সারসংক্ষেপ

মার্ক্স-সমর্থক ও মার্ক্সবিরোধী উভয় দলই কার্ল মার্ক্সকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে। মার্ক্সের দর্শনকে সামনে এগিয়ে নিতে হলে সুষ্ঠু মার্ক্সপাঠ অত্যাবশ্যকীয়। মার্ক্সের অন্যতম কৃতিত্ব হলো তাঁর পুঁজি গ্রন্থ, যার ভেতর দিয়ে তিনি পুঁজির বিকাশ ও এর মধ্যে অন্তর্নিহিত বিনাশের উপাদানগুলো ব্যাখ্যা করেছেন। এ সম্পর্কে সঠিকভাবে জানা যেমন প্রয়োজন, তেমনি বর্তমান যুগকে মাথায় রেখে পুঁজির পরিবর্তনগুলোয় নজর দেওয়া জরুরি। অনেকগুলো পরিবর্তনের মধ্যে মার্ক্সবাদী অর্থনীতিবিদেরা আর্থিক পুঁজি, শিল্পপুঁজি, বাণিজ্যিক পুঁজি ও করপোরেট পুঁজি নামের চারটি নতুন উপাদানের কথা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সামনে এনেছেন বারবার। এর পাশাপাশি মার্ক্সবাদীদের আত্মজিজ্ঞাসাও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সমাজতন্ত্র বিজয়ী হলো নাকি পুঁজিবাদ বিজয়ী হলো, সেই আলোচনার চেয়ে সমাজতন্ত্রের অস্তিত্বের প্রয়োজনীয়তায় বেশি জোর দেওয়া প্রয়োজন। থমাস পিকেটি একবিংশ শতকে পুঁজির ধরন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মার্ক্স ও পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদ কুজনেত্স উভয়কেই সমালোচনা করেছেন। আধুনিককালে পুঁজির ধরন নিয়ে তিনি বিস্তর বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন কেন বৈষম্য ক্রমাগতভাবে বাড়বে এবং তার করণীয় কী।

মুখ্য শব্দগুচ্ছ: মার্ক্স, পুঁজির বিকাশ ও বিনাশ, পিকেটি, একুশ শতকে পুঁজি, মার্ক্স-পিকেটি সম্পর্ক, পুঁজির বৈচিত্র্য, মার্ক্সবাদীদের আত্মজিজ্ঞাসা, পুঁজিবাদ সংস্কার।

‘What these gentlemen all lack is dialectic. They never see anything but here cause and there effect. That is a hollow abstraction, that such polar opposites only exist in the real world during crises, while the whole vast process proceeds in the form of interaction (though of very unequal forces, the economic movement being by far the strongest most elemental and most decisive) and that here everything is relative and nothing is absolute-this they never begin to see. Hegel has never existed for them.” [Source: Marx–Engels (1975a)]

‘এসব ভদ্রলোকের মধ্যে যা নেই তা হলো দ্বান্দ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি। কোনো কিছুর কারণকে এক স্থানে আর ফলাফলকে অন্য স্থানে দেখতে তারা বেশ অভ্যস্ত—এ ছাড়া অন্য কিছুই তারা দেখতে পায় না। ফলে এটি হয়ে দাঁড়ায় অন্তঃসারশূন্য বিমূর্তায়ন। বাস্তব দুনিয়ায় কেবল সংকটকালীন মুহূর্তেই এমন সংলগ্ন জিনিসের এ ধরনের বিপরীত মেরুর অবস্থান দেখা যায়। অথচ ইতিহাসজুড়ে কারণ ও ফলাফলের বিশাল প্রক্রিয়াটি বিচ্ছিন্নভাবে অগ্রসর হয়নি, বরং আমরা এদের দেখি দ্বান্দ্বিক রূপে (যদিও তা সংঘটিত হয় খুবই অসম দুই শক্তির মধ্যে: অর্থনৈতিক গতিশীলতার শক্তিই এখানে সবচেয়ে শক্তিশালী নির্ধারক হিসেবে কাজ করে)। এ কারণে দুনিয়াতে সবকিছুই আপেক্ষিক; কোনো কিছুই শাশ্বত নয়—যা তারা এখনো বুঝতে শুরু করেনি। হেগেলকে তারা কখনোই বুঝে উঠতে পারেনি।’ [উপরিউক্ত ইংরেজি উদ্ধৃতির লেখককৃত বঙ্গানুবাদ]    

প্রারম্ভিক কথা

দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ হচ্ছে মার্ক্সের সব লেখার প্রাণবস্তু। একে অনুধাবন না করে মার্ক্স অধ্যয়নের প্রচেষ্টা দুই ধরনের একদেশদর্শিতার (One-sidedness) জন্ম দিয়েছে। এক দল মার্ক্সের আবিষ্কৃত স্থান-কাল-পাত্র সাপেক্ষ আপেক্ষিক শিক্ষাগুলোকে একধরনের আপ্ত বাক্যে পরিণত করে মার্ক্সকে ধর্মগুরুর মতো মর্যাদা দান করেছে। আরেক দল মার্ক্সবিরোধী পণ্ডিত ‘খড়ের মার্ক্স’ তৈরি করে তাকে খণ্ডন করে ভেবেছে যে অবশেষে মার্ক্স খণ্ডিত হলো! মার্ক্সকে দেবতা বানানোও যেমন ভুল, তেমনি মার্ক্সকে সাবজেক্টিভ পাঠের মাধ্যমে একটি ‘খড়ের মার্ক্স’ তৈরি করাও কোনো একাডেমিক সততার পরিচয় বহন করে না। যেকোনো মহত্ লেখকের লেখা থেকে একটি বাক্যকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে পরিপ্রেক্ষিত ছাড়াই তাকে মিথ্যা বলে ঘোষণা দেওয়া খুবই সহজ একটি কাজ। মার্ক্স বহুবার এ ধরনের আক্রমণের শিকার হয়েছেন। দুটি সুপ্রচলিত উদাহরণ দিচ্ছি। যেমন বলা হয় মার্ক্স ‘সমাজতন্ত্রের’ কথা বলেছেন, সোভিয়েত সমাজতন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে অতএব মার্ক্স ভুল প্রমাণিত হয়েছেন। আবার উল্টো বলা হয় ‘সমাজতন্ত্রের’ অভ্যন্তরীণ কোনো ত্রুটি ছিল না, মার্ক্সের তত্ত্ব থেকে বিচ্যুতি ও বাইরের ষড়যন্ত্রই সমাজতন্ত্রের পতনের কারণ। এই দুই রকম তত্ত্বই ভুলে যায় যে মার্ক্স বা এঙ্গেলস কেউই সমাজতন্ত্রের ব্লুপ্রিন্ট দিয়ে যাননি এবং আমাদেরই দেশের একজন প্রগতিশীল অধ্যাপক খুব সুন্দর করে বলেছেন যে ‘পুঁজিবাদ সম্পর্কে মার্ক্সের রচনা ভান্ডারটিকে যদি আমরা সাগর নাম দিই, তাহলে সমাজতন্ত্র সম্পর্কে তার রচনাবলির নাম হওয়া উচিত গোষ্পদ।’ তাই সমাজতন্ত্রের পরবর্তী ব্যর্থতা বা ত্রুটির সবকিছুর জন্য মার্ক্সকে অনর্থক দায়ী করা যেমন ভুল, তেমনি স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা না করে মার্ক্সকে হুবহু প্রয়োগ করার চেষ্টা করাটাও ভুল। 

মার্ক্সের জন্ম ১৮১৮ সালের ৫ মে। লেনিন তাঁর কার্ল মার্ক্স প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘১৮৮৩ সালের ১৪ মার্চ আরামকেদারায় বসে শান্তভাবে মার্ক্স তাঁর শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন’  [লেনিন, ১৯১৪]। এই শান্তভাবে মৃত্যুবরণকারী মানুষটির জীবন ছিল বেশ অশান্ত। তিনি ছিলেন দেশান্তরি বিপ্লবী। পুলিশ তাঁকে এক দেশ থেকে আরেক দেশে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। প্রথমে বেলজিয়াম, তারপর ফ্রান্স, তারপর জার্মানিতে আবার সেখান থেকে বিতাড়িত হয়ে ফ্রান্সে এবং সেখান থেকে শেষ পর্যন্ত লন্ডনে এসে মার্ক্স স্থিতিশীল হন এবং সেখানেই মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর জীবন অতিবাহিত করেন। মার্ক্সের ৬৫ বছরের এই জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি হচ্ছে পুঁজি (Capital) গ্রন্থের প্রথম খণ্ডের রচনা ও প্রকাশ। জার্মান ভাষায় রচিত গ্রন্থটির প্রথম খণ্ডটি প্রকাশ পায় ১৮৬৭ সালে। পরবর্তী সময়ে ১৮৭৩ সালে এর দ্বিতীয় জার্মান সংস্করণটি প্রকাশিত হয় এবং সেটিরও ভূমিকা লেখেন কার্ল মার্ক্স। তৃতীয় ও চতুর্থ জার্মান সংস্করণটি প্রকাশিত হয় মার্ক্সের মৃত্যুর পর ১৮৮৩ এবং ১৮৯০ সালে। উভয়ের ভূমিকা লিখেছেন মার্ক্সের আজীবন বন্ধু ফ্রেডারিক এঙ্গেলস। আমরা যে ইংরেজি অনুবাদে ক্যাপিটাল প্রথম খণ্ড পড়ে থাকি সেটিও প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল মার্ক্সের মৃত্যুর পর ১৮৮৬ সালে এবং সেটারও ভূমিকা লিখেছিলেন ফ্রেডারিক এঙ্গেলস। তিনিই মার্ক্সের অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপির ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে ক্যাপিটাল-এর অন্য দুটি খণ্ড সম্পাদনা করেছেন।

ক্যাপিটাল গ্রন্থের বিষয় হচ্ছে পুঁজি এবং পটভূমি হচ্ছে অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতকের ইউরোপ, আরও ঠিক করে বললে ফ্রান্স, জার্মানি ও ইংল্যান্ড। এ যুগটা ছিল পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার জন্ম ও বিকাশের যুগ। মার্ক্সের ভাষায় যার ‘ক্লাসিক গ্রাউন্ড’ (চিরায়ত ভিত্তি) হচ্ছে ইংল্যান্ড। মার্ক্স নিজেই পুঁজি গ্রন্থের প্রথম খণ্ডের প্রথম ভূমিকাতে লিখেছেন:

‘In the work I have to examine the capitalist mode of production and the conditions of production and exchange corresponding to that made up to the present time, their classic ground is England. That is the reason why England is used as the chief illustration in the development of my theoretical ideas.’ (এ লেখায় আমাকে পুঁজিবাদী উত্পাদনপদ্ধতি এবং তার উত্পাদন ও বিনিময়ের শর্তাবলিকে পরীক্ষা করে দেখতে হয়েছে। এখন পর্যন্ত এর চিরায়াত ভিত্তিভূমি হচ্ছে ইংল্যান্ড। সে জন্যই আমার তাত্ত্বিক ধারণাসমূহের বিকাশের ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে ইংল্যান্ডকেই প্রধান দৃষ্টান্তরূপে ব্যবহার করা হয়েছে।)

তারপরেই তিনি তার জার্মান পাঠকদের সতর্ক করে বলেছেন যে ইংল্যান্ডের শিল্প ও কৃষি শ্রমিকদের দুর্দশা দেখে জার্মানরা যদি মনে করে থাকেন যে জার্মানিতে অবস্থাটা মোটেও তত খারাপ নয়, তাহলে তাঁরা ভুল করবেন। কারণ, তাঁর ভাষায়,

‘The country that is more developed industrially only shows to the less developed the image of its future.’ (উন্নত শিল্পায়িত দেশটি হচ্ছে কম উন্নত দেশটির ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি মাত্র।)

এ উদ্ধৃতি থেকে মনে হতে পারে যে মার্ক্স সব দেশের জন্য পুঁজিবাদী বিকাশের এবং তার যন্ত্রণাময় পরিণতির (শ্রমিক শ্রেণির জন্য) অবধারিত ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। এবং সে জন্য হয়তো পুঁজিপতিদেরই তিনি জঘন্য শত্রু হিসেবে দায়ী করেছেন। অনেক মার্ক্সবাদী এভাবেই মার্ক্সকে পাঠ করেছেন। তার ফলে পুঁজিবাদের অবশ্যম্ভাবিতা ও পুঁজিপতিদের নেতিবাচক অনিবার্যতাই তাদের পাঠে সমধিক গুরুত্ব পেয়েছে।

এ ধরনের ভাবাদর্শভিত্তিক পাঠের অসুবিধা হলো: এটি মার্ক্সের সামগ্রিক পাঠ নয়। দ্বান্দ্বিক পাঠও এটি নয়। মার্ক্সেরও একটি ভাবাদর্শ আছে কিন্তু সেটিও দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী পদ্ধতিতে নির্মিত। তাই আমাদের মনে রাখতে হবে যে পুঁজি সব সময় ‘একরকম ভালো’ বা ‘একরকম খারাপ’ থাকেনি। আমাদের ‘পুঁজিকে’ দেখতে হবে তাঁর জন্ম-বিকাশ-মৃত্যু—এই দীর্ঘ গতিশীল পথপরিক্রমণের ধারায় ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতে। কখন পুঁজি দুর্বল হচ্ছে, কখন সে সবল হচ্ছে, বিকাশমান পুঁজি নিজেই কখন স্থবির ও সংকটে পতিত হচ্ছে, কখন সে সংকটে জর্জরিত হয়ে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে মৃত্যু আসন্ন কিন্তু তারপরও কখনো সে ‘ফিনিক্স পাখির’ মতো ছাইভস্ম থেকে পুনরায় উদিত হচ্ছে, আবার আরেকটি বৃহত্তর সংকটের দিকে ধাবিত হওয়ার জন্য সেই বিচিত্র গতি-পরিণতির সব মাত্রা ও দিকের আন্তক্রিয়ায় পুঁজিকে আমাদের দেখতে হবে একটি জীবন্ত গতিশীল সত্তা রূপে, যদি আমরা প্রকৃতই মার্ক্সের মতো করে পুঁজিকে দেখতে চাই। মার্ক্সের মতো করে পুঁজিকে দেখার অর্থ কী তা মার্ক্সের মুখেই শোনা যাক। পুঁজি গ্রন্থের জন্য রচিত এই প্রথম খণ্ডের প্রথম ভূমিকাতেই মার্ক্স পরিষ্কার করে বলেছেন:

‘It is the ultimate aim of this work, to lay bare the economic law of motion of modern society-it can neither clear by bold leaps, nor remove by legal enactments, the obstacles offered by the successive phases of its normal development. But it can shorten and lessen the birth pangs. To prevent possible misunderstanding a word. I paint the capitalist and the landlord in no sense coleur de rose. But here individuals are dealt with only in so far as they are the personifications of economic categories, embodiments of particular class relations and class interests. My standpoint from which the evolution of the economic formation of the society is viewed as a process of natural history, can less than any other make the individual responsible for relations whose creature he especially remains, however much he may subjectively raise himself above them.’

‘এই গ্রন্থের চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে, আধুনিক সমাজের (পুঁজিবাদের—কারণ সেটাই তখন ছিল বিশ্বের আধুনিক সমাজ-লেখক) গতির অর্থনৈতিক বিধানটি উন্মোচিত করে প্রদর্শন করা। এর স্বাভাবিক বিকাশের নিয়মানুযায়ী যেসব প্রতিবন্ধকতা পর্যায়ক্রমে এর সামনে উপস্থিত হবে, যেগুলো সে দুঃসাহসী লম্ফ দিয়েও পার হতে পারবে না। আইনকানুন প্রণয়ন করেও দূর করতে পারবে না তবে যেসবের ভূমিষ্ঠ হওয়ার যন্ত্রণাকে সে কিছুটা কমাতে বা হ্রাস করতে পারবে। ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ যাতে না থাকে সে জন্য আরেকটি কথা। আমি পুঁজিপতি ও ভূস্বামীদের যে ছবি এখানে এঁকেছি তা কোনো অর্থেই সোনালি বর্ণের হয়নি। কিন্তু এখানে ব্যক্তিকে ব্যবহার করা হয়েছে অর্থনৈতিক প্রত্যয়, বিশেষ শ্রেণি সম্পর্ক এবং বিশেষ শ্রেণি স্বার্থের প্রতীক রূপে। আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো সমাজের অর্থনৈতিক গঠনের বিবর্তন হচ্ছে একটি স্বাভাবিক ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া, এই ক্ষেত্রে তাই ব্যক্তি হচ্ছে এসব সম্পর্কেরই সৃষ্টি।

এসব সম্পর্কের পরিবর্তনের জন্য একক ব্যক্তিকে তাই দায়ী করা আমার পক্ষে একেবারেই অসম্ভব তা সে ব্যক্তি বিষয়ীগতভাবে নিজেকে যত ওপরেই তুলে ধরুন না কেন।’

ঊনবিংশ শতকে পুঁজির বিকাশের নিয়মাবলি—মার্ক্সের দৃষ্টিতে

পুুঁজি গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে পুঁজির গতিচিত্র ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মার্ক্স যে বিষয়ানুক্রম অনুসরণ করে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন তার একটি সংক্ষিপ্ত ক্রম প্রথমে তুলে ধরছি:

ক.        পুঁজির প্রথম অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে পণ্যের বিনিময়-প্রক্রিয়ায় মুদ্রার অনিবার্য উদ্ভবের নিয়ম।

খ.        দ্বিতীয় অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে মুদ্রার পুঁজিতে রূপান্তরিত হওয়ার নিয়ম। কীভাবে সরল পণ্য উত্পাদন জটিল পণ্য উত্পাদনে পরিণত হচ্ছে ইত্যাদি।

গ.         তৃতীয় অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টির নিয়ম।

ঘ.         চতুর্থ অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টির লক্ষ্যে পুঁজিপতি কর্তৃক উন্নততর প্রযুক্তিগত বিকাশের প্রক্রিয়াটি।

ঙ.        এসবের ধারাবাহিক পরিণতিতেই পুঁজিবাদের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে গড়ে উঠছে প্রথমে হস্তশিল্প গিল্ড। তারপর একই ছাদের তলে বৃহদায়তন হস্তশিল্প, যাকে মার্ক্স ম্যানুফেকচারিং নাম দিচ্ছেন। সর্বশেষে জন্ম নিচ্ছে বিস্তৃত অভ্যন্তরীণ শ্রম বিভাজনসহ বৃহদায়তন যন্ত্রশিল্প। একই দেশের ভেতরে এরপর থেকে কৃষি এবং শিল্প, শহর এবং গ্রাম সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে গেল। সামন্তবাদ তখন আর প্রধান উত্পাদনপদ্ধতি নয়।

মার্ক্সের এসব বিশ্লেষণ থেকে পুঁজির যৌক্তিক বিবর্তনশীল মডেলটি আমাদের সামনে পরস্ফুিটিত হয়ে ওঠে। এই মডেলে পুঁজির পরিপূর্ণ বিকশিত পর্যায়ক্রমিক রূপগুলো হলো: মুদ্রারূপ পণ্যরূপ উত্পাদনশীলরূপ আবার নতুন পণ্যরূপ

আবার মুদ্রারূপ। এভাবেই পুঁজি ক্রমাগত রূপান্তরিত এবং আবর্তিত হচ্ছে। নিচের নকশায় মার্ক্সের এই ক্রমাগত বিকাশমান পুঁজির পর্যায়ক্রমিক রূপগুলোর চিত্রটি তুলে ধরা হলো:

                            শ্রমশক্তি

            মুদ্রা                  উত্পাদন    নতুন পণ্য    মুদ্রা

            কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি

এই নকশাই হচ্ছে পুঁজিবাদী উত্পাদন-প্রক্রিয়ার সরল মৌলিক ‘অ্যানাটমি’ বা প্রাথমিক অঙ্গব্যবচ্ছেদ। পুঁজিকে যদি মসৃণভাবে টেকসইভাবে সচল রাখতে হয় তাহলে তাকে তার সবগুলো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সচল রাখতে হবে এবং পুঁজির প্রতিটি পর্যায়ক্রমিক রূপের মধ্য দিয়ে পুঁজিকে আবর্তিত হতে হবে। নিজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যাত্রা করে আবার বর্ধিত আয়তনে যাত্রাবিন্দুতে উপনীত হতে হবে নতুন যাত্রা শুরুর জন্য। যতক্ষণ পুঁজি এই প্রক্রিয়া সাফল্যের সঙ্গে চালিয়ে যেতে পারবে ততক্ষণ পুঁজির কোনো সংকট নেই—বিনাশ নেই। এই কাজে পুঁজির প্রধান দুটি উপায় হচ্ছে ক্রমাগত মুনাফা আহরণ বা উদ্বৃত্ত আহরণ ও তার ক্রমাগত উত্পাদনশীল পুনর্বিনিয়োগ। প্রবৃদ্ধির এই জান্তব অভীপ্সাই হচ্ছে পুঁজিবাদের অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি।

উত্পাদনশক্তির বিকাশের এই দিকটাকেই মার্ক্স মধ্যযুগের অচলায়তন ভাঙার অগ্রদূত হিসেবে প্রশংসা করেছিলেন। কিন্তু এটুকু সত্য আবিষ্কার করে বা উন্মোচিত করেই মার্ক্স ক্ষান্ত হননি। পুঁজির যেমন জন্মকালীন প্রগতিশীলতা আছে, তেমনি তার বার্ধক্য এবং মুমূর্ষুতাও থাকবে—গতিশীল দ্বান্দ্বিক দার্শনিক মার্ক্সের কাছে সেটা স্বতঃসিদ্ধ একটি বিষয়। কিন্তু মার্ক্স ইউটোপিয়ান বা কাল্পনিক দার্শনিক ছিলেন না। তাই তিনি চেষ্টা করেছেন পুঁজির বাস্তব অর্থনৈতিক আত্মগতির মধ্যেই পুঁজির আত্মবিধ্বংসী উপাদানগুলো খুঁজে বার করতে। আজকের যুগে আমরা যখন পুঁজি নিয়ে আলোচনা করব তখন এই দ্বিতীয় দিকটিও আমাদের ভালোমতো নজর দিতে হবে।

পুঁজির আত্মবিধ্বংসী যে উপাদানগুলো মার্ক্স তদানীন্তন পুঁজিবাদের গতিকে বিশ্লেষণ করে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন সেগুলোই এখানে তুলে ধরছি:

১.         অবাধ বাজারব্যবস্থায় বৃহত্ পুঁজি ছোট পুঁজিকে প্রতিযোগিতায় হারিয়ে দেবে, যেহেতু স্কেল অব ইকোনমি বিদ্যমান।

২.         ক্ষুদ্রায়তন ব্যক্তিমালিকানা তাই বাজার প্রতিযোগিতার অধীনে ক্রমেই নিঃস্ব হয়ে যাবে, টেকসই হবে না।

৩.        সমাজে দুই মেরুর সৃষ্টি হবে—একদিকে সম্পদ এবং আয়ের প্রাচুর্য এসে জমা হবে। অন্যদিকে স্বল্প আয় ও সম্পদহীনতা বৃদ্ধি পাবে।

৪.         বিশাল শ্রমিক শ্রেণির উদ্ভব হবে। তারাই সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণিতে পরিণত হবে। এবং শ্রেণি সংগ্রাম ত্বরান্বিত হবে।

৫.         বাজারে অপরিকল্পিত উত্পাদনের কারণে নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়। সর্বদা দামের ওঠানামা চলতে থাকবে। মন্দা ও স্ফীতির ব্যবসা চক্র থেকে পুঁজিবাদের মুক্তি কখনো হবে না।

৬.        কখনো অতি-উত্পাদন ও মন্দা, কখনো স্বল্প উত্পাদন ও মুদ্রাস্ফীতি চলবে।

৭.         যান্ত্রিক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে শিশু ও মহিলা শ্রমিকেরা প্রতিকূল শর্তে শ্রমবাহিনীতে যোগ দেবেন। যন্ত্র কর্তৃক শ্রম প্রতিস্থাপিত হয়ে বেকারত্বও সৃষ্টি হবে।

৮.        পুঁজিবাদ মজুরিকে নিয়ন্ত্রণের জন্য সর্বদাই একটি রিজার্ভ আর্মি অব লেবার বেকারত্বেও টিকিয়ে রাখবে, তাই সেখানে কখনো ফুল এমপ্লয়মেন্ট বেকার জনগোষ্ঠী তৈরি হবে না।

৯.         পুঁজির প্রাচুর্য হলে পরে মুনাফার হার ক্রম অবনতিশীল হবে। ফলে পুঁজির বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির গতি আবার শ্লথ হয়ে যাবে। অথবা সেই সংকট থেকে পরিত্রাণের জন্য ঔপনিবেশিক অভিযান ও যুদ্ধের বিস্তৃতি ঘটবে।

১০.       উত্পাদনের জন্য প্রয়োজন হবে সামাজিক সহযোগিতা। কিন্তু ব্যক্তিগত মালিকানা ও বিষম বণ্টনব্যবস্থার কারণে সমাজে শ্রেণিভেদ ও শ্রেণিবৈষম্য বাড়তে থাকবে। ফলে একসময় পুঁজিবাদী উত্পাদন সম্পর্কের অধীনে আর উত্পাদন শক্তিগুলোর ভারসাম্যপূর্ণ সহযোগিতামূলক বিকাশ সম্ভব হবে না। পুঁজি ও শ্রমের দ্বন্দ্ব এবং বিচ্ছেদ চূড়ান্ত আকার ধারণ করবে। পুঁজিবাদের পতন ঘটবে। উচ্ছেদকারীরা উচ্ছেদ হয়ে যাবেন।

একবিংশ শতকের পুঁজির বিশ্লেষণ করতে হলে আজ আমাদের মিলিয়ে দেখতে হবে মার্ক্সের বিশ্লেষিত উপরিউক্ত নেতিবাচক দিকগুলোর মধ্যে কোনগুলো এখনো যুক্তিসিদ্ধ এবং প্রামাণ্য সত্য হিসেবে বিরাজমান। আমার ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে এখানে ‘অল অর নান’ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ সঠিক হবে না। কারণ এ কথা যেমন সত্য যে পুঁজিবাদ কখনোই সংকটশূন্য হতে পারেনি, তেমনি আবার এ কথাও সত্য যে পুঁজিবাদ কখনোই সংকট সমাধানের জন্য নিজস্ব স্বার্থে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও সংস্কারমূলক প্রচেষ্টা থামায়নি। মার্ক্স বর্ণিত নেতিবাচক দিকগুলো পুঁজিবাদের ভেতরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সর্বদাই কম-বেশি ঐতিহাসিকভাবে উত্পাদিত ও পুনরুত্পাদিত হয়েছিল কিন্তু নানা ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ও সংস্কারমূলক হস্তক্ষেপের ফলে তা সর্বত্র সোজা সংকটের বা বিপ্লবের দিকে এগিয়ে যায়নি। ভিন্ন ভিন্ন দেশে আলাদা ধরনের অভিঘাত এবং ফলাফলের জন্ম দিয়েছে। একবিংশ শতকে যদি মার্ক্স আবার ফিরে এসে দ্বিতীয়বার পুঁজি গ্রন্থটি লিখতেন তাহলে পুঁজিবাদের অভিযোজন ক্ষমতা নিয়ে তাঁর একটি দীর্ঘ নতুন মূল্যায়ন করতে হতো বলে আমি বিশ্বাস করি। তবে উত্পাদনের সামাজিক চরিত্রের সঙ্গে মালিকানার ব্যক্তিগত রূপের যে মৌলিক দ্বন্দ্বটি পুঁজিবাদকে কখনো ছাড়েনি, শোষণ ও উদ্বৃত্ত মূল্যের বিষয়টিও যে পুঁজিবাদের অনিবার্য বৈশিষ্ট্য সে সত্যগুলো পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। তবে আপেক্ষিকভাবে সামন্তবাদের বা খুদে উত্পাদনব্যবস্থার তুলনায় পুঁজিবাদের যে অনেক ইতিবাচক দিকও রয়েছে এবং কোথাও কোথাও সমাজতন্ত্র থেকে শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্রীয় পলিসির মাধ্যমে নিজস্ব নেতিবাচক দিকগুলোকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুঁজিবাদ যে যথেষ্ট সংকুচিত করতেও সক্ষম হয়েছে তা আমাদের নির্দ্বিধায় স্বীকার করে নিতে হবে। আমরা এটাও জানি যে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানে বিশেষ ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিশেষ ধরনের পুঁজিবাদী বিকাশের অধীনেই একই সঙ্গে প্রবৃদ্ধি ও বৈষম্য হ্রাস সম্ভব হয়েছিল। একবিংশ শতকে এসে এই ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্তগুলো থেকে মার্ক্সবাদীরা প্রয়োজনীয় শিক্ষাটুকু না নিলে আমরা এমন ‘মার্ক্সবাদী’তে পরিণত হব, যাদের সম্পর্কে আলাপ করতে গিয়ে মার্ক্সকে বলতে হয়েছিল ‘All I know that I am not a Marxist’. [মার্ক্স-এঙ্গেলস, ১৯৭৫-বি]। একবিংশ শতকে এসে পুঁজিবাদের মধ্যেও আজ কতকগুলো নতুন উপাদানের আবির্ভাব হয়েছে, যেগুলো চিরায়ত মার্ক্সবাদে ধরা পড়া সম্ভব ছিল না। কারণ পুঁজিবাদের অভিযোজনের ইতিহাস তখনো ততটুকু মাত্রায় বিকশিত হয়নি, যা থেকে মার্ক্স নতুন তথ্য ও নতুন বিশ্লেষণ সম্পন্ন করতে পারতেন। তখনো কেনস আসেনি এবং কল্যাণ পুঁজিবাদী রাষ্ট্রেরও আবির্ভাব হয়নি। সে জন্যই আজ পুঁজি গ্রন্থে ঊনবিংশ শতকে পুঁজির যে অঙ্গব্যবচ্ছেদ মার্ক্স করেছিলেন এবং ‘অনিবার্য সংকট’ সম্পর্কে যে শর্তসাপেক্ষ ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন সেখানে শর্তাবলির মধ্যে কোনো লক্ষণীয় বিশেষ পরিবর্তন এসেছে কি না, সেটাও আমাদের ঘনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা দরকার। বর্তমানে এ ক্ষেত্রে মার্ক্সবাদী অর্থনীতিবিদেরাই কয়েকটি বিশেষ পরিবর্তনের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এ ক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তনের মধ্যে বারবার তারা প্রধানত চারটি পরিবর্তনের কথা তুলে ধরেছেন।

চারটি নতুন উপাদান

প্রথমত, মার্ক্সের বর্ণিত পুঁজির বিভিন্ন রূপ এখন পরস্পরবিচ্ছিন্ন হয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্তার আকৃতি ধারণ করেছে। যদিও তারা আসলে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। আর্থিক পুঁজি, শিল্প পুঁজি, বাণিজ্যিক পুঁজি, করপোরেট পুঁজি, বিভিন্ন ধরনের ঋণপত্র ইত্যাদি। এদের মধ্যে কোনো কোনোটির উত্পাদনশীল খাতের সঙ্গে যোগাযোগ এখন অনেক বেশি দূরবর্তী ও অপ্রত্যক্ষ। যেমন ব্যাংকিং পুঁজি বা ফিন্যান্স পুঁজি এখন নিজেই নিজের এক বিশাল বৈশ্বিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। পণ্যের বাজার শুধু নয়, পুঁজি ও মুদ্রার বাজারও এখন বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত। ফলে পুঁজির গতিশীলতাও যেমন বেড়েছে, সংকটও তেমনি বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৮ সালের সংকট ও ১৯৯৫ সালের এশিয়ান সংকট তারই দুটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

দ্বিতীয়ত, এখন একবিংশ শতকে নতুন তথ্য-গবেষণা ও প্রযুক্তি বিপ্লবের অভূতপূর্ব বিকাশ সাধিত হয়েছে। ফলে একদিকে যেমন যোগাযোগ ক্ষেত্রে বিপ্লব সাধিত হয়েছে, অন্যদিকে আবার ‘জ্ঞান’ নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্পাদনশক্তিতে পরিণত হয়েছে। ফলে শুধু যন্ত্রের বা শ্রমশক্তির নিয়ন্ত্রণ নয়, জ্ঞানের নিয়ন্ত্রণও শাসকশ্রেণির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। উল্টো দিক দিয়ে জ্ঞানী শ্রমজীবীদের উত্পাদনশীলতা এবং দর-কষাকষির ক্ষমতাও অনেক বৃদ্ধি

পেয়েছে। কিন্তু জ্ঞানকে জ্ঞানের মালিক ব্যক্তি থেকে আলাদা করে ক্রয়-বিক্রয় করা যাচ্ছে না। এর ফলে পুঁজি এখন একটি অসমসত্ত্ব শ্রমবাহিনী তৈরি করেছে, যেখানে নানা ধরনের দক্ষতাসম্পন্ন ভিন্ন ভিন্ন ধরনের শ্রমিক তৈরি হয়েছে। কেউ পাচ্ছেন বেতন, কেউ পাচ্ছেন মজুরি। এমনকি কেউ কেউ পাচ্ছেন মুনাফার

অংশ। এর ফলে শ্রমিকশ্রেণির মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি পেলেও, উত্পাদনব্যবস্থায় তাদের কারোরই কোনো মালিকানা, কর্তৃত্ব বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নেই। আবার কোথাও কোথাও শ্রমজীবীরা সোস্যাল সলিডারিটি সেক্টরের অধীনে যৌথ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে। ফলে শ্রমিকশ্রেণির ভেতরেই আয় ও সম্পদের যথেষ্ট তারতম্য তৈরি হয়েছে। মার্ক্স যেমন ভেবেছিলেন বৃহত্ যন্ত্রশিল্পের অধীনে দুনিয়ার সব শ্রমিক স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ শক্তিতে পরিণত হবে, তেমন সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা অটুট ঐক্য আগের মতো সহজে আর তৈরি হচ্ছে না।

তৃতীয়ত, পুঁজির আবর্তন চক্র এখন আরও বেশি করে জাতীয় পরিসীমা অতিক্রম করে বৈশ্বিক শ্রম বিভাজনের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাপী আবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু এই পুঁজির নিয়ন্ত্রণাধীন শ্রম বিভাজন আঞ্চলিকভাবে বৈষম্যপূর্ণ এক শ্রম বিভাজন, কারণ এখানে পুঁজির গতির অধিকার অসীম অথচ শ্রমের গতির অধিকার বেশ সীমিত। ফলে পুঁজি অনায়াসে সস্তা শ্রমের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য নিজের বাসা থেকে দুনিয়ার যেকোনো প্রান্তে ছুটে যেতে পারছে। অন্যদিকে উদ্বৃত্ত শ্রম বিভিন্ন অঞ্চলে বন্দী এবং পুঁজির সঙ্গে যুক্ত হতে না পেরে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুবরণ করছে। আর যদিও কখনোবা সুযোগ পেয়ে পুঁজির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে তা হচ্ছে খুবই প্রতিকূল প্রতিযোগিতার শর্তে। অন্যদিকে, আগে থেকে প্রান্তের রাজ্যগুলোতে অবস্থিত জাতীয় শিল্প পুঁজির সঙ্গে বাইরে থেকে নতুন ছুটে আসা পুঁজির দ্বন্দ্বও কোথাও কোথাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। উন্মুক্ত পুঁজিবাদী বাজারব্যবস্থায় তাই আঞ্চলিক বৈষম্য ও অনিশ্চয়তা ক্রমাগতই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

চতুর্থত, একটি অসম বিশ্বায়নের প্রক্রিয়া চলছে। একদিকে কোথাও কোথাও আঞ্চলিক বৈষম্যের সঙ্গে সঙ্গে অভ্যন্তরীণ শ্রেণিবৈষম্যও বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে আবার এরই পাশাপাশি শ্রমজীবী অধঃস্তন অ-মালিক শ্রেণির সদস্যদের মধ্যে তাদের শাসক কর্তৃক নানা ধরনের সংস্কারের প্রকোপ এবং সুযোগ-সুবিধাও বৃদ্ধি পেয়েছে। মৌলিক পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার বিপ্লবী পরিবর্তন না করেও বিশ্ব শ্রমজীবীদের একটি বড় অংশ বিশেষত তৃতীয় বিশ্বের প্রাক পুঁজিবাদী ও অনুন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোর জনগণ বৈশ্বিক পুঁজিবাদের ভেতরে থেকেই আপওয়ার্ড মোবিলিটির কোনো না কোনো স্পেস খুঁজে বের করে নিচ্ছেন। হতে পারে সেটা বিদেশি পুঁজির ও প্রযুক্তির আগমন। হতে পারে সেটা প্রবাসে গমন। হতে পারে সেটা একটা শ্রমঘন রপ্তানি শিল্পের অভ্যুদয়। কোথাও কোথাও নিচ থেকে উঠে তৈরি হচ্ছে নব্য মধ্যবিত্ত শ্রেণি। অর্থাত্ পুঁজিবাদ মানেই স্থবিরতা-সংকট—এরূপ সরল চিন্তার কোনো অবকাশ নেই। তবে এসব সুযোগ-সুবিধা-সংস্কারের স্কোপ স্থান-কাল-পাত্রভেদে একেক অঞ্চলে একেক মাত্রায় বিদ্যমান। এই কারণে এই বৈশ্বিক বিকাশ সুষম নয়।

মার্ক্সবাদীদের আত্মজিজ্ঞাসা

মার্ক্সবাদীরা আজ এক সন্ধিক্ষণে উপস্থিত। একবিংশ শতকে তাদের সামনে পুঁজিবাদের সংকট নিয়ে যত না প্রশ্ন, তার চেয়ে অনেক বড় প্রশ্ন সমাজতন্ত্রের কার্যকারিতা নিয়ে। তাদের মধ্যে যারা হতাশ তাদের বক্তব্য হচ্ছে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপে তো সমাজতন্ত্র বিলুপ্তই হয়ে গেল। তাহলে কি এখন বলতে হবে সমাজতন্ত্র পরাজিত হয়েছে? পুঁজিবাদই কি ইতিহাসের শেষ কথা? এদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করতে ও বলতে শুরু করেছেন ‘সমগ্র জীবনটা কি আমরা বৃথাই সমাজতন্ত্রের পেছনে ছুটলাম?’

উপরিউক্ত প্রশ্নগুলোর জবাবদানের সময় শুধু বর্তমান মুহূর্তের পরিস্থিতি বা ব্যক্তিগত জীবনের হতাশার বা বিশ্বাসভঙ্গের বেদনা দ্বারা পরিচালিত হলে সেটা হবে কমিউনিস্টদের জন্য খুবই দুঃখজনক। এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় এটুকুু ইতিহাসচেতনা অবশ্যই রাখতে হবে যে ‘সমাজতন্ত্রের’ পরাজয় মানেই পুঁজিবাদের বিজয় নয়। এ কথাও মনে রাখা দরকার যে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ইউরোপে সমাজতন্ত্রের যে বিপর্যয়, সেখানেই ইতিহাস থেমে নেই। আবার পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদই বিশ্ব ইতিহাসের শেষ কথা হতে পারে না।

পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের আশু ‘দীপ্তি’ দেখে কমিউনিস্টদের হতাশ হওয়ার কিছু নেই। যেকোনো শ্রেণিবিভক্ত সমাজে শ্রমজীবী শোষিত জনগণ যত দিন আছেন তত দিন তাদের উদ্বৃত্ত মূল্য চুরির ব্যাপারটি থাকবে। হতে পারে কোথাও তা নগ্নভাবে উচ্চহারে করা হয়, কোথাও তা রেখেঢেকে নিম্নহারে করা হয়। কিন্তু কম-বেশির প্রশ্ন নয়, যত দিন শোষণ ও অন্যায় থাকবে তত দিন তার বিরুদ্ধে শোষিতদের ন্যায়ের সংগ্রাম চলতে থাকবে। তত দিন কমিউনিজমের ও কমিউনিস্টদের ইচ্ছানিরপেক্ষ সামাজিক বাস্তব ভিত্তি থাকবে। প্রত্যেক ব্যক্তিকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—এই কঠিন সংগ্রামে সে নিজে ব্যক্তিগতভাবে শামিল হবে, নাকি একান্ত ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধিকেই জীবনের মূল লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করবে। অর্থনৈতিক অবস্থানের কারণে শ্রমজীবী শোষিতরাই এই কঠিন পথের প্রধান যাত্রী হবেন। কমিউনিস্টদের তাই স্বাভাবিক সমর্থন ভিত্তি হবে ‘শ্রমজীবী শোষিত জনগণ’। অন্য শ্রেণির লোক, যে পরিমাণ যৌথ স্বার্থের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হবেন, সে পরিমাণে তাঁরা হবেন কমিউনিস্টদের সহযাত্রী, মিত্র বা সহানুভূতিশীল সমর্থক। সব বামপন্থী ও কমিউনিস্টদের আজ ঠিক করতে হবে, তারা কি তাদের পুরোনো ঐতিহাসিক প্রকল্পের ভুল-ভ্রান্তি, সাফল্য-ব্যর্থতা, শৌর্য-বীর্য, হাসি-কান্নায় ভরপুর অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে পরিত্যাগ করবেন এবং পুঁজিবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করবেন, নাকি পুরোনো ঐতিহ্যকে ধারণ করেই তাকে অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যাবেন। বিজ্ঞানের জগতে এই শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন যেমন নিউটনীয় পদার্থবিদ্যাকে ধারণ করেই তাকে অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে গিয়েছিলেন। বিজ্ঞানের অগ্রগতির ইতিহাস প্রমাণ করে যে বর্তমান যুগের নতুন সত্য অতীতের পুরোনো সত্যকে কখনোই পুরোপুরি নস্যাত্ করে দেয় না। এ প্রসঙ্গে অ্যান্টি-ডুরিং গ্রন্থে ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের প্রদত্ত একটি চমত্কার দৃষ্টান্ত এখানে তুলে ধরছি। এঙ্গেলস লিখেছেন,

‘বয়েলের সুপরিচিত সূত্রটি দৃষ্টান্ত হিসাবে ধরা যাক। এই সূত্র অনুযায়ী তাপের পরিমাণ যদি সমান থাকে তাহলে একটি গ্যাসের পরিমাণ তার চাপের পরিমাণের ভিত্তিতে বিপরীতক্রমে পরিবর্তন হবে। রেনলট, দেখলেন, এই সূত্রটি কয়েকটি ক্ষেত্রে কর্যকর হয় না। রেনলট যদি আমাদের দার্শনিকের মতো বাস্তবতার দার্শনিক হতেন তাহলে তাঁকে বলতে হতো: বয়েলের সূত্র পরিবর্তনীয় এবং সূত্রটি সত্য নয়। সূত্রটি মিথ্যা। কিন্তু তেমন সিদ্ধান্ত দ্বারা তিনি বয়েলের সূত্রে যতটা ‘অসত্য’ আছে তার চেয়ে অনেক বড় এক অসত্যে পতিত হতেন। তাঁর নিজের সত্য বিন্দুটি মিথ্যার বালুকা-স্তূপে তলিয়ে যেত। তাহলে তাঁর মূল সঠিক সিদ্ধান্তটিকে তিনি এমন ভ্রান্তির মধ্যে নিক্ষেপ করতেন, যার তুলনাতে বয়েলের সূত্রে যে বিন্দু পরিমাণ অসত্য রয়েছে সেই অসত্যসহ বয়েলের সূত্রটি সত্য বলে বোধ হতো। কিন্তু রেনলট তা করেননি। কারণ তিনি একজন বিজ্ঞানী। তাই তিনি এসব শিশুসুলভ কাজে ব্যস্ত না থেকে তাঁর গবেষণা নিয়ে অগ্রসর হন এবং পরিশেষে এই সত্য আবিষ্কার করেন যে বয়েলের সূত্র মোটামুটি সঠিক। কিন্তু যে গ্যাসকে চাপের মাধ্যমে তরল করা যায় (অর্থাত্ চাপের যে বিন্দুতে গ্যাস তরল হতে শুরু করে) সে ক্ষেত্রে সূত্রটি প্রযোজ্য থাকে না। কাজেই একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বয়েলের সূত্রের সঠিকতা প্রমাণিত হলো। কিন্তু সেই সীমার মধ্যে সূত্রটিকে কি চরম এবং অন্তিমভাবে সত্য বলা চলে? কোনো পদার্থবিজ্ঞানীই এমন কথা বলবেন না। তাঁর কথা হবে, চাপ এবং তাপের কিছু সীমার মধ্যে এবং কতিপয় গ্যাসের ক্ষেত্রে সূত্রটি ঠিক। এবং এভাবে অধিকতর নির্দিষ্ট সীমার ক্ষেত্রেও তিনি ভবিষ্যত্ গবেষণার ভিত্তিতে এর অধিকতর সীমাবদ্ধতা এবং নতুনতর সূত্র তৈরির সম্ভাবনাকে নাকচ করে দেবেন না।’ (দেখুন সরদার ফজলুল করিম অনূদিত, অ্যান্টি-ডুরিং, পৃ-১২২)

কমিউনিস্টরা যে মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী মতাদর্শের উত্তরসূরি তাকে আজ এঙ্গেলসের উল্লিখিত দৃষ্টিভঙ্গি বা দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি ব্যবহার করে পুনরায় যাচাই করে মার্ক্সবাদকে গ্রহণ করতে হবে। ‘অতীতের সবকিছুই ভুল’—এ রকম নৈরাজ্যবাদী নীতির চূড়ান্ত পরিণতি হবে বিলুপ্তি। এ ধরনের পথে বিলুপ্তি হবে অপেক্ষাকৃত দ্রুত ছিন্নভিন্ন হয়ে পচনের মাধ্যমে বিলুপ্তি। আবার ‘অতীতের সবকিছুই ঠিক’—এই দ্বিতীয় পথেরও পরিণতি হবে বিলুপ্তি। এই পথে বিলুপ্তি আসবে ধীরে ধীরে, প্রথমে মৃত্যু এবং পরে মমি বা ফসিলে পরিণত হয়ে। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি ও আশা করি বামপন্থী ও কমিউনিস্টরা বিলুপ্ত হবেন না, বরং সৃজনশীলভাবে বিকশিত, নবায়িত ও পুনর্জাগরিত হবেন।

টমাস পিকেটি: এ যুগের ‘আধুনিক মার্ক্স?’

এবার পিকেটির আলোচনায় আসা যাক। আমার বর্তমান লেখার শিরোনামের প্রথমাংশ হচ্ছে ‘একবিংশ শতকে পুঁজি’। ঠিক এই নামে ফরাসি অর্থনীতিবিদ টমাস পিকেটির একটি ‘বেস্ট সেলার’ (Best Seller) গ্রন্থ আছে। ৭০০ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থটি ক্যাপিটালের প্রচ্ছদের আদলে প্রথম প্রকাশিত হয় ফরাসি ভাষায় ২০১৪ সালের মার্চ মাসে। এরপর হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার ফর ইউরোপিয়ান স্টাডিজ’-এর সঙ্গে জড়িত আরথার গোল্ড হ্যামারকে পিকেটি এটি অনুবাদের প্রস্তাব দেন। তত দিনে এই তরুণ ফরাসি গবেষকের এই শ্রমসাধ্য (১৯৯৮-২০১৩) এক যুগের অসাধারণ কাজটি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনার কক্ষগুলোতে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে শুরু করেছে। একসময় হার্ভার্ডে অনুষ্ঠিত সেমিনারের পরে পিকেটির দেওয়া এই অনুবাদের প্রস্তাবে গোল্ড হ্যামার সানন্দে সম্মতি দেন। উল্লেখ্য যে গোল্ড হ্যামার একজন পেশাদার অনুবাদক, যাকে ‘ফ্রেঞ্চ অ্যামেরিকান’ ফাউন্ডেশন এ যাবত্ তাঁর অনুবাদকর্মের জন্য চার-চারবার পুরস্কৃত করেছে। সুতরাং মাতৃভাষায় প্রণীত একটি মহত্ সময়োচিত কর্ম সূচারুভাবে ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়ে ২০১৪ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা পৃথিবীজুড়ে বিপুল সাড়া তোলে। অল্প কয়েক মাসের মধ্যে ৭০০ পৃষ্ঠার এই বেস্ট সেলার প্রায় তিন লাখ কপি বিক্রি হয়ে যায়। তবে এর পাঠক প্রধানত উন্নত পুঁজিবাদী দেশেই বেশি ছিল। পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামজাদা অধ্যাপকেরা এর প্রশংসনীয় ও কখনো কখনো তীব্র সমালোচনামূলক পর্যালোচনা লিখতে শুরু করেন। আমেরিকার নিউইয়র্ক টাইমস, ইংল্যান্ডের গার্ডিয়ান এবং সুপরিচিত রক্ষণশীল পত্রিকা দ্য ইকোনমিস্ট-এ পক্ষে-বিপক্ষে প্রচুর মতামত প্রকাশিত হতে শুরু করে। এই প্রখ্যাত মতামত জ্ঞাপনকারীদের মধ্যে একদিকে যেমন আছেন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতির অধ্যাপক পল ক্রুগম্যান, তেমনি আরেক প্রান্তে আছেন বিশ্ববিখ্যাত ধনী উদ্যোক্তা বিল গেটস। বামপন্থী ভারতীয় অর্থনীতিবিদ প্রভাত পাটনায়েকও এই বইয়ের একটি বিস্তৃত সমালোচনা করেছেন। বিশ্বের অন্যতম রক্ষণশীল ধনবাদের প্রবক্তা দ্য ইকোনমিস্ট পত্রিকার ৪ মে ২০১৪ সালের সংখ্যায় যে মন্তব্যটি প্রকাশিত হয় তাতে দাবি করা হয় যে পিকেটি হচ্ছেন ‘আধুনিক কার্ল মার্ক্স’।

আসলে ১৯৯০ সালে বার্লিন প্রাচীরের পতনের পর উন্নত দেশগুলোতে পুঁজিবাদের পক্ষে যে ‘উচ্ছ্বাস’ উঠেছিল, পিকেটির বই তাতে একটি প্রবল কার্যকর আঘাত হানতে সক্ষম হয়। অবস্থাটি বোঝার জন্য ইকোনমিস্টের মন্তব্যের পুরো উদ্ধৃতিটি আমি নিচে তুলে ধরলাম,

‘It is the economics book taking the world by storm. ‘Capital in the twenty first century’ written by a French Economist was published in French last year and in March of this year. The English version quickly became an unlikely best seller, has prompted a broad and energetic debate on the book’s subject: the outlook for global inequality. Some reckon it heralds or may itself cause a pronounced shift in the focus of economic policy, toward distributional questions. This newspaper has hailed Mr. Piketty as ‘The Modern Marx’ (Karl that is). But what is it all about?’ [Economist, 4th May, 2014]

‘এটি অর্থনীতির একটি বই যা সারা পৃথিবীতে ঝড় তুলেছে। ‘একবিংশ শতকে পুঁজি’ একজন ফরাসি অর্থনীতিবিদ কর্তৃক লিখিত। এটি গত বছর ফরাসি ভাষায় প্রকাশিত হয় এবং এ বছর মার্চ মাসে পুনরায় প্রকাশিত হয়েছে। বইটির ইংরেজি অপ্রত্যাশিতভাবে দ্রুত ‘সর্বাধিক বিক্রীত’ বইয়ে (Best Seller) পরিণত হয়েছে। বইটির বিষয়বস্তু ‘বৈশ্বিক বৈষম্যের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি’ নিয়ে একটি উদ্দীপ্ত ও বিস্তৃত বিতর্কের সূচনা করেছে অথবা অন্যভাবে বলা যায় অর্থনৈতিক নীতিমালাসংক্রান্ত আলোচনার মনোযোগবিন্দুকে পুনরায় বণ্টনের ইস্যুতে ফিরিয়ে এনেছে। এই পত্রিকা জনাব পিকেটিকে ‘আধুনিক যুগের মার্ক্স’ (অর্থাত্ কার্ল) হিসেবে আবাহন করেছে। কিন্তু এত সবকিছু কিসের জন্য?’ [ ইকোনমিস্ট, ৪ মে, ২০১৪]

এই বইয়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য চয়ন সুদূর ইতিহাসের গভীরে দৃষ্টিপাত—প্রায় আড়াই শতাব্দীব্যাপী (১৭৭০-২০১০) আয় ও সম্পদের গতিপ্রকৃতির সুবিপুল তথ্যনিষ্ঠ চিত্র প্রণয়ন। পশ্চিম ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে ‘পুঁজির জন্ম শৈশব বিকাশ, সর্বশেষ বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যত্ পরিণতি নিয়ে এমন একটি মহাকাব্যিক প্রক্ষেপণ এর আগে মার্ক্স ছাড়া কেউই করার চেষ্টা করেননি।’ নয়া-ধ্রুপদি স্কুলের একজন অর্থনীতিবিদ যখন সংজ্ঞাগত সীমাবদ্ধতাসহই এটা করলেন, তখন তা প্রচলিত নয়া ধ্রুপদি অর্থনীতি এবং তার চেয়েও অধিকতর রক্ষণশীল নব্য উদারবাদী তথাকথিত ‘মুক্ত বাজার অর্থনীতির’ মর্মমূলে গিয়ে আঘাত হেনে তাকে অবশ করে দিল। একই সঙ্গে তা উত্তর আধুনিকবাদের মহা আখ্যানবিরোধী অবস্থানকেও প্রবল একটি ধাক্কা দিতে সক্ষম হয়েছে। এতকাল নব্য ধ্রুপদি অর্থনীতি বলে এসেছিল যে আয় বা সম্পদ ‘বৈষম্য’ পুঁজির বিকাশের জন্মলগ্নে একটি স্বাভাবিক বিষয় এবং পুঁজিবাদী উন্নয়ন বা শিল্পায়নের অনিবার্য অনুষঙ্গ, কারণ প্রথম দিকে শ্রম সরবরাহ থাকে প্রচুর এবং পুঁজি থাকে আপেক্ষিকভাবে দুষ্প্রাপ্য—তাই শ্রমের দাম স্বাভাবিকভাবেই হবে কম এবং পুঁজির ‘রেট অব রিটার্ন’ বা ‘প্রাপ্তি হার’ হবে বেশি। এটাই বাজারের চাহিদা-সরবরাহের প্রাকৃতিক স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম। তাই শৈশবে পুঁজির বিকাশ ঘটে সংযোজিত মূল্যের বড় অংশটি গ্রাস ও বিনিয়োগের মাধ্যমে। শ্রম অঢেল থাকবে যত দিন তত দিন বাজারের নিয়মানুযায়ী শ্রমের প্রকৃত মজুরি নিম্নমাত্রায় স্থবির হয়ে থাকবে শ্রমের পুরুত্পাদন ব্যয় বা শ্রমের ভরণপোষণ খরচটুকুই শুধু শ্রমিক পাবে। এই পর্যায়ে পুঁজি ও প্রযুক্তির বিকাশের ফলে শ্রমের উত্পাদনশীলতা বাড়লেও সেই বাড়তি উত্পাদনশীলতার বেশির ভাগ বা পুরো ফলই পুঁজিপতিদের পকেটেই জমা হতে থাকবে। তবে তাতে ঘাবড়ানোর কিছু নেই, তার একটি দীর্ঘমেয়াদি সুফল আছে। কারণ পুঁজিপতিরা ধনী হওয়ায় তাদের সঞ্চয় হার হবে বেশি এবং তারাই মুনাফার প্রণোদনায় নিয়ত তাদের বাড়তি সঞ্চয় উত্পাদনশীল কাজে বিনিয়োগ করে যাবে। এই সুবাদেই শেষ পর্যন্ত একসময় গ্রাম থেকে শ্রম সরবরাহের উত্স শুকিয়ে যাবে এবং গ্রামে মজুরি বাড়তে শুরু করবে এবং তখন আরও বিকাশের জন্য পুঁজির আরও শ্রমের প্রয়োজন হলে শহরে মজুরি না বাড়িয়ে পুঁজিপতির আর উপায় থাকবে না। এই নতুন পর্যায়ে যখন সমাজে পুঁজি আর দুষ্প্রাপ্য নয় শ্রমই দুষ্প্রাপ্য, তখন পুঁজির আয়ের তুলনায় শ্রমের আয়ের অংশ (মূল্য সংযোজনে) নতুন করে বাড়তে শুরু করবে এবং পুঁজির ‘প্রাপ্তিহার’ ক্রমহ্রাসমান উত্পাদনশীলতা বিধি অনুযায়ী আবার কমতে শুরু করবে। এই সমগ্র বিবর্তনটি ঘটবে শান্তিপূর্ণ অর্থনৈতিক বিবর্তনের নিয়ম অনুযায়ী। তাই অনিবার্য বৈষম্য বৃদ্ধি পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক উন্নতির কারণেই অনিবার্যভাবে শেষাবধি বৈষম্য হ্রাসে পরিণত হবে। সুতরাং সাময়িক বৈষম্য বৃদ্ধি নিয়ে দুশ্চিন্তার তেমন কিছু নেই। এ হচ্ছে উন্নয়নের গর্ভযন্ত্রণামাত্র।

ঠান্ডা যুদ্ধের যুগে পুঁজিপতিদের জন্য এ তত্ত্বটি ছিল খুবই গ্রহণযোগ্য এক তত্ত্ব। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পুঁজিবাদী উন্নয়নের জন্য এই তত্ত্বকে তারা তখন কাজে লাগান প্রবল উত্সাহে। ১৯৫৫ সালে এই তত্ত্ব আবিষ্কার করে আমেরিকার জাতীয় আয় ও তার বণ্টনের উপাত্ত ঘেঁটে তা চমত্কারভাবে প্রমাণ করেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ সাইমন কুজনেত্স। এই কাজের জন্য তাঁকে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারও দেওয়া হয়। তারপর থেকে আয় ও সম্পদবৈষম্য দিয়ে কথা উঠলেই অর্থনীতিবিদদের মূলধারার সদস্যরা বলতে থাকেন এটি হচ্ছে একটি ‘প্রয়োজনীয় মন্দ কাজ’ কিন্তু কেউই এই প্রশ্ন তখন তোলেননি বা তুলতে ভুলে যান যে:

১. অর্থনৈতিক উন্নতির ফলে আয়বৈষম্য যে কমার কথা তা আসলেই কি সত্য? ১৯৫৫ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত যে তথ্য নিয়ে কুজনেত্স আমেরিকার ক্ষেত্রে এটি দেখিয়েছিলেন (যে তথ্যের ভিত্তিতে অর্থনীতির টেক্সট বইয়ে ‘কুজনেত্স কার্ভ’ বা বেল কার্ভের বা ‘ইনভার্টেড ইউ’ চিত্রের উদ্ভব) তা কি আমেরিকান-ইউরোপীয় পুঁজিবাদের একটি অস্বাভাবিক ব্যতিক্রমী সাময়িক পর্যায়, নাকি আসলেই তা স্বাভাবিক পুঁজিবাদের স্বাভাবিক দীর্ঘমেয়াদি বিধি?

এই অত্যন্ত সহজ-সরল সাধারণ জ্ঞানভিত্তিক প্রশ্নটি টমাস পিকেটি তাঁর গ্রন্থে উত্থাপন করেছেন। তারপর তিনি নিজেই এর উত্তরটি যে ভাষায় তুলে ধরেছেন তা আমি হুবহু উদ্ধৃত করছি:

‘Nevertheless, the magical Kuznets curve theory was formulated in large part for the wrong reasons and its emperical underpinnengs were extremely fragile. The sharp reduction in income inequality that we observe in almost all the rich countries between 1914 and 1945 was due above all to the world wars and the violent economic and political shocks they entailed (especially for people with large fortunes). It had little to do with the tranquil process of intersectoral mobility described by Kuznets.’ [Thomas Piketty, 2014, P-14]

‘এতদ্সত্ত্বেও জাদুকরি কুজনেত্স কার্ভটি প্রণীত হয়েছিল বহুলাংশে ভুল যুক্তির ওপর ভিত্তি করে এবং এর তথ্যগত মূল ভিত্তিটিও ছিল খুবই ভঙ্গুর। ১৯১৪ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত আমরা প্রায় সব ধনী দেশেই বৈষম্যের যে তীক্ষ হ্রাসটি দেখতে পাই তার অন্যতম কারণটি ছিল বিশ্বযুদ্ধসমূহ এবং রাজনৈতিক অভিঘাত (বিশেষত বিশাল ভাগ্যের অধিকারী লোকজনদের ওপর)। এর সঙ্গে কুজনেত্স বর্ণিত শান্তিপূর্ণ আন্ত খাত গতিশীলতার সম্পর্ক ছিল খুবই নগণ্য।’ (টমাস পিকেটি, ২০১৪, পৃ-১৪)

পিকেটি কুজনেত্সকে সমালোচনা করার পাশাপাশি বলতে চেয়েছেন যে মার্ক্স ছিলেন ঊনবিংশ শতকের গবেষক। সেই সময় মার্ক্স পুঁজির শৈশব ও বিকাশ (শিল্প বিপ্লবের যুগ) লক্ষ করে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে পুঁজির পরবর্তী অনিবার্যতা হচ্ছে আয় ও সম্পদের আপেক্ষিক বৈষম্য বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সংকটের ঘনীভবন এবং অবশেষে বিপ্লব। সেটাও কিন্তু অনেকাংশে সত্য হয়নি। যদিও এ ধরনের চিন্তা মোটামুটিভাবে তখনকার জন্য বাস্তবভিত্তিকই ছিল। কিন্তু মার্ক্স যেই নতুন বাস্তবতা দেখে যেতে পারেননি, সেটা হচ্ছে দুটি বিশ্বযুদ্ধ এবং বিশ্বযুদ্ধের পর রাজনৈতিকভাবে অভিজ্ঞ বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির পরবর্তী রাজনৈতিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াগুলো। সেসবের অভিঘাতে পুঁজি যে সাময়িকভাবে তখন নবজীবনপ্রাপ্ত হতে পারে সে সম্ভাবনা স্বাভাবিকভাবেই মার্ক্সের নজরে আসেনি এবং আসা হয়তো সম্ভবও ছিল না।

অন্যদিকে কুজনেেসর অনুসারীরা পুঁজির শৈশবকালীন সংকটকে অতীত ইতিহাস হিসেবে স্বীকার করে নিয়ে দাবি করেছেন যে পরবর্তী সময়ে পুঁজির বা সম্পদের সাময়িক বণ্টনবৈষম্য হ্রাসই হচ্ছে পুঁজির বিকাশের একটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্য। কিন্তু তথ্য অনুযায়ী পুঁজিবাদী দেশগুলোতে ১৯১৩ থেকে ১৯৪৫ পর্যন্ত আয় ও সম্পদবৈষম্য হ্রাস পেয়ে অনেক দিন নিচুমাত্রায় থাকলেও ১৯৭০-এর পর থেকে তা পুনরায় অস্বাভাবিক গতিতে বাড়তে থাকে এবং ২০১০ সাল নাগাদ তা আবার সেই ঊনবিংশ শতকের অসহনীয় পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। তাই পিকেটির মতে, ১৯১৪-১৯৪৫-এর বর্ধিষ্ণু পুঁজিবাদের সাময়িক সাফল্য দেখে মার্ক্সকে প্রত্যাখ্যানের কোনো কারণ নেই। সত্য বলতে হলে আমাদের বলা উচিত যে মার্ক্সের চিহ্নিত পথেই ১৯৭০-এর পর পুঁজির বিকাশ আবার শুরু হয়েছে। যা এখন ২০১০ সাল নাগাদ গণতন্ত্র এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য পুনরায় হুমকিতে পরিণত হয়েছে। পিকেটির এই সত্তর-পরবর্তী নতুন তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণটি তাঁর গ্রন্থের সূচনা বক্তব্যেই চমত্কারভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পিকেটির গ্রন্থের সংশ্লিষ্ট অধ্যায়টির শিরোনাম হচ্ছে:

‘From Marx to Kuznets or Apocalypse to Fairy Tale’

(‘মার্ক্স থেকে কুজনেত্স অথবা কেয়ামত থেকে রূপকথা’)

বোঝা যাচ্ছে মার্ক্সের বিশ্লেষণে যদি পুঁজিবাদের চেহারা হয় ‘কেয়ামতের’ মতো, তাহলে মূলধারার অর্থনীতিবিদেরা কুজনেেসর কার্ভকে আশ্রয় করে পুঁজিবাদ সম্পর্কে যে শান্তিপূর্ণ মসৃণ সুষম উন্নয়নের স্বপ্ন তুলে ধরেছেন তা হচ্ছে নেহাতই এক ‘রূপকথা’র মতো। ‘কেয়ামত’ ও ‘রূপকথা’ উভয়কেই প্রত্যাখ্যান করে পিকেটি লিখেছেন:

‘Turning from the nineteenth century analysis of Ricardo and Marx to the twentieth-century analysis of Simon Kuznets, we might say that economists no doubt overly developed taste for apocalyptic predictions, gave way to a similarly excessive fondness for fairy tales, or at any rate happy endings. According to Kuznet’s theory income inequality would automatically decrease in advanced phases of capitalist development, regardless of economic policy choices or other differences between countries untill eventually it stabilized at an acceptable level.’ [Thomas Piketty, P-11] (ঊনবিংশ শতকে রিকার্ডো ও মার্ক্সের বিশ্লেষণ থেকে বিংশ শতকে কুজনেেসর বিশ্লেষণের দিকে অর্থনীতিবিদেরা যখন ঝুঁকতে শুরু করলেন তখন তাদের জন্য ‘পুঁজিবাদে কেয়ামত হবে’ জাতীয় চরম ভবিষ্যদ্বাণীর বদলে একই রকম কায়দায় অত্যন্ত প্রিয় বিষয় হয়ে পড়ল কতিপয় রূপকথা বা একধরনের ‘মধুরেণ সমাপয়েতের’ গল্প। কুজনেেসর তত্ত্ব অনুসারে, আয়বৈষম্য স্ব্বতঃপ্রণোদিতভাবে উন্নত পুঁজিবাদী দেশে হ্রাস পাবে, তা সেসব দেশের অনুসৃতব্য অর্থনৈতিক নীতিমালা যাই হোক না কেন বা দেশে দেশে যে পার্থক্যই থাকুক না কেন। (তার মতে) ক্রমে ক্রমে আয়বৈষম্য (এসব দেশে) একটি গ্রহণযোগ্য মাত্রায় গিয়ে স্থিতিশীল হবে। [টমাস পিকেটি, পৃ. ১১])

কুজনেত্স সম্পর্কে পিকেটির যে অভিযোগ, প্রায় একই রকম অভিযোগ মার্ক্সের বিরুদ্ধেও। পুঁজিবাদী উত্পাদনপদ্ধতি সম্পর্কে মার্ক্স কথিত আপেক্ষিক ও চরম স্থবিরতার যেসব যুক্তি রয়েছে সেগুলোর আপেক্ষিকতা, ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতে নির্ভরতা, সর্বোপরি অর্থনৈতিক নির্ধারণবাদী ব্যাখ্যা থেকে সেগুলোকে মুক্ত করে দেখার প্রয়োজন তুলে ধরেছেন পিকেটি। তাঁর মতে, প্রযুক্তিগত বিপ্লবের ফলে উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধি পায় এবং তখন প্রবৃদ্ধির হারও বেড়ে যায়। তখন উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধির ফল কতটুকু পুঁজির মালিকেরা পাবেন তা প্রথমত নির্ভর করবে পুঁজির প্রাপ্তিহার কত উঁচু তার ওপর। কিন্তু পুঁজিঘন অবস্থায় অতিরিক্ত মাত্রায় পুঁজির আবির্ভাবের কারণে পুঁজির লাভজনক বিনিয়োগক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে আসে এবং পুঁজির প্রান্তিক দক্ষতার হার কম থাকে। এর ওপর কল্যাণ পুঁজিবাদের নিয়মানুযায়ী রাষ্ট্র যদি পুঁজিপতিদের ওপর প্রগতিশীল ট্যাক্স নীতি প্রয়োগ করে, নানা যুদ্ধবিগ্রহের ফলে যদি সম্পদ ধ্বংস হয়ে যায়, উচ্চ জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে যদি প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম উত্তরাধিকারের সময় পুঁজিপতিদের রেখে দেওয়া সম্পদ খণ্ডীকরণের মাধ্যমে পুনর্বণ্টিত হয়, তাহলে স্বাভাবিক আয় ও সম্পদবৈষম্যের প্রবণতাটি নাও অগ্রসর হতে পারে। এই লাগামগুলোই হতে পারে পুঁজিবাদের সাময়িক রক্ষাকবচ। একটি সহজ গাণিতিক উদাহরণ দিয়ে পিকেটি দেখান যে পুঁজির ভাগ্যে জাতীয় আয়ের শেয়ার কতটুকু জুটবে তা নির্ভর করছে পুঁজির রেট অব রিটার্ন (r), জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধির হারের (g) এবং সঞ্চয়ের হার ‘s’-এর ওপর। তার প্রদত্ত মডেলে সমীকরণ দুটি হচ্ছে যথাক্রমে:

যেখানে

ক.             = জাতীয় আয়ে পুঁজির হিস্যা অর্থাত্ আলফা বেশি হওয়ার তাত্পর্য হচ্ছে জাতীয় আয়ে শ্রমের হিস্যা কম হবে অর্থাত্ আয় ও সম্পদবৈষম্য বৃদ্ধি পাবে। যেহেতু পুঁজিলব্ধ আয়ের বণ্টনবৈষম্য শ্রমলব্ধ আয়ের বণ্টনবৈষম্য মাত্রার চেয়ে অনেক উঁচু।

খ.        r = পুঁজির প্রাপ্তি হার বা রেট অব রিটার্ন

গ.         g = প্রবৃদ্ধির হার

             মোট সঞ্চয়

ঙ.        s = সঞ্চয়ের হার =

            মোট জাতীয় আয়

পিকেটি এই সহজ-সরল মডেলকে টেস্ট করার জন্য বহু বছর পরিশ্রম করে (প্রায় এক যুগ) সারা দুনিয়ার ত্ এবং ম-এর দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার তথ্য সংগ্রহ করে তাদের গতিপ্রবণতার প্রক্ষেপণ করেছেন। নিচের চিত্রলেখটি পিকেটির তথ্যের ভিত্তিতে প্রণীত হয়েছে।

নিচের চিত্রটি থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি প্রাক শিল্প বিপ্লব যুগে (১৫০০-১৭০০ সাল) সাধারণভাবে সম্পদ থেকে আয় (r) ছিল বেশ উঁচুমাত্রায় স্থির, কিন্তু সেই তুলনায় প্রবৃদ্ধির হার (g) ছিল তুলনামূলকভাবে বেশ নিচুমাত্রায় স্থির। এই অবস্থায় জাতীয় আয় বাড়বে কম এবং এর বেশির ভাগটাই নিয়ে নেবে সম্পত্তির মালিকশ্রেণি। তাই পিকেটির মডেল অনুসারে প্রাক শিল্প বিপ্লব যুগে আয় ও সম্পদবৈষম্য উচ্চমাত্রায় স্থির হয়ে বিরাজ করবে। শিল্প বিপ্লবের যুগে বা মার্ক্সের যুগে (১৭০০-১৮২০) চিত্র থেকে দেখা যাচ্ছে যে নতুন প্রযুক্তি বিপ্লবের ফলে পুঁজির প্রাপ্তিহার (r) তীক্ষভাবে বেড়েছে। পাশাপাশি জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধির হারও বেড়েছে। তবে  r তুলনামূলকভাবে বেশি বাড়ায় এই সময় বৈষম্য উচ্চমাত্রায় স্থির না থেকে আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সময় শ্রমজীবীরা চোখের সামনে প্রবৃদ্ধি দেখছেন, কিন্তু তার কোনো অংশ তাদের কাছে আসছে না। ১৮২০-১৯১৩ এই সময়ও দেখা যাচ্ছে r সামান্য কমেছে এবং g বেশ বেড়েছে। এর অর্থ হচ্ছে শিল্প বিপ্লবের অগ্রযাত্রার গতি বেড়েছে কিন্তু তার ভাগ পাওয়ার ক্ষেত্রে সম্পদের মালিকদের উচ্চ হার খুব সামান্যই হ্রাস পেয়েছে। এরপর ১৯১৩-১৯৫০ আমরা একটি অস্বাভাবিক চিত্র দেখি, যেখানে r দ্রুত নিচে নামছে কিন্তু তারপরও g না

কমে বেড়েই চলেছে এবং r-এর ওপরে চলে যাচ্ছে। এই অবস্থাটাই হচ্ছে শ্রমজীবীদের হিস্যা বৃদ্ধির সময় কিন্তু পিকেটি মনে করেন এটা হচ্ছে একধরনের ব্যতিক্রম, কারণ পুঁজিবাদের স্বাভাবিক নিয়ম হচ্ছে  r > g. পিকেটির চিত্র আরও দেখাচ্ছে যে একবিংশ শতকে r আবার বেড়ে যাবে পক্ষান্তরে প্রবৃদ্ধির হার বা g আরও হ্রাস পাবে। অর্থাত্ r ও g -এর ব্যবধান ক্রমাগত বাড়তে থাকবে। এর তাত্পর্য হচ্ছে পিকেটির মতে, ভবিষ্যতে পুঁজির আয় শেয়ার বাড়বে এবং তার ফলে সম্পদ ও আয় বণ্টনে বৈষম্য বৃদ্ধি পাবে, যদি না ১৯১৩-৫০ কালপর্বের মতো কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে।

অঙ্ক থেকে ইতিহাস: মার্ক্স সম্পর্কে পিকেটি

পিকেটি একদিকে যেমন কুজনেত্সকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, অন্যদিকে মার্ক্সের ‘চরম পরিণতি’ বিষয়ক ভবিষ্যদ্বাণীকেও পুরোপুরি গ্রহণ করেননি। সেখানে নানা শর্ত আরোপ করে পিকেটি লিখেছেন:

‘From the first to the sixth decade of the nineteenth century, workers wages stagnated at very low levels-close or even inferior to the eighteenth and previous centuries. This long phase of wage stagnation, which we deserve in Britain as well as in France, stands out all the more because economic growth was accelerating in this period. The capital share of national income-industrial profit, land rents and building rents-insofar as can be estimated with the imperfect sources available today increased considerably in both countries in the first half of the nineteenth century. It would decrease slightly in the final decades of the nineteenth century, as wages partly caught up with growth. The data we have assembled nevertheless reveal no structural decrease in inequality prior to World War I. What we see in the period between 1870-1914 is at best a stabilization of inequality at an extremely high level and in certain respects an endless inegalitarian spiral, marked in particular by increasing concentration of wealth. It is quite difficult to say where this trajectory would have led without the major economic and political shocks initiated by the war. With the aid of historical analysis and a little perspective we can now see those shocks as the only forces since the industrial revolution powerful enough to reduce inequality. [Thomas Piketty, 1914,P-8]

পিকেটির এই বর্ণনা মার্ক্সের ক্যাপিটাল ও এঙ্গেলসের ‘The conditions of working class in Britain’-এর বর্ণনার সঙ্গে প্রায় হুবহু মিলে যাচ্ছে। মার্ক্সের এই বিশ্লেষণ ঊনবিংশ শতকের জন্য ঠিক হলেও বিংশ শতকের উন্নত পুঁজিবাদী সমাজে যে অনেক জায়গাতেই কার্যকর হয়নি, পিকেটির তথ্য সেটাও দাবি করে।

কিন্তু পিকেটি এটাও খেয়াল করেন যে ১৯১৪ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত কতকগুলো ব্যতিক্রমী ঘটনার ফলেই ঊনবিংশ শতকের এই ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের প্রবণতার লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হয়েছিল। এই ব্যতিক্রমী ঘটনার মধ্যে প্রধান একটি উপাদান হচ্ছে যুদ্ধের মাধ্যমে বুর্জোয়াদের সম্পত্তির ধ্বংসপ্রাপ্তি। এ থেকে মনে হয় পিকেটি যুদ্ধের দ্বারা অতিরিক্ত পুঁজি ধ্বংস করার মাধ্যমে পুঁজিবাদের বৈষম্য কমানোর কথা বলছেন, যা অনেকটাই লেনিনের ভবিষ্যদ্বাণীর কাছাকাছি। সুতরাং সাম্রাজ্যবাদী যুগে পুঁজিবাদ দুটো বিশ্বযুদ্ধের মাধ্যমে যে নতুন জীবনীশক্তি পেয়েছিল তার ব্যাখ্যা মার্ক্সের মধ্যে তখনই পাওয়া না গেলেও তাঁর উপযুক্ত শিষ্য লেনিন এবং রোজা লুক্সেমবার্গের রচনায় আমরা তার অনেকটাই পেতে পারি। তদনুযায়ী যুদ্ধ যেমন একদিকে পুঁজিবাদকে নতুন জীবনীশক্তি দিয়েছিল, তেমনি বিশ্ব পুঁজিবাদের দুর্বল দুই গ্রন্থিতে বিষয়ীগত শর্ত (Subjective Condition) অনুকূল থাকায় একধরনের সমতা অভিমুখী বিপ্লবের জন্মও দিয়েছিল।

পিকেটি অবশ্য তাঁর গ্রন্থে যুদ্ধ ছাড়াও পুঁজিবাদের আরও কতিপয় বৈষম্য হ্রাসকারী সংস্কারবাদী প্রক্রিয়ার কথা বলেছেন, যা তাঁর মতে মার্ক্সের বর্ণিত পুঁজিবাদের ভয়াবহ পরিণতিকে ঠেকিয়ে দিয়েছে অথবা কিছুটা দীর্ঘায়িত করতে সক্ষম হয়েছে। মার্ক্সের ‘অনিবার্য পতনের’ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে পিকেটির সুনির্দিষ্ট মন্তব্যটি আমি নিচে তুলে ধরছি:

‘Marx’s dark prophecy came no closer to being realized than Ricardo’s. In the last third of the nineteenth century, wages finally began to increase. The improvement in the purchasing power of workers spread everywhere and this changed the situation radically, even if the extreme inequalities persisted and in some respects continued to increase until World War I, the communist revolution did indeed take place, but in the most backward country in Europe, Russia, where the Industrial Revolution had scarcely begun, where as the most advanced European countries explored other social democratic avenues-fortunately for their citizens. Like his predecessors Marx totally neglected the possibility of durable technological progress and steadily increasing productivity which is a force that can to some extent serve as a counter weight to the process of accumulation and concentration of private capital. He no doubt lacked the statistical data needed to refine his predictions.’ [Thomas Pikitty-P-10]

উদ্ধৃতি আর না বাড়িয়ে মার্ক্সের বিরুদ্ধে পিকেটির আরও যে কটি সামান্য অনুযোগ রয়েছে তা সংক্ষেপে নিচে তুলে ধরছি:

ক.        মার্ক্স ১৮৪৮ সালেই পুঁজিবাদের অভ্যন্তরীণ অসংগতি সম্পর্কে তত্ত্বগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে একধরনের সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন। পরে যখন তিনি পুঁজি গ্রন্থ রচনা করতে যান তখন তার পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্ত তাকে পুঁজিবাদ সম্পর্কে ‘অনিবার্য ধ্বংসের’ মতো চরম অবস্থানের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।

খ.        মার্ক্স তাঁর আমলে তাঁর তত্ত্বগুলো যাচাইয়ের জন্য ব্যাপক পরিসংখ্যানও পাননি। তখন ‘জাতীয় আয়’, ‘পুঁজির প্রাপ্তিহার’, জাতীয় আয়ে পুঁজির ও শ্রমের হিস্যা, আয়বৈষম্য, সম্পদবৈষম্য ইত্যাদি সামষ্টিক চলকের পরিমাণ ও পরিসংখ্যানও মার্ক্সের পক্ষে বিচার করা সম্ভব হয়নি। হয় তখনো এগুলো পরিমিতই হয়নি অথবা পরিমিত হলেও তা মার্ক্সের নাগালে আসেনি।

পিকেটির তথ্য অবশ্য ১৯৭০-এর পর আবার দেখাচ্ছে যে পুঁজিবাদী সব উন্নত দেশেই মার্ক্সের প্রেতাত্মা পুনরায় ফিরে আসতে শুরু করেছে। বিশ্ব পুঁজিবাদের গড় বৈষম্য সাধারণভাবে অতি উচ্চ মাত্রায় উপনীত হলেও একেক দেশে বৈষম্যের সুনির্দিষ্ট পরিমাপটি একেক রকম। তাই এই সাধারণ সত্যের রকমফেরকে শুধু পুঁজিবাদের সাধারণ অর্থনৈতিক নিয়ম বা পুঁজির নৈর্ব্যক্তিক নিয়ম দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। পিকেটি নিজেই বলেছেন,

‘As I explained earlier I began this work by collecting sources and establishing historical time series pertaining to distribution of income and wealth. As the book proceeds, I sometimes appeal to theory and to abstract models and concepts, but I try to do so sparingly and only to the extent that theory enhances our understanding of the changes we observe.’ [Thomas Piketty, 2014, P-33]

এ জন্য রক্ত-মাংসের পুঁজিবাদের বিকাশের মডেলে রাজনীতি, রাষ্ট্রীয় পলিসি, শ্রেণিসংগ্রাম, পুঁজির বিশ্বায়ন মাত্রা ইত্যাদিকেও এযাবত্ অবহেলিত কিন্তু বর্তমানে যথেষ্ট প্রভাবশালী নির্ধারক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আমরা যদি জীবন্ত গতিশীল সত্যকে বুঝতে চাই তাহলে আমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের সব শাখাকে (শুধু অর্থনীতি নয়) ব্যবহার করে অগ্রসর হতে হবে। পিকেটির বইয়েও এমনকি নানা ধরনের সাহিত্যের ব্যবহারও লক্ষ করা যায়, বিশেষ করে মার্ক্সের প্রিয় ফরাসি লেখক বালজাকের একটি উপন্যাসকেও (বালজাক, ১৮৩৫) সেই যুগের সমাজচিত্র বর্ণনার জন্য খুবই সৃজনশীলভাবে তিনি ব্যবহার করেছেন।

আত্মস্বীকারোক্তিতে পিকেটি বলেছেন যে তাঁর ১৮ বছর বয়স হয়েছিল ১৯৮৯ সালে। সেটি ছিল ফরাসি বিপ্লবের দ্বিশতবার্ষিকী, একই সঙ্গে সেটি ছিল ‘বার্লিন প্রাচীরের’ পতনের বছর। এই অবস্থায় প্রথমে পিকেটি অন্য অনেক প্রতিভাবান অর্থনীতিবিদদের মতো ‘আমেরিকাকেই’ আদর্শ চাকরি ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু শিগগিরই তাঁর উপলব্ধি বদলাতে শুরু করে। ২২ বছর বয়সে তিনি আমেরিকার শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার চাকরি নিয়েছিলেন, কিন্তু ২৫ বছর বয়সেই তিনি চাকরি ছেড়ে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। সেই সময়ে তাঁর অনুভূতির বর্ণনা পাওয়া যাবে নিম্নোক্ত উদ্ধৃতিতে:

’ I did not find the work of US economists entirely convincing. To be sure they were all very intelligent, and I still have many friends from that period of my life. But something strange happened: I was only too aware of the fact that I knew nothing at all about the world’s economic problems……… The truth is that economics should never have sought to divorce itself form other social sciences and can advance only in conjunction with them. The social sciences collectively know too little to waste time on foolish disciplinary squabble. If we are to progress in our understanding of the historical dynamics of wealth distribution and the structure of social classes, we must obviously take a pragmatic approach and avail ourselves of the methods of historians, sociologists and political scientists as well as economist. We must start with fundamental questions and try to answer them. Disciplinary disputes and turf wars are of little or no importance. In my mind this book is as much a work of history and economics.’ [Thomas Piketty, 2014 P-32-33]

উন্নত পুঁজিবাদের মধ্যে বৈচিত্র্য

পিকেটির হিসাব অনুযায়ী, ‘স্ক্যান্ডিনেভীয় পুঁজিবাদী’ দেশগুলো হচ্ছে ‘স্বল্প বৈষম্যের পুঁজিবাদী দেশ’। ইউরোপীয় পুঁজিবাদী দেশগুলো হচ্ছে ‘উচ্চ বৈষম্যের দেশ’। আর পিকেটির ভবিষ্যদ্বাণী হচ্ছে, অন্তত যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে বৈষম্য আরও তীব্রতর হবে। পাঠকদের সুবিধার জন্য আমি পিকেটির অসংখ্য তালিকা ও গ্রাফ থেকে মাত্র তিনটি তালিকা ও গ্রাফ নিচে তুলে ধরছি। ১ নম্বর তালিকায় প্রথমে দেখানো হয়েছে ‘শ্রমলব্ধ আয়ে’ বণ্টনবৈষম্যের চিত্র। ২ নম্বর তালিকায় দেখানো হয়েছে ‘পুঁজির মালিকানার’ বৈষম্য। ৩ নম্বর তালিকায় দেখানো হয়েছে উপরিউক্ত দুই ধরনের উেসর আয় মিলিয়ে মোট আয়ের ক্ষেত্রে বিরাজমান বণ্টনবৈষম্য। তথ্যগুলো মূল গ্রন্থে যেভাবে উত্থাপিত হয়েছে হুবহু সেভাবেই আপাতত আমি এখানে উত্থাপন করছি।

তালিকাগুলো লক্ষ করলেই দেখা যাবে যে সারা বিশ্বকে এখানে বৈষম্যের মাত্রার বিচারে তিন ধরনের রাষ্ট্রপুঞ্জে বিভক্ত করা হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে সাধারণভাবে স্ক্যান্ডিনেভীয় দেশগুলোতে বৈষম্য মাত্রা সবদিক দিয়েই সবচেয়ে কম। সাধারণভাবে মধ্যম মাত্রার বৈষম্য বিরাজ করছে ইউরোপীয় দেশগুলোতে। আর উচ্চ মাত্রার বৈষম্য বিরাজ করছে আমেরিকাতে।

পিকেটির তুলে ধরা তিন ধরনের বৈষম্যের চিত্র আবার তিন রকম বিষয়ের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে:

শ্রমলব্ধ আয়, পুঁজির মালিকানা এবং মোট আয়। প্রথম তালিকায় রয়েছে শ্রমলব্ধ আয়ের বৈষম্যের চিত্র।

শ্রমলব্ধ আয়বৈষম্য হচ্ছে সাধারণ যুক্তিতে শ্রমের পরিমাণ বা গুণভিত্তিক বৈষম্য (Meritocratic Inequality)। এ ধরনের বৈষম্য হয়তো সাম্যবাদের নিম্ন পর্যায়ে মার্ক্সবাদীরাও একধরনের বুর্জোয়া অধিকার হিসেবে গ্রহণ করে নেবেন এবং সমাজতন্ত্রের নানা এক্সপেরিমেন্টের ব্যর্থতার পর এখন বিদ্যমান সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো প্রায় পুরোপুরিই গ্রহণ করেছেন বলে আমার ধারণা। যদিও ক্রুশ্চেভকে একসময় এ জন্য সংশোধনবাদের বদনামে ভুগতে হয়েছিল। তবে এ ক্ষেত্রেও দেশে দেশে, কালে কালে প্রচুর অতিরিক্ত এবং অন্যায় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। সমাজের সর্বোচ্চ ১ শতাংশ শ্রমজীবী টেকনোক্র্যাটরা স্ক্যান্ডিনেভীয় দেশে সত্তর-আশির দশকে মোট শ্রমলব্ধ জাতীয় আয়ের ৫ শতাংশ ভোগ করতেন। পিকেটির জন্য এটা গ্রহণযোগ্য বৈষম্য, ইউরোপে ২০১০ সালে এই অংশটি ভোগ করতেন ৭ শতাংশ। আমেরিকায় ২০১০ সালে এই অংশটি ভোগ করতেন ১২ শতাংশ এবং পিকেটির প্রক্ষেপণ অনুসারে ২০৩০ সালে আমেরিকায় এটি বেড়ে গিয়ে হবে ১৭ শতাংশ। পিকেটির তথ্য অনুযায়ী, উল্টো করে আমরা যদি শ্রমজীবীদের বাকি ৯৯ শতাংশের শ্রমলব্ধ আয়ের শেয়ার মাপি তাহলে দেখব স্ক্যান্ডিনেভীয় দেশে ৯৯ শতাংশ পাচ্ছেন ৯৫ শতাংশ। ইউরোপে পাচ্ছেন ৯৩ শতাংশ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে পাচ্ছে মাত্র ৮৮ শতাংশ। ২০৩০ সালে গিয়ে এই আমেরিকায় ৯৯ শতাংশ পাবেন আরও কম অর্থাত্ ৭৭ শতাংশ। পিকেটি প্রশ্ন করেছেন শ্রমলব্ধ আয়ের ক্ষেত্রে শেষোক্ত দেশে এ রকম উচ্চ বৈষম্য হচ্ছে কেন? একটা কারণ হতে পারে শিক্ষার অধিকারে বৈষম্য অর্থাত্ white collar worker বনাম brown collar worker-এর বৈষম্য। আরেকটা কারণ হতে পারে যারা বৃহত্ বহুজাতিক কোম্পানির সর্বোচ্চ ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করছেন, তাঁরা নিজেরাই নিজেদের উচ্চ বেতন নির্ধারিত করে দিয়েছেন। আমাদের দেশেও ব্যক্তি খাতে উচ্চ ব্র্যাকেটভুক্তদের বেতনের অস্বাভাবিক উচ্চতা এই প্রবণতারই পরিচয় বহন করে বলে আমার ধারণা। তাদের বেতনের সঙ্গে তাদের শ্রমের পরিমাণ বা গুণের সম্পর্ক খুবই দুর্বল। তবু কেউ ইচ্ছা করলে দক্ষতার দোহাই দিয়ে এই মাত্রার বৈষম্যকে ন্যায়সংগত (Justified) বা গ্রহণযোগ্য (Acceptable) বলে আখ্যায়িত করতে পারেন। পিকেটিও তা আংশিক মেনে নিয়েছেন এবং এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক ফরাসি বিপ্লবের পর প্রণীত মানবাধিকার সনদের থেকে একটি উদ্ধৃতি ব্যবহার করেই কিন্তু তার এই গ্রন্থটি শুরু হয়েছে। এই গ্রন্থের প্রথম পৃষ্ঠার শিরোনাম ‘ভূমিকা’র পরই প্রদত্ত এই উদ্ধৃতিটি হচ্ছে:

‘Social distinctions can be based on common utility’

(Declaration of the Rights of Man and the Citizen, article I, 1789)

অর্থাত্ সমাজকে যে ব্যক্তি বা নাগরিক যত বেশি উপকার প্রদান করবেন সমাজের কাছ থেকে সেই ব্যক্তি বা নাগরিকের তত বেশি মর্যাদা প্রাপ্য হবে। তবে পিকেটি বিশেষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান ও ভবিষ্যত্ বেতনবৈষম্যকে অগ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করেছেন। অর্থাত্ এখানে অন্যায়প্রাপ্তি ঘটেছে বলে তার বিশ্বাস। বিশেষত যখন দেখা যাচ্ছে যে ওই সব উচ্চ বেতনভোগী ১ শতাংশ ব্যক্তি মোটা অঙ্কের পুঁজিরও মালিক হয়ে পড়েছেন। তাদের স্টক শেয়ারের বদৌলতে এবং তাদের অন্যান্য পুঁজিলব্ধ আয় এতে যুক্ত হওয়াতে এ ক্ষেত্রে সব মিলিয়ে আরও অনেক বেশি বৈষম্যের সৃষ্টি হচ্ছে। তাই শেষাবধি সমাজের সর্বোচ্চ এক শতাংশ পুঁজির মালিকানা এবং তথাকথিত স্বসংজ্ঞায়িত ‘দক্ষতার’ বা মানব পুঁজির মালিকানার অজুহাতে সমাজে অন্যায়ভাবে বিপুল মর্যাদার ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার বৈষম্য সৃষ্টি হতে পারে। আমাদের দেশেও বর্তমানে আমরা দেখতে পাই সর্বোচ্চ টেকনোক্র্যাটদের প্রচুর মানব পুঁজি ও অন্যান্য পুঁজিও রয়েছে কিন্তু সেই সব পুঁজির একটি বড় অংশই উত্পাদনমূলক নয়—এর চরিত্র হচ্ছে রিয়াল এস্টেট, স্টক শেয়ার, পেনশন ফান্ড, জমি, সঞ্চয়পত্র ইত্যাদি ধরনের। এসব জায়গায় ঝুঁকি কম ও খাজনা আয়ের নিশ্চিত ব্যবস্থা সুরক্ষিত। তবে কেউ বলতে পারেন যে এগুলোও অপ্রত্যক্ষভাবে উত্পাদনশীল বিনিয়োগে হয়তো ব্যবহূত হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে তা সর্বাংশে সত্য নয়। কারণ এখানে ব্যাংকে প্রচুর অলস অর্থ রয়েছে এবং অনেক অর্থ অপঋণে পরিণত হয়েছে।

আলোচনা আর না বাড়িয়ে পিকেটির ২ ও ৩ নম্বর তালিকায় প্রদত্ত তথ্যাবলি এক সঙ্গে দেখলে এ কথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে আমাদের এই বিশ্বে আয়বৈষম্যের প্রধান জনক হচ্ছে পুঁজি এবং পুঁজিলব্ধ আয়ের বৈষম্য। এখানে পিকেটির অভিযোগ হচ্ছে এই পুঁজির বড় অংশটিই ব্যক্তিমালিকানা ও উত্তরাধিকারী ব্যবস্থার কারণে উপার্জিত আয় থেকে তৈরি হয়নি। বিশেষত প্রাচীন ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের প্রাথমিক প্রতিযোগিতামূলক যুগের পর থেকে তা উত্তরাধিকার প্রক্রিয়ায় এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে হস্তান্তরিত হচ্ছে মাত্র। তাই মানবাধিকারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পিকেটি উত্তরাধিকারী সূত্রে প্রাপ্ত পুঁজিলব্ধ আয়কে সমমাত্রায় গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করেননি। পিকেটির মতে, সম্পত্তির ক্ষেত্রে উত্তরাধিকারী করব্যবস্থা না থাকলে বৈষম্য তাই Cumulative বৈষম্যে পরিণত হয়। তালিকাগুলো থেকে দেখা যাবে এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ এক শতাংশ স্ক্যান্ডিনেভীয়রা দেশে নিয়ে নেয় পুঁজির ২০ শতাংশ, ইউরোপে ১৯১০ সালে নিত ৯০ শতাংশ, এখন নেয় ২৫ শতাংশ এবং আমেরিকায় আগে নিত কম, তবে এখন নিচ্ছে ৩৫ শতাংশ। ভবিষ্যতে নেবে ৫০ শতাংশ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৩ নম্বর তালিকায় শ্রমলব্ধ ও পুঁজিলব্ধ আয়ের সমন্বয়ে গঠিত তথ্য অনুসারে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশের অধীনে আয়ের পরিমাণ বা সামগ্রিক বৈষম্যের পরিমাণটি দাঁড়িয়েছে নিম্নরূপ। স্ক্যান্ডিনেভীয় দেশে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পাচ্ছে ২৫ শতাংশ, ইউরোপে এই অংশটি বর্তমানে পাচ্ছে ৩৫ শতাংশ আর আমেরিকায় এই অংশটি পাচ্ছে ৫০ শতাংশ, যেটা অতীতে ইউরোপ ১৯১০ সালে পেত। অতএব ১৯১০ সালের ইউরোপের অনুরূপ ভয়াবহ অবস্থায় বর্তমানে আমেরিকা ফিরে গেছে। পিকেটি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে ২০৩০ সালে এটি ৬০ শতাংশ হবে।

পিকেটির প্রদত্ত এসব তথ্য আমাদের আগাম সতর্কবাণী প্রদান করছে। এই সতর্কসংকেতটি হচ্ছে মূলত আমেরিকার প্রতি এবং তার দাবি হচ্ছে যে আমেরিকা ইতিমধ্যেই অগ্রহণযোগ্য এক বৈষম্য মাত্রায় উপনীত হয়েছে এবং তার গতিমুখও আরও বৈষম্য বৃদ্ধির দিকে। তার এ কথা সবাই গ্রহণ নাও করতে পারেন, তথ্য নিয়ে নানা প্রশ্নও থাকতে পারে কিন্তু যখন আমরা দেখি যে সেখানে ১ শতাংশের বিরুদ্ধে ৯৯ শতাংশের আন্দোলন হচ্ছে, যখন ওয়াল স্ট্রিট দখলের স্লোগান উঠতে শুরু করেছে তখন নিশ্চিতভাবেই আমাদের আরেকবার থমকে দাঁড়িয়ে ভাবতে হয় আমরা যাচ্ছি কোথায়? হয়তো এ জন্যই নোবেল বিজয়ী আমেরিকান অর্থনীতিবিদ পল ক্রুগম্যান সমাজতন্ত্র বা মার্ক্সের অনুসারী না হয়েও পিকেটির বইটির ভূয়সী প্রশংসা করে রায় দিয়েছেন, ‘শুধু নিষ্ঠাবান তথ্য সংগ্রহের জন্যই পিকেটিকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া উচিত!’

পিকেটির সুপারিশ

এ কথা সহজেই অনুমেয় যে ‘বৈষম্য’ কমাতে হলে ‘আয়বৈষম্য’ এবং ‘সম্পদ বা পুঁজির’ মালিকানা বৈষম্য উভয়ই হ্রাস করতে হবে। যখনই শ্রমের উচ্চমূল্য প্রাপকেরা একই সঙ্গে প্রচুর সম্পদেরও মালিক হয়ে যান তখনই চরম বৈষম্যের উদ্ভব ঘটে। তবে অধিকাংশ পুঁজিবাদী রাষ্ট্রেই ‘আয়বৈষম্য’কে আক্রমণের জন্য প্রগতিশীল করব্যবস্থার আশ্রয় নেওয়া হয়। সে ক্ষেত্রে কোথাও কোথাও শ্রমলব্ধ আয়কে তুলনামূলক বিশেষ ছাড়ও দেওয়ার বিধান থাকে। পিকেটি শ্রমলব্ধ আয় নিয়ে অত চিন্তিত নন, তাই পুঁজির বা সম্পদের ওপরই তিনি একটি বৈশ্বিক কর আরোপের প্রস্তাব করেছেন।

তাঁর মতে, এটি একটি ‘ইউটোপিয়ান’ কিন্তু ‘ইউজফুল আইডিয়া’। পিকেটি লিখেছেন:

‘Even if nothing resembling this ideal is put into practice in foreseeable future, it can serve as a worth while reference point, a standard aginst which alternative proposals can be measured.’ (Thomas Piketty, 2014, P: 515)

পিকেটির দ্বিতীয় পরামর্শ হচ্ছে একটি সামাজিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পুনর্নির্মাণ করা। এ জন্য রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও আধুনিকায়ন করতে হবে, সামাজিক রাষ্ট্রকে ব্যক্তিগতকরণ বা বিনিয়ন্ত্রণের নামে ভেঙে ফেলা চলবে না। মাথাব্যথা হলে মাথা কাটা যে কোনো সমাধান নয়, এটি পিকেটি ভালোভাবেই অনুধাবন করেন। তবে পিকেটি বামপন্থীদের কেন্দ্রীভূত একচেটিয়া রাষ্ট্রীয় মালিকানাও সমর্থন করেন না।

পিকেটি মনে করেন তাঁর পছন্দনীয় সামাজিক কল্যাণমুখী রাষ্ট্রকে ‘অধিকার’ভিত্তিক দর্শন ও চিন্তার দ্বারা পরিচালিত হতে হবে। পিকেটি ‘পুনর্বণ্টন’ শব্দের চেয়ে ‘সার্বজনীন অধিকারের’ ভাষাকে অধিক পছন্দ করেন। ‘পুনর্বণ্টনের’ নামে খুব ধনী লোকদের কাছ থেকে কিছু ‘ভিক্ষা’ সংগ্রহ করে বিক্ষুব্ধ মধ্যস্তরের সরব গোষ্ঠীগুলোকে কিছু দিয়ে শান্ত রাখার কৌশলকে পিকেটি সঠিক মনে করেন না। তাই বারবার তাঁর গ্রন্থে ‘Patrimonial Middle Class (্আনুকূল্য প্রাপ্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণি) এর বিরুদ্ধে অনেক শক্ত মন্তব্য পাওয়া যায়। আনুকূল্য বণ্টনের বিপরীতে আধুনিক বণ্টনের দর্শন সম্পর্কে বলতে গিয়ে পিকেটি বলেছেন,

‘Modern redistribution is built around a logic of rights and a principle of equal access to a certain numbers of goods deemed to be fundamental.’ (Thomas Piketty, 2014, P: 479)

তবে এই সার্বজনীন মানবাধিকারগুলো কী হবে, সেখানে রাজনৈতিক মানবাধিকার ও অর্থনৈতিক মানবাধিকারের ভারসাম্য কতটুকু রক্ষিত হবে এবং সমাজ বিকাশের বিভিন্ন স্তরে কোন অধিকারের কতটুকু অগ্রাধিকার থাকবে এসব সূক্ষ্ম বিতর্কের কোনো সমাধান পিকেটির মধ্যে পাওয়া যাবে না। পিকেটির মতে, একটি সামাজিক কল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার পথে প্রধান সূচক হচ্ছে কর/জিডিপি অনুপাত যেটি অনুন্নত দেশে খুবই কম। চীনে অনেক বেশি আর ইউরোপ-আমেরিকায় (স্ক্যান্ডিনেভীয় ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে) মাঝামাঝি। এই সূচকটি না বাড়িয়ে অনুন্নত দেশ বা উন্নত ধনী দেশগুলো কখনোই বৈষম্যও কমাতে পারবে না এবং নাগরিকদের জন্যও সার্বজনীন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ব্যবস্থা করতে পারবে না। এদিক থেকে বোঝা যায় যে পিকেটি অমর্ত্য সেনের সঙ্গে একমত যে বাজারব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় এবং এটা সম্ভব না হলে বৈষম্যবর্ধক একটি উল্লেখযোগ্য শক্তি সমাজে চির সক্রিয় থেকে যাবে।

পিকেটির সমালোচনা

পিকেটির সমালোচনা দুদিক থেকে করা সম্ভব। একটি ডান দিক থেকে, আরেকটি বাম দিক থেকে। সংক্ষেপে এই দুই ধারার সম্ভাব্য সমালোচকের মধ্য থেকে দুটি উল্লেখযোগ্য নমুনা সমালোচনা আমি নিচে তুলে ধরছি। একটি সিপিএমের তাত্ত্বিক ‘সোস্যাল সায়েন্টিস্ট’ পত্রিকার প্রখ্যাত সাবেক সম্পাদক রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ প্রভাত পাটনায়েকের সমালোচনা। অপরটি বিশ্ববিখ্যাত ধনী ‘বিল গেটসের’। বিল গেটসের এই সমালোচনাটি অবশ্য কোথাও প্রকাশিত হয়নি। আমি তাঁর ব্যক্তিগত ব্লগে এটির সন্ধান পেয়েছি।

প্রভাত পাটনায়েক ‘The Marxist’-এর ‘এপ্রিল-জুন’ ২০১৪ সংখ্যায় প্রথম ‘Capitalsim, Inequality and Globalization: Thomas Piketty’s Capital in the Twenty-First Century’ নামে এক প্রবন্ধে এই সমালোচনাগুলো তুলে ধরেন।

১।        পাটনায়েকের মতে, পিকেটি বর্তমানে পুঁজিবাদে যে ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের বিপদের কথা বলেছেন সে বিষয়ে মার্ক্সবাদীরাও একমত কিন্তু পিকেটি এটাকে ‘r-g’ এর ব্যবধান দিয়ে টেকনিক্যালি যেভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন সেটি সঠিক নয়।

২।         পাটনায়েকের মতে, ক্যাপিটাল না মেপে ক্যাপিটালের রেট অব রিটার্ন মাপা সম্ভব নয়। আবার ক্যাপিটালকে যদি উত্পাদিত উত্পাদনের উপায় বলে সংজ্ঞায়িত করা হয় তাহলে তার আর্থিক মূল্য মাপতে হলেও আমাদের ক্যাপিটালের রেট অব রিটার্ন জানতে হবে। অর্থাত্ নয়া ধ্রুপদি অর্থনীতির ক্যাপিটাল তত্ত্ব এক অসংশোধনীয় অসংগতিতে ভুগছে। পিকেটি এই ফ্রেমওয়ার্ক ব্যবহার করায় তিনিও এই ভ্রান্তিতে ভুগছেন।

৩।        ১৯১৪-১৯২৯ এই সময়ে পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে ব্যাপক মন্দা বিরাজ করছিল। এর অর্থ হচ্ছে তখন নিশ্চিতভাবে অব্যবহূত কলকারখানা বেশি ছিল, পুঁজির তুলনায় আয়ের পরিমাণ কম ছিল। সুতরাং সেই সময় ক্যাপিটাল-ইনকাম অনুপাতটি কম না হয়ে বেশিই হওয়ার কথা এবং তখন তাহলে ক্যাপিটালের আয়ের হিস্যা বেশিই হওয়ার কথা। তাহলে ওই সময় পিকেটি যে নিম্নতর ক্যাপিটাল-ইনকাম অনুপাতের পরিমাপ দেখাচ্ছে তা সত্য না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

৪।        ক্যাপিটালের প্রান্তিক উত্পাদনশীলতা মাপা সম্ভব নয়, কারণ অন্য সব উপাদান কখনোই স্থির রাখা সম্ভব নয়।

৫।        পিকেটির আলোচনায় সঞ্চয় হার নিয়ে আলোচনাটি অসম্পূর্ণ। সঞ্চয় যদি বিনিয়োগে পরিণত হতে না পারে তাহলে চাহিদার অভাবে মন্দা সৃষ্টি হতে পারে। এ ধরনের মন্দা অবস্থায় রাষ্ট্র কিনসীয় পলিসি গ্রহণ করতে পারে, উপনিবেশে বিনিয়োগ অভিযান চালাতে পারে। প্রাক-পুঁজিবাদী খাতগুলোতে দখল অভিযানও চালাতে পারে অর্থাত্ রাষ্ট্রের একটি সাম্রাজ্যবাদী প্রতিব্যবস্থা গ্রহণের প্রবণতা থাকতে পারে। পিকেটি এই দিকটা সম্পর্কে একদম নীরব থেকে গেছেন।

৬।        পিকেটি নিজেই দাবি করেছেন যে অতি উচ্চ পদের টেকনোক্র্যাট কাম এন্টারপ্রেনাররা নিজেদের বেতন নিজেই নির্ধারণ করে থাকেন। এটা যদি সত্য হয় তাহলে শ্রমের প্রাপ্তিহার নিছক প্রান্তিক দক্ষতা তত্ত্ব দিয়ে নির্ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

৭।        বর্তমান দুনিয়ায় শ্রমের গতিশীলতা না থাকলেও পুঁজির গতিশীলতা বিদ্যমান। এই অবস্থায় পিকেটির মডেলে যে অতিরিক্ত পুঁজির বিপদের কথা বলা হয়েছে তা নাও বিপজ্জনক হতে পারে, কারণ, উদ্বৃত্ত পুঁজি পশ্চাত্পদ এলাকায় গিয়ে ত্ কে বাড়িয়ে তুলতে পারবে এবং মূল্য সংযোজনে পুঁজির প্রাপ্ত অংশও বাড়াতে পারবে। নিজের কেন্দ্রে ত্ কম হলেও তার অসুবিধা নাও থাকতে পারে।

এই সমালোচনাগুলো মূলত পিকেটির নয়া ধ্রুপদি অর্থনৈতিক পদ্ধতির সমালোচনা। তবে পাটনায়েক আরেকটি মৌলিক সমালোচনা করেছেন, সেটি হচ্ছে পিকেটির ‘গ্লোবাল ট্যাক্স’ প্রস্তাবের সমালোচনা। এ ধরনের সংস্কার করার সক্ষমতা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর কখনোই হবে না বলে পাটনায়েক মনে করেন। আর কখনো যদি কোনো রাষ্ট্রের চরিত্র এতখানি বদলে যায় যে তারা এই সংস্কারটি করতে পারবে, তাহলে তো তারা বিপ্লবই করে ফেলবে, এটাই পাটনায়েকের বিশ্বাস। পাটনায়েক মাইকেল কালেকি কর্তৃক উদ্ধৃত জোয়ান রবিনসনের যে উদ্ধৃতিটি এখানে ব্যবহার করেছেন সেটি উল্লেখ করে পাটনায়েকের আলোচনাটির সমাপ্তি টানছি:

‘Any government which had the power and the will to remedy the major defects of the captialist system would have the will and power to abolish it altogether, while the governments which have the power to retain the system lack the will to remedy the defects.’ [Joan Robinson, 1936]

বিশ্ববিখ্যাত ধনী মাইক্রোসফটের জনক বিল গেটস ১৩ অক্টোবর ২০১৪ সালে পিকেটির বইটির ওপর আরেকটি পর্যালোচনা তাঁর ব্লগে প্রকাশ করেন। সেটি দক্ষিণ দিক থেকে পিকেটির একটি সমালোচনা। সেখানে তিনি বলেন:

১।        পিকেটির বইটি লেখার আগে স্কাইপে তার সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল এবং পরে আমি বইটি পড়েছি এবং আমার মতে সবারই তা পড়া উচিত। কারণ পুঁজির অসুখ এবং তার প্রতিষেধক দুইয়েরই সন্ধান মিলবে এই বইয়ে।

২।         পিকেটির যে অনুসিদ্ধান্তগুলো আমি সঠিক বলে মনে করি সেগুলো হচ্ছে:

            ‘High levels of inequality are a problem@messing up economic incentives, tilting democracies in favours of powrful interests and undercutting the ideal that all people are created equal.’

          Capitalim does not self correct toward greater equality@that is excess wealth concentration can have a snowballing tendencies if and when they choose to do so.’

৩।        পিকেটির যে অনুসিদ্ধান্তের সঙ্গে আমি একমত নই তা হচ্ছে

            ‘To be clear when I say that levels of inequality are a problem, I do not want to imply that the world is getting worse.’

৪।        বিল গেটস পরে বলতে চেয়েছেন যেসব পুঁজিপতি একরকম নয়, তার বিশ্বাস ও প্রদত্ত উদাহরণে তিনি তিন রকম পুঁজিপতির অস্তিত্বের কথা বলেন: একজন হচ্ছেন উদ্যোক্তা পুঁজিপতি যিনি পুঁজিকে উত্পাদনশীল নতুন কাজে ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগ করেন, ব্যবস্থাপনা, শ্রম ও বুদ্ধি প্রয়োগ করেন, উদ্বৃত্ত তৈরি ও আয় করেন, অন্য একজন পুঁজিপতি এত বেশি উদ্বৃত্তের অধিকারী যিনি উদারভাবে তা মানবহিতৈষী কর্মে ব্যয় করেন এবং তৃতীয় আরেকজন পুঁজিপতি হয়তো একটি বিলাসবহুল দ্বীপ বা জাহাজ কিনে টাকা উড়িয়ে দিচ্ছেন। বিল গেটসের মতে, পিকেটির ট্যাক্স প্রস্তাব প্রথম দুই ধরনের পুঁজিপতিদের জন্য প্রযোজ্য নয়। তবে তৃতীয় ধরনের অতিরিক্ত ভোগী অথবা এবং খাজনাভোগী পুঁজিপতিদের ট্যাক্সের আওতায় আনার সুপারিশ করেছেন গেটস।

পিকেটির উল্লেখিত সমালোচনাগুলো একজন দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থসচেতন পুঁজিপতির সমালোচনা। এটা প্রমাণ করে যে পুঁজিপতিদের মধ্যেও পৃথকায়ন ও ব্যক্তিগত ব্যতিক্রম সম্ভব।

শেষ কথা

পিকেটির গ্রন্থের মাধ্যমে আজ এটা প্রমাণিত হলো যে পুঁজিবাদের প্রতিনিধিরাই স্বীকার করে নিচ্ছেন যে পুঁজিবাদের একটি কঠিন অসুখ রয়েছে। এই অসুখ সারানোর নিজস্ব ক্ষমতা পুঁজিপতিদের নেই। এই অসুখের একটি পোশাকি নামও তাঁরা দিয়েছেন ‘Inequality Trap’ বা ‘বৈষম্যের ফাঁদ’। বিশ্বব্যাংকও এখন এই শব্দটি তাদের লিটারেচারে ব্যবহার করছেন। এই ফাঁদে ধরা পড়লে একটি দেশের বৈষম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতাকাঠামো নিজেই নিজেকে নিরন্তর শক্তিশালী করতে থাকে এবং তাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়।

বাংলাদেশ আজ মধ্য আয়ের দেশ হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। বিশ্বব্যাংকের সংজ্ঞা অনুযায়ী কোনো দেশের মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়ের পরিমাণ ১০২৬ থেকে ১২৪৭৫ ডলারের মধ্যে থাকলে তাকে মধ্য আয়ের দেশ বলা হয়। তবে ১০২৬-৪০৩৫ ডলার পর্যন্ত যাদের মাথাপিছু আয় তাদের নিম্ন মধ্য আয়ের দেশ বলা হয়। বাংলাদেশ এই নিম্ন মধ্য আয়ের নিম্ন প্রান্তে আজ অবস্থিত। চীন, ব্রাজিল, মেক্সিকো, দক্ষিণ আফ্রিকা এই দেশগুলো মাথাপিছু ৫০০০ ডলারের ওপরে আয় নিয়ে বর্তমানে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে কিন্তু তারা এখন Inequality Trap এ আটকে যেতে বসেছে। যদি তারা তাদের উচ্চ বৈষম্য কমাতে না পারে তাহলে তারা আর মধ্য আয়ের দেশ থেকে বেড়ে উচ্চ আয়ের দেশে কখনোই পৌঁছাতে পারবে না। এসব দেশের উচ্চ আয়বৈষম্য তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে তিনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে:

ক. প্রথমত: বড় ধনিকদের একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তারের কারণে পুঁজিবাদের প্রধান যে ইতিবাচক শক্তি ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতামূলক উদ্যোগ তা তারা এগিয়ে যেতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

খ. গণতন্ত্র অর্থনৈতিক চাপের মুখে উঠে দাঁড়াতে পারছে না। ব্যাপক জনমতের সঙ্গে নিয়ত রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হচ্ছে এবং বিনিয়োগ ক্ষতিগস্ত হচ্ছে। পুঁজি অনেক সময় অন্য দেশে পালিয়েও যাচ্ছে।

গ. বৈষম্যমূলক অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ চাহিদা সর্বদাই সংকুচিত থাকে এবং বাধ্য হয়ে তখন বাইরে শ্রমঘন রপ্তানি বা শ্রম শক্তি রপ্তানির দিকে মনোযোগ দিতে হয়। কিন্তু মধ্য আয়ের দেশ যখন নিম্ন প্রান্তে থাকে তখন এটা চললেও উচ্চ প্রান্তে এগোতে হলে ব্যাপক জনগণের দেশীয় ক্রয়ক্ষমতা, দক্ষতা বাড়িয়ে এবং তাদের আয় বাড়িয়ে দেশের ভেতরের বাজারকে বাড়াতেই হবে। তা না পারলে মধ্য আয়ের নিম্ন প্রান্তেই পড়ে থাকতে হবে বাংলাদেশকে।

মধ্য আয়ের যে দেশগুলো এই ফাঁদে পড়েনি তারা হচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, জাপান ইত্যাদি ইস্ট এশিয়ান দেশগুলো। ভালো করে লক্ষ করলে দেখা যাবে এরা পুঁজিবাদী দেশ হলেও এর অর্থনৈতিক-সামাজিক বৈষম্য সাফল্যের সঙ্গে কমিয়ে রাখতে পেরেছিল। তার সামাজিক রাষ্ট্রের ভূমিকাকে নাকচ করে বাজার ও ব্যক্তিমালিকানাকে চরম বিশ্বাসে পরিণত করেনি। সুতরাং আমরা পিকেটির কথাই বলি আর মার্ক্সের কথাই বলি আমাদের যেভাবে হোক আমাদের গণতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য আজ একটি সমতা অভিমুখী উন্নয়ননীতি গ্রহণ করতে হবে।

তথ্যসূত্র

Marx and Engels (1975-a), Selected Correspondence, Progress Publishers, Moscow, Letter to Conrad Schmidt from Engels on October 27, 1890, P-402.

Marx and Engels (1975-b), Selected Correspondence, Progress Publishers, Moscow, Letter to Conrad Schmidt from Engels on August 5, 1890, P-393

লেনিন (১৯১৪), ‘কার্ল মার্ক্স’, গ্রানাত বিশ্বকোষের জন্য লিখিত প্রবন্ধ।

মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায় (অনুবাদ), (১৯৭৬) ‘মার্ক্স-এঙ্গেলস স্মৃতি’, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো। পৃঃ ২৫৬-২৫৭

মার্ক্স-এঙ্গেলস (১৮৮৮), কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, পৃঃ ৫৫-৫৬

মার্ক্স-এঙ্গেলস (১৯৮৯) কালেক্টেড ওয়ার্কস, ভল্যুম-২৪, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, পৃঃ ৮১-৯৯

এম এম আকাশ (১৯৯৬), ‘নতুন সন্ধিক্ষণে বামপন্থীরা কি করবেন?’, পৃঃ-৪৪-৪৮, শিখা অনির্বাণ, এপ্রিল, ১৯৯৬, সংখ্যা-১, চট্টগ্রাম।

Honore De Balzac (1835), Father Goriot, New York, W-W Norton and Company, 1998

Robert Allen (2009), ‘Engel’s Pause: A pessimist’s guide to the British Industrial Revolution’, Exploration in Economic History, 46, no.4 October, 2009-418-35

Paul Krugman (2014), ‘Why we are in a new gilded stage’,

http://my books.com/articals/ archives/2014/may/08.

Joan Robinson (1936), ‘Review of R.F. Harrod’s book The Trade Cycle’, The Economic Journal, December 1936.

Nazrul Islam (2014), ‘Will Inequality lead China to Middle Income Trap?’ Frontiers of Economics in China, 9(3), PP: 378-437.

Thomas Piketty, (2014) Capital in the Twentyfirst Century, Harvard University Press, USA.

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0