নি বিভেদকে কাজে লাগানো হয়েছিল। তখন ইরাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দখলদারি সৈন্যের নৃশংসতা চলছে। আবু মুসাব আল জারকাই নামের এক জর্ডানি এবং আল-কায়েদার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট (তার অতীত খুব সুবিধার ছিল না। তিনি ছিলেন চোর এবং নারী কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত) একটি গ্রুপ গড়ে তোলেন, যার নাম দেওয়া হয় আর্মি অব দ্য শ্যাম। বিন লাদেন তাকে আল-কায়েদার সঙ্গে এক হতে বলেন। তিনি সেটি অগ্রাহ্য করেন। পরে তার সংগঠনের নাম দেওয়া হয় আল-কায়েদা ইন ইরাক (২০০৪)। তিনি মার্কিন দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণ না চালিয়ে শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বকে চাঙা করার জন্য বিশেষ তত্পর হয়েছিলেন। ২০০৩ সালে নাজাফ শহরের ইমাম আলী মসজিদে বোমা ফাটিয়ে আয়াতুল্লা মুহাম্মদ বকর আল হাকিমকে হত্যা করা হয়। সেই সঙ্গে মৃত্যু হয় আরও ১২৫ জনের (লরেন্স রাইট ২০১৪)। ফলে আজকের ইসলামিক স্টেটের উত্থানে জাতিরাষ্ট্রের সংকট যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি করে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে মার্কিন আধিপত্যবাদ এবং শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব।

বাংলাদেশ ও জঙ্গিবাদ: কোনো প্যাটার্ন আছে কি?

ইতিহাসে রাজনৈতিক ইসলাম তিনটি ধাপ অতিক্রম করেছে বলে আমরা মনে করি। প্রথম ধাপটি ছিল উপনিবেশবাদবিরোধী। মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে উপনিবেশবাদকে বিরোধিতা করতে গিয়ে ইসলাম ধর্মের সঙ্গে রাজনীতির সংমিশ্রণ ঘটে। জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তির পাশাপাশি ধর্মীয় আন্দোলনের সেই বিরোধিতার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল আধুনিক অর্থে জাতি বলতে যা বোঝায়, তার বিরোধিতা করা এবং মুসলিম আত্মপরিচয়কে জাতি গঠনের প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠিত করা। এই আন্দোলন থেকে জন্ম নিয়েছে নানা ইসলামি চিন্তাধারা এবং ইসলামি আন্দোলন। পাকিস্তানের মাওলানা মওদুদী এবং মিসরের সৈয়দ কুতুবকে এই আন্দোলনের সবচেয়ে প্রভাবশালী তাত্ত্বিক এবং পুরোধা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এদের উভয়ে জাতীয়তাবাদকে বিরোধিতা করে ইসলামি শরিয়া আইনের ভিত্তিতে রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার পক্ষে ওকালতি করেছেন। জন্ম হয়েছে জামায়াতে ইসলামী এবং মুসলিম ব্রাদারহুড নামে দুই শক্তিশালী আন্দোলন। এই পর্যায়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে রাজনৈতিক ইসলামের আন্দোলনের ধরন। এ ক্ষেত্রে প্রাধান্য পেয়েছে গণ-আন্দোলন। এটিকেই উদ্দেশ্য অর্জনে মুখ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। মানুষকে সচেতন করা, রাজনৈতিক সংগঠনের মাধ্যমে তাদের উত্সাহিত এবং সক্রিয় করা এই আন্দোলনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। আধুনিক অর্থে জাতীয়তাবাদকে আমরা বুঝি এক ভাষাভাষী, এক সংস্কৃতি বা এক পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যভিত্তিক কোনো মানবগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়গত আন্দোলনকে। জাতীয়তাবাদী গণ-আন্দোলনের শক্তিশালী সমর্থনের কারণে গণভিত্তিক ওই ইসলামি আন্দোলনের সাফল্য সীমিত ছিল। ইরানের শাহের বিরুদ্ধে আয়াতুল্লাদের আন্দোলন ১৯৭৮ সালে সাফল্য এনে দেয়। এ ক্ষেত্রে বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সাফল্যটি আমরা লক্ষ করি শিয়া গোত্রের ক্ষেত্রে। সেই বিপ্লবের গণ-আন্দোলনী চরিত্রে আকর্ষিত হয়ে মানুষ রাস্তায় জীবন দিয়েছে কিন্তু আন্দোলন জঙ্গিবাদে পরিণত হয়নি। ওই বিপ্লবের সাফল্যের আরও একটি কারণ তার আধ্যাত্মিকতা। আয়াতুল্লাদের নেতৃত্বে পরিচালিত হলেও সে আন্দোলনে সমাজতন্ত্রী, কমিউনিস্টদেরও বিশেষ প্রভাব ছিল। আধ্যাত্মিকতার প্রসঙ্গে একটি নাম এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। তিনি হচ্ছেন আলী সরিয়তি নামে একজন বুদ্ধিজীবী এবং সমাজতন্ত্রী। শাহবিরোধী এই আন্দোলনের মূল দার্শনিক ভিত তিনি রচনা করেছিলেন ইসলাম ধর্মের (বিশেষ করে হাসান এবং হোসেনের মৃত্যু) আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে অস্তিত্ববাদী দর্শন, বিশেষ করে ফরাসি দার্শনিক পল সার্ত্রে বা কাম্যু এবং মার্ক্সবাদী দর্শনের মতো নানা দৃষ্টিভঙ্গির সংযোজন ঘটিয়ে।

দ্বিতীয় ধাপ বলতে এখানে আমরা বুঝতে চাই আফগানিস্তানে সোভিয়েত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মুজাহিদদের সফল সশস্ত্র অভিযান। চরিত্রগতভাবে এই আন্দোলন পূর্বের আন্দোলনের তুলনায় একেবারে ভিন্ন ছিল। সমাজতন্ত্রকে পরাভূত করতে গিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসলাম ধর্মকে উগ্র সমরবাদী দর্শনে কীভাবে পরিণত করেছিল সেটি সবার জানা। পাকিস্তানের সামরিক একনায়ক জেনারেল জিয়াউল হক মাদ্রাসা শিক্ষা কর্মসূচিতে জিহাদি চিন্তাকে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। অর্থ ঢেলে মাদ্রাসা নির্মাণ, আফগানিস্তানে মুজাহিদিনদের প্রতি সামরিক, আর্থিক ও রাজনৈতিক সাহায্য ভান্ডার খুলে দিয়ে পবিত্র ধর্মবিশ্বাসকে আমেরিকা সামরিক জঙ্গিবাদে পরিণত করেছিল। ফলে দ্বিতীয় পর্যায়ের এই আন্দোলন জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়নি। হয়েছে সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ এবং তার ধারক সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে। এভাবে সুন্নিভিত্তিক এই আন্দোলন ইসলাম ধর্মকে সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসবাদী জিহাদি আদর্শে পরিণত করে। তৃতীয় ধাপে রয়েছে আরও হিংস্র এবং বর্বর পদ্ধতি। তার বহিঃপ্রকাশ ঘটতে দেখি ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ নামে খিলাফত প্রতিষ্ঠার সশস্ত্র সংগ্রামে। টুইন টাওয়ার আক্রমণ, ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক অভিযানের ধাপ পার হয়ে সেই জঙ্গিবাদ এই তৃতীয় ধাপে পৌঁছায়। এখানে লক্ষণীয় দিক হচ্ছে জাতিরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অবরোধ এবং তাকে প্রতিস্থাপন করে ইসলামি রাষ্ট্র বা ইসলামি খিলাফত প্রতিষ্ঠা করা। মধ্যপ্রাচ্যের শিয়া-সুন্নি রাজনৈতিক গোলকধাঁধায় আটকে গিয়ে এই বিশেষ আন্দোলন ইসলাম ধর্মকে পরিণত করেছে ভয়াবহ এক সন্ত্রাসী আদর্শে। এই সন্ত্রাসী আদর্শের কোনো স্থানীয় বাহক নেই। ইন্টারনেটের মাধ্যমে সারা বিশ্বে সে আদর্শ ছড়িয়ে পড়েছে, তাকে ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছে বিশ্ব নেটওয়ার্ক, যা কিনা ভাসমান ও শেকড়বিহীন। ডিজিটাল সভ্যতার বদৌলতে আজ দূরত্ব এবং স্থান-কালকে উপেক্ষা করে ওই নেটওয়ার্কে আমরাও জড়িয়ে পড়েছি। ওই আদর্শের সাহচর্যে আসছে সামাজিকভাবে উপেক্ষিত ও পরিত্যক্ত এক তরুণসমাজ।

আল-কায়েদা বা ইসলামিক স্টেটের যে কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে তার দুর্বলতার চিহ্ন। সেই দুর্বলতার দুটি দিক এখানে উল্লেখ করা যায়। একটি হচ্ছে সন্ত্রাসকে তারা যে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিচ্ছে সেটি অনেকটা আন্তদেশীয় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মতো দেখায়। ম্যাকডোনাল্ড, কেএফসি যেমন বিভিন্ন দেশে তাদের ফ্র্যাঞ্চাইজির মাধ্যমে তাদের পণ্য বিক্রি করে রাজনৈতিক ইসলামের সাম্প্রতিক সংস্করণ আঞ্চলিক বা স্থানীয় জিহাদিদের মাধ্যমে সন্ত্রাসকে ছড়িয়ে দিচ্ছে। সন্ত্রাসকে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করার কোনো নেতৃত্ব নেই। এর ফলে বিভিন্ন দেশের জিহাদিরা ন্যূনতম তদারকির বাইরে। এই নিয়ন্ত্রণহীন সন্ত্রাসের মধ্যে নিহিত তার ধ্বংসের অন্যতম কারণ। এই দিকটি বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন ওয়েন বেনেট-জোনস তাঁর ‘বানচেস অব গাইস’ নামের প্রবন্ধে। দ্বিতীয় আরও একটি কারণ উল্লেখ করার মতো। তাদের ধনসম্পদের প্রতি বিশেষ মোহ। আমলাতান্ত্রিকতায় নিবিষ্ট হওয়ার একটি উদাহরণ হচ্ছে পাকিস্তানের তালিবান নেতা হাকিমুল্লাহ মেহসুদ। তাঁর ধনসম্পদের হিসাব সাংবাদিকেরা যখন পত্রিকায় ছাপে তখন থেকে পাকিস্তানের সোয়াত উপত্যকায় তালিবানের প্রভাব ক্ষুণ্ন হতে থাকে (দেখুন ওয়েন বেনেট-জোনস ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৪)। এ থেকে ধর্মের রাজনৈতিকীকরণের বিশেষ প্যাটার্ন আমরা তৃতীয় বিশ্বের নানা মুসলিম দেশে লক্ষ করি, যেটি পাশ্চাত্যের তুলনায় ভিন্ন। পাশ্চাত্যে ধর্মীয় ব্যানার ব্যবহূত হয়েছে পুরোনো সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। মার্টিন লুথারের ধর্ম সংস্কারের আন্দোলনকে ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা কঠিন হয়েছে। তার পরিধি যত প্রচ্ছন্নভাবেই হোক না কেন। ওই আন্দোলন আক্রমণ করেছে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতাকাঠামোকে। খ্রিষ্টধর্মের পতাকা নিয়ে এসব আন্দোলন কোনো না কোনোভাবে অর্থনৈতিক পরিবর্তনে সহায়তা করেছে। প্রতিটি আন্দোলন কোনো না কোনোভাবে একটি বিশেষ যুগসন্ধিক্ষণে জন্ম নিয়েছে। ধর্মীয় স্লোগানের মূল উদ্দেশ্য অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কার। সে কারণে পাশ্চাত্যের ধর্মগুলো কেবল আধ্যাত্মিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সমাজের মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তনে তারা সহায়তা করেছে। এই মূলকথাটি এঙ্গেলস তুলে ধরেছেন তার প্রাচীন খ্রিষ্টান ধর্মের ইতিহাসে। তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য লক্ষ করেছিলেন। এঙ্গেলস লেখেন, ‘এসব আন্দোলন প্রাচ্যে ধর্মীয় চাদরে আবৃত হলেও তার পেছনে কারণটি হলো অর্থনৈতিক। কিন্তু অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটি এসব আন্দোলন সফল হলেও থেকে গেছে অপরিবর্তিত। অন্যদিকে, খ্রিষ্টীয় পাশ্চাত্যে ধর্ম জনপ্রিয় আন্দোলন বা বিক্ষোভে ব্যবহূত হয়েছে ব্যানার হিসেবে। ধর্ম সেখানে পুরোনো জরাজীর্ণ অর্থনৈতিক কাঠামোর বিরুদ্ধে আক্রমণের মুখোশ হিসেবে ব্যবহূত হয়েছে মাত্র। পুরোনো ব্যবস্থার জায়গায় গড়ে উঠেছে নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা’ (এঙ্গেলস: ৪৮৩)। সে তুলনায় তৃতীয় বিশ্ব কেন ভিন্ন এবং কেন তার ভূমিকা সমাজ প্রগতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, তার একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায় জুবাইদার লেখা ‘ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল অ্যাকটিভিজম ইন ইসলাম’ প্রবন্ধে। তিনি দেখিয়েছেন বণিক ও বুর্জোয়া শ্রেণির স্বাধীন বিকাশের বিলম্বীকরণ প্রাচ্যের দেশগুলোতে এক বিশেষ জটিলতা সৃষ্টি করেছিল। ওই বিলম্বিত বিকাশের কারণে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণভার সম্পূর্ণভাবে ন্যস্ত হয়ে পড়ে আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক এলিটদের ওপর। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে আপেক্ষিক অর্থে মুক্ত থাকায় ধর্ম তাদের হাতে আমলাতান্ত্রিক হাতিয়ারে পরিণত হয়। এই প্রবণতা বিশেষভাবে প্রযোজ্য বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। পাকিস্তানের অধীনে বাঙালি বণিক শ্রেণি ছিল অত্যন্ত ক্ষুদ্র এবং সংকুচিত। রাজনৈতিক ক্ষমতার বলয় থেকে দূরে অধস্তন অবস্থায় তাকে টিকে থাকতে হয়। পাকিস্তান শাসন থেকে মুক্তি পাওয়ার পর যে আদর্শিক কাঠামো বাংলাদেশ উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করে, সে কাঠামো ধর্মীয় অনুভূতির রাজনৈতিকীকরণের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। ইসলাম ধর্মকে আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনিক ধর্মে পরিণত করা হয়েছিল। পাকিস্তানে তালিবান নেতার অর্থ সঞ্চয়ের প্রবণতা, নিজের আর্থিক ভাগ্যের প্রতি বিশেষ যত্নবান হওয়ার মধ্যে আমলাতান্ত্রিকতার প্রচ্ছন্ন ছোঁয়া পাওয়া যায়, যদিও এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত।

আমাদের দেশে ইদানীংকালে ওহাবি ধারার প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনামলে আমাদের দেশ মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে অর্থনৈতিক এবং মানব শ্রম রপ্তানি বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। সেখানকার এই ওহাবি ধারার সঙ্গে আমরাও প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হয়ে পড়ি। সৌদি ওহাবি ধারার সঙ্গে এখানে আরও যুক্ত আছে দেওবন্দি ইসলামের ধারা। এই ধারার জন্ম হয়েছিল সিপাহি বিদ্রোহের পর। বিদ্রোহে ব্যর্থ হওয়ার পর ব্রিটিশ সরকার দিল্লির সব ধর্মীয় কেন্দ্র তাদের অধীন করে। অনেক উলামা যারা মোগল আমলে বিশেষ রাষ্ট্রীয় সুবিধা পেয়েছে তারা দিল্লি ত্যাগ করে এবং অনেকেই উত্তরের শহর দেওবন্দে পাড়ি দেয়। দেওবন্দ মুসলিম সংস্কৃতির কেন্দ্র এবং দিল্লি থেকে মাত্র ৯০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। দেওবন্দ এবং ওহাবি ধারার এক মিশ্রণ থেকে আমাদের দেশে জন্ম নিয়েছে একদিকে যেমন আধা গণ-আন্দোলনমুখী, আধা সন্ত্রাসমুখী জামায়াতে ইসলামীর মতো সংগঠনের, তেমনি নানা জাতীয় জঙ্গি এবং উগ্রবাদী ইসলামি সংগঠনের। এদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো জেএমবি নামের সংগঠনটি। এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠা হয় ২০০৪ সালে। পরে সেটি দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। একটি নিও জেএমবি নামে আত্মপ্রকাশ করে। এর সঙ্গে ইদানীংকালের ইসলামিক স্টেটের সংযোগ লক্ষ করার মতো। এর নেতা তামিম কয়েক দিন আগে পুলিশের অভিযানে নারায়ণগঞ্জে মারা যান। ২০১৩ সালে আনসারুল ইসলাম এবং হিজবুত তাহরিরসহ আরও কিছু উগ্রপন্থী গ্রুপের সঙ্গে জেএমবি এক হয়। সেই সঙ্গে রয়েছে আরও একটি সংগঠন, যার নাম আনসারউল্লাহ বাংলা টিম। নিও জেএমবি তরুণদের নিয়ে গঠিত এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকে যথেষ্ট জ্ঞান রাখে। সেই সঙ্গে তাদের গ্রুপে আছে মাদ্রাসা শিক্ষিত তরুণ। জেএমবি এ পর্যন্ত ৪০ জনকে হত্যা করেছে, যার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ব্লগার, প্রকাশক রয়েছে। তাদের সংবাদ সংস্থার নাম আল-তামকিন। তারা ইসলামিক স্টেটের সাইট ‘আমাক’কেও ব্যবহার করে (দেখুন ভট্টাচার্য, ২০১৬)। ইদানীংকালে আমরা লক্ষ করছি যে ৮০টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা অনেক ছাত্র জঙ্গিবাদী কার্যকলাপে যুক্ত হয়ে পড়ছে। কী বিশেষ কারণে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত বা মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেমেয়েরা এবং কিছু মাদ্রাসার ছাত্র এই জঙ্গিবাদী আন্দোলনে অংশ নিচ্ছে, সেটি ভাববার বিষয়। তারা সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে নিপীড়িত বা নির্যাতিত নয়। তাদের অর্থের অভাব নেই এবং তারা সামাজিকভাবে ক্ষমতাবান। তা সত্ত্বেও তারাই আজকের ইসলামি জঙ্গিবাদের অগ্রবাহিনী। এর একটি ব্যাখ্যা আমরা পাই ফয়সাল দেবজির পর্যবেক্ষণ থেকে। তিনি মনে করেন, এই বিত্তবান তরুণ শ্রেণি জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে ব্যক্তিজীবনে সামাজিক বা অর্থনৈতিক নির্যাতনের কারণে নয়, বরং যে নির্যাতন ও বঞ্চনা তারা সমাজে প্রত্যক্ষ করে তার কারণে।

এই পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব কতটুকু সেটি আমরা আমাদের সমাজকে দিয়ে উপলব্ধি করতে পারি। বিগত বিশ বছরে বাংলাদেশ অনেকখানি বদলে গেছে। কীভাবে এবং কতটুকু, সেটি আমরা হয়তো যেভাবে করার সেভাবে উপলব্ধি করিনি। যদি করেও থাকি তাহলে সেটি ভাসা ভাসা। স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশে দুটি ভুবন গড়ে উঠেছে। একটি রাজনীতির। সেটি আজ পরিণত হয়েছে সংঘাতের প্রধান ক্ষেত্রে। সে ক্ষেত্র স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, সুবিধাবাদ, আইনের শাসনে ঘাটতি, রাষ্ট্রশাসনে অদক্ষতা, অদূরদর্শিতা এবং আঞ্চলিকতায় নিমজ্জমান এক ক্ষেত্র। তার প্রভাবে এখানে রাজনীতি দিকদর্শনহীন এক সংঘাতময় পরিবেশ গড়ে তুলেছে। সেখানে না আছে কোনো আদর্শ যার পেছনে সমবেত হওয়া যায়; না আছে দিকনির্দেশনা, যাকে মূলধন করে সমাজজীবনে সম্পৃক্ত হওয়ার পথ খোলা থাকে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের অধ্যায় শেষ হলেও নতুন সমাজ গড়ার জন্য নতুন আদর্শের প্রয়োজনীয়তাকে আমরা উপেক্ষা করেছি। অতীতের চর্বিত চর্বণ দিয়ে ভেবেছি মানুষকে বশে রাখা যাবে ক্ষমতার লড়াইয়ে জয়ী হতে। কিন্তু সেই ক্ষমতার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। সেখানে হিংসা সবার ওপরে স্থান করে নিয়েছে। পরিবারেও কোনো সুস্থ স্থান নেই। আধ্যাত্মিকতার নামে সেখানে রয়েছে পোশাকি ধর্ম পালন অথবা দুর্নীতির ফসল হিসেবে ভোগবাদী জগতের উপকরণে ভরপুর এক বলয়। মিথ্যার ওপর প্রতিষ্ঠিত বৃহত্তর সমাজ ও পরিবার। দুর্নীতি, বাহ্যিকতা, সস্তা উপভোগী জীবনচেতনার মধ্যে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে দিকদর্শনহীন এক জীবন গড়ে তোলার উপদেশ রয়েছে সব খানে। শিক্ষাব্যবস্থাও এখানে লোকদেখানো, সংখ্যাতত্ত্ব হিসাবে প্রচুর মানুষ ‘শিক্ষিত’ হচ্ছে, অথচ শিক্ষার অন্তর্নিহিত মর্মবাণী নেই। এ ধরনের সমাজে মানুষ হিংস্র হবে না কেন? যে পরিবেশ আমরা সৃষ্টি করে রেখেছি, সন্ত্রাসী মনন উত্পাদনের কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার জন্য তা বড়ই উর্বর।

অন্য যে জগত্ সেটি অর্থনীতির। সেখানেও অতিযান্ত্রিক, মুনাফা, শোষণ, তীব্র সামাজিক মেরুকরণের কারণে হাতে গোনা কিছু গোষ্ঠীর ধন সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। বিশ্বসমাজের সঙ্গে যোগাযোগ, যাকে আমরা বিশ্বায়ন বলি, আমাদের সমাজে অর্থের ঢল এনে দিয়েছে। সেদিকে তাকিয়ে আমরা ভেবেছি সমাজ এগিয়েছে। সম্পদ বেড়েছে। পোশাকআশাকে বাবুয়ানা ভাব এসেছে, যাতায়াত, খাবার, গাড়ির ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এরই মধ্য দিয়ে মানুষের আধ্যাত্মিক, মানবিক দিককে পিষে ফেলে এক বস্তুবাদী ভোগবাদী জীবন শেকড় গেড়ে বসেছে। তার ভয়াবহ দিকটা আমরা লক্ষ করিনি। ওই দুই বলয়ের পাশাপাশি রয়েছে বৃহত্তর সমাজ। তাকে সিভিল বা নাগরিক সমাজ বলা হয়। বিশাল মধ্যবিত্ত শ্রেণির শ্বাস-প্রশ্বাসের একমাত্র ক্ষেত্র হলেও সেখানে জীবন নেই, অসাড়, নিস্তব্ধ প্রাণহীন এক সত্তা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। কেন ভুলে যাই ঠিক এই ধরনের ভোগবাদী নির্দয় সমাজকে প্রত্যক্ষ করেই ইসলামি মৌলবাদের গুরু সায়েদ কুতুব জন্ম দিয়েছিলেন সমরতান্ত্রিক ইসলামি দর্শনের। মার্কিন সমাজের উগ্র ভোগবাদের অন্তর্নিহিত ধ্বংসের চরিত্র সায়েদ কুতুব বুঝেছিলেন। সেই বুঝ থেকে বিংশ শতাব্দীর ষাট দশকের দিকে তিনি দেখিয়েছিলেন ওই সর্বভোগবাদী সমাজের সারসত্তাহীনতা। ওই ভোগবাদী সমাজকে মডেল ধরে বস্তুবাদী, দুর্নীতিবাদী, লক্ষ্যহীন সমাজ আজ বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাকে পরিবর্তন করেনি কোনো শাসক। ক্ষমতা ও আত্মপ্রাপ্তিতে মগ্ন শাসক মানুষকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক এই জটিলতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে প্রতিবাদের মূর্ত রূপ দিতে সাহায্য করেছে রাজনৈতিক ইসলাম। সেই ইসলাম যদিও ‘ইসলামি রাষ্ট্রের’ অতিমাত্রায় ক্রুদ্ধ বিধ্বংসী জীবনদর্শনকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে, তবে আমরা কেন এই বর্বর আদর্শ হাতে পেয়েছি তার একটি কারণ তো খুঁজতে হবে এখানেই।

ভুললে চলবে না এসবই ঘটছে এমন এক অঞ্চলে যার ইতিহাস সন্ত্রাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত, যেখানে ধর্মীয় বিভেদ জাতিরাষ্ট্র গঠনের মূল অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। দেশ বিভাগের রক্তাক্ত অধ্যায় এই উপমহাদেশের মনোজগেক স্থায়ীভাবে হিন্দু-মুসলমান বৈপরীত্য দিয়ে গড়ে তুলেছে। এখানে বাবরি মসজিদের মতো ঘটনা আছে, আছে ট্রেনে আগুন ধরিয়ে হিন্দু তীর্থযাত্রী হত্যার ঘটনা, গুজরাটের দাঙ্গা। বাংলাদেশে হিন্দু-বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নিপীড়নও ওই ঐতিহাসিক সাম্প্রদায়িকতার প্রলম্বিত ইতিহাস। এখানে পাকিস্তানের আণবিক মারণাস্ত্রকে ইসলামি বোমা বলা হয়। ভারতের আণবিক বোমাকে হিন্দু ভাবা হয়। দেশ বিভাগকালে কয়েক লাখ হিন্দু-মুসলিম হত্যা, কয়েক কোটি মানুষের উদ্বাস্তু হওয়ার নিদারুণ দুঃখের কাহিনি হিন্দু-মুসলিম সহিংসতার স্থায়ী এবং ঘনায়িত মেটাফোর হিসেবে আমাদের চেতনায় রয়ে গেছে। কেউ তার প্রভাব থেকে আমাদের মুক্ত করেনি। সব মিলিয়ে আমাদের সামনে আজ এক ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ এসে দাঁড়িয়েছে, ঐতিহাসিক ও ইদানীংকালীন। সেই চ্যালেঞ্জ দুরূহ।

উপসংহার

এই প্রবন্ধের শুরুতে আমরা প্রখ্যাত ইংরেজ সাহিত্যিক জর্জ অরওয়েলের একটি উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছি। কী কারণে ফ্যাসিবাদ একপর্যায়ে ইউরোপকে আকর্ষিত করেছিল তার ইঙ্গিত আমরা ওই উক্তি থেকে পাই। ইসলামিক স্টেটকে অনেকে ফ্যাসিবাদী আন্দোলন হিসেবে দেখেন। কিন্তু মুসলিম যুবসমাজের কাছে তার অভাবনীয় আকর্ষণী প্রতাপকে উপেক্ষা করা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। ফ্যাসিবাদ বা আরও কোনো নাম দিয়ে তাকে চিহ্নিত করার মধ্যে আমি কোনো আত্মতৃপ্তি দেখি না। সমষ্টিবদ্ধ ভর্ত্সনা দিয়ে তাকে পরাভূত করা আমার মতে অকার্যকরী একটি কৌশল। এমনকি যুদ্ধজাহাজ, বোমা দিয়েও তাকে ধরাশায়ী করা কোনো কৌশল হতে পারে না। যে অন্যায়ের প্রতিবাদ থেকে এই আন্দোলনের উত্পত্তি তার মুখোমুখি হওয়া আজকের দিনের পবিত্র কর্তব্য। পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায়শ্চিত্ত করার সময় এসেছে। এই প্রায়শ্চিত্ত বহু আগে থেকে মধ্যপ্রাচ্য এবং অন্যান্য দেশ যারা উপনিবেশবাদ বা মার্কিন আধিপত্যবাদের শিকার হয়েছিল তাদের ঐতিহাসিক পাওনা। সেই পাওনা না মিটিয়ে সমাধানের কোনো পথ আমাদের সামনে খোলা নেই। আজ বিশ্ব যে দ্বিমুখী সংকটে আক্রান্ত তার অনেকখানি ইউরোপ বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি এবং দার্শনিক আদর্শ থেকে উদ্ভূত বলে আমরা দাবি করতে পারি। সেই দার্শনিক আদর্শ কীভাবে ইউরোপে প্রতিষ্ঠিত হলো তার একটি বর্ণনা আমরা পাই জার্মান দার্শনিক এইচ জি হেগেলের নানা লেখায়। তিনি ঐতিহাসিক প্রগতি দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার কারণে ঘটে বলে ঊনবিংশ শতাব্দীতে দাবি করেছিলেন। সামাজিক, সাংস্কৃতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যেসব দ্বন্দ্ব বা সংকট দেখা দেয় তা নিরসনের মধ্য দিয়ে সমাজ এগিয়ে চলে। কিন্তু তাঁর দাবি অনুযায়ী সেই নিরসনের প্রকৃত মালমসলা বিদ্যমান থাকে কেবল উদারনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত সমাজে, অন্য কোথাও নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ মহাদেশ উদারনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। আমাদের দেশ বা অঞ্চলও ইউরোপীয় প্রভাবের কারণে উদারনীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল উপনিবেশ শাসনামলে। উদারনীতিবাদী দর্শনের যে মূল্যবোধ সেটি বলতে বোঝায় ব্যক্তিস্বাধীনতা, বিরোধী মতাদর্শের প্রতি সহনশীল হওয়া ইত্যাদি। এই মূল্যবোধগুলোকে বাস্তবায়নের জন্য ইউরোপ ধর্মনিরপেক্ষ জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু সেই জাতিরাষ্ট্র আজ গভীর সংকটের মুখোমুখি। কেবল এশিয়া, আফ্রিকা বা লাতিন আমেরিকায় নয়। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায়, বস্তুত সবখানে। পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের জাতিরাষ্ট্রকে ধ্বংস করছে তার সংকীর্ণ স্বার্থের কথা মাথায় রেখে। সে কারণে তাদের নীতির সঙ্গে ইসলামপন্থীদের মিল আছে। ইসলামপন্থী এই আন্দোলনও বিদ্যমান জাতিরাষ্ট্রের ধ্বংস কামনা করে। এই ধ্বংস শুরু হয়েছিল ইরাকে আক্রমণ চালিয়ে (২০০৩)। এরপর লিবিয়া এবং সব শেষে সিরিয়া। স্বৈরশাসনের দোহাই দিয়ে জোর করে মার্কিনদের মতো করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এই স্ট্র্যাটেজির ফলাফল হচ্ছে গৃহযুদ্ধ, ইসলামি উগ্রবাদের প্রভাব বৃদ্ধি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বা সমাজকাঠামো উদারনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে কিন্তু তার বৈদেশিক বা পররাষ্ট্রনীতি উদারনীতিবিরোধী। সেখানে রাষ্ট্রের স্বার্থের দিকটিকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে নানা ধরনের সন্ত্রাসী কার্যকলাপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্রমাগত জড়িয়ে পড়ছে। সেই নীতির ক্ষেত্রে তাত্ত্বিক ও গুণগত পরিবর্তন আনা জরুরি। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতত্ত্ব বহুকাল ধরে জাতিরাষ্ট্রের স্বার্থকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। সেই তত্ত্বের ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন আনা আজ একান্তভাবে জরুরি। বিশ্বায়নের যুগে একক দেশের স্বার্থভাবনা আর উপযোগী ভাবা যায় না।

অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য বা অন্যান্য দেশে জাতিরাষ্ট্রের সংকটের কারণ নিহিত রয়েছে সুশাসনের অভাবের মধ্যে, গণতন্ত্রহীন স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার কারণে। তার আরও কারণ নিহিত রয়েছে দারিদ্র্য, অভাব, পরমতসহিষ্ণুতার ঘাটতি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আত্মপরিচয়ের সংকটের মধ্যে। এই অভাবগুলোই জাতিরাষ্ট্রের প্রধান শত্রু। আজ ইসলামিক স্টেটসহ অন্যান্য ইসলামি আন্দোলন এই জাতিরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। তারা খিলাফতকে আদর্শ রাষ্ট্র হিসেবে দেখে, যার ব্যাপ্তি কোনো দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। কিন্তু সেই আন্দোলন প্রায় ফ্যাসিবাদী রূপ ধারণ করায় তার ব্যর্থতাকেও আমরা অনিবার্য ভাবতে পারি। ফলে সামাজিক আন্দোলনের ধরন কী হবে এবং প্রতিবাদের কোনটি সবচেয়ে উপযোগী পথ বা সন্ত্রাস একমাত্র পথ কি না—এই ভাবনাগুলোকে একত্র করে সেখানেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। প্রখ্যাত লেখক ডালরিম্পল উল্লেখ করেছেন যে পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআনে ২০০ আয়াত আছে, যেখানে কেবল প্রার্থনার কথা বলা আছে। আরও প্রায় ৬০০ আয়াতে সৃষ্টিকর্তার অসীম কাজ, গ্রহ-নক্ষত্র, গাছপালা, সৌরজগেক অনুধ্যান করা, তাকে জানা, ভাবা এবং বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জালাল উদ্দিন রুমির মতো প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেছেন। তিনি ইসলামি আইনে বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তবে তাদের ক্ষেত্রে যেটি তাত্পর্যপূর্ণ তা হচ্ছে তিনি বা শেখ সাদি (পারস্য) কেউই কেবল ইসলাম ধর্মের মধ্যে ওই অনুধ্যানের প্রক্রিয়াগত দিককে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁরা হিন্দু ধর্ম এবং ইসলামের মধ্যে সংশ্লেষণের কথা বলতেও ইতস্তত করেননি। জ্ঞানের অন্তর্নিহিত সত্য উদ্ধার করতে অন্যান্য ধর্মের সহায়তা নিতে তাঁদের বাধেনি। কারণ জ্ঞান কেবল একটি ধর্মের মধ্যে নিহিত থাকে না। আর সে কারণে নিজের ধর্মকে কেবল শ্রেষ্ঠ ভেবে বাকিগুলোকে উপেক্ষা করা বা ধ্বংস করার প্রত্যয় ব্যক্ত করাকেও আমি নিতান্তই মানুষের প্রকৃতিবিরোধী ভাবি। সম্ভবত সেই দৃষ্টিকোণ থেকে রুমি বা ইবনে খালদুন বা ইবনে রুশদের মতো ইসলামের প্রখ্যাত পণ্ডিতেরা উদ্যোগী হয়ে নানা ধর্মের সংশ্লেষণের উপদেশ দিয়েছেন সৃষ্টির অন্তর্নিহিত গভীর সূত্রগুলো বুঝতে। দুঃখজনকভাবে রাজনৈতিক ইসলামের প্রভাবে এসব মিশ্রণ বা সংশ্লেষণ থেকে ইসলামি জীবনকে মুক্ত করার আন্দোলন আজ প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে। বিশ্বায়নের এই যুগে ধর্মের গুরুত্ব বা মানুষের জীবনে তার স্থানকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি। জঙ্গিবাদ সেই মূল্যায়নে কোনো ভূমিকা না রাখলেও বাদ বাকি মুসলিম সমাজকে নতুন করে ভাবতে হবে, নতুন পথের অনুসন্ধান আজ সে কারণে বিশেষভাবে জরুরি।

গ্রন্থপঞ্জি

1.            Wahhanism to ISIS: How Saudi Arabia Exported the Main Source of Global Terrorism by Karen Armstrong in New Stateman.

2.            The Phony Islam of ISIS, The Atlantic, Feb 27 2015 by Caner K. Dagli.

3.            The Problem with Vows to ‘Defeat’ the Islamic State in The Atlantic, August 21, 2016.

4.            What’s the Right Way to Think about Religion and ISIS? In The Atlantic.

5.            The Saudi Connection: Wahhabism and Global Jihad by Carol E. B. Choksy in World Affairs, May/June 2015.

6.            The Question of Theodicy and Juhad in War on the Rocks, Feb 26, 2015 by Ziya Meral.

7.            The Marxist Roots of Islamic Extremism by Damon Linker, March 25, 2016 in The Week.

8.            The Many Facets of extremism in the Islamic World by Mahesh Sachdev in The Hindu, July 16 2015.

9.            The Dilemma of Pakistan’s Foreign Policy by Muhammad Akbar Notezai in The Diplomat, August 12, 2016.

10.          Stemming the Rise of Islamic Extremism in Bangladesh, in HR by Carl Ciovacco and Sajeeb Wazed, November 19, 2008.

11.          Saudi Arabia and Iran: The Cold war of Islam by Susanne Koelbl, Samiha Shafy and Bernhard Zand in SPIGEL ONLINE, May 09, 2016.

12.          Rise of “Neo JMB” and Post-Gulshan attack developments by Rupak Bhattacharjee 28 August 2016 in bdnews24.com.

13.          Pakistan’s Islamic Schools Fill Void, but Fuel Militancy by Sabrina Tavernise, May 3 2009 in The New York Times.

14.          The Influence of Al-Mawdudi and the Jamat Al Islami Movement on Sayyid Qutb Writings by Asyraf Hj. A. B. Rahman and Nooraihan Ali in World Journal of Islamic History and Civilisation, 2 (4): 232-236, 2012.

15.          Mawdudi and Qutb: Two Anti-Western Intellectuals in macrohistory.com

16.          Sayed Qutb, Islamic Extremism & Philosophy by Arif Ahmed, April 1, 2015.

17.          ISIS has not radicalized young Muslims, it has infantilized them-and that is why it is so powerful and dangerous by Robert Fisk in The Independent.

18.          Inside the Madrasas by William Dalrymple in The New York Review of Books, December 1, 2005.

19.          How Pakistan’s Zia Handed The Batons of Bigotry to The Next Generation by Farahnaz Ispahani, January 31, 2016.

20.          The ISIS Shock by Steve Niva in The Immanent Frame: Secularism, Religion and the Public Sphere (SSRC).

21.          Pakistan’s Black Day by Ahsan Chaudhary in The Diplomat, July 8, 2016.

22.          Political Conflicts, Extremism and Criminal Justice in Bangladesh, International Crisis Group Report, 11 April 2016.

23.          How Israel Helped to Spawn Hamas in Wall Street Journal (http:/www.wsj.com/article.SB123275572295011847).

24.          Noam Chomsky, The Costs of Violence: Masters of Mankind (Part 2) In TomDispatch, May 10, 2016.

25.          The Idea behind ISIS by H.A.Hellyer in MENASource.

26.          From U.S, the ABC’s of Jihad by Joe Stephens and David B. Ottaway, Washington Post, March 23 2002.

27.          The symbiosis of savagery by Dan Sanchez March 1, 2015 in antiwar.com.Blog

28.          Fox’s Shep Smith Accuses Greenwald of Equating US Troops with Terrorists by Matt Wilstein, June 23 2014, Fox News.

29.          ISIS’s Savage Strategy in Iraq by Lawrence Wright, June 16, 2014 in The New Yorker.

30.          Bunches of Guys by Owen Bennett-Jones in London Review of Books,19 December 2013.

31.          How should we think about the caliphate? By Owen Bennett-Jones in London Review of Books, 17 July 2014.

32.          What does Obama really mean by “Violent Extremism”? in The Atlantic, Feb 20, 2015.

33.          Confused about the US response to ISIS in Syria? Look to Saudi Arabia by Patrick Cockburn, June 17, 2016 in The UNZ Review.

34.          Beyond Authencity: ISIS and the Islamic Legal Tradition by Sohaira Siddiqui in Jadaliyya.

35.          Faisal Devji, Landscapes of the Jihad, Militancy, Morality, Modernity by Stephan Claussin, Archives de sciences socials des religions, October – December 2006.

36.          American Pravda: How the CIA Invented “Conspiracy Theories” September 5, 2016 in The UNZ Review

37.          American Imperialism and the Rise of Islamic extremism in Syria and Iraq by Niles Williamson, 9 September 2014, World Socialist Web Site.

38.          Magical Thinking about ISIS by Adam Shatz in London Review of Books, 3 December 2015, Vol 37, no. 23.

৩৮.     এগার বছরে ভয়ংকর উত্থান: জেএমবি, টিপু সুলতান, প্রথম আলো, ১৭ আগস্ট ২০১৬

৩৯.      কেউ রাতারাতি জিহাদি হয়ে ওঠে না, আলী রিয়াজ, প্রথম আলো, ৯ আগস্ট ২০১৬

৪০.       গোড়াপত্তন আফগান মুজাহিদদের হাতে, টিপু সুলতান, প্রথম আলো, ৪ আগস্ট ২০১৬

৪১.       চরম নৃশংসতা নিয়ে হাজির হয়েছে আইএস মতবাদ, টিপু সুলতান, প্রথম আলো,

৬ আগস্ট ২০১৬

৪২.       জঙ্গি তত্পরতার কারণে সংকটে তরুণেরা, আলী রীয়াজ, প্রথম আলো, ৯ আগস্ট ২০১৬

৪৩.      যেসব কারণে কেউ জঙ্গি হয়, আলী রীয়াজ, প্রথম আলো, ১০ আগস্ট ২০১৬

৪৪.       দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজতে হবে, আলী রীয়াজ, প্রথম আলো, ৮ আগস্ট ২০১৬

৪৫.       শুধু ধর্মের মধ্যে সমাধান খোঁজা নয়, আলী রীয়াজ, প্রথম আলো, ১১ আগস্ট ২০১৬

৪৬.      সালাফি মতাদর্শের ব্যক্তিদের নিয়ে উত্থান জেএমবির, টিপু সুলতান, প্রথম আলো, ৫ আগস্ট ২০১৬

৪৭.       ২০ দল জামায়াতকে এভাবে না রাখার পক্ষে, প্রথম আলো, ২ আগস্ট ২০১৬

৪৮.      নব্য জেএমবি এখনো হুমকি, টিপু সুলতান, প্রথম আলো, ১০ অক্টোবর ২০১৬

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন