অনুস্মৃতি

আনোয়ারা বাহার চৌধুরী: ঢাকার বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্ত এক নারীর শিক্ষা-সাংস্কৃতিক উদ্যোগ

বিজ্ঞাপন
default-image

[আনোয়ারা বাহার চৌধুরী (১৯১৯-১৯৮৭) সমাজসেবক, শিক্ষাবিদ, লেখক। জন্ম ১৯১৯ সালে মুর্শিদাবাদ জেলার আজিজগঞ্জে। তাঁর শৈশবকাল অতিবাহিত হয় মানিকগঞ্জ জেলায়। ঢাকার পৌর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয়। তৃতীয় শ্রেণিতে তিনি বৃত্তি পান এবং ১৯২৯ সালে নিউ গার্লস হাইস্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হন। পরে কলকাতায় সাখাওয়াত্ মেমোরিয়াল থেকে প্রবেশিকা পাস করেন। তিনি বেথুন কলেজ থেকে আইএ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৩৮ সালে বিএ এবং ১৯৪০ সালে বিটি পাস করেন। মেধাবী ছাত্রী হওয়া সত্ত্বেও পারিবারিক রক্ষণশীলতার কারণে তাঁকে অবরোধবাসিনী হয়ে পাঠ সমাপ্ত করতে হয়।

কর্মজীবনের শুরুতে তিনি কিছুদিন কলকাতায় লেডি ব্রাবোর্ন কলেজে শিক্ষকতা করেন। তবে তাঁর সুদীর্ঘ কর্মময় জীবন কাটে কলকাতার সাখাওয়াত্ মেমোরিয়াল স্কুল, ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী স্কুল, ঢাকার কামরুন্নেসা স্কুল ও কলেজ এবং বাংলাবাজার হাইস্কুলে প্রধান শিক্ষয়িত্রী পদে।

১৯৪১ সালে তিনি ঢাকায় ‘সুরবিতান’ নামে নৃত্য ও সংগীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ১৯৫৫ সালে ‘বুলবুল ললিতকলা একাডেমী’র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, কোষাধ্যক্ষ এবং পরে এর সম্পাদক হন। তিনি বাংলা একাডেমীর জীবন সদস্য ছিলেন। ১৯৬১ সালে ঢাকার শান্তিনগরে হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ প্রতিষ্ঠার পর থেকে তিনি এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে ছিলেন। আনোয়ারা বাহার চৌধুরী ‘আপওয়া’র সহসভানেত্রী ও ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলামে’র সম্পাদক হিসেবেও বহুদিন সমাজসেবায় নিয়োজিত ছিলেন।

ছাত্রাবস্থা থেকেই তিনি সাহিত্যচর্চায় নিয়োজিত ছিলেন। সাহিত্যে তাঁর প্রথম আত্মপ্রকাশ ‘চতুর্থবার হজ্ব’ নামক একটি ছোট গল্পের মাধ্যমে। পরবর্তী সময়ে তাঁর বেশ কিছু রচনা ও গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। তাঁর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: ১. ছবি দেখি ছড়া শিখি, ২. কিচির মিচির, ৩. হরেক রকম, ৪. বিচিত্রা, ৫. আমার চেতনার রং। ১৯৮৭ সালের ২৭ অক্টোবর তাঁর মৃত্যু হয়। বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘরের কথ্য ইতিহাস প্রকল্পের আওতায় সাক্ষাত্কারটি গ্রহণ করেছিলেন প্রয়াত বেবী মওদুদ। গৃহীত সাক্ষাত্কারের ভিত্তিতেই বর্ণনা আকারে এ রচনাটি ছাপা হলো। আর প্রকল্পটির সমন্বয়কারী ছিলেন ইতিহাসবিদ প্রয়াত ড. সালাহ্ উদ্দীন আহমদ।]

আমার দেশের বাড়ি ঢাকা। কিন্তু আমার জন্ম হয়েছে মুর্শিদাবাদ জেলার আজিমগঞ্জে। সেখানে আমার নানা সরকারি চাকরিতে ছিলেন। তাঁর কর্মস্থলের বাসভবনেই আমার জন্ম।১ বছর দুয়েক বয়সে আমি আমার মাকে হারাই।২ এর পর থেকে অর্থাত্ আমি আমার নানি আর খালার কাছেই মানুষ হতে থাকি। বলতে গেলে তখন থেকে আমি ঢাকা শহরেই বড় হয়েছি।

আমার খালা৩ সে যুগে যথেষ্ট শিক্ষিত ছিলেন। তিনি বাংলা, ইংরেজি, উর্দু ও আরবি ভালোই জানতেন। আমার নানিও কিছু কিছু খেলাপড়া জানতেন। আমাদের পরিবারটা আসলে ছিল বেশ উদারমনা এবং শিক্ষার আলোয় আলোকিত। এর কারণ আমার নানা মেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারে খুবই উত্সাহী ছিলেন।

যথাসময়েই আমাকে স্কুলে ভর্তি করা হয়েছিল। আমাদের বাড়ির পাশেই ছিল একটা প্রাইমারি স্কুল। ওখানে পড়ে আমি তৃতীয় শ্রেণিতে বৃত্তি পরীক্ষা দিয়ে বৃত্তি পাই। তারপর আমি ঢাকায় নতুন চালু হওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীপালি স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলাম। ওই স্কুলটা খুলেছিলেন তখনকার বিখ্যাত নারীনেত্রী লীলা রায়।৪ পরে বৈবাহিক সূত্রে তিনি লীলা নাগ হয়েছিলেন। খুবই প্রগতিশীল এবং নিবেদিতপ্রাণ সমাজকর্মী হিসেবে ঢাকায় তখন তাঁর খুবই নামডাক। তাঁর এবং তাঁর সহকর্মীদের প্রচেষ্টাতেই স্কুলটা চালু করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠাকালের দু-এক বছরের মাথায়ই সেটা বর্তমান কামরুন্নেসা স্কুল টিকাটুলীর যেখানে যে বাড়িতে, সেখানে চলে আসে। তবে নতুন বাড়িতে আসার পর স্কুলটার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় কামরুন্নেসা স্কুল। কামরুন্নেসা বেগম ছিলেন ঢাকার নবাব পরিবারের একজন সদস্যা। তাঁর আত্মীয়স্বজনেরা তাঁরই নামে এই বাড়িটি স্কুলকে দান করেন। ফলে কামরুন্নেসা বেগমের নামানুসারেই ‘কামরুন্নেসা গার্লস হাই স্কুল’ চালু হয়ে যায়। এটা আমার যদ্দুর মনে পড়ে, ১৯২৯ সালের কথা। ওই স্কুলে তখন প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন মিসেস সুজাতা রায়। তিনি খুবই যোগ্য মানুষ ছিলেন। খুবই স্নেহময়ী ছিলেন। স্কুলের ভালো-মন্দের ব্যাপারে প্রখর মনোযোগ ছিল তাঁর।

আমাদের বাড়িতে একটা সাহিত্যিক পরিবেশ ছিল। আমার খালাম্মা সব সময়ই কবিতা আবৃত্তি, গল্প বা উপন্যাস থেকে পাঠ—এ সবকিছু খুবই পছন্দ করতেন। আমার দুই খালাতো ভাই, বিশেষ করে ছোট ভাইটি, ঢাকার লাইব্রেরি থেকে অনেক বই (যেগুলো প্রধানত ছিল শরত্চন্দ্র আর অন্যান্য সাহিত্যিকের লেখা) নিয়ে আসত। পাঠ্যবইয়ের ছকবাঁধা পড়াশোনার দিকে তার তেমন একটা মনোযোগ নেই। থাকলেও পাঠ্যবহির্ভূত বই পড়ার দিকে খুবই ঝোঁক ছিল। আর তখনকার দিনের তরুণ সাহিত্যিক, পরবর্তীকালে প্রখ্যাত কথাশিল্পী আবুল ফজল৫, কবি আবদুল কাদির৬, কবি সুফী মোতাহার হোসেন৭, কবি ও প্রাবন্ধিক দিদারুল আলম—এঁরা সবাই খালাম্মার কাছে আসতেন। আমার খালাম্মাও কিছু কিছু লিখতেন; গল্প, উপন্যাস—এসব। এবং তখনকার দিনের শিখা,৮ মাসিক সঞ্চয়, সওগাত৯ ও আলফারুক এর মতো নামীদামি সব কাগজে তাঁর লেখা বের হতো। তাঁর লেখা পড়েটড়েই এসব তরুণ সাহিত্যিক খালাম্মার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। এর মধ্যে সবচেয়ে উত্সাহী ছিলেন আবুল ফজল সাহেব। তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আমার খালাম্মাকে দেখে তিনি এতটাই অভিভূত হয়েছিলেন যে তিনি তাঁকে ‘মা’ বলে ডাকতেন এবং আমার খালাম্মা যত দিন সুস্থ ছিলেন, তত দিন তিনি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন। আমার খালাম্মার নাম এম ফাতেমা খানম। আসল নাম মামলুকুল ফাতেমা খানম১০। কিন্তু নামটা একটু বড় বলে তিনি সংক্ষেপে লিখতেন এম ফাতেমা খানম। এ নামেই তিনি পরিচিত ছিলেন। তিনিও স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষকতা করার ফাঁকে ফাঁকে সাহিত্যচর্চা করতেন। শুধু তা-ই নয়, তিনি যখন কোনো ছেলেমেয়েকে, বিশেষ করে শিক্ষা বা সাহিত্যের ব্যাপারে আগ্রহী মুসলিম ছেলে বা মেয়েকে, কিংবা তাদের কাউকে সাহিত্যের ক্ষেত্রে কিছু একটা করতে দেখলেই তাদের তিনি নিজের থেকে ডেকে স্নেহ করতেন, উপদেশ দিতেন এবং তাদের সঙ্গে একটা নিয়মিত যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করতেন। তখনকার দিনের যেসব তরুণ সাহিত্যিক গোষ্ঠী ছিল, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে এবং তার যাঁরা তরুণ সদস্য-সদস্যা ছিলেন, তাঁদের সবাই আমার খালাম্মাকে ‘মা’ বলে ডাকতেন। তাঁরা প্রতি রোববার তাঁর কাছে আসতেন। আর আবুল ফজল সাহেব আমাদের বাড়িতে আসতেন; বলতে গেলে, প্রায় প্রতিদিনই বিকেলে। চা-নাশতা খেতেন। অনেক সময় ভাতও খেয়ে হোস্টেল বা হলে ফিরতেন। তিনি আমাদের আত্মীয়ের মতোই হয়ে উঠেছিলেন। আমরাও তাঁকে ‘ভাই’ বলে ডাকতাম। তাঁকে বড় ভাইয়ের মতোই মনে করতাম। আমি তখন বেশ ছোট। কিন্তু আমার সেসব স্মৃতি এখনো স্পষ্ট মনে আছে। কোনো কাগজ বের হলে বা কোনো নতুন লেখা বের হলেই তাঁরা খালাম্মার কাছে সেসবের কাটিং নিয়ে আসতেন। একজন পত্রিকায় প্রকাশিত লেখাটা পড়তেন। অন্যরা শুনতেন। তারপর পাঠ করা লেখাটির ওপর আলোচনা করতেন। বয়স অল্প হলেও আমিও সেখানে একজন নীরব শ্রোতা হিসেবে সব সময় উপস্থিত থাকতাম। এভাবে আমি বাড়িতে একটা সুন্দর নির্মল সাহিত্যিক পরিবেশের ভেতর দিয়েই বেড়ে উঠেছি।

একবার খালাম্মার লেখা ছোটগল্প পড়ে বেগম রোকেয়া১১ তাঁকে চিঠি লিখেছিলেন। চিঠিতে তাঁর পরিচয় পেয়ে খালাম্মাকে তিনি লিখেছিলেন, ‘আপনি আমার স্কুলে এসে শিক্ষকতা করেন।’ বেগম রোকেয়ার অনুরোধ রাখতে ১৯৩০ সালে খালাম্মা কলকাতায় চলে যান। সেখানে গিয়ে তিনি সাখাওয়াত্ মেমোরিয়াল স্কুলে১২ শিক্ষকতার জীবন শুরু করেন। একটা কথা বোধ হয় এখানে বলা উচিত, সেটা হচ্ছে এই যে আমার খালাম্মা তখনকার মুসলমান সমাজের ছেলেমেয়েরা, বিশেষত মেয়েরা যে যেখানেই লেখাপড়া করেছে, তাকেই তিনি চিঠি দিয়ে বা ব্যক্তিগতভাবে দেখা করে উত্সাহ দিয়েছেন। আমার খালাম্মা পর্দার মধ্যেই ছিলেন। তবুও তাঁর সঙ্গে তাদের, মানে শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের একটা আন্তরিক যোগাযোগ ছিল। এ সময় যখন তিনি জানতে পারলেন যে ফজিলাতুন্নেসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতশাস্ত্রে এমএতে ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছেন, তখন তিনি রীতিমতো অবাক হয়েছিলেন। সমভাবে খুশিও হয়েছিলেন এবং তখন-তখুনি এ রকমের সিদ্ধান্ত নিলেন যে মেয়েটিকে তো আমার দেখা উচিত। আবুল ফজল সাহেবের মাধ্যমে তিনি তাঁকে বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে এনেছিলেন। মিস ফজিলাতুন্নেসা যেদিন আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন, সেদিনকার কথা আমার এখনো কিছু কিছু মনে আছে। আমাদের বাড়িতে ঘোড়ার গাড়িতে চেপেই তিনি এসেছিলেন। তাঁকে নিয়ে এসেছিলেন আমার বড় ভাই আর আবুল ফজল মিলে। খালাম্মা তার জন্য অনেক রকমের নাশতা, হালুয়া, মোরব্বা ইত্যাদি বানিয়েছিলেন, সেদিন তিনি ওই সব খাবার অনেক যত্ন করে ফজিলাতুন্নেসাকে খাইয়েছিলেন।

ফজিলাতুন্নেসা সেদিন আলাপ করার সময় যেসব কথা বলেছিলেন, তার সব আজ আর মনে নেই। কথাবার্তা বলার পরপরই তিনি চলে গিয়েছিলেন। যাওয়ার পর খালাম্মা বলেছিলেন, ও তো আমাদের সমাজের একটি উজ্জ্বল রত্ন। ওদের সম্মান জানানো উচিত, ভালোবাসা উচিত। ওদের আদর্শ অনুসরণ করা হলে অন্য আর সব মেয়ে এগিয়ে আসবে। দেখলে তো কত বিদ্যা! আমিও অভিভূত হয়ে দেখলাম এমন একজন নারীকে, যাঁর মাথায় লুজ পিন দিয়ে আঁটা শাড়ি। দেখতে বেশ স্মার্ট। কথাবার্তা বলে চলে গেলেন। আমারও খুব ভালো লাগল। যদিও আমার বয়স তখন খুবই কম।

ঢাকায় কামরুন্নেসা স্কুলে আমি পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিলাম।

যা বলছিলাম, আমার খালাম্মার ছোটগল্প পড়ে বেগম রোকেয়া তাঁকে এই বলে চিঠি লিখেছিলেন যে ‘আপনাকে আমার ভালো লেগেছে। আপনি কী করেন? আপনার পরিচয় জানতে চাই।’ খালাম্মার চিঠির জবাবে যখন তিনি জানলেন যে, তিনি শিক্ষকতাই করছেন, তখন তিনি তাকে তাঁর সাখাওয়াত্ মেমোরিয়াল স্কুলে যোগ দেওয়ার জন্য সাদর আমন্ত্রণ জানালেন। সেই অনুসারে খালাম্মা ১৯৩০ সালে কলকাতা চলে যান। সাখাওয়াত্ মেমোরিয়াল স্কুলে তিনি শিক্ষয়িত্রী হিসেবে যোগ দেন। এর কিছুদিন পর খালাম্মা আমাকেও কলকাতায় নিয়ে যান। ১৯৩২ সালের কথা সেটা। তিনি আমাকে সাখাওয়াত্ মেমোরিয়াল স্কুলে ভর্তি করাতেই নিয়ে যান। তখন আমি সবে সপ্তম শ্রেণিতে উঠেছি। কিন্তু খালাম্মার জেদ যে তিনি আমাকে ক্লাস নাইনে ভর্তি করাবেন। প্রথমেই আমি ভর্তি পরীক্ষায় অঙ্কে ফেল করলাম। আমার তখন কী লজ্জা! আমি বললাম, না, আমি এখানে পড়ব না। আমি তো পারব না।

খালাম্মা বললেন, মা, তোমাকে এখানেই পড়তে হবে।

অন্য শিক্ষকেরা বললেন, ও তো অঙ্কে ভীষণ কাঁচা। বাংলা-ইংরেজি চালাতে পারলেও অঙ্কে পারবে না। ওকে বরং অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি করিয়ে দিন। ও পারবে না। কিন্তু খালাম্মার জেদ। তিনি আমাকে বাড়িতে দুই মাস পড়িয়ে আবার নিয়ে গেলেন মে মাসে। এবার আমি ভর্তি পরীক্ষায় পাস করলাম। ফলে নবম শ্রেণিতেই ভর্তি হতে পারলাম। ভর্তি হওয়ার সময় আমার বেশ একটা বিপত্তি দেখা দিল। কারণ, আমি তো দুই ক্লাস ডিঙিয়ে ভর্তি হয়েছিলাম।

খালাম্মা বললেন, ও স্পেশাল বাংলা নিয়ে পড়বে। কারণ, বাংলাতে ও ভালো। তাহলে ওর সুবিধা হবে। কিন্তু বেগম রোকেয়ার স্কুলে বাংলা পড়ানোর তেমন ভালো ব্যবস্থা ছিল না। খালাম্মা তাই বললেন, তাহলে তো ওকে এখানে রাখা একটু অসুবিধা।

বেগম রোকেয়া সব শুনে বললেন, না, তা কেন হবে? ও এখানেই পড়বে। আমি ওর ব্যবস্থা করব। তিনি তখন কেবল আমার জন্য মিস কমলা নিয়োগী বলে বাংলায় স্নাতক পাস একজন মহিলা শিক্ষয়িত্রীকে নিযুক্ত করলেন। কারণ, উঁচু ক্লাসে আর কোনো মেয়ে ছিল না। সাখাওয়াত্ মেমোরিয়ালে পড়া তখন বেশির ভাগই মেয়েই ছিল উর্দুভাষিণী।

যা-ই হোক, ১৯৩২ সালের মে মাসে আমি সাখাওয়াত্ মেমোরিয়ালে ভর্তি হলাম। বেগম রোকেয়াকে তখন আমি প্রায় প্রতিদিনই দেখতাম। কারণ, প্রতিদিন আমাদের যে প্রার্থনা সভা হতো, তিনি তাতে যোগ দিতেন এবং প্রার্থনা-সংগীতের সূচনা তিনিই প্রথম করতেন। ইকবালের লেখা একটা গজল দিয়ে প্রার্থনা-সংগীত গাওয়া হতো। তাঁর সঙ্গে আমরাও যোগ দিতাম। গলা মেলাতাম। তাঁর সেই চেহারা আজও আমার স্পষ্ট মনে আছে। তাঁকে আমরা তখন আমাদের একমাত্র আদর্শ বলেই ভাবতাম। তিনি আসামাত্রই মনে হতো যেন দেবীর আবির্ভাব ঘটেছে। তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে আমরাও খুব ধ্যানমগ্নভাবে প্রার্থনা-সংগীতটা গাইতাম। এভাবেই চলছিল সবকিছু। কিছুদিন পর অর্থাত্ ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর আকস্মিকভাবেই তিনি মারা যান। সকালে ড্রাইভার এসে আমাদের খবর দিল যে বড়ি ওস্তাননি বি আর নাই। আমরা সবাই তাঁকে বড়ি ওস্তাননি বলতাম। বড়ি ওস্তাননি মানে বেগম রোকেয়া।

খবরটা শোনামাত্র আমরা ছুটলাম স্কুলের দিকে। গিয়ে দেখলাম তাঁর মরদেহ বিছানায় শোয়ানো। চারদিকে কোরআন শরিফ পড়া হচ্ছে। আমার খালাম্মাও একটা কোনায় কোরআন শরিফ নিয়ে বসে পড়লেন। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য। সেই শোকাবহ দৃশ্যের কথা আজও আমার থেকে থেকেই মনে হয়। বেগম রোকেয়ার আত্মীয়স্বজনে (স্কুলের তেতলায় তিনি থাকতেন) তেতলার বারান্দাঘর তখন গিজগিজ করছে। একসময় তাঁকে কবর দেওয়ার জন্য নিয়ে যাওয়া হলো। মনে হলো যেন আমাদের স্কুলের পুরো ভবনটাই অন্ধকারে ছেয়ে গেল। এ স্কুল থেকেই ১৯৩৪ সালে আমি প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করি।

আমার খালাম্মার উচ্চশিক্ষার দিকে অসম্ভব ঝোঁক ছিল। নিজের জীবনে তিনি যে আশা পূরণ করতে পারেননি, তিনি চেয়েছিলেন আমার জীবনের ভেতর দিয়ে সেটা দেখতে। আমার খালাম্মাও বাড়িতে লেখাপড়া করেছেন। প্রবীণ বয়সে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিলেন। তিনি বললেন, তোমাকে আমি কলেজে ভর্তি করাব। কিন্তু আমার বাবা তাতে তেমন সায় দেননি। আমার বাবা তখন পাটনাতে চাকরি করতেন। মাঝেমধ্যে আমাকে এসে দেখে যেতেন। বাবা যখন দেখলেন খালাম্মার আপত্তি নেই এবং কলেজে পড়ার ব্যাপারে আমারও আগ্রহ প্রবল, তখন তিনি খালাম্মাকে লক্ষ করে বললেন, বেশ তো, মেয়ে আপনার। আপনি যা করবেন, তা-ই হবে। কাজেই আমি বেথুন কলেজে১৩ ভর্তি হয়ে গেলাম। এখান থেকেই আমি প্রথম বিভাগে আইএ পাস করি। পরে পাস করি বিএ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাকে বেথুনে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার পরপরই খালাম্মা অসুস্থ হয়ে পড়েন। আমি যখন ওখান থেকে আইএ এবং বিএ পাস করি, তখন আমার সমসাময়িক কালে আর কোনো মুসলিম নারী পড়াশোনা করতেন কি না এবং যখন আমি বিএ পাস করে বের হই, তখন আমার মতো আর কেউ শিক্ষকতা করতেন কি না, বাংলাদেশে, বলতে গেলে সারা বাংলাদেশে, এ রকম কোনো মুসলিম নারীর নাম আমি শুনেছিলাম কি না, কিংবা তাঁদের সঙ্গে আমি পরিচিত হয়েছিলাম কি না, এ রকম একটা প্রশ্ন উঠতে পারে এবং তার জবাবে আমি বলব যে হ্যাঁ, ছিল। সে প্রসঙ্গেই এবার একটু কথা বলা যেতে পারে।

আমি যখন বেথুনে আইএ প্রথম বর্ষে ভর্তি হই, তখন সেখানে দু-একজন মুসলিম নারী ছিলেন। আমার সঙ্গেই ভর্তি হয়েছিলেন। নাম সুরতুন্নেসা। তিনি এখনো জীবিত আছেন। তিনিও শিক্ষকতা করছেন। আর আমার ওপরে অর্থাত্ বিএ ক্লাসে পড়তেন মিসেস রাবেয়া আলী ও মিসেস আখতার ইমাম১৪। মিসেস রাবেয়া আলী এখন বেঁচে নেই। মিসেস ইমাম এখনো বেঁচে আছেন। তাঁরা আমার সিনিয়র। তাঁরা এই বেথুন কলেজেরই ছাত্রী। আর আমার সঙ্গে আরেকজন নারী বিএ পাস করেছিলেন—তিনি মিসেস জামশেদুন্নেসা, তিনিও এখন বেঁচে নেই। পরবর্তীকালে তিনি আমার স্কুলে আমার অধীনে চাকরিও করেছেন এবং শিক্ষিকা হিসেবে অবসর গ্রহণ করার পর তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। সারা বাংলাদেশে, মানে পশ্চিম বাংলা আর পূর্ব বাংলা অর্থাত্ যুক্ত বাংলা মিলিয়ে তখন বছরে বড়জোর দুটি কি তিনটি মুসলমান বাঙালি মেয়ে ম্যাট্রিক পাস করে কলেজে ঢুকত। কাজেই আমরা যে কটি মেয়ে তখন ছিলাম বা তখন পড়াশোনা করতাম, আমরা আমাদের নামে সবার কাছেই মোটামুটিভাবে পরিচিত ছিলাম। কারণ, মুসলমান মেয়েদের মধ্যে তখন লেখাপড়া করা, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা লাভ করা একটা দুরূহ ব্যাপার ছিল। খুব কম পরিবারই তখন এতখানি উদারতা দেখাতে পেরেছে, মেয়েকে স্কুল থেকে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানোর দুঃসাহস দেখাতে পেরেছে। আমার বেলায় একটা সুবিধা ছিল যে আমার নানি, খালাম্মা—সবাই লেখাপড়া জানতেন। তাঁরা পর্দার ভেতরে থাকলেও বাড়িতে তাঁদের পড়াশোনার ব্যবস্থা ছিল। আমার নানিকে ইংরেজি এবং ক্রুশ কাঠিতে উলের বোনাবুনির কাজ শেখানোর জন্য আমার নানা একজন ইংরেজ মিশনারি নারীকে নিযুক্ত করেছিলেন। আমার খালাম্মা নিজের চেষ্টায় ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিলেন। তাই তাঁদের তরফ থেকে আমার শিক্ষাদীক্ষার ব্যাপারে কোনো ধরনের বাধা আসেনি।

১৯৩৮ সালে আমি যখন বিএ পরীক্ষা দেব, তখনই আমার বিয়ে ঠিক হয় এবং বিএ পরীক্ষার দিন কয়েক আগেই আমার বিয়ে হয়ে যায়। যে পরিবারে আমার বিয়ে হয়, তাঁরাও ছিলেন খুবই উদারপন্থী, শিক্ষিত ও সাহিত্যমনা। কাজেই আমি যে পারিবারিক পরিবেশ থেকে এসেছিলাম, সেই একই ধরনের পারিবারিক পরিবেশে আবার আমার ঠাঁই হলো। অর্থাত্ একটা অনুকূল পরিবেশেই আবার আমার ঠাঁই হলো। আমি আমার খালাম্মার কাছ থেকে যে ধরনের ভালোবাসা, শিক্ষা গ্রহণের যে সুযোগ পেয়েছি, শ্বশুরবাড়িতে এসেও সে ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বাধার সৃষ্টি হলো না। কারণ, আমার স্বামী সাহিত্যিক ছিলেন এবং তার বোন অর্থাত্ আমার ননদ—তিনিও ছিলেন উচ্চশিক্ষিতা ও সাহিত্যিক। তাঁরা দুজনেই ‘বাহার’ ও ‘নাহার’ নামে বাংলাদেশে সুপরিচিত। আমার স্বামী প্রধানত সাহিত্যচর্চা, সমাজসেবা, খেলাধুলা এবং কিছুটা রাজনীতিও করতেন। বিয়ের পর থেকে আমি সামাজিক কাজকর্ম বা সমাজসেবার কাজে জড়িয়ে গেলাম। আমার খালাম্মা সামাজিক কাজকর্ম করেছেন ঢাকায় বসে। মেয়েদের জন্য বস্তিতে বস্তিতে স্কুল খুলেছিলেন। চালু করেছিলেন সেলাই শিক্ষাকেন্দ্র। এসব কাজ তিনি করে গিয়েছেন। বেগম রোকেয়া প্রতিষ্ঠিত ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’-এরও সদস্য ছিলেন তিনি। এখানে এসে আমি আরও বৃহত্তর এক পরিবেশের বাসিন্দা হয়ে গেলাম। আমার স্বামী বলতেন, যারা লেখাপড়া শিখেছে, তারাই তো এসব কাজে এগিয়ে আসবে। কারণ, আমাদের সমাজের মেয়েরা এখনো অনেক পিছিয়ে আছে, এখনো অনেক বাধার মধ্যে আছে। তারা তো রীতিমতো বন্দী জীবন যাপন করছে। কাজেই সংসারে থেকেও তোমাদের এসব কাজের দায়িত্ব নিতে হবে। আমার স্বামীর নাম মোহাম্মদ হবীবুল্লা বাহার চৌধুরী১৫ আর তাঁর ছোট বোনের নাম বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদ১৬। তাঁরা দুজনই একযোগে সাহিত্যসাধনা করেছেন। করেছেন নানাভাবে সমাজসেবামূলক কাজ। তাঁরা দুজন মুসলমান জাতি, বিশেষ করে বাঙালি মুসলমান জাতি কীভাবে শিক্ষাক্ষেত্রে, সাহিত্যক্ষেত্রে, শিল্প-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে নিজের যোগ্য আসনটি লাভ করবে, নিরন্তর সামনে এগিয়ে যাবে— চিরকালই চালিয়ে গেছেন সেই চেষ্টা। এই পরিবেশে এসে আমিও তাঁদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লাম। বিয়ের অল্প দিন পরেই বেগম রোকেয়া প্রতিষ্ঠিত আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’ অর্থাত্ ‘নিখিল বঙ্গ মুসলমান মহিলা সমিতি’র সেক্রেটারি অর্থাত্ সম্পাদক করা হয় আমাকে। এটি তিনি গঠন করেছিলেন ১৯১৬ সালে। এই সমিতির কাজ ছিল মেয়েদের উন্নতির ব্যাপারে প্রচেষ্টা চালানো। তখন আমার বয়স খুবই কম। বউ হিসেবে তখনো আমার লজ্জা ভাঙেনি। কিন্তু এ দায়িত্ব আমাকে নিতেই হলো। নিতে হলো আমার স্বামীর আগ্রহে। যা-ই হোক, এ সমিতির সেক্রেটারি হওয়ার পর আমাকে মাসে মাসে সভা ডাকতে হতো। সদস্যদের কাছ থেকে প্রতি মাসের চাঁদা আদায় করতে হতো।

আমাদের সমিতির একজন পিয়ন ছিল। চাঁদার খাতায় সদস্যদের নাম লিখে দিতাম। জনে জনে গিয়ে সে চাঁদা সংগ্রহ করত। আর আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলামের তরফ থেকে দুটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কুল চালানো হতো তখন। একটা ছিল বেগ বাগান রোডে, আরেকটা গোঁড়া চাঁদ লেনে। সপ্তাহে তিন দিন তিন দিন করে ছয় দিন দুই স্কুলে শিক্ষা দেওয়া হতো। এভাবে আমি সমিতির কাজ চালিয়ে যেতে লাগলাম। নিয়মিত আমাকে স্কুল পরিদর্শন করতে হতো। করতে হতো অন্য কাজকর্মও।

এ সময় আমি হঠাত্ করেই ডিপিআই অফিস থেকে একটা চিঠি পেলাম। সেই চিঠিতে আমাকে জানানো হয়েছে যে আমি বিএ পাস করার ফলে ৩০ টাকা বৃত্তি পেয়েছি। একই চিঠিতে আমি কোথায় পড়েছি, আমাকে সে কথাও জানাতে বলা হয়েছে। বলা বাহুল্য, তখন আমার বিয়ে হয়ে গেছে। আমি তখন আর লেখাপড়া করছি না। কিন্তু যখন আমি জানলাম যে আমার দুই বছরের স্কলারশিপ, তখন আমার মন খুব খারাপ হয়ে গেল। রীতিমতো কান্নাকাটি করতে শুরু করে দিলাম।

আমার তো আর এমএ পড়া হলো না। তখন পাক্কা একটা বছর চলে গেছে। আমার স্বামী আমার অবস্থা দেখে বললেন, ঠিক আছে আরও তো একটা বছর আছে। এই এক বছর তুমি স্কলারশিপটা পাবে। এক কাজ করো, তুমি বি-টি পড়ো। এক বছরের স্কলারশিপটাও পাবে। তোমার একটা ডিগ্রি পাওয়াও হবে। সেই অনুসারে আমি ১৯৩৯ সালে স্কটিশ চার্চ কলেজে ব্যাচেলর অব টিচার্স ট্রেনিংয়ের ক্লাসে যোগ দিলাম এবং সেখান থেকে আমি ১৯৪০ সালে প্রথম বিভাগে পাস করি।

ওদিকে আমার সমিতির কাজও চলছে। এদিকে আমার একটা মেয়ে হলো ১৯৪০ সালে। এ সময় হঠাত্ করেই আমি সাখাওয়াত্ মেমোরিয়াল স্কুল থেকে এই মর্মে একটা চিঠি পেলাম যে আপনাকে শিক্ষকতার পদে যোগ দিতে অনুরোধ করা হচ্ছে। আমি তো অবাক। বললাম, আমি ওখানে কিছুতেই পড়াতে পারব না। ও স্কুল থেকে মাত্র কয়েক বছর আগে আমি পাস করে বের হয়েছি। আমার ভারি লজ্জা করবে।

তখন আমার স্বামী বললেন, দেখ, এটা তো তোমার চাকরি না। তুমি যা কিছু শিখেছ, যে বিদ্যা তুমি আয়ত্ত করেছ, সেটাকে কাজে লাগানো। আসলে স্কুলে মুসলমান শিক্ষক নেই। ওখানে সব হিন্দু আর খ্রিষ্টান শিক্ষক। অথচ স্কুলটা মুসলমান মেয়েদের জন্য। ওটা প্রতিষ্ঠা করেছেন বেগম রোকেয়ার মতো মহীয়সী নারী। কাজেই তোমরা যারা লেখাপড়া শিখেছ, তোমাদের মতো মেয়েদেরই তো সেখানে সাহায্য করতে যাওয়া উচিত। পয়সাটাই তো বড় কথা নয়। কাজ কতখানি করতে পারবে, আসল কথা সেটা। সেও তো একধরনের সমাজসেবা। আমার স্বামীর অনুরোধে আমি ওখানে যাই।

তখন এডিপিআই ছিলেন বদিউর রহমান সাহেব, মানে খান বাহাদুর বদিউর রহমান। তিনি আমার নানা শ্বশুরের বিশেষ প্রিয় ছাত্র ছিলেন। তিনি আমাকে বললেন যে বউমা, আপনি আসুন। কেন আপনি আপনার আহূত বিদ্যার অপচয় করবেন? আমরা তো কোনো মেয়ে পাচ্ছি না। কোনো মুসলিম শিক্ষয়িত্রী পাচ্ছি না। যা পাই, তাও অবাঙালি। ১৯৪১ সালের কথা সেটা।

অবশেষে ওই স্কুলে আমি সহকারী প্রধান শিক্ষিকার পদে যোগ দিলাম। ওই পদে আমি বেশ কিছুদিন কাজ করার পর ভারত ভাগের ডামাডোল শুরু হয়ে যায়। আনুষ্ঠানিকভাবে দেশ ভাগের অল্প দিন আগে আমি ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষিকার পদে উন্নীত হই। এভাবে আমার সংসারজীবনের সঙ্গে আমার শিক্ষকতা জীবনও যুক্ত হয়ে যায়। কিন্তু আমরা এর পাশাপাশি সমাজসেবামূলক কাজ যতটা পেরেছি, করেছি। ১৯৩৮ থেকে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত আমি আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলামেরও সম্পাদক ছিলাম।

আমি স্কুলে যোগ দেওয়ার পর আস্তে আস্তে আরও জনাকয়েক বাঙালি শিক্ষয়িত্রী যোগ দিলেন এবং বাঙালি মুসলমান ছাত্রীর সংখ্যাও বাড়তে লাগল। শিক্ষয়িত্রীদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিলেন খ্রিষ্টান এবং অবাঙালি মুসলিম ও অবাঙালি হিন্দু। আমাদের প্রধান শিক্ষয়িত্রী ছিলেন তখন মিসেস আসিয়া হাসান। তিনি বদলি হয়ে যান, তাঁর জায়গায় আসেন মিস মাধুরী মং গাইন বলে একজন খ্রিষ্টান নারী। তিনি আমাকে খুবই স্নেহ করতেন।

তিনি যথেষ্ট যোগ্যও ছিলেন। এ সময় যেসব ছাত্রীকে আমরা পড়িয়েছি, তাদের মধ্যে দু-চারজন এখনো এখানে আছে। যেমন: কুলসুম হুদা, ড. হুদার স্ত্রী। তিনি এই স্কুলেরই ছাত্রী ছিলেন। ছিলেন অভিনেতা মোহাম্মদ জাকারিয়ার স্ত্রী তাহমিনা বানু। বর্তমানে তিনি মতিঝিল হাইস্কুলের শিক্ষিকা। এরা সবাই আমার ছাত্রী। তা ছাড়া রোকসানা রেজা বলে একজন ছাত্রী ছিল আমার। সে এ দেশের প্রথম বৈমানিক। আমার আরও অনেক ছাত্রী ছিল, যাদের অনেকেই এখন বাংলাদেশে বহাল তবিয়তে আছে। ব্যারিস্টার কামাল হোসেনের স্ত্রী হামিদা হোসাইন এবং ব্যারিস্টার মোস্তফা কামালের স্ত্রী হোসনে আরা বেগমও আমার ছাত্রী।

আগেই বলেছি, আমার স্বামী হবীবুল্লাহ বাহার সাহিত্যচর্চা করতেন, খেলাধুলা করতেন। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপারেও অত্যন্ত উত্সাহী ছিলেন। বলতে গেলে তখনকার তরুণ মুসলিম সমাজের তিনি পুরোধাপুরুষ ছিলেন। তখনকার দিনের তরুণ সব সাহিত্যিক, যেমন: আহসান হাবীব১৭, ফররুখ আহমদ১৮, শওকত ওসমান১৯ ও কবি আবুল হোসেন২০—এঁদের সবাই আমার স্বামীকে মধ্যমণি করেই তাঁদের লেখালেখি চালাচ্ছিলেন। বাহার সাহেব ছাড়া তাঁদের চলত না। দিন-রাতের বেশির ভাগ সময় তাঁরা তাঁর সঙ্গেই কাটাতেন কোনো বিষয় নিয়ে তর্ক করে, আলোচনা করে। তাঁকেই আদর্শ পুরুষ হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন তাঁরা। আমার স্বামীর সঙ্গে নজরুল ইসলামের২১ যোগাযোগ ছিল অনেক আগে থেকেই। তিনি যখন চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র ছিলেন, ১৯২৮ সাল কি ১৯২৯ সালের কথা সেটা, আমার ঠিক মনে নেই। আমার তখন বিয়েও হয়নি, আমি তখন খুবই ছোট, পরে আমার স্বামীর কাছ থেকে আমি শুনেছি যে নজরুলকে তিনি দুবার আমন্ত্রণ করে চট্টগ্রাম নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁরা তখন চট্টগ্রামে থাকতেন। তাঁদের বাড়ির নাম ছিল ‘আজিজ মঞ্জিল’। আমার নানাশ্বশুর খান বাহাদুর আবদুল আজিজ সাহেবের বাড়ি। তিনি একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবক ছিলেন। তাঁর নামে চট্টগ্রামে অনেক প্রতিষ্ঠান আছে। তিনি নিজেও কিছু প্রতিষ্ঠান করে গেছেন— ‘মোহামেডান এডুকেশন সোসাইটি’, ‘ভিক্টোরিয়া ইসলাম হোস্টেল’ ইত্যাদি। তাঁর সেই বাড়িতেই নজরুলকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। নজরুল সেখানে এক মাস ছিলেন। চট্টগ্রাম শহরের ছাত্র থেকে শুরু করে সব গুণী শিল্পী-সাহিত্যিক সব সময় তাঁকে মৌমাছির মতো ঘিরে রাখতেন। নানান জায়গায়, এমনকি সীতাকুণ্ডের পাহাড়ে পর্যন্ত বেড়াতে নিয়ে যেতেন। রাতের বেলা নজরুল এসে বাড়িতে বসতেন। খাওয়াদাওয়ার পর তাঁকে এক ডিবা পান, হাতে একটা খাতা আর একটা কলম ধরিয়ে দেওয়া হতো। আমার নানাশ্বশুরের সেই বাড়িতে সামনের যে ঘরটা ছিল, তাতেই নজরুলকে থাকতে দেওয়া হয়েছিল। তিনি সেখানেই থাকতেন। সারা রাত ধরে তিনি লিখতেন। সকাল হলে আমার ননদ এবং আমার স্বামী তাঁর সেই লেখার পাতাগুলো জড়ো করতেন। এভাবে ওখানে বসে তিনি যেসব কবিতা লিখেছিলেন, সেগুলো পরবর্তীকালে তিনি সিন্ধুহিন্দোল নাম দিয়ে বই আকারে প্রকাশ করেন এবং তা উত্সর্গ করেন আমার স্বামী বাহার এবং ননদ নাহারের নামে।

উত্সর্গপত্রে নজরুল লিখেছিলেন, ‘আমার এই লেখাগুলি বাহার ও নাহারকে দিলাম।’ এর পরেই লিখেছিলেন এই কবিতাটি ‘কে তোমাদের ভালো?/ ‘বাহার’ আনো গুল্শানে গুল্, ‘নাহার’ আনো আলো।/ ‘বাহার’ এলে মাটির রসে ভিজিয়ে সবুজ প্রাণ,/ ‘নাহার’ এলে রাত্রি চিরে জ্যোতির অভিযান।/ তোমরা দুটি ফুলের দুলাল, আলোর দুলালী,/ একটি বোঁটায় ফুটলি এসে,—নয়ন ভুলালি!/ নামে নাগাল পাইনে তোদের নাগাল পেল বাণী,/ তোদের মাঝে আকাশ ধরা করছে কানাকানি!’

বইটা উত্সর্গ করার তারিখ ছিল ১৯২৬ সালের ৩১ জুলাই। উত্সর্গপত্রের আগের পৃষ্ঠায় ‘বাহার’ ও ‘নাহার’কে উদ্দেশ করে আরও দুটি কবিতার পঙিক্ত ছিল। পঙিক্ত দুটি ছিল এ রকম: ‘আলোর মতো জ্বলে ওঠো। ঊষার মতো ফোটো!/ তিমির চিরে জ্যোতির মতো প্রকাশ হয়ে ওঠো।’

আরেকটা কবিতা লেখা হয়েছিল এ বাড়িতে বসেই। বাড়িটায় ছিল এক সারি নারকেলগাছ। সেগুলো ছায়া ফেলেছিল নজরুলের মনে। বিখ্যাত সেই কবিতার নাম ‘বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি’। তিনি যেদিন চলে আসবেন, তার আগের দিন রাতে এ কবিতাটি তিনি লিখেছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি কলকাতায় এসে বই ছাপিয়ে তাঁদের পাঠান। এবং তাঁরা যখন দেখলেন যে তাঁদের দুই ভাইবোনের নামেই কবি বইটা উত্সর্গ করেছেন, তখন তাঁদের সে কী প্রচণ্ড উল্লাস আর আনন্দ! আমার স্বামী আর আমার ননদের কাছে শুনেছি যে তাঁরা ভাবতেই পারেননি যে তাঁদের মতো সামান্য ছাত্রছাত্রীদের তিনি এত বড় উপহার দিতে পারেন! তাঁরা সেদিন ধন্য হয়ে গিয়েছিলেন। নজরুল ইসলামকে পরে আমি দেখেছি। তাঁর অসুস্থ হওয়ার আগেও তাঁকে দেখেছি। আমার ননদের বাড়িতে ১৯৪১ সালের ডিসেম্বর মাসে একটি সাহিত্যসভা হয়েছিল। ওটা ছিল ঈদ রিইউনিয়ন বা ঈদ পুনর্মিলনীর মতো একটা অনুষ্ঠান। হয়েছিল ডিসেম্বর মাসে। আমার ননদ তখন থাকতেন কলকাতার শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালের কোয়ার্টারে। তাঁর স্বামী ডা. মাহমুদ সেখানে ডাক্তার ছিলেন। সেদিনই নজরুলকে আমি সুস্থ অবস্থায় শেষবারের মতো দেখেছিলাম। তার আগে অবশ্য কয়েকবারই তাঁকে দেখেছি বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির২২ সভায় বক্তৃতা দিতে এবং তাঁর সেই বিখ্যাত কবিতার বিখ্যাত সেই লাইনগুলো ‘প্রেম ঘনসুন্দর, রসঘন সুন্দর, আনন্দঘন সুন্দরের সান্নিধ্য আমি চাই’—আমার কানে আজও বাজে। কবিতাটি পাঠ করেছিলেন তিনি ১৯৩৯ সালে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির এক অধিবেশনে। তাঁকে আমি সুস্থ অবস্থায় শেষবারের মতো দেখেছিলাম ১৯৪১ সালের ডিসেম্বরে ওই শম্ভুনাথ পণ্ডিত স্ট্রিটে অবস্থিত হাসপাতালের কোয়ার্টারে আমার ননদের বাড়িতেই। সেদিন তাঁর কথা কেমন জানি জড়িয়ে জড়িয়ে আসছিল। তখনো কিছুটা সুস্থ ছিলেন। কিন্তু হাবেভাবে বোঝা যাচ্ছিল তাঁর ভেতরে কোনো একধরনের অনুভূতি কাজ করছে। তিনি সবাইকে চিনছেন। সবাইকে আদর করছেন। সবার সঙ্গে কথা বলছেন। কিন্তু তবুও তাঁর আগের সেই প্রাণোচ্ছলতা যেন আর নেই। যে নজরুল হইহই করে ছাদ-ফাটানো হাসি হাসতেন ক্রমে সেটা মিলিয়ে যেতে লাগল। তখন থেকেই একটু একটু করে ব্যাপারটা অনুভব করতে পারছিলাম। তারপর ১৯৪২ সালে তিনি তো পুরোপুরিই অসুস্থ হয়ে পড়লেন।

যা-ই হোক, বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদের কথা বলতে গেলে বলতে হয়, তিনি তাঁর ভাইয়ের উত্সাহে লেখাপড়া শিখেছিলেন এবং সমাজসেবার কাজে তিনি নিজের জীবন উত্সর্গ করেছিলেন। রোকেয়ার মৃত্যুর পর তিনি আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলামের সেক্রেটারি ছিলেন বছর কয়েক। পরবর্তীকালে তিনি অন্যান্য সমিতিতে যোগ দেন। তার মধ্যে প্রধান ছিল ‘অল ইন্ডিয়া উইমেন্স কনফারেন্স’, কলকাতা শাখা। এ সংগঠনের তিনি সেক্রেটারি ছিলেন। পরে তিনি স্থায়ী কমিটির সদস্য হয়েছিলেন। এ সমিতি ছিল ভারত বিখ্যাত একটা সংগঠন। আমার বিয়ের পর তিনি আমাকেও এ সমিতির নির্বাহী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করেন এবং আমি এ সমিতির সাধারণ সভ্য হিসেবে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কাজ করেছি। এ সমিতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন মিসেস বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত, মিসেস সরোজিনী নাইডু২৩, মিসেস অরুণা আসিফ আলী প্রমুখ। কলকাতায় এ সমিতির খুব সম্ভব সেক্রেটারি কি প্রেসিডেন্ট ছিলেন এস সি মুখার্জি আইসিএসের সহধর্মিণী। তাঁর মেয়ে মিসেস রেণুকা রায়, মিসেস জি এল মেহেতা, লেডি রানু মুখার্জির মতো নারীরাও ওই সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন। আমার বিয়ের পর আমিও প্রথমবার ওই সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলাম। ড. বিধানচন্দ্র রায়, মি. জি এল মেহতা, মিসেস বি এম সেন এবং মিসেস এস সি মুখার্জির বাড়িতে এই সমিতির সভা বসত পালা করে। আমরা সেখানে যোগ দিতাম। সেক্রেটারি হিসেবে আমার ননদের অনেক বেশি দায়িত্ব ছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাইঝি মিসেস ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণীও এই সমিতির সভ্য ছিলেন। ২ নম্বর ডাম্প অ্যাভিনিউতে তাঁর যে বাড়ি ছিল, আমরা সেখানেও গিয়েছি। সেখানে আমরা শ্রী প্রমথ চৌধুরীকেও দেখেছি। আমার ননদকে ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী খুবই স্নেহ করতেন। এভাবে তখনকার দিনের কলকাতা শহরের যে ‘জুুয়েল ক্রিম অব দ্য সোসাইটি’ অর্থাত্ তখনকার সমাজের শিরোমণিস্বরূপ এবং শিক্ষার আলোয় আলোকিত যেসব হিন্দু পরিবার ছিল, তাদের সঙ্গেও আমাদের একটা যোগাযোগ স্থাপিত হয়। তাদের ওখানে আমাদের আসা-যাওয়া ছিল এবং আমার ননদের সঙ্গে আমিও সেসব জায়গায় অনেকবার গিয়েছি। সামান্য কিছু কাজও করেছি। কিন্তু বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ কাজ আমার ননদ শামসুন্নাহার মাহমুদই সম্পন্ন করেছেন। এ জন্য অনেক সময় তাঁকে অনেক প্রতিনিধিদলের সদস্য হয়ে অল ইন্ডিয়া উইমেন্স কনফারেন্সের অন্যান্য প্রদেশে যেসব শাখা গড়ে উঠেছিল, সেসবের সম্মেলন ইত্যাদিতে যোগ দেওয়ার জন্য নানান জায়গায় যেতে হয়েছে। বোম্বেতে ওই সমিতির যেসব শাখা ছিল, সেগুলোর সম্মেলনেও তিনি নিয়মিত যোগ দিয়েছেন। এ ছাড়া ডেলিগেশন কমিটিরও তিনি সদস্য ছিলেন। আরও অনেক সভা-সমিতির সদস্য ছিলেন তিনি। সব কটির নাম আজ এই মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে না।

আমরা যখন কলকাতায় ছিলাম, তখন সমাজসেবার কাজে মেয়েরা খুব কমই জড়িত ছিল, বিশেষত মুসলমান বাঙালি মেয়েরা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শামসুন্নাহার মাহমুদই অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি অনেক সভা-সমিতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পাশাপাশি সাহিত্যচর্চা করেছেন, সাহিত্য সমালোচনা লিখেছেন। সাহিত্যসভায় ভাষণ দিয়েছেন। এমনকি তাঁকে একবার ১৯৪০ সাল কি ১৯৪১ সালে, না ১৯৪০ সালেই রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর অল্প কিছুকাল আগে শান্তিনিকেতন থেকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল। সেখানে গিয়েও তিনি ভাষণ দিয়েছিলেন।

তখনকার দিনে কলকাতা শহরে আর কোনো মুসলমান মেয়েকে আমি এসব কাজে, মানে সভা-সমিতি বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকতে দেখিনি। আমি ও আমার ননদ পুরুষদের সভা-সমিতিতেও যেতাম। মানে যুক্ত সভা-সমিতিতে যোগ দিয়েছি। এসব সভা-সমাবেশ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির উদ্যোগেই হয়েছে। পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটির উদ্যোগেও হয়েছে। বঙ্গীয় মুসলমান মহিলা সমিতি অর্থাত্ বেগম রোকেয়ার প্রতিষ্ঠিত যে প্রতিষ্ঠান, সেই আঞ্জুমানের উদ্যোগেও সভা-সমিতির আয়োজন করা হয়েছে এবং গণনাট্য সংঘের উদ্যোগে যেসব সাংস্কৃতিক ও নাট্যানুষ্ঠান হতো, সেসবেও আমরা যেতাম। আর অল ইন্ডিয়া উইমেন্স কনফারেন্স অর্থাত্ নিখিল ভারত মহিলা সম্মেলনের কলকাতা শাখার সেসব সভা-সমিতি হতো, সেখানে তো আমরা দুজন যেতামই। এসব জায়গায় আমি আমাদের পরিচিত বা অপরিচিত কোনো মুসলিম নারীকে যোগ দিতে দেখিনি। অন্য কোনোভাবেও তাদের সম্পৃক্ত হতে দেখিনি। তবে আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলামে যেসব নারী ছিলেন, তাঁরা আঞ্জুমানের সভা-সমিতিতে এসেছেন। সেখানে অবশ্য আমি বেগম সুফিয়া কামাল বা বেগম মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকাকে কোনো দিন দেখিনি। বেগম মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকার সঙ্গে আমার পরিচয় হয় দেশ ভাগের পর ঢাকায় এসে। তবে বেগম সুফিয়া কামালকে আমি চিনতাম। পার্ক সার্কাসের যে বাড়িটায় তিনি থাকতেন, সেই বাড়িতে আমি আমার ননদের সঙ্গে দু-একবার গিয়েছি। তাঁর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল এবং তাঁর লেখা তখনকার দিনের সওগাত ও মোহাম্মদীর২৪ মতো কাগজে বের হতো। দেশ ভাগের মাত্র অল্প কিছুদিন আগে নাসিরউদ্দীন সাহেবের মেয়ে নূরজাহান বেগম একটা পত্রিকা করেছিলেন। নাম ছিল বেগম২৫। সেখানেও তিনি আর আমার ননদ লিখতেন। তাঁদের আগে দু-একজন মহিলা হয়তো লিখে থাকতে পারেন, তবে তাঁদের সঙ্গে আমার চাক্ষুষ পরিচয় কখনো হয়নি।

আগেই বলেছি, দেশ ভাগের একেবারে আগেভাগে মাত্র অল্প কয়েক দিনের জন্য আমি কলকাতা সাখাওয়াত্ মেমোরিয়াল স্কুলের প্রধান শিক্ষিকার পদে উন্নীত হয়েছিলাম। পরে সেখান থেকে আমাকে ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী বালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার পদে বদলি করা হয়। সেখানে যোগ দেওয়ার পর আমি দেখলাম যে দেশে কিছুই নেই। সবাই চলে গেছে। স্কুলে শিক্ষক নেই, ছাত্রী নেই এবং সেখানকার হিন্দুপ্রধান এলাকার লোকজন বলতে লাগলেন যে এই মুসলমানেরা আবার কী দেশ চালাবে, কেমন করে স্কুল চালাবে? এ স্কুল আর চলবে না। যে স্কুলের কাজ এতকাল মিসেস বক্সী চালিয়েছেন, সেই স্কুল মুসলমানেরা চালাবে কী করে?

এসব দেখেশুনে আমার মনে একটা জেদ চেপে বসল। নিজেকেই বললাম, কেন আমরা পারব না?

এ অবস্থায় আমি সেখানকার ডিসির (জনাব আসগর) সঙ্গে কথা বলে স্থানীয় যত নারী পেলাম, রাস্তাঘাটে, এমনকি সিনেমা দেখতে গিয়ে সিনেমা হলে যাঁদের পেলাম, তাঁদের বেশির ভাগই ছিলেন কলকাতার লেডি ব্রাবোর্ন কলেজের ছাত্রী, সবাই আমার পরিচিত, তাঁদের ডেকে ডেকে স্কুলে যোগ দেওয়ালাম। তখন ডিপিআই অফিস ছিল চট্টগ্রামে। ড. কুদরাত-এ-খুদা সাহেব ছিলেন ডিপিআই। তাঁকে টেলিফোন করে এ ঘটনা জানালে তিনি বললেন, হ্যাঁ, আপনি যাকে পান, তাকেই নিয়োগপত্র দিয়ে দিন। এভাবে ১৬ জন শিক্ষককে নিয়োগ দিয়ে স্কুল চালু রাখলাম। স্কুলের মেয়েদের খেলাধুলা আর শরীরচর্চা শিক্ষা দেওয়ার জন্য পাকিস্তান উইমেন্স ন্যাশনাল গার্ড ও গার্লস গাইডের শাখা ইত্যাদি খোলা হলো। ফলে স্কুলের এক্সট্রা কারিকুলামগত তত্পরতা খুব ভালোভাবে চলতে লাগল। তখন সবারই মনে দেশ গড়ার একটা জোশ এল। প্রত্যেকেরই তখন এক ভাবনা: প্রাণের চেয়েও মান বড়। কেন আমরা পারব না? ওরা আমাদের কেন ছোট বলবে? এভাবে স্কুলটা অল্প দিনের মধ্যেই বেশ ভালো হয়ে গেল এবং স্কুলের শিক্ষিকাদের সবাই যোগ দেওয়ার ফলে পড়াশোনার কাজও পুরোদমে চালু হয়ে গেল। আস্তে আস্তে অনেক ছাত্রীও এসে গেল। হিন্দু শিক্ষিকারা দেশ ছেড়ে যাওয়ার ফলে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল, সেই ঘাটতিটা আস্তে আস্তে পূরণ হয়ে গেল।

আমি ময়মনসিংহে থাকার সময়ই ‘মণিমেলা’র একটা সম্মেলন হয়। সেই সুবাদে কলকাতার প্রখ্যাত সাহিত্যিক বিমল ঘোষকে (মৌমাছি) এখানে নিয়ে আসা হলো। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ও তাতে যোগ দিয়েছিলেন। এসবই ১৯৪৭ সালের অক্টোবর-নভেম্বর মাসের কথা। ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত ‘মণিমেলা’র সেই অনুষ্ঠানে আমাকে একটি শাখার প্রধান হিসেবে বক্তৃতা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। আমার দেওয়া সেই ভাষণে আমি বললাম দেশ সম্পর্কে, সাহিত্য সম্পর্কে এবং দেশভাগের ফলে যে পরিস্থিতির মুখে আমরা পড়েছি, বললাম সে সম্পর্কেও। সবাই আমার ভাষণের খুব প্রশংসা করে বললেন, হ্যাঁ, খুবই সময়োপযোগী ভাষণ। ভালো বলেছেন। এভাবে তখনকার স্থানীয় হিন্দুদের সঙ্গেও আমার একটা ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠল।

ময়মনসিংহে দেড় বছর চাকরি করার পর আমাকে ওখান থেকে ঢাকার কামরুন্নেসা স্কুলে বদলি করা হলো। কামরুন্নেসা স্কুল মানে তখন ইডেন কলেজ যে ভবনে ছিল, তার ভবনটি। সরকার ওটাকে সচিবালয়ের ভবনে পরিণত করায় তাকে সরকারি দপ্তরের কাজের জন্য নিয়ে যাওয়ায় কামরুন্নেসা স্কুল এবং কলেজ, ইডেন স্কুল এবং কলেজের জায়গার অভাব দেখা দিল। ফলে স্কুল ও কলেজকে ভাগাভাগি করে (আগেই সম্ভবত বলেছি ঢাকার কামরুন্নেসা স্কুল একটা প্রাইভেট স্কুল ছিল) সেই স্কুলে ইডেন স্কুলকে ঢোকানো হলো এবং ইডেন কলেজকে বকশীবাজারের আরেকটা স্কুলে স্থানান্তর করা হলো। কামরুন্নেসা স্কুলের তখন খুবই শোচনীয় অবস্থা। শিক্ষয়িত্রীদের সবাই ভারতে চলে গেছেন। স্কুলবাড়ি আর টেবিল-বেঞ্চ ছাড়া আর কিছুই ছিল না সেখানে। তখন স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন একজন ইংরেজ মহিলা। মিসেস উইলস বলে তাঁকে ডাকা হতো। আসলে তিনি ছিলেন সহকারী স্কুল পরিদর্শক। দেশভাগজনিত পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাঁকেই এই স্কুল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। স্কুলের যখন খুব দুরবস্থা, পড়াশোনার অসুবিধা, শিক্ষক-শিক্ষয়িত্রীর শূন্যতা, তখন আমাকে ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী স্কুল থেকে এখানে বদলি করে আনা হলো। এখানে আসার পর আমি দেখলাম মেয়েরা শুধু মিটিং-মিছিল করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় যেসব ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে তাদের মিছিল করে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গিয়ে তারা ‘সরকার নিপাত যাক’, ‘রাজবন্দীদের মুক্তি চাই’ ইত্যাদি নানা ধরনের স্লোগান দেয়। এ সবকিছু করে করে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়ে। অভিভাবকেরা এসে আমাদের কাছে কেবল অভিযোগ করেন তাদের মেয়েদের লেখাপড়া ঠিকমতো হচ্ছে না বলে। এ ছাড়া স্কুলের চারপাশে কোনো দেয়াল বা প্রাচীর ছিল না। স্কুলে কোনো নিয়মকানুনও ছিল না, যা ছিল, তাও কেউ মানত না। ভালো শিক্ষয়িত্রীও ছিল না। এ সবকিছু দেখেটেখে আমি ডিপিআই সাহেবকে বলে অনতিবিলম্বে চারদিকে দেয়াল দেওয়ার ব্যবস্থা করলাম। ১২টি বাথরুম করলাম। করলাম নতুন নতুন শিক্ষিকা নিয়োগের ব্যবস্থাও। তাঁদের বেশির ভাগই ছিলেন আমার পূর্বপরিচিত। সবাই কলকাতার লেডি ব্রাবোর্ন কলেজ থেকে পাস করা ছাত্রী। তাঁদের যখন আমি নিয়োগ দিচ্ছি, তখন তাঁদের কেউ কেউ ঘরের বউ। কলকাতা থেকে ঢাকায় এসেছেন তাঁরা তাঁদের পিতা বা স্বামীদের হাত ধরে। বলতে গেলে তাঁদের ধরে ধরে এনে এখানে শিক্ষকতার কাজে যোগ দেওয়ানো হলো। এভাবে আমাদের স্কুলটা অল্প দিনের মধ্যে বেশ গুছিয়ে উঠল। কামরুন্নেসায় আমি ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত প্রধান শিক্ষিকার পদেই ছিলাম। এই সময়ের মধ্যে নতুন করে গড়ে ওঠা স্কুলগুলোর মধ্যে কামরুন্নেসা স্কুলই ছিল প্রথম স্কুল, যেটা খেলাধুলার ব্যাপারে, সংস্কৃতিচর্চার ব্যাপারে, পাশাপাশি পড়াশোনার ব্যাপারেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করে এসেছে। ১৯৪৯ সালে এ স্কুলের একজন মেয়ে বোর্ডে স্ট্যান্ড করার ফলে স্কুলের খুব সুনাম হয়। অচিরকালের মধ্যে স্কুলে ছাত্রীর সংখ্যা ১ হাজার ৩০০ হয়ে যায়। একই প্রধান শিক্ষিকার অধীনে উর্দু বিভাগও শুরু করা হয়। এখানে ছাত্রীর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৪০০। আমি যখন স্কুল ছাড়ি, তখন বাংলা বিভাগে ছিল ১ হাজার ৪০০ মেয়ে। আর উর্দু বিভাগে ছিল প্রায় ৪০০ মেয়ে। পরে আমাকে ডিপিআই অফিসে স্পেশাল অফিসার উইমেন পদে নিয়োগ করা হয়। ওখানে পাঁচ বছর কাজ করি আমি।

কামরুন্নেসা প্রধান শিক্ষিকা থাকার সময়ই ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। ব্যাপারটা ছিল সারা দেশের। একদম গোড়া থেকেই সবাইকে এ আন্দোলন নাড়া দেয়। আমাদেরও নাড়া দিয়েছে। তখন এমন কেউ ছিল না, বিশেষ করে মায়ের জাত, যাঁদের ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন নাড়া দেয়নি। ছাত্র হত্যার মতো অমন হূদয়বিদারক ঘটনার কথা শুনে সবাই কেঁদেছেন। ওই সময় আমার স্বামী হবীবুল্লাহ বাহার খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েন। কারণ, এ ঘটনার মুখে তিনি খুবই মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছিলেন। তিনি চিরকালই ছাত্রসমাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাদের নিয়ে খেলাধুলা করা, তাদের নিয়ে সভা-সমিতি করা, তাদের নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদি করেই তাঁর জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে। যখন তিনি জানলেন যে ছাত্রদের ওপর এ রকম একটা দুর্যোগ নেমে এসেছে, তখন তিনি বললেন, ‘আমার আর ওদের সঙ্গে থাকা চলবে না।’ উনি মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নুরুল আমিন সাহেব বললেন, না, আমরা তো এখন আগুনের কুণ্ডের ওপরে বসে আছি। আপনি এখন মন্ত্রিত্ব ছেড়ে যেতে পারবেন না। মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিতে না পারার দুঃখটা তাঁকে তিল তিলে কষ্ট দিয়েছে। এটাই ছিল তাঁর মানসিক যন্ত্রণার মূল কারণ। এর ফলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।

আগেই বলেছি, আমার স্বামী তখন মন্ত্রিসভার সদস্য। তিনি তখন প্রাদেশিক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন। স্বাস্থ্য এবং শাসনবিষয়ক বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি ছাত্রদের মিছিলে গুলিবর্ষণের এ ঘটনায় খুবই দুঃখিত হয়েছিলেন। মন থেকে এ রকম একটি ঘটনাকে সমর্থন করতে পারছিলেন না। তিনি মানসিকভাবে এতটাই যন্ত্রণা পেয়েছিলেন যে এর ফলে তাঁর রক্তচাপ বেড়ে যায়। এর পরপরই তিনি এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়েন, যেটা আমাদের পরিবারের জন্য একটা সাংঘাতিক দুর্যোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের পরিবারের জীবনের গতিপথটাই ঘুরে যায়। ব্যাপারটা ঘটে ১৯৫৩ সালে। ওই সময় তাঁর স্ট্রোক হয়। সেই স্ট্রোকের ফলে তিনি কাজকর্ম করার জন্য যে দৈহিক সামর্থ্যের প্রয়োজন, সেটা আর ফিরে পাননি। তাঁর মধ্যে যে উদারতা, যে প্রাণচাঞ্চল্য, যে কর্মক্ষমতা ছিল, যে শক্তি ছিল, শাসনগত ব্যাপারে তাঁর যে সাহস ছিল, সেটা আর অবশিষ্ট থাকে না।

এ সময় ‘আপওয়া’ বলে একটা সমিতি হয়, যার পুরো নাম ‘অল পাকিস্তান উইমেন্স এডুকেশন’। এটা তখনকার পাকিস্তান সরকারের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান সাহেবের স্ত্রী বেগম রানা লিয়াকত আলী খান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে (এ নামই ছিল তখন বাংলাদেশের) সশরীরে এসেই তিনি গড়ে তুলেছিলেন এই সমিতি। আমাকে, আমার ননদকে এবং আরও দুজন নারীসহ মোট চারজনকে সদ্য গঠন করা ওই সমিতির সহসভাপতি করা হয়েছিল। আমি ছিলাম সাংস্কৃতিক উপকমিটির এবং আমার ননদ ছিলেন শিক্ষাসংক্রান্ত উপকমিটির দায়িত্বে। সাংস্কৃতিক উপকমিটি করলে কী হবে, তখন তো আর এখানে মেয়েদের পক্ষে নাচ-গান বা কোনো ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করার ঘটনা ছিল দুঃস্বপ্নের মতো একটা ব্যাপার। কারণ, তখনকার মেয়েরা এসবের কিছুই জানত না। বাঙালি মুসলমান মেয়েরা না জানত গান, না জানত নাচ বা অন্য কিছু। বড়জোর কিছু কিছু সাহিত্যচর্চা করত তারা। তবে সাহিত্য যাঁরা করতেন, তাঁদেরও তখন হাঁটি পা-পা দশা। সবে তাদের প্রতিভার স্ফুরণ ঘটতে শুরু করেছে। এই পরিবেশ পরিস্থিতিতে আমি তখন একটা গানের স্কুল করলাম কামরুন্নেসাতে। সেটা সম্ভবত ১৯৫০ সালের দিকে। আমার ঠিক মনে নেই। তবে ১১ মে তারিখে যে সেটা করা হয়েছিল, সেই তারিখটা মনে আছে। সালটার কথা ঠিক মনে করতে পারছি না।

যা-ই হোক, গানের স্কুল তো করলাম, কিন্তু মেয়েদের গান শেখাবে কে? শিক্ষকতার দায়িত্ব কে নেবে? জয়শ্রী সেন বলে আমার এক ছাত্রী ছিল। ১৯৫০ সালে সেও ভারতে চলে গেল। ফলে আর কোনো ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা যাচ্ছিল না। হয়তো বলা হলো একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করো; কিন্তু কাদের নিয়ে করব? এ অবস্থায় আমার দুই মামাতো বোন ছিল, তারা কলকাতা থেকে ঢাকায় এল। তাদের একজনের নাম মেহের এবং অন্যজনের নাম জিনাত। তারা নাচ-গান জানত। তা ছাড়া আমার মেয়ে সেলিনা বাহার২৬ কিছুটা নাচতে শিখল। এদের ছাড়া তখন অন্য আর কেউ ছিল না। আরেকটি মেয়ে ছিল, সে জলতরঙ্গ বাজাত। তার নাম ছিল পুষ্প। ঢাকাই মেয়ে। তখন আমি একটা স্কুল করলাম। স্কুলের নাম দিলাম ‘সুরবিতান’। কিন্তু গানের এই স্কুলের শিক্ষয়িত্রী কোথায় পাব? তখন রেডিওর ডাইরেক্টর ছিলেন ক্যাপ্টেন এহসানুল হক। আমি এই বলে তাঁকে একটা চিঠি দিলাম যে আপনাদের যাঁরা স্টাফ আর্টিস্ট, তাঁদের আমার গানের স্কুলের জন্য ধার দিন। তাঁদের অবসর সময়ে তাঁরা দুই ঘণ্টা করে সপ্তাহে দুদিন এখানে শিক্ষকতা করবেন। তাঁরা কাজটা করবেন ছুটির দিনে অর্থাত্ শুক্রবার এবং রোববার সকালে। এহসানুল হক সাহেব বললেন, ঠিক আছে। তাঁদের কাজের ব্যাঘাত না হলে আমার কোনো আপত্তি নেই।

এভাবে আবদুল আহাদ সাহেব আমাদের গানের স্কুলে রবীন্দ্রসংগীত শেখানোর দায়িত্ব নিলেন। খাদেম হোসেন খান এলেন সেতার শেখাতে। আবদুল লতিফ এলেন লোকসংগীত বা পল্লিগীতি শেখাতে। লায়লা আর্জুমান্দ বানুকে অনুরোধ করতেই তিনি স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে এগিয়ে এলেন। তারপর এলেন গওহর জামিল। তিনি নাচ শেখানোর দায়িত্ব নিলেন। সুরুজ মিয়া বলে একজন ছিলেন, তিনি এলেন গিটার শেখাতে। দেখতে দেখতে আমার খোলা গানের স্কুল ‘সুরবিতান’-এ ছাত্রীসংখ্যা বাড়তে লাগল। একটু বয়সী মেয়ে থেকে শুরু করে কিশোর-কিশোরী মিলিয়ে তখন অনেক ছাত্রছাত্রী। সুরবিতানের ছাত্রছাত্রীদের অনেকেই পরে ঢাকা বেতারের শিল্পী হিসেবে বেশ পরিচিতি লাভ করেছিল। পাক্কা সাত বছর চলেছিল স্কুলটা। ১৯৫৫ সালে আমি যখন বদলি হয়ে যাই, তখন মিসেস রাবেয়া আলী আসেন প্রধান শিক্ষিকা হয়ে। তিনি আমার গানের স্কুলের ব্যাপারে আপত্তি করেন। বললেন, স্কুলের কাজকর্মের পাশাপাশি একটা বাড়তি কাজের দায়িত্ব নেওয়া তাঁর পক্ষে পোষাবে না। তিনি আমাকে বললেন, তুমি যদি তোমার এই গানের স্কুল রাখতে চাও, তাহলে এটাকে এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যাও। কিন্তু আমি তখন স্থানাভাবে স্কুলটা আর চালাতে পারলাম না। ফলে ১৯৫৫ সালেই সেটা বন্ধ হয়ে গেল। সেদিনের একটা প্রতিষ্ঠিত সংগঠন, যেখানে নাচ-গানে পারদর্শী ছাত্রছাত্রী তৈরি হচ্ছিল, বন্ধ হয়ে গেল বলে আমার মর্মে একটা দুঃখ থেকে গিয়েছিল।

১৯৫৪ সালে এ দেশের বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী বুলবুল চৌধুরীর মৃত্যু হয়। তাঁর স্মৃতি রক্ষা করার জন্য কিছু করা যায় কি না, এ নিয়ে তখনকার দিনের সাহিত্যিক ও শিল্পীসমাজ ভাবনাচিন্তা শুরু করে। তখন আমিও তাদের সঙ্গে ছিলাম। ১৯৫৫ সালে আমরা বুলবুল ললিতকলা একাডেমি করার উদ্যোগ নিই। শুরুতে এ উপলক্ষে একটা সমিতির মতো গঠন করা হয়। এ উদ্যোগের ফলে অচিরকালের মধ্যে বুলবুল একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়। আমি তার আজীবন সদস্য হই। কোষাধ্যক্ষের পদে যোগ দিয়ে তার জন্য কাজ করতে থাকি।

আমি ‘সুরবিতান’ নাম দিয়ে যে নাচ-গানের স্কুল করেছিলাম, সেটা ছিল ছোট আকারের। সবই সেখানে শেখানো হতো—নাচ, গান, রবীন্দ্র-নজরুলসংগীত, উচ্চাঙ্গসংগীত, সেতার, গিটার ও এসরাজ। বুলবুল একাডেমি যখন করা হলো, তখন সুরবিতানের অনুসরণেই সবকিছু করা হলো। তবে আরও বড় আকারে। যাবতীয় পরিকল্পনা ছিল আমারই করা। বুলবুল একাডেমির তখনকার কার্যকরী কমিটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন বিচারপতি ইব্রাহিম। তাঁদের সবাই আমার করা পরিকল্পনাটা গ্রহণ করে নিলেন। এ সময় আফরোজা বুলবুল মানে বুলবুল চৌধুরীর স্ত্রীকে নিমন্ত্রণ করে এখানে আনা হলো। তাঁকে বলা হলো, আমরা এখানে একটা একাডেমি অর্থাত্ সংগীতশিক্ষার প্রতিষ্ঠান করতে চাই। তাঁকে অধ্যক্ষ করা হবে। কিন্তু তিনি তাতে আপত্তি জানিয়ে বললেন, না, আমি নাচের দল করব। বুলবুল চৌধুরীর রচনা করা যেসব নৃত্যনাট্য আছে, সেগুলো আমরা এখান থেকে বা আমার নিজের যেসব শিল্পী আছে, গ্রুপ আছে, তাদের নিয়ে আমরা সেগুলো মঞ্চস্থ করব। দেশে-বিদেশে সেগুলো দেখিয়ে আমরা পয়সা কামাই করব। এভাবে আয় করা টাকা থেকে আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনের ব্যবস্থাও করব ইত্যাদি ইত্যাদি। তবুও আফরোজাকে আমরা বললাম, তা তো হবেই, কিন্তু আমাদের ছেলেমেয়েদের তো গানবাজনা শেখার মতো কোনো জায়গা নেই। আমরা চাই যে তাদের গানবাজনা শিক্ষার একটা প্রতিষ্ঠান হোক, যেখানে তারা একটা কোর্স করে ডিপ্লোমা নেবে। তাতে করে তারা একটা কিছু করে খেতেও পারবে এবং অন্যদেরও তারা শেখাতে পারবে। কিন্তু তিনি আমাদের প্রস্তাব অগ্রাহ্য করে করাচি চলে গেলেন।

তবে আমরা দমলাম না। আমরা বুলবুল একাডেমি২৭ চালিয়ে যেতে লাগলাম। পরবর্তীকালে বুলবুল একাডেমির যে সুনাম এবং তার যে প্রতিষ্ঠা, সে সম্পর্কে আপনারা সবাই জানেন।

যা-ই হোক, ডিপিআই অফিসে আমি পাঁচ থেকে ছয় পর্যন্ত ছিলাম স্পেশাল অফিসার উইমেন এডুকেশন পদে। ১৯৬০ সালে আমার এই পদের পাশাপাশি আরও কতগুলো পদ বিলুপ্ত করা হয়। তখন আমাকে আবার বাংলা বাজার স্কুলে প্রধান শিক্ষয়িত্রীর পদে বদলি করা হয়। ওখানে গিয়ে দেখলাম তার ভয়ানক দুরবস্থা। স্কুলটার ভবন নেই, পর্যাপ্তসংখ্যক ঘর নেই, বাথরুম নেই, বাস নেই। এসব নতুন করে করার জন্য আমি লেখালেখি শুরু করলাম। অল্প দিনের মধ্যেই আমি জমি অধিগ্রহণের ব্যবস্থা করলাম। পরিকল্পনা পাস করালাম। এসব করতে গিয়ে বেশ সময় লাগল। স্কুলের পুরোনো ভবন ভেঙে নতুন ভবন করার পরিকল্পনা পাস করা হলো। সরকারের তরফ থেকে টাকাও মঞ্জুর করা হলো। এমন সময় আবার আমাকে বদলি করা হলো। এর পরপরই শুরু হয়ে গেল দেশে মুক্তিযুদ্ধ। অর্থাত্ এসে গেল ১৯৭১ সাল। আমি দেখলাম যে এ রকম তালগোল পাকানো পরিস্থিতির মধ্যে আমার স্কুলে যেতে অসুবিধা হবে। আমি বেশ দূরে থাকি, নতুন শহরে। ফলে অনেক ভেবেচিন্তে আমি পেনশন নিতে চাইলাম। আমাকে ডিপিআই সাহেব বললেন, আপনার তো আরও কিছুকাল চাকরি আছে। আপনি কেন পেনশন নেবেন?

এর মধ্যে আমার স্বামী হবীবুল্লা বাহারের মৃত্যু হলো। ১৯৬৬ সালে তিনি মারা গেলেন। তাঁর নামে আমি একটা কলেজ করলাম। কলেজটা আমার এবং আমাদের পরিবারের একক প্রচেষ্টায় হয়েছে। আমার যা টাকাপয়সা ছিল, জিনিসপত্র ছিল, সবকিছু বিক্রি করে দিয়েছিলাম। আমি একটু আগেভাগে অবসর নিয়েছিলাম এ কারণে যে তাহলে পেনশনের টাকাটাও ওই কলেজ প্রতিষ্ঠার কাজে লাগাতে পারব। এভাবে আমি ১৯৬৯ সালের জুলাই মাসে একটা কলেজ প্রতিষ্ঠা করলাম। শান্তিনগর এলাকায় ‘হবীবুল্লাহ বাহার কলেজ’ নামে একটা কলেজ হলো। এ কলেজের পেছনে আমার যা কিছু সঞ্চয় ছিল, তার সবই আমি দিয়েছি। আমার ছেলেমেয়েরাও এ ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করেছে। আমি আর কোথাও কারও কাছ থেকে এ ব্যাপারে কোনো রকম সহযোগিতা কামনা করিনি। বর্তমানে কলেজটা ভালোই চলছে। সেখানে এখন আড়াই হাজার ছাত্রছাত্রী। কলেজের বাড়িটাও আমরা সরকারের কাছ থেকে পেয়েছি এবং বাড়িটা পেতে আমি ১০ বছর লাগাতার সংগ্রাম করেছি। করেছি আর্থিক সংগ্রাম। প্রতিকূল অবস্থার সঙ্গে সংগ্রাম। এমনকি পাড়া-পড়শিদের সঙ্গেও আমাকে সংগ্রাম করতে হয়েছে। নানা ধরনের দলাদলি তো ছিলই। কলেজের লোকজন পর্যন্ত দলাদলি করেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির নাম পর্যন্ত মুছে দিতে চেয়েছে। প্রশ্ন তুলেছে, আমরা কে, আমরা কিছুই করিনি। এ কলেজ অন্যরা করেছে। এ রকমের একটা ধারণা তারা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে কলেজের ভেতরে এবং বাইরে। নানা রকম বিরুদ্ধ অবস্থার সঙ্গে আমাকে সংগ্রাম করতে হয়েছে। আজ বছর কয়েক থেকে কলেজ বেশ ভালোভাবেই চলছে এবং আমিও খুব শান্তিতে আছি।

আবার একটু পেছনে ফিরে যাই। ব্রিটিশ আমলে আমরা যখন লেখাপড়া শুরু করেছিলাম, তখন বাংলাদেশের কয়টা মুসলমান পরিবারে শিক্ষা ছিল, সে কথা বোধ হয় আঙুল গুনেই বলে দেওয়া যেত। পরবর্তীকালে আমরা যখন পাসটাস করে বের হলাম, তখনো প্রায় একই অবস্থা। কারণ, বাঙালি মুসলমান সমাজে তখনো শিক্ষার প্রচণ্ড অভাব। সাখাওয়াত্ মেমোরিয়াল স্কুলে বাঙালি মুসলমান শিক্ষকই জুটত না। অবাঙালি খ্রিষ্টান বা হিন্দু শিক্ষক দিয়ে চালানো হতো স্কুলটা। তারপর যখন লেডি ব্রাবোর্ন কলেজ হলো, তখন বাঙালি মুসলমান মেয়েদের মধ্যে বেশ সাড়া পড়ে গেল। দেখতে দেখতে বেশ কিছু মেয়ে সেখান থেকে পাস করে বের হলো। দেশ ভাগের পর আমাদের মধ্যে দারুণ একটা জোশ আর উত্সাহ-উদ্দীপনা এসে গেল। আমরা এই বলে শপথ গ্রহণ করলাম যে আমরা আমাদের দেশকে সুন্দর করে গড়ে তুলব, উন্নত করব, তার ভালো করব এবং আমাদের মধ্যে যে ক্ষমতা, যে শক্তি আর যে সুপ্ত প্রতিভা আছে, তার সাহায্যেই আমরা এই সবকিছু করব। কারও কাছে আমরা মাথা নত করব না। ছোট হব না। এই ভাবটা, আমার মনে হয় তখন মেয়েদের মধ্যেই খুব বেশি করে দেখা গিয়েছে। সত্যি বলতে কী, মেয়েদের মধ্যেই উন্নতিটা বেশি করে লক্ষ করা যাচ্ছিল। মেয়েদের যে উন্নতি, সেটা তখন খুব দ্রুতগতিতে হয় এবং আস্তে আস্তে মেয়েরা সমাজসেবার কাজে, সাহিত্যসেবার কাজে, সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতির দিকে, লেখাপড়ার দিকে, চাকরির দিকে তারা বেশি বেশি করে ঝুঁকে পড়তে থাকে। এর ফলে ওই সময় শিক্ষক, অধ্যাপক, প্রভাষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এবং স্থপতিও আমাদের দেশে তৈরি হতে শুরু করে। কাজেই আমি তো বলব, সব দিক থেকে চিন্তা করলে দেখা যায়, মেয়েদের অগ্রগতিটাই তখন প্রধান ছিল এবং সেটা খুব দ্রুতই হচ্ছিল।

তারপর যখন বাংলাদেশ হলো, তখন তো মেয়েরা আরও বেশি বেশি করে উন্নতি করতে শুরু করে। আর এখন তো তারা আরও অনেক বেশি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে, বিশেষ করে সরকার তাদের চাকরিতে ঢোকার ক্ষেত্রে অনেক বেশি সুযোগ দিয়েছে। কাজেই তারা অগ্রগতি লাভ করেছে। তা ছাড়া এখন মেয়েদের জন্য চাকরি করা একটা আবশ্যিক ব্যাপার হয়ে গেছে। কারণ, অর্থনৈতিক সমস্যা সমাজে এখন প্রবল। মাত্র একজনের চাকরিতে এখন আর সংসার চলে না। সে কারণেই যার যতটুকু বিদ্যা আছে, তা নিয়েই তারা এখন একটা কিছু করার চেষ্টা করছে। সেটা স্কুলেই হোক, কলেজেই হোক বা অন্য যেকোনো খানেই হোক। একটা কিছু উপার্জনের দিকে নজর না দিয়ে তাদের আর চলছে না। এভাবেই মেয়েরা অনেক অনেক দূর এগিয়ে গেছে। আমাদের দেশে এখন আর মেয়ে ডাক্তার, মেয়ে ব্যারিস্টার, মেয়ে ইঞ্জিনিয়ার বা মেয়ে স্থপতির কোনো অভাব নেই। এর থেকেই মনে হয়, অন্তত আমার কাছে, বেগম রোকেয়া জাগরণের যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, যে জাগরণের কথা শুনে আমরা উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম, আমাদের প্রথম জীবনে আমরা সেই জাগরণের অভাব দেখেছি। যে বাধা আমাদের মোকাবিলা করতে হয়েছে, সে ধরনের বাধাবিপত্তি এখন আর নেই। সুযোগ-সুবিধা অনেক অনেক গুণ বেড়েছে এবং মেয়েরা সেই সুযোগটাকে পুরোপুরি গ্রহণ করে সমাজে তারা পুরুষের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে না। পুরুষদের সহযোগিতা করার কাজে তারা এখন সমতালে এগিয়ে আসছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানেও মেয়েরা প্রচুর পরিমাণে কাজ করছে এবং তারা যে খুব খারাপ করছে, সে কথাও কেউ বলতে পারবে না। একটা জাতির জন্য এটা খুবই আশার কথা।

আসলে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ফলে মেয়েদের এবং মায়েদের মনে সৃষ্ট চাঞ্চল্য থেকেই সবাই সচেতন হতে থাকে। রাজনৈতিক সচেতনতা বোধ হয় তখন থেকেই মেয়েদের মধ্যে জাগতে থাকে। পরবর্তীকালে মেয়েদের মধ্যেও অনেকে সংসদ সদস্য হন। তাঁরা রাজনীতিতেও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে শুরু করেন। আসলে এ সবকিছুর শুরু বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকেই। তারপর ১৯৬৭-৬৮ সালেও দেশে যেসব আন্দোলন-সংগ্রাম শুরু হয়, তারই পরিণামে শুরু হয়ে যায় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। তাতে মেয়েদের অনেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশ নিয়েছে। তাদের সংখ্যাটা নেহাত মন্দ নয় এবং তাদের বেশির ভাগই শিক্ষিত সমাজের মেয়ে। মনে রাখা দরকার, একটা সমাজের চলমানতা কেবল পুরুষদের দিয়ে সম্ভব নয়। মেয়েদের সাহায্যের অবশ্য দরকার। কারণ, তারা আমাদের ডান বা বাম হাত। দুটো হাতেরই তো সাহায্যের প্রয়োজন। একটা হাত তো সবকিছু করতে পারে না। ফলে মেয়েরা যে যেভাবে পেরেছে মহান মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য-সহযোগিতা করেছে। কেউ পয়সা দিয়ে, কেউ বুদ্ধি দিয়ে, কেউ সেবা দিয়ে, কেউ দূরে থেকে কিংবা কেউ খবরাখবর দিয়ে, কেউ বিদ্যা দিয়ে—যে যেভাবে পেরেছে, সেভাবেই সাহায্য করেছে। সেটা যত নগন্যই হোক, ফেলনা নয়। তারা সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছে। তারপর দেশ স্বাধীন হলো। স্বাধীন হওয়ার পরও মেয়েরা বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তাদের অধিকার সম্পর্কে, তাদের দাবিদাওয়া সম্পর্কে তারা আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি সচেতন। এখন তারা তাদের দাবিদাওয়া নিয়ে প্রচুর আন্দোলন চালাচ্ছে, ব্যাপারটা কিন্তু লক্ষ করার বিষয়।

এই যে এখন যেসব নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে, তাদের যেভাবে কষ্ট দেওয়া হচ্ছে, সেসব তারা আগের মতো আর নীরবে সহ্য করছে না। তারা আন্দোলন চালাচ্ছে এবং তাদের দাবিদাওয়া আদায়ের জন্য তারা প্রচুর পরিশ্রমও করছে। আমি মনে করি, তারা তাদের দাবিদাওয়া আদায় করতে পারবে। এগুলো কেউ তো কাউকে হাতে তুলে দেয় না। নিজেদের চেষ্টায় নিজেদের ক্ষমতার বলে করায়ত্ত করতে হয়। মেয়েরা বুঝতে পেরেছে যে একটা সমাজে পুরুষের মতো মেয়েদেরও মর্যাদা আছে। সম-অধিকার আছে। বিশেষ করে আমাদের মুসলমান সমাজে আমাদের মেয়েদের অনেক অধিকার। তাদের সুযোগ-সুবিধার কথা ধর্মের বিধানেই লিপিবদ্ধ করা আছে।

আমাদের মুসলমান সমাজের তো তেমন কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু যেহেতু আমরা এত দিন অন্ধ ছিলাম এবং পুরুষশাসিত সমাজে আমাদের অন্ধ করে রাখা হয়েছিল, ফলে আমরা আমাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন ছিলাম না। আমাদের মেয়েরা আজকে অনেক বেশি সজাগ। আজকে তারা নিজেদের অধিকার, নিজেদের দাবিদাওয়া, নিজেদের প্রাপ্য আদায় করার জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছে এবং ইতিমধ্যে তারা অনেক কিছু আদায়ও করে ফেলেছে। আমি মনে করি, অদূর ভবিষ্যতে মেয়েরা অনেক বেশি সম্মান, আরও অনেক বেশি গৌরব, আরও অনেক বেশি মর্যাদা লাভ করতে সক্ষম হবে।

বস্তুত, আমি আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে দেখলাম যে মেয়েরা ধাপে ধাপে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। আগে স্কুলে ভর্তি করার জন্য মেয়েদের কুড়িয়ে আনতে হতো, জোগাড় করে আনতে হতো, আর এখন স্কুল-কলেজে তাদের জায়গা দেওয়া যায় না। আমার স্কুলের দাইয়ের নাতনিরাও বিএ পাস করেছে। তারা আমার কাছে এসে দোয়া চেয়ে যায়। এর চেয়ে আনন্দের কথা, ভাগ্যের কথা আর কী হতে পারে! তবে আমাদের সমাজে মেয়েদের সব সময়ই দায়িত্ব অনেক বেশি। মেয়েদের দায়িত্ব ঘরে তো বটেই, বাইরেও কিছুটা আছে। কারণ, মেয়েরা হচ্ছে মায়ের জাত। একটা সমাজে পুরুষদের গড়ে তোলার দায়িত্ব মায়েদের। সেই মা যদি আদর্শমতী না হন, তাহলে তাঁর সন্তানও আদর্শবান হতে পারে না। এখন একটা কথা এখানে আমি বলছি, যদিও কথাটা একটু অপ্রিয় শোনাবে, তবুও বলছি। আমরা স্বাধীন হয়েছি, আমাদের সুশিক্ষা পাওয়ার অধিকারও অবারিত, সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার দরজাও খোলা, ইতিমধ্যে কিছু অধিকারও আমরা পেয়েছি। কিন্তু তাই বলে আমাদের তো উচ্ছৃঙ্খল হলে চলবে না। সমাজের কিছু অংশে যে উচ্ছৃঙ্খলতা দেখা যাচ্ছে, সেটা ছেলেদের মধ্যে তো আছেই, মেয়েদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে। এটা বন্ধ হওয়া উচিত। কারণ, এর পরিণাম খারাপ হতে বাধ্য। যারাই এ রকম করছে, তারা বুঝতে পারছে না, তারা সাময়িকতার মোহে, উত্তেজনার একটা মোহে এ রকম কিছু করছে।

কিন্তু মেয়েদের কাছে আমার অনুরোধ, তাদের কাছে আমি এই আবেদন রাখছি যে তারা যেন চোখ-কান খুলে ভাবতে চেষ্টা করে যে তারা মায়ের জাত। তারা সবার আদর্শ। ধর্মই বলে যে বেহেস্তের পরেই মায়ের স্থান। আগে বেহেস্ত, তারপরই মা। সেই মা যদি আদর্শমতী না হন, সেই মা যদি আদর্শ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে না পারেন, সেই মায়ের জাতের অংশভুক্ত মেয়েরা যদি নম্র, ভদ্র আর সুন্দর ও শিক্ষিত না হন, তা হলে সমাজে উচ্ছৃঙ্খলতা কী করে কমবে? তাঁদের সন্তানদের তাঁরাই তো মানুষ করবেন। এ জন্য তাঁদের নিজেদের আগে আদর্শমতী হতে হবে। আমি সবার কথা বলছি না, কিছুসংখ্যকের কথা বলছি, যা দেখলে আমাদের দুঃখ হয়, কষ্ট হয়। কেন তারা বিপথে যাবে? কেন তারা সাজগোজ আর বিলাসব্যসনে ডুবে থাকবে? আমাদের জীবনে সবচেয়ে বড় জিনিসই তো হচ্ছে আমাদের দেশকে ভালোবাসা, সন্তানকে ভালো করে মানুষ করা, পৃথিবীতে একটা শ্রেষ্ঠ দেশ হিসেবে, জাতি হিসেবে একটা গৌরবময় স্থান লাভ করা। সেই আদর্শকে সামনে রেখে আমরা যদি এগিয়ে যাই, তাহলে বিশেষ করে যাঁরা মা, ভবিষ্যতে যাঁরা মা হবেন, তাঁরা কখনোই ছোট হতে পারবেন না। সেই কথা মনে রাখলে তাঁরা নিশ্চয়ই ভালো পথে, সু-আদর্শের পথে থাকবেন এবং অন্যকে একইভাবে প্রেরণা দেবেন, সন্তানকে উদ্বুদ্ধ করবেন। তবেই না আমরা একটা সুন্দর জাতি হিসেবে গড়ে উঠতে পারব।

এই বয়সে এসে আমি ভাবি, আমাদের সময়ে মেয়েদের মধ্যে একটা নম্রতা ছিল। তাদের মধ্যে একটা সাদাসিধা ভাব ছিল। বর্তমানে সমাজের মেয়েদের মধ্যে উগ্রতা বেশি। অস্থিরতাও মাত্রাছাড়া। ওপরি চাকচিক্যের আধিক্য। মেয়েদের মধ্যে এ সবকিছু তখনকার দিনে ছিল না। তখন মেয়েরা তো এমনিতেই লতার মতো নরম ছিল। আর যারা লেখাপড়া শিখত, তারাও জীবনে একটা আদর্শকে সামনে রেখেই এগিয়েছে। সে আদর্শের উত্স হতে পারে তাদের বাড়ির কোনো মুরব্বি বা কোনো শিক্ষক বা সমাজের কোনো ব্যক্তিবিশেষ। প্রেরণার উত্স হতে পারে সমাজের নেতৃস্থানীয় আদর্শবান কোনো ব্যক্তি অথবা বইয়ে পড়া কোনো আদর্শ চরিত্র। আমি বেগম রোকেয়ার আদর্শকে গ্রহণ করেছি। আর আমার সামনে ছিলেন আমার খালাম্মা, যিনি আমার জীবনের প্রথম আদর্শ। এখনকার মেয়েদের মধ্যে, মানে আমাদের যুব ও তরুণসমাজের মধ্যে আদর্শের প্রতি আনুগত্য বা নিষ্ঠার ব্যাপারটা একেবারেই কমে গেছে।

কাজেই এ সবকিছুর পরিণতি যে খুব ভালো হবে, সে কথা বলা যায় না। আর আমাদের মধ্যে যে অস্থিরতা এসেছে, যে চাঞ্চল্য এসেছে, তার অপনোদন দরকার। সমাজে একটা প্রশান্তি ও সুস্থিরতা আসা প্রয়োজন। কারণ, সুস্থিরতা ছাড়া কোনো বড় কাজ হয় না। সৃষ্টির কোনো কাজ হয় না। কোনো কিছু সৃষ্টি করতে হলে ভালো করে মনোনিবেশ করতে হবে। সমাজকে যদি ভালো করে সৃষ্টি করতে হয়, সুন্দর করতে হয়, সমাজ থেকে সব গ্লানি আর কালিমা যদি দূর করতে হয়, তাহলে আমাদের ধীরস্থিরভাবে ভেবে দেখতে হবে যে আমরা কোন পথে যাচ্ছি? কোন পথে আমাদের যাওয়া উচিত? এ কথা বোধ হয় আমাদের নারীসমাজকেই প্রথম ভেবে দেখতে হবে। কারণ, প্রধানত নারীসমাজের হাতেই জাতির চরিত্র গঠনের ভার থাকে। সে কারণে মায়েদের কাছে, মেয়েদের কাছে, ছাত্রীসমাজের কাছে আমার অনুরোধ, লেখাপড়া শিখে উচ্ছৃঙ্খল হওয়াটা বড় কথা নয়। চাকচিক্যটা জীবনের সবচেয়ে বড় কথা নয়। জীবনে গৌরব এবং শান্তি আনতে হলে তাকে ভালোভাবে চলতে হবে। নম্র হতে হবে। নত হতে হবে। আদর্শবাদী হতে হবে। কর্তব্য পালনের ব্যাপারে অবিচল হতে হবে।

টীকা

১. জন্ম ১৯১৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি। নানার নাম রইসউদ্দিন আহমেদ।

২. মা কানিজ ফাতেমা খানম আর বারা আব্দুল হক খান।

৩. এম ফাতেমা খানম। মুক্তবুদ্ধি, সমাজসচেতন, বিদ্যানুরাগী ফাতেমা প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা না পেলেও যথেষ্ট লেখাপড়া করতেন। অনোয়ারা বাহার চৌধুরীকে সংস্কৃতিমনা, মুক্ত চেতনা এবং বিদ্যানুরাগী করে গড়ে তোলার পেছনে ফাতেমা খানমের অবদান অপরিসীম।

৪. লীলা রায়ের জন্ম (১৯০০-১৯৭০) সিলেটে। কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে গোল মেডেল পেয়ে বিএ পাস করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ। ১৯২১ সালে বাংলায় বন্যা হলে তিনি সুভাষ বোসের সঙ্গে দেখা করে নারী কমিটি গঠন করে বন্যা আক্রান্ত এলাকায় রিলিফের কাজ করেন। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ১৯৩১ সালে সর্বপ্রথম তিনি জয়শ্রী নামে নারীদের জন্য সম্পূর্ণ নারীদের লেখা নিয়ে একটি পত্রিকা ঢাকা থেকে প্রকাশ করেন।

৫. আবুল ফজলের জন্ম (১৯০৩-১৯৮৩) সাতকানিয়া উপজেলা, চট্টগ্রাম জেলায়। তিনি প্রখ্যাত কথাশিল্পী, লেখক ও সাহিত্যিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাস করেন। ১৯৪০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ ডিগ্রি নেন। ইমাম হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষকতা করেন। ১৯৭৩-১৯৭৫ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি পাকিস্তানি স্বৈরাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে প্রায় সব বুদ্ধিজীবী ও বুদ্ধিজীবী সমাজের আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। তিনি শিখা পত্রিকার সাথে যুক্ত ছিলেন।

৬. আবদুল কাদির (১৯০৬-১৯৮৪) বাংলাদেশি কবি। কবি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি নেন। শিক্ষকতা করেন। মাহে নাও পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। তাঁর বইয়ের মধ্যে দিলরুবা, উত্তর বসন্ত, চন্দসমীক্ষণ উল্লেখযোগ্য।

৭. সুফী মোতাহার হোসেন (১৯০৭-১৯৭৫) ফরিদপুর জেলার ভবানন্দপুরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৩১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাসের পর ফরিদপুরের জেলা জজ কোর্টে দুই বছর কাজ করেন। এরপর তিনি ঈশান ইনস্টিটিউটে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় যেমন মোহাম্মদ, সওগাত, আজাদে লেখালেখি করতেন।

৮. শিখা পত্রিকাটি মুসলিম সাহিত্য সমাজের মুখপত্র ছিল। এর প্রথম সম্পাদক ছিলেন অধ্যাপক আবুল হোসাইন। এই পত্রিকার দশ বছরে মাত্র পাঁচটি সংখ্যা বের হয়েছে।

৯. সওগাত একটি সচিত্র মাসিক পত্রিকা। ১৩২৫ বঙ্গাব্দের (১৯১৮ সাল) অগ্রহায়ণ মাসে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের সম্পাদনায় কলকাতা থেকে এটি প্রকাশিত হয়। ১৩২৭ বঙ্গাব্দের চৈত্র মাসে (১৯২১ সালের মার্চ-এপ্রিল) অনিবার্য কারণবশত এর প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ ছয় বছর পর ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের (১৯২৬ সাল) আষাঢ় মাসে সওগাত-নবপর্যায় নামে পুনরায় এর প্রকাশনা শুরু হয়। কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন সওগাতের প্রধান লেখকদের অন্যতম।

১০. সাখাওয়াত্ মেমোরিয়াল স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা।

১১. রোকেয়া সাখাওয়াত্ হোসেন (১৮৮০-১৯৩২) সাহিত্যিক, শিক্ষাব্রতী, সমাজসংস্কারক এবং নারী জাগরণ ও নারীর অধিকার আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃত্। ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থানার অন্তর্গত পায়রাবন্দ ইউনিয়নে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম জমিদার পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। রোকেয়ার উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে: মতিচূর (প্রবন্ধ, ২ খণ্ড: ১ম খণ্ড ১৯০৪, ২য় খণ্ড ১৯২২), Sultana’s Dream (নকশাধর্মী রচনা, ১৯০৮), পদ্মরাগ (উপন্যাস, ১৯২৪), অবরোধবাসিনী (নকশাধর্মী গদ্যগ্রন্থ, ১৯৩১) প্রভৃতি। এ ছাড়া আছে অসংখ্য প্রবন্ধ, ছোটগল্প, কবিতা, ব্যঙ্গাত্মক রচনা ও অনুবাদ। Sultana’s Dream গ্রন্থটি রোকেয়া নিজেই বাংলায় অনুবাদ করেন সুলতানার স্বপ্ন নামে। বাঙালি মুসলমান সমাজে নারীর স্বাতন্ত্র্য ও নারী স্বাধীনতার পক্ষে প্রথম প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর বেগম রোকেয়া। বিশ শতকের প্রথম দিকে বাঙালি মুসলমানদের নবজাগরণের সূচনালগ্নে নারীশিক্ষা ও নারী জাগরণে তিনিই প্রধান নেতৃত্ব দেন। মুসলমান সমাজের ঘোর অন্ধকার যুগে নারী জাগরণের ক্ষেত্রে রোকেয়ার ভূমিকা ছিল একক, ব্যতিক্রমী এবং অনন্যসাধারণ।

১২. ১৯০৯ সালের ১ অক্টোবর স্বামীর প্রদত্ত অর্থে পাঁচটি ছাত্রী নিয়ে রোকেয়া সাখাওয়াত্ হোসেন ভাগলপুরে ‘সাখাওয়াত্ মেমোরিয়াল গার্লস’ স্কুল স্থাপন করেন ১৯১১ সালের ১৬ মার্চ কলকাতার ১৩নং ওয়ালিউল্লাহ লেনের একটি বাড়িতে মাত্র আটজন ছাত্রী নিয়ে তিনি নবপর্যায়ে ‘সাখাওয়াত্ মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন। রোকেয়ার অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ১৯১৭ সালে এই স্কুল মধ্য ইংরেজি গার্লস স্কুলে এবং ১৯৩১ সালে উচ্চ ইংরেজি গার্লস স্কুলে রূপান্তরিত হয়। ছাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণসহ অন্যান্য কারণে স্কুলটি বহুবার স্থান বদল করে। বিভিন্ন সময় স্কুলটির অবস্থান ছিল ১৩, ইউরোপিয়ান অ্যাসাইলাম লেন (১৯১৩), ১৬২, লোয়ার সার্কুলার রোড (১৯৩২), ১৭, লর্ড সিনহা রোড (১৯৩৮) এবং আলীপুর হেস্টিংস হাউস (১৯৩৮)। ১৯৬৮ সালে এটি ১৭ নং লর্ড সিনহা রোডের নিজস্ব বাড়িতে স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত হয়।

১৩. বেথুন কলেজ বাংলায় নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনকারী প্রথম কলেজ। হিন্দু ফিমেল স্কুল হিসেবে প্রথম এর কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ১৮৪৯ সালের ৭ মে বিদ্যালয়টির নামকরণ হয় বেথুন স্কুল। এর প্রতিষ্ঠাতা জন ইলিয়ট ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুন (১৮০১-১৮৫১) ছিলেন ট্রিনিটি কলেজ কেম্ব্রিজের গ্র্যাজুয়েট ও চতুর্থ র্যাঙ্গলার। তিনি গভর্নর জেনারেলের কাউন্সিলের আইন উপদেষ্টা হিসেবে ১৮৪৮ সালের এপ্রিলে ভারতে আসেন। তিনি কাউন্সিল অব এডুকেশনেরও সভাপতি ছিলেন। নারীশিক্ষার অগ্রগতির ক্ষেত্রে তাঁর অগ্রণী ভূমিকা ও পদক্ষেপে তিনি রামগোপাল ঘোষ, রাজা দক্ষিণারঞ্জন মুখার্জী, পণ্ডিত মদনমোহন তর্কালঙ্কার প্রমুখের ন্যায় কয়েকজন ভারতীয় পণ্ডিত ও মনীষীর সমর্থন ও সহযোগিতা লাভ করেন।

১৪. আখতার ইমাম (১৯১৭-২০০৯) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ছিলেন। তাঁর প্রবন্ধ/রচনা সংকলন: যেমন ভেবেছি তেমন দেখেছি; যে হুলে বিষ নেই; স্মৃতিকথা: রোকেয়া হলে বিশ বছর; দূরের ছায়া; ইডেন থেকে বেথুন ইত্যাদি। তিনি বিভিন্ন পুরস্কার পান তার মধ্যে গঙ্গামনি দেবী স্বর্ণ পদক, বেগম রোকেয়া পদক ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

১৫. হবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী (১৯০৬-১৯৬৬) রাজনীতিক ও লেখক। ফেনী জেলার গুথুমা গ্রামে ১৯০৬ সালে তাঁর জন্ম। ১৯২২ সালে তিনি চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯২৪ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন। এ সময় তিনি সক্রিয়ভাবে ছাত্র রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯২৮ সালে হবীবুল্লাহ বাহার কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। ১৯৩৩ সালে তিনি সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত হন। এ সময় তিনি বুলবুল নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করেন। ১৯৪৮ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রথম পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনের অভ্যর্থনা কমিটির তিনি সভাপতি ছিলেন। ১৯৫১ সালে পূর্ব পাকিস্তান স্পোর্টস ফেডারেশন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে হবীবুল্লাহ বাহার অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন এবং তিনি ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা-সভাপতি। ১৯৫৩ সালে হবীবুল্লাহ বাহার হূদেরাগে আক্রান্ত হলে মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেন এবং রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। এরপর তিনি সাহিত্যচর্চা ও সমাজকর্মে নিয়োজিত ছিলেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ পাকিস্তান, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, ওমর ফারুক, আমির আলী। ১৯৬৬ সালের ১৫ এপ্রিল তিনি হূদেরাগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

১৬. শামসুন্নাহার মাহমুদ (১৯০৮-১৯৬৪) শিক্ষাবিদ, লেখক। ১৯০৮ সালে ফেনী জেলার গুথুমা গ্রামে তাঁর জন্ম। হবীবুল্লাহ্ বাহার চৌধুরী ছিলেন সহোদর ভ্রাতা। শিক্ষাজীবনের শুরুতে শামসুন্নাহার চট্টগ্রামের খাস্তগীর গার্লস হাইস্কুলে ভর্তি হন, কিন্তু সামাজিক অনুশাসনের কারণে তাঁর স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। পরে নিজ চেষ্টায় তিনি প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে ম্যাট্রিক (১৯২৬) পাস করেন। বিএ পাস করার পর বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত্ মেমোরিয়াল হাইস্কুল থেকে তাঁকে সম্বর্ধনা দেওয়া হয়। পরে তিনি বেগম রোকেয়ার নারীশিক্ষা ও নারীমুক্তি আন্দোলনের অংশীদার হন। শামসুন্নাহার লেডি ব্রাবোর্ন কলেজে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক রূপে কর্মজীবন শুরু করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থ হলো: পুণ্যময়ী (১৯২৫), ফুলবাগিচা (১৯৩৫), বেগম মহল (১৯৩৬), রোকেয়া জীবনী (১৯৩৭), শিশুর শিক্ষা (১৯৩৯), আমার দেখা তুরস্ক (১৯৫৫), নজরুলকে যেমন দেখেছি (১৯৫৮) ইত্যাদি। তাঁর লেখায় সমাজ ও সংস্কৃতি-প্রীতির প্রকাশ ঘটেছে। নজরুল তাঁর সিন্ধুহিন্দোল (১৯২৭) কাব্যখানি ‘বাহার-নাহার’কে উত্সর্গ করেন। ১৯৬৪ সালের ১০ এপ্রিল ঢাকায় তাঁর মৃত্যু হয়।

১৭. আহসান হাবীব (১৯১৭-১৯৮৫) কবি ও সাংবাদিক। ১৯১৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পিরোজপুর জেলার শংকরপাশা গ্রামে তাঁর জন্ম। তিনি পিরোজপুর থেকে প্রবেশিকা (১৯৩৫) পাস করে কিছুদিন বিএম কলেজে আইএ ক্লাসে অধ্যয়ন করেন, কিন্তু আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে লেখাপড়া ত্যাগ করে কলকাতা গিয়ে সাংবাদিকতার পেশা গ্রহণ করেন এবং আজীবন ওই পেশাতেই নিয়োজিত ছিলেন। আহসান হাবীবের প্রথম কবিতার বই রাত্রিশেষ প্রকাশিত হয় ১৯৪৭ সালে। তাঁর অন্যান্য কাব্যগ্রন্থ ছায়াহরিণ (১৯৬২), সারা দুপুর (১৯৬৪), আশায় বসতি (১৯৭৪), মেঘ বলে চৈত্রে যাবো (১৯৭৬), দুহাতে দু আদিম পাথর (১৯৮০), প্রেমের কবিতা (১৯৮১), বিদীর্ণ দর্পণে মুখ (১৯৮৫) ইতাদি। তাঁর দুটি বিশিষ্ট উপন্যাস হলো অরণ্য নীলিমা (১৯৬০) ও রাণীখালের সাঁকো (১৯৬৫)। এ ছাড়া তাঁর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য শিশুতোষ গ্রন্থ: জ্যোত্স্না রাতের গল্প, বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর (১৯৭৭), ছুটির দিন দুপুরে (১৯৭৮) ইত্যাদি। মধ্যবিত্তের সংকট ও জীবনযন্ত্রণা আহসান হাবীবের কবিতার মুখ্য বিষয়। সামাজিক বাস্তবতা, মধ্যবিত্ত শ্রেণির সংগ্রামী চেতনা এবং সমকালীন যুগযন্ত্রণা তাঁর কবিতায় শিল্পসম্মতভাবে পরস্ফুিটিত হয়েছে। তাঁর ভাষা ও প্রকাশভঙ্গিতে নাগরিক মননের ছাপ আছে। সাহিত্যসাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ইউনেসকো সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬১), বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬১), আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৪), নাসিরউদ্দীন স্বর্ণপদক (১৯৭৭), একুশে পদক (১৯৭৮), আবুল মনসুর আহমদ স্মৃতি পুরস্কার (১৯৮০) এবং আবুল কালাম স্মৃতি পুরস্কার (১৯৮৪) লাভ করেন। ১৯৮৫ সালের ১০ জুলাই ঢাকায় তাঁর মৃত্যু হয়।

১৮. ফররুখ আহমদ (১৯১৮-১৯৭৪) কবি, শিশুসাহিত্যিক। ১৯১৮ সালের ১০ জুন মাগুরা জেলার শ্রীপুর থানার মাঝাইল গ্রামে তাঁর জন্ম। ফররুখ আহমদ প্রথমে কলকাতার আইজি প্রিজন অফিস এবং সিভিল সাপ্লাই অফিসে কয়েক বছর চাকরি করেন। ১৯৪৫ সাল থেকে তিনি মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকা সম্পাদনা করেন। বাংলা ভাষায় আরবি-ফারসি শব্দের প্রয়োগনৈপুণ্য এবং বিষয়বস্তু ও আঙ্গিকের অভিনবত্বে তাঁর কবিতা এক বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে। ব্যঙ্গ কবিতা ও সনেট রচনায় তাঁর কৃতিত্ব অনস্বীকার্য। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্য সাত সাগরের মাঝি (১৯৪৪), সিরাজাম মুনিরা (১৯৫২), নৌফেল ও হাতেম (১৯৬১), মুহূর্তের কবিতা (১৯৬৩), হাতেমতায়ী (১৯৬৬), হাবেদা মরুর কাহিনী (১৯৮১) ইত্যাদি। সাহিত্যে বিশেষ অবদানে জন্য তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬০), প্রেসিডেন্ট পুরস্কার প্রাইড অব পারফরম্যান্স (১৯৬১), আদমজী পুরস্কার (১৯৬৬), ইউনেসকো পুরস্কার (১৯৬৬), মরণোত্তর একুশে পদক (১৯৭৭), স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৮০) লাভ করেন। ১৯৭৪ সালের ১৯ অক্টোবর ঢাকা তাঁর মৃত্যু হয়।

১৯. শওকত ওসমান (১৯১৭-১৯৯৮) কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক। ১৯১৭ সালের ২ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার সবলসিংহপুর গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম শেখ আজিজুর রহমান; ‘শওকত ওসমান’ তাঁর সাহিত্যিক নাম। উপন্যাস ও গল্প রচয়িতা হিসেবেই শওকত ওসমানের মুখ্য পরিচয়; তবে প্রবন্ধ, নাটক, রম্যরচনা, স্মৃতিকথা ও শিশুতোষ গ্রন্থও তিনি রচনা করেছেন। বিদেশি ভাষার অনেক উপন্যাস, ছোটগল্প ও নাটক তিনি বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেছেন। গ্রন্থ সম্পাদনার ক্ষেত্রেও তিনি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি রচনা হলো: উপন্যাস জননী (১৯৫৮), ক্রীতদাসের হাসি (১৯৬২), সমাগম (১৯৬৭), চৌরসন্ধি (১৯৬৮), রাজা উপাখ্যান (১৯৭১), জাহান্নাম হইতে বিদায় (১৯৭১), দুই সৈনিক (১৯৭৩), নেকড়ে অরণ্য (১৯৭৩), পতঙ্গ পিঞ্জর (১৯৮৩), আর্তনাদ (১৯৮৫), রাজপুরুষ (১৯৯২) ইত্যাদি। সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬২), আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৬), পাকিস্তান সরকারের প্রেসিডেন্ট পুরস্কার (১৯৬৭), একুশে পদক (১৯৮৩), মাহবুবউল্লাহ ফাউন্ডেশন পুরস্কার (১৯৮৩), মুক্তধারা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯১), স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার (১৯৯৭)-এ ভূষিত হন। ১৯৯৮ সালের ১৪ মে ঢাকায় তাঁর মৃত্যু হয়।

২০. আবুল হোসেন (১৯২২-২০১৪) বাংলাদেশের প্রথম আধুনিক কবি। তিনি পঁচিশটি বই লিখেছেন। তাঁর প্রথম কবিতার বই ছিল নব বসন্ত। এ ছাড়াও রয়েছে বিরাশ সংলাপ, দুঃস্বপ্ন থেকে দুঃস্বপ্নে, এখনও সময় আছে, কালের খাতায় ইত্যাদি।

২১. ইসলাম, কাজী নজরুল (১৮৯৯-১৯৭৬) বাংলাদেশের জাতীয় কবি এবং অবিভক্ত বাংলার সাহিত্য, সমাজ ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। নজরুল ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ (২৪ মে ১৮৯৯) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং আধুনিক বাংলা গানের জগতে ‘বুলবুল’ নামে খ্যাত। নজরুলের ‘প্রলয়োল্লাস’, ‘আগমনী’, ‘খেয়াপারের তরণী’, ‘শাত-ইল্-আরব’, ‘বিদ্রোহী’, ‘কামাল পাশা’ প্রভৃতি বাংলা সাহিত্যে সাড়া জাগানো এবং বাংলা কবিতার মোড় ফেরানো কবিতা সংকলিত হয়েছিল। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে কবির অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এক বিশেষ সমাবর্তনে কবিকে সম্মানসূচক ডি. লিট উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭৬ সালের জানুয়ারি মাসে নজরুলকে বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান এবং ২১ ফেব্রুয়ারি ‘একুশে পদকে’ ভূষিত করে। ২৯ আগস্ট ১৯৭৬ (১২ ভাদ্র ১৩৮৩) ঢাকার পিজি হাসপাতালে কবি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের উত্তর পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয় বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে।

২২. বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি বাঙালি মুসলমানদের একটি সাহিত্য সংগঠন। কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের (১৮৯৩) অনুপ্রেরণায় কয়েকজন উদীয়মান মুসলিম লেখক ১৯১১ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁরা হলেন মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরী, মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক প্রমুখ। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ সমিতির সম্পাদক মনোনীত হন। একটি পরিচালক পরিষদ দ্বারা সমিতি পরিচালিত হতো। বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি দীর্ঘকাল স্থায়ী একটি মুসলিম সংগঠন। জাতির ক্রান্তিলগ্নে মুসলমান লেখকগণকে একটি ব্যানারে একত্রিত করা এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে সমাজের মধ্যে জাতীয় জাগরণ ও জাতীয়তাবোধের সঞ্চার করা ছিল এর একটি বড় অর্জন।

২৩. সরোজিনী নাইডু (১৮৭৯-১৯৪৯) কবি, রাজনীতিক। ১৮৭৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ভারতের হায়দ্রাবাদে তাঁর জন্ম। সরোজিনী নাইডু ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। ১৯১৫ সালে তিনি অল ইন্ডিয়া ন্যাশনাল কংগ্রেসে যোগ দেন। তিনি সমগ্র ভারতে সভা সমাবেশ করে নারী মুক্তি, শ্রমিক অধিকার রক্ষা ও জাতীয়তাবাদের সমর্থনে তাঁর বার্তা প্রচার করেন। সরোজিনী নাইডু ছিলেন একজন খ্যাতিমান কবি। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ হলো The Ladz of the Lake, Maher Muneer, The Golden Threshold (1905), The Bird of Time: Songs of Life, Death and the Spring (1912), The Gift of India (1915), The Broken Wing: Songs of Love, Death and the Spring (1917), The Sceptred Flute: The Songs of India (1943), The Feather of the Dawn (1961) । তিনি The Ambassador of Hindu Muslim Unity (১৯১৬) নামে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র জীবনীগ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর রচিত কবিতা সংগ্রহ The Golden Threshold ১৯০৫ সালে প্রকাশিত হওয়ার পর তিনি সাধারণ্যে ‘বুলবুলে হিন্দ’ খেতাবে বিভূষিত হন। ১৯০৮ সালে হায়দ্রাবাদে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ তত্পরতার জন্য ব্রিটিশ সরকার তাঁকে কায়সার-ই-হিন্দ স্বর্ণপদক প্রদান করে। সরোজিনী নাইডুর আজীবন কর্মসাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার সরোজিনী নাইডু স্বর্ণপদক প্রবর্তন করেছেন।

২৪. মোহাম্মদী একটি বাংলা মাসিক পত্রিকা। ১৯০৩ সালের আগস্ট মাসে মোহাম্মদ আকরম খাঁর সম্পাদনায় কলকাতা থেকে এটি প্রকাশিত হয়। ব্রিটিশ ভারত ও পাকিস্তানে বাংলার মুসলমানদের মধ্যে সাহিত্য-সংস্কৃতির একটি স্বতন্ত্র ধারা সৃষ্টি এবং জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বভিত্তিক মুসলিম জাতীয়তাবাদের বিকাশ এবং শেষে পাকিস্তানি ভাবধারার প্রসার ঘটানো ছিল মোহাম্মদী প্রকাশের মূল উদ্দেশ্য। তবে এতে অন্য মতাদর্শের লেখকের লেখাও প্রকাশিত হতো। এতে যেসব মুসলমান লেখক, কবি-সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ লিখতেন তাঁরা হলেন সুফিয়া কামাল, শওকত ওসমান, তালিম হোসেন, আবদুল হাই, আবু জাফর শামসুদ্দীন, হবীবুল্লাহ্ বাহার চৌধুরী, মোহাম্মদ আকরম খাঁ, আবদুল্লাহ আল-মুতী শরফুদ্দিন, আবদুল গনি হাজারী, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আবু রুশদ, জসীমউদ্দীন, আশরাফ সিদ্দিকী, ফেরদৌস খান প্রমুখ। তাঁরা অনেকই পরবর্তীকালে লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ ও প্রতিষ্ঠালাভ করেন।

২৫. বেগম বাংলার প্রথম সচিত্র মহিলা সাপ্তাহিক পত্রিকা। ১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই কলকাতা থেকে এটি প্রকাশিত হয়। সাহিত্যক্ষেত্রে মেয়েদের এগিয়ে আনার লক্ষ্যে সাহিত্যচর্চার পৃথক ক্ষেত্র হিসেবে বেগমের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ১৯৫০ সালে বেগম ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। বেগমের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন এবং প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদিকা ছিলেন বেগম সুফিয়া কামাল। পরে পত্রিকাটি সম্পাদনা করেছেন নূরজাহান বেগম। বেগমের প্রথম সংখ্যা ছাপা হয়েছিল ৫০০ কপি এবং প্রতি কপির মূল্য ছিল চার আনা। প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদে বেগম রোকেয়ার ছবি ছাপা হয়েছিল। পত্রিকাটির একটি বিশেষ আকর্ষণ এর বার্ষিক ঈদসংখ্যা। প্রথম ঈদসংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৯৪৮ সালে কলকাতা থেকে, দাম ছিল ২ টাকা।

২৬. সেলিনা বাহার (১৯৪০-২০০৪) সেলিনা বাহার চৌধুরী এবং বিবাহের পর সেলিনা বাহার জামান নামে সমধিক পরিচিত পারভীন সুলতানা চৌধুরী ১৯৪০ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতা হবীবুল্লাহ বাহার ও মাতা আনোয়ারা বাহার চৌধুরী অবিভক্ত বাংলার প্রগতিশীল অসামপ্রদায়িক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পঞ্চাশের দশক থেকেই ঢাকার বেতারের শিশুশিল্পী হিসেবে সেলিনা বাহারের হাতেখড়ি হয় এবং নৃত্য ও আবৃত্তিতে দক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন। নব্বইয়ের দশক থেকে তিনি বিভিন্ন স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৯৫ সালে হবীবুল্লাহ বাহার স্মারকগ্রন্থ পুনর্মুদ্রণ দিয়ে তাঁর এ পর্যায়ের কর্মযজ্ঞ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত হয় জহুর হোসেন চৌধুরী স্মারকগ্রন্থ (১৯৯৬), আনোয়ারা বাহার চৌধুরী স্মারকগ্রন্থ (১৯৯৭), শামসুদ্দীন আবুল কালাম স্মারকগ্রন্থ (১৯৯৯), শামসুন নাহার মাহমুদ স্মারকগ্রন্থ (২০০২), বেগম রোকেয়া স্মারকগ্রন্থ (২০০২), শওকত ওসমান স্মারকগ্রন্থ (২০০৩)। সেলিনা বাহারের সর্বশেষ অসমাপ্ত রচনা পথে চলে যেতে যেতে। ২০০৪ সালের ৪ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়।

২৭. বুলবুল ললিতকলা একাডেমী (বাফা) একটি সংস্কৃতি-চর্চাকেন্দ্র। উপমহাদেশের বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী বুলবুল চৌধুরীর স্মৃতিবিজড়িত এ প্রতিষ্ঠানটি ১৯৫৫ সালের ১৭ মে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়। সংক্ষেপে এটি বাফা (BAFA Bulbul Academy for Fine Arts) নামে পরিচিত। কণ্ঠসংগীত, যন্ত্রসংগীত, নৃত্যকলা, নাট্যকলা, চারু ও কারুশিল্পে শিক্ষাদান এবং শিল্প-সাহিত্য-সংগীতে গবেষণা পরিচালনা এর লক্ষ্য। বুলবুল ললিতকলা একাডেমী প্রথমে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ শুরু করে। বিভিন্ন সময়ে সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দল নিয়ে এটি ইরাক, ইরান, পাকিস্তান, সোভিয়েত রাশিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, চীন, নেপাল, বলিভিয়া, ওমান প্রভৃতি দেশে অনুষ্ঠান করে সুনাম অর্জন করে। একাডেমী পরিবেশিত কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নৃত্যনাট্য হলো: চণ্ডালিকা (১৯৫৮), প্রকৃতির লীলা (১৯৫৮), নকসী কাঁথার মাঠ (১৯৫৯), সিন্ধু (১৯৬১), মায়ার খেলা (১৯৬৪), চিত্রাঙ্গদা (১৯৬৬), হাজার তারের বীণা (১৯৬৭), বাদল বরিষণে (১৯৬৭), রাজপথ জনপথ (১৯৬৯) ও শ্যামা (১৯৭০)। এছাড়াও একাডেমী বিভিন্ন বিষয় ও গানের ওপর প্রায় অর্ধশত খণ্ড নৃত্যনাট্য পরিবেশন করেছে। একাডেমীর সবচেয়ে বড় অবদান সংস্কারমুক্ত সংস্কৃতিচর্চাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। এক সময় নৃত্যকলা সম্পর্কে মুসলিম সমাজের বিরূপ ধারণা ছিল। বুলবুল ললিতকলা একাডেমী সে ধারণা ভেঙে দিয়ে নৃত্যকলাকে সবার নিকট গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। সংগীত, নৃত্য ও যন্ত্রশিল্পী তৈরি করে এই প্রতিষ্ঠান দেশের মৌলিক সাংস্কৃতিক দায়িত্ব পালন করছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন